ঘড়িতে কাটায় কাটায় বারোটা। বাহিরে ধুলো ঝড় উঠেছে। আকাশ ডেকে উঠছে থেকে থেকে, চন্দ্রিমা রাত হলেও মেঘের আঁধারে অমবস্যার ন্যায় হয়ে আছে বাহির। বাড়ির সকলেই চিন্তিত। এতরাত অবধি বাহিরে কেন, তার বিশেষ কোনো কারণ খুঁজে পেলেন না কেউ! এই নিয়ে দশতম বার চিন্তায় সদর দরজা থেকে ঘুরে এসেছেন লিপি বেগম। নুসরাত একপাশে চুপচাপ বসে থাকলেও মুখে চিন্তার দূর্বেধ্য সূচ ফুটে উঠেছে। লিপি বেগম নুসরাতের লাল হওয়া চোখ আর নাকের ডগাটা দেখছেন সূক্ষ্ম চোখে। ধারণা করে নিয়েছেন কী হতে পারে! কথায় কথায় ঝগড়া লেগে গিয়েছে হয়তো, আর রেগে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে ছেলেটা। মেয়েটার গালে দেখা যাচ্ছে হাতের দাগ, মনে হয় চড় থাপ্পড় মেরে বসেছে। ঠিকভাবে চোখ গেড়ে না তাকালে ঠিক বোঝা যায় না গালে থাপ্পড়ের দাগটুকু। লিপি বেগম ছেলে আর ছেলের বউ নিয়ে বিরক্ত, যদি ছেলেটা রাগ করেছে, তাহলে মেয়েটার তো মানানোর প্রয়োজন ছিল, এত রাতে বের হতে দিল কেন! বিরক্তিতে চ সূচক শব্দ মুখ দিয়ে নিসৃত করে আবারো দরজার পানে তাকালেন। সেখান থেকে চোখ সরিয়ে এনে হাতের মোবাইলে দৃষ্টি নিবিষ্ট করলেন। কল মিলালেন আরশের নাম্বারে। এবার হয়তো ছেলেটা সদয় হলো তাদের প্রতি, ওপাশ হতে কল পিক করে কোনো কথার সুযোগ না দিয়ে মুখের উপর বলে ওঠল, 'আমরা ঠিক আছি, বাসায় ফিরতে লেট হবে, ঘুমিয়ে পড়ো সবাই!'
কথা শেষ করে আর টু শব্দটি কানে তুলল না সে, ফোন কেটে গেল টুথ টুথ শব্দে। বাড়ির কর্তারা বিছানায় এতক্ষণে গা এলিয়ে দিলেও কর্তীরা বসে ছিলেন ছেলের অপেক্ষায়। যখন জানতে পারলেন দু-ছেলে ঠিকই আছে, তখন ঝর্ণা বেগম রাগে ইরহামকে গালি দিতে দিতে চলে গেলেন নিজের রুমে। সবাই একে একে চলে যেতেই লিপি বেগম ড্রয়িং রুমের আলো নিভিয়ে হালকা ল্যাম্পসেড বাতি জ্বালিয়ে দিলেন। ভাবলেশহীন মুখে রুমে যেতে নিয়ে দাঁড়ালেন, চোখে ভাসল সোফার উপর ক্লান্ত শরীরে বসে থাকা নুসরাতকে। ভ্রু উচিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, 'ঘুমাতে যাবি না?'
'উনি আসুক, তারপর যাব।'
কন্ঠে কোমলতা, আগের মতো কর্কশ নয়। লিপি বেগম হাসলেন সামান্য, একদিনে এতটা পরিবর্তন। মনে মনে হাসলেন, তাহলে মন ঝোঁকছে আরশের দিকে। ঠোঁটের হাসি আড়াল রয়ে গেল আলোর অভাবে। মুখে মেকি গম্ভীরতা ফুটিয়ে তুলে বললেন, 'যা ভালো বুঝিস, তা কর!'
রাত তখন কাটায় কাটায় দুইটা। সদর দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল আরশ, পিছু পিছু ইরহাম। নুসরাতকে জাগ্রত ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে থাকতে দেখেও ভ্রুক্ষেপহীন চলে গেল পাশ কাটিয়ে। নুসরাত জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল, 'কোথায় ছিলেন?' ওইটুকু জিজ্ঞেস করার পূর্বেই লোকটা না দেখার ভান করে চলে গেল। নুসরাত ইরহামের দিকে তাকাতেই ইরহাম ঠোঁট চেপে হাসল সামান্য। শয়তানি হাসি ঠোঁটের আগায় ভাসমান, দুষ্টমি করে বলল, 'যা তোর জনাবের মনরঞ্জন করে আয়, মুড খুবই খারাপ!'
নুসরাত ইরহামের কথায় সহজ গলায় বলে ওঠল, 'আমি কোনো জিনিস না, যে মনরঞ্জন করব।'
ইরহাম গা দিয়ে ধাক্কা দিয়ে বলে ওঠল, 'সিরিয়াস হও কেন ব্রো?'
নুসরাত সামনে হাঁটতে হাঁটতে চ সূচক শব্দ বের করল। বলে ওঠল, 'তো বিরক্ত হবো না, সারাজীবন যার দখল দারিত্বে আসব না বলে, ছায়া মারাতাম না, লুকিয়ে পালিয়ে থাকতাম তার সাথে গতকাল রাত থেকে বেড শেয়ার করতে হচ্ছে!'
ইরহাম দুষ্টু কণ্ঠে শুধাল, 'চুমু শেয়ার করিসনি?'
নুসরাত কটমট করে দেখল সামনে দাঁড়ানো বাটপারটাকে। চোখ রাঙিয়ে কিছু বলতে নিবে, ইরহাম বলল, 'গিফট কী দিয়েছেন ভাই তোকে?'
নুসরাত বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টিয়ে বলে ওঠল, 'কিছুই দেয়নি!'
ইরহাম বান্ধবীর দুঃখে শোকাহত হলো, কয়েক ক্ষণের জন্য। পরমুহূর্তে বলে ওঠল, 'কষ্ট পাস না ভাই।'
ইরহাম নিজের রুমে ঢোকে দরজা আটকে দিল। নুসরাত নিজের ঘুমে ভেঙে আসা শরীরটা টেনে নিয়ে গিয়ে দাঁড়াল আরশের রুমের দোরগোড়ায়। দরজায় নক করতে গিয়ে থেমে গেল কিছু একটা ভেবে, পানির ন্যায় ঠান্ডা শরীর নিয়ে পা বাড়াল রুমে। হৃৎপিন্ডের কম্পন তখন অবিরাম চলছে। ভীতু আঁখিযুগল রুম জুড়ে বিচরণ করল, কোথাও দেখা পেল না রাগী মুখটার। ওয়াশরুমের দরজা ভেজানো, ভেতর থেকে টপটপ করে শাওয়ার থেকে পানি পড়ার শব্দ আছে। নুসরাত খেয়াল করেছে কয়েকদিন যাবত, আরশ সময়ে অসময়ে শাওয়ার নেয়। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়েই গোসল করে, আবার মাগরিবের আজানের পর, অতঃপর রাতে পার্টি অফিস থেকে ফিরে এসে আবারো গোসল করে। এই শীতের দিনে নুসরাত একবার গোসল করতে গেলেই লেগে যায় মোচড়া মুচড়ি, আর এই লোক পরপর তিনবার শাওয়ার নিয়ে নেয় বিনা দ্বিধায়। মনে সাহস সঞ্চার করে ধীর পায়ে অগ্রসর হলো ওয়াশরুমের দরজার সামনে। পায়ের গতি যতটা নিশ্চল, হৃৎপিন্ডের ধামাধামা শব্দ ততোটা প্রাণচঞ্চল। ক্লিয়ার টেমপারড গ্লাস শাওয়ার ইনক্লোশারের ভেতর চোখ যেতেই প্রকট হলো নুসরাতের চোখের আকার। শাওয়ারের পানি ঝরঝরিয়ে পড়ছে লোকটার মুখে, তা গড়িয়ে যাচ্ছে সমান ধারায় পুরুষালি কলার বোন হতে খাঁজকাটা বুক থেকে উদর পর্যন্ত। নুসরাত হকচকাল। লজ্জা, অস্বস্তিতে পেলব গাল দু-খানা রঙ্গিন হয়ে উঠে, মেয়েলি মাঝারি আকারের ঠোঁটগুলো কেঁপে উঠল থরথরিয়ে। দু-পা পিছিয়ে যেতে নিয়ে আবারো পা বাড়াল সামনে, পুরুষালি সৌন্দর্যে মর্মান্ডিত জৌলুস্যে বিকিরত ফর্সা শরীরটা দেখার শখ মন মাজারে তখনো। চোখ বুজে শ্বাস ফেলে আবারো উঁকি দিতে নিবে দরজার আড়াল হতে, মুখের সামনে অবস্থানরত দরজা খুলে গেল, বেরিয়ে আসলো দরজা ওপার হতে অতি আকাঙিক্ষত পুরুষালি ধারালো মুখজোড়া। নুসরাত ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে দু-পা দূরে সরে গেল। মুখটা অস্বস্তিতে ছোট হয়েছে, লুকিয়ে দেখতে গিয়ে ধরা পড়ায় লজ্জায় ওড়না মুচড়িয়ে উঠল। ঠোঁট টিপে কিছু বলতে হা করতে যাবে, আরশ সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে চলে গেল সামনে। তোয়ালে দিয়ে ভেজা চুল মুছে নিয়ে সাদা তোয়ালি ছুঁড়ে ফেলল কাউচের মধ্যে। পুরুষালি কানের কাছে ভেসে আসলো সেই স্বর, যার প্রতিটি নিশ্বাসের শব্দ শুনতে সে আগ্রহী, কিন্তু সন্ধ্যা বেলায় বলা কথার জের ধরে না শোনার ভান করল কথাটা। ইগনোর করে চলে যেতে নিবে কোমল একখানা হাত এসে হাতের কব্জি নিজের মুষ্ঠিতে পুরে নিল। সামনে তাকিয়ে থাকা অবস্থায় পুনঃবার শুধাল, 'আপনি কথা বলছেন না কেন? কী হয়েছে আপনার? কোথায় ছিলেন এতক্ষণ?' একটা প্রশ্নের উত্তর আসলো না ওপাশ হতে, পকেটে হাত রেখে নীরব দাঁড়িয়ে রইল। নুসরাত আরশের নির্লিপ্ততা আর গম্ভীরতায় বলিষ্ঠ হাত ছেড়ে দিল। আরশ ট্রান্সপারেন্ট বারান্দার দরজা খুলে চলে গেল ওপাশে। শীতের মৌসুম হওয়ায় তখন বাহিরে হাড় কাঁপানো শীতলতা। নুসরাত শক্ত মুখে দাঁড়িয়ে রইল নিজের জায়গায়। আবারো আরশের কাছ থেকে নির্লিপ্ততা পেয়ে মেয়েলি নরম মন বিষিয়ে উঠল।
আরশ যখন ফিরে আসলো তখন ঘড়ির কাটায় আড়াইটা। ট্রান্সপারেন্ট দরজার সামনে এসে দাঁড়াতেই দেখল ঠাঁয় এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েলি রাগের তোপে ফুলে ফেপে উঠা মুখ। ভ্রুক্ষেপহীনভাবে চলে যেতে নিবে বেডের দিকে, পেছন থেকে মোলায়েম কন্ঠে ডেকে উঠল নুসরাত, 'শুনুন...'
আরশ নিজের নির্লিপ্ততা ঝাড়তে চাইল, ছুটে চলে গিয়ে কাছে টেনে নিতে ইচ্ছে হলো ছোট্ট দেহের এই রমনীকে। চুমুর বর্ষণ ছড়িয়ে দিতে চাইল সারা মুখে, কিন্তু এমন করল না। নির্লিপ্ততার চিত্র মুখের উপর বজায় রেখে, মেকি গম্ভীরতা মুখে ফুটিয়ে তুলে প্রখর ধারালো কন্ঠে জিজ্ঞেস করল, 'আপনি আমার কথা শুনেন?'
এরপর নীরবতার চাদরে মুড়ে গেল পুরো কামড়া। ক্ষীণ শ্বাস ফেলার শব্দ শোনা গেল শুধু। আরশ নাইটস্ট্যান্ডে রাখা ল্যাম্পসেড জ্বালিয়ে দিয়ে বিছানায় পা তুলে বসল। ড্রয়ার খুলে আলগোছে বের করে নিল ইংরেজি একটা নোবেল। কবার পেইজে মোটা মোটা অক্ষরে লিখা 'ইট এন্ড উইথ আস'। নুসরাত আড়চোখে চেয়ে শুয়ে পড়ল নিজের জন্য বরাদ্দ জায়গায়। মনে চাপা ক্লেশ জমল, যেখানে থাপ্পড় সে খেয়েছে রাগ করার কথা তার ছিল, সেখানে কেন উনি রাগ করবে? রাগে দুঃখে নিজের চুল বিছানায় শুয়ে টানল কিৎকাল। পিঠে ভর করে সোজা শুয়ে পায়ের কাছে থাকা বেডশিট দুমড়ে মুচড়ে দিল।
আরশ চশমা চোখে লাগিয়ে পাশে শুয়ে ছটফট করা স্ত্রীকে দেখল। ঠোঁট বাঁকিয়ে ক্ষীণ হাসল এমন ভঙ্গিমা দেখে। পরপর আবারো মুখে গম্ভীরতা এটে চোখ রাখল ইংরেজি নোবেলটায়। যেখানে ইংরেজি বড় বড় অক্ষরে কিছু একটা লিখা আছে। আরশ পা কম্ফোটার দিয়ে ঢেকে নিয়ে পড়তে শুরু করল। পড়তে এত ব্যস্ত ছিল যে পড়তে পড়তে কখন রাত চারটা বেজে গেল টের পেল না। ঘড়ির কাটায় টিক টিক শব্দ, পাশে ঘুমানো রমনীর প্রখর নিশ্বাসের শব্দে তার বইয়ে ডুবে থাকা মন ফিরে আসলো মেয়েলি শরীরের পানে।
আরশ ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে বই রেখে দিল নাইটস্ট্যান্ডে। কম্ফোটার টেনে ভালো করে ঢেকে দিল পুরো শরীর। নুসরাত আরাম পেয়ে তা আরেকটু টেনে নিল নিজের সান্নিধ্যে, আষ্টেপৃষ্টে জড়াল বুকের সাথে। আরশ হাসল কিছু একটা ভেবে, মনের মধ্যে লাড্ডু ফুটল, একদিন এভাবে সে ও নুসরাতের হাতে থাকা কম্ফোটরের মতো জড়িয়ে থাকবে তার সাথে। আদরে আদরে ভরিয়ে দিবে এই জেদি মুখটা, পুরো মেয়েলি সত্ত্বাটা। আদৌও কী হবে তা, আরশ নিজের মস্তিষ্কের এই প্রশ্নে শুধু হাসল। সে জানে হবে এটা, কারণ ইতিমধ্যে নুসরাত নাছির তার দিকে প্রায় ঝুঁকে পড়েছে।
শুধু আরেকটু সময়, এই মেয়ে তার জন্য উম্মাদ হয়ে যাবে সেটা আরশ হেলাল হলফ করে বলতে পারে। চোখ সরিয়ে নিয়ে সাদা বেডশিটের উপর রাখা মোবাইলটা হাতে তুলে নিল। মোবাইল হাতে নিয়ে সর্বপ্রথম ক্যামেরা বন্দী করল ঘুমন্ত এলোমেলো চুলের বাহারে নিজের পুরো মুখ ঘেরাও করে ফেলা মেয়েটার ছবি। ওয়াট'সঅ্যাপে ঢুকে সর্বপ্রথম মাহাদি লিখা নাম্বারে ঢুকল। সেই নাম্বার থেকে মেসেজ এসেছে, 'কেমন অবস্থা ও দিকের?'
আরশ চোখের চশমা নাকের ডগা থেকে ঠেলে সরিয়ে লিখল, 'এদিকের অবস্থা আশানুরূপ, কাজ হয়েছে।'
আর কোনো মেসেজ না লিখে মোবাইল রেখে দিল নাইট স্ট্যান্ডে। আড় চোখে নুসরাতের দিকে একবার তাকাল, তারপর চোখ সরিয়ে নিল, কয়েক সেকেন্ড পর আবার তাকাল, এবার আড় চোখে নয় সরাসরি তাকাল, আর এরপর আর চোখ সরাতে পারল না।
সময় গড়াল, নিস্তব্ধ রাতের, নিস্তব্ধতা ভেদ করে গম্ভীর হীম করে দেওয়া শীতল স্বরে ভেসে আসলো,
'Kya jaane tu mere iraade
Le jaunga saansein chura ke