দশ
অরুর সাথে মিলিয়ে ক্রীতিক আজ ব্ল্যাক স্যাটিনের স্যুট চড়িয়েছে গায়ে। লেস ইজ মোর। সেরকমই কালো স্যুটে লম্বা চওড়া বলিষ্ঠ দেহখানা জ্বলজ্বল করছে তার।
সবাই যখন যে যার মতো আড্ডা দিতে ব্যস্ত, তখন কোথা থেকে যেন একটা গিটার নিয়ে হাজির হলো সায়র। নীলিমা অবাক হয়ে শুধালো,
'গিটার কোথায় পেলেন?'
সায়র কারিশমার স্বরে আওড়ালো,
'ম্যাজিক।'
পাশ থেকে এলিসা শুধালো,
'এখন কি তুই আমাদের গান শুনিয়ে কানের মাথা খাবি?'
'অফকোর্স।'
নির্দ্বিধায় প্রত্যুত্তর করলো সায়র। অনু বললো,
'আচ্ছা গান ধরুন তবে।'
সায়র বিগলিত হেসে জবাব দিলো, 'ধরবো, কিন্তু অরু কোথায়?'
কথাটা বলতেই কোথা থেকে যেন ধেয়ে এলো কর্কশ গলার হুংকার,
'সায়রের বাচ্চাআআআ।
সায়রের লাফিয়ে উঠে পেছনে তাকাতেই দেখলো ক্রীতিক কটমটিয়ে তাকিয়ে আছে ওর পানে। তা দেখে অধৈর্য গলায় সায়র বললো,
'কি সমস্যা তোর জেকে?'
'আমার বউয়ের নাম মুখ নিবি না তুই, সেদিন না রক্ত দিলি? আজ থেকে ও তোর রক্তের বোন। তাই আপু বলে ডাকবি।'
'কে কাকে আপু বলে ডাকবে?'
এক গ্লাস পানি এনে ক্রীতিকের দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে কথাটা বললো অরু। ক্রীতিক আর জবাব দেওয়ার সুযোগ পেলো না। তার আগেই বাক্য ছুড়লো সায়র,
'আপু প্লিজ এদিকে আসুন। একটা গান শোনাই।'
অরু বিশেষ কিছু ভাবলো না। ঠোঁট উল্টে গিয়ে বসলো নীলিমার পাশে। ততক্ষণে গীটারের গায়ে এলোমেলো আঙুল চালিয়ে মসৃণ কণ্ঠে সুর ধরেছে সায়র,
'কোথায় পাবো বল, কোনখানে তুই...... কোথায় তোর দেশ আজ যাবোই....'
পাশ থেকে নীলিমা ত্যাড়া চোখে চেয়ে বললো,
'আমিতো এখানেই, আপনি আবার কাকে খুঁজছেন?'
সায়র বিরক্ত হয়ে বললো,
'উফফ রাগিনী! দিলেতো তাল কেটে। এটা গানের লাইন, আমি দেবের ফ্যান, তুমি জানোনা?'
ওদের কথার মাঝেই গীটার কেড়ে নিলো অর্ণব। সুরের ঝঙ্কার তুলে গাইতে আরম্ভ করলো,
'কেন তুই দূরে দূরে বল, আকাশে উড়ে উড়ে চল, মিশে যাই এই আকাশে, তোর বাতাসে, পাখনা মেলে...... দিন শুরু..... তোর কথায়..... তুই ছাড়া নামে না রাত চাঁদ থেকে..........'
অর্ণবের গান শুনে হাত তালির আওয়াজে মুখর হয়ে উঠলো হলরুম। এলিসা এগিয়ে এসে ওর ঠোঁটে চুমু খেয়ে বললো,
'ইউ আর বেস্ট।'
'ইউ টু।'
তাদের দু'জনার প্রেমালাপের মাঝে সবাই একটু অন্যমনস্ক হলো। অরু আর নীলিমা কি নিয়ে যেন নারীসুলভ খুঁচরো আলাপে মেতেছে। তন্মধ্যেই ঘটে গেলো বিস্ময়কর এক ঘটনা। কথার মাঝেই কর্ণগুহরে পৌঁছালো মৃদু মন্থর সুরের মূর্ছনা। সুরটা ভীষণ চেনা, সেই সঙ্গে চিরচেনা কণ্ঠস্বর। অরু তড়াক করে পেছনে ঘুরলো। দেখলো, তার অসামাজিক অসভ্য বরটা আজ হুট করেই গীটারে গায়ে সুর তুলেছে। অরুর পানে নিবিষ্ট চোখে তাকিয়ে গলা ছেড়ে গাইছে,
'তোমাকে ছেড়ে আমি কি নিয়ে থাকবো ভালোবেসে যাবো ওগো যতদিন বাঁচবো... হেসোনা হেসোনা তুমি যেন রাখো তা.... বলেতো দিয়েছি আমি হৃদয়ের কথা.......'
ক্রীতিকের রাশভারি কণ্ঠে গানটা ভীষণ মানিয়েছে। রাগী ভূতটা যে এত সুন্দর গাইতে পারে, তাতো অরুর জানাই ছিলোনা। ওইজন্য ভার্সিটির মেয়েরা ক্রীতিককে মিস্টার পারফেক্ট বলে ডাকে।
সেই তখন থেকে বিমুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে অরু। ক্রীতিক গীটার রেখে এগিয়ে এলো। অরুর কানের পেছনে দু'হাত রেখে অস্থির স্বরে বললো,
'অরু চল উপরে যাই।'
'ক...ককেন!'
অরুর কন্ঠে আড়ষ্টতা। ও বোধ বুঝতে পেরেছে ক্রীতিকের অস্থিরতার কারণ। ক্রীতিক গ্রীবা নোয়ালো। অরুর কানের লতিকায় অধর ঠেকিয়ে হিসহিসালো,
'তোকে মারাত্মক সুন্দরী লাগছে। এতো সুন্দর আমার চোখ নিতে পারছে না, তাই এলোমেলো করবো।'
'প্লিজ! এখানে অনেক মানুষ।'
এদিক-ওদিক চোরা চোখে চেয়ে কথাটা বললো অরু। ক্রীতিকের মসৃণ কপালে তীক্ষ্ণ ভাঁজ পড়লো। গম্ভীর হয়ে বললো,
'তুই কি চাস আমি তোকে কাঁধে তুলে নিয়ে যাই?'
'খবরদার! অসভ্যতা করবেন না একদম। এটা সামাজিক অনুষ্ঠান।'
'ফাক ইউওর সমাজ।'
কথাটা বলেই অরুকে কাঁধে তুলে সোজা দোতলায় চলে গেলো ক্রীতিক। বিছানার পাশে ছোট্ট দোলনায় কিয়ারা ঘুমাচ্ছিল। ক্রীতিক অরুকে বিছানায় ফেলতেই লাফ দিয়ে উঠে বসলো অরু। কুণ্ঠিত স্বরে বললো,
'এখানে নয়। আপনি যা অধৈর্য মেয়েটাকে জাগিয়ে ফেলবেন।'
'তাহলে গেস্ট রুমে চল।'
পরিধেয় স্যুটটা ফেলে দিয়ে শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে বাক্য ছুড়লো ক্রীতিক। অরু জানালো,
'ওই রুমে নিনিত আর আর্থার ঘুমিয়ে আছে।'
'তাহলে?'
লজ্জায় আরক্ত হয়ে উঠলো রমণীর ঢলঢলে পেলব চেহারা। জড়ানো গলায় বললো,
'তাহলে আর কি? নিচে চলুন।'
ক্রীতিক তৎক্ষণাৎ অরুকে একহাতে কোলে তুলে নিলো। হাস্কি গলায় বললো,
'নো ওয়ে। আই অলসো হ্যাভ আ জিম রুম, বেইবী।'
চমকে উঠলো অরু। ক্রীতিকের কোল থেকে নামার প্রয়াসে ছটফট শুরু করে দিয়ে বললো,
'আপনার মাথা ঠিক আছে? বাড়ি ভর্তি মানুষ। আর আপনি জিম রুমে....'
'মাথা ঠিক নেই, বিশ্বাস কর সত্যিই মাথা ঠিক নেই।'
নড়তে থাকা ঠোঁট দু'টোতে আঙুল বুলিয়ে মোহাবিষ্ট গলায় কথাগুলো আওড়াতে আওড়াতেই অরু সমেত জিম রুমের দিকে পা বাড়ালো ক্রীতিক।
ওদিকে লিভিং রুম থেকে সায়র ওদেরকে ওভাবে জিমের দিকে যেতে দেখে ভ্রু কুঁচকালো। অর্ণবের কানের কাছে গিয়ে সন্দিগ্ধ গলায় জিজ্ঞেস করলো,
'দোস্ত! ওরা হঠাৎ জিমনেসিয়ামের দিকে কেন যাচ্ছে বলতো?'
অর্ণব অতিথি আলাপনে মগ্ন। সহসা ঠোঁট উল্টে জবাব দিলো,
'কি জানি, হয়তো জিম করবে।'
সায়রের চোখ কপালে উঠে গেলো। বেকুব বনে গিয়ে কলের পুতুলের মতো বিড়বিড়ালো,
'এতো রাতে জিম। স্ট্রেইঞ্জ!
আলো ঝলমলে সুন্দর সকাল। পূব আকাশে পদ্মাসন হয়ে গেড়ে বসেছে সূর্যরাজ। মেঘমুক্ত নীলাভ দিগন্ত। ঝিরিঝিরি একটা হিমেল হাওয়া কিশোরীর মতো নৃত্য করছে চেরিব্লোসমের গাছের ডগায়। আর কয়েকটা দিন গ্রীষ্মের তাপ, তারপর ধীরে ধীরে শীত নামবে ধরণি কাঁপিয়ে। বরফ ঠান্ডায় পর্যুদস্ত হয়ে পড়বে সজীব সুন্দর প্রকৃতি। আজ ছুটির দিন। সকাল বেলা লনের কাছে বেঞ্চিতে বসে মেয়েকে ফিডিং করাচ্ছে ক্রীতিক। মাঝেমধ্যেই খাওয়া ভুলে পাপার দিকে চেয়ে আধো আধো করে হেসে উঠছে অংশ তার। সেই নিস্পাপ হাসির ঢেউয়ে ভেতরে অনুভূতির পাহাড় ভাঙছে ক্রীতিকের। ও বোধ হয় এতো সুন্দর দৃষ্টি আগে কখনো দেখেনি।
ওদের থেকেই খানিকটা দূরে গা দাবানো সবুজ ঘাসের উপর ডোরাকে কোলে নিয়ে বসে আছে অরু। অন্যান্য দিনগুলোতে ভার্সিটি যেতে হয় তাকে। আজ ছুটির দিন, তাই একটু সময় দিচ্ছে ডোরাকে। মাঝেমধ্যে মুগ্ধ চোখে পরখ করছে বাবা-মেয়ের কারসাজি। ক্রীতিকের পিতৃসত্তা যে এতো গভীর আর এতো মায়াময় হবে, তা বোধ হয় কখনো কল্পনাও করেনি অরু। কিয়ারা নিঃসন্দেহে বলতে পারবে, তার পাপা বেস্ট। ক্রীতিককে দেখতে দেখতেই অরু আনমনে ভাবে এসব। তন্মধ্যে বাজখাঁই আওয়াজে বেজে ওঠে গেটের কাছের কলিং বেলটা। ফলস্বরূপ অরুর হৃদয়ে বুদবুদ করতে থাকা আনন্দের ফেনিল জলরাশিতে টান পড়ে অকস্মাৎ। সে চকিতে ঘাড় ঘোরায়।
কোনোরূপ মানুষের উপস্থিতি টের না পেয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে যায় সম্মুখে। ফ্রেন্স গেটটা টেনে খুলতেই তার পায়ের কাছে এসে জড়ো হয় টুকটুকে একটা লাল গোলাপের বুকে, সেই সাথে মলাট বাঁধানো উইশকার্ড। আজ অনেকগুলো দিন বাদে আবারও এসব জিনিস দেখতে পেয়ে বিরক্তির বদলে আশ্চর্য হলো অরু। অকারণ একটা আগ্রহ নিয়েই তুলে নিলো গোলাপগুলো। তারপর উইশকার্ডের মোড়ক খুলে পড়তে আরম্ভ করলো,
'প্রিয় অরু,
আমি জানি এই বুকেটাও তুমিই পেয়েছো। কারণ জেকে স্যারের চোখে লক্ষ্য করার মতো প্রয়োজনীয় জিনিস বোধ হয় তুমি ছাড়া আর কিছুই নেই। তুমি আশেপাশে থাকলে উনি আর কিছুই দেখেন না। চিন্তা করোনা, আজ এই বুকেটা আমি জেকে স্যারকে পাঠাইওনি। এটা তোমার জন্য, অরু। মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তোমাকে মাতৃত্বের শুভেচ্ছা জানানো কিংবা তোমার কাছে ক্ষমা চাওয়া, কোনোটারই মুখ আমার নেই। তাই এই লুকোচুরি প্রক্রিয়া। আমি জানি তুমি আমাকে ক্ষমা করবে কিনা। কিন্তু আমি সত্যিই অনুতপ্ত, অরু। তোমাদের জোৎস্নার মতো সুখের জীবনে আর কখনো মেঘের ছায়া হবো না। তাই সারাজীবনের জন্য জন্মভূমিতে ফিরে যাচ্ছি। তোমরা ভালো থেকো আর পারলে আমাকে মনে রেখো।
ইতি তোমার ক্ষমাপ্রার্থী,
'সায়নী'
ঠায় দাঁড়িয়ে চিঠিটা কয়েকবার পড়লো অরু। অতঃপর প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে দৃষ্টিপাত করলো দূর অন্তরীক্ষে। যতক্ষণ না দৃষ্টি ঘোলা হয়ে চোখে জল আসে, ঠিক ততক্ষণ চেয়ে রইলো। একপর্যায়ে চিরকুটটা বুকের মাঝে চেপে ধরে বিড়বিড় করে আওড়ালো,
'তুমি ভালো থেকো, সায়নী, খুব ভালো থেকো।'
'সমাপ্ত'