ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের নির্বসন

৪১তম পর্ব

লেখক: মৃধা মৌনি

#প্রেমের_নির্বাসন - (৪১)

লেখনীতে - #মৃধা_মৌনি

______________

রাত গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। আকাশ আজ চাঁদ-তারা বিহীন এক নিশ্ছিদ্র অন্ধকারের চাদরে ঢাকা। চারপাশের নিস্তব্ধতা যেন পাথুরে স্তব্ধতার রূপ, যেখানে বাতাসের দীর্ঘশ্বাসও শোনা বারণ। এই ঘুটঘুটে আঁধারের মাঝে ব্যথার নীল দহনে মুখ কুঁচকে বসে আছে রোদ্দুর। তার পাশেই মিশি - মমতাময়ী হাতের স্পর্শে সাদা ব্যান্ডেজ দিয়ে ভাইয়ের ক্ষতস্থানে পট্টি বাঁধছে সে।

'খুব যন্ত্রণা দেবে রে!' স্তিমিত কণ্ঠে আশঙ্কার সুর মিশির।

ব্যান্ডেজ বাঁধার পর সে চোখ তুলে চাইল ভাইয়ের পাণ্ডুর মুখখানির দিকে। যন্ত্রণায় শরীরটা ধনুকের মতো কুঁকড়ে গেলেও রোদ্দুরের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অমলিন হাসি লেগে আছে। সে সগৌরবে বলে উঠল, 'দিক না! এর চেয়ে কয়েক হাজার গুণ বেশি দহন তো বুকের গহিন শ্মশানে দাফন করে রেখেছি। এ তো সামান্য তুচ্ছ এক আঁচড় মাত্র!'

মিশি অপলক তাকিয়ে রয়। মনের অজান্তেই স্মৃতির ধূসর পাতাগুলো ওল্টাতে বসে। কত উজ্জ্বল ছিল এই ছেলেটা! ছাঁটা দাড়ি-গোঁফ আর পরিপাটি করে আঁচড়ানো চুলে যাকে দেখলে মনের কোণে এক পশলা স্নিগ্ধতা নেমে আসত, সেই মানুষটা আজ এক জীবন্ত ধ্বংসস্তূপ। যার চপল হাসিতে একসময় পুরো বাড়ি ম ম করত, সে আজ হাসতে ভুলে গেছে কয়েক যুগ ধরে।

সেই টগবগে প্রাণোচ্ছল মির্জা পরিবার আজ এক নীরব শ্মশান। যে বাড়ির দেয়ালে দেয়ালে একসময় কোলাহলের প্রতিধ্বনি বাজত, আজ সেখানে কেবল কান পাতলে শোনা যায় বুক চিরে বেরিয়ে আসা গুমোট দীর্ঘশ্বাস। সে দীর্ঘশ্বাস আটকানোর সাধ্য এই নিঝুম রাতেরও নেই।

জানলার বাইরে ফিকে হয়ে আসা আঁধারের দিকে তাকিয়ে আনমনেই বিড়বিড় করল মিশি, 'সবকিছু কেমন ওলটপালট হয়ে গেল, তাই না ভাইয়া?'

একটু থেমে রোদ্দুরের মলিন মুখটার দিকে তাকালো পুনরায়। বিষণ্ণতা সেখানে স্থায়ী বসতি গেঁড়েছে বুঝি। মিশি দীর্ঘশ্বাস ফেলে যোগ করল, 'সবার জীবনেই অকাল ঝড় নেমে এল। কেউ ভালো নেই আমরা...'

'ভালো থাকতে হলে ভালো কিছু করতেও হয় মিশি, আমরা কি তা পেরেছি?' রোদ্দুরের কণ্ঠস্বর বুজে এল, চোখের কোণ চিকচিক করে উঠল লোনা জলে, 'বরং আমরা কেবল জুলুম করেছি, অন্যায় করেছি। তুচ্ছ অবহেলায় পিষে দিয়েছি কারও কোমল হৃদয়!'

মিশি সান্ত্বনার সুরে বলে, 'কিন্তু সেখানে তো তোমার একার কোনো দোষ ছিল না।'

'অল্প হলেও ছিল তো,' রোদ্দুর ধরা গলায় আওড়ে, 'আমার আরও একটু বুঝদার হওয়া উচিত ছিল। কে প্রকৃত শুভাকাঙ্ক্ষী আর কে মুখোশধারী—তা যাচাই করার দায়ভার তো আমারই ছিল। বাবার জেদের সামনে আমার অন্তত পাথর হওয়া উচিত ছিল। তাহলে আজ এই নিস্তব্ধ রজনীটা অন্যরকম হতে পারত। আমাদের ঘরটা অপূর্ণতায় নয়, বরং একরাশ মায়ায় মোড়ানো থাকত। জীবনটা... জীবনটা সত্যিই অন্যরকম সুন্দর হতে পারত।'

রোদ্দুর একটা তপ্ত নিশ্বাস ফেলে। মুখ নিচু করে নিজের চোখের জল আড়াল করার ব্যর্থ চেষ্টা করে। মিশি দেখল সেই দৃশ্য, বুকের ভেতরটা হু-হু করে উঠল তার। পরক্ষণেই এক অদ্ভুত আক্রোশে গলা চড়ে গেল মেয়েটার, 'অথচ দেখো, সে হয়তো অন্য কারও হাত ধরে দিব্যি সুখে আছে! আর তুমি এখানে স্মৃতির দংশনে তিল তিল করে মরছ ভাইয়া।'

মুহূর্তেই রোদ্দুরের চোয়াল শক্ত হয়। প্রতিবাদের ঝিলিক খেলে গেল চোখের তারায়। অবদমিত যন্ত্রণায় ফেটে পড়ে বলল, 'ও মৃত্যুকে আলিঙ্গন করতে পারে মিশি, কিন্তু অন্য কোনো পুরুষকে নয়! কক্ষনো না।'

'যদি করে থাকে?' মিশির কণ্ঠে সংশয়।

'করবে না।' রোদ্দুরের প্রত্যয় সংক্ষুব্ধ।

'এত বিশ্বাস তোমার?'

'বুকের পাঁজর দিয়ে আগলে রাখা বিশ্বাস মিশি। এর কোনো নড়চড় নেই।'

মিশি হাসে, তিক্ততা ঝরে পড়ল দুই ঠোঁট জুড়ে, 'অথচ সেই মানুষটাই তোমার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারল না? অনায়াসেই চলে গেল?'

রোদ্দুর নিশ্চুপ রয় ক্ষণকাল। তারপর যেন নিজেকেই শোনাল নাকি স্বান্তনা দিল, 'সে তো অভিমান করে গেছে... অভিমানী এক বোকা পাখি সে। আমার ওপর অভিমান করেই ঘর ছেড়েছে।' মিশির দিকে তাকিয়ে ভীষণ অসহায় চোখে আবার বলল, 'আসলে কিইবা করার ছিল ওর বল? আমিই তো তাকে সেই কঠিন সময়ে এক ফোঁটা সঙ্গ দিতে পারিনি।'

মিশি ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ায়। মেয়েটার দুচোখে শূন্যতা।

'জানি না এই গল্পের শেষ কোথায়। তবে এটুকু জানি, তোমাদের এই টানাপোড়েনের আগুনে আমার জীবনটাও ভস্মীভূত হয়ে গেছে। সৌম্যকে বড্ড চেয়েছিলাম আমি, বাবা দেননি। আর এখন? এখন আমাকে চাওয়ার মতো কেউ নেই। যে বাড়িতে বড় ভাইটা পাগলের মতো পথে পথে লড়াই করে ফেরে, যে সংসারে প্রতাপশালী বাবা আজ ভিখিরি হয়ে শয্যাশায়ী, যেখানে ভোরের পাখির গান নেই, জানলায় রোদ পড়ে না... চারদিকে যেখানে শুধু ধ্বংসস্তূপ, সেখানে কে আসবে শুনি? কেউ আসবে না আমার জন্য।'

মিশি একটা করুণ হাসি হাসল, 'কিন্তু কার কাছেই বা অভিযোগ করব? এখানে তো সবাই নিজের নিজের দহনে নীল হয়ে আছে।'

রোদ্দুর নিরুত্তর। তার মৌনতা ঘরের বাতাসকে আরও ভারী করে তুলে। মিশি নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যায় তারপর।

★★★

আকাশের ক্যানভাসে আজ ধূসর মেঘের আনাগোনা। স্থানীয় সংবাদ বলছে, তুষারঝড়ের দাপট আপাতত স্তিমিত; নতুন করে স্নো-ফলের সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। জানলার কাচ ভেদ করে বিকেলের চোখ গেল সামনের ইয়ার্ডে। সেখানে সারিবদ্ধ পাইন গাছগুলো বরফের সাদা চাদরে ঢাকা। সেই গাছগুলোর ফাঁকফোকর দিয়ে ভেসে আসছে রঙ-বেরঙের সোয়েটার পরা একঝাঁক শিশুর খিলখিল হাসির শব্দ। পাড়ার সব বাচ্চা বুঝি আজ উৎসবে মেতেছে।

বিকেল হাতে কফির মগ নিয়ে জানলার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। সূর্যাস্ত হতে আরও ঘণ্টা তিনেক বাকি। বিদেশের এই দীর্ঘ বিকেলগুলোতে একাকীত্ব যখন চেপে বসে, তখন এই বাচ্চাদের কোলাহলটুকু মন্দ লাগে না। তখনই হঠাৎ করেই পরিচিত এক সুবাস নাকে ধাক্কা দেয়। বিকেল মুচকি হেসে পেছনে না তাকিয়েই বলল, 'গুড আফটারনুন...'

শ্যামা এক হাতে চোখ ডলতে ডলতে দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে। উস্কোখুস্কো চুল আর আধবোজা চোখ দেখে বোঝা যাচ্ছে, ওর ঘুমটা এখনো পূর্ণ হয়নি। বিকেল মগটা টেবিলে রেখে এগিয়ে এল। নরম স্বরে বলল, 'আরও কিছুক্ষণ ঘুমানো উচিত ছিল তোমার। এত তাড়াতাড়ি উঠলে কেন?'

শ্যামা নিরুত্তর। বিকেল লক্ষ্য করেছে, এই মেয়েটা তার বয়সের তুলনায় বড্ড বেশি গম্ভীর। খুব প্রয়োজন না হলে সে মুখ খোলে না। অভিমানী পাথরের মতো চুপ করে থাকে। বিকেল দীর্ঘশ্বাস ফেলে। মা হওয়ার কোনো অভিজ্ঞতা নেই তার, কিন্তু এই অনাথ মেয়েটার দায়িত্ব যখন সে নিয়েছেই, তখন না বলা কথাগুলো তাকেই বুঝে নিতে হবে। অনুমানের ওপর ভিত্তি করে সে শুধাল, 'পেটে বুঝি ইঁদুর দৌড়াচ্ছে? খিদে পেয়েছে?'

শ্যামা আলতো করে ওপর-নিচ মাথা নাড়ে। বিকেল নিজের তীক্ষ্ণ বুদ্ধির জন্য মনে মনে নিজেকে একটা বাহবা দিল সঙ্গে সঙ্গেই।

'কী খাবে শুনি? কোনো স্পেশাল রিকোয়ারমেন্ট আছে, নাকি যা দেব তাতেই চলবে?'

শ্যামা এবার ঘাড় কাত করে বোঝাল—যা পাওয়া যায়, তাতেই সে খুশি।

বিকেল হাসল, 'ওকে ফাইন। আসো আমার সাথে কিচেনে, আমাকে কোম্পানি দাও। নাকি তাতেও আপত্তি আছে?'

মেয়েটি আবার মাথা নেড়ে জানাল, তার কোনো আপত্তি নেই। বিকেলের খুব অবাক লাগল। অদ্ভুত তো! একটা মানুষ শুধু মাথা নেড়ে নেড়ে এভাবে কতক্ষণ কথা বলতে পারে?

রান্নাঘরে এসে বিকেল ওকে তুলে কিচেন ক্যাবিনেটের ওপর বসিয়ে দিল। ফ্রিজ থেকে ফ্রোজেন পরোটা বের করে সেঁকতে শুরু করল সে। নিরবতা ভাঙার জন্য বিকেলের একতরফা কথাই চলতে লাগল অনর্গল—

'উঠে যখন গেছই, তখন গরম পানি দিয়ে একটা শাওয়ার নিয়ে নাও। দেখো, বাইরে কত আনন্দ হচ্ছে। স্নো-ফাইটিং চলছে। তুমি চাইলে আমি তোমাকে পাশের বাড়ির বাচ্চাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পারি। খেলবে ওদের সাথে?'

শ্যামা এবার খুব স্পষ্ট করে মাথা নেড়ে ‘না’ জানাল। তার চোখেমুখে এক ধরনের অনীহা।

খানিক থমকায় বিকেল।৷ খুন্তিটা হাতে নিয়েই ঘুরে দাঁড়াল সে।

'দেখো, আমি তোমাকে যতই বোঝার চেষ্টা করছি, তুমি ততই আমাদের মাঝে একটা অদৃশ্য দেয়াল তুলে দিচ্ছ। কেন? আমাকে একটু সাহায্য করা কি তোমার উচিত নয়?'

শ্যামার ঠোঁট তবু নড়ে না। নিশ্চুপে চেয়ে আছে শুধু। বিকেল কিছুটা গম্ভীর হয় এবারে, 'আমি জানি না তুমি কোথা থেকে এসেছ, কারা তোমার পরিবার বা কী তোমার আসল পরিচয়। কিন্তু আমি যখন তোমার দায়িত্ব নিয়েছি, তখন তোমারও উচিত আমাকে সাপোর্ট করা। এভাবে নীরব থাকলে আমি কিছুই বুঝতে পারব না।'

এবারেও শ্যামা কোনো জবাব দিল না। তার ডাগর ডাগর কালো চোখ জোড়া দিয়ে বিকেলের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে রইল, যেন সে কোনো অদ্ভুত কিছুই দেখছে। বিকেলের এবার সত্যিই হতাশা লাগল। কিছুটা বিরক্তি মেশানো গলায় বলে ফেলে, 'আমার দেখা সবচেয়ে অদ্ভুত বাচ্চা তুমি। কেন জানি না, আমার লাইফে যা আসে সবই কেমন উল্টোপাল্টা আর এবনরমাল হয়! খোদা...'

'আপনি বুঝি আরও বাবু টোকাই আনছিলেন? আগেও?' বলে ওঠে শ্যামা, অদ্ভুত ভঙ্গিতে।

বিকেল চমকে ওঠে। ক্ষণকাল স্থির চোখে তার দিকে তাকিয়ে থেকে পরমুহূর্তেই শব্দ করে হেসে ফেলল সে। দু'ধারে মাথা নাড়িয়ে বলতে লাগল, 'না রে বাবা, আর কাউকে টোকাই আনিনি। শুধু তোমাকেই এনেছি।'

ডিম ভেঙে তেলের কড়াইয়ে ছাড়ল বিকেল। তেলের চড়চড় শব্দের মাঝে নিচু গলায় জিজ্ঞেস করে ক্ষণিক পরে, 'তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব? সঠিক উত্তর দেবে তো?'

শ্যামা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি দিল, ঠোঁট জোড়া শব্দহীন।

'তুমি কি বাঙালি?'

এমন প্রশ্নে অবুঝের মতো চাইল মেয়েটা। বিকেল বুঝতে পারে, 'বাঙালি' শব্দটা এই শিশুর জন্য সম্ভবত একটু বেশিই তাত্ত্বিক হয়ে গেছে। সে কথা ঘুরিয়ে সহজ করে বলল তাই, 'বলছি যে, তুমি এই যে বাংলা ভাষায় কথা বলছ, এটা কার কাছ থেকে শিখেছ?'

এবার ছোট্ট পরীটা বুঝল। ঘাড় কাত করে খুব নরম স্বরে উচ্চারণ করল, 'মা।'

বিকেলের হাত থমকায় তাই শুনে।

'তোমার মা-ও কি বাংলায় কথা বলতেন?'

শ্যামা ওপর-নিচ মাথা নাড়ল।

'আর তোমার বাবা?'

শ্যামা আবারও মাথা নাড়ে। মানে, তার বাবাও বাঙালি ছিলেন।

'ওহ, তাহলে তো পুরো বাঙালি পরিবার! তা কোথায় থাকতে তোমরা? এই দেশেই?'

শ্যামা মাথা দুলিয়ে ‘হ্যাঁ’ বলল।

'এই আশেপাশে কোথাও?' বিকেলের কৌতূহল বাঁধ ভাঙে। সুযোগ পেয়ে একটার পর একটা প্রশ্নের ডালি খুলে বসেছে সে।

উত্তরে শ্যামা এবার দুই দিকে জোরে জোরে মাথা নাড়ল। জানাল, তারা আশেপাশে থাকত না।

'তাহলে দূরে কোথাও? এখানে এলে কীভাবে? জায়গার নাম জানো?'

শ্যামা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রয়। বিকেল নিজের ভুল বুঝতে পেরে শান্ত গলায় বলে, 'সরি, আমি বোধহয় একসাথে অনেক প্রশ্ন করে ফেলেছি। আচ্ছা বলো তো, এখানে কীভাবে এসেছ?'

'ট্রে-এ-নে...' টেনে টেনে অস্পষ্টভাবে শব্দটা উচ্চারণ করে পাতলা ঠোঁট জোড়া।

'ট্রেনে করে? আচ্ছা! সঙ্গে কি তোমার মা-বাবা ছিল?'

মাথাটা আবার এদিক ওদিক ঘোরে। না জানাল শ্যামা।

বিকেলের ভুরু কুঁচকে এল।

'তবে? কে ছিল সঙ্গে?'

'বাবা...' ছোট্ট উত্তর সাড়তেই বিকেল কপাল কুঁচকে বলল,

'শুধু তোমার বাবা ছিল?'

শ্যামা ‘হ্যাঁ’ বলতেই তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। মেয়েটা কি তবে হারিয়ে গেছে? যদি তা-ই হয়, তবে তো সে বিশাল বড় ভুল করেছে ওকে এভাবে নিজের কাছে রেখে। হয়তো ওর বাবা-মা ওকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। পুলিশে খবর দেওয়াটা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

প্লেটে দুটো মুচমুচে পরোটা, একটা ডিম পোচ, পাশে সামান্য টমেটো সালাদ আর এক বাটি টক দই দিয়ে সাজিয়ে দিল বিকেল। সবশেষে এক গ্লাস অরেঞ্জ জুস। শ্যামা খুব মন দিয়ে খেল। খাওয়ার ধরনেও সে অন্য দশটা বাচ্চার মতো নয়, এলোমেলো বা ছড়ানো-ছিটানো ভঙ্গি নয়, বরং খুব মার্জিত আর ধীরস্থির ভাবেই খাওয়া শেষ করে মেয়েটা।

বিকেলের মাথায় চিন্তার পাহাড় গেড়ে বসে। ঘুরেফিরে বারংবার মেয়েটির পরিচয় জানবার আগ্রহবোধে হৃদয় পূর্ণ হয়। সিদ্ধান্ত নিলো, রাত নামার আগেই একবার স্থানীয় থানা থেকে ঘুরে আসবে।

কিন্তু মানুষের পরিকল্পনা আর বিধাতার লিখন তো এক নয়। খাওয়া শেষে হঠাৎই মেয়েটা বীভৎস চিৎকারে আতংকিত হয়ে ওঠে। বিকেল কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখল, শ্যামা নিথর হয়ে মেঝেতে পড়ে যাচ্ছে। মেইন দরজা খুলে দাঁড়িয়েছিল বিকেল, ওর দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী এলবার্টের লম্বা ছায়া এসে পড়েছিল তখন ঘরের ভেতর।

★★★

খোলা জানলা দিয়ে হু-হু করে হিমেল বাতাস ঢুকছে ঘরে। শীতের তীব্র কামড়ে ঘরের বাতাস পাথর হয়ে আছে। আইরিন ঘরে ঢুকেই আঁতকে উঠলেন। ব্যস্ত সমস্ত হয়ে জানলার দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন, 'জানলাটা এমন খুলে রাখছ কেন ভাবি? গা তো একদম বরফ হয়ে গেছে তোমার!'

কপাটে হাত দিয়ে জানলাটা আটকাতে যাবেন, তখনই রেহনুমা অত্যন্ত দুর্বল ও ভগ্ন কণ্ঠে বললেন, 'থাক আইরিন, ওটা লাগাতে হবে না। তুই বরং এখানে এসে আমার পাশে বস।'

আইরিন শুনলেন না। জানালাটা শক্ত করে আটকে তবেই রেহনুমার শিয়রে এসে বসলেন। বিষণ্ণ মনে শুধালেন, 'ভাইজান ঘুমিয়েছে?'

রেহনুমা শুধু ঘাড় নেড়ে সায় দিলেন। তারপর শূন্য দৃষ্টিতে কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে থেকে আচমকা বললেন, 'আমার মরণের জন্য একটু দোয়া করিস তো। এই জীবন আর সইছে না।'

আইরিন শিউরে উঠলেন, 'এসব কী কথা ভাবি! ছিঃ! মরণের কথা এভাবে মুখে আনতে নেই।'

'না এনে উপায় কী বল? যে অন্যায় করেছি, তার একমাত্র প্রায়শ্চিত্ত বোধহয় মৃত্যুই।'

চোখে পানি না থাকলেও হৃদয়ের গহীনে চলা দহন লুকোতে পারলেন না তিনি।

আইরিন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে গুমোট স্বরে বললেন, 'সংসারটা বাঁচাতে চেয়েছিলে ভাবি। সংসার তো বেঁচে আছে।'

'সংসার বেঁচে আছে, কিন্তু মানুষগুলো কি আছে?' রেহনুমার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল, 'সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে কী বিষই না ছড়ালাম। অথচ ওরা যে আমাদের সাথে এমন করবে, তা কি কখনো স্বপ্নেও ভেবেছিলাম?'

আইরিন একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, 'লতা ভাবিকে চিনতে তুমি মস্ত বড় ভুল করেছ ভাবি। আমি বারবার তোমাকে সাবধান করেছিলাম, মনে পড়ে?'

রেহনুমা হাহাকার করে উঠলেন, 'কী করব আইরিন? ছেলেটা এখন আমাকে সহ্যই করতে পারে না। চোখের সামনে নিজের র★ক্তকে পর হয়ে যেতে দেখছি।'

'ভাইজানের শরীর তো এখন আর সায় দিচ্ছে না। চাইলে তুমিই পারো সব ওলটপালট করে দিতে। মির্জা বাড়ির ওপর যে অভিশাপ নেমে এসেছে, তা মুছে দিয়ে সবকিছু আবার আগের মতো স্বাভাবিক করার চাবিকাঠি তো তোমারই হাতে।'

রেহনুমা উদগ্রীব হয়ে চাইলেন, 'কীভাবে?'

আইরিন স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে শীতল কণ্ঠে বললেন, 'বিকেলকে ফিরিয়ে নিয়ে এসো।'

মুহূর্তেই রেহনুমা স্তব্ধ বনে যান। ঘরের নিস্তব্ধতা আরও গাঢ় হলো। আইরিন থামলেন না, বলতে থাকলেন, 'মেয়েটার ওপর কম অবিচার তো করোনি তোমরা! আমরা নিজের র★ক্ত হয়েও কী নির্দয়ভাবে ওকে ঠকিয়েছি। যেখানে আমাদের ওর মাথার ওপর ছায়া হওয়ার কথা ছিল, সেখানে আমরা ওকে ঠেলে দিয়েছি নরকের আগুনের দিকে। ভেবেছিলে ওই এতিম মেয়েটার দীর্ঘশ্বাস আমাদের ছোঁবে না? ছুঁয়েছে ভাবি, চাবুকের মতো ছুঁয়েছে। তাই তো আজ একে একে সবার শাস্তির পালা শুরু হয়েছে। বড় ভাইজানের ব্যবসা ডুবল, প্রতিপত্তি গেল। রোদ্দুর মাঝপথে পড়াশোনা ছেড়ে ছিটকে এল। ঘরের সবচেয়ে ভদ্র ছেলেটা আজ নেশার ঘোরে পথের ভিখারি! নেশার টাকার জন্য বাইরের ছেলেরা এসে বাড়ি চড়াও হয়... একবারও ভেবেছিলে এমন দিন আসবে? ওই নিষ্পাপ মেয়েটাকে ঠকানোর ফল হাতেনাতে পাচ্ছি আমরা।'

রেহনুমা হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে উঠলেন, 'আমি তো চেয়েছিলাম ও এই বাড়ির বউ হোক! কিন্তু তোর ভাই... সে কি আমার কথা শুনেছিল?'

আইরিন ম্লান হাসলেন, 'সেদিন তুমি যদি মিথ্যে অসুস্থতার নাটক না করতে, তবে কাহিনীটা আজ অন্যরকম হতো ভাবি।'

'বাপ-ছেলের মধ্যে যে যুদ্ধের রণদামামা বাজছিল, তার ভার আমি নিতে পারিনি আইরিন! বিশ্বাস কর, আমি ইচ্ছে করে অসুস্থ হইনি। সেই পরিস্থিতির চাপ সইবার ক্ষমতা আমার ছিল না।'

আইরিন একদণ্ড চুপ করে রয়। সময় নিয়ে পরের কথাগুলি ছোঁড়ে ধীরস্থির কণ্ঠে, 'কিন্তু তোমার সেই দুর্বলতাকে ঢাল বানিয়েই তো ছেলেটার ওপর অন্যায় সিদ্ধান্তগুলো চাপিয়ে দেওয়া হলো। বড় ভাইজানের ভেঙে পড়া মুখটার দিকে তাকিয়ে রোদ্দুর কিছু বলতে পারল না। আর সেই সুযোগে মেজো ভাবি আর তার মেয়ে মিলে...'

রেহনুমা ঘৃণায় মুখ কুঁচকে উঠলেন, 'নাম নিস না ওদের! মানুষ যে কতটা নিচ আর স্বার্থপর হতে পারে, লতা আমাকে তা হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দিয়েছে।'

'বুঝিয়ে কী লাভ? নিজের মেয়েকে নিয়ে সে-ও তো এখন যন্ত্রণায় ভুগছে। তবু যদি শিক্ষা হয়!'

দুজনেই নীরব হয়ে গেলেন তারপর। ঘরের বাতাস অপরাধবোধের ভারে নুয়ে পড়েছে। রাত প্রায় শেষ, অথচ এই প্রকাণ্ড বড় বাড়িটার কোনো প্রহরীর চোখে দুখণ্ড ঘুমের ছিটেফোঁটাও নেই। শান্তির ঘুম এ বাড়ি থেকে অনেক আগেই বিদায় নিয়েছে। শুধু রুহগুলো কোনোমতে ধুঁকছে...

ক্ষণিক পরে বাইরের নিস্তব্ধতা চিরে মুয়াজ্জিনের সুমধুর কণ্ঠস্বর ভেসে এল— 'হাইয়া আলাস সালাহ, হাইয়া আলাস সালাহ...'

রেহনুমা নড়েচড়ে বসলেন। অস্থিরভাবে জিজ্ঞেস করলেন, 'কোথায় পাব ওকে?'

আইরিনের তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবটা কেটে গেল, 'কাকে? বিকেলের কথা বলছ?'

'হুঁ...'

'সে তো তার সৎ মায়ের সাথে এ ঘর ছেড়েছে। ওর খবর যদি কেউ জেনে থাকে, তবে সেটা একমাত্র ওই মহিলাই।'

'ছোটও তো জানে না ওর খবর?'

'সে কি কখনো মন থেকে খোঁজ নিয়েছে যে জানবে? ঘরে বসে মাথা কুটে মরে, অথচ একবারও বাইরে বেরিয়ে খুঁজে দেখে না। ছেলেটার কথাও কি মনে পড়ে না হুঁ? মানুষের হৃদয় এত কঠিন হয় কেমন করে!'

কথা শেষ করেই আইরিন উঠে দাঁড়ান, 'নামাজটা পড়ে নাও ভাবি। আল্লাহর কাছে তওবা করো। জানি না মির্জা বাড়ির কপালে আর কত লাঞ্ছনা আছে, কিংবা কবে আমরা এই পাপ থেকে মুক্তি পাব...'

ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন তারপর। বাইরে আজানের রেশ মিলিয়ে গেছে। রেহনুমা বুঝতে পারছেন না, কোন মুখে রবের দুয়ারে মাথা ঠুকবেন তিনি!

(চলবে)

_______

গল্পটা এখনো ভালো লাগছে কার কার? হাত তুলুন!

সব্বাইকে দেখি....❤️

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন