ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদয়ে তাহার আগমন

১ম পর্ব

লেখক: নাবিলা সৈয়দ

দো-তলা বিশিষ্ট পুরোনো ধাঁচের একটা দালান শহরের কেন্দ্রস্থল উপশহরে মাথা উচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাড়িটির সামনের লোহার তৈরি গেটে ঝুলছে একখানা নেমপ্লেট। নেমপ্লেটের উপর মোটা মোটা অক্ষরে লেখা সৈয়দ নিবাস। শীতের কুয়াশায় মিটিমিটি ভিজে আছে নেমপ্লেটে খুদাই করা নামখানা। সেই নামের সাথে মিশে আছে এই বাড়ির প্রতিটি মানুষের অঙ্গভঙ্গি, আচার-আচরণ এবং পরিচয়। নাম শুনলেই আশেপাশের সোসাইটির মানুষ চোখ বন্ধ করে বলে দিতে পারে, কয়েক যুগ ধরে সৈয়দ নামক খানদানি মানুষগুলো ওই বাড়িতে বসবাস করছে।

ইট-পাথরের তৈরি বাড়িটির বাহির পুরোনো ধাঁচের হলেও ভেতরের সাজসজ্জা আধুনিক। প্রতিদিনের তুলনায় আজ বাড়ির অভ্যন্তরে মানুষের কোলাহল, গমগমে আলোরিত। দো-তলার বাঁ-দিকের সবার শেষের রুম এই বাড়ির সেজ পুত্র সৈয়দ আরশ হেলালের। যে রুম সবসময় নীরব থাকে, আজ সেই রুম থেকে অনবরত কান্নার শব্দ ভেসে আসছে। সাথে চিৎকার করে কেউ বলছে, 'ও ভাইয়া, আজ ছেড়ে দাও, আর জীবনেও তোমার জিনিসে হাত দিব না, তোমার কসম।'

পরপর বাজিয়ে একটা থাপ্পড় পড়ল মেয়েটার পিঠে। ছেলেটা রগরগে গলায় শুধাল, 'আর না শুনলে?'

মেয়েটা পোকায় খাওয়া দাঁত বের করে হেসে বলল, 'না শুনলে তুমি মরে যাবে। হা হা হা হা..!'

ছেলেটা এতে আরো রেগে গিয়ে মেয়েটাকে ঝুঁকিয়ে আরো কয়েকটা পরপর কিল বসাল। মেয়েটা চিৎকার করে ওঠে, নিজের মাকে ডাকল, 'আম্মায়ায়ায়ায়া, ভাইয়া আবার মারছে।'

নাজমিন বেগমকে চিৎকার করে হাক ছুঁড়লেও ফিরতি কোনো উত্তর আসলো না। করুণ মুখ বানিয়ে আরশের দিকে ফিরে চাইতেই আরশ বাঁশের কচি বেত নিজের হাতে নিয়ে সতর্ক বাণী দিল, 'কান ধরে ফটাফট একশতটা উঠ বস কর, নাহলে এই কচি বেতের বারি একটাও মাটিতে পড়বে না।'

বাড়ির ছোট-বড় সবাইকে একপাশে দাড় করিয়েছেন নাছির সাহেব আর হেলাল সাহেব। নুসরাতের মুখ যথারীতি কুঁচকে আছে। সে আসতে চায়নি, তার গুণোধর বাপ তাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে এসেছে। এটা কোনো ইম্পর্ট্যান্ট কাজ হলো! একজন মানুষ মরে যাবে, তাকে শান্তিতে পর্যন্ত তার বাপ চাচা মরতে দিচ্ছে না, এনে পলিটিক্যাল গ্রুপ বানাচ্ছে। হাহ..! এদের কে বোঝাবে, মৃত পথযাত্রী এসব মোটেও পছন্দ করেন না। একটু লাফালাফি করতে চাইছিল সে, তা করতে না দিয়ে এখানে এনে স্কুলের এসেম্বলির লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখেছেন, নিশ্চুপ! দেখে মনে হচ্ছে তার থেকে কোনো বিশেষ পরামর্শ নেওয়া হবে, আসলে তা ও তো না! অনেক চিন্তাভাবনা শেষে নুসরাত নড়েচড়ে দাঁড়াল। চুপচাপ কিছুক্ষণ সবার দিকে চেয়ে আরশের গা ঘেঁষল। উঁচু লম্বা আরশের কোমর সমান সে উচ্চতায়। ড্রপ সোল্ডার টি-শার্টের কোণা ধরে টান দিতেই এক ভ্রু উচালো আরশ। নুসরাত ইশারায় দেখাল সামান্য নিচের দিকে ঝুঁকতে। আরশ কোমর বাঁকিয়ে ঝুঁকে আসলো। কান পাতল নুসরাতের মুখের কাছে। নুসরাত প্রচুর সিরিয়াস কন্ঠে শুধাল, 'এই বুড়ো এমন ভং মেরে পড়ে আছে কেন?'

আরশ কিছুক্ষণের জন্য মনে করেছিল, কোনো ইম্পর্ট্যান্ট কথা বলবে, কিন্তু সে ভুল! এই মেয়ের দ্বারা কখনোই সিরিয়াস কথা হবে, এটা ভাবাই বিলাসিতা। নুসরাত কথা শেষ করতেই আরশ বিরক্ত হয়ে একটা গাট্টা মারল। নুসরাত নিজের মাথার পেছনে হাত বুলাবে না ভাবল, এটা শুধু ভাবনা পর্যন্ত স্থায়ী রইল। মাথার পেছন চিনচিন করে ওঠল কিছু মুহূর্ত অতিবাহিত হতেই। হাত দিয়ে মাথার পেছনে হাতিয়ে চোখ গোল গোল করে কিছু একটা দেখল। আরশ নুসরাতের দিকে তখনো তাকিয়ে, এমন অদ্ভুত চাহনির মানে জানে সে। পূর্ব প্রস্তুতি নেওয়ার পূর্বেই নুসরাত খুঁজে খুঁজে উরুর মধ্যের মাংস চেপে একটা চিমটি কাটল আরশের। অতঃপর আরশের পানে চেয়ে হাসল ঠোঁট এলিয়ে। আরশ কব্জি দিয়ে নুসরাতের গলা পেঁচিয়ে ধরল। বলল, 'চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক। চেয়ে দেখ, একটা বাচ্চা তোর মতো শুধু লটরপটর করছে?'

নুসরাত অবাক হলো। মনে প্রশ্ন জাগল, লটরপটর এটা আবার কী! আরশের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করতে যাবে, কানে আসলো দাদা নামক লোকটার কথা। একহাতে তার বাপের হাত, অন্য হাতে চাচার হাত চেপে ধরে আজমল আলী বলছেন, 'বাবা, আমি মনে হয় আর বাঁচব না!'

হেলাল সাহেব আর নাছির সাহেব। ইনা বাণী মুখ ফুটে উচ্চারণ করতে গেলেন, পারলেন না। নুসরাত ভাবসাব নিয়ে বলল, 'আরে না, আপনি আর বাঁচবেন না। আপনার যা অবস্থা, আল্লাহ, আল্লাহ করেন। তাছাড়া এক্ষুনি আপনার দুই ছেলে আপনাকে মিথ্যে বলে আশ্বাস দিত, আমি থাকায় আপনাকে আর মিথ্যে আশ্বাস দিতে পারল না। ধন্যবাদ বলে নিজেকে ছোট করবেন না, আমি জানি আমি মহৎ হৃদয়ের অধিকারী। আর এ ও জানি, মৃত্যু পথযাত্রীকে মিথ্যে বলে সান্ত্বনা দেওয়া কবিরা গুণাহের কাজ। আমি শুধু এসব থেকে নিজেকে দায়মুক্ত রাখছি।'

নাছির সাহেব চোখ পাকিয়ে নুসরাতকে চুপ করতে বললেন, কিন্তু সে থামল না। কাঁচির মতো ক্যাচক্যাচ করে বলেই গেল, আর বলেই গেল যতক্ষণ পর্যন্ত তার কথার অন্তিম রত্তি না আসলো। জায়িন ধমকে উঠল নুসরাতকে। জিজ্ঞেস করল, 'আর এটা আপনি কোন হাদিস থেকে জেনেছেন যে মৃত্যু পথযাত্রীকে মিথ্যে বলা গুণাহের কাজ?'

নুসরাতের ঠোঁটের আগায় যেন প্রশ্নের উত্তর ছিল। সে চুল উড়িয়ে নিয়ে বলল, 'হাদিসে আমপাড়া থেকে।'

হেলাল সাহেব শক্ত কন্ঠে চিৎকার করে উঠলেন। বললেন, 'বস, আর একটা শব্দ না।'

এবার হেলাল সাহেব বাবার শিউড়ে বসলেন। হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে প্রশ্ন করলেন, 'কী বলবেন, আপনি বলুন! আমি আর নাছির রাখার চেষ্টা করব।'

আজমল আলী ঝলমলে চোখে হাসলেন সামান্য। অসুস্থতায় কায়া হয়ে যাওয়া শরীর নাড়িয়ে অত্যন্ত শীতিল সুরে বললেন, 'জায়িন আর ইসরাতের বিয়ে দেখে যেতে চাই..!'

নুসরাত আর ইরহাম লাফিয়ে উঠল, দু-হাতে তালি দিয়ে। আরশকে জ্বালানোর জন্য নুসরাত হাত দিয়ে তার কোমর চেপে ধরল। নিজে নাচতে শুরু করল, সাথে আরশকে দু-হাতে ঠেলে ধাক্কিয়ে নাচাতে নাচাতে বলল, 'বিয়ে বিয়ে, আহা বিয়ে বিয়ে।'

আজমল আলী হয়তো নুসরাতের এত লাফঝাপ দেখতে পারলেন না, নুসরাতের খুশিতে পানি ঢেলে দিতে বললেন, 'আরশ আর নুসরাতের ও বিয়ে দেখে যেতে চাই, এই সামান্য আশা। বাবা, তোরা আমার আশা রাখবি না?'

নুসরাতের নাচ থেমে গেল। আরশের কোমরে থাকা হাত সরে আসলো তড়িৎ গতিতে। আরশের দিকে অবাক চোখে তাকাল, আরশ ও তাকাল। তারপর দুজন দু-জনের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে ছিটকে দূরে সরে গেল। নুসরাতের মুখ ফসকে বের হলো কয়েকটা শব্দ, 'কীঈইইই আরশ ভাইকে বিয়ে, অসম্ভব!'

অসম্ভব বললেও চার জনকে ধরে বেঁধে নিয়ে আসা হলো বিয়ে দেওয়ার জন্য। কিছু মুহূর্তের মধ্যে হুজুর ও মসজিদ থেকে চলে আসছেন বলে গুঞ্চন উঠল। নুসরাত সোফার উপর উঠে লাফ দিতে থাকল আর বলতে লাগল, 'আমাকে দেখে কী তোমাদের মাথায় সমস্যা বলে মনে হয়? এই আরশ ভাইকে আমি কোন দুঃখে বিয়ে করব?'

নাক টেনে কাঁদার ভঙ্গিমা করে আরশকে ডেকে উঠল, 'আরশ ভাই...! ও আরশ ভাই... বিয়েটা ভেঙে দিন না, আমি আর আপনি ভাই-বোনই ঠিক আছি।'

নাছির সাহেব বিরক্ত স্বরে বললেন, 'সমস্যা কোথায় বিয়ে করতে?'

নুসরাত বেলেহাজের মতো মুখে ফেড়ে বলল, 'সমস্যা কোথায় জিজ্ঞেস করছেন আপনি আব্বা! জিজ্ঞেস করুন, সমস্যা কোথায় নেই। ডানে সমস্যা, বামে সমস্যা, সোজা সমস্যা, বাঁকা সমস্যা, যেদিকে তাকাচ্ছি আমি শুধু সমস্যাই দেখছি। আরশ ভাই নিজেই তো আস্তো একটা সমস্যা..!'

নাছির সাহেব বললেন, 'শুধু একটা সমস্যার কথা বলো তুমি?'

নুসরাত ধীর ভঙ্গিতে উচ্চারণ করল, 'আরশ ভাই আমার জামাই হলে, উনাকে আমি চুমু খাব কীভাবে, এটাই প্রথম এবং মূল সমস্যা।'

নুসরাতের একটা কথায় পুরো ড্রয়িং রুম স্তম্ভিত হয়ে গেল। নাছির সাহেব আকস্মিক গলা খাঁকারি দিয়ে ফোন বের করলেন। হেলাল সাহেবের কানে পৌঁছানোর মতো করে বললেন, 'মৌলভী সাহেব চলে এসেছেন মনে হয়।'

আরশ ভাইয়ের কব্জা তলে মুখ চুপসে বসে আছে। তার যে একটা জলজ্যান্ত গার্লফ্রেন্ড আছে, এটা কাকে বোঝাবে! এরা কেউই তো মানবে না। বলবে, 'তুই এখনো ছোট!' সে এখনো কীসের ছোট! বিশ বছরের একজন যুবককে ওরা এমনভাবে ট্রিট করে যেন এই মায়ের পেট থেকে বেরিয়েছে। এর মধ্যে মৌলভী সাহেব বাড়ির ভেতর প্রবেশ করলেন। এসে সোফায় বসতেই দেখলেন কনে সোফার উপর উঠে লাফাচ্ছে। জীবনের প্রথমবার এমন কন্যাকে বিয়ের খুশিতে লাফাতে দেখে অবাক কণ্ঠে শুধালেন, 'কন্যা কুমারী, এমন ব্যাঙের মতো লাফাচ্ছো কেন?'

'অতিরিক্ত বিয়ের খুশিতে আমি ব্যাঙ হয়ে গেছি, তাই ব্যাঙের মতো লাফাচ্ছি। আপনার ইচ্ছে হলে আপনি ও এসে লাফান আমার সাথে। আর চাইলে মুখ দিয়ে ব্যাঙের মতো শব্দ ও বের করতে পারেন এভাবে, ঘ্যাঁক-ঘ্যাঁক, ঘ্যাঁক-ঘ্যাঁক!'

মৌলভী সাহেব মুখ থমথমে বানিয়ে নিলেন। ইসরাত আর জায়িন একে অন্যের মুখ দেখছে শুধু। এতদিন দু-জন দু-জনের পিছু লাগতো, এখন একে অন্যকে বিয়ে করে মুখ দেখাবে কীভাবে তারা! দাদা, এরকম না করলে পারত! এমন অবিচার মেনে নিতে কষ্ট হলো সামান্য তাদের..!

আরশ অতি কষ্ট বুকে চেপে জায়ানকে বলল, 'ছোট ভাইয়া, এই দেখো, এটা কী পরিমাণ বাচ্চামি করে! বিয়ে করার পর দেখা যাবে আমাকেই ব্যাঙ বানিয়ে মাথার উপর উঠে নাচছে।'

জায়ান বিরক্তি সুরে ভাইকে বলল, 'মাথার উপর উঠলে তোর বউ উঠবে, সেখানে আমাদের করার মতো কিছু নেই। বিয়ের পর তুই তোর বউকে মাথায় রাখবি না, কাঁধে রাখবি, এটা তোর একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার, আমি নাক গলাতে যাব না। সো মাথায় চাপ নিস না। চুপচাপ বিয়ে করে নে।'

আরশ বিরক্তির রেশ গলায় টেনে বলল, 'কিন্তু আমার গার্লফ্রেন্ড আছে।'

জায়ান ব্যগ্র কন্ঠে বলল, 'আম্মুর সামনে এই কথা বলিও, ঝাটা দিয়ে পিটাই করে ওই মেয়ের ভুত তোর ঘাড় থেকে নামাবে। চুপচাপ বিয়ে কর বেয়াদব।'

আরশ তবুও জেদি স্বরে তর্ক বজায় রাখতে বলল, 'তোমরা সবাই মিলে আমার বাল্যবিবাহ দিচ্ছো, এটা আইনত অপরাধ।'

জায়ান নিজের উপর কোনো দায়বার না নেওয়ার ভঙ্গি করে বলল, 'আম্মুকে গিয়ে বল, আমি কিছু জানি না।'

আরশ চোখ তুলে মায়ের দিকে তাকাতেই মনে হলো অদৃশ্য ছুরি চোখে পড়ে বসে আছেন লিপি বেগম। তলোয়ারের মতো ধারাল চোখ দিয়ে ইশারায় বোঝাচ্ছেন, চুপচাপ বিয়ে করে নিতে। আরশ চুপসে যাওয়া মুখ নিচের দিকে নামিয়ে নিল। জায়ান টিপ্পনী কাটল, 'এবার আম্মুকে বলো, মাম্মা, আমি বিয়ে করব না।'

আরশ মুখ ফুলিয়ে বসে রইল। মৌলভী সাহেব ধর্মীয় মতে বিয়ে পড়াতে শুরু করলেন, 'সৈয়দ হেলাল আহমদ এর প্রথম পুত্র সৈয়দ জায়িন হেলালকে দশ লক্ষ নগদ দেনমোহর দার্য করিয়া এই বিয়ে করিতে রাজী থাকলে বলো মা কবুল।'

জায়িন অতো কিছু শুনেনি, আনমনে বলে ওঠল, 'আলহামদুলিল্লাহ...'

মৌলভী কেটে দিলেন তাকে। দাঁত বের হাসলেন। ঠোঁটে হাসি বজায় রেখে বললেন, 'তোমাকে না।'

নুসরাত জায়িনকে লজ্জা পেতে দেখে উপহাস করে হা হা করে হেসে উঠল। জায়িনের মুখ দেখার মতো কালো বনে গেল। ইসরাতকে আবার বলা হলো বলার জন্য, সে অতি কষ্টে তিনবার উচ্চারণ করল শব্দগুলো।

ইরহাম মুখ লটকে ওখানে দাঁড়িয়ে রইল। জায়ান সোফায় চুপসানো মুখ বসে রইল। তারপর নাটকীয় ভঙ্গিতে সে আর ইরহাম শার্টের কলারে চোখ মুছল, যেনো বিয়ে করতে না পেরে কষ্টে তাদের বুক ফেটে যাচ্ছে।

নুসরাতকে এক জায়গায় বসানো পুরো দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে একবার এদিকে যাচ্ছে, তো একবার ওদিকে। মৌলভী ইয়া বড় হা করে বসে আছেন নিজের জায়গায়। হাতে তার বিয়ে পড়ানোর খাতা। কন্যাকে থামিয়ে নাছির সাহেব বসাতে ব্যর্থ হলেন, তাই শেষ মুহূর্তে বাঘিনী রূপে ড্রয়িং রুমে হাতে বিছানা ঝাড়ার ঝাড়ু নিয়ে হাজির হলেন নাজমিন বেগম। রেগে ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস ফেলে জিভে কামড় মারলেন। তারপর লাফাতে থাকা নুসরাতকে উড়াধুড়া যেদিকে পারলেন বারি মারলেন। নুসরাত ঝাড়ুর বারি খাওয়ার হাত থেকে বাঁচার জন্য এদিক থেকে সেদিক ফড়িং এর মতো লাফালাফি করল, শেষে না পেরে আরশের গায়ের পেছনে গিয়ে লুকিয়ে পড়ল। গায়ের উপর তখনো ঘূর্ণিঝড়, টনেডো, জলোচ্ছ্বাস চলছে। নুসরাতের সাথে আরশও খাচ্ছে বারি। নুসরাত আরশের গায়ের সাথে মিশে যেতে যেতে করুণ সুরে বলল, 'ও ভাইয়া, বিয়ে করব তো বলছি, আম্মাকে বলো না আর না মারতে।'

নুসরাতের মুখে কথাটা উচ্চারণ হতেই ঝাড়ুর বারিও থেমে গেল। শব্দ করে শ্বাস ফেলে পিছু ফিরলেন নাজমিন বেগম। রাগে এতক্ষণ জ্যান্ত একটা মানুষকে চোখে দেখেননি তিনি। যখনই দেখলেন, লজ্জাত্বক ভঙ্গিতে মাথা থেকে পড়ে যাওয়া ওড়না টেনে বললেন, 'আসসালামু আলাইকুম! কেমন আছেন?'

মৌলভী মুখ দিয়ে কথা বলার ভাষা হারিয়েছেন অনেকক্ষণ। তিনি হতবম্ব! এতটা হতবাক হয়েছেন যে মুখ দিয়ে সালামের উত্তরটুকু বের হওয়ার আন্দাজটুকু হারিয়েছেন। এই প্রথম এমন বিয়ে পড়াতে এসেছেন, যেখানে পাত্রী সোফায় উঠে বিয়ের খুশিতে নাচছে আর পাত্রীর মা তাকে চুপ করিয়ে বসানোর জন্য ঝাড়ুড় পিটা করছে। আজব এই বাড়ির মানুষজন!

মৌলভী সাহেব নিজের হতবাকতা গিলে নিয়ে ঝটপট বিয়ে পড়িয়ে পালানোর কথা ভাবলেন। এই বাড়িতে সে আরো এক মুহূর্ত থাকলে নিজেও পাগল হয়ে যাবেন এদের সাথে। এ কোন পাগলা গারদে বিয়ে পড়াতে চলে আসছেন তিনি। তওবা কেটে নিলেন মনে মনে। এই বাড়ি থেকে তাড়াতাড়ি বের হওয়ার জন্য তড়িঘড়ি করে বিয়ে পড়ানোতে মনোযোগী হলেন। নিজস্ব ভঙ্গিমায় শব্দ তুললেন, 'সৈয়দ হেলাল আহমদের তৃতীয় পুত্র সৈয়দ আরশ হেলালের সাথে নগদ দশ লক্ষ দেনমোহর দার্য করিয়া...'

কথাটা শেষ করার আগেই নুসরাত থামিয়ে দিল হাত তুলে। ভাষণ দেওয়ার মতো করে আঙুল তুলে বলল, 'এক মিনিট! এখানে একটা ভুল হয়েছে কাজী সাহেব!'

নুসরাতের দিকে সকলেই বিস্মিত দৃষ্টি ফেললেন। কাজী সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, 'কী ভুল মা?'

নুসরাত সুন্দর করে শুধরে দিয়ে বলল, 'এভাবে বলুন কাজী সাহেব, দশ লক্ষ দেনমোহর দার্য করিয়া, কিয়ামত পর্যন্ত বাকি রাইখা, যদি এই বিয়ে করিতে রাজী থাকো, তাহলে বলো মা কবুল।'

নুসরাত কথা শেষ করে হা হা করে হাসতে লাগল। নাজমিন বেগম গলা ধরে ঝুঁকিয়ে নিয়ে কব্জা দিয়ে ধুপধাপ দুটো বসিয়ে দিলেন তার পিঠের মধ্যে।

মৌলভী সাহেবের মনে হয় আজ অবাক হওয়ার দিন। অবাক হওয়ার উপর অবাক হচ্ছেন। বিয়ের পাত্রীকে বিয়ের আসরে বসিয়ে দ্বিতীয়বারের মতো পিটা হলো, এ কেমন বিয়ে! মার খেয়েও পাত্রী হাসে! নাজমিন বেগম প্রায় মৌলভী সাহেবকে ধমকে উঠে বললেন, 'কী হয়েছে, আপনি বিয়ে পড়াচ্ছেন না কেন?'

মৌলভী সাহেব ধমক খেয়ে মুখ চুপসে নিলেন। হকচকিয়ে উঠে আবারও বিয়ে পড়াতে শুরু করলেন, 'সৈয়দ হেলাল আহমদের তৃতীয় পুত্র সৈয়দ আরশ হেলালের সাথে নগদ দশ লক্ষ দেনমোহর দার্য করিয়া এই বিয়ে করতে রাজী থাকলে বলো মা কবুল।'

নুসরাত অনিহা নিয়ে অস্পষ্ট সুরে বলে ওঠে, 'খবুল।'

নাজমিন বেগম মাথায় গাট্টা মেরে বললেন, 'পরিস্কার করে বলো, নাহলে পিটিয়ে লাশ বানিয়ে ফেলব তোমায়।'

নুসরাত চোখ উল্টিয়ে নিল লাশের মতো। বলল, 'আমি পিটা খাওয়ার আগেই লাশ হয়ে গেছি।'

নাছির সাহেব ধমকে উঠলেন নুসরাতকে। খেপাটে গলায়, ক্ষোভ নিয়ে বলে ওঠেন, 'বিয়ে করবে তুমি?'

নুসরাত নিজেও জেদি গলায় আওড়ায়, 'না! আজ মুড নেই, টানাটানি করো না তো, আগামীকাল করব।'

নাজমিন বেগম নিজের পায়ের জুতো জোড়া হাতে নিলেন পেটানোর জন্য। নুসরাত সেদিকে একবার দেখল আড়চোখে। মনে মনে ধীর ভঙ্গিমায় এঁটে রইল নিজের সিদ্ধান্তে। কোনো ভাবেই বিয়ে করবে না সে। এর মধ্যে লিপি বেগম আদুরে কন্ঠে বললেন, 'এবার দুষ্টুমি বাদ দিয়ে মৌলভী সাহেব যা বলতে বলছেন, তা বলো নুসরাত, নাহলে আজ খাবার পাবে না।'

নুসরাতের চোখের সামনে পোলাও, মুরগীর গোস্ত, গরুর গোস্ত ভেসে ওঠল। যেগুলো তাকে ডাকছে নিজেদের খাওয়ার জন্য। লোভে চকচক হয়ে ওঠা চোখে কিৎকাল চেয়ে এক নাগালে বলে চলল, 'আলহামদুলিল্লাহ, কবুল, কবুল, কবুল।'

পরপর চিৎকার করে ওঠে বলল, 'বড় আম্মু, সব খাবার এখন আমার। আমি কাউকে দিব না। এক্ষুণি প্লেট ভরে আমাকে মাংস দাও।'

আরশ বিতৃষ্ণা নিয়ে চাইল নুসরাতের দিকে। বিড়বিড় করে উচ্চারণ করল, 'খাদক একটা। খাবারের লোভে বিয়ে করে নিয়েছে।'

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন