ক্রীতিক রুমেই ছিল, ওর পরনের কাপড়চোপড় ভিজে একাকার। বাইরে বৈশাখী ঝড় শুরু হয়েছে। ঝোপঝাড় থেকে ধেয়ে আসা ঝোড়ো বাতা-সের ভয়াতুর আওয়াজে গা ঝিমঝিম করছে যেন, সেই সাথে শরীর শিউ-রানো ঠান্ডা তো আছেই। একটু পরে এক হাতে তোয়ালে আর অন্য হাতে একটা হ্যাজাক নিয়ে ওর রুমে হাজির হয় অরু। হ্যাজাকের মৃদু রোশনাই এ অরুকে অপার্থিব লাগছে, কি সুন্দর তুলতুলে পুতুলের মতো দেখতে মেয়েটা। বাংলাদেশে না এলে বোধ হয় অরুর এই নতুন রূপ গুলো দেখাই হতো না কখনো।
পরক্ষণেই ক্রীতিকের ভেতর থেকে কেউ একজন চ্যাঁচিয়ে উঠে বলতে লাগলো,
আমি দেখেছি, বহুবার বহু রকম ভাবে দেখেছি ওকে। ওর সবটা শুধু আমার, শুধুই আমার।
ভিজে আছেন। ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে নিন, নয়তো ঠান্ডা লেগে যাবে।
একহাতে তোয়ালে বাড়িয়ে দিয়ে কথাটা বললো অরু। অরুর কথায় ভ্রম কাটলো ক্রীতিকের। সে স্বহস্তে তুলে নেয় তোয়ালে, অতঃপর সেটিকে গলায় ঝুলিয়ে বলে,
যাচ্ছি। কিন্তু তুমি এখানে ওয়েট করো, আমার অনেক কথা জমে আছে।
অরু জবাব দেয় না কোনো, চুপচাপ বসে পরে খাটের উপর। অরুর মৌনতা বরাবরই সম্মতির লক্ষন সেই ভেবে ওয়াশ রুমে ঢুকে যায় ক্রীতিক।
ওদিকে অজ্ঞাত অরু এখনো নির্বাক, ওর কেন যেন কোনোকিছুই বিশ্বাস হয়না আজকাল, এখনো হচ্ছে না।
শুধু মনে হচ্ছে সুপারস্টার জায়ান ক্রীতিক কোন দুঃখে এই কাজ করবে? কেন'ই বা অরুর মতো একটা তুচ্ছ মেয়ের জন্য সেই সুদুর আমেরিকান চাকচিক্য কে পায়ে হটিয়ে ছুটে আসবে এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায়?
সবসময়ের মতো এবারও কোনো প্রশ্নের উত্তর নেই অরুর নিকট। ভাব-নার কিয়ৎক্ষন পরে চুল মুছতে মুছতে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে এলো ক্রীতিক। অরু তাকালো সেদিকে, কালো টিশার্ট আর কালো ওভার সাইজ কার্গোতে ভীষণ স্নিগ্ধ লাগছে তাকে।
ক্রীতিক গলায় ঝোলানো তোয়ালে দিয়ে চুল মোছার কাজ অব্যাহত রে-খেই শুধালো,
কি দেখছো?
আপনাকে। কেন যেন বিশ্বাস হচ্ছে না মূহুর্তটা, কারন আপনি আমার কাছে মানসিক রোগ ছাড়া আর কিছুই নন।
নির্বিকার উত্তর অরুর।
অরুর কথায় ক্রুর হাসলো ক্রীতিক। ঠোঁটের আগায় আলতো হাসিটা ধরে রেখেই বললো,
- আমি ঠিক কি করলে বিশ্বাস হবে তোমার?
ক্রীতিকের কৌশলী লাগামহীন কথায় চট করে চোখ নামিয়ে নিলো অরু। তড়িঘড়ি করে কথা ঘুরিয়ে বললো,
হঠাৎ এতোদূর কেন এলেন? আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন আমার সম-স্যার কথা।
- তার আগে বলো তুমি আমাকে না বলে কেন চলে এলে?
ক্রীতিকের কণ্ঠস্বর দৃঢ়, তারমানে সে এই মূহুর্তে সিরিয়াস। কিন্তু অরুর ও তো ভেতরে ভেতরে অভিযোগ অভিমানের পাহাড় জমে আছে ভীষণ। সহসা ক্রীতিকের কথার প্রত্যুত্তরে সে বললো,
আপনিও তো বিয়ের রাতে উধাও হয়ে গিয়েছিলেন। তারপর কখনো খোঁজ নিয়েছেন? কি বলতাম আমি?
মেয়েটার মেকি তেজ দেখে অবাক হলো হলোনা ক্রীতিক। যেন এই তেজ টুকুতে অক্ষি জুড়ালো ওর। সেভাবেই বিনাদ্বিধায় চোয়াল শক্ত করে কন্ঠস্বরে গমগমে আওয়াজ তুলে বললো,
এটা মোটেই আমার প্রশ্নের উত্তর নয় অরু। তুমি আমার তিন কবুল বলে বিয়ে করা বউ। আমি উধাও হয়ে যাই, খোঁজ না নিই, কিংবা হারিয়ে যাই, বিয়েটাকে অস্বীকার তো আর করিনি কখনো। তাহলে নিজের স্বা-মীর অনুমতি ব্যাতীত একাএকা এতদূর চলে আসার সিদ্ধান্ত টা কি করে নিলে তুমি? এতো বড় সাহস হলো কি করে তোমার?
কথা বলার সময় চোখের রং বদলে গেলো ক্রীতিকের। এই মূহুর্তে অগ্নি স্কুলিঙ্গের মতোই বিস্ফোরিত তার দু'নয়ন। হঠাৎ করে অরুর মনে হলো এই বদমেজাজি ভীষণ উগ্র মানুষটা তো ক্রীতিক নয়, ক্রীতিকের এই রূ-পটা অরুর নিকট সম্পূর্ণ নতুন। অরু ভড়কালো তবে চোখেমুখে সেই দৃশ্য ম্লান। উল্টো জিভ দিয়ে শুষ্ক অধর ভিজিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যা-ওয়ার জন্য উদ্যত হয় অরু, বাইরের দিকে পা বাড়িয়ে ক্ষুদ্ধস্বরে বলে,
- আমি উত্তর দিতে বাধ্য নই আপনাকে।
হিংস্রতা যেন বেড়ে গেলো ক্রীতিকের মাঝে। বাইরে তুমুল ঝড় বইছে। এরই মাঝে হুট করেই কি জানি কেন, নিভে গেলো রুমের সকল আলো। অরু বেড়িয়ে যাচ্ছিল ক্রীতিক তৎক্ষনাৎ বিদ্যুৎ গতিতে পেছন থেকে একহাতে চেপে ধরে ওর সরু লতানো কোমর। পেশিতে বল প্র-য়োগ করে গলায় স্পষ্ট কাঠিন্যতা ধরে রেখে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
- কোথায় যাচ্ছো তুমি? অনুমতি দিয়েছি এখান থেকে যাওয়ার?
ক্রীতিকের স্পর্শ কেন যেন আজ যন্ত্রনাদায়ক। সেই সাথে গলার আও-য়াজটাও বেশ ভয়ানক। ওর এহেন আকষ্মিক উদ্ভট আচরনে ভয়ে শি-উরে উঠলো অরু। ভীষণ কষ্টে ধরা কন্ঠে বললো,
এসব কি করছেন? আ... আপনাকে অন্যরকম লাগছে।
অরুর আতঙ্কিত আওয়াজ শোনার সঙ্গে সঙ্গে ঢিলে হয়ে গেলো ক্রীতি-কের হাতের বাঁধন। সেই সাথে নিভে গেলো চোখের সকল অগ্নুৎপাত। কয়েক মূহুর্ত চোখ দুটো বন্ধ রেখে নিজেকে সামলালো সে, অতঃপর দী-র্ঘশ্বাস ছেড়ে শান্ত স্বরে হিসহিসিয়ে বললো,
আ'ম সরি।
ক্রীতিকের কন্ঠে কাতরতা। ওর ক্রমাগত ওঠানামা করা শ্বাস-প্রশ্বাস নি-দ্বিধায় আঁচড়ে পরছে অরুর ঘাড়ের কাছে। অন্ধকারের মাঝে সেখানটায় ক্রীতিকের ঠোঁটের ভেজা স্পর্শ অনুভব হতেই ছিটকে দূরে সরে যায় অরু। ভীষণ অস্বস্তি নিয়ে ব্যগ্র কন্ঠে বলে ওঠে,
ছোঁবেন না।
- বাঁধা দিচ্ছো?
ক্রীতিকের হাস্তিস্বর কর্ণকুহর ভেদ করতেই অরু ভয়ের চোটে মিনমি-নিয়ে বলে,
--- না অনুরোধ করছি।
থমকালো ক্রীতিক। হালকা কেশে গলাটা পরিষ্কার করে প্রসঙ্গ পাল্টে বললো,
তোমার পরিবার কোথায়?
নেই।
ছোট্ট করে উত্তর দিলো অরু।
ওর উত্তর শুনে ফের মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো ক্রীতিকের, বললো,
আবার ভুলভাল উত্তর দিচ্ছো?
যা সত্যি তাই বলছি।
তাহলে তোমার বাবা মা?
কেউ নেই।
অরুর এহেন উত্তর শুনে ক্রীতিক দাঁত কিড়িমিড়িয়ে বললো,
কেউ নেই মানে কি? তাহলে তুমি একা একা এতো বড় বাড়িতে করছো টা কি?
অরু উপহাস করে হেসে বললো,
এ বাড়িটা যে আমার সেটা বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি?
অরুর কথার হেঁয়ালিপনায় ওর নিকট এগিয়ে এসে অরুর হাতদুটো নি-জের একহাতের মুঠোয় পুরে, পেছন দিকে চেপে ধরে ক্রীতিক বললো,
---- আমায় তুমি কতটা চেনো বালিকা?
বাইরে বিজলির ঝলকানি। সেই মৃদু আলোতে ক্রীতিকের দীঘির মতো গভীর চোখে দৃষ্টিপাত করে অরু। অতঃপর করুন স্বরে বলে,
যতটা চিনলে আপনি আমার মানসিক অসুখে পরিনত হতে পারেন, ঠিক ততটা।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অরুর হাত দুটো ছেড়ে দিলো ক্রীতিক। এরপর শা-ন্তস্বরে বললো,
-- এখন তো কল্পনা নয়। তাও মেনে কেন নিচ্ছো না?
- আমি দ্বিধাগ্রস্ত জায়ান। এখনো বিশ্বাস করে উঠতে পারছি না নি-জেকে। তাছাড়া আপনি হলেন দূর আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র। যাকে শুধু দূর থেকে দেখে ভালোবাসা যায়, যাকে নিয়ে অকপটে স্বপ্নের জগতে বিচরণ করা যায়, কিন্তু কাছাকাছি গেলে ঝলসে যেতে হয়।
এখনো ভুলের মধ্যে আছো বেইবি।
-আমলকীকে ডেকে দিচ্ছি, ও হ্যাজাক জ্বালিয়ে দিয়ে যাবে। ততক্ষণ একটু অন্ধকার সহ্য করুন। এটা তো আমেরিকা নয় এখানে লোড শে-ডিং নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।
---তুমি কাছে থাকলে আলোর প্রয়োজন নেই অরু পাখি। আমি যে ঘোর অন্ধকারেও তোমায় দেখতে পাই।
ক্রীতিকের আদুরে ডাকে সারা দেয়না অরু। বরং কথাটুকু শেষ করে নিঃশব্দে ত্যাগ করে চলে যায় ওর কক্ষ।
রাতের বেলা খাবারের আয়োজন করা হয়েছে হলরুমের ডাইনিং এ। হরীতকী ডেকে নিয়ে এসেছে ক্রীতিককে। অরু তখন ডাইনিং এই উপ-স্থিত ছিল। আমলকী রান্নাঘর থেকে একে একে খাবারের বহর এনে সা-জাচ্ছে টেবিলে। যদিও তার উচ্চতা টেবিলের সমান, তবুও তার হাতের রান্না করা খাবারের সুস্বাদু গন্ধে ম ম করছে চারিপাশ।