পর্ব - ২৭
চিরকুটটাতে চোখ বোলানো মাত্রই স্তব্ধ এক অভিমান জেঁকে বসলো হৃদের ভেতর। বৃষ্টিতে ভিজে কাগজের মতো ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়া মুখে তখন আষাঢ়ে আধার। চোখের কোটর চিকচিক করছে প্রত্যাখান নামক সুক্ষ্ম এক অপমানে। ঝাপসা চোখে রুমা-লটাকে আরও একবার দেখলো হৃদ, অতঃপর বেদনারুদ্ধ স্বরে বলে উঠলো,
আপনার এতোই তাড়া যে নিজের নামটা অবধি লিখে যেতে পারেননি, আর না তো একটাবার চেষ্টা করেছেন আমার নাম জা-নার। তাহলে কন্ট্যাক্ট নাম্বার কেন লিখে দিয়ে গেলেন? দায়মুক্ত হওয়ার জন্য? কিন্তু আমিতো অতোটাও উদার নই মি. মিস্ট্রি। কোনোদিনও দায়মুক্ত করবো না আমি আপনাকে। আপনার আর আমার ক্ষণিকের সাক্ষাৎ এখানেই সমাপ্ত। আলবিদা।
বলেই অন্ধকারের মাঝে নাম্বার লেখা রুমালটাকে ছুড়ে ফেললো অদৃশ্য এক পাহাড়ের ঢালে।
মিলানো, ইতালি।
প্রায় সপ্তাহ খানিক পরে।
ইয়াশ আজ মিলানোতে ফিরেছে। যেহেতু প্রিসিলা রোহানের সঙ্গে আগেই ফিরে এসেছে, তাই একাই ফিরেছে সে। ইয়াশ যখন এয়া-রপোর্ট থেকে বেড়িয়ে নিজের ব্ল্যাক ল্যাম্বরগিনি নিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে বেড়িয়ে পড়েছে তখন খুব সকাল।
মাথার উপর বিস্তৃত আকাশটা অলৌকিক নীল। সূর্য এখনও তেজ ছড়ায়নি, এক ঈষদুষ্ণ কাচপোকা সোনাবরণ রোদ্দুরে ছেয়ে আছে চারপাশ। রাস্তার ধারের ম্যাপল গাছের পাতায় পাতায় খে-লছে ভোরের নরম বাতাস। স্নিগ্ধ সেই বাতাস কেটে কেটে রূপো-রঙা তকতকে রাস্তা ধরে শাঁই শাঁই করে এগিয়ে চলেছে ব্ল্যাক ল্যাম্বরগিনিটা।
একহাতে স্টিয়ারিং সামলে, অন্যহাতে চোখের মাঝে বড়সড় একটা চৌকো রোদচশমা চড়ালো ইয়াশ। তারপর আস্তে করে সরিয়ে দিলো ট্রান্সপারেন্ট ছাঁদটা।
অনেকদিন পরে যানযটমুক্ত রাস্তায় ড্রাইভ করতে বেশ ভালো লা-গছিল তার। গত বেশকিছুদিন ধরে বুকের মাঝে চলতে থাকা উত্তাল ঝোড়ো হাওয়াটাও শিথিল হয়েছে খানিক। মুখে স্বীকার না করলেও প্রিসিলাকে মন থেকে মুছে ফেলার চেষ্টাতে এখনো সফল হতে পারেনি ইয়াশ। বারবার শুধু ওই সোনালি চুলের ছল-নাময়ী মেয়েটা ঘুরঘুর করতে থাকে চোখের তারায়। ইয়াশ বিরক্ত হয়, মাঝেমধ্যে বকাঝকাও করে খুব, তারপর আবারও হতাশ দী-র্ঘশ্বাস ছেড়ে ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে ওই মেয়েটাকে নিয়েই ভাবতে থাকে সারাক্ষণ। এই যেমন এখনো ভাবছে। ভাবনার মাঝেই হঠাৎ ম্যাসেজের টুংটাং আওয়াজে সংবিৎ ফিরে পেলো ইয়াশ। পাশের সিটে খুব অবহেলায় পরে আছে মোবাইলটা, ততোধিক দায়সারা হাতেই সেটাকে তুলে এনে ম্যাসেজ চেক করলো ছেলেটা। অপরি-চিত নাম্বার, তবে প্রোফাইল অপশনে নিভানের হাস্যোজ্জল চেহা-রাটা ভাসছে। সেটা দেখা মাত্রই চোখেমুখে মেঘ থমথমে আধার খেলে গেলো ইয়াশের। দাঁতে দাঁত পিষে আওড়ালো,
--- দিসস এসহোল!
বিরক্ত হয়ে ফোনটা ফেলেই দিচ্ছিল প্রায়। তারপর আবারও কি ভেবে যেন মত বদলালো।
নোটিফিকেশন বার থেকে বেড়িয়ে সরাসরি ম্যাসেজ অপশনে ঢু-কলো। প্রোফাইলটা খুলে ধরতেই চোখের সামনে ভেসে উঠলো পেন্সিলে আঁকা অসম্পূর্ণ একটি স্কেচ। ইয়াশের কপাল কুঁচকে গেলো। এটা কেন পাঠিয়েছে নিভান? তারপর আরেকটু ভালো-ভাবে পর্যবেক্ষন করে বুঝলো স্কেচে আঁকা ব্যক্তিটি আসলে সে নিজেই। পৌরুষে আবিষ্ট মুখ, তীক্ষ্ণ চাহনি, ঠোঁটের নিচে তিল এমনকি লিপ পিয়ার্সিং দু'টো যোগ করা হয়েছে এখানে। আর্টিস্ট ব্যক্তিটি যে ইয়াশকে খুব সুক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষন করেছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা।
কিন্তু কে তৈরি করেছে এতো ভালো পোট্রেট? কার হাতের জাদু এটা? মনের মাঝে প্রশ্নটা উঁকি দিতেই পরপর আরও কয়েকটা ম্যাসেজ আসলো ফোনে। তাতে লেখা,
সেদিন প্রিসিলাকে আমার ছবি আঁকতে বলেছিলাম। দেন শী স্কেচ ইট, ডু ইউ্য থিংক দিস লুকস লাইক মি?
থমকে গেলো ইয়াশ। কুঁচকে থাকা কপালটা সরল হয়ে হয়ে উঠলো এক নিমেষে।
-- প্রিসি!
অতঃপর দু'ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে অদ্ভুত ভাবেই ছিটকে বেড়িয়ে এলো নামটা। পরমূর্হতেই আবারও ম্যাসেজ পাঠালো নিভান,
আই থিংক শী ইজ ইন লাভ উইথ দিজ ম্যান। দ্যাটস হোয়াই শী স্কেচ ইট।
শেষ ম্যাসেজটা কোনোমতে সিন করে মোবাইলটা আবারও আগের জায়গায় রেখে দিলো ইয়াশ। অতঃপর ঝড়ের বেগে স্টি-য়ারিং ঘুরিয়ে ইউটার্ন নিলো মাঝরাস্তায়। পরবর্তী পদক্ষেপ গুলো ছিল তার বেপরোয়া উদ্ভ্রান্তের মতো। ট্রাফিক পুলিশের তোয়াক্কা না করেই স্পিডোমিটারে একশোর উপর গতি তুলে ফেললো ইয়াশ। ল্যাম্বরগিনির অস্বাভাবিক গতিবিধি দেখে আশেপাশের সকলের যেন চোখ ধাঁধিয়ে গেলো। ডিউটি অফিসার আজকেও সিসিটিভি ফুটেজ দেখে দাঁত খিঁচিয়ে উঠলেন। ডেস্কের উপর সজোরে এক চাপড় মেরে বিরক্তির স্বরে বলে উঠলেন,
ফাঁক। ইট'স ইয়াশ ইউভান এগেইন!
চোখের পলকে পেরিয়ে গেলো কিলোর পর কিলো। আশেপাশের শয়ে শুয়ে চলন্ত গাড়িকে টপাটপ পেছনে ফেলে মাত্র কয়েক মি-নিটের মাথায় স্নোফ্লেক্স ম্যানরের সামনে এসে থামলো ল্যাম্বরগি-নিটা। ইয়াশ জানে ওর পেছনে পুলিশ ধাওয়া করছে, হয়তো চলেও আসবে কয়ক মিনিটের মধ্যে, তাই গাড়ি থেকে নেমে সি-টের উপর একটা ডলারের বান্ডিল ছুড়ে মারলো সে। অতঃপর ছোট্ট একটা স্টিকি নোট লিখে সেটা লাগিয়ে দিয়ে গেলো গাড়ির উপর।
'টেইক ইট এ্যাজ আ ফাইন। এ্যান্ড স্যরি ফর মাই মিসটেক।'
সদর দরজা ঠেলে হলরুমে পা রাখতেই চিরাচরিত ওয়াইল্ড ল্যা-ভেন্ডারের স্নিগ্ধ সুবাসটা বিমত্ত করলো ইয়াশকে। এই সুগন্ধিটা ইয়াশের জন্য বরাবরই স্ট্রেস রিমুভাল হিসেবে কাজ করে। যত-বারই বাড়িতে ঢোকে ততবারই মায়ের আঁচলের মতো একটা কা-চামিঠে অনুভব সবর্দা আবিষ্ট করে রাখে ওকে। আজকেও তার ব্যতিক্রম নয়, তবে আজকের ইয়াশ ইউভান একেবারে অন্যরকম এক সত্তা নিয়ে ঢুকলো বাড়িতে। ভেতরে গিয়ে দোতলায় যাও-য়ার আর তর সইলো না, হলরুম থেকেই গলা চিঁড়ে ডাকতে আর-ম্ভ করলো প্রিসিলাকে।
- প্রিসিইই! এ্যাই প্রিসি!
ডাকতে ডাকতে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতেই যাচ্ছিল, তক্ষুনি পাশ থেকে ভেসে এলো এক রাশভারী ভরাট কন্ঠস্বর,
-- প্রিসি নেই।
বজ্রাহাতের ন্যায় পাশ ঘুরলো ইয়াশ। দেখলো তুষার বসে আছে কাউচের উপর। একেবারে স্যুটেড ব্যুটেড হয়ে ফর্মাল লুক নিয়ে বসে আছে সে, হাতে ভাজ উল্টানো নিউজপেপার, সম্ভবত রোহা-নের জন্য অপেক্ষা করছে সে। রোহানের এলেই হয়তো অফিসের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পরবে। আপাতত তুষারের উদ্দেশ্য নিয়ে কো-নোরূপ মাথাব্যথা নেই ইয়াশের। ওর মস্তিষ্কে শুধু বিঁধলো একটাই বাক্য,
প্রিসি নেই!
নেই মানে! কোথায় প্রিসি?
এবারে আস্তেধীরে পেপারটাকে সাইডে সরিয়ে রেখে কাউচ ছেড়ে উঠে এলো তুষার। পকেটে দু'হাত গুঁজে ইয়াশের সামনে সটান দাঁড়িয়ে বললো,
প্রিসি নেই মানে নেই। আর থাকলেও ওর ধারে কাছে আর তোমাকে যেতে দিচ্ছি না আমি।
তুষারের কথা শুনে ইয়াশের শিথিল মস্তিষ্কটা অকস্মাৎ চড়াৎ করে উঠলো। এটাই বোধ হয় প্রথমবার তুষার কোনোকিছু নিয়ে মুখের উপর না করেছে ইয়াশকে। তাইতো অবিশ্বাস্য গলায় প্রশ্ন ছুড়লো ইয়াশ,
আর ইউ্য ইনসেইন পাপা?
-নো আ'ম নট।
প্রিসি ইজ মাই লিগ্যাল ওয়াইফ। তুমি বলা আর না বলায় কি-চ্ছু আসে যায় না।
কন্ঠে অনবদ্য দাপট নিয়ে কথাটা বললো ইয়াশ। ততোধিক জো-রালো স্বরে তাকে প্রতিহত করলো তুষার,
- খুব শীঘ্রই ডিভোর্স লেটার পেয়ে যাবে।
তুষার যে খুব সিরিয়াস হয়ে কথাগুলো বলছে, তা অবশেষে বু-ঝলো ইয়াশ। এতোক্ষণ নিলিপ্তে কথাগুলো বললেও, এবার তার মাঝেও একটা লড়াইয়ের স্পৃহা চলে এলো। জিদি গলায় বললো,
জীবনটাকে ছেলেখেলা পেয়েছো মনে হচ্ছে? যখন ইচ্ছে হবে বিয়ে দিয়ে দিবে, আবার যখন ইচ্ছে হয় ডির্ভোস ও করিয়ে ফে-লবে। প্রিসি আর আমি নিশ্চয়ই তোমার গেমিং টয় নই পাপা।
ইয়াশের কথা শুনে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফেরত দিলো তুষার। নির্জীব আশাহত হয়ে বললো,
মানুষ কাকে সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটা উপহার দেয় জা-নোতো? নিজের আত্মার কাছের মানুষটাকে। তুমি আমার সেই আত্মার কাছের মানুষটি ইয়াশ। তোমাকে আমি স্নেহ করি কিনা জানিনা, তবে তোমার মতো করে আমার জীবনে এতোটা আগলে আমি কখনো কাউকে রাখিনি, নেভার এভার। এমনকি তোমার মাম্মাকেও না। তুমি আমার রক্ত ইয়াশ। সেই রক্ত, যার জন্য আমি পরিত্যক্ত এক রেললাইনের মাঝে শুয়ে হাউমাউ কেঁদেছিলাম। তুমি সেই রক্ত, যার জন্য এখনো রাশিয়ার মাটিতে পা রাখলে সমস্ত শরীর থরথর করে কেঁপে ওঠে আমার। রক্তাক্ত হয়ে যায় বুকের পাঁজর। তুমি তারই অংশ, যার জন্য আজও আমি নাম পরিচয় না পাল্টে ব্রাটভায়ের তুষার জাওয়াদ হয়ে বেঁচে আছি।
সেই তোমাকে নিজের করে রাখার জন্য আমার আপ্রাণ প্রচেষ্টা। আমার জীবনের সবচেয়ে মুল্যবান জিনিসটা তোমাকে উপহার দেওয়া এই প্রচেষ্টারই একটি অংশ ছিল। ভেবেছিলাম প্রিসি তো-মার জীবনে থাকলে তুমি অন্তত এই আত্মিক বন্ধনটুকু ছিন্ন করত পারবে না কখনো। কারণ আমি জানি তুমি চলে আমি আবার হোঁচট খাবো, ঠিক আজ থেকে দুই যুগ আগের মতোই।
কিন্তু আমি ভুল ছিলাম। আমার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। হ্যা ঠিকই শু-নেছো, ফর দ্যা ফার্স্ট টাইম তুষার জাওয়াদ ওয়াজ রং। তুমি আমার দেওয়া উপহারটিকে অবজ্ঞা করেছো ইয়াশ। অতি তুচ্ছ জিনিসের মতোই মাটি ছুড়ে ফেলেছো। কিন্তু ওটা তো একটা ফুল। ও শুধু যত্নে আর আদরেই শোভা পায়, অবহেলায় নয়।
তাই খুব বেশি দেরী হওয়ার আগেই আমি আমার ফুলটিকে তো-মার কাছ থেকে ফিরিয়ে নিলাম। আর কখনো সে বিরক্ত করবে না তোমায়। সম্পর্কের শেষ দায়টুকুও আমি খুব শীঘ্রই চুকিয়ে দেবো। এখন থেকে তুমি আগের মতোই মুক্ত। নাও ইউ্য ক্যান ডু হোয়াটেভার ইউ্য ওয়ান্ট।
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে থামলো তুষার। ইয়াশ তখনও প্রস্ত-রীভূত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল চুপচাপ। তার মুখে বুলি নেই, কেবল চো-খের তারায় জ্বলজ্বল করছে অতি সুক্ষ্ম অপরাধবোধ। তখনই ফের বাক্য ছুঁড়লো তুষার,
--- এরপর অবশ্যই আমি আমার অতি মূল্যবান ফুলকে এমন জা-য়গায় হস্তান্তর করবো, যেখানে তারজন্য যথাযথ মূল্যয়ন এবং ভালোবাসা থাকবে।
এতোক্ষণ ধরে তুষারের বলা কথাগুলো শুনে ইয়াশের মাঝে যে তীব্র অপরাধবোধ জেঁকে বসেছিল তা এবার এক নিমেষে ক্রোধে রূপান্তরিত হলো। তুষার তো জানেনা তার অতিব মূল্যবান ফুলটি ইয়াশের কাছে তার চেয়েও বেশি মহামূল্যবান। প্রিসিলার ধারে-কাছে মোটেই সহ্য করতে পারেনা সে অন্য কাউকে। সেখানে তু-ষারের মুখে এহেন কথা শুনে মাথায় খুন চেপে বসলো ইয়াশের। ধারালো দৃষ্টিতে তাকালো সে পাপার দিকে। দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
চ্যালেঞ্জ করছো?
--যদি চ্যালেঞ্জ ভেবে নিয়ে থাকো, তবে তাই করছি।
বলেই পৈশাচিক ভঙ্গিতে ঠোঁট বাঁকালো তুষার। বিপরীতে ওর মু-খের উপর খানিকটা ঝুঁকে এলো ইয়াশ। চোখে চোখ রেখে চোয়া-লের পেশী শক্ত করে হিসহিসিয়ে আওড়ালো,
-আমি বেঁচে থাকতে আমার স্ত্রীকে কে অন্যত্র হস্তান্তর করে, তার বুকের পাটা কত বড় সেটা আমিও দেখবো।
সেদিনের পর প্রায় পনেরো দিন আর কোনো খোঁজ ছিলনা ইয়া-শের। কোথায় যেন হারিয়ে গিয়েছিল ছেলেটা। না কোনো ফো-নকল, না কোনো টেক্সট কিংবা অন্যকোনো মাধ্যম, কোনোভাবেই আর প্রিসিলার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি ইয়াশ।
চলছে.....