১৪
'এলিজাবেথ ও ইবরাত হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়েছে আজ তিন দিন। সময়ের সাথে সাথে যন্ত্রণার তীব্রতা কিছুটা কমেছে, অশ্রুও ফুরিয়ে আসছে ধীরে ধীরে। ইস্কা তাদের ভালোবাসার পরশে বেড়ে উঠছে প্রতিদিন। রিচার্ড এখন আর ম্যানশন ছাড়তে চায় না। বাইরের দুনিয়ার যাবতীয় বোঝা একাই বয়ে নিচ্ছে লুকাস দৃঢ় হাতে।
'বারোটা পেরিয়েছে। ঘুমন্ত মেয়েকে বুকে শুইয়ে রিচার্ডও চোখ বুজে আছে। নীরব, পাথরসম ভারী তার চিবুক। মুখে স্থায়ী গম্ভীরতার ছাপ লেপ্টে আছে কয়দিন ধরে। তবুও এলিজাবেথ টের পায় লোকটার ভেতরে কতখানি যন্ত্রণা দাউ দাউ করে জ্বলছে। শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপচাপ তাকিয়ে থাকে সে।
'রিচার্ড গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে নিশ্চিত হয়ে এলিজাবেথ নিঃশব্দে উঠল। শব্দহীন পায়ে গিয়ে বেডসাইড কেবিনেটের ড্রয়ার খুলে রিচার্ডের গাড়ির চাবির গোছা তুলে নিল। নিঃশব্দ পদক্ষেপে নেমে গেল গ্যারেজের কাছে। বাইরে তখন ঘোর অন্ধকার। পাহারাদারদের চোখ জড়িয়ে আসছে ঘুমে।
'এই সুযোগেই ম্যানশনের পেছন দিক বেয়ে ভেতরে প্রবেশ করল প্রেম। গ্যারেজের ছায়ায় সে অপেক্ষা করছিল অনেকক্ষণ ধরে। এলিজাবেথকে দেখে তার মুখে আশার আলো জ্বলে উঠল। ভেবেছিল হয়তো আজও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করবে সে। এলিজাবেথ নিরাসক্ত চোখে এগিয়ে গিয়ে চাবি বাড়িয়ে দিল প্রেমের হাতে। ঠান্ডা কণ্ঠে শুধু বলল,
'যা করার, তাড়াতাড়ি করুন। তিনি জেগে ওঠার আগেই সব শেষ হোক। আজকের পর আপনাদের ছায়াও যেন আমার পরিবারের গায়ে না লাগে।'
'প্রেম কৃতজ্ঞতার হাসি ঝরিয়ে মাথা নাড়ল। এলিজাবেথের দেওয়া চাবি শক্ত করে হাতে চেপে ধরে দ্রুত ঢুকে গেল গ্যারেজে। গ্যারেজের ভেতরেই আছে সেই গুপ্ত বেজমেন্ট, যার চাবি রিচার্ড ছাড়া আর কারো কাছে নেই। এ কারণেই তো প্রেমকে আশ্রয় নিতে হয়েছে এলিজাবেথের কাছে। তার সহায়তা ছাড়া এই দরজা খোলার উপায় ছিল না।
'চাবি ঘুরতেই ভারী দরজার ফাঁক গলে ভেতরে প্রবেশ করল সরু এক আলোর রেখা। অন্ধকারাচ্ছন্ন বেজমেন্টে ছায়ার মতো পড়ে থাকা মেয়েটির চোখে সেই আলো এসে লাগল। নিস্তেজ দৃষ্টি পিটপিট করে খুলতেই ঝাপসা চোখে ভেসে উঠল অফিসার প্রেমের মুখ। কাতর দৃষ্টি। তীব্র আকুলতা।
প্রেম আর এক মুহূর্ত দেরি করল না।
'লাড়া জান্স... আমার লাড়া জান্স!'
'ঝড়ের মতো ছুটে গিয়ে আঁকড়ে ধরল মেয়েটিকে। দু' বছর পর সেই পরিচিত মুখ দেখে লাড়া থমকে গেল। দমবন্ধ করে রাখা বিস্ময় নিয়ে তাকাল তার দিকে। এ যে-চেনা সেই বিরক্তিকর অথচ আপন মুখ! হ্যাঁ, মেয়েটি আর কেউ নয় সে লাড়া স্ট্রোন।
'প্রেম এমন শক্ত করে জাপটে ধরেছে যে লাড়া নিশ্বাস নিতে পারছে না। আতঙ্ক আর অশ্রুর ভেতর থেকেও কোনোমতে ফিসফিস করে উচ্চারণ করল,
'অফিসার... তুই?'
'প্রেমের বুক থেকে উঠে এল বিদীর্ণ কণ্ঠ। কেঁপে উঠল বেজমেন্টের স্তব্ধ দেয়াল।
'হ্যাঁ, আমি! আমি অফিসার প্রেম এহসান! কুত্তার মতো দু'বছর ধরে তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি! তিলে তিলে শেষ হয়েছি, দগ্ধ হয়েছি, নিদ্রাহীন রাত পেরিয়েছি! জানো দু'বছরে কতগুলো দিন, কত সেকেন্ড হয়? প্রতিটা মুহূর্ত আমি ছটফট করেছি তোমার জন্য। কেন হারিয়ে গেছিলে? একবারও কি মনে হয়নি আমার কথা?'
'অনলাইন জগতেই তাদের পরিচয়। দীর্ঘদিনের কথোপকথন, অসংখ্য রাতজাগা আড্ডা কেবল লাড়ার কাছে হয়তো তা ছিল নিছক ফ্লার্টিং, কিন্তু প্রেমের কাছে সেটা একতরফা ভালোবাসার পূর্ণতা। হঠাৎ করেই একদিন লাড়া উধাও হয়ে যায়। অপেক্ষার পর অপেক্ষা, অথচ লাড়া আর অনলাইনে ফিরল না। পাগলের মতো ছুটে যায় প্রেম ইউএসএ-তে। কিন্তু ততদিনে দেরি হয়ে গেছে।
'রিচার্ডের লোকজন লাড়াকে অপহরণ করে বাংলাদেশে নিয়ে এসেছে। প্রেম তখন কিছুই জানত না। পরে খোঁজ চালিয়ে জানতে পারে রিচার্ড আর জেমসের পুরনো শত্রুতার শিকার হয়েছে লাড়া। রিচার্ডের কাছে পৌঁছাতে লেগে যায় দীর্ঘ দুই বছর। অথচ কিছুতেই কাজ হচ্ছিল না। রিচার্ডের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, কঠোর শাসনের কাছে বারবার পরাস্ত হচ্ছিল প্রেম।
'শেষমেশ সেই হাসপাতালে ছদ্মবেশে গিয়ে এলিজাবেথের কাছে সাহায্যের হাত বাড়ায় প্রেম। এলিজাবেথ শোনার পর আশ্বাস দিয়েছিল সাহায্য করবে বলে। কারণ এই শত্রুতার জন্যই সে হারিয়েছে নিজের এক সন্তানকে। আর কাউকে হারাতে চায় না সে।
'বিহ্বলিত লাড়া কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল,
'কে... কেন?'
'প্রেম কোনো অনুমতি নিল না। উন্মাদের মতো ঝুঁকে পড়ল ওর ফ্যাকাসে মুখশ্রীতে। চুমুর বৃষ্টি নামিয়ে ঘন নিশ্বাসে উচ্চারণ করল,
'শুধুমাত্র তোমার জন্য।'
'অদ্ভুত এক ঘোরে তলিয়ে গিয়ে লাড়া যেন নিজের সাথেই প্রশ্ন করে উঠল,
'আ... আমার?'
'প্রেম হঠাৎই লাড়ার চিবুক শক্ত করে চেপে ধরল। চোখে চোখ রেখে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে বলতে লাগল,
'আই লাভ ইউ, লাড়া। আমাদের ছয় মাসের প্রতিটি চ্যাট, প্রতিটি কথা-স্রেফ ফ্লার্টিং ছিল না আমার কাছে। ওটা ছিল আমার শুদ্ধ ভালোবাসা। যেটা তোমার কাছে ওয়ান-সাইডেড লাগত, সেটা আমার কাছে ছিল নিঃশর্ত অনুভূতি। দু'বছর ধরে পাগলের মতো খুঁজেছি তোমাকে। কোথায় না গেছি! যখন তোমাকে আর অনলাইনে পাইনি, আমি উন্মাদ হয়ে ছুটে গিয়েছিলাম ইউএসএ। কিন্তু তুমি... তুমি সেখানেও ছিলে না। আমার সব সোর্স লাগিয়ে অবশেষে আজ তোমাকে পেলাম। আর না! এবার আর তোমাকে হারাতে দেব না। অনেক হয়েছে খেলা। এবার তোমাকে আমার ভালোবাসা গ্রহণ করতেই হবে। তুমি চাও বা না চাও, তুমি এবার আমারই হবে। তোমার সম্মতি বা অসম্মতি আজ আমাদের বিয়ে হচ্ছে। সব ব্যবস্থা করে রেখেছি আমি। কাজি অপেক্ষা করছে। আমি আর কোনো রিস্ক নেব না। আজ এই হাতকড়া পরাচ্ছি তোমাকে প্রেমে ফেলার অপরাধে-চিরজীবন আমাকে সামলে রাখার দণ্ডে।
আমি আর কোনো রিস্ক নেব না। জ এই হাতকড়া পরাচ্ছি তোমাকে প্রেমে ফেলার অপরাধে-চিরজীবন আমাকে সামলে রাখার দণ্ডে। তোমার মুক্তি নেই আর আমার কাছ থেকে। আই লাভ ইউ, লাড়া... জাস্ট লাভ ইউ।'
'কথা শেষ করেই প্রেম হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দিল লাড়ার হাতে। যেন আসামিকে ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে দরজার দিকে। লাড়া হতবিহ্বল হয়ে কিছুক্ষণ চুপ রইল, তারপর আচমকা পিছন থেকে সেই চিরচেনা বেপরোয়া সুরে ডেকে উঠল, "এই অফিসার।”
'প্রেম ঘুরে তাকাতেই লাড়ার অধরে ফুটে উঠল দুষ্টুমি ভরা হাসি। টেনে বলল, 'কোলে তুলে নে। নতুন বউকে কেউ টেনে নিয়ে যায় নাকি? শালা, পিকআপ লাইন মারতে মারতে রোমান্সটাই ভুলে গেছিস?'
'প্রেম হকচকিয়ে হেসে উঠল, ঠোঁট কামড়ে বলল, 'উফ লাড়া জান্স... তুমি তো একেবারেই বদলালে না। কাম টু মি, মাই বেবি।'
'প্রেম ঝুঁকে লাড়াকে কোল তুলে নিল। লাড়া আর এক মুহূর্ত দেরি করল না। দু'হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল প্রেমের গলা। তারপর হঠাৎই টুপ করে বসিয়ে দিল চুমু প্রেমের ঠোঁটে।
'প্রেম চাবিটা এলিজাবেথের হাতে বুঝিয়ে দিয়ে লাড়াকে নিয়ে দ্রুত সরে গেল। ভারী এক নিঃশ্বাস ছেড়ে এলিজাবেথ পিছন ফিরতেই হঠাৎ আঁতকে উঠল। শীতল শিহরণ শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে এল তার, কারণ সামনে দাঁড়িয়ে আছে রিচার্ড, চোখে কঠিন কোপদৃষ্টি। মুহূর্তেই জবুথবু কেঁপে উঠল এলিজাবেথ। এক টানে হাত খামচে ধরে রিচার্ড তাকে টেনে নিল ম্যানশনের ভেতর। ভয়ের ঝড় বুকের ভেতর ক্রমশ গর্জন তুলতে লাগল, কিন্তু বিস্ময়ে এলিজাবেথ দেখল রিচার্ড তাকে সরাসরি রুমে নিয়ে গেল।
'বিছানায় বসিয়ে দিয়ে গ্যাংস্টার বস রিচার্ড হঠাৎ হাঁটু গেড়ে বসল তার সামনে। দু'হাতে জড়িয়ে ধরল এলিজাবেথের কোমরের বাঁক, ক্লান্ত শরীর ভর করে মাথা নামিয়ে রাখল ওর উরুর উপর। গলা ভাঙা, নিস্তেজ সুরে উচ্চারণ করল, 'দেশ ছাড়তে চাও?'
'অপ্রত্যাশিত এই প্রশ্নে এলিজাবেথ চমকে উঠল। ঝড়ের বদলে এতো শান্ত সুর? ধাতস্থ হতে কিছুক্ষণ সময় নিল সে। কাঁপা গলায় বলল, 'মানে?'
'রিচার্ড মুখ না তুলেই বলল, 'চলো, অনেক দূরে চলে যাই।'
'কথা শেষ হবার আগেই হঠাৎ মুখ তুলল রিচার্ড। নিস্পৃহ অথচ গভীর চাহনি মেলে ধরল এলিজাবেথের চোখে। ঠোঁট নড়ে উঠল আবার, 'আমি এরিদ আর ইস্কাকে খুব সুন্দর একটা জীবন দিতে চাই রেড। কিন্তু আমার ভয় হচ্ছে, রেড... খুব ভয়।'
'রিচার্ডের কণ্ঠে সেই প্রথমবার নেমে এলো এক অচেনা খাদ, দুর্বলতার ছাপ। এলিজাবেথ নরম হাতে রিচার্ডের চোয়াল ছুঁয়ে প্রশ্ন করল, 'ভয়? কিসের ভয়?'
'রিচার্ড নিজের হাত রাখল এলিজাবেথের হাতের উপর, কাঁপা নিশ্বাসে ফিসফিস করে বলল, 'যদি আমি ওদের সেই সুন্দর জীবন দিতে না পারি? যদি তোমাদের রক্ষা করতে না পারি?'
'দশ বছরের দাম্পত্য জীবনে এই প্রথমবার এলিজাবেথ লোকটার কণ্ঠে ভয় ছুঁতে দেখল। বুক কেঁপে উঠল তার। এলিজাবেথ ধীরে ঝুঁকে এল রিচার্ডের মুখের কাছে, কপাল ঠেকাল কপালে। নিদারুণ কোমল কন্ঠে ফিসফিস করে বলল, 'আপনি আছেন মানেই ওদের জীবন সুন্দর। আপনি আছেন মানেই আমরা সুরক্ষিত... আমরা যেখানে থাকি না কেন।'
'রিচার্ড চোখ বুজে ফেলল গভীর আবেশে। এলিজাবেথ দৃষ্টি সরিয়ে দেখল দোলনায় ঘুমিয়ে আছে তাদের মেয়ে, শান্ত স্নিগ্ধ মুখে চাঁদের আলো পড়ছে। হঠাৎ তার ঠোঁট থেকে বেরিয়ে অভিযোগের সুর, 'মেয়ে ঘুমাচ্ছে, মি. কায়নাত। চলুন না, আজ একটু চাঁদ বিলাস করে আসি। আপনি দিনকে দিন বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন না তো?'
'চোরা হাসি ফুটল রিচার্ডের ঠোঁটে। কোনো কথা না বলে সে হঠাৎই এলিজাবেথকে কোলে তুলে নিল, হাঁটা ধরল টেরেসের দিকে। আজ আকাশে উঠেছে পূর্ণচাঁদ। চাঁদের স্নিগ্ধ আলো এসে ঝলমলিয়ে তুলছে ঘুমন্ত ইস্কার সুশ্রী মুখশ্রী। টেরেস জুড়ে ভেসে এলো প্রেমিক পুরুষের গাঢ় সুর, আর তারই ফাঁকে শোনা গেল রমণীর খিলখিলে হাসি।
"টালমাটাল, মনটা কিছু তোমায় বলতে চায় বেসামাল, ভাবনাগুলো তোমায় ছুঁতে চায় টালমাটাল, মনটা কিছু তোমায় বলতে চায় বেসামাল, ভাবনাগুলো তোমায় ছুঁতে চায় আমি শুধু চেয়েছি তোমায়
আমি শুধু চেয়েছি তোমায় আমি শুধু চেয়েছি তোমায় আমি শুধু চেয়েছি তোমায় আমি শুধু চেয়েছি তোমায় না লেখা চিঠিগুলো, মন পাহারায় আমি শুধু চেয়েছি তোমায় আমি শুধু চেয়েছি তোমায় আমি শুধু চেয়েছি তোমায় আমি শুধু চেয়েছি তোমায়
রাতদিন, চেনা তুমি ছিলে অচেনা অন্তহীন, মনে হত মিষ্টি যন্ত্রণা সেই ব্যাথা উঠলো সেরে, চোখেরই চাওয়ায় আমি শুধু চেয়েছি তোমায় আমি শুধু চেয়েছি তোমায় আমি শুধু চেয়েছি তোমায় আমি শুধু চেয়েছি তোমায় কতদিন, ভেবেছি শুধু দেখবো যে তোমায় ক্লান্তহীন, তুমি ছিলে আমার কল্পনায় সেই ছবি উঠলো ভেসে চোখেরই পাতায় আমি শুধু চেয়েছি তোমায় আমি শুধু চেয়েছি তোমায় আমি শুধু চেয়েছি তোমায় আমি শুধু চেয়েছি তোমায়
'সময়ের পরিক্রমায় কেটে গেছে আরও দু'টি মাস। এ সময়ের মধ্যে ইস্কা সবার নয়নের মণি হয়ে উঠেছে। চারপাশে তার হাসি-আনন্দই সবার প্রাণ। আজ রিচার্ড অস্বাভাবিকভাবেই তাড়াতাড়ি অফিস থেকে ফিরল। ঘরে ঢুকেই মেয়ের কপালে মমতার চুমু এঁকে রেখে, কোটটা খুলে সরাসরি ওয়াশরুমে ঢুকে গেল ফ্রেশ হতে। তখন ইস্কা নিশ্চিন্তে দোলনায় ঘুমিয়ে আছে।
'এলিজাবেথ রিচার্ডের কোটটা রাখতে গিয়ে হঠাৎ পকেটে একটি বস্তু খুঁজে পেল। মুহূর্তেই বুক কেঁপে উঠল তার। চোখে জমে উঠল অশ্রু। মনের ভেতর ভয়, ক্ষোভ আর আঘাত একসাথে ঘূর্ণিঝড়ের মতো বয়ে গেল। রিচার্ড ওয়াশরুম থেকে বের হতেই এলিজাবেথ ক্রোধভেজা অশ্রুতে চোখ মেলে তাকিয়ে হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, 'আপনি আমাকে ঠকাতে পারলেন, মি. কায়নাত?'
'রিচার্ড থমকে দাঁড়াল। চোখ বিস্ফারিত, বিস্ময় আর ক্ষোভ মিশ্রিত কণ্ঠে বলে উঠল, 'হোয়াট দ্য হ্যাক!'
'ছিঃ!' এলিজাবেথ থুতু ফেলে ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিল।
মুহূর্তেই রিচার্ডের থমকে যাওয়া মস্তিষ্কে জেগে উঠল তার চিরচেনা পৈশাচিক সত্তা। সমুদ্র-নীল চোখ দুটি আগ্নেয়গিরির জ্বালা ছড়াতে লাগল। সে হঠাৎ তেড়ে এসে এলিজাবেথকে শক্ত করে চেপে ধরে দাঁত চেপে একেকটি শব্দ চিবিয়ে চিবিয়ে উচ্চারণ করল, 'এই আল্লাহর বান্দি! কী আজেবাজে বলছিস? ডু ইউ হ্যাভ এনি আইডিয়া হোয়াট ডিড ইউ সে রাইট নাও? তোমাকে আমি ঠকাবো? আদৌও সেটা আমার দ্বারা কখনো সম্ভব?'
'কাঁপতে থাকা এলিজাবেথ ঝটকা মেরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে চিৎকার করে উঠল, 'ছাড়ুন আমাকে! একদম ছুবেন না। পরনারীতে আসক্ত পুরুষকে আমি ঘৃণা করি।'
'রিচার্ড যেন আচমকাই বিদ্যুতের শর্ট খেয়ে থমকে গেল। অবিশ্বাসে ভরা গলায় বলে উঠল, 'পরনারীর প্রতি আসক্ত? তাও রিচার্ড কায়নাত? আর ইউ আউট অফ ইউর মাইন্ড?'
'এলিজাবেথ আর্তচিৎকারে কাঁপতে কাঁপতে জবাব দিল, 'হ্যাঁ, হ্যাঁ! আপনিই! আপনি, রিচার্ড কায়নাত, আমাকে ঠকিয়েছেন!'
'তার চিৎকারে ঘুমন্ত ইস্কা চমকে উঠে কেঁদে দিল। মুহূর্তেই রিচার্ড ছুটে গিয়ে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিল। শিশুটিকে আঁকড়ে ধরে রেখেই এক হাতে এলিজাবেথের কব্জি চেপে ধরে দাঁত কষে গর্জে উঠল, 'আওয়াজ নামাও! আমার মেয়ের ঘুম যদি তোমার চিৎকারে ভেঙে যায়, কসম, আজই তোর শেষ নিশ্বাস টেনে নেব আমি!'
'এলিজাবেথ রাগে আর ঘৃণায় কাঁপতে কাঁপতে বলল, 'ছাড়ুন আমাকে! যদি মেয়ের কথা এত ভাবতেন, তবে বাইরের মেয়েদের কাছে যেতে পারবেন না!'
'এই কথায় রিচার্ডের হিংস্র চোখে আবারও বিস্ময়ের ছায়া ভেসে উঠল। মুহূর্তেই তার কণ্ঠ জ্বলে উঠল আগুনের মতো, চোখে ক্রোধের ঝড়, 'বাইরের মেয়েদের কাছে গেছি মানে? খোদার কসম! তুই-ই আমার একমাত্র দূর্বলতা এটা কিন্তু আমি ভুলে যাবো এই মুহূর্তে!'
'এলিজাবেথ ফোঁপাতে ফোঁপাতে কোটের দিকে কাঁপা আঙুল তুলে বলল, 'তাহলে আপনার পকেটে ওই লিপস্টিকটা কীসের? আমি তো এরিদ জন্মের পর থেকে লিপস্টিক ছুঁয়েও দেখিনি। বলুন, তাহলে ওটা কার জন্য?'
'রিচার্ড সবটা এতোক্ষণে পরিষ্কার বুঝে গেল। তবে তার ক্ষোভ মুহূর্তেই ঠাণ্ডা হয়ে গেলেও, এলিজাবেথের এই অবুঝ সন্দেহের জন্য ভেতরে ভেতরে বিরক্তি জেগে উঠল। ঝাঁঝালো স্বরে বলল, 'উফক্স! ইউ ফাকিং ফুল! ভুলে যেও না, আমার ঘরে একটা মেয়ে আছে।'
'এলিজাবেথ থমকে গেল। সরু চোখে তাকিয়ে কাঁপা গলায় প্রশ্ন করল, 'মানে?'
'রিচার্ড গর্জন মেশানো তীক্ষ্ণ কণ্ঠে জবাব দিল, 'ইস্কার জন্য ওটা! এরিদকে শপিং করাতে নিয়ে গেলে এটা দেখে হঠাৎ মেয়ের কথা মনে হলো, তাই নিয়ে নিলাম।'
'এলিজাবেথ হতভম্ব হয়ে গলায় বলল, 'দুই মাসের মেয়ের জন্য আপনি লিপস্টিক কিনেছেন?'
'রিচার্ড নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে উত্তর দিল, 'হ্যাঁ, তো কী হয়েছে? মেয়ে আমার বড় হবে না নাকি?'
'কথাটা শুনে এলিজাবেথের ঠোঁটের কোণে এক মুহূর্তের জন্য হাসি ফুটল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই তা মিলিয়ে গেল। আমতা আমতা করে বলল, 'আ-আমি তো ভেবেছিলাম...'
'রিচার্ড কড়া চোখে তাকাল। বলল, 'তোমার ভেবে নেওয়া আমি বুঝে নিচ্ছি। আগে মেয়েকে দিয়ে আসি।'
'এই বলে ইস্কাকে বুকে চেপে ধরে নিচে নেমে গেল রিচার্ড। লিভিং রুমে বসে থাকা ন্যাসোর কোলে মেয়েকে দিয়ে গম্ভীর গলায় সতর্ক করল, 'কিছুক্ষণের জন্য রেখে যাচ্ছি। খবরদার, ওকে 'মাই প্রিন্সেস' বলবে না। শি ইজ অনলি মাই প্রিন্সেস। বউয়ের রাগ ভাঙিয়ে মেয়েকে নিতে আসব।'
'রিচার্ড হনহনিয়ে উপরে চলে গেল। ন্যাসো হতবুদ্ধির মতো তাকিয়ে রইল তার পিছুপানে।
'রুমে ঢুকেই রিচার্ড দরজা শক্ত করে টেনে দিল। শব্দে কেঁপে উঠল এলিজাবেথ। শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে, ধীরে ধীরে পা ফেলে এগিয়ে আসতে লাগল রিচার্ড। এলিজাবেথ পিছিয়ে যেতে যেতে আতঙ্কভরা কণ্ঠে বলল, 'এ-একি, মি. কায়নাত? কাছে আসছেন কেন?'
'রিচার্ডের চোখে তখন অদ্ভুত নেশা। ঠোঁটের কোণে শয়তানি হাসি নিয়ে হিসহিসিয়ে বলল, 'প্রি-বুকিং দিতে।'
'এলিজাবেথ বিভ্রান্ত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, 'প্রি? কিসের বুকিং?”
'বাচ্চার!'
'এ-এখন? এ তো অ-অসম্ভব।'
'সব সম্ভব।'
'এলিজাবেথ পিছিয়ে গিয়ে দেয়ালে ঠেকে গেল। আতঙ্কে মাথা নাড়াতে নাড়াতে সে শুধু বলতেই থাকল, 'না-না-না!'
'রিচার্ড আচমকা ওর কোমর শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কানে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল, 'আমি প্রো জান।'
'এলিজাবেথ কাঁপতে কাঁপতে চোখ বুজল। মাথা নাড়িয়ে বলতে থাকল, 'না... না।'
'রিচার্ডের গলা গাঢ় হয়ে উঠল, 'আমি প্রো মাই ফাকিং ডার্ক রেড।'
'এলিজাবেথ শুকনো ঢোক গিলতে লাগল। রিচার্ড এলিজাবেথের গ্রীবায় ঠোঁট ছোঁয়াতে ছোঁয়াতে চাপা স্বরে বলল, 'তোমাকে একেবারেই খেয়ে ফেলতে মন চাইছে, এলিজান...'
'এলিজাবেথ ভেজা বিড়ালের মতো নুইয়ে ফিসফিস করে আওড়ালো, 'খেয়ে ফেললে পরে আর কোথায় পাবেন?'
'রিচার্ড ঠোঁট কামড়ে হেসে উঠল। আচমকা ওর ঠোঁটে আগুনের মতো চুমু এঁকে দিল। চুমুর ফাঁকেই ফিসফিস করে বলল, 'একটু একটু করে খাবো। একেবারে না তো, জান।'