ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদয়ে তাহার আগমন

১৩তম পর্ব

লেখক: নাবিলা সৈয়দ

মাথায় তোয়ালি দিয়ে মুছতে মুছতে বের হয়ে আসলো ওয়াশরুম থেকে আরশ। নুসরাতকে মোটা কম্ফোটার পেঁচিয়ে শুয়ে থাকতে দেখে গিয়ে টেনে তা সরিয়ে দিল। বিরক্ত চোখ তুলে আরশের দিকে নুসরাত তাকাতেই আরশ তার হাতে তোয়ালি দিয়ে ইশারা করল চুল মুছে দিতে। মুখ দিয়ে বলল, 'উঠুন, উঠে চুল মুছে দিন।'

নুসরাত উঠল না, নিজের জায়গায় থম মেরে শুয়ে রইল। আরশের তর সইল না, এসে টেনে উঠিয়ে বসাল, বেড থেকে তোয়ালি তুলে জোর করে ধরিয়ে দিল হাতের মুঠোয়। নুসরাত বিতৃষ্ণায় তিক্ত হয়ে চিৎকার করে উঠে বলল, 'ভালো লাগছে না আমার!'

আরশ জোর করে নুসরাতের হাত দিয়ে মাথার পানি মুছতে মুছতে বলল, 'তো আমি কী করব? ডু ইউ নিড এনি প্রিন্সেস ট্রিটমেন্ট?'

আরশের হেয়ালিতে নুসরাত আরো তেতিয়ে উঠল। খিটখিটে মেজাজে বলল, 'দেখুন...'

আরশ মাঝ থেকে কেটে দিয়ে, দু-চোখ নুসরাতের গ্রীবাদেশে স্থির রেখে বলল, 'তাহলে দেখান...!'

নুসরাত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আরশ তোয়ালে ঢিল মেরে ফেলে দিল দূরে কাউচে। হাত বাড়িয়ে নুসরাতের ঘাড় পেঁচিয়ে ধরল। নুসরাত মুচড়ে ওঠতেই আরশ শক্ত কণ্ঠে বলল, 'ডোন্ট মুভ, দেখতে দিন কোথায় লেগেছে!'

নুসরাত তবুও নড়াচড়া করল। আরশ চোখ রাঙিয়ে নেত্র নিবিষ্ট করল মেয়েলি মুখটায়। বলল, 'নড়াচড়া করতে দেখলে কিস করব?'

'আপনার কী মনে হয়, আপনার কিসে আমি ভয় পেয়ে যাব?'

নুসরাতের ঘাড়ে রাখা হাত আরশের আরো শক্ত হয়ে আসলো। টেনে কাছে এনে হিসহিসিয়ে বলল, 'আপনার কী মনে হয়, আমি আপনাকে একটা কিস করে ছেড়ে দিব?'

নুসরাতকে কাছে টানল আরেকটু। নুসরাত নমনীয় কণ্ঠে বলল, 'তা কেন মনে হবে?'

আরশ নিজের ক্লিন সেভ করা উজ্জ্বল মুখটা আগাল। নীলাভ্র ধারালো চোয়ালে তখন পুরুষযাচিত অহংকার বিদ্যায়মান। আরেকটু মুখ এগিয়ে, চোখে চোখ রেখে নুসরাতকে শুধাল, 'ভয় লাগছে?'

নুসরাত শক্ত কণ্ঠে বলল, 'জ্বি না।'

আরশ ঠোঁট দাবিয়ে শক্ত করে চুমু আটল গালে। তারপর জিজ্ঞেস করল, 'এবার ভয় করছে?'

'জ্বি না!'

আরশ নাকে, কপাল, থুতনিতে, গ্রীবাদেশে এমনকি পুরো মুখে জুড়ে ভেজা চুমুর বর্ষণ করল। মেয়েলি শক্ত চোখের কোণে কোমলতার খোঁজ চালিয়ে জানতে চাইল, 'এবার ভয় লাগছে?'

নুসরাত নিশ্চুপ বসে রইল। চোখের দৃষ্টিতে ছাড় পাওয়ার আকুলতা। সামনে বসা ব্যক্তিটি অবিচল, তার পুরুষালি হাত কোমরে বিচরণ ছড়িয়ে ততক্ষণে উদরে পৌঁছে গিয়েছে। শক্ত হাতের বিচরণে শিরশিরে অনুভূতির জোয়ারে ভাসছে মেয়েলি মন। আরশ তার ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে নিঃসংকোচ কণ্ঠে বলতে নিল, 'মে আই কিস ইউ জেন্টলি জাস্ট ওয়ান্স, লাইক আ পেসেন্স কিস?' তা বলার পূর্বেই যান্ত্রিক শব্দে মুঠোফোন ডেকে উঠল। আরশ চোখ সরিয়ে সাদা রঙের বেড সিটের উপর রাখা নিজের মোবাইলটা দেখল। নুসরাতের উদ্দেশ্যে বলে ওঠল, 'মোবাইলটা হাতে নিন!'

নুসরাত নিশ্চুপ অভিমত পোষণ করল। হাত বাড়িয়ে ফোনটা হাতে নিতেই আরশ রাশভারী আওয়াজে বলল, 'পিক করুন কলটা।'

কল পিক করতেই আরশ নুসরাতের মুঠোয় বন্দী মোবাইলসহ হাত চেপে ধরল নিজের কানে। অপাশ থেকে কী বলল শোনা গেল না, শুধু আরশ অস্ফুটে হিসহিসিয়ে আওড়াল, 'ওকে, আই'ল কল ইউ ব্যাক হাফ এন হাউয়ার।'

এরপর আরশ নুসরাতকে আর জ্বালাল না। দু-জনেই দু-জনের কাজে ব্যস্ত হলো। আরশ ল্যাপটপ উরুর উপর রেখে কিবোর্ডে হাত চালাতে চালাতে কয়েকবার সামনে পেছনে পুরো রুমে জুড়ে বিচরণ চলা মেয়েটাকে দেখল। আরশ হঠাৎ একটা জিনিস দেখে থামকাল কয়েক ক্ষণের জন্য। পরপর সেখান থেকে চোখ সরিয়ে এনে কিবোর্ডে রাখল, চোখ স্ক্রিনের স্থায়ী হলো দু-য়েক সেকেন্ডের জন্য, আবারো তা চলে গেল ওই মেয়েলি দু-পায়ে। আরশ বুঝে পায় না, এই মেয়ের হাত পা এত ফর্সা কেন, তদরূপ সে এটা ভুলে বসল তার নিজের মুখের তুলনায় হাত পা অস্বাভাবিক লাল। দেখলেই মনে হয় পা দুটোতে একটু শক্ত হাতে টোকা দিলে রক্ত বেরিয়ে আসবে। আরশ দু-পায়ে স্লিপার পরে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। সামনে বসে ভাবলেশহীন হাতে মোবাইলে চ্যাট করছে নুসরাত। উপরে নামের জায়গায় জ্বলজ্বল করছে বাটপার নামটা। পেছনে কারোর নিশ্বাসের ঘন উপস্থিতি টের পেতেই মোবাইল লুকিয়ে ফেলল। শঙ্কিত হলো মন, পেছনে ফিরে তাকাতেই দেখল আরশ দাঁড়িয়ে আছে। এক ভ্রু উচিয়ে কিছু বলতে যাবে, আরশ সামান্য ঝুঁকে আসলো। নুসরাতের মন বিষাক্ততায় তেতিয়ে উঠল। গতকাল থেকে শুরু করে এখনো পর্যন্ত গা ঘেষাঘেষিতে রপ্ত আছে, এত কাছে আসাআসি ছোঁয়াছুঁয়ির মানে বা কী! সে বিরক্ত, মহা বিরক্ত এই লোকের উপর। এমন গা ঘেষাঘেষি একদম তার মেয়েলি মন নিতে পারছে না। তাকে তো সময় দেওয়া একটু উচিত, কিন্তু এই লোক তো একদম সময়ই দিচ্ছে না, সময়ে অসময়ে কাছ ঘেঁষছে। সে তো মানুষ একটু স্বস্থির নিঃশ্বাস কী ফেলতে পারবে না, বিয়ে করে উনার ঘরে এসেছে বলে উনার মন মর্জি মতো সব হবে কী! তার কোনো প্রাইভেসি নেই! নিজের মস্তিষ্কের দাবানলে রপ্ত হয়ে নুসরাত এক মুহূর্ত না ভেবে মুখ ফসকে একটা কথা বলে ফেলল, 'আপনি কী আমার সাথে ঘুমাতে চান?'

সে বুঝতে পারল না এর পরিণতি কী হতে পারে, বা একটু পর কী হতে চলেছে। নিজের বোকামিঠাসা কথাটা বলে যখন চোখ তুলে সহজ ভঙ্গিতে সামনে স্তব্ধ দাঁড়িয়ে থাকা স্বামীর দিকে তাকাল, তখন কান ঝাঁঝিয়ে উঠে ঠাঁটিয়ে একটা থাপ্পড় পড়ল গালে। নুসরাত বেবাকুফের মতো চেয়ে রইল সামনে দাঁড়ানো লোকটার দিকে। লোকটা থাপ্পড় মেরেছে আবার, সেই থাপ্পড়ের কথা মনে হতেই চোখ জলে টইটুম্বুর হলো, আরশ মোটেও সেদিক দেখল না। হাতের তালুতে মেয়েলি থুতনি চেপে ধরে রুঢ় কণ্ঠে হিসহিসিয়ে জানতে চাইল, 'কী বলেছিস, আবার বল!'

এক মুহূর্তে কথার ভঙ্গি বদলে আপনি থেকে তুইতে নেমে আসলো। চোখের চাহনি তখন রাগের পাহাড়ে দবদবানি করছে। হিসহিসিয়ে উঠে ঝোঁকে আসলো কাউচে বসা মেয়েটার দিকে। হাড়ে হিম করা কাঁপন ধরিয়ে বলে ওঠল, 'বল কী বলেছিস? আমি জানতে চাচ্ছি তোর কাছে!'

নুসরাত কথা বলতে পারল না। চোখ থেকে না চাইতেও এক ফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল। বারংবার মনে হতে লাগল ছোটবেলার সেই থাপ্পড়ের কথা। আরশ কঠোরতার সাথে ঝটকা মেরে ছেড়ে দিল নুসরাতের থুতনি। মাথা ঠান্ডা করা প্রয়োজন ভাবতেই হিসহিসিয়ে সরে গেল আরশ দূরে। না হয় কখন আবার এই বেয়াদবটাকে আরো কয়েকটা থাপ্পড় মেরে বসে সে। রাগ তখনো আয়ত্তে আসেনি। রাগে নিজের মাথার চুল চেপে ধরে চিৎকার করে উঠল। নুসরাত এমন পাগলের মতো আরশের চিৎকারে আরো একটু গুটিয়ে গেল। আরশ কোনো কিছু না ভেবেই বিছানার উপর রাখা নিজের ল্যাপটপ হাতে তুলে নিয়ে ছুঁড়ে মারল কাউচের বিপরীতে পাশের দেয়ালে। যদি মাথাটা একটু শান্ত হয়, ভুলেই বসল সোফায় বসারত নুসরাতকে। ল্যাপটপ দেয়ালের সাথে বারি খেয়ে ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে, উচ্চ শব্দ কান ভেদ করতেই মেয়েলি দু-পা কাউচে তুলে সেটে গেল মেয়েটা। জলের ছাপ চোখে, ভয়ে শঙ্কিত মন তার। সে ভয় পায় আরশের এই রাগকে, যেদিন প্রথমবার রাগের বসে থাপ্পড় মেরেছিল, এর পরের দিন সকাল গালের একপাশ পুরো অসাড় হয়েছিল। খাবার খাওয়ার জন্য মুখ নাড়াতে পারত না ব্যথায়। এতটা জোরাল ছিল থাপ্পড়টা, প্রথমে না বোঝা গেলেও পরে বোঝা গেছে থাপ্পড়ের জোর কতটুকু ছিল। মুখের একপাশ ফুলে গিয়েছিল ক্ষোভের বর্শভর্তী হয়ে মারা থাপ্পড়টার জন্য।

নুসরাত যখন খিঁচিয়ে নিয়ে বন্ধ করা চোখ ভয়ে ভয়ে খুলে সামানে তাকাল, তখনই চোখাচোখি হলো আরশের রাগমিশ্রিত চোখের সাথে। বারংবার না চাইতেও ঠোঁট দিয়ে বয়ে আসছে লোকটার হুংকার, যেন নুসরাতকে ছিঁড়ে ফেলবে দু-হাতে। কিৎকাল তাকিয়ে থেকে আরশ চোখ সরিয়ে নিল। আলগোছে। ভয়ে শঙ্কিত ভেজা চোখ দুটো দেখে নিজের হুঁশে ফিরল হয়তো। দু-পাশে মাথা নাড়িয়ে নিজেকে শান্ত করল। দীর্ঘ শ্বাস ফেলে নিমেষেই রাগে থরথর করে কাঁপা শরীরটা স্থির করলো। এরপর আর গুটিয়ে কাউচে বসে থাকা মেয়েটার দিকে ফিরে তাকাল না, না তাকিয়েই বের হয়ে গেল রুম থেকে। যাওয়ার আগে ড্রপ সোল্ডার টি-শার্টের উপর হুডি চড়াল। দরজা বন্ধ থাকায় রুমের ভেতরের ঘূর্ণিঝড়ের আবাস বাড়ির কেউ পেল না। চার দেয়ালের আড়ালে ঢাকা পড়ল তা!

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন