#সে_আমার_মায়াবতি
#লেখনিতে_ঈশা_ইসলাম
#পর্ব_১৭
সকালে ঘুম ঘুম চোখে বুঝতে পারলাম কারো বাহু বন্ধনে আবদ্ধ আছি, কেউ শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শান্তির নিঃশ্বাস নিচ্ছে।সামিয়া আপুও প্রায় রাতে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমায়। তাই আপু ভেবে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ঘুম ঘুম চোখে বললাম -
--- আপু তুমি কখন এলে? এত শক্ত করে কেন জড়িয়ে আছো?( ঘুম ঘুম চোখে)
কিন্তু একি আপুর কোন সাড়া শব্দ না পেয়ে আস্তে আস্তে চোখ মেলে তাকাতেই আমার চোখ ছানাবড়া। ঘুম উবে গিয়েছে। মস্তিস্ক ফাকা ফাকা লাগছে। উনি নিশচিন্তে আমাকে জড়িয়ে ধরে মিটমিট করে হাসছে। ইশ লোকটাকে আমি আজ এত কাছে থেকে দেখছি। একটা লোক এত মারাত্বক কিউট হয় কিভাবে। ভাবনার মাঝেই উনি আমার গালে ঠোট ছুঁয়িয়ে দিলেন। আমি বিস্ফরিত নয়নে তাকাতেই আরও শক্ত করে আমাকে কমোড় জড়িয়ে তার বুকের ওপর টেনে নিয়ে আসলেন। ফের বলতে শুরু করলেন -
--- গুড মরনিং " জান। আমার মিষ্টি পাখি। আজকের পর থেকে এভাবেই আমাকে ঘুম থেকে তুলবে।
--- কি কি করছেন কি! ছাড়ুন আমায়। দে দেখুন আমার হাস- ফাস লাগছে, অসস্তি ফিল হচ্ছে, প্লিজ ছাড়ুন -
---ও সারারাত আমাকে ঘুমতে না দিয়ে এখন বুঝি ছেড়ে দিবো? আগে আমি ঘুমোবো তারপর ছাড়াছাড়ি।
হায় আল্লাহ আমার তো জড়িয়ে ধরার অভ্যাস। তাই বলে মিঃ চৌধুরীকে আমি সাড়ারাত জড়িয়ে ধরে ছিলাম? ছি ছি, ভাবতেই গাল গরম হচ্ছে। আমি আবার কিছু বলার আগে উনি আমার গালে হাত দিয়ে বললেন-
--- ঈশু এটা ঠিক না কিন্তু। দেখো আমি তোমার একটা মাত্র জামাই। কিন্তু তুমি আমাকে উল্টো আদর না করে, এখন দূরে সরিয়ে দিচ্ছো? ( ইনোসেন্ট ফেস করে)
--- মিঃ চৌধুরী অ অনেক বেলা হয়েছে। আর আমি এসবে অভস্ত নই। আমাকে ছাড়ুন, আমি ফ্রেশ হবো।সবাই কি ভা!
---মিসেস চৌধুরী আপনি কি জানেন এই সাম্রাজ্য আর এই মানুষটা পুরো আমি?তাহলে আপাদত আমাকে টাইম দিন। নয়তো রাতে যেটা করেছি এখন তার উল্টোটা করতে বাধ্য হবো।
কি করেছে উনি? আমার সাথে? না না উনি আমাকে জোর করেছে? এসব ভাবনার মাঝেই কান্না করে দিলাম। কাঁদতে কাঁদতে জিজ্ঞাস করলাম -
--- আপ আপনি কি করেছেন রা রাতে? ( কেঁদে উঠে)
--- হেই জান লুক পাখি। বিলিভ মি তুমি যা ভাবছো কিছুই না। আমি তোমার দিকে বাজেভাবে তাকাই না পর্যন্ত, সেখানে তোমাকে ছুবো কিভাবে?
--- তাহলে কি করেছেন আপনি ( চোখ মুছে)
--- জান রিলেক্স। তুমি নেহাত বাচ্চা, এসবের প্রেসার নিয়ো না। আমি জাস্ট তোমার শাড়ি ঠিক করে দিয়েছি। আর জড়িয়ে ধরেছি।
শাড়ি ঠিক করেছে শুনতেই নিজের দিকে তাকিয়ে দেখি, ঠিক ভাবেই সেট করা। উনি হুট করেই আমাকে নিচে শুয়িয়ে দিয়ে আমার ওপর ঝুকে পড়ে। আমি ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললে বাকা হেসে বলে-
---ওপেন ইউর আইস জান। আই সেইড ওপেন।
আমি পিটপিট করে চোখ খুললে ঘরির দিকে ইশারা করে বলে উঠে,
---মাত্র ৬ঃ৫০ বাজে। নতুন বউ বলে ফর্মালিটি করতে হবে হা। জামাই সেবা করলেই হবে। ঈশু আমি যে এত দিন ঘুমতে পারি নি। এখন শান্তির ঘুম দিবো। সো ডোন্ট ডিসটার্ভ।
--- আ আমি ওঠি আপনি ঘুমান দেখুন সবা!
--- আহ আরেকটা সাউন্ড হলে, বাসর আজকেই সারবো।বলে দিলাম। এই আরাভ কিন্তু যা বলে তাই করে ইউ নো মিসেস চৌধুরী।
বলেই গলায় মুখ গুজে শুয়ে পরলেন। আমিও একটা সময় এই লোকটার এত তাড়াতাড়ি এত পরিবর্তন নিয়ে ভাবতে ভাবতে ঘুমিয়ে গেলাম।
সারে দশটার দিকে মিঃ চৌধুরীর ঘুম ভাংলে, আমাকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু দিয়ে উঠে পরে। আমার দিকে তাকাতেই দেখে শাড়ি সরে পেটের অর্ধেক অংশ উন্মুক্ত হয়ে আছে, লোকটা বিরবির করে বলতে শুরু করলো-
--- তুমি কি জানো? মানুষ এর মানসিক শান্তি কিসে? যখন তার পছন্দের মানুষটা তার হয়ে যায়। তুমি আমার মায়াবতি। আমার মানসিক শান্তি৷ এতটুকু আচ আসতে দিবো না আমার জানপাখির ওপর। যে গম্ভির আরাভ হাসতো না সে সারাদিন তোমার কথা ভেবে হাসে। তার কল্পনায় এক নারী জুড়ে থাকে। এতটা পাগল না করলেও পারতে। এখন এই সোন্দর্য দেখিয়ে কি আমাকে মারতে চাও। কিভাবে আমি এই পিচ্চিকে নিয়ে কন্ট্রোল থাকবো শুনি? ঘুমাও জান, তোমার রেস্ট্রের প্রয়োজন।
বলতে বলতে আমার গায়ে চাঁদর দিয়ে দিলেন। নিজে ফ্রেশ হতে গেলেন। ঘরির কাটা ১২ টার ঘরে গেলে আমি চোখ খুলে আবার সেই চিরচেনা ঘরে আবিষ্কার করলাম। হটাৎ করেই মনে পরলো আমি তো নিজের বাড়িতে নেই, আমার তো বিয়ে হয়েছে কাল। এখন সবাই কি ভাববে? তাই উঠে বসে তাড়াতাড়ি বের হতেই খেয়াল করি শাড়ি ঠিক নেই, তাই চাদর দেয়াতে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না। আমি বুঝতে পেরেছি এটা মিঃ চৌধুরীর কাজ, হয়তো চায় না, ঘুম থেকে উঠে আমি লজ্জায় পরি৷ এখন নিচে যেতে হবে ভাবতেই হুট করে দড়জা খুলতেই চমকে উঠি৷ সামনে তাকাতেই দেখলাম মায়া আর সামিয়া আপু। আমার দিকে তাকিয়ে মিটমিটিয়ে হাসছে। নিজের দিকে তাকিয়ে দেখি সব ঠিক আছে তাহলে ওরা এমন হাসছে কেন৷ এর ভিতর মায়া বলে উঠলো--
--- হ্য গো নতুন বউ তোমার কি ম্যনার্স নাই? কোথায় বিয়ের পরের দিন চা নাস্তা বানাবে তা না সারারাত বড়ের আদর সোহাগ পেয়ে বেলা করে ঘুম থেকে উঠছো।( চোখ পাকিয়ে বললো)
আপুও মায়ার কান ধরে বললো-
বেশি পেকেছো তুমি মায়া। আমরা কিন্তু তোমার ভাবি হই।
--- ভাবি পরে ও আগে আমার ফ্রেন্ড হয়। আর আমি তো আগেই বলেছি, জামাই নেই তাই ওকে একটু খোচাচ্ছি।
আমি লজ্জায় এদিক সেদিক তাকালে আপু আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে উঠলো-
--- জানি না কি ভালো কাজ করেছি। আমার বোনটাকে যে আমি সবসময় চাইতাম নিজের কাছে রাখতে, আল্লাহ আমার ডাক শুনেছে।এখন আমার আর টেনশন নেই, আমার পাগলিটা আমার সাথেই আছে। আরাভ ভাইয়াকে এর জন্য থেংস দেয়া তো লাগবেই।
--- হ্যা হ্যা এসব পরে হবে মম তো বকবে এখন ওকে না নিয়ে গেলে। ও কিন্তু কালকে শুধু সুপ খেয়েছে। মম কিন্তু এবার বকবে। চলো ফ্রেশ হয়ে গোসল করে এসো। দুপুর তো হয়ে এলো।
দুপুর শুনতেই খারাপ লাগছে।এতক্ষন ঘুমিয়েছি। কে কি ভেবেছে? আপুর দিকে তাকাতেই দেখলাম একটা ব্লাক জামদানি শাড়ি হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। আমাকে ইশারা করলো পরিয়ে দিবে। আমিও চলে গেলাম সাওয়ারে। শাড়ি ছাড়া সব পরে বের হতেই দেখি মেইড খুব সুন্দর করে ঘর গুছিয়ে দিয়ে গিয়েছে।আপু আর মায়া শাড়ি গহনা নিয়ে মিঃ চৌধুরীর চয়েস সম্পর্কে আলোচনা করছে।সামনে যেতেই মায়া আর আপু মিলে চুল শুকিয়ে ছেড়ে দিয়েছে।শাড়ি পড়িয়ে সোনার বালা,জুয়েলারি পরিয়ে দিলো। কাজল আর হালকা লিপস্টিক দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে দু- জনেই প্রশংসা করলেন। তারপর নিচে যাওয়ার জন্য বের হই।আমি যত নিচে নামছি ততো অবাক হচ্ছি। কারন পুরো বাড়িটা বিশাল, এতো পুরো সামরাজ্য মনে হলো, আসলে এবার বুঝতে পারছি কেন সবাই আপুকে এত ভাগ্যবতি মনে করেছিলো। আসলেই বাড়িটা খুব সুন্দর, চারিদিকে চোখ বুলাতে বুলাতে, নিচে যেতেই দেখি, আনটি সহ আরও অনেক মহিলা। মেইডরা কাজ করছে।বাড়ি সাজানো হচ্ছে।আমি নিচে যেতেই আনটি উঠে এলো। মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে, বলে উঠলেন-
--- মাশাল্লাহ এটা তো পরি দাড়িয়ে আছে। আমার আম্মুটাকে অনেক সুন্দর লাগছে। তুমি অনেকক্ষন না খেয়ে আছো চলো আম্মু --
আমি আমতা আমতা করে বললাম -
--- আসলে আনটি আমি জানি না এত টাইম কিভাবে ঘুমোলাম। সরি আসলে আন্টি!
--- এই যে সেই কখন থেকে কি আন্টি আন্টি করছো শুনি?মা বলবে, তুমি আমার মেয়ে। ওই যে আমার সামিয়া আর তুবাও মেয়ে তাই আমকে মা বলতে হবে।
আমিও মুচকি হেসে বললাম -
---আম্মু, আমি তোমাকে আম্মু বলবো,
--- এই তো আমার মেয়ে। এবার চলো খেতে চলো, আরাভ কিন্তু আমাকে বার বার বলেছে তোমাকে খাওয়াতে,
--- সরি আম্মু, আমি আর
--- আবার এসব বলছো,আর কাল তোমার খাবারেই ঘুমের মেডিসিন ছিলো পাগলি। তাই এত ঘুমিয়েছো। এবার চলো।
আমিও গেলাম খাবার টেবিলে বসার সাথে সাথে এই সেই আইটেম আমাকে দিচ্ছে, কিন্তু আমি এত খাবার খেতেও পারবো না, তাই একটু মুখে নিতেই আপু এসে আমাকে খায়িয়ে দিতে লাগলো।আর মুচকি হেসে বললো-
--- জানিস খুব ভাগ্য আমাদের দুই বোনের। এত সুন্দর মনের মানুষ দের কে পেয়েছি। কত ভালোবাসে বল তো।
বিপরিতে আমিও মুচকি হাসলাম। তারপর আম্মু একে একে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন।সবাই এই সেই গিফট দিলো। সবচেয়ে বেশি অবাক হলাম সবাই কি মিশুক, আমাকে রুপ নিয়ে প্রশংসায় করছে। এটা কি সত্যি। কিন্তু মা, দাদি যে বলে আমাকে ভুত ছাড়া কিছুই লাগে না। ভাবতেই বুক ভারি হয়ে এলো , আচ্ছা ওই বাড়িতে এখন নি অবস্থা। অনেক্ষন বসে বোর হলাম। আপুর দিকে তাকাতেই দেখলাম সেইম অবস্থা। মায়া বুঝতে পেরে আমাদের কে নিয়ে ছাদে গেল। বাড়ির সব ঘুরিয়ে দেখাচ্ছে। আমি কাঠগোলাপ দেখতে পেয়ে থেমে গেলাম।ছিড়তে গিয়ে থেমে গেলাম। যদি বকা খাই।
চোখ সরিয়ে সামনে তাকাতেই দেখলাম এই সাইড ফাকা। আচ্ছা ওরা গেলো কই? চারিদিকে তাকাতেই দেখলাম, সব দিকেই রাস্তা আমি কোথায় খুজবো ওদের? ভাবতে ভাবতে সামনে এগিয়ে গেলাম৷ আরেক পা এগোতেই কেউ হেচকা টানে দেয়ালে চেপে ধরলেন, আমি ভয় পেয়ে চোখ বন্ধ করে, হালকা চেচিয়ে উঠলাম-
--- আহ জানপাখি গো, আমি তোমার জামাই। কেন ভয় পাচ্ছো? এই বাড়ি কেন এই পৃথিবিতে আমি ছাড়া আমার জানকে এমন হুটহাট করে করে কেউ ধরার সাহস আছে কি?
--- আপনি। আপনি সব সময় এমন করেন কেন? ( জোড়ে শ্বাস নিয়ে)
--- ইশ এত সুন্দর কেন তুমি। তুমি কি জানো? এই কাজ পাগল ছেলেটা কাজ বাদ দিয়ে সারাটা সময় ধরে বউ কে চোখে হারায়। আমার পিচ্চি পরি, তুমি সম্পুর্ণা আমার।
আমি নিশপলক তাকিয়ে আছি৷ এই কি সেই লোকের মুখে শোনা হিংস্র আরাভ? নাকি অন্য কেউ?উনি হুট করেই আমার কানে সেই কাঁঠগোলাপ দিয়ে দিলেন। আমি মুগ্ধ দৃষ্টিতে দেখছি ওনাকে, কি আছে মিঃ চৌধুরীর মাঝে যা আমাকে মোহিত করে। আমার মনের কথা, আমার পছন্দের জিনিস্টার খবর ও সে রাখে।
--- আমার মায়াবতি, কাঁঠগোলাপ কি জানে সে যেমন আছে তাতেই আমি শেষ আর এখন সে এই কাঁঠগোলাপ যে তার স্পর্শে মুগ্ধ। মায়াবতি তুমি শুধু আমার। খুব শিগ্রই সে সম্পুর্নরুপে আমার হবে।
আমি ওনার কথায় লজ্জায় মাথা নিচু করে ভাবছি,
--- এই মানুষটা কি সত্যি আমার, সত্যি কি আপুর বলা কথা আজ সঠিক হচ্ছে। যে আমাকে আগলে রাখবে।
( রিচেক হয় নি। ভুলত্রুটি হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন।)