#সে_আমার_মায়াবতী
#লেখনিতে_ঈশা_ইসলাম
#পর্ব_৩৩
সব কিছু শুনে শুধু আমি না বাকিরাও বিমূর হয়ে তাকিয়ে রইলো। আন্টি যে আমার মা সে আমার সামনে এসে গালে হাত দিয়ে বললো-
-- সেদিন যদি বায়না ধরে মেলায় না যেতাম তাহলে আজ আমার মেয়েটা আমার কাছেই থাকতো। মনে আছে পরির বাবা আমি ওকে প্রথম দেখেই বলেছি এ আমার মেয়ে পরি। ( আম্মু)
-- হ্যাঁ মায়ের মন তো ঠিক চিনেছো। জানো আরাভ শেলিনা বার বার আমার পরির কথা বলতো। ( আব্বু)
-- আমার মিষ্টি পরি ভাই তোকে কতটা ভালোবাসি জানিস? তোর মনে আছে আমি তোর জন্য চকলেট না এনে দিলে মুখ ফুলিয়ে থাকতি। তোর পুতুল গুলো আমাকে ছাড়া কাওকেই ছুঁতে দিতি না। আমি কিন্তু আজও তোর পুতুল কাওকে ছুঁতে দেই না। নিজের হাতে তোর রুম সাজিয়ে রেখেছি। আমার বিশ্বাস ছিলো আমার পরি আসবে। ( ফারাজ)
সবার চোখে পানি। মিঃ চৌধুরী আমার এক হাত জড়িয়ে এবার প্রেসের সামনে গিয়ে আবার বললো -
-- আই হোপ সবাই আমার ওয়াইফ এর পরিচয় পেয়েছেন? সে কোন পরিচয়হীন মেয়ে না। যথেষ্ঠ সমভ্রাম্ত পরিবারের মেয়ে। আর আজকে যদি সে নিজের পরিচয় নাও পেতো তাহলে তার জন্য বরাদ্ধকৃত ভালোবাসা এতটুকু কমতো না। আমার ঈশুপাখি যেমন আমি তেমনি তাকে ভালোবাসি।( মিঃ চৌধুরী)
ওনার কথায় রীতিমত সবাই অবাক হলেও আমি অবাক হলাম না। জানি এই মানুষটাই আমার ভরসার স্থান। আমার আস্থা আমার ভালোবাসা। এবার আমি আম্মুর দিকে তাকাতেই দেখলাম তার চোখে পানি গড়িয়ে পরছে। আজ প্রথম আমি এই কঠোর মানুষটাকে কাদঁতে দেখছি। আম্মুর সামনে গিয়ে দাড়াতেই আম্মু আমাকে জড়িয়ে হাউমাউ করে কেঁদে উঠে-
-- আমাকে তুই ক্ষমা করে দে মা। আমি যে তোর প্রতি এত অন্যায় করেছি তার কোন ক্ষমা হয় না জানি। যেই মেয়ের জন্য আমি তোকে অবহেলা করলাম, সেই মেয়ে আমার মুখ পুড়িয়েছে। কিন্তু তুই এত ভালোবাসার পরেও তোকে কাছে টেনে নেই নি। আমাকে ক্ষমা করে দে মা। (আম্মু)
আম্মু কান্না করে কথাগুলো বলতেই আমি চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বললাম-
-- কি বলছো আম্মু তুমি। তুমি আমার আম্মু ছিলে আর থাকবেও। হ্যাঁ এখন আমি আমার আসল বাবা মা কে পেয়েছি কিন্তু তাই বলে কি আমার এই আম্মু কে ভুলে যাবো নাকি। তুমি কেদোঁ না আম্মু। ( আমি)
আমার কথায় আম্মু মুচকি হেসে জড়িয়ে ধরলো। দাঁড়িয়ে আমার আসল মা আর শাশুরি আম্মুর সামনে গিয়ে তিনজনের হাত আমার হাতে নিয়ে বললাম -
-- চৌধুরি সাহেব দেখেছেন আমার তিনটে আম্মু। তোমরা দেখেছো আজ থেকে আমার ভালোবাসা তিনগুন বেড়ে গেলো। ( আমি)
-- হ্যাঁ পাখি এবার আমাকে মনে রাখলেই হয় তোমার।( মিঃ চৌধুরী)
-- আপনি আবার? ( আমি)
আমার কথায় সবাই হেসে দিলে। শশুর আব্বু সবাইকে কেক কাটিং এর জন্য এনাউন্স করে। একে একে সবাই এলে আমিও কেক কাটতে যাই। কিন্তু রাইসা কে এক কোনায় দেখে ওর সামনে দাঁড়াই। আমাকে দেখে রাইসা নিচু তাকালে ওর হাত ধরে কেকের কাছে নিয়ে আসি।
-- সবাই এখানে তুই ওইখানে কি করছিস? চল একসাথে কেক কাটি। ( আমি)
আমি খেয়াল করলাম রাইসার চোখে অশ্রুকনা ভির করেছে তাই ওর একহাত জড়িয়ে মিঃ চৌধুরীর দিকে ইশারা করতে উনি হ্যাঁ বোধক মাথা নাড়ে। ওনাকেও টেনে এনে কেক কাটি। আজকের দিনটা আমার জিবনের শ্রেষ্ঠ দিন। সব ভালোবাসারা আমাকে ডেকে নিচ্ছে তাদের কাছে। কি নেই আমার কাছে। তিন তিনটে মা আছে, বাবা আছে। পুরো পরিবার আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যা আছে সে হচ্ছে আমার স্বামী। আমার ভালোবাসার মানুষ। কেক কেটে সর্বপ্রথম আমি মিঃ চৌধুরীর মুখে ধরি। উনি আম্মু আব্বু কে দেখিয়ে দিলে আমি হেসে বলি-
-- আপনার মতো স্বামী প্রতিটা মেয়ে ডিসার্ভ করে। যে তার স্ত্রী কে সিমানাহীন ভালোবেসে মুড়িয়ে রাখে। আপনি আমার অতিত বর্তমান না যেনেই আমাকে বুকে ঠাই দিয়েছে। কখনো এক ফোটা অশ্রু বের হতে দেন নি। আপনি আপনার কথা রেখেছেন মিঃ চৌধুরী। আজকে আপনার জন্যই এই আমি সব পেয়েছি।(আমি)
-- তুমি আমার এক আকাশ সমান অধিকার। আমার অতল সমুদ্রের ভালোবাসা। তাকে খুশি করা তো আমার দায়িত্ব। আজকের পর তুমি সবসময় এভাবেই লিড করবে জান। ( মিঃ চৌধুরী)
উনি মুচকি হেসে কথাটা বলে উঠতেই কড়তালির আওয়াজে পুরো চৌধুরি বাড়ি ধ্বনি তুললো। উনি হুট করেই হাটু গেড়ে বসে পরলেন। হাত থেকে ডায়মন্ড রিং বের করে সবার সামনে আমার হাত টেনে পরিয়ে দিলেন। আমার ইচ্ছে করছিলো মানুষটার বুকে মিশে যেতে কিন্তু বড়রা ছিলো বিধায় পারি নি। উনি হয়তো আমার মনের কথা শুনতে পেয়েছেন তাই উঠে সবার সামনেই আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বললেন-
-- আমি তোমার জান। যখন ইচ্ছে জড়িয়ে ধরবে, চুমু খাবে কে বারন করেছে। এত হেজিটেড এর কি আছে পাখি।(মিঃ চৌধুরি)
-- অসভ্য লোক মানুষ আছে। কি করছেন ছাড়ুন। ( আমি)
উনি ছেড়ে দিলেও পুরোপুরি ছাড়লেন না। আমার বাহু আকড়ে রইলেন। একে একে সবাইকে কেক খাওয়ানোর পালা শেষ হলো। যে যার মতো ইনজয় করছে। সিড়ির দিকে চোখ পরতেই দেখি, তুবা কে জোড় করে কেক খায়িয়ে দিচ্ছে তুহিন ভাইয়া। বেচারি মনে হয় রেগে ছিলো ঠোঁট ফুলিয়ে কিছু বলার আগেই তুহিন ভাইয়া কিছু একটা বললো। মিউজিকের সাউন্ড এ শুনতে না পেলেও এতটুকু বুঝেছি আমার চৌধুরি সাহেবের মতোই অসভ্য মার্কা কথা বলেছে নয়তো তুবা এখন এমন লাল নীল হতো না। একদল ফ্যমিলি দেখছি যারা জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছে। আজ বাড়ির প্রতিটা সদস্যের মুখে প্রশান্তির হাসি। আপুকে ভাইয়া এখনোও জোড় করে ফল খাওয়াচ্ছে। আপু কপাল চাপড়াচ্ছে আর বিরবির করছে। মায়া আর আবির ভাইয়া কি সুন্দর লুকিয়ে প্রেম করছে।অবশ্য সামনেই ওদের এনগেজমেন্ট তবুও ওদের মতে বিয়ের আগে প্রেম করার মজাই আলাদা। সবাইকে পরোখ করার চোখ যায় মিঃ চৌধুরীর দিকে। উনি চোখ ছোট ছোট করে বুকে হাত গুজে বললেন -
-- শেষ? দেখা হয়েছে? নাকি আরও বাকি আছে? সবার দিকেই নজর খালি আমি ছাড়া। ( মিঃ চৌধুরী)
উনি বাচ্চা বাচ্চা ফেইস এ কথাটা বলতেই আমি খিলখিলিয়ে হেসে দিলাম।
ওনার মুখের সামনে গিয়ে হালকা গাল টেনে দিলাম।
উনি অবাক হয়ে বললো-
-- এই তুমি আমাকে নকল করছো? নট ব্যড জান। ( মিঃ চৌধুরী)
দু-জনেই হেসে দিলাম। তারপর খাওয়ার পর্ব এলে সবাই ডিনার করতে বসে। আমি খেতে খেতে পেট ফুল হয়ে গিয়েছে কারন তিন আম্মু, আর সাথে মিঃ চৌধুরী তো আছেই। যত যত বারন করছি বেশি করে গেলাচ্ছে। ফেলতেও পারছি না তাই খেতে হচ্ছে। অসহায় চোখে মিঃ চৌধুরীর দিকে তাকাতেই বলে উঠে -
-- নো জান আগে খাও। তোমার কোন বাহানা চলবে না। ওয়েট কতো জানো৷ এখন মুখ ফুলিয়েও কোন লাভ হবে না। ফিনিশ ইট। (মিঃ চৌধুরি)
-- যখন প্রথম এ বাড়িতে এসেছি। পরির প্রতি আরাভ এর নেয়া যত্ন গুলো দেখতাম, মনে মনে খুব ইচ্ছা হতো তখন যদি আমার পরি থাকতো আরাভের সাথেই বিয়ে দিতাম। কার কপালে এমন ভাগ্য থাকে স্বামীর এত আদর যত্ন পাওয়ার। আজ ঠিক আমার মনের ইচ্ছা পূরন হয়েছে। সেই আরাভের বউ হয়েছে আমার মেয়েটাই। ( আম্মু)
আম্মুর বলা কথায় সবাই সায় জানালেও এই মানুষটার প্রতি আরো ভালোবাসা বেড়ে গেলো আমার। সত্যি তো কয়জন মেয়ের ভাগ্যে এমব বড় জোটে। আমি সত্যি অনেক লাকি। যে কাওকে পরোয়া করে না তার ভালোবাসায়।
-----------------------------------------------------------
সময় বহমান কারো জন্যই অপেক্ষা করে না। তেমনি আরও চারটে মাস আমাদের জিবন থেকে সুখে আনন্দে চলে গেলো। এই ক-মাসে উনি আমাকে কোন দিন একা ছাড়ে নি। ভার্সিটিতেও নিজে নিয়ে যেতো। মানুষটাকে মুখ ফুটে কিছু বলা লাগে না। সব কিছুই বুঝে যায়। কথায় কথায় তো তার রোমেন্টিক অত্যাচার আছেই। আপুর সাড়ে চার মাস চলছে। আজ আপুর সাধের অনুষ্ঠানের সাথে আবির ভাইয়া আর মায়ার এনগেজমেন্ট। এক সপ্তাহ পরেই ওদের বিয়ের ডেইট দেয়া হয়েছে। তুবা আর তুহিন ভাইয়ার ও ছোটখাটো ভাবে এনগেজমেন্ট করিয়েছেন। ভাইয়া একটা বিসনেস ট্রিপ এ যাবে তাই তার পরেই ওদের বিয়ে দেয়া হবে। উকিঝুঁকি দিতেই দেখলাম উনি খুব মনোযোগ দিয়ে ল্যপটপে কাজ করছে। তাই ওনাকে একটু বিরক্ত করার জন্য সামনে গিয়ে ঠাস করে ল্যপটপ অফ করে হুট করেই ওনার কোলে চড়ে বসলাম। ওনার গলা জড়িয়ে
ধরলে আমার কোমড় ধরে টেনে নিয়ে এলেন। চুলে হাত বুলিয়ে বললেন-
-- কি হয়েছে জান। কিছু লাগবে? মন খারাপ? ( মিঃ চৌধুরী)
-- হুম আপনাকে লাগবে। আপনি এখন আর আমাকে এতটুকু টাইম দিচ্ছেন না। সারাদিন ল্যপটপে কি?
-- ওহহ আচ্ছা তাই? আমি তো কাজ করছি পাখি। আজ তো অফিস জাবো না তাই কিছু কাজ যেন ডিউ না থাকে তাই করে রাখছি। তো বলুন ম্যডাম আপনি এত সোহাগ করছেন কেন? ( মিঃ চৌধুরী)
-- ওহহ তাই আর নিজে যে আমাকে সারাদিন জ্বালাতন করেন তার বেলায়। ঠিক আছে আর আসবো না আমি থাকুন আপনি। ( আমি)
অভিমান করে কথাটা বলতেই উনি আরেকটু কাছে টেনে নিলেন। গালে নাক ঘষে বললেন-
-- এত অভিমান এত। সামান্য সময় দেই নি তাতে এত অভিমান। আর যখন তুমি সারাদিন মায়া, আর এনার সাথে বসে থাকো এই বেচারা আমি যে তোমাকে মিস করি সেটা তো বোঝ না। ( মিঃ চৌধুরী)
-- ওহহ তাই আপনি রিভেঞ্জ নিবেন। সেটাই আ!! ( আমি)
আমাকে আর কিছু না বলেই উনি জড়িয়ে ধরলেন। চুমুর বর্ষন একের পর এক দিতেই থাকেন। মুখ বুঝে সহ্য করছি ওনার পাগলামি গুলো। মানুষটা কি পরিমান পাগল
হলে এমন করতে পারে সেটাই ভাবছি। নিবিড় ভাবে জড়িয়ে গেলাম মানুষটার বুকে। উনিও হেসে আমাকে বুকে আগলে নিলেন।
#চলবে____________
নতুন গল্পের থিম শুধু মাথায় ঘুরঘুর করছে৷গল্পটা বেশি নেই। আর মাত্র ২ পর্বে শেষ করে দিবো। ভুলত্রুটি ক্ষমা করবেন। হ্যপি রিডিং।