ফন্ট সাইজ:
থিম:
তবু রবে চিরকাল

২য় পর্ব

লেখক: সামিয়া আফনান

তবু রবে চিরকাল

লেখনীতে- সামিয়া আফনান

শেষপর্ব

স্বাধীন অফিসে ঢুকল। যে যার মতো আনন্দ-ফুর্তি করছে। মৃদু আওয়াজে ইংরেজি গান বাজছে। গানটা সে আগেও শুনেছে। ভুল না হলে 500 miles বোধহয় নাম। সবাই স্বাধীনকে দেখেই বসার জন্য বললেও সে আর বসল না। নিজের কেবিনে চলে গেল। কম আলোর লাইট গুলো জ্বালিয়ে বসে পড়ল সোফায়। হাত পা ছড়িয়ে বসতেই মাথায় এলো সুনীধির কথা। জীবনের বহু মেয়ের প্রতি সে আগ্রহ দেখিয়েছে। এর পরিবর্তে তাদের থেকেও রেসপন্স পেয়েছে। তার মাথায় একটা জিনিসই ঘুরলো। সুনীধি ডিফারেন্ট। সুনীধি..ইজ..ডিফারেন্ট।

সে কিছু একটা ভেবে ফোন হাতে নিল। তার আন্ডারে কর্মরত সবার নামই কমবেশি তার জানা। সেই মোতাবেক ফেসবুকে সুনীধির পুরো নাম দিয়ে সার্চ দিল। তবে সেই নামে কোনো একাউন্ট না পেয়ে ঠোঁট কামড়ে কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা করে লিংকড-ইনে তার নাম সার্চ দিল৷ তার প্রোফাইলে দেখল ঠিকই ফেসবুকের একাউন্ট দেওয়া৷ কিছু একটা ভেবে নিজের ডেস্কে বসে ল্যাপটপ অন করলো। সেখানে অন্য এক একাউন্ট থেকে লিংকড-ইনয়ে পাওয়া একাউন্ট সার্চ করতেই ল্যাপটপের স্ক্রিনে সুনীধির সুন্দর একটা ছবি ভেসে উঠলো। স্বাধীন ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো। ভুল না হলে অফিসের প্রত্যেককে এই নারী ব্লক করে রেখেছে।

তবে হাসি হঠাৎ থামলো একটা জিনিস দেখে। রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস সে মোটেও এমনটা আশা করেনি। Married to Tanzeem Shafayet দেখে কিছুটা চমকালো। এই নামটা খুবই পরিচিত মনে হলো তার কাছে। যেন কোথাও শুনেছে। কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারছে না। তানজীম..তানজীম..ভাবনার মাঝেই সে এই নামটা গুগলে সার্চ করে ফেলল৷ চোখের সামনে ভেসে উঠলো এক অদ্ভুত সুন্দর পুরুষের মুখশ্রী। স্কোয়াড্রন লিডার তানজীম সাফায়েত। খুবই ফরমাল, আর্মি কাটে, ফ্লাইট স্যুট পরিধানরত এক দারুণ যুবক যার চোখে মুখে বুদ্ধিদীপ্ততার ছাপ স্পষ্ট। সে এবার ইউটিউবে ঢুকে একই নামে সার্চ করলো। আর সেই নাম সার্চ করতেই অনেকগুলো নিউজ চ্যানেলের ভিডিও সামনে এলো। সে স্ক্রল করতেই থাকলো। মুখভঙ্গীতে দারুণ পরিবর্তন এলো। মৃদু আলোতে গভীর রাতে বসে সবগুলো ভিডিওর টাইটেল দেখল সে। ভিডিওগুলো দুবছর পুরোনো। স্ক্রল করতে করতে এক ভিডিওতে সুনীধিকেও দেখা গেল। তবে এই সুনীধি আর তার সামনে দিয়ে আসা যাওয়া সুনীধির যেন বিস্তর তফাৎ। রাতের নিরবতার মাঝেই তার মনে হলো, সুনীধিকে নিয়ে তার আগ্রহ দেখানো একদমই ঠিক হয়নি। চেয়ারে হেলান দিয়ে দুহাতে মুখ ঢেকে একাই বিড়বিড় করল,

"শিট!"

-

তানজীম নিজের জীবনে দুঃখ নামক শব্দকে রেখেছিল সর্বদা লাস্ট প্রায়োরিটি। তার সবক্ষেত্রে এক্সিলেন্সির পেছনে কারণ এটাই ছিল। পড়াশোনা, আইএসএসবি, ট্রেনিং, ফ্লাইট ল্যাফটেন্যান্ট হয়ে উঠা সবটা শুধু ভাগ্যের জোরে না বরং এর পেছনে তার চিন্তাভাবনারাও সমানভাবে তাকে সাহায্য করেছে। তার জীবনে ট্র‍্যাজেডি বলতে নিজের সন্তানটাকে হারানোই ছিল কেবল। কি বিশ্রী এক যন্ত্রণা বুকে বা পাশে নিয়ে সেই বুকেই বউকে রেখে শান্তনার বাণী দিয়েছে। এছাড়া বাকিবাদ সব তার ঠিকঠাক! সৃষ্টিকর্তার কাছে সে এর বেশি কখনো চায় নি। তবে জীবনের এমন এক পর্যায়ে এসে নিজেকে অসহায়ই মনে হলো তার।

সুনীধি নিজেই সন্তানের শোকে অর্ধেক শুকিয়ে গিয়েছে এর মধ্যে তানজীমের এই হাল। সে উঠে পড়ে লাগলো মানুষটাকে সুস্থ করতে, তার যত্ন নিতে। তানজীম যে ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছে এটা সুনীধি খেয়াল করেছিল। জীবনে সাফল্যর পাশাপাশি সুস্থতাও চিন্তাভাবনার উপর অনেকাংশে নির্ভর করে সেখানে তানজীমের মতো শক্ত মানুষটাতেও ডিপ্রেশন বাজে প্রভাব ফেলছিল। সে নিজের দুঃখ ভুলে তানজীমের কাছে বসতে শুরু করলো। হাতে হাত রেখে হাসিমুখে আগ্রহ নিয়ে তানজীমকে জিজ্ঞেস করতো তার আলাদা জগতের ব্যপারে। তখন তানজীম মন খুলে নিজের ট্রেনিং জীবনের গল্প, প্রথম ফ্লাইং, প্রথম টেক অফ-এর অভিজ্ঞতা সবকিছু বলতো। তার এই গল্প বলার ভঙিতে সুনীধি বুঝত, এই মানুষটা নিজের কাজকে কতটা ভালোবাসে। যেই কাজ তাকে আপনজন থেকে দূরে সরিয়ে রাখে, যেই পেশায় নিজেকে নিয়োজিত রেখে বাকীসব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয় সেই পেশাকে নিয়ে তার চোখে মুখের দীপ্তি লেগে থাকতো সর্বদা।

মাঝে মাঝে আঙুলে আঙুল রেখে দুজনে স্মৃতিচারণ করতো। সাদামাটা বিকেল, খোলা জানালা হতে হুড়মুড়িয়ে আসা বাতাসে এলোমেলো ঘরটায়, দুকাপ কফিতে সেই পুরোনো দিন ভেসে উঠতো। সুনীধি তানজীমের কাঁধে কখনো মাথা রাখতো না, রাখতো তার বুকে। সেই বুকে মাথা রেখেই এমনই এক বিকেলে প্রশ্ন করল,

"বলো তো এবার সত্যি করে। তোমার ফার্স্ট প্রায়োরিটি কে? ইউর জব? অর মি?"

নিছক মজা। তবে এর উত্তরে সুনীধি বুঝল সে এখন কলেজ ড্রেস পরিহিত সেই পুরোনো পাঁয়ে পা মিলিয়ে চলা চঞ্চল তানজীমের সঙ্গে নয় বরং এক বুদ্ধিদীপ্ত, দায়িত্বশীল আর সবশেষে একজন সুপুরুষ এর সাথে বসবাস করছে।

"ফার্স্ট প্রায়োরিটি আমার জব। যার জন্য আমি স্বপ্ন দেখেছি।যার জন্য আমি এই বিশাল আকাশকে নিজের কাছ থেকে দেখতে পেরেছি। আমি অলওয়েজ গ্রেটফুল থাকবো। এই জবে আমি নিজেকে নিজে চিনতে শিখেছি নীধি। কোন পরিস্থিতিকে কিভাবে হ্যান্ডেল করতে হয় তা বুঝতে শিখেছি। মানুষের জীবনে শেখার ধরণ এক হয়না। তবে, তুমি সকল প্রায়োরিটির উর্ধ্বে। যে মানুষটা জানতো, সবকিছুর ফলাফল হবে দুরুত্ব। তা জেনেও দিনের পর দিন আমাকে সাপোর্ট করে গিয়েছে, সবসময় সাহস জুগিয়েছে, তাকে কি করে তুলনা করার সাহস পাই বল তো? আমার নীধিজান সত্যিকার অর্থেই আমার জান। জানবিহীন মানুষ বাঁচে কি করে?"

নীধির চোখে মুখে হাসি খেলে গেল। চট করে নাকে ডগায় চুমু খেয়ে বলল,

" জীম, পুরোনো দিনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ থাকলে তুমি নিজের জীবনের কোন মূহূর্তগুলোকে পরিবর্তন করতে চাইতে?"

তানজীম সুনীধি আগলে নিয়ে খানিকটা হেসে উত্তর দিল,

"যেই মূহূর্তে আমি আমার সন্তানকে হারালাম ঠিক সেই মূহুর্তটা। আমার জীবনের সব পর্যায়ে জিতে গেলেও এই এক জায়গায় এসে হেরে গিয়েছি নীধি। কেন থাকল না সে? বাবার কোলে কেন এলো না?"

সুনীধি বির‍স মুখে মাথা তুলে তাকালো তানজীমের দিকে। যার চোখে মুখে তারই মতো কোনো কিছু পেয়েও হারিয়ে ফেলার দুঃখ। মুখে বেদনার হাসি। অবাক হলো এই ভেবে, ছেলেটা এতোগুলো মাস এ বিষয়ে একটা কথাও বলে নি। তার অনুভূতি কি সে জানায়নি। তবে যখন বলল, তখন মনে হলো, তানজীমের মতো সুনীধি তানজীমকে বুঝেনি এই কদিনে।

শারীরিক অসুখ সেড়ে যায় তবে মনের অসুখ সাড়ানো যেন কঠিন। তানজীমের পা ঠিক হয়, ফিজিওথেরাপি আর নানান পরীক্ষা শেষে সে আবারও জয়েন করে। সুনীধি খুশি হয় ভীষণ। মানুষটা আবারও পেশাগত জীবনে ফিরে গিয়েছে তবে সময় সুযোগ, যোগাযোগ কমে এসেছে।

তবে যখনই ভিডিও কল আসতো, সব ফেলে সেই রোদে পোড়া মুখটার দিকে তাকিয়েই দীর্ঘসময় কাটিয়ে দিত। তখন আর বলে হওয়া উঠতো না- জীম, চলো আরেকবার সন্তান নেই। এবার তাকে আর যেতে দিব না। নিজেদের কাছে রেখে দিব। খুব যত্নে, খুব আদরে, খুব শাসনে।

স্বাভাবিক জীবনে ততদিনে তানজীমের মতো সুনীধিও ফিরে গেল। চাকরিতে জয়েন করলো। সেই পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে শুরু করলো। জীবনের কালো অধ্যায় ফিকে হয়ে এলো পরিস্থিতির সঙ্গে সঙ্গে। তবে ফিকে হওয়া রঙও যেন মাঝে মাঝে গাঢ় হয়ে আসে।

তানজীম আর সুনীধির সম্পর্ক আগের মতোই রইল। কোথাও কোনো কমতি নেই। নিয়ম করে প্রত্যেক এনিভার্সারির আগে ছুটি নিয়ে চলে আসে সে। কোনো ওকেশনে এই বান্দাকে না পাওয়া গেলেও এই একদিন সে কোনোভাবেই মিস করবে না। সুনীধি অবাক না হয়ে পারে না! এতো মেইনটেইন করে চলে কিভাবে এই ছেলে!আর এমনই এক বিবাহবার্ষিকীতে তানজীম এলো। প্রতিবার সারপ্রাইজ দিয়ে চমকে দেওয়া মানুষটার জন্য নিজেই সারপ্রাইজ করে রেডি হয়ে বসে রইল। অপেক্ষায় অপেক্ষায় কাটানো মূহূর্তটাকে উপভোগ করলো। সত্যিকার অর্থেই তানজীম এলো! প্রতিবারের ন্যায় হাতে একগুচ্ছ সাদা গোলাপ আর মুখে লেপ্টে থাকা চমৎকার হাসি,

"শুভ বিবাহবার্ষিকী নীধিজান!"

তবে গাঁয়ে পেশাগত পোশাক দেখে চমকে উঠলো। বসার ঘরে সবাইও অবাক। সেজে গুজে সাদা শাড়ি পরিধানরত সুনীধি খানিকটা হাসার চেষ্টা করলো৷ তবে বুঝল না এমন দিনে এই পোশাকে আসার মানে। তখনই তানজীম হেসে নিজের বুকের দিকে আঙুল তাক করলো। সুনীধি খেয়াল করল, বুকে থাকা ভিন্ন র‍্যাংক যা সে আগে কখনো দেখেনি। তার বিস্ময়ে ঠোঁটদুটো আলগা হয়ে এলো। তানজীম হাসলে তার চোখ দুটো ছোট ছোট হয়ে আসতো। সেই একই হাসি মুখে ঝুলিয়ে জানান দিল,

"স্কোয়াড্রন লিডার তানজীম শাফায়েত হেয়ার!"

সুনীধি এতই অবাক হলো যে কথা বলতেই ভুলে গেল। কখন তানজীম তাকে বুকে টেনে নিয়েছে সে টেরও পেল না। অধিক বিস্ময়ে আশেপাশের হই-হুল্লোড়ও যেন কানে এসে পৌছালো না। সে শুধু অবাক হয়ে চেয়ে রইল হাসিখুশি মুখটার দিকে। মনে অজান্তে প্রার্থনা চলে এলো, এই মুখটার হাসি যেন কখনো সরে না যায়।

সেই রাত কাটলো মধুর! পরিবার, প্রিয়জনকে নিয়ে সেই রাত কাটালো অনেক চমৎকার। বন্ধুবান্ধবদের গিটারের টুংটাং শব্দ আর গানের তালে দুজনেও কাঁধ মিলিয়ে গান গাইল। সেই রাতের মতো রাত আর এলো না নীধির জীবনে। আর এতো আনন্দের ভিড়েও জানানো হলো না, দ্বিতীয়বারের মতো সন্তানের আগমনী বার্তা। তানজীম বেশি সময় দিতে পারে নি, তার ফেরার তাড়া ছিল। ঘুমহীন রাত কাটিয়ে সেদিন ভোরের কিছুক্ষণ বাদেই সে ফিরে গেল। যাওয়ার আগে ব্যক্তিগত সময় কাটানোর সুযোগও তারা পায়নি। শুধু ফিরে যাওয়ার আগে তানজীম আড়ালে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। ফিসফিসিয়ে কানের কাছে মুখ এনে বলল,

"মাইলস টু গো নীধিজান। ভালোবাসি তোমায়!"

নীধি নিজেও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। যেন এই বুকের মাঝেই ঢুকে যাবে সে। চোখ বেয়ে অবিরাম অশ্রু ঝড়লো। কেন? সে জানেনা। কখনো এমন হয়না। তানজীমের সঙ্গে সঙ্গে নিজেকেও শক্ত রাখার চেষ্টা চালিয়ে এক পর্যায়ে তা অভ্যাসে পরিণত হলেও আজ নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না। তানজীমের তাড়া থাকায় শেষ চুমুটা কপালে দিয়েই সে বিদায় নিল। সেদিন প্রথমবারের মতো আরও জলদি সামনাসামনি তাকে দেখার লোভ হলো, আর তাই ভেবে নিল খবরটা সে ফোনে জানাবে।

তানজীম ফিরে যেতেই সে দ্বিগুণ ব্যস্ত হয়ে গেল। নতুন দায়িত্ব, নতুন এয়ারক্রাফট ফ্লাই করা, নতুন জায়গায় পোস্টিং সব মিলিয়ে দারুণ ব্যস্ততার সময় কাটানো শুরু করলো। সুনীধি শেষে বাড়িতে সবার জোরাজোরিতে এক বিকেলে সুখবরটা জানিয়ে দিল তানজীমকে। শত ব্যস্ততার মাঝেও হা হয়ে গেল তানজীমের মুখটা। সে বিশ্বাস করতে চাইলো না। সুনীধি নিজের হাসি চেঁপে নানান ভাবে বিশ্বাস করাতে লাগলো। তানজীম যখন জানলো, নীধি বিবাহবার্ষিকীর দিন জেনেও তাকে জানায়নি তখন সে কপট রাগ দেখালো,

"দিস ইজ নট ফেয়ার নীধি। আমি তাকে ছুঁয়ে অনুভব করতে পারিনি।"

নীধি হেসে বলল, "পরেরবার আসলে অনুভব করে নিও। তখন আরও ভালোভাবে পারবে।"

"আমাকে কাছে পেতে এমন চালাকি করেছো তাই না?"

"কারেক্ট!"

"চালাক নীধিজান!"

সুনীধির দিন ফের কাটতে লাগলো অপেক্ষায়। কবে ফিরবে...কবে ফিরবে...। সে চাইলেই চলে যেতে পারতো তার সাথে থাকার জন্য আবাসিকে। তবে তানজীমের মা বাবাকে সে একা ছেড়ে যেতে চায়নি। এই এক ছেলেকে তারা কাছে চেয়েছিল অথচ সেই থাকে বহুদূরে। যেখান থেকে চাইলেও যখন তখন ছুটে আসা যায়না। এদিকে একা এই অবস্থায় সেখানে থাকাও এখন আর তার পক্ষে সম্ভব নয়।

সেদিন ভোর সকালেও সকলের সাথে তানজীম ভিডিও কলে কথা বলল। জানালো, প্রশিক্ষণ বিমানে আজ যাচ্ছে। সব বারের মতো মায়ের দোয়া চাইল। তানজীমের মা ছেলের দিকে আর্দ্র চোখে তাকালেন। তিনি চেয়েও কিছু বলতে পারেন না। ছেলের শখ, ছেলের স্বপ্ন, পেশার প্রতি তার ভালোবাসা দেখে প্রতিবার দমে যান। সুনীধি আড়চোখে তা দেখলো। আর দেখতেই প্রতিবারের ন্যায় মন খারাপ হয়ে এলো। অফিসে যাওয়ার প্রস্তুতি স্বরুপ ব্যাগের চেইন টানতেই কল কেটে গেল। সাথে সাথে মায়ের দীর্ঘশ্বাসও শোনা গেল। যে এখন ব্যস্ত ছেলের জন্য দুয়া করতে সৃষ্টিকর্তার নিকট। তবে আজ যেন ব্যতিক্রম কিছু ঘটার দিবস। যে ব্যতিক্রমে অনেকগুলো জীবনই পালটে গেল।

এক অদ্ভুত পীড়া বুকে চেঁপে অস্থিরতা নিয়েই কাজ করছিল সুনিধী। আর দুমাস বাদেই মেটারনিটি লিভ নিয়ে নিবে সে। হঠাৎ শীতাতপে আচ্ছাদিত অফিসের নিস্তব্ধতা ভেঙে ফোন ভাইব্রেট করে উঠল। না চাইতেই ভড়কে গেল সুনীধি। ফোন উলটে দেখল তার এক ফ্রেন্ড। অসময়ে তার কল পেয়ে কিছুটা চিন্তিত হয়েই ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ হতে ক্রন্দনরত স্বরে হতবিহ্বল হলো। সে বারবার একই ভঙিতে বলে যাচ্ছে,

"সুনীধি নিউজ...দেখ...সুনীধি...ভাইয়া..."

আর শুনতে পারলো না সুনীধি। এক কলিগ দৌড়ে আসলো তার দিকে। সে হাপাতে হাপাতে তার কাঁধে হাত চেঁপে বলল,

"ইউ অলরাইট নীধি?"

সুনীধি কিচ্ছু বুঝতে পারছিল না সেই মূহূর্তে। সবার এমন কথার মাঝে বন্ধু নিয়াজের একটাই কথাই বারবার কানে প্রতিধ্বনিত হলো, 'ভাইয়া'। ভাইয়া মানে তানজীম? সে কাঁপা কণ্ঠে কলিগকে জিজ্ঞেস করল,

"কি হয়েছে?"

সেই কলিগ তাকে জড়িয়ে ধরলো একপাশ হতে। তার ফোন তখন অনাবরত ভাইব্রেট করে যাচ্ছে। অফিসে সবাই উৎসুক চাহনিতে চেয়ে আছে। কলিগের হাতের ফোনে তখন নিউজ চ্যানেলের লাইভ দেখানো হচ্ছে। প্রশিক্ষণ বিমানটি চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে পড়ে আছে। যার থেকে এখনও ধোঁয়া বের হচ্ছে। আমজনতার ভিড় সে স্থানে। সাংবাদিকের কোনো কথাই তার কান পর্যন্ত পৌছালো না। শুধু শুনলো এটুকুই,

"বিধ্বস্ত প্রশিক্ষণ বিমানটির একাংশ পাওয়া গেলেও বিমানে অবস্থানরত পাইলটের কোনো খোজ পাওয়া যায়নি। এলাকার সাধারণ মানুষজন থেকে জানা গিয়েছে, পাইলট বিমানে আগুন লাগার অনেকক্ষণ বাদে ইজেক্ট করেছেন তবে এখনও তাকে খুজে পাওয়া যায়নি। জী, রাশেদ বর্তমানে জানা গিয়েছে Yak-130 নামক বিমানটি অবস্থানরত ছিলেন স্কোয়াড্রন লিডার তানজীম শাফায়েত। আপাতত এখানের অবস্থা বেশ শোচনীয়। পাইলটের খোজ চলমান..."

সুনীধির চোখ বেয়ে পানি পড়লো, টলে উঠলো তার দেহ। ভারসাম্য রাখতে টেবিল আঁকড়ে ধরলো৷ ভাইব্রেট হওয়া ফোনটা এলোমেলো হাতে রিসিভ করতেই তাজরিয়ানের হাউমাউ করে কান্না ভেসে উঠলো,

"আমার ভাই ভাবী। আমার ভাই.."

সে কোনোমতে ব্যাগ হাতে তুলে টলমলে পায়ে বেরিয়ে এলো। এক কলিগ তাকে বাসা পর্যন্ত পৌছাতে সাহায্য করল। পুরো রাস্তা উদ্ভ্রান্তের ন্যায় এদিক উদিক তাকালো সে। যেন এই ব্যস্ত রাস্তার মাঝেই কাউকে খুজে বেড়াচ্ছে। জ্যাম ঠেলে পৌছাতে অনেক সময় লেগে গেল। বাড়ি ফিরতেই বুক খামচে ধরলো কেউ যেন। মানুষজনে গিজগিজ করছে, কান্নার রোল পড়ে গিয়েছে। কেউ কেউ বিলাপ করছে। সেই বিলাপের শেষ প্রতিবার তানজীমে গিয়ে ঠেকছে। আর তাতেই এতক্ষণ ভেতরে বাহিরে শক্ত থাকা সুনীধির অসুস্থ লাগতে লাগলো। বিষাদের অতল সমুদ্রে যেন তলিয়ে যেতে লাগলো তার দেহ। তারপর সব ধোঁয়াশা!

যখন তার চোখ খুলেছে তখন প্রায় গভীর রাত। আশেপাশে সবাইকে অনেক অস্থির দেখা গেল। ব্যস্থ হাতে ব্যাগ গোছানো কালে তাজরিয়ান এসে কম্পমান কণ্ঠে বলল,

"ভাবী ভাইয়াকে পাওয়া গিয়েছে। হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে হেলিকপ্টারে।"

হতবুদ্ধির ন্যায় আশেপাশে তাকালো সুনীধি। এভাবে জ্ঞান হারানোয় অন্যসময় হলে সবাই তার সেবা করতে উঠে পড়ে লাগতো। কিন্তু আজকের দিনটা যে বাকিদিনগুলোর ন্যায় নয়। দুজন টেনে উঠাতেই সুনীধি উঠে দাঁড়ালো। সময়টা অপচয়ের নয়। হাসপাতালে পৌছাতে বেগ পেতে হলো। চারিপাশ কেমন গুমোট, মানুষজনে ভর্তি, বেশিরভাগ উর্ধতন কর্মকর্তারা। গাঁয়ে সকলের পেশাগত পোশাক, সেখানে ভিন্নতা একটাই- কারো পুলিশি পোশাক আর কারো সেনাবাহিনীর। কিন্তু এসেও যেন কোনো লাভ হলোনা। জীবিত তানজীমের দেখা সুনীধি আর পেল না। সেই তানজীমের নিজের সন্তানকে অনুভব করা হলো না। তাদের পৌছাতে যে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। ডাক্তারের মাত্র এসে বলা কথায় আশেপাশে সেনারা "ইন্না-লিল্লাহ" বলতে শুরু করেছে। সেই সমস্বরে মৃদু কণ্ঠে সবার উচ্চারিত শব্দে ধপ করে বসে পড়লো সুনীধি। তানজীমের আম্মার আহাজারিতে ভারী হলো পরিবেশ। ভাইয়ের জন্য হাউমাউ করে কাঁদছে তাজরিয়ান। কানে শুধু একটা কথাই বারবার বাড়ি খাচ্ছে সুনীধির,

"দিস ইজ নট ফেয়ার নীধি। আমি তাকে ছুঁয়ে অনুভব করতে পারিনি।"

জানা গিয়েছে, কোনো এক ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার দিকে গিয়েই নিয়ন্ত্রণ হয়ে পড়ে বিমান। সোলো প্রশিক্ষণ বিমান আকাশে উড্ডয়নরত অবস্থাত যথেষ্ট চেষ্টা চালিয়েছে তানজীম। বারবার তাকে জানানো হচ্ছিল সে যেন ইজেক্ট করে। কিন্তু তানজীম তখনোও জানত ইজেক্ট করলেই বিমান সেই এলাকায় গিয়ে বিধ্বস্ত হবে আর সেখানে এমনটা হলে কতকত মানুষের যে মৃত্যু ঘটবে তা সে ভালো করেই বুঝতে পারছিল। নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে শেষে পাহাড়ের শেষ সীমানায় গিয়ে পৌছাতেই বিমানে আগুন লেগে যায়। তখনও তার ইজেক্ট করার কোনো পরিকল্পনা ছিল। আর কিছুটা দূর পর্যন্ত নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলেও শেষে বাধ্য হয়েই ইজেক্ট করে। বিমান বিধ্বস্ত হয়, আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠে। ভুল জায়গায় ইজেক্ট করায় আহত তানজীম দূরের জঙ্গলে গিয়ে পড়লেও জ্ঞান হারায়। পূর্বের ভেঙে যাওয়া সেড়ে উঠা পা, পর্যাপ্ত অক্সিজেনের অভাব, শরীরে জখম নিয়েও প্রায় ছয়ঘন্টা জীবিত থাকলেও হসপিটাল আনার কিছুক্ষণ বাদেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে।

সাহসিকতার, বীরত্বের আর দেশপ্রেমের এক অসাধারণ পরিচয় দিয়ে ঝড়ে গেল এক তাজা প্রাণ। দেশের একজন অসামান্য বিমানবাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে নিজের জীবনের বিনিময়ে সাধারণ মানুষের জীবন বাঁচালেও হেরে গেল একজন ছেলে হিসেবে যার কীনা ছুটিতে মাঁয়ের কাছে ফেরার কথা ছিল, হেরে গেল একজন বোনের কাছে যে ভাইয়ের কাছে একটা ট্রিপ আবদার করার অপেক্ষায় ছিল, হেরে গেল একজন স্ত্রীর কাছে যার সকলের সুখের খোড়াক ছিল সে। অতঃপর তানজীম শাফায়েত চলে গেল স্ত্রী, মা, বাবা, ভাই-বোন সবাইকে ফেলে অদূরে, নিয়ে গেল এক সন্তানকে হারানোর বেদনা এবং অন্য সন্তানকে ছুঁয়ে অনুভব করতে পারার স্বর্গীয় সুখ হতে বঞ্চিত হবার এক বুক আফসোস নিয়ে। দেশের পতাকায় মোড়ানো মৃতদেহ যখন এসে পৌছালো তানজীমের গ্রামের বাড়িতে তখন সাদা সুতির জামা কাপড়ে পাথর হয়ে বসে থাকা সুনীধির একটা প্রশ্নই মাথায় খেলে গেল- একটা মিথ প্রচলিত আছে,মৃত্যুর পূর্বের সাতমিনিট স্নায়বিক সক্রিয়তায় মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মূহুর্তগুলো তারা দেখতে পায় চোখের সামনে। তানজীম কি দেখেছিল? এই বিস্তৃত আকাশ নাকি হাসিমুখে পাশে থাকা সুনীধিকে? তার শেষ আকাশ যাত্রা সুন্দর হলেও তো পারতো।

-

নিকশ অন্ধকারে আচ্ছাদিত ঘরটায় টেবিল ল্যাম্প জ্বালালো সুনীধি। আজকে ফিরতে এতো দেরি হয়ে যাবে ভাবতে পারেনি। টেবিলেই ছোট গোলাকৃতির কেকটা রাখা। যার উপর ছোট করে লেখা Happy Anniversary। যদিও প্রথম লেখাটা নেই। সেই অংশটুকু ছেলে খেয়েছে। যে এখন কম্ফোর্টারের নিচে আরামে ঘুমিয়ে আছে। সুনীধি দূর হতেও ছেলের দেহের নিশ্বাসের সাথে উঠানামা দেখল। আকাশে নাকি অনেক তারা আজ। সে দেখেনি, ছেলেই বলেছিল। সে তো আকাশের দিকে এখন তাকায় না।

সুনীধির ঘুম পাচ্ছিল ভীষণ। আলস্যের সঙ্গে ফোন হাতে তুলে নেয় সে। গ্যালারি ঘাটাঘাটি করে খুব অনাগ্রহের সঙ্গে। যেন সময় কাটানোর এক দারুণ উপায়। সেই চলমান আঙুল থেমে যায় একটা ভিডিওতে। কে করেছিল খেয়াল নেই। সম্ভবত তাজরিয়ান করেছিল। ভিডিওতে সবার হৈ-হুল্লোর, কথাবার্তা চলমান। এর মাঝেই তানজীমের বন্ধু গিটার বাজাচ্ছে। গান গাচ্ছে। সুনীধির মুখে তখন বিরাট হাসি। তানজীমের দৃষ্টি তখন তার দিকে। দুজনেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সবার সঙ্গে গলা মেলাচ্ছে, "যাব কোয়ি বাত বিগার যায়ে, যাব কোয়ি মুশকিল পার যায়ে। তুম দেনা সাথ মেরা ও হামনাভা.."

কখন যে টেবিলে মাথা ঠেকেছে সুনীধির সে টের পায়নি। মুখে স্ক্রিনের আলো এসে পড়ছে। ক্লান্ত মুখে মলিন এক হাসি ফুটল তার। বড় অপরাধী তো সে নিজেই! সেদিন জানালে তানজীম শাফায়েত নিজের ছেলেকে অনুভব করে যেতে পারতো। সে ফোনটা সুইচড অফ করে ফেলে দুর্বল পায়ে জানালার কাছে গেল। অনেকদিন? নাকি অনেকবছর বাদে আজ এই বিশাল আকাশের দিকে তাকালো সুনীধি? জানে না সে। হিসাব রাখেনি। জোরে জোরে নিশ্বাস ফেলে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে আপনমনে আওড়ালো,

"আমার জীম, তুমি নেই আজ বছর তিনেকের বেশি।আমার তানজীম,

তোমাকে তো আর জিজ্ঞেস করা যায় না তুমি কেমন আছো। তবে আমার কথা বলি, আমি ভালো নেই। এখন যে প্রতিদিন সুন্দর করে শাড়ি পড়ে পরিপাটি হয়ে ঘুরে বেড়ায় সে কেবল সুনীধি সরকার। যার মধ্যে কোনো অনুভূতিই জীবিত নেই। সে কেবল অভিনয় করে বেড়াচ্ছে প্রতিনিয়ত।

আর অতীতে যে ছিল, সে কেবল সুনীধি সরকার ছিল না। ছিল কারো ‘নীধিজান’। যেই ‘নীধিজান’ সুখ চিনত, দুঃখ চিনতো, হার চিনতো কিংবা জিততে চিনতো। সে ভালোবেসে ফেলেছিল সাধারণ তানজীম সাফায়েত নামের একটা অতি পরিপাটি ছেলেকে। যেই ছেলে ক্রমেই নিজের ব্যক্তিগত, শিক্ষাগত, পেশাগত জীবনে তার চোখের সামনে পদোন্নতি করতে লাগলো।

আমার জীম, তুমি আকাশ ভালোবাসতে। মুক্ত পাখির মতো এই বহুরুপী আকাশে উড়ে বেড়াতে চাইতে। অথচ এই রূপধারী আকাশই তোমাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিল। আমি আজও আকাশের দিকে তাকাতে ভয় পাই। যেই আকাশকে তুমি ভালোবাসতে সেই আকাশ দেখলে আমার ভেতর ভেঙে চুরে আসে। আমার মুখ আতঙ্কে নীল হয়ে যায়।

আজকাল কেউ এই যত্নহীন লম্বা চুলগুলো নিজের পেশীবহুল হাতে পেচিয়ে নেয় না, কেউ নোসপিনের দিকে তাকিয়ে ঘন্টা অতিবাহিত করে দেয়না। তখন আমার হৃদয় মরুভূমির ন্যায় হয়ে উঠে। আজকাল আর এই রৌদ্রতপ্ত কিংবা বৃষ্টিমুখর কোনো আকাশই আমার ভালো লাগেনা। একে নাকি অবশ্য ফোবিয়া বলে। আমি অতশত বুঝিনা। শুধু জানি, এই আকাশ আমাকে বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়, 'তুমি নাই..তুমি নাই..'

তুমি জানতেই পারলেনা, আমার তোমার একটা অংশ এই পৃথিবীতে আছে। আমাদের ছেলে। তানজীম শাফায়াত আর সুনীধি সরকারের আদুরে ছেলে তাহসিম শাফায়াত। ছেলেকে ভালোবেসে সবাই ডাকে তোজো। আমাদের এই ছেলেটাও জানো আকাশ ভীষণ ভালোবাসে। কখনো কখনো কবিদের মতো এই আকাশ নিয়ে কবিতা বানায়। তার এই অসীম মহাবিশ্ব আর এই আকাশ নিয়ে ভীষণ কৌতুহল। নেবুলা, নেপচুন, ভেনাস এসব নিয়ে সারাদিন গবেষণা চলে তার। যেই গবেষণার অবশ্য কোনো ভিত্তি নেই।

আমার জীম, পারলে এই নীধিকে ক্ষমা করে দিও যে তোমাকে পাওয়ার লোভ মনে নিয়ে সন্তানের খবরটা সেদিনই দেয়নি যেদিন সে নিজে জেনেছে। পারলে এই নীধিকে ক্ষমা করে দিও, যে তুমি বিহীন এই পৃথিবীতে একদম অসহায় হয়ে পড়েছে। তবে তুমি জেনে রেখো, জীবনের সবক্ষেত্রে তুমি জয়ী। সবক্ষেত্রে..। ভালোবাসি তানজীম। আজীবন ভালোবেসে যাবো তোমায়।"

দূর আকাশে তারাগুলো মিটমিট করছে। সেই আকাশের দিকে তাকিয়ে সুনীধির মনে হলো এই বুঝি আকাশের দিকে আঙুল তাক করে ফিসফিসিয়ে কানের সামনে বলল,

"বাংলার আকাশ রাখিব মুক্ত।"

সমাপ্ত।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আগের পর্ব উপন্যাস সমাপ্ত

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন