ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদয়ে তাহার আগমন

২য় পর্ব

লেখক: নাবিলা সৈয়দ

রাত আটটা। টিকটিক করে দো-তলার ড্রয়িং রুমে ঘড়ি চলছে। নুসরাত ঘড়ির কাটার দিকে একবার চেয়ে ধীরে ধীরে পর্দার ভেতর নিজের মাথাটা ঢুকিয়ে দিল। আলগোছে বন্দি করে নিল অক্ষিপটে ভেতরের অবস্থা। মাথা বের করে হিসেব নিকেষ করল, অতঃপর আবার মাথা ভেতরে ঢুকিয়ে দিল। এবার মনে হলো সামনে থেকে কেউ তার ঘাড় ধরে টানছে। মাথা তুলে উপরে তাকাতেই দেখল আরশ তার দিকে তাকিয়ে ভ্রু উপরে তুলে ইশারায় জিজ্ঞেস করছে, 'এখানে কী?' নুসরাত এটা দেখে কেটে পড়ার ধান্দা করল। মেকি হাসি ঠোঁটে ঝুলিয়ে গুটিগুটি পায়ে পিছু ঘুরতেই আরশ আদেশ দিল, 'ভেতরে আয়, চুপচাপ।'

নুসরাত ভদ্র মেয়ের মতো মাথা ঝাঁকিয়ে ভেতরে প্রবেশ করল। ঠোঁট চেপে চুপচাপ গিয়ে আসন পেতে বসল আরশের বিছানায়, ভদ্র বাচ্চার মতো। দেখলে মনে হবে তার মতো ভালো বাচ্চা আর দুটো নেই এই পৃথিবীতে। অতঃপর আরশের পানে ফিরে চাইতেই আরশ বলল, 'বই কোথায় তোর?'

নুসরাত চোরের মতো একবার মুখ তুলে তাকিয়ে আরশের মুখ দেখল। মিনমিনিয়ে বলে ওঠল, 'সেল্কের উপর রাখা।'

আরশ শুধাল, 'বইগুলো সেল্ফে রাখার জন্য আনা হয়েছে?'

নুসরাত মাথা ঝাঁকিয়ে প্রথমে স্বীকারউক্তি দিল, হ্যাঁ, তারপর দু-পাশে মাথা নাড়িয়ে বলল, 'জ্বি না।'

'তাহলে বই নিয়ে পড়তে আসলি না কেন সন্ধ্যা বেলায়?'

নুসরাত ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে একদম নম্র গলায় জানতে চাইল, 'তুমি আমাকে পড়াবে?'

আরশ প্রশ্ন করল, 'কেন পড়াব না? প্রথমে এই প্রশ্নের উত্তর দেয়, আজ পড়তে আসলি না কেন?'

নুসরাতের সোজা কথা, আজ আমার বিয়েছিল।

আরশ অবাক হওয়ার ভান করল। পকেট হাতড়ে মোবাইল বের করে কিছু একটা খুঁজল। নুসরাত পাশে বসে ভদ্র বাচ্চার মতো শুধু সবকিছু অবলোকন করল। যে কেউ দেখলে মনে করবে ভাজা মাছটি সে উল্টে খেতে জানে না। আরশ কিছু একটা ঘেটে বের করে নুসরাতের মুখের সামনে তুলে ধরল। নুসরাত চোখের পাপড়ি ঝাপটে রঙিন স্ক্রিনের দিকে চেয়ে রইল এক দৃষ্টিতে। অবাক কন্ঠে শুধাল, 'কে এই মহিলা?'

আরশ নুসরাতের কথার জবাবে উত্তর দিল না। জানতে চাইল, 'মেয়েটা কেমন আগে এটা বল?'

নুসরাত বাচ্চাসুলভ কন্ঠে বলে ওঠল, 'সুন্দর!'

এরপরই আরশ নুসরাতের মাথায় বাজ ফেলল। বলে ওঠল, 'তোর ভাবী।'

কথাটা বলতে দেরি হলো নুসরাতের লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াতে দেরি হলো না। শক্ত কন্ঠে জিজ্ঞেস করল, 'কী বললে তুমি?'

আরশ আগের ভঙ্গিতে বলল, 'তোর ভাবী।'

নুসরাত রাগে কটমট করে উঠল। নাকের পাটাতন ফুলে উঠল দ্রুততার সহিত। হিসহিসিয়ে উঠে নুসরাত গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে যাবে, থেমে গেল। রাগে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে বলে ওঠল, 'আসল কথা বলব, ওই মেয়েটা দেখতে কুৎসিত, কুৎসিত, কুৎসিত। মুখে দু-মনের আটা মেখে বসে আছে। আর ঠোঁট দুটো একদম কাকড়ার মতো। আরেকটা কথা, আপনাকে আজ, আমি, নুসরাত নাছির এখানে দাঁড়িয়ে, এই মুহূর্তে, এক.. তালাক.. দিলাম। তালাক..! এসব লুচ্চা, বদমায়েশদের সাথে সংসার করার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। হুহ..!'

নুসরাত মুখ ঝামটা মেরে কথা শেষ করল। বিস্ময়ে আরশের চোখ কোটর ছেড়ে বের হওয়ার মতো প্রকট। নুসরাত ততক্ষণে ধিনধিন করে চলে গিয়েছে নিজের রুমে। আরশের রুমের বিপরীত রুম নুসরাতের হওয়ায় দরজা লাগানোর জোরালো শব্দ আরশের কান পর্যন্ত পৌঁছাল। চার ফুটের একটা মেয়েকে এত অহংকার দেখাতে দেখে আরশের চোয়াল ঝুলে পড়ল। তাকে ওই মেয়ে অহংকার দেখায় আবার মুখ ঝামটা মারে! এত সাহস আসে কী করে ওই ছোট্ট মুরগীর মতো শরীরের ভেতর থেকে। আবার তাকে তালাক দিয়ে যায়। তাকে! আরশ নিজের দিকে আঙুল তুলে বিড়বিড় করে উচ্চারণ করল, 'আমাকে অহংকার দেখায় ও, সৈয়দ আরশ হেলালকে। অহ মাই গস..!'

নুসরাত কঠোর ভাবনায় লিপ্ত। এপাশ থেকে ওপাশে পায়চারি করছে আর ভাবছে গভীর ভাবনা। আরশ ভাই কীভাবে পারল তাকে ধোঁকা দিতে। কত্ত বড় সাহস! এর একটা হেস্তনেস্ত করেই আজ ছাড়বে সে। আরশ ভাই প্রেম করে, তাহলে সে কী দোষ করেছে, তাকে ও প্রেম করতে হবে। তারপর আরশ ভাইয়ের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলবে, 'শালা, এই তোর দুলাভাই, সালাম দে।' নুসরাত অনেকক্ষণ ভাবল। ভাবনা শেষে দ্রুত নিজের বিছানার দিকে এগিয়ে গেল। বিছানার মধ্যে থেকে টেব হাতে নিয়ে ভিডিও কল লাগাল সাদিয়াকে। তাদের গ্রুপে একমাত্র মেয়ে সাদিয়া যে প্রেম করে। আর তার কাছে আছে বিভিন্ন ছেলের সন্ধান। তাই প্রেম করতে হলে প্রথমে সাদিয়ার সাথে কথা বলতে হবে। নুসরাতের অতর্কিত চিন্তা থামিয়ে দিতে সাদিয়া ফাটা বাঁশের মতো বলে ওঠল, 'এই খান কি, মা গী, এখন কল দিয়েছিস কেন? আর কল দিয়ে তোর কোন মাউ গা খানার কথা চিন্তা করতাছিস?'

নুসরাত বিরক্তিতে নাক উপরে তুলে নিল। শক্ত কন্ঠে পাল্টা গালি দিল, 'তুই খান কি, তুই ম আকারে মা গ ঈ কারে গী।'

সাদিয়া এমন গালিতে কিছু মনে করল না। অলস ভঙ্গিতে ক্যামেরার পানে চেয়ে থেকে বলল, 'বল মা গী, কোন প্রয়োজনে কল করেছিস?'

নুসরাত চোরের মতো মুখ বানিয়ে বলে ওঠল, 'প্রেম করব। কয়েকটা ছেলের সাথে ডেটিং এর ব্যবস্থা করে দে।'

সাদিয়া সুর টেনে শুধাল, 'তোর পিতা সমান আলচ ভাই কোথায়? জানতে পারলে দিবেনে।'

তারপর আবার দুঃখী মুখ বানিয়ে ব্যথিত সুরে বলল, 'যদি জানে আমি তোর প্রেমের জন্য ছেলে এনে দিয়েছি, তাহলে প্রথমে আমাকে ধরে পেদানি দিবে! দরকার নেই ভাই। রিস্ক মাথার উপর এই সাদিয়া নেয় না, সে সবসময় রিস্ক মাথায় নিয়ে ঘুরে।'

নুসরাত ভরসা দিয়ে বলে ওঠল, 'তোর নাম আসবে না। কয়েকটা ছেলের ব্যবস্থা করে দেয় না ভাই!'

নুসরাতের মিনতি কন্ঠে সাদিয়া প্রায় গলে পড়ল। গালি দিয়ে বলে ওঠে, 'এত করে যখন বলছিস সা উয়া, তাহলে একটা ব্যবস্থা না হয় করেই দিলাম। বল লেইট নাইট ডেটিং এ যাবি?'

নুসরাত আঁতকে উঠল। দু-হাত সামনে এনে বলল, 'আরে না, লেইট নাইট ডেটিং এ কেন যাব! ওসবে না, শুধু আরশ ভাইকে দেখিয়ে প্রেম করার জন্য একটা ছেলে দরকার।'

সাদিয়া নুসরাতকে ভয় দেখিয়ে বলে ওঠল, 'পরে বলিস না, আরশ ভাই আমাকে কেলানি দিছে।'

নুসরাত ভাব নিয়ে বলল, 'হ্যাঁ হ্যাঁ, বলব না। এবার তোর ফাটা মুখ বন্ধ কর। আর ছেলের ব্যবস্থা করে দেয়।'

সাদিয়া পারদর্শী কন্ঠে বলে ওঠল, 'আগামীকাল ব্যবস্থা হয়ে যাবে। চারটা ছেলেকে দেখবি, তারপর চুস করবি কোনটার সাথে প্রেম করবি। আবার পরে বলিস না, চারটার সাথেই তুই প্রেম করবি। অতিরিক্ত রিস্ক হয়ে যাবে।'

পরের দিন স্কুলের ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে চুপিসারে নুসরাত বেরিয়ে পড়ল বাড়ি থেকে। সকালের নাস্তা খাওয়ার জন্য নুসরাতকে ডাকতে গিয়ে নাজমিন বেগম দেখলেন, সে উধাও। স্কুলের ব্যাগ নিয়ে বের হলেও পালিয়ে সে পার্কে চলে গেল। সেখানে গিয়ে দেখল সাদিয়া দাঁড়িয়ে আছে। সাথে তার মেলানো বয়ফ্রেন্ড ফাতিন। এটাকে দেখেই নুসরাতের মাথা গরম হয়ে গেল। মনে মনে ভাবল, একটা মানুষের মুখ কীভাবে এমন হতে পারে, যাকে দেখলেই মাথা তিনশত ষাট ডিগ্রী এঙ্গেলে গরম হয়ে যায়। কোনো কারণ ছাড়াই এই ফাতিন নামক ছেলেকে দৃষ্টিসীমানার আশেপাশে দেখলে নুসরাতের রাগ লাগে। এর মধ্যে তার জন্য ঠিক করা ছেলে চলে আসলো। সাদিয়া ছেলেটার সাথে নুসরাতের পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, 'তোরা এদিকে হাঁট, আমরা ওদিক থেকে আসছি।'

সাদিয়া এটা বলে চলে গেল। নুসরাত যখন ছেলেটার দিকে ফিরে তাকাল, পেট ঠেলে বমির উদ্রেক হলো। মাথা ভর্তি ঝাকড়া চুল। দেখে মনে হচ্ছে জীবনেও চিড়নি মাথায় স্পর্শ করে না। সে সরাসরি প্রশ্ন করে বসল, 'তোমার চুলের এ অবস্থা কেন? চুলে চিড়নি স্পর্শ করোনা? নাকি চুল পরিস্কার করো না? আর এত বড় ছেলে, তোমার নাক দিয়ে এখনো সর্দি পড়ে কেন?'

নুসরাতের শক্ত কন্ঠের ঝাড়িতে ছেলেটার চোখ ছলছল করে ওঠল। সেকেন্ডের ভেতর ঝরঝর করে চোখ দিয়ে পানি পড়ে গেল। শব্দ করে নাক টেনে কাপড়ে মুছে নিয়ে শব্দ করে কেঁদে উঠল। মৃদু সুরে জানতে চাইল, 'তুমি আমাকে ধমকাচ্ছ কেন?'

'ধমকাবো না তো কী, তোকে চুমু খাব? তোকে চুমু খাওয়ার কথা ভাবতেই আমার বমি আসছে। সর শালা সামনে থেকে। কখন থেকে শব্দ করে নাক টেনে টেনে আমার কান ঝালাপালা করে দিয়েছিস। কার সাথে ডেটিং এসেছিস, জেনে এসেছিলি? এসব সর্দি মর্দি নিয়ে এসেছে আমার সাথে ডেটিং করতে, যত্তসব সর্দিখোর।'

প্রথম ডেটিং নুসরাতের এভাবেই ভেস্তে গেল। দ্বিতীয় ডেটিং করতে গিয়ে ছেলে পছন্দ হলো না। ঠিক ছেলে নয়, ছেলের ছাপড়ি পোশাক তার মোটেও পছন্দ হয়নি। নুসরাত নাছিরের সাথে ডেটিং করতে আসছে হলুদ প্যান্ট আর লাল শার্ট পরে। সে ধমকে বলেছে, 'এক কাজ করলে না কেন, হলুদ প্যান্ট আর লাল শার্টের সাথে মিলিয়ে একটা সাদা কালার চশমা আর কড়া গোলাপি রঙের বেল্ট পরলে তোমাকে আরো দারুণ ছাপড়ি লাগতো।'

ছেলেটাকে অপমান করে রাগী চোখ মুখ নিয়ে পার্ক ছেড়ে বের হবে, সাদিয়া তাকে এসে আটকাল। ব্যথিত কন্ঠে বলল, 'বোন, রাগ করিস না আমার।'

নুসরাত রাগে ফুসফুস করে উঠল। গা ঝাড়া মেরে ছাড়িয়ে নিয়ে, কঠিন ভাষায় কিছু গালি দিল সাদিয়াকে। বলল, 'তোমার সাউয়া র জামাইয়ের মতোন একটা মদন এনে আমার গলায় ঝুলাইতে চাইতাছো, তা কী আমি বুঝি না! সর শালী সামনে থেকে, নাহলে এমন লাথি মারব উড়ে গিয়ে ওই ফাকিং ফাতিন এর কোলে গিয়ে একদম পড়বি।'

সাদিয়া মিনতি সুরে নুসরাতকে বোঝানোর চেষ্টা করল। বলল, 'বোন, আমার তোর দু-পায়ে পড়ি, প্লিজ যাস না। আমার খাতিরে আজ থেকে যা। কষ্ট করে ছেলেগুলোর সাথে ডেটিং শেষ করে যা। নাহলে আমার পেস্টিজ পাঞ্চার হয়ে যাবে।'

সাদিয়া প্রায় পা চেপে ধরবে নুসরাতের। নুসরাত সাদিয়াকে ঠেলে গায়ের উপর থেকে সরাতে সরাতে বলল, 'শালীর মেয়ে, তোর গা থেকে বিশ্রী গন্ধ আসছে, সর দূরে। আমার শ্বাস আটকে যাচ্ছে।'

সাদিয়া মাথা তুলে আশা ভরা চোখে নুসরাতের পানে তাকিয়ে শুধাল, 'তুই তাহলে যাচ্ছিস না?'

নুসরাত অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, 'আমি কেন যাব! আমি না ডেটিং করতে আসলাম?'

সাদিয়ার চোখ কোটর হতে বের হয়ে যাবে। সে কিড়মিড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, 'তাহলে এখন কোথায় যাচ্ছিলি?'

নুসরাত অনিহা নিয়ে বলে ওঠল, 'আইস্ক্রিম খেতে যাচ্ছিলাম। এই জন্য বলে বেডি মানুষ বোঝেনা, কোনো বা ল আবার যায় ছিঁড়তে প্রেমের ছাল। এবার সর মুখের সামনে থেকে। তোর চাপাচাপিতে মরি আর না মরি, তোর এই ঘামের গন্ধে আমি আজ নির্ঘাত মরে যাব। ওই ফাতিন কীভাবে এসব সহ্য করে, এক আল্লাহ মালুম ভালো করে জানে!'

সাদিয়া ভাব নিয়ে বলল, 'এটা আমাদের ভালোবাসার পাওয়ার।'

নুসরাত চোখ উল্টে নিয়ে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে সাদিয়ার কথা উড়িয়ে দিল। বলল, 'ভালোবাসার পাওয়ার না ছাই। দু-দিনের দুনিয়ায়, চারদিন তগো প্রেমিক প্রেমিকার প্রেম পিরিতি, চুম্মা চাটি আর ন্যাকামি দেখতে হয়। আল্লাহ কেন যে আমার মতো ভালো ভালো মানুষকে মেরে ফেলে আর তোদের মতো মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, আমি ঠিক বুঝে পাই না।'

নুসরাত সাদিয়াকে অপমান করে হেলেদুলে চলে গেল সামনের দিকে। আইস্ক্রিম কিনে এপাশে আসতেই আরেকটা ছেলের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল সাদিয়া। নুসরাত ছেলেটাকে কিছুক্ষণ চোখ দিয়ে পরখ করে নিল। ছেলেটা এসে তার পাশ ঘেঁষতেই ছ্যাত করে উঠল। বলল, 'এই মদন, গায়ের সাথে লাগছিস কেন?'

ছেলেটা নুসরাতের দিকে ত্যাড়া চোখে চেয়ে দূরে সরে গেল। নুসরাত আইস্ক্রিম সাধল ছেলেটাকে। ছেলেটা মাথা নাড়িয়ে না করে দিল। নুসরাত আবার সাধল। সাথে বলল, 'একটু কামড় দিয়ে খেয়ে নাও।'

ছেলেটা এবার লজ্জা রেখে কামড় মারতেই যাবে, নুসরাত বলে ওঠল, 'দু-বার মাত্র সাধলাম, এতেই গলে গেলে? খেতে হলে নিজ টাকায় কিনে খাও।'

ছেলেটা অপমানে থমথমে মুখ বানিয়ে নীরবে উঠে চলে গেল সামনে। সাদিয়া আর ফাতিনের সাথে অনেকক্ষণ কোনো একটা বিষয় নিয়ে কথা কাটাকাটি করল। তারপর ধুপধাপ পায়ে চলে গেল। ছেলেটা চলে যেতেই সাদিয়া এসে বসল নুসরাতের পাশে। বিরক্তিতে মুখ দিয়ে চ সূচক শব্দ উচ্চারণ করে জানতে চাইল, 'আবার এই ছেলেকে কী বলেছিস তুই?'

নুসরাত ইনোসেন্ট লুক বানিয়ে সাদিয়ার পানে চাইল। মুখ চোরের মতো বানিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে ঠোঁট নাড়িয়ে সাফাই গাইল, 'শোন, আমি আইস্ক্রিম খাচ্ছিলাম। গণে গণে মাত্র দু-বার সাধলাম, এতেই ছেলেটার মুখ দিয়ে কুত্তার মতো লালা পড়তে শুরু করল। আইস্ক্রিম খাবি, বাপ, তুই তোর টাকা দিয়ে কিনে খাস না কেন! আমি কী না করেছি! আমার আইস্ক্রিমের দিকে চোখ দিচ্ছিস কেন!'

সাদিয়া দীর্ঘ শ্বাস ফেলল। ঠোঁট নাড়িয়ে শব্দ উচ্চারণ করার শক্তি সে হারিয়ে ফেলেছে। তবুও বলল, 'শোন ভাই, তুই ডেটিং এ আসছিস। এমন করলে হবে না। তিনটাকে উল্টাপাল্টা বলে ভাগাইছিস, এবারেরটা শেষ। একটু ভালো করে ব্যবহার কর আমার। প্রয়োজন হলে আইস্ক্রিম আমি টাকা দিয়ে তোদের কিনে দিব, তবুও এবার কোনো আজগুবি কাজ করিস না।'

নুসরাত চুপচাপ মাথা নাড়িয়ে মেনে নিল, এবার সে কোনো উল্টাপাল্টা কাজ করবে না বলে। এরপরের দশ মিনিট পার্কে বসে থেকে কাটল। দশ মিনিট কাটার পর একটা ছেলে এসে হাজির হলো। ওই ছেলের সাথে সাদিয়া নুসরাতকে পরিচয় করিয়ে দিয়ে নিজ টাকায় আইস্ক্রিম কিনে দিল। নুসরাত চুপচাপ বসে পা নাড়িয়ে আইস্ক্রিম খাচ্ছিল। ছেলেটা ও তার মতো খাচ্ছিল। আকস্মিক ভুতের মতো তাদের সামনে এসে উদয় হলো আরশ। নুসরাত আইস্ক্রিম খেতে খেতে যখন মাথা তুলে উপরে তাকাল, আর উপরে তাকিয়ে রইল। ছোট মুখের দৃষ্টি থমকে রইল আরশের মুখের মধ্যে। লাল হয়ে আছে আরশের মুখ। ধীরে ধীরে তার পাশ ঘেঁষে এসে দাঁড়াল দুটো ছেলে। এই ছেলে গুলোকে নুসরাত খুব ভালো করে চিনে। দুটোই আরশ ভাইয়ের বন্ধু। একটার নাম মাহাদি এহসান খান আর অন্যটা মৃন্ময় শাহরিয়ার তুষার। সবাই হাপাচ্ছে! দেখেই মনে হচ্ছে অনেক পেরেশানিতে ছিল। নুসরাত অবাক হয়ে সবার দিকে তাকাল। কিছু জিজ্ঞেস করার পূর্বেই আরশ গর্জে উঠে জিজ্ঞেস করল, 'তুই স্কুলে না গিয়ে এখানে কী করছিলি?'

নুসরাত মুখ ঘুরিয়ে নিল। যার মানে সে উত্তর দিবে না। আরশ থাবা মেরে নুসরাতের ছোট মুখ নিজের হাতের মধ্যে পুরে নিয়ে হিসহিসিয়ে জানতে চাইল, 'তুই এখানে কী করছিলি? তোর বাপ তোর চিন্তায় যে হার্ট অ্যাটাক করে ফেলছে, সেই চিন্তা আছে তোর?'

নুসরাত তবুও নির্লিপ্ত। আরশের কাছ থেকে নিজের মুখ ছাড়ানোর চেষ্টা করল মোচড়া মুচড়ি করে। আরশের হাত এতে মোটেও শীতিল হলো না, গালের কাছে আরো শক্ত হয়ে আসলো। রাগী কন্ঠে জিজ্ঞেস করল, 'সাহস বেড়েছে খুব? পা ভেঙে বাড়িতে বসিয়ে রাখব। কোন সাহসে তুই একা একা বাড়ি থেকে বের হয়েছিস? হয়েছিস, এখানে এসে ঘাপটি মেরে বসেছিস কেন?'

নুসরাত মুখে কিছু নিয়ে আজ বসেছে হয়তো। কোনো কথার একটা টু পরিমাণ উত্তর করল না। আরশের কন্ঠ রাগে কাঁপছে। দাঁতের মাড়ি শক্ত করে চেপে ধরে বলল, 'নুসরাত, জবাব দে, নাহলে এখানে পুঁতে রেখে যাব।'

মাহাদি আরশের কাঁধে হাত দিল শান্ত হওয়ার জন্য, আরশ কাঁধ ঝাড়া দিয়ে ফেলে দিল। মাহাদির কোমল কন্ঠ স্বর শোনা গেল, 'বাচ্চা মানুষ বুঝেনি, হয়তো বেড়াতে চলে আসছে।'

আরশ মাহাদির কথা কানেই তুলল না। চোখের আকৃতি ছোট ছোট করে তীক্ষ্ণ গলায় জানতে চাইল, 'কোন সাহসে তুই বাড়ির বাহিরে পা দিয়েছিস? তোকে এই সাহস দিয়েছে কে?'

নুসরাত মুখ ঘুরিয়ে নিল। আজ এখানে প্রলয় ঘটলেও সে কথার উত্তর দিবে না। আরশ নাকের পাটা ফুলিয়ে নিয়ে নুসরাতের মুখ চেপে ধরে নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিল। তার পাশে ইশারা করে কিড়মিড়িয়ে জানতে চাইল, 'ওই ছেলেটা কে?'

নুসরাত এবার মুখ খুলে একটা কথা বলল, 'হু আর ইউ? আমার জীবনে ইন্টারফেয়ার করার আপনি কে?'

কথা শেষ হওয়ার পূর্বেই আরশের দানবের মতো হাতের একটা গাল অবশ করে দেওয়ার মতো থাপ্পড় খেল নুসরাত। কান ঝাঁঝিয়ে উঠল ব্যথায়। চোখে ঝাপসা দেখল কয়েক সেকেন্ডের জন্য। ক্যানাইন দাঁত কিছুটা নড়ানো ছিল, আরশের এক থাপ্পড়ে সেই দাঁত নড়ে কোথায় উড়ে গিয়ে পড়ল, নুসরাত নিজেও জানে না। থাপ্পড় খেয়ে রেগে কিছুক্ষণ আরশকে দেখে ধুপধাপ পায়ে চলে গেল নুসরাত ওখান থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যে। বাড়িতে এসে ড্রয়িং রুমে ছুঁড়ে ফেলল বইয়ের ব্যাগ, জুতো ছুঁড়ে মারল আরশের ফুটবল খেলে জিতা ট্রফির গ্লাসে, তারপর ধুপধাপ পায়ে চলে গেল কোনো রা ছাড়াই।

নিজের রুমে ঢুকে দরজায় তালা দিতে গিয়ে থেমে গেল। আবারো নাচতে নাচতে সবার অগোচরে বাড়ি থেকে বের হয়ে আসলো সে। এবার সরাসরি সে যাচ্ছে ডিভোর্স কার্যালয়ে। আরশ নামক বাঁদরকে ডিভোর্স দিয়ে তবেই থামবে সে। কত্ত বড় সাহস ওই কুত্তার, তাকে থাপ্পড় মারে, নুসরাত নাছিরকে। রাগে গা কাঁপছে নুসরাতের। আজ সে বুঝিয়ে দিবে নুসরাত নাছিরের হাত কতটা লম্বা! নিজের কাছে দাঁত চেপে ওয়াদা বদ্ধ হলো, আরশের সাথে আর কখনো কথা বলবে না।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন