এমনই এক বৃষ্টিস্নাত সকাল ছিল সেদিন, কালো মেঘের আড়ালে পুরো-পুরি ঢাকা পরেছিল সোনালী রঙা সূর্যরশ্মি, সেই সাথে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি তো আছেই, এতো দিনের ঝাঁ ঝাঁ উত্তপ্ত দিবালোকের পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে আজকের এই অন্যরকম সকাল টা বেশ লাগছে অরুর। গতকাল রাতেই নাকি অনন্যার ভাইয়া ফিরেছে বাড়িতে, তিনি সিলিকন ভ্যালিতে থাকেন। খুব একটা আসেন না এদিকে। এবার কাজের ফাঁকে বেশ কিছুদিনের অবসর জুটেছে বলে সোজা চলে এসেছেন বাড়িতে। যদিও অরুর সঙ্গে এখনো দেখা হয়নি তার, তবে অরু শুনেছে অনন্যার ভাইয়া নাকি ভীষণ রগচটা আর বেপরোয়া স্বভাবের মানুষ। খুব সহজে কারও সঙ্গে কথা বলেন না তিনি।
তাতে অবশ্য অরুর কিছু যায় আসেনা, বাইরের গুমোট মেঘ আর ঝিরি-ঝিরি বৃষ্টিই আজ সবটুকু আকর্ষন কেড়ে নিয়েছে ওর। সহসা ঘুম ভেঙে জানালা গলিয়ে বাইরে দৃষ্টিপাত করে মিহি কন্ঠে গুনগুনিয়ে গেয়ে ওঠে ও,
চল রাস্তায় সাজি ট্রাম লাইট
আর কবিতার সুরে কাপলেট
আহা উত্তাল কত সুন্দর,
তুই থার্মোমিটারে মাপলে.....
ওদিকে বেশ রাত করে বাড়িতে ফিরে ক্লান্ত শরীর নিয়ে তাড়াতাড়ি ঘু-মিয়ে গিয়েছিল ক্রীতিক। তাই আজ সকাল সকাল উঠে বাড়ির কাছের ইকোপার্ক টাতে একটু হাঁটতে বেড়িয়েছিল ও। গহীন জঙ্গল বরাবরই বেশ পছন্দ তার। তাই তো সুযোগ পেলেই শহুরে জনজীবন ছাড়িয়ে গন্ত-ব্যহীন হয়ে হারিয়ে যায় অজ্ঞাত কোনো জঙ্গলের মাঝে।
তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বৃষ্টির তোড় বেড়ে গেলে ক্রীতিক ফিরে আসে বাড়িতে, ঘাড় ছুঁই ছুঁই চুলগুলো থেকে চুয়িয়ে চুয়িয়ে অনর্গল বারি-কণা ঝরছে তার। সেগুলো কে হাতের সাহায্যে ঝেড়ে মুছে, মাত্রই দো-তলায় পা দিয়েছে ক্রীতিক। নিজের রুমেই যাচ্ছিল, তবে হঠাৎ করে করিডোরের ওপাশ থেকে ভেসে আসা রিনরিনে মেয়েলী গানের সুরে মাঝ পথেই থমকে যায় ও। কিছুটা বিস্মিত হয়ে গানের উৎস ধরে এগিয়ে যায় অনন্যার রুমের দিকে।
অনন্যা তখন মায়ের সঙ্গে গ্রোসারীতে গিয়েছে। অরু একাই রুমে। রু-মের সামনে সটান দাঁড়িয়ে, পিছন ঘুরে থাকা মেয়েটাকে চমৎকার পুরু-ষালী আওয়াজে ডেকে ওঠে ক্রীতিক,
অনু?
অনু আর অরু নামটা শুনতে কিছুটা একই রকম। তাই পেছনে না ঘুরেই বেঘোরে সারা দেয় অরু,
--- হুম?
এবারও খটকা লাগলো ক্রীতিকের। অনুর চুল তো এতো লম্বা নয়। আর না তো অনু নিজের রুম এতো পরিপাটি করে গুছিয়ে রাখে কখনো। তাই আর কিছু না বলেই নিঃশব্দে অরুর নিকট এগিয়ে এসে গমগমে আও-য়াজে প্রশ্ন ছোড়ে ক্রীতিক,
কে তুমি?
অকস্মাৎ এই অপরিচিত কন্ঠস্বরে হকচকিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় অরু। ক্রীতিক ওর বেশ খানিকটা কাছাকাছি দাড়িয়ে থাকায় জানালা দিয়ে আগত ভেজা বাতাসে অরুর লম্বা চুল গুলো সপাটে আঁচড়ে পরে ক্রীতিকের চোখে মুখে। এহেন অবস্থায় চোখ মুখ কুঁচকে বন্ধ করে নেয় ক্রীতিক। ওদিকে এখানে এই অবস্থায়, এভাবে নিজের কল্প পুরুষকে চোখের সামনে দে-খতে পেয়ে বিস্ময়ে আপনাআপনি ফাঁক হয়ে গেলো অরুর ওষ্ঠাধর।
ক্রীতিক সত্যি সত্যি সামনে দাঁড়িয়ে আছে, ধারালো চিবুক, সুডৌল মুখশ্রী, ভাসা ভাসা চোখ, ঘাড় ছুঁই ছুঁই লম্বা চুল সবকিছু চোখের সামনে, শুধু সামনেই নয় খুব কাছাকাছি তারউপর জীবন্ত। যা দেখা মাত্রই বাক শক্তি লোপ পেয়েছে অরুর, চোয়াল ঝুলে পরেছে অজানা কৌতূহলে। অরুকে এভাবে হা হয়ে নির্দ্বিধায় তাকিয়ে থাকতে দেখে ক্রীতিক নিজ পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়ে বিরক্ত কন্ঠে বলে ওঠে,
সত্যি করে বলো তো তুমি আসলে কে? কি করছো এই বাড়িতে? ঢু-কলেই বা কেমন করে?
জা,,, জা,,,,, জা,,,
বিস্ফোরিত চোখে ঠোঁট নাড়িয়ে কেবল ওই একটা শব্দই উচ্চারণ করতে চাইছে অরু, কিন্তু কেন যেন পারছে না কিছুতেই। অরুর এহেন অদ্ভুত কান্ডে ভ্রু কুঞ্চিত করে কঠিন স্বরে ক্রীতিক বলে ওঠে,
এই মেয়ে কি বলছো এসব, বোবা নাকি? তুমি স্টকার তাই না? এখন ধরা পরে বোবা হওয়ার ভান ধরেছো, আমাকে স্টক করতে করতে এত-দূর চলে এসেছো? সাহস তো কম নয় তোমার?
ক্রীতিকের গম্ভীর আওয়াজে কিঞ্চিৎ কেঁপে ওঠে অরু। এখনও একই ভাবে কিছু একটা বলার বৃথা চেষ্টা চালাচ্ছে মেয়েটা, তবে অতিরিক্ত উত্তেজনায় কিছুই বের হচ্ছে না মুখ থেকে।
এমতাবস্থায় ক্রীতিক দ্বিতীয়বার চোখ রাঙিয়ে কিছু একটা বলার জন্য উদ্যত হলে, জা,,, জা,,, জায়ান, করতে করতেই আচমকা চেতনা হারিয়ে ক্রীতিকের বুকের উপর ঢলে পরে অরু।
*মেয়েটা এভাবে হঠাৎ করে অবচেতন হয়ে পরায় ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় ক্রীতিক। সুদীর্ঘ উজ্জ্বল ফর্সা কপালে কয়েকখানা দুশ্চিন্তার ভাঁজ টেনে আশ্চর্য কন্ঠে শুধায়,
---আরেহ, কি হলো তোমার? আর ইউ সিক?
অরুকে নিজ বাহুতে আবদ্ধ রেখেই ওর নরম তুলতুলে গালে আঙুল বু-লিয়ে ব্যগ্র কন্ঠে ডাকছে ক্রীতিক। ঠিক এমন সময় রুমে প্রবেশ করে অনন্যা, অরুকে এভাবে ভাইয়ের বাহুতে অসার হয়ে পরে থাকতে দেখে ও ছুটে এসে উদ্ভ্রান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো,
ভাইয়া কি হয়েছে অরুর?
ক্রীতিক অরুকে কোলে তুলে বিছানায় শুয়িয়ে দিতে দিতে বললো,
সেন্সলেস হয়ে গিয়েছে মেইবী।
সুস্থ সবল মানুষটা এভাবে হুট করে সেন্সলেস হয়ে গেলো? কি বলছো আবোল তাবোল?
--- কেন হলো, আমি কিভাবে বলবো? বাই দ্যা ওয়ে হু ইজ শী?
নির্বিকার কন্ঠে প্রশ্ন ছোড়ে ক্রীতিক। "অরু কে"? সেটা ভাবতে গিয়েই অনন্যার হঠাৎ মনে পড়ে যায় অরু তো ক্রীতিকের ভীষণ বড়
ভক্ত। হতে পারে এভাবে হঠাৎ মানুষটাকে চোখের সামনে দেখে উত্তে-জনায় জ্ঞান হারিয়েছে মেয়েটা। ওয়েল, ক্রীতিককে চোখের সামনে দে-খলে অরুর দ্বারা কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। সেই ভেবেই দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে অনন্যা।
সে বেলা সেভাবেই কেটে যায়। সকাল পেরিয়ে বিকেলের গোধূলিতে মু-ড়িয়ে যায় ধরনী। তবুও রুম থেকে আর বের হয়না অরু। লজ্জা, ভয়, সংকোচ আর তার চেয়েও বেশী ভেতরে বাড়তে থাকা এক অদম্য উত্তে-জনা সব মিলিয়ে গুমোট হয়ে আছে অরুর মন মস্তিষ্ক।