পর্ব - ২৫
প্রিসিলার শেষ কথাগুলো শোনা মাত্রই আচানক ওকে ছেড়ে দিলো ইয়াশ। চোখের পলকে দূরত্ব বাড়ালো কয়েক কদম। তা-রপর যন্ত্রের মতো পিছিয়ে যেতে যেতে শীতল গলায় আওড়ালো,
ইউ্য মেইক মি লাইক দ্যাট। আই রিপিট প্রিসি, ইউ্য মেইক মি ক্রেজী।
ইয়াশের মুখ থেকে ওয়াইফ শব্দটা শোনার পর কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল নিভান।
এতোকিছুর মাঝেও বিস্ময়বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল নির্বাক হয়ে। রক্ত ঝরছিল, তবুও কাতর দৃষ্টি আঁটকে ছিল ইয়াশের দু'হাতে আবদ্ধ ওই রাশান মেয়েটার উপর। প্রতিটি ঘটনাই তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছিল যেন। কিন্তু যতক্ষণে টের পেয়েছে সবকিছু, ততক্ষণে অনেকদূর গড়িয়ে গেছে পরিস্থিতি। তবুও শেষ চেষ্টা করতে পিছপা হলোনা নিভান। দ্রুত গিয়ে ইয়াশকে আটকানোর পাঁয়তারা করে হাত রাখলো তার কাঁধে। পরাজিত স্বরে বললো,
- ইয়াশ, ব্রো, জাস্ট লিসেন টু মি। কোথাও একটা ভুল হচ্ছে। উই ডিড'ন্ট স্লিপ টুগেদার।
নিভানের এতোটা নমনীয়তার পরেও টললো না হিমালয়। উল্টো জোরালো ঝটকায় কাঁধে রাখা হাতটাকে ছিটকে সরালো ইয়াশ। অতঃপর বুটের তলায় বালু উড়িয়ে হনহন করে বেড়িয়ে গেলো ঘর থেকে।
সকালের ঘটনার পরে যত দ্রুত সম্ভব মাহিনের সি-সাইড ভিলায় ফিরে এসেছে প্রিসিলা। কিন্তু ইয়াশের কোনো খবর নেই। সকাল থেকেই লাপাত্তা সে। ফোনটাও বন্ধ। মাহিন আঙ্কেল কাজ থেকে ফিরেছেন গত কালকে, হৃদমিলা অবশ্য এখনো নেটওয়ার্কের বা-ইরে। তারও কোনো খবর নেই। না থাকুক খবর, এই মূহুর্তে দুনি-য়ার কাউকে নিয়ে কোনো প্রকার মাথা ব্যথা নেই প্রিসিলার। সে শুধু ওই একটা ছেলের চিন্তায় বিভোর যাকে ও দুনিয়ার সবার চেয়ে বেশি অপছন্দ করে, কিংবা পছন্দও করে সবার চেয়ে বেশি। মানুষ নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি সবচেয়ে বেশি আকর্ষন অনুভব করে, প্রিসিলার কাছে ইয়াশ চরিত্রটা ঠিক তেমনই। অপ-ছন্দের তবুও আগ্রহের।
মনের খবর মন জানেনা, তবে মেয়েটা যে ফিরেছে থেকেই অস্থির আর মনমরা হয়ে আছে তা চোখ এড়ায়নি মাহিনের। দুপুরে খা-বার টেবিলে বসেও কিচ্ছুটি মুখে তোলেনি সে, ভালো লাগছে না, গা গুলাচ্ছে ইত্যাদি ইত্যাদি বাহানা দেখিয়ে কৌশলে উঠে গেছে প্লেট রেখে।
তখন ভর সন্ধ্যা, সকালের সেই অপ্রত্যাশিত তিক্ত ঘটনার প্রায় বারোঘন্টা হতে চললো, এখনো বাড়ি ফেরেনি ইয়াশ। প্রিসিলার দুশ্চিন্তা হচ্ছিল খুব, সহসাই বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালো মেয়েটা। বা-ইরে চঞ্চল কিশোরীর মতো নেচে বেড়াচ্ছে হিমহিম শীতল হাওয়া, অক্টোবরের শেষ সময়টা সবচেয়ে সুন্দর। আবছা শীতল কুয়াশায় তখন বিষন্ন সন্ধ্যাবেলাকেও স্নিগ্ধ মনে হয়। তবে আজকের এই শীতের ঘ্রাণ মাখা স্নিগ্ধ শীতল হাওয়াটাকে বড়ই গুমোট লাগলো প্রিসিলার নিকট। একটা অহেতুক শূন্যতা অকারনেই কাটা করে তুলেছে তাকে। বুকের মাঝে চিনচিন করছে নীরব এক অজানা ব্যথা। সেই ব্যথার তীব্রতা এতোই বেশি যে রমণীর নীলাভ সমু-দ্রের ন্যায় চোখের কোটর জলে ভরে উঠেছে বারবার। নিজের সঙ্গে নিজের হাজার বাকবিতন্ডার পরেও কিছুতেই লুকোতে পা-রছে না এই সদ্য জন্মানো অনুভূতি।
ওদিকে বিকেল থেকে গার্ডেনে বসে প্রিসিলাকে ক্রমাগত বারা-ন্দায় পায়চারি করতে দেখছে মাহিন। মেয়েটাকে নিয়ে আগেই সন্দিগ্ধ ছিল সে, এবার যেন সন্দেহটা পাকাপোক্ত হলো। ফলস্ব-রূপ সময় নষ্ট না করে উপরের ঘরে গিয়ে ডাকলো প্রিসিলাকে। মেয়েটা ভেতর থেকে দরজা খোলা আছে বলে হাঁক ছাড়লে সত-র্ক পা ফেলে ভেতরে ঢুকলো মাহিন। প্রিসিলার মুখোমুখি হয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলো,
- তুমি কি কোনোকিছু নিয়ে আপসেট, বাচ্চা?
তড়িঘড়ি করে মাথা নাড়ালো প্রিসিলা। ঠোঁটের কোণে মেকি একটা হাসি ঝুলিয়ে জবাব দিলো,
-না না আঙ্কেল তেমন কিছু নয়, আসলে...
মিথ্যে বলোনা, বয়সে আমি তোমার চেয়ে অনেক বড়, তাই কথা লুকানোর অভিজ্ঞতাটাও আমার বেশি।
কথা সম্পন্ন করার আগেই নীরবে শাসনে মেয়েটাকে থামিয়ে দিলো মাহিন। প্রিসিলাও আর ভণিতা করলো না, সরাসরি বলেই ফেললো,
ইয়াশ কোথায় আঙ্কেল? সারাদিনেও তো ফেরেনি?
-তুমি কি এতোক্ষণ ইয়াশের জন্য দুশ্চিন্তা করছিলে?
মাহিনের প্রশ্নের বিপরীতে জোরে জোরে হ্যা সূচক মাথা নাড়ালো প্রিসিলা। ওর শুকনো মুখের দিকে চেয়ে কপাল গোছালো মাহিন। অতঃপর মেয়েটাকে ধাতস্থ করার উদ্দেশ্যে শান্ত গলায় জবাব দিলো,
-ইট'স ওকে বেটা। ইয়াংম্যান বিডিতে এসেছে একটুতো হ্যাং-আউট করবেই।
- ইট'স নট এ্যাবাউট হ্যাংআউট আঙ্কেল। তুমিকি প্লিজ বলবে আমায় ইয়াশ কোথায়?
মাহিন যতটা নিরুত্তাপ হয়ে প্রিসিলাকে বোঝাচ্ছিল, ততোধিক অস্থির গলায় চেঁচিয়ে উঠলো প্রিসিলা। মেয়েটার এরূপ উদ্যত বা-ক্যে মাহিন নিজেও একটু সতর্ক হলো। স্রেফ কাজিনের জন্য কেউ এতোটা উতলা হয়? নাকি বিষয়টা আরেকটু গভীর? প্রশ্নটা থেকেই গেলো মাহিনের মনে। তবে মুখ ফুটে জিজ্ঞেস করলো,
ইজ এ্যানিথিং রং? তোমাদের মধ্যে কি কোনো ঝামেলা চলছে?
সবকিছু পরে বলবো আঙ্কেল। প্লিজ আপনি আমাকে ইয়াশের খবরটা দিন।
প্রতি মূহুর্তে প্রিসিলা কেমন শ্বাসরুদ্ধ আচরণ করছে। সমস্যাটা যেহেতু ওদের ভাইবোনের ব্যক্তিগত, তাই মাহিন আর ঘাটালো না মেয়েটাকে। একটু ভেবে রয়েসয়ে বললো,
সারাদিন ইয়াশের ফোন বন্ধ ছিল বলে আমি নিজেও চিন্তিত ছিলাম। পরে আমার এ্যাসিসট্যান্টকে দিয়ে খোঁজ পাঠালে সে জানায়, সন্ধ্যার পরেই নাকি ইনানীর একটা নাইট ক্লাবে ঢুকতে দেখেছে ওকে।
আপনি কি আমায় লোকেশনটা দিবেন আঙ্কেল?
বলেই ঘরে ঢুকে নিজের পার্স আর মোবাইলটা হাতে নিলো প্রি-সিলা। মাহিন হতচকিত হয়ে প্রশ্ন করলো,
সে কি, তুমি এভাবে একা যাবে? দাঁড়াও, আমি ড্রাইভারকে বলে দিচ্ছি।
বিপরীতে নিঃশব্দে মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানালো প্রিসিলা। বললো,
-- আই ক্যান ড্রাইভ।
ইনানীর মিডনাইট শ্যাডো নাইট ক্লাবের বাইরেটা শিথিল হলেও ভেতরে মানুষের সরগরম। ট্রান্সপারেন্ট কাচের দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই নীল, বেগুনী আর সবুজাভ ক্ষীণ রশ্মি এসে চোখ ধাঁধিয়ে তুললো প্রিসিলার। ভেতরে বিস্তৃত হলরুম জুড়ে সব চাক-চিক্যের সমাহার। মানুষজন নানান স্টাইলের বিদেশি পোশাক আসাক পরে আনন্দ করছে এখানে। কেউ দলবদ্ধ হয়ে আলাপ জুড়েছে, ক্যাসিনো ও চলছে একপাশে। সদা সংস্কৃতমনা বাঙালি-রাও যেন নিজেদের বেশভূষা পাল্টে পাশ্চাত্যের তথাকথিত মুক্ত-মনা হয়ে উঠেছে এখানে এসে। কমবেশি সবার হাতেই হুইস্কির গ্লাস। প্রিসিলার কাছে এসব দৃশ্য নতুন নয়। ছোটবেলা থেকেই ইতালিতে থাকার দরুন এর চেয়েও উশৃংখল জীবনযাপন আর বিকৃত মনোভাবের সঙ্গে পরিচিত সে।
তাই সবকিছু অগ্রাহ্য করে নিটোল পায়ে সামনে এগুলো।
ভেতরের দিকে কয়েক পা অগ্রসর হতে না হতেই আচানক নিভে গেলো সব আলো। থমকে গেলো প্রিসিলা। এতোক্ষণ ধরে নীলাভক্ষীণ আলোয় যেই মানুষগুলোকে দেখা গিয়েছিল, তারা এখন পু-রোপুরি অদৃশ্যমান। যেন এক মৃত্যুপুরীর উদ্ভাসন। প্রিসিলা সেখা-নেই দাঁড়িয়ে রইলো। মাকড়সার জালের মতো চারিপাশে ছড়িয়ে থাকা নিকশ কালো আঁধারে একপল সতর্ক দৃষ্টি ফেলে আবারও ঘুরে তাকালো সম্মুখে। তৎক্ষনাৎ সামনে থাকা মিনি সাইজের স্টেজটাকে লক্ষ্য করে হলের সবগুলো লাইট একযোগে জ্বলে উঠলো। আর প্রিসিলার চোখের সামনে ভেসে উঠলো সেই আকা-ভিঙ্ক্ষত মুখ, ইয়াশ ইউভান। চুল এলোমেলো। চোখ দু'টো কিঞ্চিৎ লাল। দৃষ্টি অস্থির। নিশ্চয়ই ড্রাংক হয়ে আছে। কিন্তু এভাবে স্টেজে দাঁড়িয়ে কি করছে ছেলেটা? প্রিসিলা আরেকটু ভালো-ভাবে খেয়াল করতে যাবে তখনই চারিপাশে আলোড়ন তুললো মনমাতানো মিউজিকের সুর। অস্বস্তিকর মিউজিকের বিট নয়, বরং একটা আকর্ষনীয় নস্টালজিয়া তরঙ্গচ্ছ্বাসের মতোই ঝঙ্কার তুলেছে চারিদিকে। প্রিসিলা স্তব্ধ হয়ে গেলো, বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে দেখলো ইয়াশ ইউভানের নব্য এক রূপ। কাঁধের মাঝে গীটার ঝুলিয়ে সামনে দণ্ডায়মান মাইক্রোফোনটার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ালো ইয়াশ। মিউজিকের সাথে সুর মিলিয়ে গীটারের বুকে ঘর্ষন তুললো। প্রফেশনাল রকস্টারদের মতোই কেঁপে উঠলো তার শরীর। অতঃপর প্রিসিলাকে পুরোপুরি হতবিহ্বল করে দিয়ে মিউজিকটা সামান্য একটু শিথিল হতেই বিটের ছন্দে পা মিলিয়ে
একাকী মন আজ নীরবে
বিবাগী তোমার অনুভবে,
ফেরারী প্রেম খোঁজে ঠিকানা
আকাশে মেঘ মানে বোঝো কিনা।
বিরহ নীলে নীলে বাঁধে বাসা,
অজানা ব্যথাআআআ,
অধরা তারাগুলো কাঁদে বেদনায়,
খেয়ালী তুমি কোথায়
নারে না না নানা, নারে না না না....
হলরুম ভর্তি শয়ে শয়ে মানুষ, সবাই হইহই করছে তার গান শুনে। কেউ কেউ একটুআধটু নাচের মূদ্রা অনুসরণ করছে। সুর আর গানের মাতাল করা তরঙ্গচ্ছ্বাসে যেন ভেসে গেছে ক্লান্তি, দুশ্চিন্তা, অবসাদগ্রস্ততা সব। কিছুক্ষণের জন্য সব মানুষগুলো যেন সমব-য়সী হয়ে উঠেছে। সকলের মাঝেই ধরা দিয়েছে কৈশোরের সেই প্রাণবন্ত উল্লাস। একমুহূর্তের জন্য প্রিসিলার মনে হলো শত মানু-ষের ভীরের মাঝেও ওই অদ্ভুত নজরকাড়া দৃষ্টি দিয়ে ওকেই বুঝি দেখলো ইয়াশ। কিন্তু তার গানের কথাগুলো এতো অভিমানী শো-নালো কেন? তাহলে কি মানুষটা অভিমান করেছে? ইয়াশ ইউ-ভান অভিমান করতে জানে এটা তো প্রিসিলার কল্পনারও বাইরে।
প্রিসিলার ভাবনার মাঝেই গান শেষ হলো, ইয়াশ স্টেজ থেকে নেমে গীটার তুলে দিলো কতৃপক্ষের হাতে। তারপর চলে গেলো সোজা বার কাউন্টারের সামনে। চুপচাপ একটা বারস্টুল টেনে নিয়ে ওয়াইনের অর্ডার করলো। প্রিসিলা যে এতোক্ষণ ধরে ওকে আচ্ছন্নের মতো অবলোকন করছে তা যেন দেখেও দেখলো না ছেলেটা। ওর চোখেমুখে একটা অহংকারী রুষ্টভাব নিদারুণ খেলা করছে। প্রিসিলা এসে নিভৃতে দাঁড়ালো ওর পাশে। ইয়াশ তবুও নির্বিকার। এতোগুলো মানুষের ভীরেও দু'জনার একটা নৈঃশব্দ্যিক জগত তৈরি হয়েছে, সেই জগতে বিচরণ করছে শুধু-মাত্র দীর্ঘশ্বাসের প্রতিযোগীতা। অসহনীয় এই নৈঃশব্দ্য ভেঙে একপর্যায়ে ডেকে উঠলো প্রিসিলা,
- ইয়াশ! একটু কথা...
বাকি কথা সম্পন্ন করতে পারলো না আর, তার আগেই স্টুল ছে-ড়ে উঠে দাঁড়ায় ইয়াশ। অভিমান, অভিযোগ কিংবা তারচেয়েও বড় কোনো আঘাতে প্রস্তরীভূত হয়ে রইলো সে। একবার ঘুরে অবধি তাকালো না প্রিসিলার পানে। প্রিসিলা মাথা উঁচালো, হিমা-লয়ের মতো সটান যুবকের সামনে ও এক পুঁচকে মেয়ে। তবুও দু'হাতে ছেলেটার বাহু ঝাঁকিয়ে জানতে চাইলো,
- আমরা কি একটু কথা বলতে পারি?
ইয়াশ আর জবাব দিলো না। হনহনিয়ে বেড়িয়ে গেলো ক্লাব থেকে। প্রিসিলাও ওর পিছু নিলো। বাইরে বেরোতেই সমুদ্রের শীতল দমকা হাওয়ায় শিরশির করে উঠলো সর্বাঙ্গ। আকাশটা অলৌকিক থমথমে। বোধ হয় মেঘ জমেছে, একটু বাদেই বৃষ্টি হবে। বাতাসে তার স্পষ্ট পূর্বাভাস। কিছুদূর যেতেই আবারও গলা চিঁড়ে ডাকলো প্রিসিলা,
তুমি কি এখনো রেগে আছো? আচ্ছা কেন রেগে আছো বলোতো? নিভানকে আমার রুমে দেখেছিলে বলে?
শেষ কথাটা বলতে না বলতেই একেবারে উল্টো স্রোতের মতো ওর দিকে ধেয়ে এলো ইয়াশ। মুখটা ওর মুখের কাছে নিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে হিসহিসিয়ে বললো,
- ডু ইউ্য থিংক আই ফাকিং কেয়ার? তুই কার সঙ্গে থাকলি না থাকলি, রুম শেয়ার করলি নাকি বেড শেয়ার করলি, দ্যাটস নান অফ মাই বিজনেস।
চলছে.....