আগামীকাল উইকএন্ড তাইতো মা জননীর কড়া নিষেধাজ্ঞা টপকে ডরমি-টরিতে আর থাকার সাহস হলোনা অনন্যার। ক্লাস শেষ দিয়ে ফিরতে হয়েছে পৈতৃক নিবাসে। তবে এই মূহুর্তে বাড়িতে ঢুকে অনন্যার ধীর পা আর সচেতন দৃষ্টি দেখে মনে হচ্ছে, সে বাড়িতে উইকএন্ড কাটাতে নয় বরং চুরি করতে এসেছে।
এই আসার সময় হলো তোর? শনিবার হলে বাড়িতে যে মা অপেক্ষা সেই হুশটুকুও নেই নাকি?
লিভিং রুমের মাঝ বরাবর কাউচের অবস্থান। সেখানেই বসে বসে চোখে মোটাফ্রেমের চশমা লাগিয়ে কুশি কাঁটায় উল বুনছেন মিসেস কি-য়ারা জায়ান।
ওদিকে সাবধানে পা টিপেটিপে নিজের রুমের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছিল অনন্যা, তখনই হঠাৎ মায়ের এহেন কর্কশ আওয়াজে আচমকা হকচ-কিয়ে দাঁড়িয়ে পরে ও। ঠোঁটের আগায় ভয়াতুর একটা মেকি হাসি ধরে রেখে দু'হাত কচলাতে কচলাতে পেছনে তাকিয়ে নিজেকে নির্দোষ সা-ব্যস্ত করার প্রয়াসে অনন্যা বলে,
- ইয়ে মানে, ক্লাস ছিল মা।
-ক্লাস ছিল, নাকি বন্ধুদের সঙ্গে আবারও কোনো উদ্ভট প্ল্যান ছিল?
চশমার উপর দিয়ে সুক্ষ্ম চোখে চেয়ে প্রশ্ন করেন কিয়ারা জায়ান।
অনন্যা কাঁধের ব্যাগটা মেঝেতে ফেলে এগিয়ে গিয়ে মায়ের পাশে বসে মাকে দু'হাতে জড়িয়ে ধরে, গায়ে নাক ঘষতে ঘষতে আহ্লাদী সুরে বলে,
সত্যিই ক্লাস ছিল।
কিয়ারা জায়ান দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে হাতের কাজ অব্যাহত রেখে অভিমানী গলায় বলতে লাগলেন,
যা খুশি করো, এখন তো বড় হয়ে গিয়েছো মায়ের কথা মনে থাক-বেই বা কেন শুনি? তোমার ভাই কেই দেখো না, মাসের পর মাস চলে যায় অথচ মায়ের কথা মনেই থাকেনা তার।
ওমা, এভাবে কেন বলছো? ভাইয়া তো কাজে ব্যস্ত থাকে সবসময়। তাছাড়া সে তো অফ ডে পেলেই বাড়িতে চলে আসে। তুমি এই বয়সে এসে এখনো এতো বকাবকি করো ভাইয়াকে, তবুও কখনো প্রতিবাদ করে বলো? ভাইয়া তোমাকে অসম্ভব ভালোবাসে মা, হয়তো তার প্রকাশ করার ধরনটা কিঞ্চিৎ ভিন্ন।
মেয়ের কথায় ঝাঁঝিয়ে উঠলেন কিয়ারা, ওকে নিজের থেকে খানিকটা দূরে ঠেলে দিয়ে কটমটিয়ে বললেন,
একদম ভাইয়ের হয়ে সাফাই গাইতে আসবি না আমার সামনে। মা-য়ের কোনো খোঁজ খবর নেয় সে? সারাক্ষণ শুধু ইমেজ আর ইমেজ, এতো ইমেজ দিয়ে কি করবে শুনি? বয়স ত্রিশ পার হতে চললো এখনো তাকে একটু খানি স্থির বানাতে পারলাম না আমি। সেই এক বেপরোয়া স্বভাব, মায়ের কথা শুনলে কি এমন হতো কোনোদিন? আবার নাকি ভালোবাসে?
রাগে গজগজ করছেন কিয়ারা। অনন্যা মায়ের শরীরে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে কৌতুক কন্ঠে বললো,
ভাইয়াকে বরং একটা বিয়ে করিয়ে দাও। দেখবে বউ পেয়ে একদম স্থীর হয়ে গিয়েছে। তখন তোমার আর তাকে ধরে বেঁধে রাখতে হবেনা, তখন বউয়ের ভালোবাসায় নিজেই বাঁধা পরতে চাইবে।
কথা শেষ করে খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে অনন্যা।
অনন্যার বাবা নেই। একমাত্র মা'ই এখন সব ওদের, তাইতো মায়ের একটু খানি কালো মুখ দেখতে পেলেই দিশেহারা হয়ে যায় ওরা দু'ভাইবোন। নিজেদের ব্যস্ত জীবনের টানাপোড়েন শেষে অবসর সময়-টুকু বরাদ্দ করে রাখে শুধু মাত্র মায়ের জন্য। এতোকিছুর পরেও মায়ের হাজারটা অভিযোগ মাথা পেতে নেয় নিঃশব্দে, উদ্দেশ্য কেবল একটাই মায়ের একাকীত্ব ঘোচানো। গর্ভধারিনীর মুখে একটুখানি হাসি ফোটানো।
একদিকে অনন্যা যখন ভাইকে নিয়ে মায়ের সঙ্গে হাসাহাসি খুনসুটিতে ব্যস্ত, অন্যদিকে মিসেস কিয়ারা তখন মনেমনে স্থির করেই নিয়েছেন মজার ছলে অনন্যার মুখ থেকে বের ওই বাক্যখানি,
ভাইয়াকে বরং একটা বিয়ে করিয়ে দাও।
ছেলের বিয়ের কথা ভাবতে ভাবতেই আনমনে কিয়ারা বলেন,
- ঠিকই বলেছিস অনু, এবার গরমের ছুটিতে বাড়ি ফিরলে ওকে ধরে-বেঁধে বিয়ে করাতে হবে। নইলে দেখা যাবে আজ বাদে কাল আমাদের না জানিয়েই সাদা চামড়ার কোনো এক বিদেশিনী নাইকা গাইকা কে ধরে বউ বানিয়ে নিয়ে চলে এলো, তখন আর কেঁদে কেটেও লাভ হবেনা। ওই ফ্যাটফেটে সাদা বউ আমি কিছুতেই মানবো না। অসম্ভব আমি এসব রিস্কে নেই, যা করার আমাদের এবারই করতে হবে।
মায়ের কথায় খুব একটা প্রতিক্রিয়া দেখা গেলো না অনন্যার মাঝে। ও পা তুলে কাউচের উপর গা এলিয়ে দিয়ে হাই তুলে বললো,
তোমার যে ছেলে, এতো সহজে কথা শুনবে বলে মনে হয়না।
কপালের মাঝে সুক্ষ্ম ভাজ টেনে কৌশলী ভঙ্গিতে কিয়ারা জায়ান বলেন,
সোজা আঙুলে ঘি না উঠলে আঙুল টা বাঁকাতে হবে।
এসাইনমেন্টের পাট চুকিয়ে সন্ধ্যা নাগাদ ডরমিটরিতে ফিরে এলো অরু।
নীলিমা তখন নিজের বেডে বসে ল্যাপটপে মুখ গুঁজে আছে। শীতের শেষ সামনেই হয়তো সামার ভ্যাকেশন শুরু হয়ে যাবে। আর কয়েকদিন মাত্র তারপরই টানা দু'মাসের দীর্ঘ ছুটি। নীলিমা আর অনন্যা দুজনই আমেরিকান সিটিজেন। ওরা হয়তো বাড়িতে চলে যাবে আর কয়েকদি-নের মাথায়, পাছে শুধু পরে রইবে একা অরু। কিছুদিন পরের কথা ভেবে এখনই মনটা কেমন নেতিয়ে যায় অরুর।
ভেতরের চাপা দীর্ঘশ্বাস টা আড়ালে বের করে দিয়ে শুকনো মুখে রুমের চারিদিক পরখ করে সামনে বসে থাকা নীলিমাকে ডেকে অরু শুধালো,
কিরে নীলিমা, অনন্যা এখনো ফেরেছি?
ল্যাপটপ থেকে চোখ সরায় নীলিমা। অরুর কথার প্রত্যুত্তরে ঠোঁট উল্টে বলে,
কি জানি, প্রত্যেক উইকএন্ড এলেই তো কোথায় হারিয়ে যায় ও। তার উপর জানিসতো অনন্যা আমাদের মতো সাধারণ পরিবারের কেউ নয়। ও নিশ্চয়ই কোনো রিচ কিড।
এমনটা কেন মনে হলো তোর?
নীলিমা বড়বড় চোখ করে উৎসুক কণ্ঠে জবাব দিলো,
হ্যারে, আমি নিজের চোখে দেখেছি সেদিন, ওকে একটা বিশাল মা-সিঁডিজে করে ক্যাম্পাসে আসতে। সঙ্গে আবার ড্রাইভার ও ছিল।
কারোও হাঁড়ির খবর জানতে খুব একটা আগ্রহী নয় অরু। তাই ও নির্বি-কার ভঙ্গিতে নিজের প্রয়োজনীয় কাজ গুলো করতে করতে বললো,
হবে হয়তো কোনো বড়সড় বিজনেস ম্যানের একমাত্র কন্যা।
নীলিমা হাতের ইশারায় মাছি তাড়ানোর মতো। করে বললো,
বাদ দে তো ওসব কথা, এই দেখ তোর জায়ান ক্রীতিকের প্রিভিউ লাইভ কনসার্ট হচ্ছে। কি হ্যান্ডসাম দেখতে, কনসার্টের আউটফিট গু-লোতে সবসময় ড্যাশিং লাগে এই ছেলেকে, পুরোই চকোলেট বয়। উফফ!