ফন্ট সাইজ:
থিম:
একমুঠো সঙ্গীন প্রনয়াসক্তি

৩য় পর্ব

লেখক: সুরাইয়া রাফা

তিন

অনু চোখ খোলার বৃথা চেষ্টা চালায়। অশ্রুসজল চোখ দুটো তার নিভে আসছে ক্রমশ। ওষুধের সাইড ইফেক্ট হবে হয়তো। তবুও অরুকে দেখে আরেকদফা কান্না উথলে আসে তার। চোখের জল ছেড়ে আহাজারি করে বলতে থাকে,

'আমার বাচ্চাটা আর নেই রে অরু। বাচ্চাটা আর আমার কাছে নেই। সন্তানহারা হয়ে গেলাম। ওরা মেশিন দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করে টেনে বের করে এনেছে আমার পুচকুকে।'

অনুর কথায় চোখ খিঁচিয়ে বন্ধ করে ফেললো অরু। কর্ণগুহরের চারিপাশে ক্রমাগত বাদ্যের মতো প্রতিধ্বনিত হচ্ছে কথাগুলো। অস্থিরতায় শ্বাসরোধ হয়ে আসছে তার।

মাত্র দু'টো মাসের পেট অরুর। এখনো ভ্রুণটা পর্যন্ত ঠিকঠাক গঠিত হয়নি। তারপরেও এই অভূমিষ্ঠ সন্তানকে নিয়ে কত স্বপ্নই না দেখে ফেলেছে সে। মন গহীনে বেঁধেছে হাজারো সুখের মায়াজাল। সেখানে অনুর সন্তান তো পরিপূর্ণ এক নবজাতক। তার স্বপ্নের পরিধিও ব্যাপক। এতো এতো স্বপ্ন ভাঙার যন্ত্রণা কি করে সইবে আপা? কী করেই বা প্রত্যয় ভাই সামলাবে ওকে? সবকিছু ভেবে নিজেও দিশেহারা হয়ে ওঠে অরু। কোনোকিছু না বলেই একটানে অনুকে বুকের মাঝে নিয়ে নেয় আচানক। চুলের মাঝে কোমল হাতের প্রলেপ বুলিয়ে মায়ের মতো মমতা মাখানো কণ্ঠে বলে,

'সব ঠিক হয়ে যাবে আপা। সব ঠিক হয়ে যাবে। প্লিজ, তুই একটু ধৈর্য ধর। প্রত্যয় ভাই আছেন তো। তোর বেস্ট পার্টনার। উনি তোর কষ্টগুলো সুখের চাদরে মুড়িয়ে দিবে, দেখিস।'

'কিচ্ছু ঠিক হবেনা অরু। কিচ্ছু না। আমার সন্তান আর কখনোই আমার কোলে ফিরে আসবে না। সে ইতিমধ্যে মৃত। আমি ব্যর্থ মা। অপয়া একটা। নিজের সন্তানকে সুরক্ষিত রাখতে পারিনি। আমারও তো মরে যাওয়া উচিৎ তাইনা?'

অনুর বুক ভাঙা চিৎকারে থরথর করে কেঁপে ওঠে অরু। চিৎকার থামানোর জন্য দু'হাতে চেপে ধরে অনুর মুখ। তবুও ছাড়েনা তার আপাকে। বরং আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বুকের আস্তিনে। ক্ষণকালের নৈঃশব্দ্য হটিয়ে রাতের নিস্তব্ধতার মতোই ধ্বনিত হয় তার মন্থর শীতল কণ্ঠস্বর,

'আপা! এ্যাই আপা! একটু শান্ত হ। তুই এমন করে কাঁদলে আমারও কান্না পায় ভীষণ। তুই তো আমার মায়ের মতো আপা। তুই না থাকলে আমার কি হবে? কে সারাক্ষণ আগলে রাখবে আমায়? মনে রাখিস, আঁধার রাতের পরে যেমন ঝলমলে দিনের সূচনা হয়, তেমন দুঃখের পরেও সুখের সূর্য উদয় হয়। তুই চিন্তা করিস না আপা, তোর সন্তান ভালো আছে। উপর ওয়ালা তাকে বড্ড আদরে মুড়িয়ে রেখেছেন।'

একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে আজ যেন হঠাৎ দিগুণ পরিণত হয়ে গেলো অরু। সত্যি সত্যিই তার মাঝে ধরা দিয়েছে প্রবল মাতৃত্ব। মায়ের মতো বড় আপাকে পরম স্নেহে আগলে রেখেছে বুক পাঁজরে। রূপকথার গল্প শোনানোর মতো করেই সান্ত্বনা দিতে দিতে এক পর্যায়ে লক্ষ্য করলো, তার ছোট্ট বুকে আদুরে বিড়াল ছানার মতোই ঘুমিয়ে পড়েছে অনু।

শেষরাতের মোম নরম চাঁদের আলো টুকু জানালার কার্নিশ গলিয়ে আঁচড়ে পড়ছে অনুর রক্তশূণ্য ফ্যাকাশে চেহারায়। অরু সেদিকে করুন দৃষ্টে তাকিয়ে থাকে কিয়ৎক্ষণ। চোখের কোলে এখনো জল জমে আছে মেয়েটার। অরু আলতো হাতে মুছিয়ে দেয় সেগুলো। নরম আদুরে স্বরে স্বগোতক্তি করে আওড়ায়,

'আপা, আমার আপা। আমি চাই, এরপর থেকে দুনিয়ার সবটুকু সুখ তোর ভাগে থাক। আধার রাতের ধোঁয়াসার মতোই দুঃখগুলো সব বেওয়ারিশ হয়ে হারিয়ে যাক।

নার্সিংহোমের করিডোরের স্টেইনলেস কাচের দেওয়ালে হেলান দিয়ে কারোর সঙ্গে ফোনালাপে মগ্ন হয়ে আছে ক্রীতিক। পড়নে তার ক্যাথলিনের বিয়ে বাড়ির পোশাক। সাদা রঙের ব্লেজারটা তর্জনীর ডগায় তুলে কাঁধের আস্তিনে ঝুলিয়ে রেখেছে আনমনে। উষ্কখুষ্ক চুল, কনুই অবধি গোটানো শার্টটাও যেথায় সেথায় কুঁচকে গিয়ে বেহাল দশা তার।

ক্রীতিক যখন পরিশ্রান্ত হয়ে বারপ্রান্তের ব্যক্তিটির সঙ্গে তুমুল বাকবিতণ্ডায় লিপ্ত, ঠিক তখনই নিয়নবাতির ঝাপসা আলোয় মুখ বরাবর ভেসে উঠলো এক আবছায়া অবয়ব। নির্জীব প্রস্থর খণ্ডের ন্যায় দণ্ডায়মান সে। অবয়বটিকে পর্যবেক্ষণ করে কান থেকে ফোন সরালো ক্রীতিক। অজ্ঞাত স্বরে ডেকে উঠলো,

'প্রত্যায়!'

তাৎক্ষণিক ঝোরো হাওয়ার বেগে ছুটে এসে ক্রীতিকের কাঁধ জড়িয়ে ধরলো দু'টো খশখশে পুরুষালি বাহু। ঘটনার আকস্মিকতায় স্তম্ভিত হয়ে গেলো ক্রীতিক। ক্ষণকালের ব্যবধানে বোধশক্তি ফিরে পেতেই উপলব্ধি করলো কাঁধের কাছের শার্টটুকু তপ্তজলে ভিজে উঠেছে তার। তারমানে প্রত্যয় এখন কাঁদছে? ক্রীতিক বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লো। নিষ্ক্রিয় গলায় ডেকে শুধালো,

'প্রত্যয়, সন্তান হারানোর কষ্ট কি এতোটাই বেশি? এতোটাই যন্ত্রণার? তুমি কাঁদছো যে!'

নিজেকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালালো প্রত্যয়। ভঙ্গুর স্বরে থেমে থেমে বললো,

'আমি কিছুই বুঝতে পারছি না ভাই। শুধু মনে হচ্ছে পৃথিবীতে আমার চেয়ে নিকৃষ্ট, অপ্রয়োজনীয় মানুষ আর দু'টো নেই। সবকিছু আমার জন্য হয়েছে। উপরওয়ালার উচিৎ আমাকে কঠোর শাস্তি দেওয়া।'

তৎক্ষণাৎ কোনো প্রত্যুত্তর খুঁজে পেলোনা ক্রীতিক। কাউকে সরল মনে সহানুভূতি দেখানো ধাঁচে নেই তার, তবুও প্রত্যয়ের পিঠে আলতো করে

হাত চাপড়ালো সে। তপ্তশ্বাস ছেড়ে বললো,

'শী ওয়াজ ড্রাগ অ্যাডিক্টেড প্রত্যয়। এরকম একটা সাইকোপ্যাথের দ্বারা যা কিছু সম্ভব। থ্যাংক গড যে অনুর কিছু হয়নি।'

'ভাই মেয়েটা...'

বাক্য সম্পন্ন করতে পারলো না প্রত্যয়, তার আগেই ক্রীতিক বলে উঠলো,

'রিল্যাক্স। মেয়েটাকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি। কালকেই কোর্টে তোলা হবে আই গেইস। কোর্ট যা খুশি রায় দিক। কিন্তু এই জীবনে ও যাতে তোমার ত্রীসীমানায় না আসতে পারে সেই ব্যবস্থা আমি করবো। ইউ হ্যাভ মাই ওয়ার্ড।'

শেষ কথাটা বলার সময় ক্রীতিকের গভীর কালো চোখ দু'টো অযাচিত কোনো শঙ্কায় ছলছল করে উঠেছিল বোধ হয়। ধূসর মেঘে ঢেকে আছে গোধূলি। মেঘ ভেজা দমকা হাওয়ায় ভর করে ক্রমশ প্রগাঢ় হচ্ছে ঝিরিঝিরি বৃষ্টির রেশ। আগের রাত আর সারাটাদিন কাটিয়ে শেষ বিকেলে বৃষ্টি মাথায় নিয়ে হসপিটাল থেকে বাড়িতে ফিরেছে ক্রীতিক অরু।

অরু দাঁড়িয়ে আছে মূল ফটকে। হাতে তার সফেদ রঙা তোয়ালে ঝুলে আছে। ক্রীতিক গাড়ি পার্কিং করছে, নিশ্চয়ই ভিজে যাবে। আর তারপর ভেতরে এসে শুরু করে দেবে অরুর জামা নিয়ে টানাটানি। সুযোগ পেলে অরুর জামা খুলে নিয়ে নিজের চুল মুছে ক্রীতিক। আশ্চর্য! এতো বেহায়া কেন লোকটা? আনমনে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে অরু। কোনো এক অযাচিত ভাবনায় আষাঢ়ে আকাশের মতোই মন ভার হয়ে আসে তার।

একটু বাদেই বৃষ্টিতে ভিজে ছুটে ভেতরে প্রবেশ করে ক্রীতিক। বৃষ্টির তীব্র ছাটে আধভেজা হয়ে আছে তার সমগ্র শরীর। অরু এগিয়ে যায় তোয়ালে নিয়ে। মাথা মুছিয়ে দেওয়ার জন্য হাত বাড়াতেই, তোয়ালেটা একটানে লুফে নিয়ে নিঃশব্দে নিজেই নিজের মাথা মুছতে লাগলো ক্রীতিক। অরু একটু অবাক হলো। মানুষটার ভাবভঙ্গিমায় কেমন অদ্ভুত পরিবর্তন। অন্য সময় হলে জিদ দেখিয়ে বলতো,

'চুল মুছে দে।'

অরু দিতে না চাইলে জোর করে ওর ওড়না, জামা যেটাই হাতের কাছে পেতো সেটা দিয়েই কাজ চালাতো। সেসব ভবঘুরে কর্মকাণ্ডে অরুর বাহ্যিক আচরণে বিরক্তি ফুটলেও, মনের কোণে সুখ সুখ হাওয়া বইতো একপ্রকার।

আজ কেমন এলোমেলো সবকিছু। ক্রীতিকের অভিব্যক্তি বোঝা বড়ই দায়। গম্ভীর এক অভিব্যক্তি ধরে রেখেছে চেহারায়। রাস্তায় পুরোটা সময় এভাবেই ড্রাইভ করছে নিঃশব্দে। এখনো সেভাবেই স্তব্ধ হয়ে আছে মানুষটা। ক্রীতিক তোয়ালে রেখে কাউচে গিয়ে বসলে অরুও এগিয়ে যায় সেদিকে।

দু'পা ছড়িয়ে শরীরটা হেডবোর্ডে এলিয়ে দিয়ে বেখেয়ালি হাতে শার্টের বোতাম খুলছে ক্রীতিক। অম্লান ক্লান্তিতে চোখ দু'টো বুজে আছে তার। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অরু ঠান্ডা গলায় বললো,

'খুব বেশি ক্লান্ত লাগছে? তাহলে বেডরুমে গিয়ে একটু....'

বাকি কথা জিহ্বাতেই আটকে থাকলো অরুর। তন্মধ্যে ওর কব্জিতে হ্যাঁচকা টান মেরে নিজের উরুর উপর বসিয়ে দিলো ক্রীতিক। ঘুমের তোড়ে ভার হয়ে আসা মাথাটা আলগোছে তুলে অরুর বুকের মধ্যে চেপে ধরলো। অতঃপর দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে গভীর স্বরে বললো,

'আমি অনেক খারাপ তাইনা? তোকে সারাক্ষণ জ্বালাই, মারি, বকি।'

'কই না তো। এখন তো আর মারেন না।'

অজ্ঞাত অরু ঠোঁট উল্টায়। ফের তপ্তশ্বাসে ভার হয়ে আসে চারপাশ। গভীরের চেয়েও গভীর ঘোর লাগানো স্বরে ক্রীতিক বলে,

'আই হ্যাভ নেভার বিন অ্যাবল টু কনট্রোল মাই সেলফ। বাট আই লাভইউ অরু। আমি সবকিছুর জন্য তোর কাছে ক্ষমা চাইছি বেইবী। একটা ভালো স্বামীর সার্টিফিকেট দিবি আমায়? আমি চেষ্টা করবো তোর মন মতো হওয়ার।'

অরু বুঝতে পারেনা ক্রীতিক হঠাৎ এসব কিছু কেন বলছে? সে কি জানেনা, অরু তাকে কতোটা ভালোবাসে?

'কি বলছেন এসব? কে বলেছে আপনি আমার মন মতো না?'

'আমি একটা উগ্র। নিজের স্ত্রী সন্তানের জন্য ক্ষতিকর। এরকম একটা স্বামী কেউ চায় না। জাস্ট নো ওয়ান।'

অরু নির্বাক হয়ে চেয়ে আছে। একে তো অনুর সঙ্গে ঘটে যাওয়া অমানবিক ঘটনায় হৃদয়টা পর্যুদস্ত, তার উপর ক্রীতিকের এসব উদ্ভট সব কথাবার্তা। দুঃখ, হতাশা আর সন্দেহের মিশেলে আপাতত বাকরুদ্ধ অরু। কি বলবে বুঝতে পারছে না সে। ক্ষণকালের অসহনীয় নৈঃশব্দ্য কাটিয়ে ক্রীতিক নিজের নমনীয় সত্তাটা গুটিয়ে ফেললো। অরুর বক্ষ বিভাজিকা থেকে মুখ সরিয়ে স্পষ্ট গলায় বললো,

'বেডরুমে যা অরু। ঘুমিয়ে পড়। গত দুদিন অনেক স্ট্রেচ গিয়েছে।'

'আর আপনি?'

'আমি আছি এখানেই। রান্নার প্রিপারেশন নিবো। ইউ হ্যাভ টু ইট সামথিং নিউট্রিশিয়াস।'

ক্রীতিকের কথায় ফিক করে হেসে লো অরু। উপহাস করে বললো,

'আপনি আর রান্না?'

ক্রীতিক খোশগল্পে মাতেনা। আপাতত এসবের মন মানসিকতা নেই তার। অগত্যা চোখ পাকিয়ে বললো,

'যা বলেছি তাই।'

কোনো কারণে ডিস্টার্ব হয়ে আছে মানুষটা। ব্যাপারটা উপলব্ধি করে চুপচাপ সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে যায় অরু। মনে মনে স্বগোতক্তি করে আওড়ায়,

'খাবার রান্না করার চেয়ে আপনি আমায় জড়িয়ে ধরে বুকের ওমে ঘুম পাড়ালে বেশি তৃপ্তি পেতাম। আপনি আষ্টেপৃষ্টে না জড়ালে ঘুমই হয় না আজকাল। কেন যেন স্যান্ডাল উডের মাদকীয় গন্ধটা বড্ড বেশী কাছে টানে আমায়।

একটানা কয়েক দিন ঝড়বৃষ্টির পরে আজ সকাল সকাল কনে দেখা আলোয় ঝলমল করছে প্রকৃতি। সবুজ সিক্ত ঘাসের ওপর সোনারঙা রোদের ঝলকে মুক্তো দানার মতো দ্যুতি ছড়াচ্ছে সেগুলো। অরু আজ আবারও প্রত্যয়ের ফ্ল্যাটে এসেছে। কাল রাতেই অনুকে রিলিজ দেওয়া হয়েছে হসপিটাল থেকে। আপাতত একটু সুস্থ সে। তাই অস্থিরতা দমাতে পারেনি অরু। সকালের আলো ফোঁটার জন্য ছটফট করেছে সারারাত। অবশেষে সকালে উঠে ক্রীতিক ভার্সিটির উদ্দেশ্য বেরোতেই সুযোগ বুঝে একাই উবার ধরে চলে আসে সানফ্রান্সিসকো।

রঙ বেরঙের ডেইজি ফুল অনুর ভীষণ প্রিয়। তাই সাথে করে বড় একটা ডেইজি ফুলের বুকে আর ডোরাকে নিয়ে এসেছে অরু। পাসওয়ার্ডও আগেই জানতো, তাই ভেতরে ঢুকতে নক করতেই হয়নি। লিভিং রুমটা অন্ধকার ভীষণ। নিঃশব্দে হাঁটতে হাঁটতেই অরুর কর্ণগুহরে পৌঁছালো মৃদু মন্থর গীটারের ঝঙ্কার, সেই সাথে প্রত্যয়ের কণ্ঠে ক্লাসিক্যাল সঙ্গীতের বিমুগ্ধ সুর,

'আমার একলা আকাশ থমকে গেছে

রাতের স্রোতে ভেসে,

শুধু তোমায় ভালোবেসে।

আমার দিনগুলো সব রঙ চিনেছে

তোমার কাছে এসে,

শুধু তোমায় ভালোবেসে.....'

এটুকু গেয়ে গীটারের তারে এলোমেলো সুর তুলে থামলো প্রত্যয়। অমনি পেছন থেকে ভেসে এলো অবিরাম করতালির ঝঙ্কার।

'কি সুন্দর গানের গলা আপনার, প্রত্যয় ভাই!'

মুগ্ধ নয়নে অভিবাদন জানাতে জানাতেই কক্ষে প্রবেশ করলো অরু। এতোক্ষণ অনুকে বেডে শুয়িয়ে তার শিয়রে বসে গান ধরেছিল প্রত্যয়। মেয়েটা চোখ বুঁজে অনুভব করছিল তার স্বামীর ভালোবাসার গভীরতা। অরু আসতেই ঘুরে তাকালো সে। অরুকে দেখে অনু ভীষণ খুশি হলেও চেহারায় আধার ঘনালো প্রত্যয়ের। সে পানসে মুখে শুধালো,

'ভাইকে বলে এসেছো, অরু?'

মাছি তাড়ানোর মতো করে হাত নাড়ালো অরু। মুচকি হেসে বললো,

'আরে নাহ। বলে এলে এই অবস্থায় আসতে দিতো বলে মনে হয় আপনার?'

প্রলম্বিত শ্বাস ফেললো প্রত্যয়। গাঢ় গলায় বললো,

'বলে আসা উচিত ছিল। সেদিন ওইটুকুনি অসুস্থ হয়ে গিয়েছিলে বলে, ভাই ক্লায়েন্ট মিটিং, কোম্পানির ডিল সবকিছু উচ্ছেদ দিয়ে রাতারাতি প্রাইভেট জেট নিয়ে ক্যালিফোর্ণিয়া ফিরেছিল। আজকের ব্যাপারটা জানতে পারলে মোটেও শান্ত থাকবে মনে হয় তোমার? ভাইকে তুমি চেনো না?'

অরু একটা ঢোক গিললো। এতোকিছু তো ভাবেনি একবারও। এই লোক মেজাজ হারালে যা খুশি করতে পারে। অরুর কপালে নির্ঘাত শনি নাচছে। নয়তো এমন আহাম্মকের মতো কাজকর্ম করলো কিভাবে ও?

'এখন কি করবো, প্রত্যয় ভাই?'

মুখ কাচুমাচু করে প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে তাকালো অরু। ছদ্ম রাগ দেখিয়ে মুখ ঘোরালো প্রত্যয়। ভারিক্কি আওয়াজে জবাব দিলো,

'জানিনা।'

পাশ থেকে নরম কণ্ঠে কথা ছুড়লো অনু,

'তুমি একটু ক্রীতিক ভাইয়াকে ফোন দিয়ে ম্যানেজ করোনা।'

দাঁত কটমটিয়ে ঘুরে তাকালো প্রত্যয়। দু'বোনকে চোখের চাউনিতে ভস্ম করে দিয়ে বলে ওঠে,

'বলির পাঠা হিসেবে আমাকেই পেলে?'

আহ্লাদী বালিকার মতো ঠোঁট উল্টালো অনু। অনুনয় করে বললো,

'প্লিইইজ।'

'ঠিকাছে, ঠিকাছে, দেখছি।'

বিরক্তির স্বরে কথাটা বলে, ফোন হাতে কক্ষ ত্যাগ করলো প্রত্যয়। সে চলে যেতেই অরু এগিয়ে গিয়ে অনুর পাশ ঘেঁষে বসলো। ডেইজির

বুকেটা বাড়িয়ে দিয়ে বললো,

'তোর প্রিয় ফুল, ডেইজি।'

মলিন হেসে বুকেটা গ্রহণ করলো অনু। তপ্তশ্বাস ছেড়ে বললো,

'তুই কত বড় হয়ে গেছিস, অরু। সবকিছু কি সুন্দর সামলে নিতে পারিস এখন।'

সামান্য ঠোঁট প্রশস্ত করে হাসলো অরু। শুধালো,

'মা কল দিয়েছিল?'

'হুম, অনেকবার। তোকে?'

অরু মাথা নাড়ায়। প্রত্যুত্তর করে,

'তুই যে হসপিটাল থেকে বাসায় ফিরেছিস সেটাও মা-ই বলেছে। আরও একটা কথা বলেছে।'

'কি বলেছে?'

'বললো তুই নাকি শীঘ্রই দেশে ফিরবি।'

নীরবে হ্যা সূচক মাথা নাড়ালো অনু। বুক ভার করা দীর্ঘশ্বাসে দম বন্ধ হয়ে আসছে তার। ক্ষণকাল থেমে উত্তর দিলো,

'হ্যারে। আমি আর পারছি না আসলে। মন মস্তিষ্কের বাকবিতন্ডায় হাঁপিয়ে উঠেছি একদম। চারিদিকে আমার পুচকু সোনার স্মৃতি। এখানে একা থাকলে নির্ঘাত ফাস্ট্রেটেড হয়ে সুইসাইড করে বসবো।'

'আপা!'

অরুর কন্ঠে উদ্বেগ। অনু নিঃশব্দে হাসলো। অরুর চিবুকে আলতো হাত বুলিয়ে বললো,

'চিন্তা করিস না। পরিস্থিতিটার সঙ্গে মানিয়ে ওঠার জন্য দেশে ফিরছি। আমাকে একটু সময় দে, বোন।'

অযাচিত অভিমানে নাকের ডগা ফুলে ওঠে অরুর। তপ্ত জলে থৈথৈ করে ওঠে ডাগর আঁখি। ভাঙা ভাঙা গলায় বলে,

'তুই চলে গেলে আমার কি হবে, আপা? এই অচেনা দেশে কে দেখবে আমায়?'

'স্বয়ং ক্রীতিক ভাইয়া থাকা সত্ত্বেও তোর এত দুশ্চিন্তা? আমার চেয়ে তো মানুষটাকে তুই ভালো চিনিস।'

'তবুও, তোর জায়গা কেউ পূরণ করতে পারবে না।'

নাক টেনে ফুপিয়ে উঠলো অরু। ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো অনু। মায়ের মতো আদুরে স্বরে বললো,

'বোকা মেয়ে। বেঁচে থাকলে আবারও দেখা হবে আমাদের, ইনশাআল্লাহ।'

দু'বোনের মান অভিমানের আবেগঘন মুহূর্তে হুট করেই রুমে প্রবেশ করলো প্রত্যয়। চেহারায় তার অবাধ বিস্ময়ের ঢেউ। কোনোকিছু নিয়ে সন্দিগ্ধ সে। প্রত্যয়কে দেখা মাত্রই হাতের পিঠে চোখ মুছলো অরু। চটপট জিজ্ঞেস করলো,

'কথা হয়েছে, প্রত্যয় ভাই?'

বেখেয়ালে মাথা নাড়ালো প্রত্যয়। অনু ভ্রু কুঁচকে শুধালো,

'কি ব্যাপার, থম মেরে আছো যে? ভাইয়া কি বেশি রাগ করেছেন?'

এদিক-ওদিক মাথা নাড়ালো প্রত্যয়। অর্থাৎ না। সঙ্গে সঙ্গে তেতে উঠলো অরু। নাকটা সিঁকোয় তুলে বললো,

'ভারী অদ্ভুত তো আপনি, প্রত্যয় ভাই। রাগ যেহেতু করেনি, তাহলে এমন রোবট হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন কেন?'

'ওটাই তো ভাবছি। ভাই রাগ দেখালো না একটুও। উল্টো আমাকে বললো, তোমার যখন ইচ্ছে হয় তখনই যাতে পৌঁছে দিই।'

প্রত্যয়ের কথায় অনু তৃপ্তির হাসি হাসলো। অরুও তাল মেলালো তাতে। কিন্তু কোথাও যেন আফসোস হলো তার। ভেতর ভেতর আশঙ্কার ঝড় উঠেছে ভীষণ। ভোঁতা এক অভিমানে গুটিয়ে গেলো হৃদয়টা।

জীবনে বোধ হয় এটাই প্রথম, অরুর অনুপস্থিতিতে ক্রীতিক এতটা নির্লিপ্ত। কিন্তু কেন? সে কি বদলে গেলো তবে? নাকি ভালোবাসা ফুরিয়ে গেলো?

ক্রীতিকের কথা মতো অরুর ইচ্ছানুযায়ী তাকে সন্ধ্যার পরে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছে প্রত্যয়। অরু ফেরার আগে সঙ্গহীন একাকী আপার কাছে গচ্ছিত রেখে এসেছে নিজের আদরের বিড়াল ডোরাকে। বলেছে,

'আজ থেকে ডোরা তোর মেয়ে আপা। ওকে যত্নে রাখিস। ও কিন্তু ক্যাটফুড একদমই খেতে চায় না। ওকে বাঙালিদের মতো মাছভাত আর দুধ খাওয়াতে হয়।'

অনু প্রথমে নিতে চায়নি। সরাসরি নাকচ করে দিয়েছিল বোনকে। যতই হোক, এই বিদেশের মাটিতে পা রাখার পরে অরুর একমাত্র সঙ্গী ছিল বিড়াল ছানা ডোরা। ডোরা এখন আর ছানা নেই, সে প্রাপ্তবয়স্ক। খুব শীঘ্রই হয়তো বিয়েও দিতে হবে তার। কিন্তু তাতে কি? অরুর কাছে তো সে এখনো ছোট বাচ্চা, যার নরম কোমল লোমশ শরীরে এখনো মাতৃস্নেহের পরশ বোলায় অরু। অনু ডোরাকে নিতে অনিচ্ছা প্রকাশ করলে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে অরু। একপ্রকার জেদ ধরেই বলে,

'তুই কি ভেবেছিস আপা? আমি ওকে ভালোবেসে দিচ্ছি? জি না, এই ফাজিলকে আর আমি রাখতে পারবো না। ক্যাটফুডের ধারে কাছেও ঘেঁষে না, দু'বেলা মাছ বেছে কে খাওয়াবে ওকে? ভাব দেখলে মনে হয় মহারানী ভিক্টোরিয়া। আমি এতো খাতির যত্ন করতে পারবো না আর। তুই নিয়ে যা তো। ধর ধর।'

অরু জানতো আদর দেখিয়ে বললে আপা কখনোই নেবে না। তাইতো ডোরাকে অনুর কোলে একপ্রকার চাপিয়ে দিয়েই চলে এসেছে সে।

তখন শক্ত মুখে গটগট করে চলে এলেও, এই মুহূর্তে বাড়ির গেইটে পা রাখতেই ভেতরে অনুভূতির পাহাড় ভাঙছে তার। ধীরে ধীরে হাঁটতে গিয়ে অরু টের পেল বুকের ভেতর অব্যক্ত এক শূন্যস্থানের উপস্থিতি। চোখের কোলে জড়ো হয়েছে ছলছলে নোনাজল।

বসার ঘরে ক্রীতিকের উপস্থিতি টের পেয়ে জলটুকু হাতের পিঠে অবলীলায় মুছলো সে। তারপর এগিয়ে গেলো সম্মুখে। কাউচের উপর মাথা এলিয়ে দিয়ে মেঝেতে বসে টিভি স্কিনে গেইম খেলছে ক্রীতিক। পড়নে এখনো ফর্মাল পোশাক, টাইয়ের নটটা ঢিলে হয়ে ঝুলে আছে শার্টের উপর। অরু পাশ ঘুরতেই তার নজরে পড়লো চকচকে স্বচ্ছ ওয়াইনের গ্লাস। সঙ্গে সঙ্গে মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো তার। কিঞ্চিৎ ঝাঁঝ নিয়ে বললো,

'আপনি বাড়িতে বসে ড্রিংক করছেন?'

টিভি স্ক্রিনে দৃষ্টি আবদ্ধ রেখেই নির্লিপ্তে মাথা নাড়ালো ক্রীতিক। সুইচবোর্ড চেপে ঠাস করে টিভি বন্ধ করে দিলো অরু। চোয়ালের পেশী শক্ত করে বললো,

'কেন করছেন? এতো অধপতন কবে হলো?'

'তুই ছিলিনা তাই...'

'আমি ছিলাম না বলে ঘরে বসে মদ খেতে হবে? আমি না থাকলে আর কি কি করতেন আপনি?'

ক্রীতিক রাগ দেখালো না। লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অরুর হাত ধরে টেনে বসালো মেঝেতে। ওর ছোট্ট কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে শীতল গলায় আওড়ালো,

'আমার আজ ভীষণ রাইডিংয়ের ক্রেভিং হচ্ছে অরু। হেলমেট, লেদারসুট, গ্লাভস পড়ে আমি বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উড়বো। উফফস, থ্রীলিং।'

বলতে বলতেই আবেশে চোখ বুজলো ক্রীতিক। তার আনমনা হাসিমাখা মুখ দেখে মনে হচ্ছে মানসিকভাবে সে এখন বাইকেই ভেসে বেড়াচ্ছে। মলিন দৃষ্টে উজ্জ্বল টালমাটাল মুখটাকে পরখ করলো অরু। নরম স্বরে বললো,

বললো,

'তাহলে চালান না কেন বাইক? আপনাকে রাইডিং করতে দেখতে আমারও তো ভীষণ ভালো লাগে।'

এদিক-ওদিক মাথা নাড়ালো ক্রীতিক। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,

'বাইক তোকে ব্যথা দিয়েছে অরু। ভীষণ ব্যথা দিয়েছে।'

'বাইক আমাকে ব্যথা দিয়েছে বলে এতো জেদ? সামনে আরও কথা ব্যথা অপেক্ষা করছে আমার জন্য।'

কথা বলত বলতেই নিজ উদরে হাত ছোঁয়ালো অরু। ক্রীতিক খেয়াল করলো না। নেশার ঘোরে বুদ হয়ে আছে সে। উল্টো অস্পষ্ট মাতাল স্বরে জবাব দিলো,

'তুই ব্যথা পেলে আমার ভীষণ লাগে রে অরু। এখানে ভীষণ লাগে।'

বুকের বাম পাশে হাত ছোঁয়ালো ক্রীতিক। পরপরই কঠিন হয়ে এলো তার কণ্ঠস্বর। দাঁতে দাঁত পিষে বললো,

'তোকে যে ব্যথা দেওয়ার কথা কল্পনাও করবে, তার আজন্ম ব্যথার করুন ইতিহাস লিখবো আমি। যার প্রতিটা পৃষ্ঠা যন্ত্রণায় হাঁপায়।'

অরুর মেঘ থমথমে অভিমানী মনের গহীন কোণে একছটাক সূর্য উদয় হয়েও ফের মিলিয়ে গেলো তা। অযাচিত দৃষ্টি গিয়ে আটকালো কাউচের উপর সন্তোর্পণে রেখে দেওয়া গোলাপ ফুলের বুকেটাতে। চট করেই প্রশ্ন করলো,

'বুকে কোথায় পেলেন? আপনার না গোলাপে অ্যালার্জি?'

'গেইটের কাছে পেয়েছি।'

ক্রীতিকের নামে গোলাপ আসা নতুন কিছু নয়। সেই শুরু থেকে 's' নামক অজ্ঞাত কোনো ব্যক্তি প্রতিটি স্পেশাল দিনে গোলাপ দিয়ে যায় তাকে। কিন্তু আজকাল স্পেশাল কিংবা স্মৃতি বিজড়িত মুহূর্তের মোটেও তোয়াক্কা করে না সে ব্যক্তি। যখন তখন গেইটে এসে রেখে যায় এসব।

ক্রীতিক বুকেটা ঘরে নিয়ে আসায় অরু একটু রাগ দেখালো। রুষ্ট গলায় প্রশ্ন করলো,

'অন্য সময় হলে রেগেমেগে ছুড়ে ফেলে দেন। আজ হঠাৎ যত্ন করে বাসায় নিয়ে এলেন যে?'

'তোর পছন্দ তাই।'

ক্রীতিকের নিরুদ্বেগ প্রত্যুত্তর যা শোনা মাত্রই রাগের পারদ আকাশ ছুঁলো অরুর। তৎক্ষণাৎ দূরত্ব বাড়িয়ে কঠিন স্বরে বলে উঠলো,

'আমি পছন্দ করি বলে অন্য কারোর দেওয়া গোলাপ বাসায় নিয়ে আসবেন? আশ্চর্য!'

ক্রীতিক নিশ্চুপ হয়ে শুনে গেলো। কোনোরূপ প্রত্যুত্তর করলো না। অরুকে বকলো না, মারলো না, অধিকারবোধ দেখালো না। কেন যেন ক্রীতিকের মাঝে এই নির্লিপ্ত শীতল ভাবটা মোটেও ভালো লাগেনা অরুর। নিজেকে ভীষণ ফেলনা মনে হয়। সহসা রাগ দেখিয়ে তৎক্ষণাৎ উপরে চলে গেলো মেয়েটা। যাওয়ার সময় পেছন থেকে ভেসে এলো ক্রীতিকের সতর্ক কণ্ঠস্বর,

'সাবধানে বেইবি।

নভেম্বর মাসের শেষ ক'দিন থেকে বৃষ্টি আসে। আবহাওয়ার গতিবিধি যাচ্ছে তাই। শীতকালে বর্ষার আমেজটা খানিক রোমাঞ্চকর। ঝাপসা হয়ে আসা ঘন কুয়াশাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ঝমঝমিয়ে আসা এক পশলা বারিধারার সঙ্গে হু হু করে বয়ে যায় অবিরাম হিমেল স্নিগ্ধ বাতাস। সেই কনকনে ঠান্ডা বাতাসে উড়ন্ত প্রজাপতির মতোই নেচে-কুঁদে ওঠে অষ্টাদশীর ছোট্ট হৃদয় গহীন। অলসতা এসে ভর করে ব্যতিগ্রস্ত মস্তিষ্কে। মরণপণ করেও সেই উড়ন্ত মনটাকে দমাতে পারেনা রমণী। হাজার ব্যস্ততাকে পায়ে ঠেলে এক কাপ গরম কফি হাতে ছুটে যায় ছাঁদ বারান্দায়। শরীরে ভালো মতো ওমের চাদর টেনে কনকনে ঠান্ডার মাঝেই বসে পড়ে দোলনার গদিতে। শীতের তোড়ে রক্ত জমে আসে, ঠকঠকিয়ে কেঁপে ওঠে হৃদযন্ত্র। তাও নাক টানতে টানতে সেই মাথা নষ্ট করা রোমাঞ্চকর পরিবেশটাকে কফির সাথে উপভোগ করতে বেশ লাগে অরুর।

আজও তার ব্যতিক্রম নয়। ভোরের আলো ফুটতেই অরু এসে দাঁড়িয়েছে চিরচেনা সেই ছাঁদ বারান্দায়। তবে আজ খুশির আভা নেই রমণীর সুশ্রী মুখাবয়বে। ফুটেছে নীল বিষাদের ছায়া। দীঘির জলের মতো স্বচ্ছ নেত্রগহ্বর জুড়ে হানা দিয়েছে তপ্ত বেদনাশ্রু। সেথায় উষ্ণ জলের উপস্থিতি। অবহেলায় নির্বিকারে ঠান্ডা কপোল বেয়ে গড়িয়ে পড়ে সেগুলো। এ যেন অশ্রু নয়, স্বয়ং ক্রীতিকের ভালোবাসা। মন চাইলেও যা খুব করে আঁকড়ে ধরতে পারছে না অরু।

নিশ্চল দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আনমনা অরু ভাবে, প্রথম প্রথম বিদেশের বাড়িতে খুব একটা মন্দ যায়নি দিনকাল। এই ছোট্ট ডুপ্লেক্স বাড়িটা এখন অরুর সংসার। অরু নিজ হাতে সাজিয়েছে সবকিছু। রেঁধে বেড়ে খুব যত্ন সহকারে স্বামী নামক মানুষটাকে খাওয়ায় সে। ক্রীতিকের জীবনের অপ্রাপ্তির অধ্যায় বিস্তৃত। সেই বিষাদময় দিনগুলো ভুলিয়ে দিতে সে কি পাঁয়তারা মেয়েটার। যেন স্বামীর একাকীত্বের বেদনা স্বয়ং অরুর রন্ধ্রে বয়। আচ্ছা, এতোটাও কি ভালোবাসা যায়? ভালোবাসার মানুষটা যখন জায়ান ক্রীতিক, তখন বোধ হয় যায়।

বেপরোয়া গোছের ভবঘুরে জায়ান ক্রীতিক ও যেন আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে গিয়েছিল অষ্টাদশীর সেই অদৃশ্য মায়ার আস্তরণে। জড়িয়ে গিয়েছে কথাটা খানিক ভুল, জড়াতে দিয়েছে। কবুতরের ন্যায় পেলব কোমল অরুর একবুক উষ্ণ মমতাকে জোর হস্তে ঠায় দিয়েছিল আপন অন্তরে। তৃষ্ণার্থ চাতকের ন্যায় হরণ করেছিল ওই মেয়েটার সবটুকু মায়ার ভাণ্ডার। অষ্টাদশীর হৃদয় ছাপিয়ে শরীর, এমনকি সমস্ত অস্তিত্বই যেন জানান দিয়ে যেত ক্রীতিক নামক সত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশের।

অথচ সেই বুদবুদিয়ে উথলে ওঠা ভালোবাসার জোয়ারে অকস্মাৎ কার নজর পড়লো, কে জানে? ভালো নেই অরু। মোটেই ভালো নেই ওর ভালোবাসারা। দিনকে দিন অন্তঃস্থলের সেই তরতাজা ভৃঙ্গরাজ খানা অচিরেই শুকিয়ে যাচ্ছে বোধ হয়। হৃদয় মাঝে হুহু করে বইছে বিষণ্ণতার কালো ঝড়। এমনটা চলতে থাকলে মরে যাবে অরু, সত্যিই মরে যাবে।

ভাবনার অতলে ডুব দেওয়ার সুযোগ হলোনা অরুর। ছাঁদ বারান্দায় পা রাখার কয়েক মিনিটের মাথায় ফ্রেন্স গেটের ওপাশ থেকে বাজখাঁই আওয়াজ তুলে কারো উপস্থিতি জানান দিলো কলিংবেলটা। এহেন বৈরী আবহাওয়ার মাঝে কোনো পার্সেল এসেছে নাকি, সেই ভেবে কৌতুহলী হয়ে উঠলো মস্তিষ্ক। অগত্যা আধখাওয়া কফিটা টেবিলের কর্ণারে রেখে চলে গেলো নিচ তলায়।

লিভিং রুমের কাউচে উলের সোয়েটার রাখা, সেটাকে ভালোমতো শরীরে প্যাঁচিয়ে ধীর পদযুগলে গেটের কাছে এসে উপস্থিত হয় অরু।

বাইরে পা রাখতেই বাতাসের তীব্রতায় দু'চোখ বুজে এলো ওর। সতেজ স্নিগ্ধ হাওয়া বুকে পুরে প্রশান্তি লাগছিল ভীষণ। তবে সম্মুখের দৃশ্য অবলোকিত হতে না হতেই উবে গেলো সেই প্রশান্তি। অজান্তেই চোয়াল পাটি শক্ত হয়ে চিড়বিড়িয়ে উঠলো মস্তিষ্কটা। গেটের পাশে খুব যত্নসহকারে একটা তরতাজা গোলাপের বুকে রাখা আছে, তার মাঝে হলুদ কাগজে মোড়ানো ছোট্ট চিরকুট। অরু ভালো করেই জানে ওই চিরকুটের মাঝে কি লেখা রয়েছে, তবুও তুচ্ছ হাতে ভাজ খুলে তাতে

'good morning jk sir. Have a nice day,

~~ from (s)'

পরমূহুর্তেই তিরিক্ষি হাতে চিরকুটটাকে ছিড়ে খুঁড়ে ফুল সমেত এক ঝটকায় ফেলে দিলো ময়লার বিনে। ক্রুদ্ধস্বরে বিড়বিড়ালো, ' জেকে স্যারকে প্রতিদিন ফুলের বুকে পাঠানো হয়, অথচ তার যে গোলাপে এলার্জী রয়েছে সেটুকুই জানেনা, মূর্খ রমণী।'

ওয়েল, এই ফুল পাঠানোর ব্যাপারটা আগে মাঝেমধ্যে ঘটতো। ক্রীতিকের জন্মদিন, ভ্যালেন্টাইন ডে, ক্রিসমাস কিংবা অন্য কোনো বিশেষ দিনে (s) নামক অজ্ঞাত এক ব্যক্তির নিকট থেকে ক্রীতিকের নামে উপহার আসতো। কিন্তু অরু এই বাড়িতে পদার্পণের কিছুদিন পর থেকেই শুরু হয় উপহারের জ্বালাতন। প্রতিদিনই নিয়ম করে অন্তত শ খানিক তাজা গোলাপ আসে ক্রীতিকের নামে, সঙ্গে নানান রকম উইশকৃত চিরকুট।

যদিও ইদানীং ক্রীতিকের অগোচরে সেসব কিছু গায়েব করে ফেলে অরু। তবে এসব ঠুনকো ব্যাপারগুলো আজকাল বেশ হীনমন্যতায় ভোগায় অরুকে। না চাইতেও অপ্রত্যাশিত ভাবনারা পঙ্গপালের ন্যায় হানা দেয় মস্তিষ্কে। এর অবশ্য যথেষ্ট কারণও রয়েছে, প্রায়ই চিরকুটের মাঝে ক্রীতিককে নিয়ে ভার্সিটিতে ঘটে যাওয়া নিত্যনৈমত্তিক কিছু ঘটনা লেখা থাকে, যেগুলো অরুর অজানা। অবশ্য ওর জানার কথাও নয়, প্রেগন্যান্সির ফার্স্ট ট্রাইমেস্টার শুরু হওয়ার পর থেকেই শারীরিক অসুস্থতার জন্য ভার্সিটি যাওয়া বন্ধ তার। ক্রীতিক বাড়িতে যতটুকু লেসন দেয়, ততটুকুই। তবে, আজকাল বড্ড বেশি উদাসীন লাগে ক্রীতিককে। বাড়িতেও থাকা হয়ে ওঠেনা খুব একটা। প্রশ্ন করার অভ্যাস নেই অরুর, তাই আগ বাড়িয়ে জানতে চায় না কখনো। এই জানতে না চাওয়া, প্রতিদিন উপহার আসার ব্যাপারগুলো এড়িয়ে যাওয়ার ফলে গুমোট অসহায়ত্ব বাসা বেঁধেছে অরুর মনে। দিনকে দিন অদৃশ্য আঁধারে ঢেকে যাচ্ছে তার হৃদগহীন।

সেই বেপরোয়া লোকটা, যে কিনা অরুতে আসক্ত। সমাজ, পরিবার, এমনকি পুরো দুনিয়ার বিপক্ষে গিয়ে যেই মানুষটা শুধুমাত্র অরুকে চেয়েছে। সমাজের নিয়ম নীতিকে একহাত দেখিয়ে নিজের সৎ বোনকে বিয়ে করার মতো দুঃসাহস দেখিয়েছে। আজকাল তার মাঝে সেই উন্মাদ পাগলাটে প্রেমিক ভাবটা আর কিছুতেই খুঁজে পায় না অরু। আগে যখনই ক্রীতিক সাধারণ বিষয়গুলো নিয়ে বারাবারি করতো, অথচ রেগে যেত, নিজের মর্জি মতো অরুকে কাছে না পেলে তুলকালাম বাঁধিয়ে ফেলতো। তখন অরু মনে মনে হাজার বার প্রার্থনা করতো, মানুষটা যাতে একটুখানি সভ্য হয়। ভালোবাসার নামে তার অতিরিক্ত আসক্তি, বেপরোয়া, লাগামহীন পাগলামি গুলো যাতে কিছুটা হলেও দমে যায়। এমন উগ্র ছন্নছাড়া ভাব নিয়ে আর যা-ই হোক, কোনো ভদ্র সমাজে বসবাস করা যায় না। গেলেও চক্ষুলজ্জা খোয়াতে হয় সবার আগে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন