ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রণয়ভেলা

১৯তম পর্ব

লেখক: সুরাইয়া রাফা
হরেক রকমের খাবার। পাহাড়ি বন মোরগের মাংস, চিংড়ির দোপেয়াজা, গরুর কলিজা ভুনা, কয়েক পদের ভর্তা, ডিমের কোরমা, রোস্ট, পোলাও, সহ আরও কিছু সালাদ আইটেম আর সবশেষে ডেজার্ট হিসেবে বড়বড় সাইজের রসগোল্লা আর ক্ষীর। বৃষ্টি বাদলের রাতে টেবিলে এতো এতো খাবারের বহর দেখে আশ্চর্য হয় ক্রীতিক। চেয়ার টেনে বসার আগেই টেবিলের খাবার গুলোতে এক নজর চোখ বুলিয়ে হতভম্ব কন্ঠে অরুকে উদ্দেশ্য করে বলে ওঠে,
এতো খাবারের আয়োজন করেছো কেন? কে খাবে?
অরু উঠে গিয়ে নিজ হাতে ক্রীতিকের প্লেট সাজিয়ে তাতে খাবার বেড়ে দিতে দিতে বলে,
কে আবার আপনি খাবেন।
চেয়ার টেনে বসে ক্রীতিক, অরুর কথার প্রত্যুত্তরে বলে,
এই ঝড়ের রাতে বিদ্যুৎ নেই, কিছু নেই অথচ এতোগুলো খাবার একসাথে কে রান্না করলো?
অরু চোখের ইশারায় বামন মেয়েটাকে দেখিয়ে নিরেট কন্ঠে বললো,
---- আমলকী।
অরুর ইশারা অনুসরণ করে ক্রীতিক চাইলো বামন ছেলে মেয়ে দু'টোর দিকে। তারা ও ক্রীতিকের দিকেই নিস্প্রভ চোখে চেয়ে আছে তখন থেকে। তাদের দৃষ্টি কিঞ্চিৎ অদ্ভুত। যেন চোখের ইশারায় হাজার বার ক্রীতিককে কুর্নিশ করায় ব্যতিগ্রস্ত তারা। ক্রীতিক ড্যাবড্যাবিয়ে চেয়ে রইলো শুধু। এটা কি শুধু ই মনিবের স্বামী বলে সম্মানার্থে জানানো কু-নিশ, নাকি আতঙ্কে বিবর্জিত হয়ে নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ? ঠিক বোধগম্য হলোনা। যেন কোনো কিছুর জন্য ক্রীতিকের কাছে ভীষণ দা-য়বদ্ধ তারা। কেন যেন ক্রীতিকের হুট করেই মনে হতো লাগলো এই দৃষ্টি মোটেই সমীচীন নয়।
কি হলো শুরু করুন?
অরুর ডাকে ভাবনার সুতো ছিঁড়লো ক্রীতিকের। ও তৎক্ষনাৎ হ্যা সূচক মাথা নাড়িয়ে মন দিলো খাবারে।
রাতে ঘুমানোর সময় বাঁধলো আরেক বিপত্তি। নির্জন পাহাড়ি অঞ্চলের অজানা অচেনা পোকামাকড়ের সঙ্গে মোটেই পরিচিত নয় ক্রীতিক। তা-রউপর জঙ্গলের অধিপতি বিশাল কিং সাইজের মশারা তো আছেই। রাত বাড়তেই একটু থেমে পুনরায় দিগুণ তালে ঝড় উঠেছে বাইরে। এবার শুধু বৃষ্টি বাতাস নয়, বজ্রপাতের গগন বিদারক নৃশংস গর্জন ও রয়েছে সাথে। ঝড়ের তোপে বাইরের পোকামাকড়ের দল সব এসে গেড়ে বসে আছে ক্রীতিকের সারা ঘরে।
হ্যাজাকের আলো জ্বালিয়ে রাখা অবস্থাতেই ক্রীতিক ঘুমানোর প্রয়াস চা-লালো কিয়ৎক্ষন। কিন্তু পারলো না, মশার কামড়ের সঙ্গে ঘুম টা বড্ড বেমানান। তাই উঠে গিয়ে দক্ষিণ দিকের দেওয়াল জোড়া জানালার কপাট গুলো খুলে দাঁড়িয়ে রইলো নির্বিগ্নে। তৎক্ষনাৎ বাইরের ঝোড়ো হাওয়ায় এলোমেলো হয়ে যায় রুমের সকল আসবাবপত্র।
তাতেও কোনোরূপ হেলদোল নেই ক্রীতিকের মাঝে। বরং নিগূঢ় দৃষ্টি মেলে ক্রীতিক তাকিয়ে রইলো বাড়ির পেছনে গভীর জঙ্গলের দিকে। ওর দৃষ্টি মৃত মানুষের মতোই নির্জীব আর অপলক। যেন ক্রীতিক আর ক্রীতিকের মাঝে নেই, ওর মাঝে বিচরণ করছে স্বয়ং অন্যকেউ। অথচ কয়েক সেকেন্ডের জন্য বিজলির আলোয় সেই শূন্য চোখের মনি জুগল তেজস্ক্রিয় সূর্য কীরণের মতোই দপ জ্বলে উঠলো যেন। গভীর কালো চোখ দু'টোর মনি জুগলে হঠাৎ পরিলক্ষিত হলো বাঘের মতো ডোরা-কাটা দাগ। পুনরায় কয়েক মূহুর্তের মধ্যে নিকোশ আঁধারের তলানিতে মিলিয়ে গেলো সেই অদ্ভুত রঙের গভীর নেত্রজুগল।
ওদিকে ঝড়ের মাঝেই ব্যগ্র কদমে ছুটে এসে দরজা ঠেলে ক্রীতিকের কক্ষে প্রবেশ করে অরু। অকস্মাৎ কারও আগমন টের পেয়ে পেছনে দৃষ্টিপাত করলে ক্রীতিক দেখতে পায় মশারি হাতে নিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে ওর ফুলের মতো টুকটুকে রাঙা বউ।
- নিশ্চয়ই ভয় পেয়ে ছুটে এসেছো?
ক্রীতিকের গমগমে পুরুষালি কন্ঠে করা প্রশ্নটাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে অরু ওর নিকট এগিয়ে এসে বলে,
পাহাড়ে বেড়ে ওঠা মেয়ে আমি। তাই এসব ঝড়ে টড়ে ভয় পাইনা। নেহাৎ আপনি আমেরিকান মানুষ মশার কামড়ে নিশ্চয়ই ঘুমাতে পারছেন না, তাই মশারী নিয়ে এলাম, টাঙিয়ে দিয়ে চলে যাবো আবার।
আচ্ছা!
বিদ্রুপাত্তক স্বরে ক্রীতিক শব্দটা উচ্চারণ করতে না করতেই, প্রকান্ড বজ্রপাতের আওয়াজে আচমকা কেঁপে ওঠে ধরণি। দক্ষিণের জানালাটা তখন ও হাট করে খোলা ছিল, অগত্যা বাজ পড়ার আওয়াজে ভয়ের চোটে মশারি ছুড়ে ফেলে দিয়ে ঝপাৎ করে ক্রীতিকের বুকে এসে হা-মলে পড়লো অরু। ওর স্ক্রিনি টিশার্টটা দু'হাতে শক্ত করে খামচে ধরে চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে বিড়বিড়িয়ে বলে ওঠে,
ভয় করছে, দূরে যাবেন না প্লিজ।
যাবো না।
ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে কথাটা উচ্চারণ করে, অরুকে বুকে নিয়েই ধপ করে খাটে শুয়ে পরে ক্রীতিক। নিকোশ নিঝুম অন্ধকার, চারিদিকে এলো-মেলো দমকা হাওয়া, ক্রীতিক অরুকে দু'হাতে জাপটে ধরে শুয়ে আছে নির্বিগ্নে। মূহুর্তটা রোমাঞ্চকর, দু'জনার ভারী বেগতিক নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কোনো আওয়াজ নেই কোথাও। অরু চোখ বুঁজে নাক টেনে গন্ধ নেয় ক্রীতিকের শরীরের। মানুষটার সৌবিষ্ঠ বক্ষ ভাঁজে মুখ লু-কিয়ে, গায়ের সঙ্গে একেবারে মিলে গিয়ে রিনরিনে আওয়াজে বলে,
--- আপনাকে অবাস্তব মনে হচ্ছে না। আবার বাস্তব ভাবতেও দ্বিধা হচ্ছে হৃদয়ে।
দু'হাতের বাঁধন শক্ত করলো ক্রীতিক। অরুকে আরও কাছে টেনে এনে হাস্কিস্বরে বললো,
শুনতে পাচ্ছো অরু?
কি?
- আমার হৃদস্পন্দন।
কি ভেবে যেন অরু এবার কান পাতলো ওর বুকের মধ্যেখানে, তৎক্ষ-নাৎ শুনতে পেলো বেসামাল হৃদস্পন্দের ধুকপুক আওয়াজ। এমনটা তখনই হয় যখন তুমি কাউকে মন থেকে চাও আর নাজুক চাহিদার সেই মানুষটা তোমার আশেপাশেই অবস্থান করে।
কিন্তু ক্রীতিক তো কখনো চায়নি অরুকে, মায়ের জোড়াজুড়িতে নাস্তানা-বুদ হয়ে তোপের মুখে বিয়েটা করেছিল সেদিন। হতেও পারে আজও একই কারণে'ই এতোটা দূরে অরুর খোঁজে ছুটে এসেছে সে।
কিছু সময় ভেবে মনের অযাচিত ভাবনাকে প্রাধান্য দিয়ে ক্রীতিকের থেকে দূরত্ব বাড়ায় অরু। চট করেই উঠে দাঁড়িয়ে কঠিন অথচ জর্জরিত কন্ঠে বলে,
-- আজ বৃষ্টি ছিল তাই কোথাও যেতে বলিনি। সকাল হলেই ফিরে যা-বেন দয়াকরে। আপনি চাকচিক্যে ঘেরা শোবিজ দুনিয়ার মানুষ। এটা মোটেই আপনার থাকার জন্য উপযুক্ত জায়গা নয়।
ক্রীতিককে আর কোনো কিছু বলার ফুরসত না দিয়েই এক নাগারে কথা-গুলো শেষ করে দ্রুত কদমে রুম থেকে বেরিয়ে যায় অরু।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন