ফন্ট সাইজ:
থিম:
তবু রবে চিরকাল

১ম পর্ব

লেখক: সামিয়া আফনান

ফেসবুকে “শুভ বিবাহবার্ষিকী” লেখা একটা 'মেমোরি' আসলো ঘুরে ফিরে একবছর বাদে। ছবিতে সে এবং তার স্বামী। সামনে কেক! দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে আছে। তা দেখে মুখে হাসি ফুটলো সুনীধির। এই হাসি হঠাৎ মিলিয়ে গেল। যেভাবে মিলিয়ে যায় আকাশের মেঘ।

অফিস টাইম বহু আগেই শেষ। কিছু কাজ গোছাতে গিয়ে এতো দেরি হয়ে যাবে সে ভাবতে পারেনি। অবশ্য অফিসের সব বাতিগুলোই এখনও জ্বলছে। এমন সবসময় দেখা যায়না। দশটা বাজলেই মানুষশুণ্য অফিসের সব বাতিগুলো নিভে যায়। তবে আজ বাহিরে এতো হইচই, হাসাহাসির শব্দ শোনা যাচ্ছে তার কারণ একটাই। আজকে সিইওর জন্মদিন। এই দিনটায় একমাত্র কাঠখোট্টা সিইওর খুবই ভিন্ন এক রুপ দেখা যায়। আহামরি তেমন কিছুই না, সে কেবল যা যা এই অফিসে এলাউড না তার প্রায় সব করারই অনুমতি দিয়ে দেন। আর এতে প্রায় সব এমপ্লয়িই লাই পায়। কোমল পানীয় থেকে নিষিদ্ধ পানীয় সবই আনা হয়। কেউ ধরে দেখে কীনা তা সুনীধির জানা নেই। সে থাকে নিজের দুনিয়ায়।

শাড়ি পড়া ধরেছে অনেক বছর। সুন্দর করে শাড়ি পড়তে তার ভালো লাগে। বাসার সবাই নাক কুচকায়। এতো রঙ বেরঙের শাড়ি পড়ার মানে কি? তার জীবনে এতো রঙ কেন। এতে তার বিন্দুমাত্র কিছু যায়ও না আসেও না। শাড়ি তার ব্যক্তিগত মানুষটার পছন্দ। তার নিজেরও পছন্দ। সুন্দর আটসাট করে নিউজ প্রেজেন্টারদের মতো শাড়ি পড়তে সে ভালোবাসে।

আবিদ, অর্ণব ওরা সবাই জোড়াজুড়ি করলো সুনীধিকে থাকার জন্য। মেয়েদের সাথে নাহয় চলে যাবে পরবর্তীতে যদি ছেলেদের রাইড পছন্দ না হয়। অবশ্য মেয়ে এমপ্লয়ি কারো মধ্যেই সুনীধিকে নিয়ে কোনো মাথাব্যথা দেখা গেল না। তারা ব্যস্ত নিজেদের মতো ইঞ্জয় করতে। বসে বসে দুনিয়ার ফাস্টফুড আর ক্যানের কোক খেয়ে নারী পুরুষ না দেখেই হেলেঢুলে পড়াকে আবার কোন ধরনের ইঞ্জয় করা বলে? যারা জোর করছিল তাদেরকে সুন্দর করে প্রত্যাখান করে বেরিয়ে গেল। তার যাওয়ার পানে ক্যানে এক সিপ টেনে তাকালো স্বাধীন।

বাহিরে এসে দাঁড়ালো রিকশার অপেক্ষায়। এখান থেকে বাসার দূরুত্ব তেমন একটা না। তবে এখন অনেক রাত। রিকশা নেওয়াকেই সেফ অপশন হিসেবে বেছে নিল। সে বেছে নিলেও ভাগ্য তো আর বেছে নিলনা। কোনো রিকশাই আশেপাশে নেই। রাত বারোটায় অবশ্য রিকশার আনাগোনা এ সাইডে কমই থাকে। রিকশার অপেক্ষায় থাকা সুনীধির পাশে দীর্ঘদেহী কারো উপস্থিতি পেতেই সে ঘুরে তাকালো। দেখল স্বাধীন দাঁড়িয়ে আছে এক হাত পকেটে গুজে অন্যহাতে কোকের ক্যান নিয়ে। পকেটে থাকা হাত বের করে 'হাই' দিল তাকে।

সুনীধি মুখেই 'হাই' বলল। এই লোকের বয়স ত্রিশের বেশি তো হবেই। এতো কম বয়সে একটা অফিসের সিইও হয়েও সারাবছর থাকে সর্বদা পাঞ্চুয়াল আর কর্মনিষ্ঠ। কিন্তু এই এক দিনই কেমন ব্যতিক্রম দেখায় লোকটাকে। সে বুঝে পায়না, এই বয়সে এসেও বাচ্চাদের ন্যায় জন্মদিনের জন্য এতো কাহিনী করার কি আছে? তবে দু বছর যাবত এইসবই দেখে আসায় এখন আর আহামরি কিছু লাগেনা। সবার মতো তার কাছেও স্বাভাবিক। শুধু সে স্বাভাবিকতায় নিজেকে ঠেলে দেয়না। দূরে দূরেই থাকে।

স্বাধীন হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “ফিরে যাচ্ছেন কেন এতো তাড়াতাড়ি?”

সুনীধি স্বাভাবিকভাবেই জবাব দিল, “ফেরার তাড়া আছে তাই।”

“আরেকটু থাকা যেত না? কেক কাটার সময়ও উপস্থিত ছিলেন না।”

সুনীধি অবশ্য কোনো বারই থাকে না। এবার নতুন করে জিজ্ঞেস করার কি হলো কে জানে। সে তবুও হালকা হেসে বলল, “সময় নেই। ফেরার সত্যিই তাড়া আছে। তাছাড়া এসবে কিছুটা অস্বস্তিবোধ করি আমি। কিছু মনে করবেন না।”

“কেক টেস্ট করা যেতো।”

“আমি সুগার খাইনা। ধন্যবাদ। ”

স্বাধীন ক্যানে সিপ দিল আরেকটা। দিতে দিতে মাথা নাড়লো। সে কিছুই মনে করেনি। দুবছর ধরে তো দেখেই আসছে। ক্যানটাকে হাত দিয়ে চেপে চ্যাপ্টা করে পাশে থাকা বিনে ফেলে বলল, “এগিয়ে দিয়ে আসবো? রিকশা তো দেখা যাচ্ছে না।”

অদূর হতে টিংটিং শব্দ তুলে একটা খালি রিকশা এলো। স্বাধীন ঘাড়ে হাত রেখে দেখল কিভাবে রিকশা ডেকে সেই রিকশায় উঠে বসল সুনীধি। ভাগ্য খারাপ হলে যা হয় আরকি। একের সাথে এক ফ্রি। এইযে উঠার আগে মেয়েটা ফোনে সময় দেখল বোধহয়। স্ক্রিনে তখন দেখা গেল কিভাবে একটা পুরুষের গলা আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে তার গালে চুমু খাচ্ছে সুনীধি।

সে রিকশায় উঠতেই লোকটাকে ঠিকানা বলল। আর তখন স্বাধীন শুনলো একটা পেস্ট্রিশপের নাম। রিকশার চাকা ঘোরা শুরু হওয়ার আগে সুনীধি স্বাধীনের দিকে তাকিয়ে হাসলো। হেসেই বলল, “ধন্যবাদ! সাহায্য করতে চাওয়ার জন্য। ইট মিন্স আ লট।”

স্বাধীনও চোখে মুখে হাসলো। রিকশা মিলিয়ে গেল তবে মিলিয়ে গেল না তার হাসি। পকেট থেকে সিগারেট বের করে ঠোঁটে চাপার আগে ঠোঁট বাকিয়ে হেসে বিড়বিড় করল, “আমি সুগার খাইনা! লায়ার ওম্যান।”

-

দ্বিতীয়বারের মতো আইএসএসবি-তে রেড কার্ড পেয়ে বর্তমানে মাঠে পা ভাজ করে বসে আছে সুনীধি। ভীষণ রোদ। তবে তার মন খারাপকে এই রোদও যেন ছুতে পারছে না। হতাশার নিশ্বাস ভেতর থেকে ঠেলেঠুলে বের হয়ে আসতে চাইছে। হঠাৎ কেউ পাশে বসে নিজের হাতে সুনিধীর লম্বা চুলের লম্বা বেনি পেঁচিয়ে নিল। শক্তপোক্ত হাতে নিজের চুল পেঁচিয়ে থাকতে দেখে সে মানুষটার দিকে না তাকিয়েই বলল,

“এগুলো আমার চুল তানজীম। কোনো গরু বেঁধে রাখার দড়ি না।”

“কিন্তু তানজীম গরু শুধু এই দড়িতেই বাঁধে।”

সুনীধি মুখ ঘুড়িয়ে দেখল তার বেনি তানজীম তার গলায় পেঁচিয়েছে। তা দেখে ঠোঁট টিপে হাসলো সে। তার হাসি দেখে এবার হাতে থাকা শুকিয়ে আসা সাদা গোলাপগুচ্ছ বাড়িয়ে দিয়ে তানজীম সোজা হয়ে বসে জিজ্ঞেস করল, “মন খারাপ?”

“হওয়া স্বাভাবিক না?” ফুল হাতে নিয়ে জবাব দিল সুনীধি।

তানজীম আকাশের দিকে তাকাতে চাইলো তবে রোদের চোটে চোখ মুখ তার সহসা কুঁচকে গেল। কুঁচকে থাকা মুখেই বেশ স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,

“ইটস ওকে। জীবনে কত কিছুই তো হয়।”

“কিন্তু আমার হয়নি। অবশ্য তোমার কি? তুমি তো প্রথম বারেই সিলেক্টেড। তুমি কি করে বুঝবে আমার কষ্ট?”

তানজীম সুনীধির মুখের দিকে চাইল। সম্পর্ক সেই তাদের ক্লাস টেইন থেকে। ভাইব ম্যাচ করার মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের ভীষণ মিল ছিল, এখনো আছে। সেই থেকেই শুরু। একই স্কুল, একই কলেজ। সুনীধির একই কলেজ হওয়া থেকে একটা কথা মনে পড়ে গেল। মন পড়তেই শেষ বলা কথাটুকু বলে যেন এখন অনেক আফসোস হলো।

তাদের সম্পর্কে কোনো কালেই লুতুপুতু ব্যপারটা ছিলনা, ছিলনা দুজন দুজনের থেকে বাড়তি এক্সপেক্টেশন। ওইযে শুধু ভাইব মিলত। কলেজ সিলেকশন একটা ভয়াবহ কাজ। মনে হবে, দুইবছরই তো। এ আবার তেমন কি। অথচ এই দুই বছর বাদেই যে ঘোরতর কিছু খাতা কলমের পরীক্ষা সম্মুখীন হওয়া লাগে। যদি এই দুইটা বছর উনিশ বিশ হয় তবে পরীক্ষা দিতেই বসা মুশকিল হয়ে যায় কোথাও কোথাও। দুইজনের একই কলেজে হওয়ার চান্স একদম নাই নাই। কেননা, প্রত্যেক ছেলেদের বাবা মায়ের স্বপ্ন বোধহয় থাকে তাদের ছেলে দেশসেরা কলেজে চান্স পাক। তানজীমের ক্ষেত্রে বিপরীত হয়নি। কিন্তু অবাক হয়ে একদিন জানতে পারলো তানজীমের মতো ছাত্র চান্স পেলনা। তার বিশ্বাস হলোনা মোটেও। তাই একদিন সরাসরি তানজীমকে জিজ্ঞেস করল। সে বড়ই উদাসীনতা নিয়ে উত্তর দিল,

“এখান থেকে হাফের বেশি স্টুডেন্ট বের হয় ইঞ্জিনিয়ার হয়ে। আমার এসব ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার শখ নেই। আমি তো উড়তে চাই, পাখির মতো এই বৃহৎ বহুরুপী আকাশে।”

আসলেই তানজীমের লক্ষ্য ওইটাই ছিল কিন্তু কেন যেন মনে হলো ছেলেটা তার পিছু ছাড়তে চাইছে না। হলোও তাই। শাহীনের ওরিয়েন্টেশনের দিনে সুনীধি হেসে বলেছিল,

“সব বুঝি তানজীম বাবু! পিছু না ছাড়ার বাহানা যত্তসব। রেসিন্ডেসিয়ালেও যেতে পারতে। গেলে না। এলে আমার পিছু পিছু। সব বুঝি।”

নিজের দিকে আঙুল তাক করে তানজীম বলেছিল,“বুঝলে এবার এই অধমকে নিয়ে বসে থাকো।”

সে কথা মনে পড়তেই দীর্ঘশ্বাস ফেলল। জীবনেও শুনেনি তানজীম সেখানে পড়তে চায়না। হঠাৎই শুনেছিল আর শুনে কষ্টও লেগেছিল ভীষণ। সবার কষ্ট তো আর এক হবেনা। আইএসএসবি সুনীধির কাছে ছিল একটা স্বপ্ন। নিজের নামের পাশে ল্যাফটেন্যান্ট ট্যাগ দেখার স্বপ্ন। এতো পরিশ্রমের পর আজ সবই অধরা। সে তানজীমের দিকে চেয়ে ঠোঁট উলটে বলল, “বিয়ে করে ফেলি তানজীম। ভালো ছেলে খুজে দাও তো।”

তানজীমের চোখে মুখে অসন্তুষ্টি ফুটে উঠলো। সে জানে মেয়েটা তাকে ইচ্ছে করে জ্বালায়। এমন জ্বলন কার ভালো লাগে? সে রাশভারি কণ্ঠে বলল, “খুজে দিব। আর পাঁচটা বছর অপেক্ষা করো।”

“পাঁচবছর? বুড়ি হয়ে যাবো তো।”

সুনীধির কুঁচকে আসা ভ্রু দুই আঙুল দিয়ে টেনে সোজা করতে করতে মিচকে হেসে বলল, “এই বুড়ি নীধিকে এই তানজীম বিয়ে করবে। ততদিন নো বিয়ে। সিঙ্গেল লাইফের মজা নাও নীধিজান।”

বিয়ে নিয়ে সুনীধি ভাবে আর কই? সে রেডকার্ডের দুঃখেই যত উল্টাপাল্টা বলছে। তবে এই ছেলের প্রথমবারেই হয়ে গিয়েছিল। সেদিন নিজের দুঃখ ভুলে ছেলেটার গলা ধরে ঝুলেছিল। এতো খুশি সে কোনো কালেই যে হয়নি।বারবার মুখের সামনে মুখ নিয়ে চোখে মুখে অবিশ্বাস নিয়ে জিজ্ঞেস করছিল, “এই জীম? তোমার আসলেই গ্রিন কার্ড এসেছে? আসলেই?”

দীর্ঘক্ষণ হতবুদ্ধির ন্যায় এই মেয়েকে নিয়ে গলায় ঝুলতে ঝুলতে একসময় বিরক্ত হয়ে সুনীধিকে বলেছিল, “নিজের রেড কার্ডের শোকে আমাকে মেরে ফেলছো। আসো এক্সচেঞ্জ করি।”

সেই দুইবার পাওয়া রেডকার্ডের শোক ঘুচিয়ে প্রাইভেটে ভর্তি হয়ে গেল সুনীধি। আর তানজীম? সে সিপিএসএস দিল। সেখানেও পাস করলো। সুনীধি সেদিন চুমু দিয়ে দিয়ে তানজীমের গাল ব্যথা বানিয়ে ফেলল। এই মেয়ে তার সবকিছুতে এতো খুশি হয় কি করে তা ভেবে কুলাতে পারতো না।

সবশেষে সুনীধি ভীষণ খুশি হলেও তার ভেতরটা অজানা কারণে পুড়তো। এই দহন কাউকে দেখানোর মতো না, জানানোর মতো না। এমনকি যার জন্য এতো চাপা কষ্ট তাকেও জানানো মানা যেন। দুজনের জীবন আলাদা হয়ে যাচ্ছে। আলাদা হচ্ছে তাদের চিন্তাভাবনা আর জীবনযাপন। সুনীধি সেটাই মনে মনে কখনো চাইতো না। যেই ভাইব ম্যাচ থেকে সব শুরু সেটাই যদি না থাকে তখন কি করবে? সে পাগলাটে কিশোরী প্রেমিকাদের ন্যায় না তবে তানজীম ব্যতীত তার জীবনে রঙ থেকেও যেন ফ্যাকাশে।

কথাবার্তা কমে এলো। তার জীবন হাজারো পরীক্ষা, ল্যাব, এসাইনমেন্টের জাতাকলে পড়ে গেল। অন্যদিকে তানজীম কেমন জীবন কাটাতো তা আর তার অজানাই রয়ে গেল। তানজীমও জানতে পারতো না, সুনীধির জীবন এখন অনেক পাল্টেছে। এখন তার অনেক বন্ধুবান্ধব। ছেলে হোক কিংবা মেয়ে। তারা সপ্তাহে একদিন হলেও আভিজাত্যপূর্ণ রেসুরেন্টে খেতে যায়। বিল দেয় ভাগাভাগি করে। এতো কিছুর মাঝেও সুনীধির মনে হতো কিছু একটা নেই, কেউ একটা নেই। কেউ এসে হুটহাট নিজের পেশীবহুল হাতে তার ইয়া লম্বা চুল পেঁচিয়ে ধরে না। কেউ সময়ের পর সময় ঘোরলাগা দৃষ্টিতে তার নাকের নোসপিনের দিকে তাকিয়ে থাকেনা।

তবুও দিনের একভাগে যখন পরিচিত নাম্বার থেকে কল আসে আর শুনতে পায় সেই আগের মতো ঘোর লাগানো “নীধিজান” তখনই সে সব ভুলে যায়। আর্মি কাট দেওয়া ফর্সা গড়নের ছেলেটার শ্যামলা হয়ে আসা মুখটাকে ভার্চুয়াল দেখেই তার হাসি ফোটে।

বন্ধুমহলে সবার ব্যক্তিগত জীবন যখন খোলামেলা তখন বন্ধুদের একটাই কথা থাকতো, 'সমবয়সী? সেম এজ রিলেশন এন্ড বিয়ে? টিকবে আদেও? নিজের ফিউচার এর কথা ভাব সুনীধি।' সে তখন কোল্ড কফির স্ট্রোতে টান দিত জোরে। যেন সে এদের কোনো কথাই কানে নেয়নি।

দেখতে দেখতে সুনীধির গ্র‍্যাজুয়েশনের দিন এলো। একেতো সে একবছর গ্যাপে ভর্তি হয়েছিল তার উপর আবার সাব্জেক্ট এমন যে পাঁচবছর বাদে গ্র‍্যাজুয়েট হলো। সেদিন বাড়ি ফিরে একটা অতি পরিচিত মুখ দেখে কিছুক্ষণ চমকে দাঁড়িয়ে রইল। এমন না যে তাদের দেখা সাক্ষাৎ হতোনা। কিন্তু তা হতো খুবই অল্প পরিসরে। তানজীমের ট্রেনিংয়ে ফাকে মাঝে মাঝে বাড়িতে আসা হলে। আশেপাশে সবাই যে মিটিমিটি হাসছে তা সুনীধির চোখেও পড়লো না। কেননা সে ঝাপসা দেখছে সব। এমন থমকে গিয়েছিল শেষ কবে? একটা সুন্দর মুখ হাসি নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ালো তানজীম। অথচ মেয়েটার মনে হলো, এই সেই তানজীম না, কাটকাট মুখশ্রীতে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো শক্তপোক্ত দেহী পুরুষ। সুনীধি কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে স্রেফ বলল, “একবার জড়িয়ে ধরি?”

তানজীম সুনীধির এমন অবস্থায় ঠোঁট টিপে হাসলো। হেসে ফিসফিস করে বলল, “আর কিছুদিন নীধিজান। তারপর দিনরাত জড়িয়ে ধরে বসে থেকো। এখন ধরলে নিজেই লজ্জা পাবে।”

সুনীধি বড় সড় একটা নিশ্বাস ফেলল ততক্ষণে। তা দেখে তানজীম ভ্রুনাচিয়ে বলল, “বিয়ে করবে বুড়ি নীধি? ফ্লাইট ল্যাফটেন্যান্ট তানজীম সাফায়াতকে?”

সুনীধি কপট রাগ দেখালো। তা দেখে তানজীম হাসলো। তারপর হঠাৎ একদিন বিয়ে ঠিক করে ফেললো তাদের। আয়োজন আহামরি করেনি দুজনের ইচ্ছেতেই। সুনীধি আর তানজীমের বিয়েটা হলো খুব সুন্দর করে। কবুল বলার পর সুনীধি দফায় দফায় চমকালো।

বাসর ঘরে সাজানো গোছানো টিপটপ। সুনীধির ফুল পছন্দ নয়। কেবল সাদা গোলাপ বাদে। লাল গোলাপে বাসর সাজে। সাদায় সাজে নাকি? অথচ তাকে অবাক করে দিয়ে ঘরজুড়ে সাদা গোলাপ আর সাথে ছোট ছোট মোমবাতি জ্বলে আছে। তানজীম ঢুকেই খাটে বসা সুনীধির সামনে নিজেও বসলো। বসে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। পরপর দুজনেই দুজনের দিকে তাকিয়ে থেকে হেসে ফেলল একসাথে। তানজীম যেন এক প্রশান্তির নিশ্বাস ফেলল। আর বলল,

“ফাইনালি!”

সাথে সাথে সুনীধির ঘোমটা ফেলে দিল আর তার লম্বা বেণি করা চুলগুলো নিজের হাতে পেঁচিয়ে বলল,

“এবার আমাকে চটপট বেঁধে ফেলো তো সুনীধি।”

সুনীধি লজ্জা পাবে কি, হেসেই কুল পেল না। মোমবাতির আলোয় সাদা পাথরের জ্বলজ্বলে নোসপিনটায় নজর গেল তানজীমের। সে দম আটকে কাছে টেনে আনলো আর বলল,

“এটা আমাকে বড্ড জ্বালাচ্ছে। খুলে ফেলি?”

সুনীধি হাসি আটকে ফেলল। এভাবে ঝাপটে ধড়ায় তার নিজেরই নিশ্বাস আটকে আসছে।কোনোমতে জবাব দিল, “ফেল।”

বলতে দেরি আর তানজীমের তা খুলতে দেরি না। দাঁতের সাথে লেগে পাথর উঠে গেল নাকি? সুনীধি ধমকে উঠলো। তানজীম এবার ঝাপটে ধরতেই খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো সে। সকাল হতে ঘরময় তল্লাশি চালালো। কখনো খাটের নিচে তো কখনো তোশকের নিচে। কোনকিছু বাদ রাখলো না তবুও সেই নাকের ফুল না পেয়ে সুনীধির নাক টানা শুরু হয়ে গেল। তানজীম জানে, অতি প্রিয় জিনিস হারালেই কেবল এই মেয়ের চোখে পানি আসে। সে ঢোক গিলে তার মাথায় হাত রেখে বলতে লাগলো, “থাক! আর কাঁদেনা।”

“নতুন একটা কিনে দিব।”

“আর কোনোদিন খুলবো না তোমার গহনাগাটি।”

“আচ্ছা এটাই খুজে দিচ্ছি দাঁড়াও।”

“খালাকে ডেকে দুজন মিলে আজকে পুরো রুম খুজবো।”

“কাঁদেনা নীধিজান!”

প্রতিবারই এই কথাই বলে এই ছেলে কিন্তু প্রায় রাতেই সুনীধি শাসালেও লাভের লাভ কিছু হয়না। এখন অবশ্য খুলে আর এদিক সেদিক ফেলে দেয়না।খুব যত্নে খাটের একপাশে রেখে দেয়।

সংসার করতে দেখেছে সুনীধি তার মাকে। তার কোনো ভাইবোন নেই। সুনীধি তার বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে। দুজনেই আধুনিক চিন্তাভাবনার মানুষ। তাদের সংসারটা ঝুটঝামেলাহীন যেমন ছিল তেমনটা তার নিজেরও। তানজীমের বাবা, মা, বড় এক ভাই আর ছোট এক বোন। বড় ভাই তাজওয়ার তার বউ বাচ্চা নিয়ে ভীনদেশে সেটেল্ড। ছোট বোন তাজরিয়ান ভীন শহরে হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করছে।

সুনীধির তাই তেমন সংসার জিনিসটা বুঝে নিতে কষ্ট হয়নি। তবে সেই ভালোবাসার সংসারে একদিন হুট করে জানতে পারলো, এক নতুন অস্তিত্বর কথা। হতবিহ্বল সুনীধি দাঁড়িয়ে কেবল ভাবছিল সেই একসাথে কলেজে ক্লাস করা দুটো ছেলে মেয়ে এখন বাবা মা হয়ে যাবে? তানজীম বাবা হবে? সেই তানজীম?

খবরটা জানালো রাতে। অবাক ফ্যালফ্যাল চোখে তানজীম তার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলেছিল, “এই নীধিজান? আমরা প্যারেন্টস হয়ে যাবো? আমাদের হাত ধরে বাচ্চাটা স্কুলে যাবে?”

সুনীধি একচোট হাসলো। বলল, “পৃথিবী দেখুক আগে? স্কুলে পাঠানোর এতো তাড়া কেন?”

অথচ সারারাত তানজীম ঘুমাতে পারলো না। এপার ওপাশ করতে করতে অস্থির হয়ে গেল। সেই সাথে সুনীধিকেও জ্বালিয়ে মারলো।

তবে জীবন কোথায় কখন কেমন আদেও কেউ জানে? চারমাসে মিসক্যারেজ নামক একটা অসহ্যকর পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যেতে হলো সুনীধির। সে স্থবির হয়ে গেল। পেটে হাত রাখলেই বুক চিরে কান্না আসতো। হসপিটালের বেডে শুয়ে থাকা সুনীধি কাঁপা কণ্ঠে বলল, “সরি তানজীম! কি হয়ে গেল এটা বলোতো? তুমি কি আমাকে এর দায়ী ভাবো?”

তানজীম শুকনো মুখে হেসে বলেছিল, “ইটস ওকে। জীবনে কত কিছুই তো হয়। তুমি দায়ী কেন হবে?”

তানজীম সেদিন শক্ত থাকলেও সুনীধি ভেঙেচুরে একাকার হয়ে গেল। জীবন যাবতকাল কেন সহজ হয়না? কেন দুঃখ দুয়ারে পা রাখবেই? সেই প্রশ্নর উত্তর মেলেনি তবে এর মাঝেই জীবনে দুঃখ এসে ডালপালা ছড়িয়ে দিল।

তানজীমের রোড এক্সিডেন্ট হলো। পা ভাঙলো। সুনীধির মিসক্যারেজের ট্রমা কেটে উঠার আগেই তানজীমের জীবনে এই এক্সিডেন্ট এলো তার ব্যক্তিগত ট্রমা হয়ে। চাকরি থেকে বিরতিতে যাওয়া লাগলো। এমন জীবনের সাথে তানজীম পরিচিত নয়। যে জীবনে দায়িত্ব, ট্রেনিং সব ফেলে অসুস্থতায় জড়িয়ে পড়ে থাকতে হয়। তবে এই দুটো ট্রমাযুক্ত মানুষ যেন এই অবসর সময়টুকুতে নিজেদের ঘায়ের মলম হয়ে গেল।

চলবে…

তবু রবে চিরকাল

লেখনীতে- সামিয়া আফনান

প্রথম পর্ব

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন