ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের নির্বসন

৫০তম পর্ব

লেখক: মৃধা মৌনি

#প্রেমের_নির্বাসন - (৫০)

লেখনীতে - #মৃধা_মৌনি

___________________

বিকেলের কণ্ঠস্বর বরফের মতো শীতল, সে নিচু স্বরে আদেশ করল, 'আমার পা ছাড়ুন।' একটু থেমে বিজাতীয় গাম্ভীর্য নিয়ে পরের শব্দটা যোগ করল,

'প্লিজ!'

কিন্তু রোদ্দুর ছাড়ল না। বরং আরও মরিয়া হয়ে আঁকড়ে ধরে বলল, 'যতক্ষণ না মাফ করছিস, আমি তোর পা ছাড়ব না। তুই যদি আমায় লাথি মারিস, তবুও না।'

বিকেল ভ্রু কুঁচকে আগের চেয়েও কঠিন স্বরে শুধাল, 'আমি আপনাকে লাথি দেব কেন? কী আজব কথাবার্তা!'

'দিতেই পারিস,' রোদ্দুরের গলায় পরাজয়ের সুর, 'আমি যা করেছি, তাতে তোর লাথি জুটলে ওটাই হবে আমার রাজভাগ্য।'

'আজেবাজে বকা বন্ধ করে পা ছাড়ুন। আমি বসব।'

রোদ্দুর নিজের সিদ্ধান্তে অটল, 'তুই চলে যাবি, আমি জানি। ছাড়ব না বিকেল। আগে বল ক্ষমা করেছিস, আমায় একটা সুযোগ দিবি- তবেই পা ছাড়ব। তার আগে যদি ঘণ্টার পর ঘণ্টা এভাবে পড়ে থাকতে হয়, আমি থাকব।'

বিকেল শেষবারের মতো সতর্ক করল, 'আপনি পা ছাড়বেন না?'

রোদ্দুর দৃঢ়স্বরে জানাল, 'না।'

পর মুহূর্তেই ঘটে গেল অভাবনীয় একটা কাণ্ড। রোদ্দুর কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রবল ধাক্কায় ছিটকে উলটে পড়ল মেঝেতে। বিকেল যে গত আট বছরে কেবল মানসিকভাবেই নিজেকে ইস্পাতসম কঠিন করেনি, শারীরিক সক্ষমতাতেও নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে, তা রোদ্দুরের ধারণার বাইরে ছিল। বিদেশের মাটিতে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে নিয়মিত জিম আর ক্যারাটে অনুশীলনে বিকেল এখন যথেষ্ট শক্তিশালী। রোদ্দুরের জীর্ণ-শীর্ণ শরীরটাকে পরাস্ত করতে তার কয়েক সেকেন্ডও সময় লাগল না। ব্যথার চেয়েও বিস্ময় রোদ্দুরকে বেশি আচ্ছন্ন করল। সে ড্যাবড্যাব করে বিকেলের মুখের দিকে তাকাতে বাধ্য হলো।

বিকেলের ধৈর্যের বাঁধ পুরোপুরি ভেঙে গেছে। এতক্ষণ ধরে বুকের গভীরে চেপে রাখা দাহ্য পদার্থগুলো যেন হঠাৎ অগ্নুৎপাতে রূপ নিল। যে জেদ, ক্ষোভ আর অভিমানকে সে সযত্নে তালাবদ্ধ করে রেখেছিল, রোদ্দুর নিজেই তাতে আ★গুনের স্ফুলিঙ্গ ছুঁড়ে দিল।

মেঝেতে পড়ে থাকা রোদ্দুরের শার্টের কলার টেনে হিঁচড়ে দাঁড় করিয়ে দিল বিকেল। তার কণ্ঠে এখন পৃথিবীর সমস্ত কাঠিন্য আর তীব্র আর্তনাদ মিশে একাকার। সে চিৎকার করে বলে ওঠে, 'কী পেয়েছটা কী তুমি? আমি কি তোমার হাতের মোয়া? নাকি রক্তে-মাংসে গড়া কোনো পুতুল? যখন মনে চাইল ভালোবাসলে, যখন মনে চাইল বিয়ে করলে! তারপর হুট করে মনে হলো ফ্যামিলিকে প্রায়োরিটি দিতে হবে, ব্যস—বাপের কথায় আরেক কালনাগিনীকে বগলদাবা করে বিদেশ ছুটলে! একবারও ভাবলে না, যে মেয়েটা তোমার ওপর অন্ধ বিশ্বাস রেখে হাতটা ধরেছিল, তাকে কাদের মাঝে, কোন নরকে ফেলে যাচ্ছ?'

সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই রণচণ্ডী বিকেলকে রোদ্দুর চিনতে পারছে না। এ যেন এক অন্য মানবী। এত তেজ, এত জোর সে কোথায় পেল? নাকি মনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভই তার পেশিতে অমানুষিক শক্তি জুগিয়েছে! রোদ্দুর একদম কুঁকড়ে গেল। ভেজা গলায় আমতা আমতা করে বলতে চাইল, 'আমি তো সেটার জন্যই মাফ...'

কথাটা কেড়ে নিয়ে তপ্ত শিস দেওয়ার মতো করে বিকেল বলে উঠল, 'কিসের মাফ? মাফ কি তোর মায়ের রান্না করা করলা ভাজি? মন চাইল খেলে, না চাইলে ফেলে দিলে? আমার জীবনটা কি তোর কাছে জোক মনে হয়? এ বাড়ির বড় ছেলে বলে কি সবার মাথা কিনে নিয়েছিস তুই? কারো জীবনের সুখ-শান্তি মন চাইলেই কেড়ে নেওয়ার পারমিশন তোকে কে দিয়েছে? বল, কে দিয়েছে?'

রোদ্দুর নির্বাক। বিকেলের সম্বোধন 'আপনি' থেকে 'তুমি' হয়ে এখন সরাসরি 'তুই'-তে নেমে এসেছে। রোদ্দুরের মনে হলো, এখন চুপ থাকাই ভালো, নইলে হয়তো আরও বড় কোনো বিস্ফোরণ ঘটবে। সে কোনো জবাব দিল না, শুধু চোখের অবাধ্য জলগুলো গালের মলিন কার্নিশ বেয়ে চিবুকে এসে জমা হতে লাগল। আট বছর আগের সেই 'পাগলি বিকেল' আজ এক রুদ্রমূর্তিতে তার সমস্ত অন্যায়ের হিসাব কড়ায়-গন্ডায় বুঝে নিচ্ছে।

তাতে আরও আ★গুনে ঘি পড়ল যেন, আহত বাঘিনীর মতো ফুঁসতে ফুঁসতে বিকেল আর্তনাদ করে ওঠে, বলতে থাকে 'খবরদার! একদম কাঁদবি না। এই মিথ্যে কান্নার নোনা জলে আমার মন ভোলানোর চেষ্টা করিস না। আমি অতটা নির্বোধ নই যে তোর এই অভিনয়ের ফাঁদে আবারও পা দেব।'

'এটা অভিনয় নয়, তুই বিশ্বাস কর। একবার ছুঁয়ে দেখ, এই চোখের জল কতটা খাঁটি...' রোদ্দুরের গলা ভিজে আসে বলতে গিয়ে।

বিকেল ছ্যাৎ করে ওঠে সঙ্গে সঙ্গে, 'ছিঃ! নোংরা, জঘন্য ওই পানি!' কণ্ঠ স্বরে ঘৃণা ঝরে পড়ল তার, 'আমি ছোঁবো? আমি? আমার আস্ত একটা জীবন তছনছ করে দিয়েও তোর আশ মেটেনি? এখন আবার এসেছিস ক্ষমা চাইতে! ক্ষমা কি হাতের বানানো মোয়া যে চাইলেই পাওয়া যায়? আমার বিধ্বস্ত হৃদপিণ্ডটাকে একবার জিজ্ঞেস করে দেখ, সে তোকে ক্ষমা করার ক্ষমতা রাখে কি না।'

রোদ্দুরের ওপর থেকে হাত সরিয়ে নিয়ে বিকেল মুখ ফিরিয়ে নেয়। চোখের সামনে ঝাপসা হয়ে ভেসে উঠছে সেই দিনগুলো, যখন সে যন্ত্রণার অতল সমুদ্রে ডুবে যাচ্ছিল। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসত বারবার, মনে হতো প্রাণটা বুঝি কণ্ঠনালীতে এসে আটকে আছে। চারদিকে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার, এক চিলতে আলোর দেখা নেই। দিনের পর দিন একা একা ছটফট করে আজকের এই পাথরচাপা বিকেলে পরিণত হয়েছে সে। কতবার যে ইচ্ছে করেছে ওই সাদা সিলিং ফ্যানটা ছুঁয়ে দেখতে, ঝুলে পড়তে— ভাগ্যিস ঈমানটা একটু শক্ত ছিল, নইলে পৃথিবীর এই আলো-বাতাস অনেক আগেই তার জন্য বরাদ্দ ফুরিয়ে যেত।

দীর্ঘ একটা শ্বাস টেনে নিজেকে সংযত করল বিকেল। সে কাঁদবে না, কিছুতেই না। কান্নার দিন তার বহু আগে ফুরিয়েছে, চোখের জলের দাম এখন বড্ড চড়া। চোখ দুটো জ্বালা করলেও হাত দিয়ে জোরে রগড়ে নিয়ে সে আবার ঘুরে তাকাল রোদ্দুরের হতভম্ব মুখটার দিকে। এবারের কণ্ঠস্বর একটু শান্ত, কিন্তু ইস্পাত কঠিন।

'বিবেকের এই দহনটুকু তোমার প্রাপ্য ছিল মিস্টার রোদ্দুর মির্জা। বিধাতা আমাদের সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে পাঠিয়েছেন, দিয়েছেন বোধ আর বিবেক। অথচ অদ্ভুত দেখো, সেই মানুষের হাতেই মানুষ এমনভাবে ক্ষতবিক্ষত হয় যা কল্পনাকেও হার মানায়। শরীরের রক্তপাত হয়তো বন্ধ করা যায়, কিন্তু যখন রুহ বা আত্মার ওপর আঘাত আসে, সেই ক্ষত কোনোদিন শুকোয় না। তুমি কি ভেবেছিলে, কয়েক ফোঁটা নোনা জল ফেললেই দীর্ঘ বছরের সেই দীর্ঘশ্বাসগুলো মুছে যাবে?'

দম টেনে তুলতে এক সেকেন্ডের বিরতি টেনে পুনরায় আক্রোশপ্রসূত হয়ে পড়ে মেয়েটা,

আঙুল তুলে শাসানোর ভঙ্গি করল,

'তোকে বিশ্বাস করাটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে বড় বিলাসিতা, আর সেই ভুলের মাশুল আমি গুনেছি প্রতিটা সেকেন্ডে। যখন যন্ত্রণায় আমি নীল হয়ে যেতাম, যখন নিঃশ্বাস নিতে বুক ফেটে যেত, তখন আমার পাশে একটা ছায়াও ছিল না। শূন্য ঘরে একা দেয়ালের সাথে কথা বলতাম আমি। ভাগ্যিস, দিশা মা সেই সময়টাতে আমার জীবনে দেবদূত হয়ে এসেছিলেন, নইলে আজ এই বিকেলের অস্তিত্বটুকুও মাটির নিচে মিশে থাকত।'

বিকেলের চোখের দৃষ্টি সুদূরে স্থির হয়, যেন সেই ফেলে আসা দিনটা দেখতে পাচ্ছে সে আরও একবার, 'এখনো মনে আছে আমার, যেদিন আমি প্রথম দেশের বাইরে চলে যাই, এয়ারপোর্টের মাটি ছুঁয়ে আমি শপথ করেছিলাম—বিকেলের সেই সত্তাটাকে আমি এই দেশের মাটিতেই দাফন করে যাচ্ছি, যে তোমাকে পাগলের মতো ভালোবাসত। যে তোমাকে নিজের অন্ধ বিশ্বাসের ওপর স্থান দিয়েছিল, যার চোখের পাতায় ছিল তোমাকে নিয়ে হাজারো স্বপ্নের আস্তর। সেই নরম বিকেলের সমাধি নিজের হাতে গড়ে তবেই আমি দেশ ছেড়েছিলাম।'

এরপর সরাসরি রোদ্দুরের চোখে চোখ রেখে বাকি কথাটুকুর সমাপ্তি টানলো সে, 'আজ তোমার সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে রোদ্দুর মির্জা, সে সেই মৃত বিকেল নয় যার কাছে তুমি ক্ষমা ভিক্ষা করতে এসেছ। আজ সেই বিকেল ফিরে এসেছে যে ভুল আর অপরাধের সূক্ষ্ম পার্থক্যটা বুঝতে শিখেছে। ভুল করলে ক্ষমা করা যায়, কিন্তু তুমি যা করেছ তা ছিল জঘন্য অপরাধ। আর অপরাধের কোনো ক্ষমা হয় না। লৌকিকতার খাতিরে কিংবা মনের বিরুদ্ধে গিয়ে আমি অন্তত বলতে পারব না যে তোমাকে আমি মাফ করে দিয়েছি। আমার হৃদয়ের সেই গহীন কোণটা তুমিই কুরে কুরে মেরে ফেলেছিলে। মৃত মানুষের যেমন কোনো আবেগ থাকে না, আমার হৃদপিণ্ডটাও তোমার জন্য আজ ঠিক তেমনই পাষাণ। বুঝেছ?'

'তাহলে কেন এখনো বিয়ে করিসনি?'

ফিসফিস করে শব্দখানি উচ্চারণ করে ছেলেটা, তার কণ্ঠস্বর ভীষণ অসহায় শোনায়। সে যেন খড়কুটো আঁকড়ে ধরা এক ডুবন্ত মানুষ, যে শেষবারের মতো সত্যের মুখোমুখি হতে চায়।

বিকেল স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। সঙ্গে সঙ্গে জবাব দিতে পারল না কোনো,

রোদ্দুর থামল না অবশ্য, বলে চলল বিরতিহীন, 'মানছি আমায় তুই আর ভালোবাসিস না, আমার জন্য তোর হৃদয়ে আর কিচ্ছু অবশিষ্ট নেই। আমিই আমার সেই হাসিখুশি পাগলাটে বিকেলকে নিজের হাতে শেষ করে দিয়েছি—সব মানছি। তুই শুধু একটা প্রশ্নের উত্তর দে, কেন এই আট বছরেও নিজের জীবনে কাউকে জায়গা দিলি না? কার অপেক্ষায় আজও পথ চেয়ে আছিস তুই? জবাব দে বিকেল!'

বিকেল মুহূর্তের জন্য ত্রস্ত হয় এবং পরক্ষণেই গলার দুর্বলতা ঝেড়ে ফেলে দ্বিগুণ কাঠিন্যে গর্জে ওঠে বলে, 'সেটা সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার, তাই নয় কি? আমি কাকে বিয়ে করব, কবে করব, আদৌ করব কি না—এসব কৈফিয়ত কি তোমায় দিতে হবে?'

'কৈফিয়ত নয় রে,' রোদ্দুর ম্লান হাসে, 'আমি শুধু জানতে চেয়েছি। তুই তো আমার কাছে ফিরবি না, আমায় ক্ষমাও করবি না। তাহলে শুধু শুধু একা থাকবি কেন? তুই অনেক সুন্দর একটা জীবন ডিজার্ভ করিস, যেখানে অনেক অনেক ভালোবাসা থাকবে।'

'ওহ! এখন তোমার কাছ থেকে আমাকে জীবনবোধের জ্ঞান নিতে হবে?' বিকেলের ভেতরের আগ্নেয়গিরি ফেটে পড়ল আবারও। রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে হাতের কাছে থাকা চেয়ারটা সজোরে উলটে ফেলে দিল।

চেয়ারটা পড়ার শব্দে ঘরটা কেঁপে উঠতেই রোদ্দুর স্তম্ভিত হয়, তাকিয়ে রইল সম্মুখে, এই রণচণ্ডী মূর্তি কি সত্যিই তার সেই চেনা বিকেল- ভাবল একদণ্ড।

ওদিকে বিকেল চিৎকার করে বলছে, 'আমার জীবনের বারোটা বাজিয়ে দিয়ে এখন জ্ঞান দেওয়া হচ্ছে! কেন বিয়ে করিনি? কারণ, আমি আর কাউকে বিশ্বাসই করতে পারিনি। যাকে ছোটবেলা থেকে চিনতাম, যে সবার চোখে আদর্শ আর বিশুদ্ধ আত্মার মানুষ ছিল—সেই যখন আমায় মাঝদরিয়ায় ভাসিয়ে দিতে দু-মিনিট ভাবেনি, তখন অচেনা কাউকে বিশ্বাস করে ঘর-সংসার পাতা কি অতই সহজ? বিয়েটা কি তোমার কাছে স্রেফ জামাকাপড় বদলানোর মতো কোনো ছেলেখেলা? মনে চাইল একে ধরলাম, মনে চাইল ওকে ধরলাম!'

'বিকেল!' রোদ্দুর বাধা দেওয়ার চেষ্টা করতেই বিকেল ক্ষিপ্ত বাঘিনীর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল তার ওপর। দুই হাতে রোদ্দুরের টুটি চেপে ধরল একদম। চোখ রাঙিয়ে চূড়ান্ত চিৎকারে ফেটে পড়া গলায় গজরে গেল, 'একদম গলা চড়াবি না! তোকে আমি আর এক দণ্ড সহ্য করতে পারছি না। তুই না আমায় ভালোবাসতি? তাহলে আমাদের বিয়ের ব্যাপারটা গোপন রাখলি কেন? কেন সবাইকে বুক ফুলিয়ে জানালি না যে আমি তোর স্ত্রী? ওই ডাইনিটাকে নিয়ে বিদেশে চলে গেলি—ফা★ক ইয়োর ফ্যামিলি অ্যান্ড ইয়োর সিচুয়েশন! তোর নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা কোথায় ছিল তখন? তোর বাপ বলল আমি পিকনিকে মারাতে গেছি আর তুই সেটা বিশ্বাস করে নিলি? তুই জানিস তুই আমাকে কীসের মধ্যে ফেলে গিয়েছিলি?'

বিকেলের হাতের জোর বাড়ছে। রোদ্দুরের দম বন্ধ হওয়ার জোগাড়, তবু সে একটুও ছটফট করল না। বরং চোখ বুজে নিজেকে সঁপে দিল। এই যন্ত্রণার চেয়ে মৃ★ত্যু ঢের ভালো। তিলে তিলে হৃদয়ে ছু★রি চালানোর চেয়ে একবারে গলা টিপে মে★রে ফেলাই শ্রেয়।

কিন্তু সেই আশা পূর্ণ হলো না। বিকেল হঠাৎ ঘৃণাভরে তার গলা ছেড়ে দিয়ে নিজের ওভারকোটে হাত দুটো মুছে নেয়, যেন কোনো ভীষণ নোংরা কিছু স্পর্শ করে ফেলেছে সে। বিকেলের এই তাচ্ছিল্য রোদ্দুরের বুকটা চিরে ফালা ফালা করে দেয়। সে অস্ফুটে আওড়ে, 'তুই আমায় এত ঘৃণা করিস বিকেল?'

বিকেল উত্তর দিল না, তার জ্বলন্ত দৃষ্টিই বলে দেয় - ঘৃণা শব্দটাও বোধহয় এই অনুভূতির কাছে বড্ড ম্লান আজ।

বিকেল আর কোনো কথারই উত্তর দিল না তারপর। শরীরের সমস্ত ভার ছেড়ে দিয়ে পাশের একটা চেয়ারে ধপাস করে বসে পড়ল। এক অমানুষিক ক্লান্তি তাকে গ্রাস করছে। এই মুহূর্তে তার ভীষণ ইচ্ছে করছে ব্যানফ শহরের সেই হাড়কাঁপানো ঠান্ডার মাঝে, ফায়ারপ্লেসের আগুনের পাশে একটা কমফোর্টার গায়ে জড়িয়ে গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে।

রোদ্দুর আহত পশুর মতো বিকেলের পায়ের কাছে মেঝেতে বসে পড়ে। পুনরায় ফিসফিস করে সেই একই আর্তনাদ আওড়ালো, 'তুই আমায় এত ঘৃণা করিস বিকেল?'

বিকেল নিরুত্তর। তার চোখের পাতা বুজে আসছে। এক পৃথিবী সমান ঘুম যেন তার দু-চোখে ভর করেছে। সে চেয়ারের ওপরই পা দুটো তুলে নিয়ে গুটিশুটি মেরে বসল। রোদ্দুর সেসব খেয়াল না করেই আপনমনে বলে চলল তার স্বীকারোক্তি।

'আমি তো ইচ্ছে করে তোকে অবহেলা করিনি রে। ওরা আমার মাথাটাই বিগড়ে দিয়েছিল। আমার কী হয়েছিল আমি নিজেও জানি না। বিশ্বাস কর, আমি সুস্থ ছিলাম না। বাবা-মায়ের সাথেও খারাপ ব্যবহার শুরু করেছিলাম, সবার থেকে দূরে সরে যাচ্ছিলাম। আমি এক অন্য মানুষে পরিণত হয়েছিলাম সেই সময়টায়। তখন যা যা করেছি, তার কোনো ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই। তবুও তোর কাছে সবটা স্বীকার করব। জানি তুই ক্ষমা করবি না, তবুও বলব। কারণ এই অপরাধবোধের বোঝা বয়ে আমি আর বাঁচতে পারছি না...'

বিকেল আদৌও শুনছে কি না বোঝা গেল না, কিন্তু রোদ্দুর একের পর এক উগড়ে দিল তার জীবনের অন্ধকার অধ্যায়গুলো। তৃপ্তির সাথে বিয়ে না হলেও দীর্ঘ প্রবাস জীবনে তার সাথে বারংবার শারীরিক সম্পর্ক, মদ, গাঁজা আর ক্যাসিনোর নেশায় ডুবে যাওয়া—সবই সে বলে গেল। উমেদ মির্জা পড়াশোনার জন্য যে অর্থ রেখেছিলেন, তার একটা বড় অংশ রোদ্দুর উড়িয়েছে জুয়া আর ক্লাবের পেছনে। তারপর কীভাবে সে একদিন হঠাৎ বাড়ি ফিরে তৃপ্তি আর লতা চাচির ভিডিও কনফারেন্স আড়ি পেতে শুনে ফেলেছিল, তাও বলল। সেদিন তৃপ্তি তার মায়ের কাছে অভিযোগ করছিল যে, রোদ্দুর তো তার আঁচলেই বাঁধা থাকার কথা ছিল, কিন্তু সে কেন এখন বহুগামী হয়ে উঠছে? কেন অন্য মেয়েরা তাকে ভোর রাতে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে যায়?

সেইদিন ওই সত্য জানার পরই রোদ্দুর উন্মাদ হয়ে গিয়েছিল। ঘরের আসবাবপত্র ভেঙে চুরমার করে তৃপ্তির গলা চেপে ধরেছিল সে। সব কথা স্বীকার করিয়ে নিয়ে তবেই সে দেশে ফেরে। পরে তার পরিবার অভিজ্ঞ হুজুরের মাধ্যমে রুকাইয়াহ করিয়ে তাকে সেই অন্ধকার থেকে বের করে আনে। সুস্থ হওয়ার পর রোদ্দুর বুঝতে পারে, সে তার জীবনের সবচেয়ে দামী হীরা—তার বিকেলকে হারিয়ে ফেলেছে। ততদিনে বিকেল নিরুদ্দেশ। কেউ জানে না সে কোথায়। সেই থেকে প্রতিটি দিন রোদ্দুর এই অনুশোচনার আগুনে পুড়ে খাক হয়েছে।

রোদ্দুর চোখভর্তি জল নিয়ে ধরা গলায় বলতে থাকে, 'তুই আমায় ক্ষমা করিস না রে, তার চেয়ে বরং মে★রে ফেল। তোকে ছাড়া বাকি জীবনটা বেঁচে থাকার কথা ভাবলেই আমার ভেতরটা চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে যায়।'

কথা শেষ করে রোদ্দুর উঠে দাঁড়ায়। এবং অবাক চোখে তাকিয়ে দেখে, সে এতক্ষণ কাকে এতসব কথা শুনিয়েছে! বিকেল তো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। চেয়ারে গুটিসুটি মেরে একটা ছোট্ট শিশুর মতো নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে মেয়েটা।

রোদ্দুরের বুকের ভেতরটা মায়ায় ভরে ওঠে। তার খুব ইচ্ছে করে, অন্তত একবার পরম মমতায় বিকেলের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে, একটুখানি বিলি কেটে দিতে। কিন্তু সেই অধিকারবোধের আজ তার কতটুকু অবশিষ্ট আছে, তা ভেবে ছেলেটা থমকে দাঁড়িয়ে রইল শিয়রের কাছে।

(চলবে)

_______

ছোট পর্ব বলবেন না কেউ।

আমি নিয়মিত দেওয়ার চেষ্টায় আছি। আরেকটা পর্ব পাবেন আগামীকাল। আচ্ছা, রোদকে আর কয়েকটা মাইর দেওয়ার ব্যবস্থা করলে কেমন হয়? জানিয়ে যাবেন কিন্তু, হ্যাপি রিডিং ❤️

এই পোস্টটা অতি অবশ্যই সবাই পড়বেন, প্লিজ - https://www.facebook.com/share/p/17swLED9tN/

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন