ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের নির্বসন

৪৪তম পর্ব

লেখক: মৃধা মৌনি

#প্রেমের_নির্বাসন - (৪৪)

লেখনীতে - #মৃধা_মৌনি

(নোট পড়ে নেবেন সবাই)

_________________

সকাল থেকেই আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নেমেছে। প্রকৃতিতে আজ যেন প্লাবনের সুর। এমন অঝোর ধারায় বর্ষণ বহু কাল দেখেনি শহরটা। রাস্তার মোড়ে একটা বন্ধ দোকানের ঝাপানো শাটারের নিচে দিশা দাঁড়িয়ে ছিল অনেকক্ষণ। ছাঁট এসে শাড়ির অনেকটা ভিজিয়ে দিলেও তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। হাতের মুঠোয় ছাতাটা ধরা, অথচ কেন যে সে ওভাবে ঠায় দাঁড়িয়ে কী ভাবছে, তা বোঝা ভার। এক সময় এক বৃদ্ধ রিকশাওয়ালের ডাকে তার তন্দ্রা ভাঙল।

ভাঙা গলায় বৃদ্ধ শুধোলেন, 'ও আফামুনি, যাইবেন নি?'

দিশা এমন ভাবে চমকে উঠল যে খোদ রিকশাওয়ালাই আঁতকে উঠলেন। লজ্জিত মুখে বললেন, 'ও মা, ভয় পাইছ? আহারে, আমি বুজি নাই তুমি এমন ধ্যানে আছ।'

দিশা ম্লান হেসে সামলে নিল নিজেকে, 'না চাচা, ঠিক আছি। যাবেন আপনি?'

'কই যাবা? এমন ভরা বাদলে দাঁড়াইয়া রইছ ক্যান?'

হাতের ছাতাটা মেলে ধরে দিশা ধীরস্বরে বলল, 'আমাকে মিল রোডের মাথায় নামিয়ে দিতে হবে। পারবেন?'

'পথ তো দূরের, তয় পারমু। উইঠা আসো।'

রিকশায় চড়ে বসেই দিশা আকস্মিক বলে উঠল, 'হুডটা নামানো থাক চাচা।'

বৃদ্ধ আবারও অবাক হলেন। রিকশাওয়ালার বোধহয় কথায় কথায় চমকে ওঠার বাতিক আছে। তিনি আমতা আমতা করে বললেন, 'ভিজবা যে মা! জ্বর নামলে বিপদ।'

'অসুবিধা হবে না, আমায় দেখার লোক আছে।' দিশা নীচু স্বরে কথাটা বলতেই বৃদ্ধ আর দ্বিরুক্তি করলেন না। বিড়বিড় করে বললেন, 'ঠিক আছে, যা তোমার খেয়াল খুশি।'

খোলা রিকশাটা পিচঢালা জলমগ্ন পথে সরসর করে এগিয়ে চলল। আসমান চিরে বৃষ্টি নামছে, সাথে হিমেল হাওয়ার ঝাপটা। হাড়কাঁপানো ঠান্ডাতেও দিশার কেন যেন ভীষণ ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে, বৃষ্টির এই প্রতিটি শীতল কণা তার মনের ভেতরের জমাট বাঁধা দহনকে একটু একটু করে ধুয়ে দিচ্ছে। সে আকাশের দিকে তাকানোর চেষ্টা করল, কিন্তু ঝাপটা সামলাতে না পেরে চোখ নামিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

ভিজে জুবুথুবু হয়ে যখন মির্জা বাড়ির সামনের পথে পৌঁছাল, তখন বৃষ্টির বেগ আরও বেড়েছে। রিকশা থেকে নেমে ভাড়ার অতিরিক্ত ১০০ টাকা বৃদ্ধের হাতে গুঁজে দিয়ে দিশা ধরা গলায় বলল, 'চাচা, দোয়া করবেন। আমার মেয়েটার বড় অসুখ। ও যেন আবার আগের মতো মন খুলে হাসতে পারে।'

বৃদ্ধ লোকটা কী বুঝলেন কে জানে, পরম মমতায় দিশার মাথায় হাত রাখলেন। আর্দ্র গলায় বললেন, 'বুঝতে পারছিলাম মা, তোমার মনটা ভালো নাই। আমারও একটা মাইয়া আছে, তোমার মতোই খামখেয়ালি। সে-ও এমন বাদল দিনে ভিজতে ভালোবাসে। আগে বুঝতাম না, পরে একদিন বুঝলাম—ভরা বর্ষায় ভিজলে ওর চোখের পানি কেউ দেখতে পায় না। মনের আউশ মিটাইয়া কান্দার জন্যই সে বৃষ্টি খোঁজে। তোমার মাইয়ার জন্য দোয়া করি মা, সব দুঃখ ঘুচে ওর কোল জুড়ে সুখ আসুক।'

দিশার দুচোখ ভরে এল। ভিজে শাড়ির আঁচলে চোখের কোণটা মুছে নিয়ে সে ধীর পায়ে মির্জা বাড়ির সদর দরজার দিকে এগিয়ে চলল। বৃষ্টির শব্দে তার কান্নার শব্দটা মিশে গেল প্রকৃতির অতল গহ্বরে।

দরজাটা খোলাই ছিল। দিশা অত্যন্ত সহজ ভঙ্গিতে ভেতরে পা রাখল, ঠিক যেন এই বাড়িরই কেউ—কয়েক মুহূর্ত আগে হয়তো পাশের দোকান থেকে সওদা করতে বেরিয়েছিল, এখন কাজ সেরে ঘরে ফিরছে। চেনা বারান্দা পেরিয়ে বসার ঘরে ঢুকতেই আইরিনের সাথে মুখোমুখি দেখা।

আইরিন বোধহয় তাড়াহুড়ো করে কোথাও যাচ্ছিলেন, হাতে একটা শাকের ডালা। দিশাকে দেখামাত্র তিনি এমনভাবে থমকে দাঁড়ালেন, যেন দিনের আলোয় জলজ্যান্ত কোনো প্রেতাত্মা দেখছেন। দিশার ঠোঁটের কোণে আলতো হাসি ফুটল। বিনম্র কণ্ঠে সে শুধাল, 'কেমন আছ আইরিন?'

আইরিন কোনো জবাব দিতে পারলেন না। বিস্ময়ের ঘোর কাটতেই চাইছে না যেন। তার বিস্ফারিত চোখজোড়া কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না যে, বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া সেই মুখটা আজ তার ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে। দিশা ম্লান হেসে আরও এক পা এগিয়ে এসে আইরিনের হাতটা ধরল। ছোঁয়া পাওয়ামাত্র আইরিনের হাত থেকে শাকের ডালাটা ধপাস করে নিচে পড়ে গেল। থরথর করে কাঁপতে শুরু করলেন তিনি। অবরুদ্ধ গলা চিরে এক চিলতে গোঙানির আর্তনাদ বেরিয়ে এল, 'ও মা গো...'

দিশার হাসির রেখাটা এবার কিছুটা দীর্ঘ হয়। সে শান্ত স্বরে বলল, 'আরে, আমি! চিনতে পারোনি? আমি দিশা... তোমার ছোট ভাইজানের...'

'চিনছি,' আইরিন স্তব্ধ গলায় শব্দটা উচ্চারণ করলেন। পরমুহূর্তেই সংবিৎ ফিরে পেয়ে শাড়ির আঁচল দিয়ে কপাল আর গলার বিন্দু বিন্দু ঘাম মুছে নিলেন। অবিশ্বাসের সুরে জিজ্ঞেস করলেন, 'আপনি এমন জুবুথুবু হয়ে ভিজছেন কীভাবে?'

'বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আসলাম।'

'কেন? কোনো গাড়ি-ঘোড়া পাননি?'

'ইচ্ছা করেই ভিজলাম।'

আইরিন নিচু হয়ে ছড়িয়ে যাওয়া শাকের ডালাটা কুড়িয়ে নিলেন। তার শরীর এখনো কাঁপছে। দিশা চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে ধীরস্বরে জিজ্ঞেস করল, 'বাড়ির বাকি সবাই কোথায়?'

আইরিনের কণ্ঠস্বর এবার হঠাৎ করেই থমথমে হয়ে যায়। নিচু স্বরে প্রশ্ন করলেন, 'কারে খুঁজছেন আপনি?'

দিশার বুক চিরে বেরিয়ে এল দীর্ঘশ্বাস । বুকটা হাহাকার করে উঠলেও সামলে নিয়ে বলে, 'তোমার ছোট ভাইজান... কোথায় সে?'

আইরিন সেকেন্ড দুই চুপ করে রইলেন। তারপর নির্লিপ্ত কণ্ঠে জবাব দিলেন, 'ঘরেই আছে।'

'আর তোমার বড় ভাইজান?'

'উনিও ঘরেই আছেন।'

'ওহ।'

'পথ তো আপনার চেনাই। যান, ভেতরে যান,' বলেই আইরিন আর দাঁড়ালেন না, দ্রুতপায়ে গমন করলেন এক দিকে।

দিশা একা দাঁড়িয়ে রইল বিশাল হলঘরটার মাঝখানে। এক সময় এই বাড়িটা মানুষের কলতানে মুখর থাকত, হাসাহাসি আর খুনসুটিতে জমজমাট থাকত চারপাশ। আজ সেখানে ভর করে আছে কেবলই থমথমে নিস্তব্ধতা। সময়ের নির্মম স্রোত কাকে কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে গেছে, কেইবা তার খবর রাখে! ভেজা কাপড়ে দাঁড়িয়ে থাকা দিশার মনে হলো, এই পরিচিত বাড়িটাও আজ বড্ড অচেনা হয়ে গেছে।

বুক চিরে বেরিয়ে আসা আরও একটি দীর্ঘশ্বাস সামলে সে এগোলো গুটিগুটি পায়ে। পথটা একই রয়ে গেছে। চিনতে অসুবিধে হয় না এতটুকু। না হয় কারো সঙ্গে দেখা। এ বাড়িতে যে মানুষের বসবাস আছে, তা বুঝি আইরিনের সঙ্গে দেখা না হলে বিশ্বাস করতেই কষ্ট হতো তার। সাত-পাঁচ অনেক কিছু মাথায় নিয়েই চেনা দরজাটার সামনে এসে থমকে দাঁড়াল সে। চোখ বুঁজে ঘ্রাণ টানে। নাকে পাওয়া যায় পরিচিত সুবাস। কত বছর পর! দিশা খুব ধীর হাতে সেগুন কাঠের তৈরি দরজাটার বুকে হাত স্পর্শ করে। দুই সেকেন্ড আঙুলে আঁকিবুঁকি করল অযথাই। তারপর পাল্লাটা মৃদু ধাক্কায় খোলার চেষ্টা করতেই খুলে গেল।

ঘরের চৌকাঠ পার হতেই দিশার পায়ের তলার মাটি সরে যায়। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হয় সে কোনো ভুল ঠিকানায় চলে এসেছে বুঝি। এই কি সেই ঘর? যে ঘরটা একসময় আভিজাত্য আর পারফিউমের ঘ্রাণে ম ম করত? অথচ আজ চোখের সামনে যা দেখছে, তা কোনো মানুষের বাসযোগ্য কক্ষ বলে বিশ্বাস করা দায়।

চারিদিকে ধুলোর আস্তরণ, যত্রতত্র পড়ে আছে ওষুধের খালি পাতা, পচা কাগজের স্তূপ আর আধখাওয়া খাবারের অবশিষ্টাংশ। বাতাসের গুমোট বোটকা গন্ধে নিঃশ্বাস নেওয়া ভার। জানলার ভারী পর্দাগুলো টেনে রাখায় দিনের আলোও ভেতরে ঢোকার সাহস পাচ্ছে না। এই বীভৎস অগোছালো পরিবেশের মাঝেই হঠাৎ এক বিকট কর্কশ চিৎকার ঘর কাঁপিয়ে উঠল।

ওসমান মির্জা তীক্ষ্ণ স্বরে ফেটে পড়লেন, 'কে? কে দরজা খুলল? কার এত সাহস!'

দিশার কণ্ঠস্বর যেন নিজের অজান্তেই অস্ফুটে বেরিয়ে এল, 'আমি...'

এই একটি শব্দেই জাদুমন্ত্রের মতো থমকে গেল সবকিছু। ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দটাও যেন থেমে গেল এক লহমার জন্য। ওধারে খাটের ওপর কুঁকড়ে শুয়ে থাকা অবয়বটা কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল। তারপর অতি কষ্টে বিড়বিড় করে উচ্চারণ করলেন, 'দিশা? তুমি কি দিশা?'

দিশা ভাঙা গলায় মাথা ওপর-নিচ নাড়িয়ে সায় দিল, 'হ্যাঁ, আমিই এসেছি।'

কথাটা শোনামাত্র ওসমান মির্জা বিছানা থেকে ঝটকা দিয়ে উঠে বসার চেষ্টা করলেন। পেছন ফিরে যখন তিনি দিশার দিকে তাকালেন, দিশার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে আসে। আর্তনাদ করে উঠতে গিয়েও সে পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এ কাকে দেখছে সে? এ কি সেই দাপুটে, সুপুরুষ ওসমান মির্জা? অসম্ভব!

মানুষটার এককালের সেই উজ্জ্বল জৌলুশ আজ বিলীন। গালের হাড় ঠেলে বেরিয়ে এসেছে, চোখের নিচে কালচে গর্ত। গায়ের চামড়াগুলো ঝুলে পড়ে কঙ্কালসার এক মূর্তিতে পরিণত করেছে তাকে। রুক্ষ চুল আর উস্কোখুস্কো দাড়িতে চেনাই দায়। শুধু সেই বড় বড় চোখ দুটো আজ আরও বড় হয়ে অবিশ্বাস্য এক ঘোর নিয়ে দিশার দিকে চেয়ে আছে।

দিশা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। দুপা এগিয়ে গিয়ে প্রায় চিৎকার করে বলতে নিল, 'এ কি হাল তোমার ওসমান!' কিন্তু বলতে পারল না। কণ্ঠস্বর কেউ বুঝি চেপে ধরে রেখেছে।

ওসমান মির্জার দুচোখ বেয়ে অবাধ্য অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তপ্ত বালিশে। তিনি ভাঙা, কাঁপা গলায় বললেন, 'মৃত্যুর আগে তোমাকে আর একবার দেখতে পাব, তা স্বপ্নের অতীত ছিল দিশা। আমি আল্লাহর এক অধম, পাপিষ্ঠ বান্দা। তবু তিনি আমার এই শেষ মিনতিটুকু কবুল করলেন? জানো, কত কোটিবার রবের দরবারে হাত তুলে শুধু তোমাকে একটিবার দেখার তৃষ্ণা নিয়ে আকুতি জানিয়েছি? ভেবেছিলাম আক্ষেপ নিয়েই চলে যেতে হবে।'

দিশার বুকের ভেতরটা নিদারুণ যন্ত্রণায় নীল হয়। হ্যাঁ, এই মানুষটা তাকে ঠকিয়েছে। তাদের সম্পর্কের বনিবনা হয়নি, স্বার্থের সংঘাত আর ভুল বোঝাবুঝিতে একসময় বিচ্ছেদ ঘটেছিল। কিন্তু আজ এই জীর্ণ দশায় তাকে দেখে দিশার সব অভিযোগ যেন বৃষ্টির জলে ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে গেল। শত হোক, কোনো এক বসন্তে এই মানুষটাকেই সে ভালোবেসেছিল। তার বুকে মাথা রেখেই তো দেখেছিল আগামীর স্বপ্ন। সেই মায়ার রেশটুকু কি এত সহজেই মুছে ফেলা যায়? দীর্ঘদিনের জমে থাকা অভিমানগুলো মুহূর্তেই সকরুণ মমতায় রূপ নিল।

ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে খাটের একপাশে বসল সে।

বসার ভঙ্গিটা এতটাই জড়োসড়ো যে মনে হচ্ছে কোনো এক নিষিদ্ধ রাজ্যে ভুল করে পা রেখেছে মেয়েটা। ওসমান মির্জা দুই হাতে ভর দিয়ে অতি কষ্টে দিশার দিকে একটু এগিয়ে এলেন। তার শরীরটা এখন এতটাই ভারহীন যে সামান্য নড়াচড়াতেও হাড়ের ঘর্ষণ স্পষ্ট বোঝা যায়। দিশার বিস্ময় আর স্তব্ধতা কয়েক গুণ বেড়ে গেল। কাঁপতে থাকা কণ্ঠনালি চিরে শুধু এটুকুই বেরিয়ে এল, 'কীভাবে হলো...'

ওসমান মির্জা ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষণ্ণ হাসি ফোটালেন। ঝাপসা হয়ে আসা চোখ দুটো ভিজে উঠল। ধরা গলায় বললেন, 'তোমাদের কত কষ্ট দিয়েছি দিশা! তার শাস্তি কি পাব না? প্রকৃতি তো তার হিসেব বাকি রাখে না।'

দিশা নিথর হয়ে রইল। জীবনের এই মোড়ে দাঁড়িয়ে তর্কের সব ভাষা সে হারিয়ে ফেলেছে। ওসমানই নীরবতা ভেঙে আবার বললেন, 'ক্যান্সার গো! শরীরটা কুরে কুরে খাচ্ছে। এখন আর ভালো ওষুধ-পথ্য খাওয়ার মুরোদ নেই। যে কয়টা দিন আয়ু আছে, এভাবেই পড়ে আছি। শুধু মনে মনে একটা বড় আফসোস ছিল—তোমাদের যদি আর একটা বার দেখতে পেতাম! ভাবিনি পাপিষ্ঠ এই বান্দার দোয়া আল্লাহ কবুল করবেন। যাক, তিনি মুখ তুলে চেয়েছেন... কিন্তু তুমি একা কেন? ওরা আসেনি?'

প্রশ্নটা শোনামাত্র দিশার বুকের ভেতরটা হু হু করে ওঠে। একটা অদৃশ্য স্রোত তার কলিজা ছিঁড়ে বয়ে যাচ্ছে। কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এলেও নিজেকে সামলে নিয়ে কোনোমতে বলল সে, 'না, আসেনি।'

কথাটা শোনামাত্র ওসমান মির্জার ম্লান মুখখানা মুহূর্তেই অন্ধকার হয়ে যায়। একটা ছোট বাচ্চা যেমন তার প্রিয় খেলনা বা বায়না করা আইসক্রিম না পেলে অভিমানে কুঁকড়ে যায়, ওসমানের চেহারাটা ঠিক তেমনই দেখায়। দিশার হৃদয়টা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল দৃশ্যটা দেখে। কিছু পাপের শাস্তি বোধহয় এতটাই কঠিন হয় যে, চাইলেও সেই পাপীকে পুরোপুরি ঘৃণা করা যায় না, আবার ভালোবাসাও যায় না।

দিশা মাথা নিচু করে রইল। চোখের পানি আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করছে সে। ওসমান মির্জা নিজেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, 'আসলে আমি যা করেছি, তাতে তুমি যে এসেছ এটাই তো অনেক বড় শুকরিয়া। ওরা আসেনি, ভালোই করেছে। আমার এই কঙ্কালসার চেহারা দেখে ওদের কী লাভ বলো? আমি তো এক ব্যর্থ কাঙাল, কপালপোড়া মানুষ। সব খুঁইয়েছি নিজের দোষে।'

দিশা কোনো জবাব দিতে পারল না। ভেজা শাড়ির আঁচল টেনে চোখের কোণ মুছল সে, যেন খুব সাধারণ কোনো ময়লা পরিষ্কার করছে এমন এক বাহানায়। ওসমান মির্জা এবার সুর পাল্টে উৎকণ্ঠার সাথে বললেন, 'তুমি এমন ভিজে আছ কেন দিশা? জ্বর বাঁধাবে তো!'

'বাঁধুক,' নিচু স্বরে জবাব দিয়েই দিশা নাক টানল।

ওসমান মির্জা হাসলেন, 'অদ্ভুত তোমরা মেয়েরা... যারা রুহে আঘাত করে, তাদের জন্যই শেষ পর্যন্ত চোখের জল ফেলো।'

দিশা ছলছল নয়নে তাকাল।

'আমি কোনোদিন চাইনি তোমার এই অবস্থা হোক ওসমান।' মেয়েটার কণ্ঠে আক্ষেপ ঝরে পড়ে।

'হয়ে ভালো হয়েছে,' ওসমান মির্জা স্মিত হাসলেন, 'পরকালে অন্তত কী মুখ দেখাতাম? ওই জগতের শাস্তির চাইতে এই দুনিয়ার শাস্তি অনেক নগণ্য দিশা। এই কষ্টটুকু আমার পাওনাই ছিল।'

সংকোচ ভেঙে ওসমান কথা চালিয়ে যেতে লাগলেন। দীর্ঘ কয়েক বছর পর আজ তার মুখে খৈ ফুটেছে যেন। তিনি নিবিড় স্বরে শুধালেন, 'তারপর বলো? কেমন আছো তুমি?'

দিশা মৃদুস্বরে উত্তর দিল, 'বিয়ে করেছি।'

'কেমন সে?'

'চমৎকার।'

'তুমি ভালো আছো জেনে খুব শান্তি পেলাম,' ওসমান মির্জা একটু থামলেন। পরক্ষণেই উসখুস করে বললেন, 'দিশা, রাগ না করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?'

'করো... রাগ করব কেন?'

'হয়তো ভাবতে পারো, এতদিন বাদে তোমাকে দেখে হঠাৎ আমার পিতৃত্ব জেগে উঠেছে। কিন্তু সত্যি বলছি, তোমাকে খুঁজে পাওয়ার কোনো পথই তুমি খোলা রাখোনি। কতবার কতভাবে যে তোমাদের খুঁজেছি আমি... থাক সেসব, আজ আর পুরনো কথা বলে তোমার সময় নষ্ট করব না। কিন্তু এই ভিজে শরীরে কতক্ষণ বসে থাকবে? শাড়ি পাল্টে নেবে? তোমার সবকিছু আমি আজও আগলে রেখেছি।'

দিশা আরও একবার স্তম্ভিত হলো। তার ডাগর ডাগর আঁখি দুটি মেলে ওসমানের পানে চেয়ে রইল। ওসমান মুচকি হেসে ঘাড় কাত করলেন, 'সব তো আর নিয়ে যাওনি। যা ফেলে রেখে গিয়েছিলে, সেই স্মৃতিটুকু আঁকড়েই তো বেঁচে ছিলাম। একটু কষ্ট করবে? উঠে দাঁড়াবে একবার?'

দিশা যন্ত্রের মতো উঠে দাঁড়াল।

'বাম পাশের ওই আলমারিটা একটু খোলো তো।'

দিশা ঘোরগ্রস্তের ন্যায় আলমারিটা খুলে এবং খোলার সাথে সাথেই তার হৃৎপিণ্ড এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায়। পুরো ঘরটা যতটাই জরাজীর্ণ আর অগোছালো হোক না কেন, এই আলমারির ভেতরের জগৎটা অসম্ভব পরিপাটি। ঠিক যেভাবে দিশা তার আলমারি গুছিয়ে রাখত। সেখানে তার ফেলে যাওয়া পুরনো সব জামাকাপড়, এমনকি তার ব্যবহৃত একটা তোয়ালে পর্যন্ত সযত্নে ভাঁজ করে রাখা। দিশার চোখের বাঁধ ভেঙে গেল এরপরেই।

পেছন থেকে ওসমানের ধরা গলা ভেসে আসে, 'ভেবেছিলাম যদি কোনোদিন ফিরে এসে নিজের ফেলে যাওয়া জিনিসগুলো চাও, তখন কী দেব? তাই গুছিয়ে রেখেছিলাম। তুমি অন্য কিছু ভেবো না দিশা। আমি তোমাকে আটকাব না। আমি এক পঙ্গু, মুমূর্ষু মানুষ—তোমার সেই চমৎকার পৃথিবীতে হস্তক্ষেপ করার সাধ্য বা সাহস কোনোটিই আমার নেই। বিশ্বাস করো।'

দিশা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল সে। যত কঠিন কথা, যত যুক্তি আর পাহাড়সম অভিমান নিয়ে সে এই বাড়িতে পা রেখেছিল, সব এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। আলমারির সামনেই ধপ করে বসে পড়ল সে এবং দুহাতে মুখ ঢেকে প্রাণখুলে কাঁদল পরবর্তী অনেকটা সময়।

ওসমান মির্জা খাটের ওপর পাথরের মতো বসে রইলেন। তিনি হাত বাড়িয়ে দিশাকে ধরলেন না, সান্ত্বনাও দিতে এলেন না। কারণ তিনি জানেন, এই কান্নার ওপর এখন আর তার কোনো অধিকার নেই। এই মেয়েটার চোখের জল মুছিয়ে দেওয়ার দাবি এখন অন্য কারো।

★★★

মির্জা বাড়ির অন্য এক প্রান্তে তখন ভিন্ন এক ঝড় বয়ে চলেছে। বাইরের বৃষ্টির শব্দের চেয়েও ধারালো হয়ে বিঁধছে রেহনুমার কণ্ঠস্বর। উমেদ মির্জা জানলার পাশে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছেন। তার ঋজু ভঙ্গিতে এখনো সেই পুরনো আভিজাত্যের দম্ভ লেগে আছে, কিন্তু ভেতরটা যে ঘুণে ধরা কাঠের মতো জীর্ণ, তা কেবলই রেহনুমা জানেন।

রেহনুমা আর্তনাদ করে উঠে বললেন, 'এত কিছু হয়ে গেল, ঘরবাড়ি-সংসার সব ছারখার হয়ে গেল, তুমি এখনো স্বার্থপরের মতো নিজের ইগো নিয়ে চুপ করে থাকবে? একবার যাবে না ওর সামনে? এক মুহূর্তের জন্য কি নিজের ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইবে না তুমি?'

উমেদ মির্জা কোনো উত্তর দিলেন না। তার এই মৌনতা রেহনুমার গায়ে আগুনের হলকার মতো এসে বিঁধে। রেহনুমা উমেদ মির্জার একেবারে সামনা সামনি এসে দাঁড়ালেন। তার চোখের মণি কাঁপছে তীব্র আক্রোশে। উমেদ মির্জার নিস্পৃহ চোখের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বললেন, 'কী আছে তোমার আর? এই মির্জা বাড়ির জৌলুশ গেছে, মান-মর্যাদা গেছে, একে একে সবাই দূরে সরে গেছে। আজ সব হারিয়েও তোমার এই আকাশচুম্বী অহংকার কি একটুও তুষ্ট হলো না? কেন তুমি এত কঠোর? দিশার কাছে গিয়ে একটা বার নত হলে কী হতো? আমাদের বিকেলের খোঁজ কি ও তোমাকে দিত না? ও আর যাইহোক, ফিরিয়ে দেওয়ার মতো কঠিন না।'

উমেদ মির্জা ধীরেসুস্থে মাথা ফেরালেন। অদ্ভুত হিমশিলতা কণ্ঠে জড়িয়ে বিষাক্ত কণ্ঠে বলে উঠলেন, 'বিকেল যদি ওর মায়ায় রোদকে না ফেলত, তাহলে আজ আমার সংসারের এই দশা হতো না। সব অনর্থের মূল ওই মেয়েটা। সে আমার সাজানো গোছানো সংসারটাকে বিষিয়ে দিয়েছে। অথচ তুমি বলছ আমি তাকে আবার এই বাড়িতে আমন্ত্রণ জানাব?'

রেহনুমা ফেটে পড়লেন এবারে। দীর্ঘদিনের জমানো লাভা যেন আগ্নেয়গিরি হয়ে বেরিয়ে এল হৃদয় চিরে। তিনি চিৎকার করে উঠলেন, 'এখনো? এখনো তুমি সব দোষ ওই মেয়েটার ওপর চাপাচ্ছ? ওকেই বলি দিচ্ছ এখনো? নিজের বিবেককে একবারও প্রশ্ন করো না তুমি?'

উমেদ মির্জা বিচলিত হলেন। গত পয়ত্রিশ বছরে যে রেহনুমা কোনোদিন তার চোখের দিকে সরাসরি তাকানোর সাহস পায়নি, আজ সেই নারী তার মুখের ওপর আঙুল উঁচিয়ে কথা বলছে! রেহনুমার দুচোখে ভয়ের চিহ্নমাত্র নেই, বরং সেখান থেকে উপচে পড়ছে কেবলই ঘৃণা।

রেহনুমা উন্মত্তের মতো ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা মেডিসিন বক্সটা এক ঝটকায় ফ্লোরে আছাড় দিয়ে ফেলে দিলেন। তীক্ষ্ণ শব্দে কেঁপে উঠল ঘরটা। হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে উমেদ মির্জার বুকের ওপর তর্জনী ঠেকিয়ে বলতে লাগলেন, 'যে ভাই আর ভাইয়ের বউয়ের জন্য তুমি তোমার ছেলেকে বলি করলে, নিজের কলিজার টুকরোটাকে তিলে তিলে ধ্বংস করলে—তারা কী করেছে শেষ পর্যন্ত? দেখেছ তাদের আসল রূপ? তোমার সেই আপন ভাইয়ের বউ আর মেয়ে মিলে তোমার ছেলেকে তাবিজ-কবজ করেছে! কালো জাদু করে ওরে পাগল বানিয়ে ফেলার পায়তারা করেছে! নিজের চোখে দেখেও সব ভুলে গেছ তুমি?'

উমেদ মির্জা পাথরের মতো দাঁড়িয়ে, কপাল বেয়ে ঘাম নামছে। রেহনুমা থামলেন না, আরও উচ্চস্বরে বললেন, 'আর তোমার সেই ভাই তো এখন নতুন বিয়ে করে, নতুন বউ নিয়ে নতুন সংসার সাজিয়ে মজে আছে। একবারও কি তোমার ফোন দিয়েছে সে? একবারও খোঁজ নিয়েছে তোমার এই ভগ্নদশার? অথচ তাদের খুশির জন্য তুমি দিশার মতো একটা মেয়েকে অপমান করে বের করে দিলে, বিকেলের জীবনটা নরক বানালে। এখনো মানুষ চিনতে পারলে না তুমি? এখনো সেই রক্তের দোহাই দিয়ে নিজেকে অন্ধ করে রাখছ?'

উমেদ মির্জার ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু কোনো শব্দ বেরোচ্ছে না। রেহনুমা শেষবারের মতো কঠিন গলায় বললেন, 'তোমার এই আত্মঅহংকার তোমাকে আর কতদূর নিয়ে যায়, সেটা আমিও দেখব আর তুমিও দেখবে। মনে রেখো, সেই দিন আর বেশি দূরে নেই যেদিন এক ফোঁটা পানি দেওয়ার মতো লোকও তোমার পাশে থাকবে না। ওসমান অন্তত শেষ সময়ে এসে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছে, ওসমানের চোখে এখন অনুশোচনা আছে। কিন্তু তুমি এই পাথরের অহংকার নিয়েই কবরে যাবে। কোনোদিন বুঝতে শিখবে না যে ভালোবাসা শাসন দিয়ে জেতা যায় না।'

বলেই রেহনুমা ঝড়ের বেগে বেরিয়ে গেলেন ঘর থেকে। দড়াম করে দরজা লাগানোর শব্দে পুরো ঘরটা কেঁপে উঠল যেন। উমেদ মির্জা নিস্তব্ধ ঘরে দাঁড়িয়ে রইলেন একা একা। পায়ের কাছে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা ওষুধের শিশি আর ভাঙা কাঁচের টুকরো যেন তার জীবনেরই বিধ্বস্ত প্রতিচ্ছবি। বাইরের অবিশ্রান্ত বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে তার কানের কাছে রেহনুমার প্রতিটি কথা হাতুড়ির মতো বাজতে লাগল। তিনি হঠাৎ-ই অনুভব করলেন, এই বিশাল রাজপ্রাসাদতুল্য বাড়িতে তিনি আসলে পৃথিবীর সবচাইতে নিঃসঙ্গ এক কয়েদি।

★★★

দরজার ওপাশে সংসারের ব্যস্ততা, কাপ-ডিশের মৃদু টুংটাং শব্দ ক্রমেই মিলিয়ে গিয়ে সেখানে এক অখণ্ড নীরবতা জেঁকে বসল। ঘরের ভেতর আবছা আলো-আঁধারি। রেহনুমা বেগম চলে যাওয়ার সময় দরজাটা আলতো করে ভেজিয়ে দিয়ে গেছেন, যেন দীর্ঘদিনের জমে থাকা পাহাড় সমান অভিমান গলানোর জন্য এই দুই মানুষের কিছুটা ব্যক্তিগত সময়ের প্রয়োজন।

দিশা নিজেকে সামলে নিয়ে আবার বসেছে। পাশে ওসমান মির্জা আধশোয়া হয়ে বসা, পিঠের পিছনে একটা বালিশ লম্বা করে টেনে দেওয়া হেডবোর্ডের সঙ্গে। মাঝে আইরিন এক দফা চা দিয়ে গিয়েছিলেন, সেই চায়ের ধোঁয়া কখন মিলিয়ে গেছে হিমের মতো ঠান্ডা ঘরে, কেউ খেয়াল করেনি।

দিশা ভাঙা গলায়, ভেজা ভারী স্বরে বলল, 'আসবার আগে খুব করে হিসেব কষেছিলাম, তোমার ওপর কত কত অভিযোগ জমা... ভেবেছিলাম আজ সব কড়ায়-গণ্ডায় উশুল করে নেব।'

ওসমান মির্জা শশব্যস্ত হয়ে তাকালেন না, বরং দৃষ্টি মেঝের কার্পেটে নিবদ্ধ রেখে অপরাধীর সুরে শুধালেন, 'তারপর? কত পেলে সেই হিসেবে? শাস্তি পাওনা এখনো কতটা বাকি?'

দিশা একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে, মৃদু স্বরে বলল, 'নেই। সব হিসেব কেমন ফুরিয়ে গেছে। শূন্য খাতা নিয়ে বসে আছি।'

সে সরাসরি ওসমান মির্জার ঝাপসা হয়ে আসা চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, 'আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিয়েছি ওসমান।'

ওসমান মির্জা স্তব্ধ হয়ে গেলেন। এই একটি মাত্র বাক্যের জন্য সম্ভবত তিনি গত কয়েকটা সূর্যোদয় ধরে অপেক্ষা করেছিলেন। তাঁর মনে হলো, বুকের ভেতর পাথর হয়ে চেপে থাকা একটা বিশাল ভার হঠাৎ করেই হালকা হয়ে গেল। কিন্তু এই ক্ষমার আনন্দ উপভোগ করার মতো শক্তিও আর অবশিষ্ট নেই। তিনি শুধু অপলক চেয়ে রইলেন—বিস্ময় আর কৃতজ্ঞতা মেশানো একটা অদ্ভুত দৃষ্টি নিয়ে।

দিশা পকেট থেকে ফোন বের করে। হাতটা সামান্য কাঁপছে তার। একটা ভিডিও কল করল অন্যপ্রান্তে। ওসমান মির্জা জানেন না ওপাশে কে, তবুও তাঁর বুকের ভেতরটা আচমকা ঢিপঢিপ করে ওঠে। এ তো র★ক্তের টান, অবচেতন মন ঠিকই টের পাচ্ছে ওপাশ থেকে কে সাড়া দিতে যাচ্ছে। বৃদ্ধের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা অদ্ভুত শিহরণ বয়ে গেল।

কয়েক মুহূর্ত যেন কয়েকটা অনন্তকাল। রিং হয়ে যাচ্ছে। ওপাশে থম ধরা নীরবতা ভেঙে অবশেষে ফোনটা রিসিভ হলো। ফোনের স্পিকারে ভেসে এল ঘুম-জড়ানো সেই পরিচিত গম্ভীর কন্ঠস্বর, 'হ্যালো, মা?'

মুহূর্তের মধ্যে নুয়ে পড়া ওসমান মির্জার শিরদাঁড়া খাড়া হয়ে গেল। এ যে তাঁর সেই আদরের মেয়ে, যাকে তিনি বছরের পর বছর অবহেলা করেছেন, দূরে ঠেলে দিয়েছেন। কিন্তু অপরাধে জর্জরিত হয়ে সেই কণ্ঠস্বর শোনার পর একজন পিতার শরীরে যে বিদ্যুৎ খেলে যায়, তা ভাষায় প্রকাশ করা দুঃসাধ্য। তাঁর বুকের খাঁচার ভেতর হৃদপিণ্ডটা পাগলের মতো আছাড় খেতে লাগল বুঝি। চোখের কোণ দিয়ে গড়িয়ে পড়ল প্রথম তপ্ত অশ্রুবিন্দু।

দিশা ফোনের ক্যামেরাটা ধীরলয়ে ওসমান মির্জার দিকে ঘুরিয়ে দিল। ওপাশে বিকেলের সম্ভবত তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাব ছিল, কিন্তু স্ক্রিনে বাবার মুখটা দেখামাত্র তার সেই তন্দ্রা এক নিমেষে কর্পূরের মতো হাওয়ায় উড়ে যায়। ওপাশ থেকে ধড়মড় করে উঠে বসার শব্দ পাওয়া গেল। রুদ্ধ, কাঁপা কাঁপা গলায় অস্ফুটে ডাকল, 'বাবা?'

ওসমান মির্জা আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। দীর্ঘদিনের শক্ত খোলসটা নিমিষেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তিনি ছোট বাচ্চার মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠলেন। তাঁর সেই দাপুটে কন্ঠস্বর আজ আর্তনাদে পরিণত হয়েছে। কাঁপতে কাঁপতে নিজের দুই হাত এক করে বিকেলের উদ্দেশ্যে জোড় করলেন—ক্ষমা প্রার্থনার ভঙ্গি তাতে। মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোচ্ছে না, শুধু দুচোখ বেয়ে অবিরল ধারায় অশ্রু নামছে। গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসা কান্নায় তিনি যেন বোবা হয়ে গেছেন।

ওপাশ থেকে বিকেল অস্থির তখন, তার চোখও বন্যায় প্লাবিত। সে চেঁচিয়ে বলতে লাগল ক্রমান্বয়ে, 'কী হয়েছে বাবা? তুমি কাঁদছ কেন? বাবা, তাকাও আমার দিকে! কী হয়েছে তোমার? তুমি আমার কাছে মাফ চাইছ কেন? তুমি যে আমার বড়, তুমি আমার বাবা! আমি তো তোমার ছোট্ট মেয়েটা, আমার কাছে কেন হাত পাতছ? কিসের অপরাধ তোমার? না বাবা, না—হাত নামাও বলছি! তুমি আমার কাছে কেন নত হবে?'

বিকেলের প্রতিটি কথা তীরের মতো বৃদ্ধের বুকে এসে বিঁধে। তাঁর কান্নার বেগ আরও বেড়ে গেল। তিনি হাত নামালেন না, বরং আরও জোরে নিজের আঙুলগুলো চেপে ধরলেন। এই ক্ষমাটুকু পাওয়ার জন্যই বুঝি তিনি আজ অবধি বেঁচে ছিলেন - এমনটাই বারবার মনে হচ্ছিল তাঁর।

কিন্তু অতিরিক্ত উত্তেজনা আর কান্নায় হঠাৎ করেই ওসমান মির্জার শ্বাসপ্রশ্বাসে টান পড়ে। তাঁর ফ্যাকাশে ঠোঁট দুটো নীল হয়ে আসতে লাগল। বুকের খাঁচাটা অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করতে থাকে। দিশা আতংকিত হয়। মানুষটার চোখের তারা স্থির হয়ে আসছে, কিন্তু কান্না থামছে না - লক্ষণ ভালো ঠেকে না। সে তড়িঘড়ি ফোন টা সরিয়ে বিকেলকে বলল, 'পরে ফোন ব্যাক করছি।'

প্রত্যুত্তরে বিকেল কিছু একটা বলতে নেয়, দিশা তার আগেই ফোন কাটে। দু'হাতে ওসমান মির্জা কে ধরে, উৎকণ্ঠিত গলায় বলে ওঠে, 'ওসমান! ওসমান! বেশি খারাপ লাগছে? ওসমান!'

ওসমান মির্জার চোখ টকটকে লাল, শরীর থরথর করে কাঁপছে। সিলিংয়ের দিকে চেয়ে তিনি কাত হয়ে পড়লেন বিছানার উপর, এত ভার দিশা সামলাতে পারে না। অস্ফুটে উচ্চারণ করেন, 'পানি...'

দিশা ঝড়ের বেগে ছুটে যায় পানি আনতে। এক মগ পানি নিয়ে ফিরে আসে বিদ্যুতের গতিতে। তার ছোটাছুটি দেখে আইরিন, রেহনুমা সহ মিশি ও ছুটে আসে। এবং অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করে, ঘরটা নিস্তব্ধতায় মোড়ানো।

দিশা কাঁপা কণ্ঠে ডাকে, 'ওসমান? পানি খাবে না?'

কোনো সাড়া নেই। বৃদ্ধের চোখ দুটো খোলা। কিন্তু সেই চোখে আর কোনো অশ্রুফোঁটা নেই, নেই কোনো আকুতি। অদ্ভুত একটা প্রশান্তি খোলা দুই চোখের দৃষ্টিতে লেপ্টে আছে। দেখলে মনে হয়, তিনি যে উত্তরটা খুঁজতে বেরিয়েছিলেন, তা পেয়ে গেছেন শেষমেশ। আর তাই যাত্রাপথ সমাপ্ত ঘোষণা হলো।

দিশার হাত থেকে পানির মগটা মেঝেতে পড়ে যায়। ঝনঝন শব্দ উঠলেও কাঁচ ভাঙল না—কিন্তু দিশার ভেতরটা টুকরো টুকরো হয়ে চুরমার হয়ে পড়ে। বুঝতে আর বাকি রয় না, দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটেছে অবশেষে। মানুষটার আত্মা যেন এতক্ষণ ধরে আটকে ছিল এই জীর্ণ দেহের খাঁচায়, শুধু মেয়েটার মুখে একবার বাবা ডাক শোনার জন্যে। সেই শেষ পাওনাটা এবার বুঝি শোধ হয়ে গেছে। তাই নিঃশব্দে পাড়ি জমিয়েছেন তিনি এক অনন্ত, না ফেরার দেশে।

বিছানায় নুয়ে পড়া নিথর দেহটার দিকে তাকিয়ে দিশার মনে হয়, জীবনের সব হিসেব শেষ মুহূর্তে এসে এভাবেই মিলে যায় বোধহয়। ক্ষমা কিংবা ভালোবাসার একটুখানি ছোঁয়া পেলে মানুষ মৃত্যুকেও অতিক্রম করে, অমর হয়ে রয় স্মৃতির ভেতরে। বাইরে আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এবার আগের চেয়েও বেশি তীব্র, বেশি বেদনাভেজা।

(চলবে)

________

নোটঃ ১০০০ লাইক পূর্ণ হলেই পরবর্তী পর্বটি পেয়ে যাবেন। হোক সেটা ঈদের পরের দিন, তাও দিবো, কথা দিচ্ছি।

সবাইকে ঈদ মোবারক। সবার ঈদ সুন্দর, রঙিন কাটুক ❤️

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন