#প্রেমের_নির্বাসন - (৪৫)
লেখনীতে - #মৃধা_মৌনি
_________________
অভিশপ্ত মির্জা বাড়ির আকাশে শোকের মেঘ যেন স্থায়ী বসতি গেড়েছে। একটা ঝড় থামতে না থামতেই আরেকটা কালবৈশাখী এসে তছনছ করে দিয়ে যায় সব। ওসমান মির্জার চিরবিদায়ে আইরিন বেগম আজ দিশেহারা; হাত-পা ছুড়ে জনমের কান্না কাঁদছেন তিনি। পাশে দাঁড়িয়ে রেহনুমাও শাড়ির আঁচলে বারবার চোখ মুছছেন, কিন্তু এই হাহাকারের মাঝেও উমেদ মির্জা পাথুরে মূর্তির মতো স্থির কেবল।
মানুষটা ঠিক কোন ধাতুতে গড়া, তা কারো জানা নেই। ভাইয়ের মৃত্যুতেও তার চোখে এক ফোঁটা অশ্রুকণা নেই, মুখে নেই কোনো বিলাপের সুর। নির্বিকার, নিটল - যেন কিছুই ঘটেনি অথবা এ নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার!
রেহনুমা ঘরের ভেতর ঢুকে রাগের মাথায় টিভির রিমোটটা আছড়ে ভেঙে ফেললেন। উমেদ মির্জার এই অতিপ্রাকৃত শান্ত ভাব তাকে ভেতর থেকে জ্বালিয়ে দিচ্ছে। ক্ষোভে ফেটে পড়ে তিনি শুধালেন, 'আপনি কি আদতে মানুষ, নাকি রক্ত-মাংসের আড়ালে শুধুই পাথর একটা?'
উমেদ মির্জা এতটুকুও নড়লেন না। অতিশয় নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললেন, 'ঠিক কী করলে তোমার মনে হবে আমি মানুষ? তোমাদের মতো হাত-পা ছুড়ে ন্যাকা কান্না কাঁদলে?'
রেহনুমা নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলেন না। তীব্র ধিক্কারের সহিত বললেন, 'আমরা না হয় ন্যাকামিই করছি, কিন্তু আপনার কি ন্যূনতম বেদনাবোধও নেই? নিজের আপন ভাই মারা গেল, আর আপনি এভাবে কথা বলছেন?'
উমেদ মির্জা মুখ তুললেন। লোকটার কণ্ঠস্বর জমাট বাঁধা বরফের চেয়েও শীতল। ধীরলয়ে বললেন, 'মরে গেছে, বেঁচেছে। বেচারার কষ্ট ফুরিয়েছে। এর চেয়ে ভালো আর কী হতে পারত?'
এই নিষ্ঠুর সত্যের ধাক্কায় রেহনুমা মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে পড়েন। এমন অমানবিক উত্তর তার কল্পনারও বাইরে ছিল। রাগে আর ঘেন্নায় ড্রেসিং টেবিলের ওপর রাখা সবকিছু সপাটে মাটিতে ফেলে দিয়ে তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। এই অনুভূতিহীন মানুষের সঙ্গে তর্ক করাও অরণ্যে রোদন।
তারচেয়ে দিশাকে ধরা যাক বরং!
বিকেলকে এ বাড়িতে ফিরিয়ে এনে এই বাড়ির সকলকে অভিশাপ মুক্ত করার একমাত্র মাধ্যম দিশাই! তাকে হারানো মানে রেহনুমার আশার প্রদীপের শেষ আলোটুকুও হারিয়ে ফেলা!
ছাদের এই দক্ষিণ কোণটা অদ্ভুতভাবে নির্জন। রেলিংয়ের একপাশে শ্যাওলা ধরা দেয়াল আর অন্যপাশে বিশাল আকাশ। এই শূন্যতাটুকুই ছিল ওসমানের বড্ড প্রিয়। মানুষটা যখনই খুব অস্থির হতো, যখনই জীবনের জটিল অংকগুলো মেলাতে না পেরে হাঁপিয়ে উঠত, তখনই এসে দাঁড়াত এই নির্জনতায়।
দিশার কানে আজও ওসমানের সেই গম্ভীর কণ্ঠস্বর বাজে,
'জানো দিশা, এখানে দাঁড়ালে বুকের ভেতরের পাথরটা কেমন যেন হালকা হয়ে যায়। চারপাশের কোলাহল ছাপিয়ে এক অদ্ভুত শান্তি নেমে আসে মনে।'
স্মৃতির সিন্দুকে ধুলো পড়া একটা রাত হঠাৎ দিশার চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল। ভরা জোছনা সেদিন আকাশ চিরে চুইয়ে পড়ছিল শহরের ছাদে। ওসমান হঠাৎ-ই মাঝরাতে ঘুম থেকে টেনে তুলেছিল তাকে। দিশা বিরক্ত হয়ে কপালে ভাঁজ ফেলে বলেছিল, 'বাচ্চাদের মতো এই নাটক করার বয়স কি আমাদের আছে ওসমান? ছাড়ো তো, ঘুমাতে দাও।'
ওসমান সেদিন রাগ করেনি। বরং ম্লান হেসে বলেছিলেন, 'আমি এখানে চাঁদের আলোয় বিলাসিতা করতে আসিনি দিশা। এই জায়গাটা আমার বড় আপন, বড় নির্ভার। আজ আমার মনটা বড্ড ভালো নেই, তাই তোমাকে একটু পাশে চাইলাম।'
দিশা তখন বোঝেনি, নিছক এক টুকরো ছাদ কীভাবে একটা মানুষের সবটুকু আশ্রয় হয়ে উঠতে পারে। আজ ওসমান মির্জা নেই, কিন্তু তার রেখে যাওয়া সেই শূন্যতা আর এই ছাদটুকু রয়ে গেছে। দীর্ঘশ্বাসে বুক চিরে যায় মেয়েটার। ওসমানের সঙ্গে কাটানো তিক্ত ঝগড়া, অভিমান আর রুক্ষ স্মৃতিগুলো আজ কেন জানি ফিকে হয়ে আসছে। রয়ে গেছে শুধু এক পশলা নরম রোদ্দুরের মতো কিছু সোনালী মুহূর্ত। মানুষ চলে গেলে বুঝি তার সমস্ত বিষাদ সাথে করে নিয়ে যায়, আর ফেলে রেখে যায় কেবল মায়া। দিশা শূন্য দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকাল। ভাবল, ওই অসীম নীলের কোথাও থেকে কি ওসমান তাকে দেখছেন?
হঠাৎ হাতের মুঠোয় থাকা ফোনটা কেঁপে উঠতেই দিশা শিউরে ওঠে। সম্বিত ফিরে পেয়ে দেখল স্ক্রিনে ‘শফিক’ নামটা জ্বলছে। ফোনটা কানে নিতেই ওপাশ থেকে উৎকণ্ঠিত কণ্ঠ ভেসে এল,
'তোমাকে হোয়াটসঅ্যাপ করছি, সিন করছ না যে?'
'নেট নেই শফিক।'
'ওহ। ওদিকের খবর কী? সব গুছিয়ে এনেছে?'
'এখন গোসল করানো হচ্ছে। মাগরিবের পর জানাজা...' দিশার কণ্ঠস্বর বুজে আসে।
শফিক কিছুক্ষণ নীরব থেকে অত্যন্ত কোমল স্বরে বললেন, 'তুমি কি দাফন শেষ করে একবারে আসবে? তাহলে আমি বরং রাতের রান্নাটা সেরে ফেলি।'
দিশার চোখের কোণে টলমল করে উঠল জল। এই মানুষটা কেন এত বেশি জেন্টেল! কে তাকে শিখিয়েছিল এতটা মায়াবী হতে? না জানি তার প্রথম স্ত্রী কতটা ভাগ্যবতী ছিলেন। তাকে হয়তো এর চেয়েও বেশি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার চাদরে মুড়িয়ে রাখতেন শফিক। দিশা ধরা গলায় উত্তর দিল, 'না শফিক, আমি জানাজা শেষেই চলে আসব। আমি এখানে থাকব না।'
শফিক অভয় দিয়ে বললেন, 'তুমি চাইলে থাকতে পারো দিশা। যে চলে গেছে, তাকে নিয়ে আমার মনে কোনো দ্বিধা বা সংকীর্ণতা নেই। সে তোমার অতীত ছিল, তার সম্মান আমার কাছেও অনেক।'
'না,আমি থাকব না। আমার হাত-পা কাঁপছে, কেমন যেন অস্থির লাগছে। আমি চলে আসতে চাই।'
'ঠিক আছে, আমি আসছি। আমি এখনই আসছি তোমাকে নিতে।'
ফোনটা রেখে দিশা আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে হাউমাউ শব্দে কেঁদে ফেলল। শোক প্রকাশে কান্নাটা বেরিয়ে আসেনি, বরং একটা নীরব মুক্তির সাক্ষী স্বরুপ এতদিনকার জমানো কান্নাটা প্রকোট হয়ে বেরিয়ে আসছে। এই এতগুলো বছর বুকের গহীনে যা কিছু পাথর হয়ে জমে ছিল, কান্নার স্রোতে তা গলে গলে বের হয়ে যাচ্ছে। দিশা বুঝতে পারছে, ওসমানের জন্য জমা থাকা সবটুকু অভিযোগ, অভিমান আজ ঐ নীল দিগন্তে পাড়ি জমিয়েছে, যেখানে সব হিসাব নিকাশের ঊর্ধ্বে মানুষ কেবলই শান্তি খুঁজে পায়।
বাতাসে মাগরিবের আজানের প্রতিধ্বনি ভেসে আসে।
এরই মাঝে দিশার হাতের ফোনটা আবারও সজাগ হয়ে উঠল। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা অচেনা বিদেশি নম্বরটি দেখে তার বুঝতে বাকি রয় না, ওপাশ থেকে কে ফোন করেছে। নিজের ভেতরের অস্থিরতাটুকু গলার স্বরে আড়াল করে সে ফোনটা ধরল। ওপাশ থেকে কোনো কথা আসার আগেই দিশা স্বাভাবিক হওয়ার অভিনয় করে বলল, 'হ্যালো? আরে আমার ফোনের নেট শেষ হয়ে গিয়েছিল রে, তাই অনলাইনে পাচ্ছিস না।'
ওপাশ থেকে বিকেল স্বাভাবিকতার কোনো ধার ধারে না। কান্নায় ভিজে ভারী হয়ে আসা কণ্ঠে মেয়েটা শুধায়, 'আমি এত দুর্ভাগা কেন মা? জীবনের শেষবেলায় আমি কি একবারও তাকে স্পর্শ করতে পারব না? একটুখানি ছুঁয়ে দেখার সুযোগও কি হবে না আমার?'
বিকেলের আর্তনাদে দিশার বুকের ভেতরটা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায়। মাতৃত্বের এক অসীম ধৈর্যে নিজেকে সামলে নিয়ে সে কথা ছুঁড়ে দেয়, 'ভাগ্য কখনো একা একা ভালো বা মন্দ হয় না রে। ভাগ্য যিনি লিখেছেন, এ কেবল তাঁর ওপর তোর বিশ্বাসের এক কঠিন পরীক্ষা। তোর ললাটে হয়তো এটাই লেখা ছিল। মেনে নে মা, মেনে নেওয়াই শান্তি।'
'আমার খুব কষ্ট হচ্ছে মা... বড় বেশি কষ্ট হচ্ছে।' বিকেলের কণ্ঠস্বর বুজে আসে।
'এখানে এসে এই মৃতদেহের পাশে দাঁড়ালে কি তোর কষ্ট খুব কমে যেত?' দিশার প্রশ্নে শূন্যতা ঝরে পড়ে। বিকেল ওপাশে স্তব্ধ হয়ে রইল। দিশা আবারও বলতে শুরু করে, 'বরং শুকরিয়া আদায় কর, সৃষ্টিকর্তা তোর বাবাকে অন্তত ক্ষমা চাওয়ার সুযোগটুকু দিয়েছিলেন। দুনিয়ায় কত মানুষ তো ক্ষমা চাইবার সময়টুকুও পায় না রে...'
বিকেল নাক টেনে অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে, 'তুমি কি এখনো ওই বাড়িতেই আছো মা?'
'হুম।'
'সবাই কি খুব কাঁদছে?'
'বাড়ির একজন চলে গেলে কাঁদাটাই তো স্বাভাবিক, তাই না?'
বিকেল আবারও মৌন হয়। তার মনের গহীনে একজনের কথা জিজ্ঞেস করার তীব্র আকুলতা জেগেছে, অথচ একটা অদ্ভুত জড়তা আর সংকোচ তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলল। নামটা বারবার ঠোঁটের ডগায় এসেও হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দিশা তো মা; সন্তানের না বলা কথাগুলো যে তার হৃদয়ে প্রতিধ্বনি তোলে। দিশা সামান্য ম্লান হেসে অনুচ্চ স্বরে যোগ করল, 'সে-ও কেঁদেছে রে।'
বিকেল স্তব্ধ হয়ে গেল। এই নিস্তব্ধতা কয়েক মুহূর্তের জন্য সময়কে থামিয়ে দেয়। কোনো প্রতিউত্তর খুঁজে না পেয়ে সে আবারও মৌনতাকে বেছে নেয়। দিশা সেই নীরবতা ভেঙে পূর্ণতা দিল নিজের অসম্পূর্ণ বাক্যে— 'তোর জন্য কেঁদেছে।'
'আমার জন্য?'
বিকেলের কণ্ঠে বিস্ময় আর অবিশ্বাস আছড়ে পড়ে। নিজের জীবনে এর আগে কখনো সে এতটা অবাক হয়েছে কি না, তা মনে করতে পারল না। যেদিন রোদ্দুর আর তৃপ্তি একসাথে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিল, সেদিনও বুঝি এতটা চোট লাগেনি মনে। মেয়েটা স্থবির হয়ে গেল। মানুষটা ওর জন্য কাঁদবে কেন? রোদ্দুরের সাথে তো তার কোনো সম্পর্ক নেই, নেই কোনো স্বীকৃত অধিকার। সে তো রোদ্দুরের আপন কেউ নয়, আবার ঠিক পর-ও নয়। তার জন্য কাঁদবে কেন সেই মানুষটা তবে? যাকে আজন্মের কান্না সঙ্গী করে দিয়েছে নিজেই!
বিকেলের বিস্ময়ে হাট হওয়া ঠোঁট জোড়া অজান্তেই বিড়বিড় করে পুনরায়, 'আমার জন্য? মা?'
দিশা চোখের পানি মুছে এদিকে, 'তুই দেশে আসবি?'
চমকের পারদ যেন পারদস্তম্ভ ছাড়িয়ে ঊর্ধ্বমুখী। যে মানুষটি তাকে পরবাসের খাঁচায় বন্দি করে রেখেছিল, যার কারণে নিজভূমে ফেরার পথ ছিল রুদ্ধ, আজ সেই মানুষটিই তাকে ফিরে আসার আহ্বান জানাচ্ছে! বিকেলের কানে কথাগুলো অশরীরী কোনো সুরের মতো বাজে। এটা কি তবে স্বপ্ন? কোনো বিভ্রম? হয়তো সে এখনো ঘুমের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত, যেখানে অসম্ভবগুলো ডানা মেলে।
বিকেলের স্তব্ধতা ভেঙে দিশার কণ্ঠস্বর ভেসে আসে, অস্থির আর অধীর হয়ে বলে, 'আসবি না রে?'
সম্বিত ফিরে পায় মেয়েটা। নিজের অবচেতন মনকে প্রশ্ন করার বদলে সরাসরি জিজ্ঞেস করে বসে, 'এটা কি স্বপ্ন?'
ফোনের ওপাশে দিশার ঠোঁটে হাসি ফুটে ওঠে সামান্য। সে কোমল স্বরে বলে, 'তাই মনে কর। এবার বল, আসবি কবে?'
বিকেলের কণ্ঠে একরাশ সংশয়, 'আসাটা কি খুব প্রয়োজন, মা?'
'খুব প্রয়োজন,' দিশার কণ্ঠে হাহাকার ঝরে পড়ল, 'এখানে একটা ডানা ভাঙা পাখি যন্ত্রণায় ছটফট করছে। তার ক্ষতের একমাত্র উপশম শুধু তোর কাছেই আছে। তুই না এলে সেই পাখিটা যদি চিরতরে ডানা ঝাপটানো থামিয়ে দেয়...'
কথাটা বিকেলের আত্মাকে কাঁপিয়ে দিয়ে গেল। সব ভুলে অজানা আতঙ্কে সে চিৎকার করে ওঠে, 'না! কোথাও যাবে না কেউ।'
পরমুহূর্তেই তার ভেতরটা অস্থির হয়ে উঠল। যেন এখনই কোনো জাদুমন্ত্রে সে দিগন্ত পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যাবে প্রিয়জনের কাছে। ব্যাকুল স্বরে আওড়ে, 'আসব আমি, আসব... আমাকে একটু সময় দাও।'
'সময় আছে রে, এখনো দেরি হয়ে যায়নি। তুই দ্রুত আয়।'
ওপাশ থেকে লাইনটা কেটে যায়। বিকেলের শরীরে উন্মাদনার দোলা। সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে বিছানা ছেড়ে আলমারি হাতড়ায়। চোখের সামনে যা পায়—প্রয়োজনীয়, অপ্রয়োজনীয় সব কাপড়চোপড় হড়বড় করে সুটকেসে ভরতে থাকে। ঘোরের মাথায় সে ঘরের স্লিপার জুতো, বিছানার চাদর, এমনকি একটা স্ট্রবেরি আকৃতির নরম বালিশও ঢুকিয়ে দেয় ব্যাগে।
হঠাৎ সেই ঘোরের জাল ছিঁড়ে যায়। দরজার কাছে তাকিয়ে দেখে এক খুদে মানবী স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শ্যামা আজ অন্য ঘরে একা শুয়েছিল নিজের ইচ্ছেতেই, কিন্তু কখন নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছে, বিকেল টেরই পায়নি। মেয়েটার পুরো শরীর ঘামে ভিজে জবজব, হাঁটু গেড়ে বিছানায় বসে জিজ্ঞেস করল, 'কী দেখছ তুমি?'
শ্যামা গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে আসে। তার চোখেমুখে অদ্ভুত গাম্ভীর্য মাখানো। শান্ত স্বরে সে তালিকা মেলায়, 'তুমি দুই জোড়া জুতো, চাদর, পাপোশ আর বাথরুমের ব্রাশ ব্যাগে ভরেছ।'
বিকেল আকাশ থেকে পড়ে, 'সে কী! না তো!'
তারপর ব্যাগ খুলে দেখল সত্যিই তাই। এক গাদা আবর্জনার মতো অদরকারি জিনিসে ব্যাগটা ঠাসা। শ্যামা ধীরস্থিরভাবে বিছানায় উঠে বসে। তার ছোট্ট মুখটায় গভীর প্রশ্ন, 'তুমি কি চিন্তিত?'
বিকেল ক্লান্তিতে বিছানার হেডবোর্ডে পিঠ ঠেকিয়ে দুই হাতে মুখ ঢাকে। তার রুদ্ধকণ্ঠ থেকে বেরিয়ে আসল একটা দীর্ঘশ্বাস, 'বুঝতে পারছি না রে... জীবনে এমন কিছু ঘটছে যা আমি কোনোদিন কল্পনাও করিনি।'
শ্যামার ছোট্ট ঠোঁটে বড়দের মতো প্রজ্ঞা জড়িয়ে, 'জীবন কি সবসময় আমাদের ভাবনা মতো চলে? চলে না তো।'
বিকেল বিস্ময়ে মুখ ঘুরালো এই খুদে দার্শনিকের দিকে। শ্যামা থামে না, সে নিজের জীবনের ক্ষতগুলো অনায়াস ভঙ্গিতে মেলে ধরে, বলে চলে, 'আমিও তো ভাবিনি আমার বাবা-মা আমাকে ফেলে দিয়ে চলে যাবে। কিন্তু তারা তো গেছে। আমি সেটা মেনে নিয়ে মানিয়ে চলার চেষ্টা করছি তো।'
বিকেলের ভ্রু কুঁচকে যায়, বুকটা ধক করে ওঠে।
'ফেলে দিয়েছে? ইচ্ছে করে?'
শ্যামা আলতো করে ঘাড় নাড়ল।
'কিন্তু কেন?'
'কারণ আমি আমার বাবার নিজের মেয়ে নই।'
বিকেলের মনে হয়, একটা তপ্ত বিদ্যুৎ তার শিরদাঁড়া দিয়ে বয়ে গেছে। এইটুকু একটা মেয়ে, অথচ কী অবলীলায় বুক ফাটানো সত্যিটা বলে দিল! চোখে অশ্রুকণা নেই, কণ্ঠে কোনো অভিযোগ নেই - কেবলই একটা হিমশীতল স্তব্ধতা পুরো বদন জুড়ে...
শ্যামা বলে চলে, 'বাবা আমায় কোনোদিন ভালোবাসেনি, মাম্মা বাসত অবশ্য। কিন্তু যখন জানল আমি স্বাভাবিক নই, তখন মা-ও বদলে গেল। শেষে বাবার কথা মেনে আমাকে একলা ফেলে দিল। কিন্তু জানো? আমি একটুও অবাক হইনি। কারণ আমি জানি, আমি যা ভাবব তা কখনো হবে না।'
সামান্য থেমে পুনরায় যোগ করে, 'লাইফ মিনস ম্যাজিক! এখানে সারাক্ষণ ম্যাজিক হয়। একটা আন্টি আমাকে বলেছিল কথাটা, আর আমি তা বিশ্বাস করি। এই ম্যাজিকে কখনো তুমি দুঃখ পাবে, কখনো আনন্দ। সবটুকু হাসিমুখে মেনে নেওয়াটাই হলো রিয়েল চ্যালেঞ্জ।'
বিকেলের ঠোঁট দুটো পাথরের মতো জমে গেল। কোনো শব্দ ফুটল না, কোনো প্রতিবাদ জাগল না। শুধু এক অসীম স্তব্ধতা মেয়েটাকে গ্রাস করে নেয়। এইটুকু একটা মেয়ে, অথচ তার বুকের ভেতর জমাট বেঁধে আছে কতখানি নীল কষ্ট!
শ্যামা ধীর পায়ে এগিয়ে আসে। বিকেলের দুগালে নোনাজলের যে দাগ, তা নিজের ছোট্ট হাতের তালু দিয়ে পরম মমতায় মুছে দিল সে। বিকেল আবার নতুন করে চমকে উঠল ওই মায়াবী মুখখানির দিকে তাকিয়ে।
শ্যামা ফিসফিস করে বলল, 'আমি জানি না তোমার সমস্যা কী, আমি তো ছোট মানুষ আন্টি... তোমাকে কী-ই বা বোঝাব? তবুও একটা কথা বলি, তুমি যা সবচাইতে বেশি ভয় করো, তারই মুখোমুখি দাঁড়াও একবার। তুমি খুব ভালো...'
হৃদবাড়ির জোড়াতালি দেওয়া বাঁধটা মচমচ করে ভেঙে পড়ল এবারে। সজোরে জড়িয়ে ধরল শ্যামাকে বিকেল।ওইটুকু এক পলকা বুকের ওপর মাথা রেখে ডুকরে কেঁদে উঠল মেয়েটা। যে কান্না সে বছরের পর বছর চেপে রেখেছিল, তা আজ প্রলয় হয়ে নেমে এল বুঝি।
বিকেলের কান্নার তোড়ে শ্যামার পাতলা ঠোঁটজোড়া আর কোনো শব্দ উচ্চারণ করে না। কেবল নিঝুম, নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রয় একটা মূর্তি হয়ে। আর তার ছোট্ট হাতজোড়া দিয়ে বিকেলের অবিন্যস্ত চুলের মাঝে বিলি কেটে দিতে লাগল।
বিকেলের ভীষণ আরাম বোধ হয়। চারপাশের জগতটা হঠাৎ করেই মিলিয়ে যায়। রেখে যায় শুধু এক টুকরো শান্তি আর এই ছোট্ট মেয়েটির ঐশ্বরিক ছোঁয়া।
শান্তির সেই ক্ষণস্থায়ী প্রলেপটুকু শুকানোর আগেই ঝড়ের পূর্বাভাস এল ফের। মাত্র ঘণ্টাখানেক ব্যবধানে বেজে উঠল ফোন। স্ক্রিনে ভেসে ওঠা অপরিচিত নম্বরটি স্থানীয় থানার।
বিকেল ফোন কানে ধরতেই শরীরটা যেন পাথরের মতো ভারী হয়ে গেল তার। ওপাশ থেকে জানানো হলো—শ্যামার বাবা-মায়ের সন্ধান পাওয়া গেছে। যে মা একসময় বিমুখ হয়েছিল, সে-ই এখন মেয়ের জন্য ব্যাকুল হয়ে কাঁদছে। পুলিশ নির্দেশ দিল, দ্রুত যেন মেয়েটিকে থানায় নিয়ে আসা হয়।
কোনো উত্তর দিল না বিকেল। 'হ্যাঁ' কিংবা 'না' বলার শক্তিটুকুও যেন হরণ করে নেওয়া হয়েছে তার থেকে। ফোনের যান্ত্রিক নীরবতা ছাপিয়ে নিজের ভেতরের হাহাকার স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মেয়েটা স্থবির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল মাঝঘরে।
তার মনে হলো, জীবন তাকে এক অদ্ভুত নিষ্ঠুর রসিকতার বৃত্তে বন্দি করে রেখেছে। যা কিছু তার একান্ত প্রিয় হয়ে ওঠে, যা কিছুকে সে নিজের আত্মার অংশ মনে করে আগলে ধরতে চায়—সবই বালির বাঁধের মতো আঙুলের ফাঁক দিয়ে গলে পড়ে। কেন এমন হয়? কেন বারবার তাকেই এই বিচ্ছেদের দহনে পুড়তে হয়?
যে মেয়েটির ছোট্ট হাতের স্পর্শে কিছুক্ষণ আগে সে পরম প্রশান্তি খুঁজে পেয়েছিল, তাকে এখন বিদায় দিতে হবে—এই সত্যটা বিষের মতো নীল হয়ে বিঁধছে তার বুকে। বিদায় জানানো যে কতটা হৃদয়ছেঁড়া কষ্টের, তা কি বিধাতা জানেন না? তবু অদৃষ্টের এ কেমন পরিহাস বারবার?
(চলবে)
________
আমি চলে এসেছি! ওরা চলে এসেছে!
আপনার সবাই এসেছেন তো? এলে জলদি জলদি কমেন্ট করুন, রিয়েক্ট করুন, রেসপন্স করুন! 🤩💟
আমার প্রোফাইল পিকচারে একটা লাভ রিয়েক্ট দিয়ে আসুন পিল্লিইইইইজ - 🥺
https://www.facebook.com/share/p/1DKTaYyqGq/