ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ভেলা

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: সুরাইয়া রাফা

অন্যদিক কিয়ারা জায়ান এসব কথা জানতে পেরে নিজে নিজেই অনেক দূর ভেবে ফেলেছেন তিনি। অরুকে তার ভীষণ পছন্দ, ছেলের বউ হলে তো সোনায় সোহাগা। তারউপর এই মেয়ে তার ছেলে বলতে অজ্ঞান, এবার শুধু নিজের ছেলেকে জোরজবরদস্তি করে টোপ টা গেলাতে পা-রলেই হলো। মনেমনে হাজারটা কৌশল এঁটে, অতিদ্রুত বসে পরেন অনন্যার সঙ্গে একান্ত গোপনীয় আলাপে।

খুব সকালে ঘুম ভেঙেছে অরুর, এখনো হয়তো বাড়ির সকলে ঘুমে বি-ভোর সেই ভেবেই খালি পায়ে ধীরে ধীরে নেমে এলো নিচে। পরনে সু-তির ঘাগড়া আর হ্যালো কিটির লং টিশার্ট। সেভাবেই একটুখানি প্রকৃতির সান্নিধ্যে গিয়ে দাঁড়ানোর প্রয়াসে মেইন ডোর খুলে বাইরের দিকে পা বা-ড়ায় অরু। ঠিক এমন সময় ওর পদধ্বনি রোধ করে পেছন থেকে হাতটা টেনে ধরে কেউ, অরু পেছনে তাকানোর আগেই কন্ঠে ভীষণ অধিকার বোধ নিয়ে এক চমৎকার সুদর্শন পুরুষ হাস্কিস্বরে শুধায়,

কোথায় যাচ্ছো?

ক্রীতিকের কন্ঠস্বর বেশ ভালোই চেনে অরু, কিন্তু লোকটা এভাবে বাহু চেপে ধরে আছে কেন? অরুর হৃদস্পন্দন গতি হারিয়ে ফেটে পরার উপক্রম, তবুও বহু কসরতে গলা থেকে একটু খানি মিহি আওয়াজ বের করে অরু বলে,

কোথাও না, এখানেই।

এবার অরুর হাত ছেড়ে দিলো ক্রীতিক, দু'কদম সামনে এগিয়ে এসে গ্রী-বাটা অরুর দিকে বাড়িয়ে চোখে চোখ স্থাপন করে বললো,

কাল ওভাবে সেন্স হয়ে কি প্রমান করতে চেয়েছিলে?

এএকটু ভয় পেয়েছিলাম।

কম্পিত কন্ঠে কথা শেষ করে চোখ তুলে ক্রীতিকের দিকে তাকাতেই পিলে চমকে গেলো অরুর। লোকটা খালি গায়ে শুধু একটা সুইমিং প্যা-ন্ট পরে গলায় টাওয়াল ঝুলিয়ে অরুর দিকে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে। এমন একটা পরিস্থিতিতে বিস্মিত সেই সঙ্গে লজ্জিত হয়ে তাড়াহুরো ক্রীতিকের থেকে চোখ সরিয়ে শুষ্ক ঢোক গেলে অরু। ক্রীতিক সেসবে তোয়াক্কা না করে ঘাড়টা আরও খানিকটা নিচু করে হিসহিসিয়ে বললো,

ভয় কেন পেয়েছো? আমি বাঘ না ভাল্লুক যে খেয়ে ফেলবো তোমায়?

অরু জবাব দেয়না। অন্য দিকে দৃষ্টি সরিয়ে হাতের মাঝে হাত নিয়ে কচ-লাতে থাকে শুধু।

অপ্রস্তুত নাজুক অরুর দিকে একঝলক তাকিয়ে সামান্য ঠোঁট বাকিয়ে হাসলো ক্রীতিক। অতঃপর পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে ঝাপ দিলো সোজা সুইমিং পুলে।

ক্রীতিককে এভাবে বিনাবাক্যে ঝাপ দিতে দেখে দু'কদম সামনে এগিয়ে গেলো অরু, দিশেহারা চোখে এদিক ওদিক খুঁজতে লাগলো ক্রীতি-ককে। এমন সময় হুট করেই পানির মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসে ক্রীতিক, যা দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে পুনরায় পিছিয়ে যায় অরু।

ওদিকে ওদের এই কর্মকান্ড দোতলার ছাঁদ বারান্দায় ঘাপটি মেরে দাঁ-ড়িয়ে দূরবীনের সাহায্যে পর্যবেক্ষন করছেন দু'জন অতিব উৎসুক মানবী।

অবশেষে সবকিছুকে পাছে ফেলে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ির ব্যাক ইয়ার্ডে এসে দাঁড়ায় অরু। এই জায়গাটা ভীষণ সুন্দর আর মনোরম। পুরো ব্যাক ইয়ার্ড জুড়ে মাথা উঁচিয়ে সগৌরবে দাড়িয়ে আছে একাধিক পিচ ফলের গাছ, তার ঠিক পেছনে ফ্রেন্স গেইটের কাছে সারিবদ্ধ ম্যাপল গাছের বহর। সদ্য গজানো রঙবেরঙের ম্যাপল পাতায় ভরে উঠেছে গাছ গুলো। অরু বিস্মিত নজরে সবকিছু পরখ করে, প্রান ভরে স্বস্তির নিঃ-শ্বাস নেয়, মনেমনে এটা ভেবেই খুশিতে হারিয়ে যায় যে, এই মানুষটাকে শুধু একটু দেখার এক বুক আকাঙ্ক্ষা নিয়ে এই দূর দেশে পা রেখেছিল ও, অথচ আজ ভাগ্যের পরিক্রমায় সে মানুষটা ওর সামনে, এমনকি খুব কাছে।

মনের খুশিতে আকুলিবিকুলি ভাবতে গিয়েই অরুর চোখ গেলো গাছের মগডালে ঝুলতে থাকা টসটসে পিচ ফলের দিকে। অরু হাত বাড়ালো ফল পাড়ার উদ্দেশ্য, কিন্তু অরুর মতো একরত্তি চুনোপুঁটির মতো মেয়ের কি আর সাধ্যি আছে অমন ডালপালা ছড়ানো পোক্ত গাছের মগডাল থেকে ফল পেড়ে আনার? অরুও পারলো না, ফলস্বরূপ ব্যাক ইয়ার্ডের এক কোণে অযত্নে ফেলে রাখা কয়েক টুকরো পাথর এনে জড়ো করে দাঁড়িয়ে গেলো তারউপর।

অবশ্য এতেও কাজ হচ্ছে না খুব একটা, বহুকষ্টে নিজের ভার ধরে রেখে হাত বাড়িয়েও কিছুতেই নাগাল পাওয়া যাচ্ছে না বেয়ারা মগডা-লের। অরু যখন ঠোঁট কামড়ে ধরে গভীর ধ্যানমগ্ন হয়ে চেষ্টায় অবিরত, ঠিক এমন সময় নিজের বলিষ্ঠ পুরুষালী হাতটা বাড়িয়ে পিচ ফলটা পেড়ে আনলো ক্রীতিক।

একেতো নড়বড়ে পাথরের উপর সাবধানে দাঁড়িয়ে আছে অরু। তা-রউপর আকস্মিক ঘটনায় নিজের তাল সামলাতে না পেরে আচানক সা-মনের দিকে হুমড়ি খেয়ে পরে যায় ও। তবে ভাগ্যের জোরে এবারও শক্ত করে দু'হাতে ক্রীতিকের সফেদ রঙা টিশার্ট খানা খামচে ধরে বেঁচে যায় অরু। অরুর পানে শূন্য চোখে তাকিয়ে আছে ক্রীতিক, দেখে মনে হচ্ছে মাত্রই শাওয়ার শেষ করে টিশার্ট আর ট্রাউজার পরে বেরিয়েছে সে। আধভেজা স্টাইলিশ চুলগুলো লেপ্টে আছে কপালে, শরীর থেকে ভুরভুর করে বেরোচ্ছে স্যান্ডাল উড পারফিউমের স্নিগ্ধ সুঘ্রান।

সবসময়ের মতোই গন্ধটা একেবারে হৃদয়ে গিয়ে লাগে অরুর। যার ফলে ওর কয়েকমূহুর্ত সময় লেগে যায় নিজেকে সামলাতে। খানিকক্ষণ বাদে সমতল হাতরে সেটিকে আঁকড়ে দাঁড়ালে ক্রীতিক অরুর মুখের সা-মনেই ফলে কামড় বসাতে বসাতে বললো,

এতো ছোট কেন তুমি?

একে তো ফলটা নিজে পেড়ে নিজেই খেয়ে নিচ্ছে, তারউপর এমন খোঁচা মেরে কথা। রাগ হলো অরুর, সে নাক ফুলিয়ে বললো,

আপনার মতো লম্বা নই বলে খোঁটা দিচ্ছেন?

খোঁটা নয় যা সত্যি তাই বলছি।

ক্রীতিকের কথায় মনেমনে আরও চটে গেলো অরু। প্রথমত এক অবলা নারীকে চোখের সামনে খোঁটা দিচ্ছে, তারউপর সেটা আবার বুক ফুলিয়ে মুখের ওপর বলে দিলো? ও থমথমে মুখে সামান্য ঠোঁট বাকিয়ে বলে,

বাস্তবে আপনি কেমন যেন।

কেমন আমি?

কাটখোট্টা টাইপ, কথায় কোনো মিষ্টতা নেই একদম।

অরুর কথায় কোনোরূপ ভাবান্তর হলোনা ক্রীতিকের মাঝে। ও নিজের আধ খাওয়া ফলটা অরুর হাতে ধরিয়ে দিয়ে, ফ্রন্ট গেইটের দিকে যেতে যেতে ভাবলেশহীন কণ্ঠে বললো,

- আমি এমনই, এখন থেকে অভ্যেস করে নাও।

উক্ত বাক্য দ্বারা আদতে কি বোঝালো লোকটা সেসব কঠিন সমীকরণ অবশ্য ছোট মাথায় ঢুকলো না অরুর।

ভীষন অদ্ভুত এই পৃথিবী, তারচেয়ে ও অদ্ভুত মহাবিশ্বের ব্ল্যাকহোল। এর চাইতেও যদি বহুগুণ অদ্ভুত আর অপ্রত্যাশিত কিছু থেকে থাকে তাহলে সেটা এখনকার পরিস্থিতি।

ক্রীতিকদের পুরো বাড়িটা ভূতুড়ে বাড়ির মতোই থমথমে হয়ে আছে এই মূহুর্তে। এ যেন প্রবল ঝড়ের সামান্য পূর্বাভাস, বাইরে অবশ্য ঝড় উঠেছে, চারিদিকে প্রচন্ড বাতাসের শাঁই শাঁই আওয়াজ, খুলে রাখা জানালার পাল্লা গুলো ধিরিম ধিরিম আওয়াজ করে সশব্দে এসে বারি খাচ্ছে দেওয়ালে গায়ে। একেবারে গাঁ ছমছমে পরিবেশ যাকে বলে, এদিকে বাইরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সন্ধ্যা থেকেই বাড়ির আবহাওয়ায় গুমোট ভাব ধরে আছে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন