পর্ব-৩১
ক্যাম্পাস থেকে সোজা ডিপার্টমেন্ট ভবন পর্যন্ত প্রিসিলাকে এগি-য়ে দিলো ইয়াশ। পুরোটা সময় নির্বাকই থেকে গেলো দু'জন। শে-ষমেশ প্রিসি যখন ইয়াশকে বাইরে রেখে এলিভেটরে ঢুকে পাঁচত-লার বোতাম চাপলো সঙ্গে সঙ্গে কোথা থেকে যেন ঝড়ের বেগে এসে ভেতরে ঢুকে পরলো ছেলেটা। ঘটনার আকস্মিকতায় ভড়কালো প্রিসিলা। ধড়ফড়িয়ে উঠে পিছিয়ে গেলো দু'কদম, পিঠ গিয়ে ঠেকলো এলিভেটরের মসৃণ দেওয়ালে। ইয়াশ কিছু না বলে ওর বিপরীতে পাশে ঠেস দিয়ে দাঁড়ালো শুধু। নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আছে তার। তারপর যখন হঠাৎই এলিভেটরের স্লাইডিং দর-জাটা ফোঁস করে বন্ধ হয়ে গেলো, তৎক্ষনাৎ কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রিসিলার উপর ছিটকে পড়লো ইয়াশ। মেয়েটাকে কো-নোকিছু বুঝে ওঠার ফুরসত দিলোনা আর, উন্মাদের মতোই এক-হাতে ওর চুলগুলো আঁকড়ে ধরে রুক্ষ তৃষ্ণার্থ ঠোঁট দু'টো ডুবিয়ে দিলো গলার ভাঁজে। অনুভূতির এক অদ্ভুত তরঙ্গোচ্ছ্বাসে আচানক কাতরে উঠলো প্রিসিলা। মুখ ফস্কে বেড়িয়ে এলো চাপা শিৎকার,
আহহহ!
ইয়াশ তখনও প্রেয়সীর গলার ভাঁজে নিজের কতৃত্ব ফলাতে ব্যস্ত। হাত দু'টো কব্জি বন্ধ করে তুলে রেখেছে মাথার উপর। প্রিসিলা বিহ্বল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যেন কষ্টের মতো এক অলৌকিক সু-খের অত্যাচারে ক্রমশ তলিয়ে যাচ্ছে সে। মনে হচ্ছে একজোড়া অধৈর্য দিশেহারা ঠোঁট নেশাতুর কোনো দ্রব্য আহরণ করছে। ভয়ংকর কোনো রক্তচোষার মতোই চুম্বনের দমকে শুষে নিয়ে যেতে চাইছে তার ছোট্ট দেহের প্রতিটি রক্তকণা।
কাছে আসার সেই অলৌকিক মূহুর্তটুকু এক নিমেষে চুরমার করে দিয়ে কয়েক সেকেন্ড বাদেই খুলে গেলো এলিভেটরের দর-জাটা। ইয়াশ যেমন ছিটকে কাছে এসেছিল, তেমন ভাবেই ছি-টকে মুখ সরিয়ে নিলো প্রিসিলার গলা থেকে। প্রিসিলা তখনও কাপছে তিরতিরিয়ে। দাঁড়ানোর শক্তি ক্ষীণ হয়ে এসেছে তার। চোখ দু'টো ঘোলাটে। গলার মাঝের যে সুন্দর বিউটিবোন গুলো উন্মুক্ত করে কলেজে এসেছিল তা এখন কালচে রঙের ক্ষত দি-য়ে ভরে গেছে। ইয়াশ এসে নিঃশব্দে হাত ছোঁয়ালো সেখানটায়।
তার আলতো স্পর্শে কেঁপে উঠল প্রিসিলা। ব্যথায় চোখ খিঁচিয়ে ফেললো। ততোধিক নমনীয় স্পর্শে মেয়েটাকে আরও খানিকটা ব্যথা দিলো ইয়াশ। অতঃপর কানের কাছে মুখ হিসহিসিয়ে আওড়ালো,
- নাও ইউ্য আর লুকিং লাইক মাইন। অল মাইননন!
বলেই হাওয়ার বেগে সামনে থেকে চলে গেলো ছেলেটা। প্রিসিলা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো। পরিস্থিতি সামলে উঠতে আরও কিছু-ক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো স্থবির হয়ে। তারপর যখন সামনের দিকে পা বাড়ালো, তখনই কোথা থেকে যেন সামনে এসে উদয় হলো রোজ। রোজকে দেখে ফের থমকে গেলো প্রিসিলা। চোখেমুখে ভর করলো অসন্তোষ। মেয়েটা নিশ্চয়ই কোনো ঝামেলা পাকাতে এসেছে এখানে। কিন্তু প্রিসিলার হাতে সময় নেই, অগত্যা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই আবারও ওর পথ রুখলো শকুন চোখের মেয়েটা। এবারে ধৈর্য্যহারা হয়ে পরলো প্রিসিলা। বিরক্ত গলায় বললো,
- কি ব্যাপার রোজ?
- কি ব্যাপার সেটা তো তুমি আমায় বলবে?
প্রিসিলার দিকে আগুন চোখে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড়িয়ে কথাটা বললো রোজ। বিপরীতে প্রিসিলা একটা হতাশ নিঃশ্বাস ছাড়লো। যথাসম্ভব শান্ত থাকার চেষ্টা করে বললো,
তোমার যদি কিছু বলার থাকে পরে বলো। আমার পরীক্ষা আছে এখন আমায় যেতে দাও।
আমার কথার উত্তর না দিয়ে এখান থেকে এক পা ও নড়তে পারবেনা তুমি।
ভেতর ভেতর ক্রোধে ফেটে যাচ্ছে প্রিসিলা। শরীরের রক্ত টগবগ করে ফুটছে তার। কিন্তু অযথা ঝামেলা করার সময় নেই, তাই কোনোমতে রাগটুকু সামলে চিবিয়ে চিবিয়ে বললো,
বলো কি জানতে চাও।
ইয়াশ তোমায় কিস করলো কেন?
- কি বললে?
প্রিসিলা যেন শুনেও শুনেনি, তেমনি ভাবে প্রশ্ন করলো আবারও।
- আমি দেখেছি, একটু আগেই এলিভেটরে বসে তোমাকে কিস করেছে ইয়াশ। বাট হোয়াই?
রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে আছে রোজ। রোজের পেছনের সাঙ্গ পাঙ্গ-
রাও ফুঁসছে প্রিসিলার দিকে চেয়ে। ওদের এই অকারণ রাগ দেখে অবাক না হয়ে পারলো না প্রিসিলা। সহসা অধৈর্য্য হয়ে মুখ খুল-তেই হলো ওর। বিস্ময়াভিভূত কণ্ঠে বললো,
আমার হাসবেন্ড আমাকে যেখানে খুশি সেখানে বসে কিস করবে, এটা তার ইচ্ছে। তুমি প্রশ্ন করার কে? হু দ্যা হেল আর ইউ্য?
প্রিসিলার কথা শুনে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো রোজ। রাগে কাঁ-পতে কাঁপতে বললো,
নষ্টা মেয়েছেলে। ভাইকে হাসবেন্ড বলছিস, ইয়াশ আমার হাসবেন্ড!
কথাগুলো বলে থামতে পারলো না রোজ, তার আগেই ওর গালে এসে আঁচড়ে পরলো শক্ত এক চপেটাঘাত। প্রিসিলার এহেন অত্যাশ্চর্য কর্মকাণ্ড দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো রোজের পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েগুলো। তারা একে অপরের দিকে ভয়ার্ত চোখে দৃষ্টি বিনিময় করছিল, ঠিক সেই মূহুর্তে কানে ভেসে এলো প্রিসিলার তেজস্ক্রিয় কণ্ঠস্বর,
মাইন্ড ইউওর ল্যাঙ্গুয়েজ। একটা ছেলেকে মনগড়া নিজের হা-সবেন্ড পরিচয় দিতে দিতে এখন তার বিবাহিত স্ত্রীর সামনেও দে-ওয়া শুরু করেছো, লজ্জা করেনা?
-কার লজ্জা? কিসের লজ্জা?
পেছন থেকে ভরাট এক পুরুষালি কণ্ঠস্বর ভেসে আসতেই রোজ প্রিসিলা সহ একযোগে পেছনে তাকালো সবাই। দেখলো, চুইঙ্গাম চিবোতে চিবোতে ঘাড় বাঁকিয়ে প্রিসিলার দিকেই এগিয়ে আসছে জ্যাকভ। তার হাতে, মাথায় অনেকগুলো সেলাইয়ের দাগ। সম্ভবত আগের বারের এক্সিডেন্ট থেকেই তৈরি হয়েছে। ক্ষতগুলো।
জ্যাকভকে দেখা মাত্রই সামনে থাকা মেয়েরা সব হুড়মুড়িয়ে সা-ইডে সরে গেলো। প্রিসিলা এখন মুখোমুখি তার। ভেতর ভেতর কিছুটা শঙ্কিত হলেও, অভিব্যক্তিতে আগের মতোই তেজ ধরে রে-খেছে মেয়েটা। জ্যাকভ সেসবে পাত্তা দিয়ে ওর চোখের দিকে কঠোর দৃষ্টিপাত করে আবারও প্রশ্ন ছুড়লো,
- কাকে লজ্জা শেখাচ্ছিস তুই?
জ্যাকভের তুই সম্মোধনে প্রিসিলা সহ আশেপাশের সবাই আশ্চর্য হয়ে গেলো। শুধুমাত্র এক দু'জন নয়, পুরো ক্যাম্পাস জানে জ্যাকভ প্রিসিলার জন্য ঠিক কতটা পাগল। তাহলে আজ হঠাৎ এমন আচরণ কেন? সবাই যখন নিজেদের মাঝে ফিসফাস করায় ব্যস্ত তখন আবারও একটা আশ্চর্য কাণ্ড ঘটিয়ে ফেললো জ্যাকভ। অতর্কিত হাতে থাবা দিয়ে প্রিসিলার লম্বা চুলগুলো টেনে ধরলো সে। প্রিসিলা ঝটকা মেরে সরিয়ে দিতে উদ্যত হলে আরও শক্ত করলো সে হাতের বাঁধন। তারপর ওর মুখটাকে মু-খের সামনে টেনে এনে চুইঙ্গাম চিবাতে চিবাতে আগ্রাসী কণ্ঠে বলে উঠলো,
- ইয়াশকে হারানোর জন্য তুই আমায় ব্যবহার করেছিস। গত তিন মাস আমি হসপিটালে ছিলাম, আর তুই কি করলি সেই ইয়া-শকেই বিয়ে করে ফেললি? আমি জ্যাকভ তোর পেছনে নেড়ি কু-কুরের মতো ঘুরেছি,যখন যা বলেছিস তাই করেছি। কিন্তু তুই আমাকে নিয়ে দারুণ খেলেছিস। এবার তো আর ছেড়ে দেওয়া যায়না বিচ। এবার তোকে আমার আসল রুপটা দেখাতেই হয়।
ভাইয়ের কাজে ইন্ধন দিয়ে পাশ থেকে রোজ কটমট করে বললো,
আবার আমাকে চড়ও মেরেছে ভাইয়া।
এক্সজ্যাক্টলি, আমার বোনকে চড়ও মেরেছিস। এবার ওকে স্যরি বল। সে স্যরি রাইট নাওওও!
চারিদিকে সবাই তাকিয়ে তাকিয়ে তামাশা দেখছে। প্রিসিলার নী-লাভ শান্ত চোখে পানি চলে এলো। তবুও দৃঢ় গলায় বললো,
আমি প্রিসিল জাওয়াদ শুধু শুধু কাউকে স্যরি বলিনা, আর বলবোও না।
এখনোও এতো অহংকার?
উপহাসের স্বরে কথাটা বলেই ঘাড় বাঁকালো জ্যাকভ। যেন ও খুব ভালো করেই জানে এর পরবর্তী পদক্ষেপ কি হতে চলেছে।
ওকে ইচ্ছেমতো হ্যারাস করো ভাইয়া। বুঝিয়ে দাও তুমি আসলে কি।
পাশ থেকে ঝগড়াটে মহিলাদের মতো চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে কথাগুলো বললো রোজ। সেদিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাত করে প্রিসিলা দাঁতে দাঁত পিষলো। কণ্ঠে হুঁশিয়ারি নিয়ে বললো,
সময় আছে থেমে যা রোজ। নয়তো আজকের এই ঘটনার এক পার্সেন্টও যদি আমার পাপা জানতে পারে, তাহলে তোদের দু'জনের গল্প এখানেই শেষ।
প্রিসিলার মুখ থেকে কথাটা বেরোনো মাত্রই ক্রোধে ফেটে পড়লো জ্যাকভ।
-ইউ্য ডার্টি বিচচচচ!
মুখ দিয়ে অশ্রাব্য বাক্য ছুঁড়ে, রেগেমেগে পাশে দাঁড়ানো একজ-নের হাত থেকে একটা কোকের বোতল ছোঁ মেরে টেনে নিয়ে বো-তলের সবটুকু পানীয় ঢেলে দিলো প্রিসিলার মাথায়। এতোক্ষণ ধরে চিবুতে থাকা চুইঙ্গামটাও থু মেরে ছুঁড়ে ফেললো ওর মুখের উপর। তারপর আশেপাশে তাকিয়ে রোজ আর সাঙ্গ পাঙ্গদের উদ্দেশ্য করে বললো,
ওকে টেনেহিঁচড়ে স্টোররুমে নিয়ে যাও, সেখানেই ওর ক্লাস নেওয়া হবে আজ। খেয়াল রাখবে কিছুতেই যাতে সময়ের আগে পরীক্ষার হল অবধি যেতে না পারে।
বলেই সেখান থেকে প্রস্থান করলো জ্যাকভ। যেই বলা সেই কাজ, রোজ খুব আগ্রাসী হয়ে হাত বাড়ালো প্রিসিলার দিকে। এবার সত্যিই ভয় পেয়ে কুঁকড়ে গেলো মেয়েটা। চারিদিকে কুণ্ঠিত দৃষ্টি-পাত করে পিছিয়ে গেলো কয়েক পা। রোজ এগিয়ে গিয়ে আবারও ধরতে চাইলো ওর বাহুটা। কিন্তু শরীর ছোঁয়ার আগেই কোথা থেকে যেন একটা শক্ত পুরুষালি হাত এসে আচানক সা-ইডে সরিয়ে নিলো প্রিসিলাকে। ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকি-য়ে উঠলো সকলে। শিকার হাত ফস্কে বেড়িয়ে যাওয়ার মতোই ভারী বিরক্ত হয়ে পাশ ফিরে তাকালো রোজ। সঙ্গে সঙ্গে পিলে চমকে গেলো ওর। অস্ফুট স্বরে আওড়ালো,
- নি... নিকো।
নিজের শার্ট খুলে প্রিসিলার শরীরে জড়িয়ে দিচ্ছিলো নিকো। তা-রপর মেয়েটাকপ বাহুতে আগলে ধরেই রোজের দিকে রক্তগরম চোখে তাকালো সে। গর্জে উঠে বললো,
হাউ ডেয়ার ইউ্য গার্ল? প্রিসির দিকে হাত বাড়ানোর সাহস কি করে হলো তোমার? কে দিয়েছে এতো পাওয়ার? এর পরিণাম কতটা ভয়ংকর হবে আদৌও জানো সেটা তুমি?
তার শেষ কথাতে থমকে গেলো চারিপাশ। রোজ আর সাহস পে-লোনা কিছু বলে ওঠার। চুপচাপ দাঁড়িয়ে কোণ দৃষ্টিতে প্রিসিলাকে লক্ষ্য করে সাপের মতো ফোঁসফাস করছে শুধু। নিকো এবার দৃ-ষ্টি ঘুরিয়ে আশেপাশের মেয়েগুলোর দিকে তাকালো, যারা এতো-ক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু তামাশা দেখে গেছে।
একটা মেয়েকে হ্যারাস করা হচ্ছে। তবুও প্রতিবাদ না করে তা-কিয়ে তাকিয়ে গিলছো, লজ্জা নেই তোমাদের?
মেয়েগুলোর দিকে অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে ঘৃণার স্বরে কথাগুলো বললো নিকো। বিপরীতে নিঃশব্দে মাথানত করে ফেললো সবাই।
নিকো
আবারও শক্ত কণ্ঠে বাক্য ছুড়লো তৎক্ষনাৎ,
আর একমুহূর্তও যদি কেউ এখানে দাঁড়িয়েছো, আমি সোজা গিয়ে তার নামে প্রিন্সিপালের কাছে কমপ্লেইন করবো। কলেজ লাইফ হেল করে দেবো তার।
সিনিয়রের হুংকার শুনে একযোগে হুড়মুড় করে সেখান থেকে চলে গেলো সবাই। জায়গাটা এখন শশ্মানের মতো নীরব।
এতোক্ষণে আবারও প্রিসিলার দিকে দৃষ্টিপাত করলো নিকো। মে-য়েটার চোখ বেয়ে নিঃশব্দে গড়িয়ে পরছে নোনাজল। ফর্সা মুখ কেঁদেকেটে টমেটোর মতো লাল হয়ে গেছে। নিকো হাত বাড়িয়ে ওর চোখের জল মুছে দিতে চাইলে চট করেই মুখ ঘুরিয়ে নিলো প্রিসিলা। ফুঁপিয়ে উঠে অভিমানের স্বরে বললো,
যার মুছিয়ে দেওয়ার কথা সে তো এলোনা, তুমি কেন অন্যের দ্বায়িত্ব পালন করবে নিকো?
চলছে.....