ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের নির্বসন

৫১তম পর্ব

লেখক: মৃধা মৌনি

#প্রেমের_নির্বাসন - (৫১)

লেখনীতে - #মৃধা_মৌনি

______________________

ঘরের এক কোণে নিস্তব্ধতা ভেঙে যখন বিকেলের ঘুম ভাঙে, বাইরের অন্ধকার তখন বেশ গাঢ়। নিঝুম এই ঘরে কোনো ঘড়ি নেই, তাই সময়ের হিসেবটা মেলাতে পারে না সে। হাতড়ে নিজের ফোনটা খুঁজতে গিয়েও পায় না। এক ধরনের অদ্ভুত অস্থিরতা আর দমবন্ধ করা শূন্যতা তাকে গ্রাস করে নিচ্ছে। বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় বিকেল। ঘরটা তার অচেনা নয়; এই দেয়াল, এই আসবাব—সবই তার চেনা। দীর্ঘ কয়েকটা বছর পর আজ প্রথম এই ঘরে সে ঘুমিয়েছে। কিন্তু মেয়েটার মনে পড়ে, সে পাশের ঘরে একটা চেয়ারে বসে ছিল; সেখানেই একসময় ঘুমিয়ে পড়েছিল। তাহলে এই ঘরের এই বিছানায় এল কী করে? তবে কি কেউ তাকে এখানে নিয়ে এসেছে? রোদ্দুর? কোলে করে? কই, বিকেল তো বিন্দুমাত্র টের পায়নি!

দেয়ালের সুইচবোর্ডে হাত বুলিয়ে বিকেল যখন বাতি জ্বালায়, মুহূর্তেই অন্ধকার চিরে শুভ্র আলোয় ঘরটা ঝলমল করে ওঠে। আর ঠিক তখনই চমকে ওঠে সে। জানালার ধারের সেই টু-সিটার সোফাটায় রোদ্দুর আধশোয়া হয়ে বসে আছে। হঠাৎ আলোয় রোদ্দুরও ধড়মড় করে জেগে ওঠে। চোখ দুটো লালচে হয়ে আছে তার, সম্ভবত এইমাত্রই তন্দ্রা লেগেছিল। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে বিকেল শান্ত হওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু বুকের ভেতরটা তখনও কাঁপছে।

রোদ্দুর উঠে দাঁড়াতেই বিকেল দ্রুত পায়ে দরজার দিকে এগোতে চায়। গলার স্বরে চাপা তাড়া নিয়ে বলে ওঠে, 'আমি যাই।'

রোদ্দুর একটু হন্তদন্ত হয়ে সামনে এগিয়ে এসে পথ আগলে দাঁড়ায়। শুধায়, 'কোথায় যাবি?'

'আমার বাসায়,' দ্বিধাহীনভাবে বলে বিকেল।

'এটা তো তোরই বাসা বিকেল।'

বিকেল থমকে দাঁড়িয়ে চোখেমুখে এক ধরনের কঠিন শীতলতা ফুটিয়ে তোলে। বলে, 'না, এটা মির্জা পরিবারের বাসা। যে পরিবারের সঙ্গে আমার কোনো বর্তমান সম্পর্ক নেই এবং ভবিষ্যতে যুক্ত হওয়ার সামান্যতম ইচ্ছেও আমার নেই।'

রোদ্দুরের মুখটা মুহূর্তেই অসহায় দেখায়। ছেলেটা যেন বিকেলের এই কাঠিন্য সহ্য করতে পারছে না। বিকেলের কণ্ঠে আক্ষেপ নয়, বরং চূড়ান্ত বিচ্ছেদের সুর বাজছে। মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বিছানার এক কোণে বসে। মনে মনে কথাগুলো গুছিয়ে নেয় সে। অনেক দিনের জমে থাকা কথা, যা পাথর হয়ে বুকের ভেতর চেপে বসে আছে।

শান্ত অথচ ইস্পাত-দৃঢ় কণ্ঠে সে বলে ওঠে, 'বসো সামনে। তোমাকে কিছু কথা বলি, মন দিয়ে শুনবে কেমন?'

রোদ্দুর নিঃশব্দে বিকেলের সামনে এসে বসল। বিকেল কিছুটা সময় নিয়ে শুরু করল এক নিঃশ্বাসে, 'যেদিন আমি জানতে পারলাম, তুমি তৃপ্তিকে নিয়ে দেশ ছেড়ে চলে গেছ, সেদিনই আমি নিজেকে একটা চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিলাম। নিজেকে বুঝিয়েছি—তোমার মতো একজন দ্বিধাগ্রস্ত মানুষ আমার জীবনে না থাকলেও চলবে। আমি মনে করি সৃষ্টিকর্তা আমায় রক্ষা করেছেন। যে মানুষটা আমার চরম সংকটের সময়ে পাশে দাঁড়াতে পারেনি, পরিবারের দোহাই দিয়ে নিজেকে আড়ালে রেখেছে, তাকে দিয়ে আমি কী করব? যে আমার দুঃখে ছিল না, তার সঙ্গে আমার সুখের কোনো ভাগাভাগি থাকতে পারে না। সেই মুহূর্ত থেকেই আমাদের মাঝে যোজন যোজন দূরত্ব তৈরি হয়ে গেছে রোদ্দুর। এই ব্যবধান আর কোনোদিন ঘুচবে না।'

রোদ্দুর আবেগতাড়িত হয়ে বিকেলের হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় চেপে ধরার চেষ্টা করল। ব্যাকুল হয়ে বলল, 'তুই চাইলেই ঘুচবে বিকেল। তুই একটিবার সুযোগ দিলেই সব আগের মতো হয়ে যাবে।'

বিকেল ঝটকা দিয়ে হাতটা সরিয়ে নেয়। তার চোখের দৃষ্টিতে অনমনীয় কাঠিন্য।

'সমস্যা তো এটাই যে, আমি আর চাইই না। আমার এই হৃদয় আর সায় দেয় না। তোমাকে, এই মির্জা পরিবারকে কিংবা এই জীর্ণ সম্পর্কগুলোকে—আর কিছুর জন্যই আমার ভেতর কোনো টান অবশিষ্ট নেই। হ্যাঁ, আমি ভালোবাসি, হয়তো এখনো বাসি; তবে তোমার সেই সত্তাটাকে, যার ভেতর আমি আমার জন্য রুখে দাঁড়ানোর সাহস দেখেছিলাম। মানুষ তার জীবনে অনেকগুলো চরিত্রে অভিনয় করে। আমি তোমার সেই সাহসী ‘নায়ক’ চরিত্রটাকে ভালোবেসেছিলাম। কিন্তু বাস্তবে সেই চরিত্রটার আজ কোনো অস্তিত্ব নেই।'

রোদ্দুর তর্কে নামল, যেন এই যুক্তিগুলো সে মানতে পারছে না।

'এটা কেমন কথা বিকেল? এগুলো তো সব রাগের কথা। চরিত্র আবার কী জিনিস? ভালোবাসলে তো পুরো মানুষটাকেই বাসতে হয়।'

বিকেল জানালার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল।

'ভালোবাসলে মানুষের ভালোটা তো সবাই বাসে। মন্দটাকে সহ্য করার নাম ভালোবাসা নয় রোদ্দুর, ওটা সমঝোতা। আমি তোমার মন্দটাকে ক্ষমা করে দিয়েছি, কিন্তু গ্রহণ করিনি। এর চেয়ে বেশি তোমাকে নিয়ে ভাবার শক্তি বা সময়—কোনোটাই এখন আর আমার নেই।'

ধীর স্থির পায়ে উঠে দাঁড়াল মেয়েটা। তার চেহারায় প্রশান্তি মেশানো কাঠিন্য মিশে। রোদ্দুর হতবিহ্বল হয়ে ভাবছে, সে কি এই মুহূর্তে মেয়েটার পায়ে লুটিয়ে পড়বে? তার সেই পুরনো অধিকার বোধটা কি একটুও কাজ করবে না? কিন্তু তার কিছু করার আগেই বিকেলের কণ্ঠস্বর ঘরের প্রতিটি কোণে প্রতিধ্বনিত হয়।

'আমি এই জীবনে আর কাউকে নিজের করে নিইনি, কারণ নতুন করে কাউকে বিশ্বাস করার সাহস আমার নেই। পুনরায় কোনো অতল সমুদ্রে ডুবতে ডুবতে খড়কুটো ধরে বাঁচতে চাই না বলেই আমি নিজেকে সব কিছু থেকে সরিয়ে নিয়েছি। কিন্তু আমি ভালো আছি রোদ্দুর। আমি আমার মতো করে ভীষণ ভালো আছি। আমার ভেতর এখনও এমন এক সত্তা বাস করে যাকে আমি আজও ভালোবাসি এবং আজীবন ভালোবেসে যাব। সেই একান্ত আপন সত্তার সঙ্গে গল্পে গল্পে আমার গোটা একটা জীবন অনায়াসে কাটিয়ে দেওয়া যাবে।'

বিকেল আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না। গুমোট ঘরটা পেছনে ফেলে সে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে এল। রোদ্দুর সম্বিৎ ফিরে পায়। পাগলের মতো পেছনে ছুটে এসে আর্তনাদ করে ওঠে, 'তুই এভাবে আমাকে ফেলে চলে যেতে পারিস না বিকেল! আমি তোকে ভালোবাসি... আজও অনেক ভালোবাসি!'

'কিন্তু আমি বাসি না।' সোজাসাপটা জবাব মেয়েটার।

'বিকেল! আমাদের এত বছরের ভালোবাসাকে তুই এভাবে নির্বাসনে দিস না। আমি হাত জোড় করছি তোর কাছে...' রোদ্দুরের গলার স্বর কান্নায় ভেঙে পড়ে।

বিকেল ঘুরে দাঁড়ায়। তার দু চোখ জুড়ে কেবলই ক্লান্তির ছাপ।

'আমিও হাত জোড় করছি রোদ্দুর, দয়া করে আমাকে বাধ্য করো না কটু ভাষায় তোমাকে কিছু বলতে। আমি যথেষ্ট শান্তভাবে, মার্জিত ভাষায় আমার অনুভূতিগুলো বুঝিয়ে বলেছি। আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলেও, তোমার সঙ্গে এক ছাদের নিচে থাকা আমার পক্ষে আর সম্ভব নয়।'

এই কথাগুলো তীরের মতো রোদ্দুরের বুকে এসে বিঁধে। সে দিশেহারা হয়ে বিকেলের পায়ের ওপর আছড়ে পড়ে। দু হাতে বিকেলের পা জড়িয়ে ধরে রুদ্ধশ্বাসে বলতে লাগল, 'মরে যাব আমি বিকেল! একটু বোঝার চেষ্টা কর, তোকে ছাড়া বেঁচে থাকা আমার পক্ষে সত্যিই সম্ভব না। আমি নিঃশেষ হয়ে যাব!'

বিকেল নিস্পৃহ চোখে একবার নিচু হয়ে তাকাল। শীতল কণ্ঠে শুধাল, 'এতগুলো বছর তো ছিলে।'

'সে তো তুই একদিন না একদিন ফিরে আসবি—সেই আশায় বুক বেঁধে বেঁচে ছিলাম।'

'এখনও বাঁচতে পারবে। আমি তো তোমায় ক্ষমা করে দিয়েছি, এখন আরও নিশ্চিন্ত মনে প্রশান্তি নিয়ে বাঁচতে পারবে।'

রোদ্দুর দু পা আরও শক্ত করে চেপে ধরল। তার অশ্রুতে বিকেলের পায়ের পাতা ভিজে উঠছে।

'পারব না রে বিকেল, কিছুতেই পারব না। আমার ক্ষমা চাই না, আমি তোকে চাই। শুধু তোকে...'

বিকেল দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে একটু সময় নিল। তারপর নিচু স্বরে বলল, 'আমার পা ছাড়ো।'

'ছাড়ব না।'

'আমাকে যেতে দাও রোদ ভাইয়া।'

'দেবো না। কিছুতেই তোকে যেতে দেবো না।'

বিকেলের কণ্ঠে বিরক্তি প্রকাশ পেল,

'পাগলামো করো না রোদ্দুর।'

'একশবার করব! তুই ফিরে না আসা পর্যন্ত এই পাগলামো থামবে না।'

'রোদ ভাইয়া...'

রোদ্দুর বিকেলের পায়ে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বুজে। ভেজা কণ্ঠে, অস্ফুট স্বরে বলে, 'আমি ভুল করেছি, আমি অপরাধ করেছি। কিন্তু আমি তো এত বড় কোনো অন্যায় করে ফেলিনি যার শাস্তি মরণ হতে হবে! তুই আমায় ক্ষমা করিস না বিকেল। আমার ওপর তোর আজীবনের সব অভিমান জমা করে রাখ। আমি আমার শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত সেই অভিমান ভাঙানোর চেষ্টা করে যাব। তবু তুই আমার থাক... শুধু আমারই থাক!'

মেয়েটার চোখের কোণ থেকে এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। ঘরের ভেতরে শুরু হওয়া এই আর্তনাদ আর হৈ-হল্লায় বাড়ির সবার ঘুম ভেঙে গেল। সবাই ছোটাছুটি করে আসতে লাগল। দিশাও ছিল আজ, শ্যামাকে সঙ্গে নিয়ে ওসমান মির্জার ঘরে ঘুমিয়েছিল সে। চিৎকার, হাউমাউ কান্নার শব্দে সে নিজেও হতবিহ্বল।

শ্যামা দিশার আড়ালে দাঁড়িয়ে বড় বড় চোখে দৃশ্যটা দেখে। তার ছোট্ট মনে অদ্ভুত বিস্ময় আর করুণা জাগল। এত বড় একজন মানুষ তার মাম্মামের পা জড়িয়ে ধরে শিশুর মতো ফুঁপিয়ে কাঁদছে! শ্যামার খুব মন খারাপ হলো, আবার মনে মনে ভাবল—এমন কী নিদারুণ কষ্ট হলে একটা মানুষ এভাবে সবার সামনে কাঁদতে পারে? তার কি একটুও লজ্জা করছে না?

রেহনুমা বেগম আর স্থির থাকতে পারলেন না। তিনি আঁচল পেতে প্রায় ভিক্ষা চাওয়ার ভঙ্গিতে বিকেলের সামনে এসে দাঁড়ালেন। রুদ্ধস্বরে বললেন, 'তোর কাছে আমি আজ আমার ছেলের প্রাণ ভিক্ষা চাই মা। তোকে আমি কম আদর-ভালোবাসা দেইনি কোনোদিন। তবে স্বীকার করছি, যখন তোর আমাকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল, তখন আমি মা হয়ে তোর পাশে থাকতে পারিনি। সেই ভুলের সবটুকু শাস্তি তুই আমায় দে মা, কিন্তু আমার ছেলেটাকে বাঁচা। ও মরে যাবে রে বিকেল, তোকে ছাড়া ও স্রেফ শেষ হয়ে যাবে!'

বিকেল গাল মুছে নেয়, গলায় কাঠিন্য মিশিয়ে কাটা কাটা প্রতিধ্বনিতে বলে ওঠে, 'মরে গেলে যাক! এক সময় তো আমিও মরে যেতে পারতাম, তখন তো কেউ আমার কথা ভাবেননি। আজ কেন তবে দরদ দেখাচ্ছেন?'

রেহনুমা ডুকরে কেঁদে উঠলেন, 'শাস্তি দে রে মা, আমাদের সেই ভুলের চরম শাস্তি দে!'

'আমি কোনো বিচারক নই, কাউকে শাস্তি দেওয়া আমার কর্ম নয়। ওপরে যিনি আছেন, তিনিই সব দেখছেন এবং তিনিই বিচার করবেন।'

'বিচার তিনি করছেন রে মা, খুব কড়া বিচার করছেন,' রেহনুমা হাহাকার করে ওঠেন, 'জীবনের সুখ-শান্তি কী জিনিস, তা আমরা বহু আগেই ভুলে গেছি। তোর বড় বাবা তো শেষবেলায় ক্ষমা চাওয়ার সুযোগটুকুও পেলেন না, তার আগেই সব ছেড়ে চলে গেলেন। আমি শুধু বেঁচে আছি এই পাগল ছেলেটার দিকে তাকিয়ে। তুই পারবি বিকেল, একমাত্র তুই পারবি এই বাড়ির হারানো সুখ আর শান্তি ফিরিয়ে আনতে।'

'আমি পারব না। আমি কোনো মাটির পুতুল নই যে যখন যে যা বলবে, আমাকে তাই করতে হবে। আমার নিজেরও একটা জীবন আছে, একটা সত্তা আছে।'

বিকেল ভিড়ের মাঝখান থেকে দিশার দিকে তাকায়। মেয়েটার কণ্ঠে এবার মিনতি আর অস্থিরতা, 'মা, প্লিজ ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলো। আমি এখনই এখান থেকে যেতে চাই। আমার দমবন্ধ হয়ে আসছে এখানে।'

রেহনুমা আবার বিকেলের হাত টেনে ধরতে চাইলেন, কিন্তু তার আগেই দিশা এগিয়ে এসে তাকে আলতো করে সরিয়ে দিল। রেহনুমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, 'আমি আপনাদের আগেই বলেছিলাম, আমার মেয়ের জীবনের সিদ্ধান্ত কেবল ও-ই নেবে। আপনি, আমি বা অন্য কেউ ওর সিদ্ধান্তে নাক গলাবো না। ওর যা ভালো মনে হয়, ও তা-ই করবে।'

রেহনুমা স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। দিশা পকেট থেকে ফোন বের করে ড্রাইভারকে নির্দেশ দিল গাড়ি নিয়ে গেটের সামনে আসতে।

বিকেল যাওয়ার জন্য এক পা বাড়ায়, কিন্তু রোদ্দুর তখনো জোঁকের মতো তার পা জড়িয়ে ধরে মেঝেতে পড়ে আছে। বিকেলের শরীর ঘৃণায় না কি অভিমানে শিউরে ওঠে, সে সজোরে পা ঝাড়া দিল। একসময়ের পরম নির্ভরতার মানুষটি আজ কেবল এক বিষণ্ন বোঝা বিকেলের নিকট। বাড়ির নিস্তব্ধতা ভেঙে রোদ্দুরের কান্নার শব্দটা গুমরে গুমরে ম★রতে লাগে শুধু।

এর পরের অনেকটা সময় ঘরের বাতাস ভারি হয়ে রইল একে অপরের প্রতি ছোঁড়া ধারালো সব যুক্তিতে। বাকবিতণ্ডা এবার আর কেবল রোদ্দুর আর বিকেলের মধ্যে সীমাবদ্ধ রইল না; এতে জড়িয়ে পড়ল মিশিও। মিশি তার ভাইয়ের পক্ষ নিয়ে কথা বলতে শুরু করল। অনেক যুক্তিতর্ক দাঁড় করালো, বোঝাতে চাইল কিন্তু বিকেল যে বড্ড নাছোড়বান্দা, মেয়েটা কিছুই বুঝতে চাইছে না।

অথচ কেউ জানে না, মেয়েটার বুকের গভীরে, একদম গভীরতম কোণে তখন একটা বড় ঝড় সব লণ্ডভণ্ড করে চলেছে। ছারখার করছে। উড়িয়ে দিচ্ছে সবকিছু। ব্যথা পাচ্ছে বিকেল, প্রচুর ব্যথাবোধ হচ্ছে তার। রোদ্দুরের বিধ্বস্ত মুখটার দিকে তাকালেই অভাগী মেয়েটার চোখের পাতায় ভেসে ওঠে অতীতের সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর স্মৃতি। এই বাড়িতে আসার আগেই বিকেল তৃপ্তিকে খুঁজে বের করেছিল, তার সঙ্গে দেখা করে জেনে এসেছিল সেই সত্যগুলো যা এতদিন পর্দার আড়ালে ছিল। রোদ্দুর আর তৃপ্তির একত্রে কাটানো সময়, রোদ্দুরের বিভিন্ন নারীর প্রতি আসক্তি—সবকিছুই বিকেলের নখদর্পণে। তবে অন্য কোনো নেশা বা আসক্তি তাকে ততটা র★ক্তাক্ত করেনি, যতটা করেছে তৃপ্তির সঙ্গে রোদ্দুরের চরম ঘনিষ্ঠতার কথা।

বিকেলের মনে বারবার একটা কথাই বিষাক্ত কাটার মতো বিঁধছে—যে সময়টাতে বিকেল প্রতিটা মুহূর্ত যুদ্ধ করেছে তলিয়ে না গিয়ে কোনোমতে বেঁচে থাকার জন্য, ঠিক সেই একই সময়ে রোদ্দুর আর তৃপ্তি একত্রে এক বিছানায় রাত কাটিয়েছে। যে আদর, যে সোহাগ ছিল কেবল বিকেলের প্রাপ্য, যা ছিল তার একান্ত অধিকার আর হকের ধন—সেই সবকিছু বিলিয়ে দেওয়া হয়েছে অন্য এক নারীকে। বিকেল কিছুতেই এই দৃশ্যগুলো মাথা থেকে সরাতে পারছে না; তার পবিত্র ভালোবাসার জায়গায় এই ভাগাভাগি সে মেনে নিতে পারছে না।

একপ্রকার মানসিক ও শারীরিক যুদ্ধ করেই বিকেল শেষ পর্যন্ত ওই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। দীর্ঘদিনের পরিচিত দালানটা আজ তার কাছে একটা নরককুণ্ড বলে মনে হচ্ছে। সে দ্রুত গাড়িতে গিয়ে বসে। শ্যামাকে সামনে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসিয়ে দিল, আর নিজে দিশার পাশে পেছনের সিটে গিয়ে গা এলিয়ে দিল। এতক্ষণের ধরে রাখা বাঁধটা এবার আর মানল না। গাড়ির স্টার্ট দেওয়ার শব্দের সঙ্গেই বিকেল মায়ের বুকে মাথা গুঁজে ডুকরে কেঁদে উঠল।

ভাঙা গলায় অসহায় মানুষের মতো বলতে লাগল, 'ওরা আমায় কেমন পুতুল ভাবে মা! ওরা কি মানুষ না? আমায় এতগুলো বছর তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে, আঘাত দিয়ে, চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়ে এখন আবার কী অনায়াসে জোড়া লাগাতে চায়! এখন ওদের আমাকে চাই। ওরা আমাকে ইমোশনালি শেষ করে দিচ্ছে মা, আমি আর পারছি না!'

মেয়ের হাহাকার দিশার বুকটাকেও চিরে দেয়। সে বিকেলের মাথায় পরম মমতায় হাত বোলাতে লাগল। কণ্ঠে দৃঢ়তা রেখে শান্ত সুরে বলল, 'তুই শুধু তাই করবি মা, যা তোর হৃদয় বলে। তুই সেখানেই যাবি যেখানে তুই শান্তিতে একটু নিঃশ্বাস নিতে পারবি। এই স্বাধীনভাবে নিঃশ্বাস নিতে পারাটা ছাড়া একটা মেয়ের জীবনে একান্ত নিজের বলতে আর কিছু নেই। কিচ্ছু নেই।'

গাড়িটা মির্জা পরিবারের সীমানা ছাড়িয়ে অন্ধকার রাস্তা দিয়ে ছুটতে লাগল।

★★★

ঘর ভর্তি থমথমে নিস্তব্ধতা। ক্ষণিক বাদেই ফজরের আজান পড়বে। মির্জা বাড়ির সবাই একত্রে এক ঘরে ক্লান্ত ও জরাজীর্ণ হৃদয়ে বসে। ঘরটি উমেদ মির্জার বড় হলঘর। পারিবারিক সব আলোচনা, সিদ্ধান্ত আর বিচার-সালিশ সবসময় এ ঘরেই হয়। আর সেই সব আয়োজনের মধ্যমণি থাকেন স্বয়ং উমেদ মির্জা। আজ তিনি নেই, অথচ তাঁর রেখে যাওয়া সবকিছুই আগের মতো আছে। শুধু তাঁর জায়গা দখল করেছেন তাঁর স্ত্রী; তিনিই এখন এই আলোচনা সভার মূল কেন্দ্রবিন্দু। লোকে বলে সময় সব শূন্যস্থান পূরণ করে দেয়। কিন্তু রোদ্দুরের দিকে তাকালে তা মনে হয় না। ছেলেটার বুকে যে তৃষ্ণা আর হাহাকার তৈরি হয়েছে, তা পূরণ করার সাধ্য বোধহয় সময়েরও নেই।

ছেলেটা এখনো কেঁদে চলেছে। মেয়েদের মতো একটু পর পর ডুকরে উঠছে সে। বিকেল বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে গেছে প্রায় দেড় ঘণ্টা হতে চলল, অথচ রোদ্দুরের কান্না থামছে না। রেহনুমা বিছানার মাঝখানে এলোমেলো ভঙ্গিতে বসে আছেন। রোদ্দুর আইরিনের কোলে মাথা রেখে শুয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। বাকি সবাই দূরত্ব বজায় রেখে বসে আছে।

কারো চোখে বিরক্তি নেই, শুধু মিশির চোখ দুটো ছাড়া। সে অনেকক্ষণ নিজেকে সামলে রাখার চেষ্টা করে অবশেষে ফেটে পড়ে। রোদ্দুরকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে, 'এই ভাই, থামবি তুই? কী বাচ্চাদের মতো কান্নাকাটি শুরু করেছিস!'

রোদ্দুরের কোনো হেলদোল নেই। মিশি এবার রেহনুমার দিকে তাকিয়ে বলে, 'মা, তুমি কি কিছু বলবে, নাকি এভাবেই সবাই বসে থাকবে? আমার খুব ক্লান্ত লাগছে।'

জবাব দেন আইরিন, 'তুই গিয়ে ঘরে শুয়ে থাক না মিশি।'

'কীভাবে শোব? আমার কানে যে ভাইয়ার কান্নার শব্দ বাজছে। এই শব্দ নিয়ে কি ঘুমানো যায়?'

আইরিন থমথমে মুখে বলেন, 'কাঁদলে মনের ভার হালকা হয়। ওকে কাঁদতে দে।'

মিশি তৎক্ষণাৎ কোনো জবাব দেয় না। তবে পরমুহূর্তেই আপনমনে গজগজ করতে থাকে, 'না হয় একটা ভুল করে ফেলেছে, তাই বলে এত পাষাণ হতে হবে? ছেলেটা এভাবে কাঁদছে দেখেও তো মন গলতে পারে! পাষাণী একটা।'

এরপর আবার রোদ্দুরের দিকে তাকিয়ে বলে, 'আর এই একজন! ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার মতো সেই মেয়ের জন্য কেঁদে কেটে খু★ন হচ্ছে। কেউ কিছু বলছেও না। এই ভাইয়া, কান্না থামা! একদম কান্না থামা...'

মিশি রোদ্দুরের হাত ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে তাকে ওঠানোর চেষ্টা করে। রোদ্দুর আরও কুঁকড়ে যায়। কান্নার বেগ বাড়িয়ে ভিজে কণ্ঠে বলে, 'আমি ওকে ছাড়া কীভাবে থাকব রে মিশি? তুই একটু বোঝা না। আমি আর কোনোদিন এমন ভুল করব না, আমি ওয়াদা করছি।'

মিশি কণ্ঠ নরম করে বলে, 'আচ্ছা শোন, শান্ত হ প্লিজ। আমার কথা শোন...'

রোদ্দুর কান্না থামায়, তবে হিক্কা উঠছে ওর। রক্তাভ চোখে মিশির দিকে তাকালে মিশি ভাইয়ের মলিন মুখে হাত বুলিয়ে দেয়। নরম স্বরে জিজ্ঞেস করল, 'আমাকে দেখ, আমার দিকে দেখ। তুই কি আমাকে ভালোবাসিস না?'

রোদ্দুর মাথা ওপর-নিচ দোলায়।

মিশি আবার প্রশ্ন করল, 'কতটা বাসিস?'

রোদ্দুর অস্ফুটে উত্তর দেয়, 'অনেকটা।'

মিশি বলল, 'তোর মনে আছে ভাইয়া, ছোটবেলায় একবার এক ছেলে বল মেরে আমার হাত ফাটিয়ে র★ক্ত বের করে দিয়েছিল? স্বস্তির চেয়েও বয়সে ছোট ছিল সে, না বুঝেই খেলার মাঝখানে আমাকে বল দিয়ে আঘাত করে। হাত ফেটে র★ক্ত পড়ছিল আর আমি যন্ত্রণায় চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে বাসায় ফিরি। মনে পড়ে?'

রোদ্দুর শান্ত স্বরে বলল, 'মনে আছে।'

'তারপর তুই সেই পিচ্চিটার সাথে কী করেছিলি, মনে আছে?'

রোদ্দুর চুপ করে থাকে। মিশি নিজেই বলে চলল ঘাড় নেড়েচেড়ে, 'আমি কিন্তু এখনো ভুলিনি, কোনোদিন ভুলবও না। তুই সেই ছোট বাচ্চাটাকেও ব্যথা দিয়েছিলি। আমাকে যতটা ব্যথা দিয়েছিল, তার চেয়েও বেশি আঘাত করেছিলি তাকে। তুই আমায় এতটাই ভালোবাসতি ভাইয়া...'

রোদ্দুরের চোখের কোণে আবারও নোনা জল জমতে শুরু করেছে। মিশি পরম মমতায় সেই জল মুছিয়ে দিয়ে শুধায়, 'তুই বলেছিলি ভাইয়া, ব্যথার কোনো প্রতিশোধ হয় না। ব্যথা কেবল ব্যথাই হয়। শরীরের চোট মলমে সারানো গেলেও মনের ক্ষতে তো তা লাগানো যায় না! আমার সামান্য শরীরের ব্যথায় তুই ওইটুকু একটা বাচ্চাকে শাস্তি দিয়েছিলি; আর সেখানে তুই যার মনে এত বড় বড় ক্ষত করলি, যাকে র*ক্তাক্ত করলি—সে তোকে শাস্তি দেবে না?'

রোদ্দুর কোনো উত্তর দিতে পারল না। কেবল নীরবে তার চোখ বেয়ে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল চিবুকের কাছে। মিশি পরম যত্নে তা মুছিয়ে দিতে দিতে বলে,

'আমার একটা কথা শোন, তুই ওকে যেতে দে। ওকে মুক্তি দিয়ে দে। ওর ওপর থেকে তোর সব দাবি সরিয়ে নে ভাইয়া। মেয়েটা জীবনে অনেক কষ্ট পেয়েছে। আমরা সবাই বাবা-মায়ের আদর-ভালোবাসা পেয়েছি, কিন্তু ও পায়নি। ও তীব্র ভালোবাসার অভাব নিয়ে বড় হয়েছে, এখনো সেই অভাবের মাঝেই ডুবে আছে। ওকে তুই মুক্তি দে। ওকে ডানা মেলে উড়তে দে, দেখতে দে এই আকাশটা ঠিক কতটা বিশাল!'

মিশি উঠে দাঁড়াল।

'সত্যিকারের ভালোবাসায় কাউকে আটকে রাখতে হয় না। ভালোবাসার ধর্মে জোর খাটে না। ভালোবেসে তো তাকে ছেড়ে দিতে হয়। ভালোবাসায় তাকে পেতেই হবে—এমন কোনো শর্ত থাকতে নেই। তাকে কোনোদিন পাব না জেনেও তার জন্য একগুচ্ছ শুভ্র অনুভূতি হৃদয়ে লালন করার নামই হলো ভালোবাসা।'

মেয়েটা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। রোদ্দুরসহ ঘরের প্রতিটা সদস্য স্তব্ধ, নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে। দীর্ঘক্ষণ পর রোদ্দুর ভাঙা গলায় রেহনুমাকে ডেকে বলে উঠল, 'বিকেলের মায়ের নম্বরটা কি আছে তোমার কাছে, মা?'

রেহনুমা ধীরে মাথা নাড়েন, 'আছে।'

'একটু ফোন করবে ওনাকে?'

'কেন?'

রোদ্দুর অপরাধীর মতো মাথা নিচু করল, 'তোমার মেয়ে ভুল কিছু বলে যায়নি মা। আমি সত্যিই নিজের স্বার্থে বড় বেশি অন্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। যখন বিকেলের আমাকে প্রয়োজন ছিল, তখন আমি ওর দিকে ফিরেও তাকাইনি। আর আজ আমার প্রয়োজনে ওকে বাধ্য করছি আমায় ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য। সত্যি মা, তোমার ছেলের মতো স্বার্থপর এই পৃথিবীতে আর একটাও নেই। তুমি ফোন করো, আমি ওকে বলব যে আজ থেকে, এই মুহূর্ত থেকে ওর জীবনে আমার আর কোনো অস্তিত্ব নেই। ও আমাকে পুরোপুরি মুছে দিয়ে নতুন করে জীবন শুরু করুক। যে ভুল আমি করেছি, তার শাস্তি আমি একাই ভোগ করব। ও কেন করবে? ওর মতো লক্ষ্মী মেয়ে দুনিয়াতে আর একটাও নেই। এই বিশাল পৃথিবীর কোথাও না কোথাও কেউ না কেউ নিশ্চয়ই একবুক স্বচ্ছ ভালোবাসা নিয়ে ওর জন্য অপেক্ষা করে বসে আছে। অবশ্যই আছে!'

(চলবে)

_______

আর সর্বোচ্চ ২-৩ টা পর্ব আছে। ৫৫ এপিসোডের মধ্যে সমাপ্ত হবে আপনাদের #প্রেমের_নির্বাসন।

আপনারা বিকেল-রোদকে কি এরপরেও একসঙ্গে চান? চাইলে এই পর্বের পোস্টে লাভ রিয়েক্ট দিয়ে যাবেন। দু'দিন পর পর্ব দিয়েছি, তাই সবার রেসপন্স কাম্য। হ্যাপি রিডিং ❤️

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন