ফন্ট সাইজ:
থিম:
একমুঠো সঙ্গীন প্রনয়াসক্তি

৪র্থ পর্ব

লেখক: সুরাইয়া রাফা

অথচ ইদানীং বেশ কয়েকদিন ধরে ক্রীতিকের সকল পাগলামি যখন শূন্যের কোঠায় চলে এলো, ভালোবাসার নামে মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি যখন কমে এলো, সত্যি সত্যিই উপর ওয়ালা যখন অরুর প্রার্থনা কবুল করলো, তখন কি জানি কি হলো ওর। আর ভালো লাগছে না এই মানুষটাকে। অবুঝ মনটাকে কেন যেন হাজার বুঝিয়েও শান্ত করতে পারছে না মেয়েটা। যেন ভালোবাসার অভাবে হৃদয় শুকিয়ে যাচ্ছে ওর। তার মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি, অহেতুক জ্বালাতন, বিনা কারণে বকাঝকা ঠিক তার পরপরই আদুরে উন্মাদনায় স্বর্গীয় সুখের উল্লাসে ভাসানো, সব সবকিছু ভীষণ মিস করে অরু।

প্রেগন্যান্সির তিন মাস চলমান ওর। গর্ভকালীন সময়ের মুড সুইং নাকি অতিরিক্ত ভুলভাল ভাবনা থেকে এসব হচ্ছে, সঠিক জানা নেই মেয়েটার। নয়তো এ ধরনের অসুস্থ লাগামহীন ভালোবাসা কারোর কি করে ভালো লাগতে পারে?

অরু কিচ্ছু জানেনা, শুধু বারংবার সেই বেপরোয়া লোকটাকে মনে পড়ে ওর। তার ভালোবাসা পাগলামিতে ভেসে যেতে চায় মন। একান্ত কাছে টানার মিষ্টি যাতনায় তার হাতে বহুবার ম'রে যেতে ইচ্ছে হয়। কেন ক্রীতিকের স্বাভাবিক আচরণগুলো অরুর স্বাভাবিক মনে হয় না? কেন নিজের তড়ে পাগলামি না করলে ক্রীতিকের প্রতি অভিমানে কণ্ঠনালি ধরে আসে অরুর? এ কেমন অস্থিরতা? সে হদিস জানেনা রমণী। আজ বেশ রাত করে বাড়ি ফিরলো ক্রীতিক। গত কয়েক মাস হলো প্রফেসর পেশায় ফিরেছে সে, যার দরুন ব্যস্ততা ভীষণ। ফিরতে প্রতিদিনই মাঝরাত গড়ায়। কোনো কালেই জীবনের গন্ডিতে পিছুটান অনুভব না করা মানুষটা হুট করেই পুরোনো পেশায় নিযুক্ত হয়েছে, এর পেছনের রহস্য সম্মন্ধে পুরোপুরি অজ্ঞাত অরু। ক্রীতিক নিজেও কোনোদিন মুখ খোলেনি এ ব্যাপারে, শুধু বলেছে,

'আমার মতো ভবঘুরে ইনডিসিপ্লিন মানুষের দ্বারা আর যাই হোক কোম্পানির ক্লায়েন্ট সামলানো সম্ভব নয়। ওটা আপাতত মাদার ইন ল সামলে নিক, তিনি পটল তুললে না হয় অন্য কিছু ভাবা যাবে।'

সকাল থেকেই উদাসীন হয়ে আছে অরু, মন ভালো নেই ওর। ক্রীতিক লিভিং এ প্রবেশ করতেই দেখলো অরু শুয়ে আছে কাউচে। ও আর ডাকলো না মেয়েটাকে, নির্লিপ্ত পদযুগলে খানিক এগিয়ে এসে সুক্ষ্ম নেত্রে পরখ করলো একপল, দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিড়বিড়ালো,

'এতো ফ্যাকাসে কেন লাগছে তোকে? আমি তো তোর জন্য পাগলামো করা বন্ধ করে দিয়েছি, তোকে আগের মতো জ্বালাচ্ছি না, সভ্যতার বিশাল গন্ডিতে বন্দী করেছি নিজেকে। তবুও কিসের এতো দুশ্চিন্তায় অবচেতন তুই?'

জবাব এলোনা অপর প্রান্ত থেকে, অরু ঘুমিয়ে আছে। ক্রীতিক আর কথা বাড়ায় না, পকেট থেকে ওয়ালেট আর গাড়ির চাবিটা বের করে ছুড়ে মারলো কফি টেবিলের উপর। অতঃপর ঘুমন্ত অরুকে বাহুবদ্ধ করে সিঁড়ি ভেঙে এগিয়ে যায় নিজেদের শোবার ঘরের দিকে।

ঘড়ির কাটা তখন দুইয়ের ঘরে। ভীষণ পরিচিত পুরুষালী তপ্ত নিঃশ্বাসে খানিক কেঁপে ওঠে ঘুমন্ত অরু। পুরুষালি ক্লোন মিশ্রিত স্যান্ডাল উড পারফিউমের ঘোর লাগা সুঘ্রাণে অন্তর শীতল হয়ে আসছে যেন। ঘুমন্ত মস্তিষ্ক বারংবার ইঙ্গিত দিয়ে যাচ্ছে প্রেমানুভূতির। শরীরের প্রতিটি খাঁজে একজোড়া সিক্ত অধরের নিদারুণ কারুকাজ। প্রতিটি বেসামাল স্পর্শে জাগ্রত হয়ে ওঠে ভেতরের সুপ্ত নিষিদ্ধ অনুভূতিরা। তন্দ্রাচ্ছন্ন অরু নিমেষেই গুটিয়ে যায় সেই স্পর্শে, এলোমেলো দু'হাতে স্বামীর পৃষ্ঠদেশে খচিত করে প্রণয়ের ক্ষত চিহ্ন। বিরামহীন প্রতিটি উন্মাদ নখর স্পর্শে রক্তাক্ত হয়ে ওঠে ক্রীতিকের ফর্সা ত্বক। তবুও নির্বিকার, প্রেয়সীর সবটুকু সৌন্দর্য উন্মোচনে বেসামাল তার ওষ্ঠাধর।

স্পর্শের গভীরতায় তন্দ্রা কেটে গেলো অরুর। চোখ খুলতেই নিজেকে আবিষ্কার করলো বস্ত্রহীন, তবে উন্মুক্ত নয়। ক্রীতিকের বলিষ্ঠ দেহের মাঝে অতি সন্তোর্পণে ঢাকা পরে আছে ওর শীর্ণকায় ছোট্ট তুলতুলে শরীরখানা।

অরু তাকিয়ে আছে। ব্যাপারটা উপলব্ধি হতেই ক্রীতিক গ্রীবা তুলে চাইলো ওর পানে। ঘোর লাগা চাহনি, অথচ শিশু সুলভ নিষ্প্রভঅভিব্যক্তি, যেন অরুর নিষেধাজ্ঞা এলে আজ সত্যিই ধৈর্য হারিয়ে মরে যাবে সে।

'তোর তিন মাস চলছে তাই না অরু?'

ক্রীতিকের প্রশ্নে পুরোপুরি ঘুম ছুটে গেলো এবার। মাত্রাতিরিক্ত সুদর্শন জ্বলজ্বলে কৃষ্ণগহ্বরে একপল চোখ বুলিয়ে দৃষ্টি নামালো অরু। নিজের অবস্থান পর্যবেক্ষণ করে ভঙ্গুর স্বরে বলে উঠলো,

'কি করছিলেন আপনি?'

অরুর মুডের বারোটা বেজে আছে। সেই ঘটনা আঁচ করতে পেরে ওর গলার মাঝে নাক ডোবালো ক্রীতিক। মেয়েটাকে আদুরে স্পর্শে ভরিয়ে দিতে দিতে শান্ত গলায় প্রশ্ন করলো,

'ক্যান আই হ্যাভ ইউ টুনাইট হার্টবিট?'

প্রত্যুত্তর করলো না অরু। নিস্তেজ অনুভূতিহীন হয়ে পরে রইলো ক্রীতিকের বাহুর মাঝে। অরুর এহেন নির্জীবতায় থমকালো ক্রীতিক। ওকে ছেড়ে দিয়ে খানিক দূরত্ব বাড়ালো তৎক্ষণাৎ। উদ্বিগ্ন স্বরে প্রশ্ন ছুড়লো,

'আর ইউ ওকে বেইবি? ঠিক আছিস?'

'আগেতো ঠিক আছি কিনা কখনো জিজ্ঞেস করতেন না, যখন যেভাবে ইচ্ছে নিজের চাহিদা উশুল করে নিতেন, তাহলে এখন কেন এতো উদ্বিগ্ন হচ্ছেন? আপনি তো এমনটা নন, এটা মোটেই আপনার প্রকৃতি নয়।'

ফোঁস করে তপ্তশ্বাস ছাড়লো ক্রীতিক, নিরেট স্বরে বললো,

'আমি তোর মনের মতো হতে চাইছি অরু, এখনো বোধ হয় ঠিকভাবে হয়ে উঠতে পারছি না।'

'মানে?'

কন্ঠে রাজ্যের কৌতূহল টেনে চোখ তুলে তাকায় অরু। ক্রীতিক আর কথা বাড়ায় না, অরুকে নিজের কাছে টেনে এনে ওর মাথায় স্নেহের আঙুল বুলিয়ে বলে,

'কিছু না, ঘুমিয়ে পর। ইউ নিড টু টেইক সাম রেস্ট।'

এই মানুষটা অরুকে এতো সহজে ঘুমাতে দিচ্ছে? আজেবাজে কথা বলে বিরক্ত করছে না মোটেই, ওকে ভালোবাসার জন্য হাজারটা তদারকি করছে না, না তো কোনো অহেতুক পাগলামি। ভালোবাসাটা যেন পানসে হয়ে গিয়েছে। ক্রীতিকের এহেন ডিসেন্ট আচরণে অরুর হৃদয় খামচে উঠলো। না চাইতেও বুকের রক্ত তোলপাড় করা হাহাকারে গুঙিয়ে উঠলো ভেতরটা, মনে পড়ে গেলো সকালের সেই তাজা গোলাপ আর চিরকুটের মুহূর্তটা। সন্দেহের পারদ আকাশ ছুঁলো যেন, অগত্যা কোনোমতে বুকের কান্না গিলে, রুক্ষ প্রাণহীন স্বরে অরু বলে ওঠে,

'আমি দেশে ফিরবো?'

'হোয়াট!'

কপাল গোছালো ক্রীতিক।

'বেশ কয়েকদিন ধরেই আপা অনুযোগ করছে, তাছাড়া আমারও আর এখানে থাকতে ভালো লাগছে না, ডোরাকে মিস করছি।'

সংবরণ হলোনা ক্রীতিকের লাগামহীন মেজাজ। ক্রুদ্ধস্বরে ধ্বনিত হলো,

'তোর ডোরা কে চাই ভালো কথা, দেশ থেকে নিয়ে আসবো। কিন্তু আমার কাছে থাকতে ভালো লাগছেনা এই বাক্য কেন উচ্চারণ করলি? জানের মায়া নেই নাকি?'

বিরস মুখে অরু বলে,

'আমার থাকা না থাকায় আপনার কি আসে যায়? তাছাড়া এটা আমার জীবন, আমার সিদ্ধান্ত।'

ক্রীতিক যেন দিশেহারা হয়ে গেলো। মূহুর্তেই অভিব্যক্তিতে ধরা দিলো উগ্র বেপরোয়া অস্তিত্ব। চোয়ালের পেশী শক্ত করে বললো,

'মাঝরাতে মার খাওয়ার শখ হয়েছে? শখ হলে কাছে আয় তোকে মে'রে ফেলি। এমনিতেও নিজের মধ্যে নেই আমি।'

'আপনি না মারলেও আমি মরে যাবো। এখানে দমবন্ধ লাগে আমার। অনেক হয়েছে, এবার দেশে ফিরতে চাই।'

এক প্রকার বিরক্তির স্বরে বাক্যকটা বের করলো অরু। ওর কথায় মূহুর্তেই অগ্নিস্ফুলিঙ্গ খেলে গেলো ক্রীতিকের ব্যতিগ্রস্ত মস্তিষ্ক জুড়ে। ফের দাঁতে দাঁত পিষে প্রত্যুত্তর করলো,

'ডোন্ট ক্রস ইওর লিমিট অরু, আমার বাচ্চাটাকে পেটে নিয়ে বসে আছিস। তোর কষ্ট হচ্ছে, তাই ধৈর্য ধারণ করছি, তাই বলে এই না যে আমি তোকে কাঁদাতে ভয় পাই। তুই বাঁচলেও আমার আর মরলেও আমার। কথাটা মস্তিষ্কে সেট করে ফেল।'

আজ কতগুলো দিন হলো মানুষটা ওকে নীরবে উপেক্ষা করে যাচ্ছে। কাছাকাছি আসছে না, ভালোবাসার জন্য পাগলামো করছে না, অধিকারবোধের মিষ্টি যন্ত্রণায় অরুকে ধরাশায়ী করছে না। এটা কি অবহেলা নয়? আত্মগ্লানি যেন গিলে গিলে খাচ্ছে অরুকে।

কিন্তু উগ্র বেপরোয়া জায়ান ক্রীতিককে কে বোঝাবে এই অভিমান? সে তো বরাবরের মতোই নাছোড়বান্দা।

সেই যে একা একা ক্যালিফোর্ণিয়ার মাটিতে পা রেখেছিল মেয়েটা, এরপর কতগুলো দিন পেরিয়ে গেলো দেশে আর ফেরা হয়নি অরুর। বহুবার যাবো যাবো বলেও যেতে দেয়নি ক্রীতিক। বেপরোয়া লোকটার একরোখা, ঘাড়ত্যাড়া স্বভাব নাকি কোথায় একটা হারানোর ভয়, জানা নেই ওর। সে যাই হোক, সে রাতে হুশ হারিয়ে উগ্রতার চরম শিয়রে পৌঁছে গিয়েছিল রমণীর গুমরে মরা অভিমানী চিত্ত। দেশে ফেরা নিয়ে সামান্য বাকবিতন্ডা এক পর্যায় লাগামহীন হয়ে পৌঁছে যায় ডিভোর্স অবধি। কথাটা ইচ্ছেকৃত ছিল না, তীব্র ক্রোধে অনেকটা বেখেয়ালেই বলে ফেলেছিল অরু,

'আমি আপনার স্লেভ নই, যে সারাক্ষণ গলায় দড়ি বেঁধে নিজের কাছে আটকে রাখবেন। বলেছি যখন যাবো তখন যাবোই।'

অরুর কর্কশ ধ্বণিতে জ্বলে ওঠে ক্রীতিক। তক্ষুনি বেওয়ারিশ হয়ে পুরুষালি আঙুলের মাঝে শক্ত করে চেপে ধরে ওর নাজুক তুলতুলে চিবুকখানা। দাঁতে দাঁত পিষে অত্যন্ত রূঢ় ভাষায় জবাব দেয়,

'অনেক বড় হয়ে গিয়েছিস তাই না? স্লেভ বলা শিখেছিস? নিজেকে এতো নিচে নামাতে লজ্জা করলো না? কত বড় সাহস তোর অরু!'

ক্রীতিকের রুক্ষ আওয়াজে কেঁপে ওঠে অরু। ডুকরে কেঁদে উঠে বলে,

'যা বলেছি ঠিকই বলেছি, ভালোবাসেন না আপনি আমাকে। স্লেভের মতোই আঁটকে রাখেন শুধু।'

'দরকার পরলে তাই থাকবি। তুই আমার, তোর ভেতর বাহির সবটা আমার। ভালো না লাগলেও এখানেই থাকতে হবে তোকে।'

ক্রীতিকের কন্ঠে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের তাপ। যে কোনো সময় অনর্থ ঘটিয়ে ফেলা তার জন্য অত্যাবশ্যক। তেমন করেই আগুন চোখে চেয়ে রইলো অরুর পানে। আগ্রাসী হয়ে নাক ফোলালো অরু, ক্রীতিকের শক্ত বাঁধন হতে নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা অব্যাহত রেখেই বললো,

'থাকবো না। এভাবে থাকা যায় না, যেখানে নিজের ইচ্ছেগুলো মূল্যহীন সেখানে ভালোবাসার উপস্থিতি অনর্থক, অস্তিত্বহীন।'

'আমি তোকে ভালোবাসি কে বললো? তুই আমার অবসেশন। আনহেলদি অবসেশন, অনেকটা ড্রাগের মতো, না পেলে মরে যাই। বুঝিস না?'

ক্রীতিকের কথা শুনে অচিরেই চোখের কোটর ভরে উঠলো অরুর। মেয়েটা নাক টেনে বিমর্ষ স্বরে বললো,

'না ভালোবাসলে ডিভোর্স দিয়ে দিন। শুধু শুধু এতো জোর জবরদস্তি কেন দেখান?'

আগের ক্রীতিক হলে এই অকুতোভয় শব্দ উচ্চারণের দ্বায়ে এতোক্ষণে দু'চারটা থাপ্পড় বসিয়ে অরুর নরম চেহারায় রক্ত জমাট বাঁধিয়ে দিতো নিশ্চিত। কিন্তু আজ মোটেই সেসবে আগ্রহী হলো না ওর ক্ষুদ্ধ অন্তঃকরণ। বাচ্চার মায়ের শরীরে হাত তোলার মতো বিশ্রী হিংস্রতা লাঘব করেনি সে। হতে পারে উগ্র বদমেজাজি, তাই বলে তার অংশকে নিজের অভ্যন্তরে ধারণ করে এক অপার্থিব অস্তিত্বে রূপ দেওয়া এই রমণীর শরীরে হাত তুলতে পারবে না সে। না, না কিছুতেই পারবে না।

কিন্তু এই কথার জন্য অরুকে তো শাস্তি দিতেই হবে। ওর দুঃসাহসের মূল্য হাড়ে হাড়ে বুঝিয়ে দিবে ক্রীতিক। ওদিকে লাগামহীন বুলেটের ন্যায় কথার বহর ছুড়তে ব্যস্ত অরু। প্রত্যুত্তরে ক্রীতিক কিছু বললো না আর। চূড়ান্ত রাগের আস্ফালন ঘটিয়ে নিজের খরখরে পুরুষালি অধর মাঝে চেপে ধরলো আরেক জোড়া মোম নরম ওষ্ঠাধর।

কথার বহর থমকে গেলো অরুর, তবে অন্তরে উজ্জীবিত ক্রোধ যেন উথলে উঠলো ফের। কি পেয়েছে কি লোকটা? কথায় কথায় বলে ভালোবাসি না, অথচ যখন যা মন চায় সেটাই আদায় করে নেয়ার ক্ষমতা রাখে। ভালো না বাসলে এতো অধিকার কোথায়? অরুর শিশুসুলভঅভিমানি মনটা তেঁতে উঠলো ভীষণ। রাগে গজরাতে গজরাতে পাতলা নখের আঁচড়ে ক্রীতিকের অনাবৃত পেশিবহুল বক্ষস্থল রক্তাক্ত করে ফেললো মুহূর্তেই। নিটোল ক্রীতিক এক সেকেন্ডের জন্যও দমলো না তাতে, উল্টো অরুর সরু গ্রীবাদেশে আঙুল প্যাঁচিয়ে শক্ত হাতে টেনে আনলো সন্নিকটে। রাগের বহিঃপ্রকাশে তীব্র দংশনে বিদীর্ণ করলো ক্রন্দনরত মেয়েটার নমনীয় অধরদেশ। সমগ্র মুখজুড়ে রক্তের নোনতা স্বাদের উপস্থিতি। অশ্রুকণার সহিত অধর গলানো রক্তের ধারা মিলেমিশে একাকার। ক্রীতিক নির্লিপ্তে গিললো সবটা। রাগের উদ্ভবে ঠোঁটের ফাঁক ছাঁড়িয়ে ক্রমশ তা ছড়ালো সমগ্র মুখমণ্ডলে। ঘাড়, গলা, বুক সবটাই খুবলে খেল যেন। অরু কাঁদলো না আজ, প্রস্থর খন্ড হয়ে সয়ে গেলো।

আজ তুচ্ছ রমণীর এই সামান্যতম কাঠিন্যতাটুকু ক্রীতিককে বিস্মিত করলো ভীষণ। অরু তো কখনো এমন করে না। কষ্ট পেলে কেঁদে ফেলে, আঘাতে গুটিয়ে যায়, অপমানে কুণ্ঠিত হয়, ভালোবাসা পেলে প্রজাপতি হয়ে নিদারুণ ডানা ঝাপটায়। হ্যা, এটাই তো ওর অরু। পেঁজা তুলোর মতোন তুলতুলে, মুক্ত বিহঙ্গের ন্যায় চঞ্চল। যার নমনীয়তা আর আসক্তির তোড়ে ব্যাগ্র হয়ে নির্দ্বিধায় পুরো দুনিয়া থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে ক্রীতিক। অরু নামক অসুখে মরণাপন্ন হলেও বোধ হয় এক জীবনে এইটুকুনি ক্লান্ত হবে না সে। অথচ আজ প্রেয়সীর সামান্যতম পরিবর্তন যেন মুহূর্তেই টুকরো টুকরো করে দিলো উগ্র মেজাজি লোকটার দাম্ভিকতার কঠোর দেওয়াল। প্রবল ক্ষুব্ধতায় বক্ষ গহীনে টগবগিয়ে উঠলো কিছু একটা। তাও দিশেহারা হয়ে ব্যাকুল কন্ঠে প্রতিধ্বনিত হলো,

'সে সামথিং অরু...'

'দূরে যান। ভালো লাগছে না, আপনার এই উদ্যত, পাগলাটে আচরণ দেখতে দেখতে ক্লান্ত আমি। সহ্য হয় না এখন আর, দয়া করে রেহাই দিন।'

'অনেক দূর চলে গিয়েছিস অরু থমে স্লেভ, তারপর ডিভোর্স আর এখন...'

একটু থেমে বললো,

'ডিড ইউ মিন ইট?'

হীমবাহের ন্যায় পরিশ্রান্ত কন্ঠস্বর।

অরু প্রত্যুত্তর করলো না কোনো, বিতৃষ্ণ হয়ে মুখ ফিরিয়ে নিলো শুধু।

এরপর পুরোটা সময় নৈঃশব্দ্য।

সারারাত ঘুম হলোনা আর। শেষ রাতের তন্ত্রাটুকু কেটে গেলো অতি ভোরেই। মর্নিং সিকনেসের দরুন বিছানায় শুয়েই হাসফাস করতে লাগলো রমণী। অন্যদিন সকাল সকাল ক্রীতিকের কণ্ঠস্বর শোনা গেলেও আজ মৃতের ন্যায় নীরব চারিপাশ। বোধ হয় তাড়াহুড়ো ভার্সিটি চলে গিয়েছে সে। অরু গুরুত্ব দিলোনা তেমন, কারণ ইদানীং ক্রীতিক না পারতে ঘুম থেকে জাগায় না অরুকে। অরু ঘুমে থাকতেই সকালের নাস্তা অর্ডার করে বেডসাইড টেবিলে রেখে চুপচাপ চলে যায় ভার্সিটিতে।

তবে কোনো এক অদৃশ্য পিছুটানে আজ কেন যেন ভেতরটার ছটফট করছে অরুর। আজ আর অলসতা করলো না, ক্লান্ত শরীরটাকে টেনে তুললো উদ্বেগে। ক্লোজেট খুলে দেখলো ল্যাপটপ ব্যাগ, প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টস এমনকি পরিধেয় পোশাকগুলো পর্যন্ত গুছিয়ে রাখা। তারমানে এখনো ভার্সিটির সময় হয়নি। তাহলে হঠাৎ করে গেলো কোথায় মানুষটা?

কাল রাতে অমন বাজে আচরণের জন্য অনুশোচনায় কঁকিয়ে উঠলো অন্তর। মনে মনে নিজেকে হাজার বার চড় থাপ্পড় মেরেও যেন সন্তুষ্টির ছিটেফোঁটা নেই কোথাও। বরং অস্থির তৃষ্ণার্থ চোখ দু'টো ক্রীতিককে দেখার তাড়নায় মরিয়া হয়ে উঠলো ভীষণ। অসুস্থতা নিয়েও শুয়ে থাকতে পারলো না মেয়েটা, অন্তরের যাতনায় ছুটে এলো রুমের বাইরে। অতঃপর সমগ্র ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজলো ক্রীতিককে। ঘরের মাঝে উপস্থিতি টের না পেয়ে সিঁড়ি ভেঙে নেমে এলো লিভিং এ। তাড়াহুড়ো মেইন গেট খুলে গ্যারেজের দিকে দৃষ্টিপাত করতেই দেখলো সেখানে ব্ল‍্যাক মার্সিডিজ অনুপস্থিত। তার মানে ক্রীতিক বেড়িয়ে গিয়েছে। কিন্তু কোথায় গেলো এতো সকালে? এখনো তো সূর্যের আলোই ফোটেনি ভালো করে। বুকের মাঝের অনুশোচনা যেন হু হু করে বাড়তে লাগলো এবার। দিশেহারা মনটা খারাপ কিছুর ইঙ্গিত দিতে চাইছো যেন। অরু ভাবতে চায় না সেসব, তবুও বারবার চলে আসে ভাবনায়।

স্যান্ডালউডের স্নিগ্ধ সৌরভ ম্লান হয়ে এসেছে চারিদিকে। অরু দম নিতে পারছে না, দুশ্চিন্তা আর আত্মগ্লানিতে বুকের উপর পাথর চাপা ঝড় হয়ে বয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। অগত্যা তাড়াহুড়ো করে লিভিং এ ফিরে গিয়ে কল লাগালো ক্রীতিকের নম্বরে।

এবারও আশাতীত হলো রমণী। বারবার একই ছন্দে ওপাশের রিনরিনে নারী কণ্ঠস্বরে বিরক্ত হয়ে ফোনটাকে ছুড়ে মারলো ফ্লোরে। তৃষ্ণার্থ চাতকিনীর ন্যায় ব্যাকুল হয়ে বলে উঠলো,

'কোথায় চলে গেলে তুমি জায়ান? আমি কি বেশি অন্যায় করে ফেলেছি? তোমার দূরত্বের বিরহ যে ভয়ানক, আমি সইতে পারবো না আর।'

কিয়ৎক্ষন নৈঃশব্দ্য। পরমূহুর্তেই অবুঝ শিশুর মতো হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো অরু। নিস্তব্ধতায় ঘেরা কোলাহল মুক্ত শহরতলীর ডুপ্লেক্স বাড়ির ভেতর থেকে ভেসে আসা সেই ব্যথাতুর ক্রন্দন অবলীলায় ভেসে গেলো দূর বহুদূরে। পুরো দুনিয়া জানলো না, যে, কোনো এক ছন্নছাড়া গতিবিধি হীন পুরুষের নিকট এই অশ্রুকণার মূল্য ঠিক কতখানি।

প্রায় এক সপ্তাহ পরে.....

অন্তরীক্ষে কালো মেঘের আস্ফালন, রাতভর মুশলধারার বর্ষণে যেন মন খারাপে ভাটি পরেনি গগনদেশের। সেথায় গুরগুর করছে বর্ষার মাতন। থেকে থেকে প্রকট ধ্বনিতে ভাঙছে আকাশ। গভীর রাতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় হিমেল হাওয়ায় এলোমেলো দুলছে জানালার ভারী পর্দাগুলো, কক্ষজুড়ে সাজানো গোছানো আসবাবগুলোও টলছে তিরতিরিয়ে।

রাতের শেষ প্রহরে ঝোড়ো হাওয়া যেন বাড়ছে ধীরে ধীরে। বৃষ্টি মুখর শীতল আবহে ঘুমন্ত প্রকৃতি, অথচ সেই আবেশিত ঘুমের একটুখানি রেশ নেই অরুর চোখের পাতায়। ওদিকে ছোট্ট পেটের অভ্যন্তরে দুনিয়ার সবটুকু মোহমায়া গচ্ছিত রেখে আবেশে ঘুমিয়ে আছে তার নারী ছেড়া বীনে সুতোর টান।

মাঝরাত থেকে এপাশ ওপাশ করে অবশেষে ঘড়ির কাটা রাত তিনটে ছুঁলে বিছানা ছাড়ে অরু। ঢং ঢং আওয়াজ তুলে সময় জানান দেওয়া যন্ত্রটির দিকে একপল দৃষ্টি বুলিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে রমণী। রমণী? হ্যা, রমণীই তো, এক নিস্পাপ অস্তিত্বকে নিজের মাঝে ধারণ করে বসে আছে অরু। তাও যে সে অস্তিত্ব নয়, স্বয়ং জায়ান ক্রীতিকের অংশ এই সত্তা। এই ক্ষুদ্র মাংসপিণ্ডটুকু নিজের মাঝে ধারণ করার সুখ যে ভাষায় অপ্রকাশিতব্য। অরু পারেনা এই সুখের শিয়র ছুঁতে। মনে মনে হুবহু ক্রীতিকের মতো দেখতে এক ছোট্ট অস্তিত্বকে দেখে দেখে নয়ন জুড়ায় সে। বাচ্চাটার ক্ষুদ্র নমনীয় মুখাবয়বটুকু পরখ করতেই তুলতুলে অনুভূতির জোয়ারে নয়ন ভিজে ওঠে তার। পূর্ণতার উচ্ছ্বাসে এলোমেলো হয়ে যায় অন্তঃকরণ। এ কোন অদৃশ্য মায়া তাকে উপহার দিলো জায়ান ক্রীতিক, কে জানে?

কোন একদিন ক্রীতিক বলেছিল, অরুকে দেওয়া ওর পৃথিবীর সেরা উপহারটি হবে এমন কিছুই। আজ অরুর মন বলছে সেদিনের সেই বেপরোয়া লাগামহীন কথাটা ভুল ছিলো না কোনো অংশে। এই তো সেই উপহার, পৃথিবীর সবটুকু আহ্লাদ গায়ে মাখিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমুচ্ছে তারই পেটে। জায়ান ক্রীতিকের ভাষায় তার বেস্ট ডি এন এ।

নৈঃশব্দ্যে তৃপ্তির ঢেকুর তোলে অরু। বিছানা হাতড়ে একটা পশমি শাল গায়ে চড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় বৃষ্টি মুখরিত খোলা জানালার কার্নিশে। গোলগাল সুন্দর মুখখানিতে জড়ো হয়েছে তার প্রগাঢ় আঁধার, বাইরের ঝড়ের পানে নিষ্প্রভ চেয়ে ঠোঁট গলিয়ে বিড়বিড়ায় মেয়েটা,

'আজ রাতটা ভীষণ দীর্ঘ। আর কতদিন অভিমান করে দূরে থাকবেন বলুন তো? আমি আজও আপনাকে বুঝতে পারি না জায়ান। আপনি কি করে ভুলে গেলেন ঝড় বৃষ্টিতে ভয় হয় আমার ভীষণ, আপনিহীনা বর্ষার রাতগুলো অন্তহীন যাতনা সম। রাত শেষ হয়ে আসছে, আমি কি এখনো অপেক্ষা করবো? আপনি কি আদৌও আমার ভয় ভাঙাতে ফিরে আসবেন?'

আনমনে অভিমানী বাক্য আওড়াতে আওড়াতে চোখের কার্নিশে জল জমে অরুর। ডানাকাটা অস্থির বিহঙ্গের ন্যায় কাতরে ওঠে নীল বেদনায়। জায়ান ক্রীতিকের উগ্র মেজাজের নাগাল আজও পায়নি অরু।

একাকীত্বের যন্ত্রণা ঘোঁচাতে এতটুকু কাঁদার ফুরসত পেলোনা মেয়েটা, তার আগেই শব্দ হলো কলিং বেলের। অরু বিস্মিত হয়। হতচকিত হয়ে বলে ওঠে,

'কে এলো এই সময়? জায়ান নয়তো?'

কৌতুহলের পারদ সীমা ছাড়ালো। অরু জানে ক্রীতিক চাইলে অনেক অসম্ভবই সম্ভব। তাই ঝড়বৃষ্টি কিংবা নিশীথের অন্ধকার, কোনোকিছুই ভাবালো না ওকে। পুনরায় কলিং বেলের আওয়াজ পাওয়া মাত্রই অস্থির হয়ে ছুটে গেলো নিচ চলায়, পুলকিত হাতে মেইন গেট খুলে দিতেই খানিকক্ষণ আগের উচ্ছ্বাসটুকু মিলিয়ে গেলো অজানায়। হাসিমাখা মুখটাতে হঠাৎ এসে জড়ো হলো হতাশার ঘন কালো মেঘ। ভেতরের দীর্ঘশ্বাস গিলে, ছোট্ট করে আওড়ালো,

'এলি আপু তুমি? এতো রাতে?'

হাতের ছাতাটা বন্ধ করে তড়তড়িয়ে ভেতরে প্রবেশ করে এলিসা। বব কাট চুলগুলো থেকে বারিকণা ঝাড়তে ঝাড়তে গিয়ে বসলো কাউচে, বিরস কন্ঠে জানালো,

'আমি এখানে কেন সেটা তোমার স্বামীকে জিজ্ঞেস করলেই পারতে। ওই হিটলারের জন্য ঘরে থাকার উপায় আছে? সেই ঝড় বৃষ্টি মাথায় নিয়ে এতো রাতে আসতেই হলো। ভাগ্য ভালো ক্যাথি ছিল, তাই বাচ্চাটাকে রেখে আসতে পেরেছি।'

এলিসা অনর্গল কথা বলে চলছে, এর মাঝেই একফাঁকে বাক্য ছুড়লো অরু,

'ওনার, না মানে জায়ানের সঙ্গে তোমার কথা হয়েছে আপু?'

এলিসা ভ্রু বাঁকালো অকস্মাৎ। হতবুদ্ধি হয়ে শুধালো,

'কি বলছি তোমায় এতোক্ষণ?'

'উনি তোমাকে পাঠিয়েছে? বলোনা আপু? যদি পাঠিয়ে থাকে তবে কোথায় উনি?'

তারমানে ক্রীতিক কোথায় আছে অরু জানেনা। নিশ্চয়ই ঝামেলা আছে কোনো। ব্যাপারটা উপলব্ধি করে নির্লিপ্তে মাথা নাড়ালো এলিসা, নিরেট স্বরে বললো,

'তার বউকে নাকি ঝড়বৃষ্টি এসে গিলে খাবে। কিছুতেই একা থাকা যাবেনা। তাইতো জোর করে পাঠালো আমায়। কত করে বললাম সায়র নীলিমা ফ্রি আছে, ওরা যাক। তাতে হবে না, সায়র নাকি জীবানু। তাকালেই ফোস্কা পরে। ভাগ্যিস সায়র আমার কাছে ছিল না।'

অরু দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। নির্লিপ্ত হয়ে বসে পড়লো কাউচে। অসহায় কন্ঠে জানতে চাইলো,

'ফোনটাও তো নিয়ে যায়নি। তাহলে কথা হলো কিভাবে?'

'ফোন বুথ থেকে।'

দরজার কাছে অযাচিত এক পুরুষের কণ্ঠ পেয়ে হুড়মুড়িয়ে ঘুরে তাকালো অরু। বৃষ্টি ভেজা ছাতাটা সন্তোর্পণে বন্ধ করতে করতেই কথা বলে ওঠে আগন্তুক,

'আমি খোঁজ নিয়েছি, ওটা রাস্তার ধারের ল্যান্ড লাইন ছিল।'

'তুমি! তুমি এখানে কি করছো?'

এক নিঃশ্বাসে কথাটা বলে প্রশ্নবিদ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইলো এলিসা।

ছাতাটা দরজার কাছে রেখে পায়ে পায়ে ভেতরে প্রবেশ করলো অর্ণব। এলিসাকে বিগলিত এক হাসি উপহার দিয়ে বললো,

'এই ঝড় বৃষ্টির রাতে জেকে ওর বউকে লেপের তলায় একা ছাড়তে পারেনা। সেখানে আমি আমার বউকে ব্যস্ত সড়কে একা ছাড়ি কি করে বলো?'

'আদিখ্যেতা!'

কথাটা বলেই মুখ ভ্যাঙালো এলিসা। বাহ্যিক দৃষ্টিতে সাদা চামড়ার হলেও তার কথা, বার্তা, আচার-আচরণে ঘরোয়া বাঙালির ছাপ সুস্পষ্ট। কি সুন্দর বাঙালি রমণীদের মতো কথায় কথায় মুখ ভ্যাঙায়। দেখলেই কেমন আদুরে লাগে। অরু মলিন হাসলো। ওর বিমর্ষ চেহারা পরখ করে এলিসা ও অর্ণব দু'জনই স্তব্ধ হয়ে থাকলো কিছুক্ষণ। অর্ণব ভ্রু কুঞ্চিত করে জিজ্ঞেস করলো,

'কেইস টা কি বলোতো অরু। জেকে কোথায়?'

এতোদিনের জমানো অভিমান, অনুরক্তি সব একসাথে উগড়ে এলো কান্না হয়ে। পরপর কয়েক দফা শুষ্ক ঢোক গিলে নিজেকে সামলানোর বৃথা চেষ্টা চালালো অরু। এলিসা ও অর্ণব নিজেদের মাঝে প্রশ্নবিদ্ধ দৃষ্টি বিনিময় করলো। অরু জড়ানো গলায় বললো,

'আমি কিচ্ছু জানি না ভাইয়া।'

'জানোনা মানে?'

অর্ণবের কপালে চিন্তার বলিরেখা। চোখের কোল ছাপিয়ে অশ্রু গড়ালো দু'গালে। অরু কান্না গিলে জবাব দিলো,

'সত্যিই জানি না। কি করে জানবো? উনি তো বাড়িতেই ফেরেন না।'

'কতদিন ধরে?'

'প্রায় এক সপ্তাহ।'

অরুর উত্তর শুনে বাকরুদ্ধ হয়ে গেলো এলিসা। তপ্ত রাগে জ্বলে উঠে বললো,

'জেকে টা কি কোনোদিন ভালো হবেনা? ওর বউ প্রেগন্যান্ট আর ও একসপ্তাহ ধরে এভাবে বাড়ির বাইরে বসে আছে? পাগলামোর একটা লিমিট থাকা দরকার। মেয়েটার দিকে তাকানো যাচ্ছে না, আর ওদিকে সে ফোন করে দরদ দেখাচ্ছে, আমার বউ ঝড়ে ভয় পায়।'

রাগে ফোঁসফাঁস করতে করতেই অর্ণবের দিকে দৃষ্টি ঘোরালো এলিসা। ক্রীতিকের সব রাগ ঝাড়ার জন্য যেন অর্ণবকেই পেলো এবার। ক্ষিপ্ত বাঘিনীর মতো তেড়ে এসে বললো,

'অর্ণবের বাচ্চা। জেকে কে খুঁজে নিয়ে আয় নয়তো আমি তোকে....'

অর্ণব ছিটকে দূরে গিয়ে বসলো। কুশনের আড়ালে গা ঢাকা দেওয়ার বৃথা চেষ্টা করে গম্ভীর মুখে বললো,

'বাচ্চার বাবাকে তুই তুকারি করছিস, কি অসামাজিক হয়ে গেছিস তুই এলি। ছিহ!'

এলিসা বাম হাতের কুশনটা ছুড়ে মারলো অর্ণবের গায়ে। দাঁত কিড়মিড়িয়ে বললো,

'বলেছি বেশ করেছি, আরও বলবো, তুই, তুই, তুই, কি করবি তুই?'

'কি করবো দেখবি তুই?'

নাকের পাটা ফুলিয়ে দুঃসাহসিক পদচারণায় দু'কদম এগিয়ে এলো অর্ণব। এলিসা তাতে থোড়াই কেয়ার না করে হাঁটু গেড়ে কাউচে উঠে বসলো। পারলে এখনই ঘুষি মেরে অর্ণবের নাক ফাটিয়ে দেয়, তেমন করেই মুখের কাছে গিয়ে মাস্তানের মতো ভাব ধরে বললো,

'হ্যা দেখা, দেখা না দেখা। কি রে দেখা?'

সঙ্গে সঙ্গে এলিসার গালের মধ্যে টকাস করে একটা দানবীয় চুমু খেলো অর্ণব। ঘটনার আকস্মিকতায় হতবিহ্বল হয়ে গালে হাত দিয়ে ধপ করে বসে পড়লো এলিসা। রাগের তাড়নায় গজগজ

পড়লো এলিসা। রাগের তাড়নায় গজগজ করতে করতে আওড়ালো,

'কি করলি এটা?'

'তুই অসামাজিক, তাই তোকে অসামাজিক চুমু খেয়ে অপমান করলাম।'

'এছাড়া আর কিছু পারিস তুই?'

নিমেষেই কপাল গোছালো অর্ণব। হাওয়ার বেগে ছুটে এসে এলিসার মুখোমুখি হয়ে বললো,

'পারিনা মানে? এক বাসরেই বাচ্চা ফুটিয়ে গেলো, এখনো তোর আমায় নিয়ে সন্দেহ?'

এলিসা আর প্রত্যুত্তর করলো না, নীরবে মুখ ঘুরিয়ে চুপিসারে হাসি সংবরণ করলো ঠোঁট টিপে। সেই সাথে ফর্সা ত্বকে লেপ্টে যাওয়া জাফরানি রঙটাও, যার সুশ্রী আভায় ফুটে ওঠে লাজুকতার মিশ্রণ।

এই পুরো ঘটনা ঘটে যাচ্ছে ক্রীতিকের লিভিং রুমের কাউচের উপর। অরু আবার পাশের সিটে সটান বসে বেকুবের মতো হা করে দেখছে তাদের। যারা এই মুহূর্তে নাটকের সমীকরণ মেলাতে এসে নিজেরাই বাংলা সিনেমা শুরু করে দিয়েছে। অবশেষে অর্ণব এলিসার ঝামেলা মেটাতে মাঝরাতে এসে হাজির হলো সায়র। ঘরের দুয়ারে পা রাখতে না রাখতেই ভেসে এলো তার বিরক্তিভরা হাঁকডাক,

'রাত বিরাতে কি রঙ্গ শুরু করেছিস?'

'কোথায় বৃষ্টির রাত বউ কোলে নিয়ে ঘুমাবো একটু, তা না ঝড়ের মধ্যে কলিজা হাতে নিয়ে তোদের নাট্যকলা দর্শনে এসেছি। ধ্যাত্তরি!'

সায়রকে দেখা মাত্রই নাক-মুখ কুঁচকে ফেললো অর্ণব। আশ্চর্য হওয়ার ভাব ধরে বললো,

'আব্বে, তুই এখানে কি করছিস?'

জবাবে সায়র কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে প্রত্যুত্তর করলো এলিসা,

'আমি ডেকেছি।'

'ডেকেছি মানে? এই বিরিয়ানির এলাচিকে এখানে কেন ডেকেছো?

জেকে জানলে টেংরি ভেঙে রেখে দেবে ওর, সাথে আমার জন্য উদম ক্যালানী একদম ফ্রি।'

সায়রের আগমনে অর্ণব উদ্বিগ্ন ভীষণ। সায়র সেসবের বিন্দু পরিমাণে তোয়াক্কা না করে খেঁকিয়ে উঠে বললো,

'টেংরি ভাঙবে মানে? আমার কি হাত নেই নাকি? তাছাড়া এই বাড়িটা তো অরুর ও।'

'আবার অরুর নাম মুখে নিয়েছিস?'

চটে গেলো অর্ণব। সায়র হতবিহ্বলিত নয়নে এলিসার পানে চাইলো। চোখ দু'টো কপালে তুলে ছদ্ম বিস্ময় নিয়ে বললো,

'এই ঝড়বৃষ্টিতে নিজের বরটাকে একটু সামলে রাখবি না, দোস্ত? ওর মাথায় তো জেকের ভূত চেপেছে!'

'আহাম্মক!'

অর্ণব দাঁত কটমটিয়ে শব্দটা উচ্চারণ করতেই, ফের হইরই আওয়াজে সরগরম হয়ে উঠলো পরিবেশ। কেউ কাউকে একচুল ছাড় দিতে নারাজ তারা। যেন নিউজ চ্যানেলের টকশো চলছে এখানে। হোস্ট স্বয়ং অরু। ওদের বাকবিতন্ডায় হাঁপিয়ে গিয়ে অবশেষে চেঁচিয়ে উঠলো এলিসা।

'উফফ! থামবি তোরা?'

এলিসার কর্কষ ধ্বনিতে স্তব্ধ হয়ে গেলো চারিপাশ। অরু নিজেও বিভ্রমে ডুবে যেতে যেতে ফিরে এলো বাস্তবতায়। সবার দৃষ্টি যখন এলিসার থমথমে চেহারায় নিবদ্ধ, তখনই তপ্ত রাগে গর্জে উঠলো সে,

'কি সমস্যা তোদের? একটা সিরিয়াস বিষয় নিয়ে আলাপ করবো বলে এতো রাতে এখানে বসে আছি। সেখানে তোরা ঝগরুটে মহিলাদের মতো তর্ক করেই যাচ্ছিস। আর সায়র, আজ বাদে কাল বাবা হতে যাচ্ছিস, একটু তো ম্যাচিউর হবি এবার?'

এলিসার কথায় বিগলিত হাসলো সায়র, শার্ট ঝেড়ে কাউচে গা এলিয়ে ফুরফুরে মেজাজ নিয়ে বললো,

'আজ হই, কিংবা কাল, জেকের আগে হবো এটা কনফার্ম।'

এমন একটা মুহূর্তে সায়রের নিরুদ্বেগ বাক্যে চোয়াল ঝুলে পড়লো সকলের। অরু একটু কুণ্ঠিত হলো। সংকোচে ঘুরে তাকালো সে অন্যত্র। এলিসার কপালে হাত। ওদের নাজেহাল অবস্থা পরখ করে অবশেষে টানটান হয়ে বসলো সায়র। মুখাবয়বে গাম্ভীর্যের রেশ টেনে বললো,

'আচ্ছা, চল এবার আলোচনা করা যাক।'

অর্ণব চিবুকে তর্জনী বুলিয়ে ভাবুক স্বরে বললো,

'ঝামেলাটা শুধু জেকে অরুর মনমালিন্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে এতো সিরিয়াস হতাম না। কারণ জেকে নিজের জিনিসের ভাগ কাউকে দেয় না।'

সায়র অর্ণবের কথায় তাল মিলিয়ে বললো,

'ঠিক বলেছিস। শালা হিটলার, একবার দেখি ডাস্টবিন থেকে খাবার তুলে খায়, আমি একটু চাইলাম অমনি মুখের উপর না করে দিলো। ভাব কতো স্বার্থপর।'

সায়রের কথায় হকচকিয়ে উঠলো অরু। দ্বিধান্বিত গলায় শুধালো,

'কিহ! ডাস্টবিন থেকে খাবার খায় মানে?'

সায়র প্রত্যক্ষদশার ন্যায় সাক্ষ্য দিয়ে বললো,

'হু, খেয়েছিল তো একদিন। পুরো একবাটি পায়েশ। আমি কি স্বাদে বলি এই ব্যাটার মাথায় সমস্যা?'

অরু স্মৃতিচারণ করলো, এমন একটা ঘটনাই তো বছর খানিক আগে ঘটেছিল ওর সঙ্গে। তারমানে কি ক্রীতিক সেদিন ওর রান্না করা পায়েশটাই ডাস্টবিন থেকে তুলে খেয়েছিল? আপাতত ঘটনার যোগসূত্র তো তাই বলছে। তখন থেকে কত ভালোবাসতো মানুষটা আর অরু কিনা তাকে এতোগুলা কথা শোনালো? ব্যাপারটা ভাবতে গিয়েই খুশির ক্লেশে চোখ ভিজে আসে অরুর। সে ছলছলে নয়নে সায়রের পানে দৃষ্টিপাত করলো। ঠোঁটের কোণে দীপ্তিময় হাসির রেখা টেনে আবারও জানতে চাইলো,

'সত্যি বলছেন? সেদিন উনি ডাস্টবিন থেকে খাবার তুলে খেয়েছিলেন?'

অরুর কান্নামিশ্রিত খুশি দেখে সায়রের অধর ফাঁক হয়ে গেলো। বাম হাতে ঘাড় চুলকে নির্বোধের মতো মাথা নাড়ালো সে। মনে মনে স্বগতোক্তি করে আওড়ালো,

'ডাস্টবিন থেকে খাবার খেয়েছে, এতে খুশিতে কেঁদে ফেলার কি হলো? আশ্চর্য! এতো দেখছি জামাই বউ দু'টোই পাগল।'

'আচ্ছা, এই ফুল দাতা আসলে কে? সে কি জানেনা জেকে বিবাহিত? না-কি জেনেশুনে ইচ্ছাকৃত করছে এসব? শুধুমাত্র অরুকে ডিস্টার্ব করার জন্য।'

অর্ণবের সন্দিগ্ধ বাক্যে সংবিৎ ফিরলো সকলের। দাঁতের ডগায় অধর কামড়ে বিড়বিড়ালো এলিসা,

'সেটা জানার একটাই উপায়।'

চট করেই সায়র বলে উঠলো,

'হাতেনাতে ধরতে হবে।'

'রাইট!'

আঙুলের ডগায় তুড়ি মেরে একযোগে চিৎকার দিয়ে উঠলো অর্ণব ও এলিসা।

অরু একটু ঘাবড়ালো। ঠোঁট উল্টে ম্লান স্বরে বললো,

'কিন্তু কিভাবে? ফুল রেখে যায় রাতের বেলা। রাতের ঠিক কোন সময় যে রেখে যায় সেটাও জানিনা।'

সায়র এবার উঠে দাঁড়ালো। শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে বললো,

'চিইল অরু। কালকে একঢিলে দু'টো পাখি মারবো আমরা। তুমি শুধু আমার পছন্দের স্ন্যাক্সগুলো অর্ডার করে রেখো। রাত জাগলে আমার আবার বড্ড ক্ষিদে পায়।'

তারপর দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে অর্ণবকে ডেকে বললো,

'আয় অর্ণব, যেতে যেতে বাদবাকি প্ল্যানগুলো করে ফেলি।'

অর্ণব মাথা নাড়ালো। পাশ ঘুরে এলিসা কপালে আলতো চুমু খেয়ে জানালো,

'এলি, জান আমার। রাত প্রায় শেষ, ভোর হতে চললো, ঝড় বাদলাও কমে এসেছে কিছুটা। তুই অরুর সাথেই থাক। আমরা সন্ধ্যায় ফিরবো।'

এলিসা মাথা নাড়িয়ে সায় জানালো তাতে, বিমর্ষ গলায় বললো,

'আর্থার কে দেখো।'

'নো ওয়ারিশ, আল ম্যানেজ।'

বলেই চলে গেলো ওরা দু'জন।

পরের দিন সন্ধ্যা নাগাদ একে একে সবাই এসে হাজির হলো ক্রীতিকের ডুপ্লেক্স বাড়ির ব্যাক ইয়ার্ডে। শহরতলী হওয়ার দরুন জায়গাটা মনোরম। চারিদিকে শান্ত, নিরিবিলি চোখ জুড়ানো পরিবেশ। কোথাও কোনো কোলাহল নেই। আছে কেবল অদূর পাহাড়ে ফিঙে পাখির কলরব এবং ছোট ছোট ঝিলের জলের কলকল স্রোতধ্বণি।

লনের একসাইডে বারবিকিউয়ের আয়োজন করেছে সায়র। অর্ণব এতো করে বললো এগুলো এখন করার সময় নয়। কে শোনে কার কথা? ক্রীতিক বাড়িতে নেই, সেই খুশিতে তার নাকি পিকনিকের ক্রেভিং হচ্ছে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন