#প্রেমের_লালনছোঁয়া
#পর্ব_১০
#লেখিকা_অনামিকা_তাহসিন_রোজা
" আপনি স্যারের খাবার নিয়ে এসেছেন কেনো? আপনার পরিচয় টা একটু ঠিক করে দিলে ভালো হয়!"
হিয়ার এমন তীক্ষ্ণ কথার অর্থটা ঠিকঠাক মাথায় ঢুকলো না শৈলীর। সে মুখে ভদ্রতার হাসিটা রেখে খানিক ভাবলো, এরপর মুখ খুলে কিছু বলতে যাওয়ার আগেই ঝড়ের গতিতে হাজির হলো আকাশ। একদম শৈলী এবং হিয়ার মাঝে এসে ব্রেক কষলো।
শৈলী আকাশকে বেশ ভালো করেই চেনে। নিশানের কাছের বন্ধু হওয়ার সুবাদে হলেও আকাশের সাথে তার বেশ ভাই-বোনের মতো সম্পর্ক আছে।
" আকাশ, ভাইয়া..আপনি!"
আকাশকে দেখে শৈলী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। এত বড় অফিসে সে একা কোথায় যাবে, সেটাই বুঝতে পারছিল না! এখন একটু শান্তি লাগছে।
আকাশ শৈলীকে ছোট করে বলল,
" এক মিনিট শৈলী! জাস্ট ওয়েট!"
বলেই হিয়ার উদ্দেশ্যে বলল,
" মিস হিয়া, শোনো, তোমার কি চাকরি হারানোর ইচ্ছে আছে? না থাকলে এখুনি ইতালির প্রজেক্টের ফাইলগুলো বের করে একটু এনালাইসিস করো। শা/লা নিশানের থুক্কু আই মিন স্যারের কড়া আদেশ। কাজ দ্রুত করো। আমি জায়গার জিনিস জায়গায় রেখে এখুনি আসছি!"
নিশানের অর্ডার করার কথা শুনে হিয়া তড়িঘড়ি করে নিজের ডেস্কে চলে গেল। তার পুরোপুরি প্রস্থানের পরই আকাশ আবারো সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলে উঠলো,
" কেমন আছো শৈলী?"
শৈলী চোখে হাসলো,
" অনেক ভালো ভাইয়া। আপনি তো আমাদের বাড়িতেই আসেন না। খুব মিস করি।"
আকাশ এবার মাথা নেড়ে বলে,
" হুম, যাব যাব। আচ্ছা ভালো কথা, শোনো, নিশানের হার্টটা খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তুমি কি কোথাও দেখেছো?"
শৈলী অবুঝের ন্যায় তাকালো,
"মানেহ?"
" আর বলো না, সেই তখন থেকে নিশানের হার্ট মিসিং। কে জানি কোথায় গেল? সহজ,সরল হার্ট তো! যেকোনো সময় কেও ছিনিয়ে নিতে পারে। এই শৈলী, তুমি আবার চুরি করোনি তো?"
আকাশের শেষের কথার ভঙ্গি দেখে নিজেকে চোর মনে হচ্ছে শৈলীর। সে কথার আগামাথা না বুঝে পিটপিট করে তাকিয়ে বলে,
" আমি কিছু চুরি করিনি তো ভাইয়া! আপনি কীসের কথা বলছেন?"
আকাশ হেসে ফেলল। সে শৈলীর কপালে আঙুল ঠেকিয়ে নকল ভাবনার ভঙ্গিতে বলল,
"হুম, সন্দেহজনক! নিশানের হার্ট কোথায়, সে নিজেও জানে না। আমিও জানি না। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, তুমি কিছু জানো!"
শৈলী এবার সত্যিই ঘাবড়ে গেল।
"আমি? আমি আবার কী জানব?"
আকাশ ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
"অবশ্য তোমার সরল মুখ দেখে মনে হচ্ছে, তুমি চোর হলেও খুব চালাক চোর। নিশান বুঝতেই পারছে না হার্ট কার কাছে গেছে!"
শৈলী আরও বিভ্রান্ত হয়ে গেল। তার কপালে ভাঁজ পড়ে গেল,
"আপনার মাথা ঠিক আছে তো, ভাইয়া? নিশান ভাইয়ার হার্ট কেউ চুরি করলেই বা, আমি কেনো জানব? আর সবচেয়ে বড় কথা, হার্ট চুরি হবে কীভাবে? অপারেশন ছাড়া কীভাবে সম্ভব?"
আকাশ এবার মুখ কুঁচকে তাকালো শৈলীর দিকে। মেয়েটার মুখ দেখে বোঝাই যাচ্ছে প্যাঁচানো কথাগুলো একটাও ঘটে ঢোকাতে পারেনি। এই মেয়ে নিশানের মতো জটিল ব্যাক্তির অনুভূতি কীভাবে বুঝবে সেটাই ভেবে পায় না আকাশ। আদৌও কখনো বুঝতে পারবে কিনা!
আকাশের ভয়ানক দৃষ্টি দেখে শৈলী গলার স্বর স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল,
"আমি সত্যিই এসব জানি না ভাইয়া, এসব আপনারা বোঝেন। এখন আমাকে নিশান ভাইয়ের কাছে নিয়ে চলুন, আমি খাবার দিয়ে চলে যাব।"
আকাশ বুক ভরে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
"হুম, ঠিক আছে, চলো! দেখা যাক, নিশানের হার্টের সন্ধান পাওয়া যায় কি না!"
বলেই সে শৈলীকে নিয়ে নিশানের কেবিনের দিকে হাঁটতে লাগলম শৈলী ধীর পায়ে তার পেছনে হাঁটতে লাগল। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক উত্তেজনা কাজ করছে। নিশান ভাই যদি রাগ করেন? যদি বলেন, ‘তোর আসার কোনো দরকার ছিল না!’ কিংবা... যদি অবাক হয়ে বলেন, "তুই আমার জন্য এসেছিস?" শৈলী ধীরে করে টিফিনের ব্যাগটা শক্ত করে ধরল। যা হয়, হোক!
~~~★
মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে শৈলী। হাত দুটো সমান তালে মোচড়াচ্ছে। চোখের পাতা অনড়, তবে মণি স্থির টাইলসের মেঝেতে। সামনেই ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে নিশান। দুহাত বুকে গুঁজে কৌতূহলী মন নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে সে। একটু আগে নিশানের অভিব্যক্তি পর্যবেক্ষণ করেই গা ঢাকা দিয়েছে আকাশ। হঠাৎ করে সুস্থ স্বাভাবিক ছেলেটা এমন রেগে গেল কেনো, তাই ভেবে পায়নি সে।
শৈলী এক পলক তাকিয়ে মিনমিন করে বলল,
" নিশান ভাই..আপনি রেগে গেলেন কেনো?"
নিশান জবাব দিল না। চোখ সরিয়ে টেবিলের ওপর থাকা টিফিন বক্সটার দিকে তাকিয়ে এগিয়ে গেল সেদিকে। শৈলী আড়চোখে খেয়াল করল। নিশানকে বেসিনে গিয়ে হাত ধুতে দেখে সস্থির শ্বাস ফেলে শৈলী। দ্রুত হাত চালিয়ে টিফিন বক্স খুলতে শুরু করে। এর মধ্যে নিশান হাত মুখ মুছে কেবিনের দরজা লক না করে শুধু বন্ধ করে। শৈলী একে একে সব খাবার সাজিয়ে নিশানের চেয়ারের সামনে প্লেট এগিয়ে দেয়।
নিশান চেয়ারে বসে প্লেটে হাত রাখতে গিয়েও রাখল না। ভ্রু কুঁচকে শৈলীর দিকে তাকিয়ে সন্দিহান কন্ঠে শুধালো,
" গত রাতে আমি তোকে খাইয়ে দিয়েছিলাম, তাই না?"
শৈলী নিশানের দিকে না তাকিয়েই মাথা নেড়ে বলে,
" জ্বি...!"
নিশান এবার প্লেটে রাখতে যাওয়া হাতটা আবারো ফিরিয়ে নেয়। টাওয়াল হাতে নিয়ে বলতে থাকে,
" খাইয়ে দে আমায়!"
" এহহহ??" মাথায় বাজ পড়ে শৈলীর। নিশানের কথায় চোখ বড় করে এক ঝটকায় বিস্ময় নিয়ে তাকালো সে।
নিশান ভ্রু কুঁচকে বলল,
" শুনতে পাস নি?"
শৈলী চোখ পিটপিট করল। সে শুনতে পায়নি,তেমনটা নয়। তবে ঠিক শুনেছে কিনা তা নিয়ে একটু সন্দিহান। নিশান তার অভিব্যক্তি লক্ষ্য করে আবারো আদেশ ছুঁড়ে মা/রল,
"আমাকে খাইয়ে দিতে বলেছি। গত রাতে আমি নিজ হাতে খাইয়ে দিয়েছি তোকে, আজ তোর পালা! দ্রুত খাইয়ে দে। টাইম নেই।"
~~★
অন্ধকার মুখ কুঁচকে বসে আছে শৈলী। হাতে তার এঁটো খাবারের প্লেটটা। সে বিশ্বাসও করতে পারছে না যে নিশান এত বড় পল্টি মা/র/বে। একটু আগে ঘটে যাওয়া দুটো ঘটনাই তার মাথার উপর দিয়ে গেছে।
নিশান প্রতিশোধপরায়ণ না হলেও বরাবরই ইটের বদলে পাটকেল ছুঁড়তে বেশ দক্ষ। গত রাতে শৈলী তার হাতে কাঁ/ম/ড় দিয়েছিল। ভুলে যায়নি সে। একটু আগে শৈলীর হাতে খাওয়ার নাম করে বেশ জোরেই কা/ম/ড় বসিয়ে দিয়েছে শৈলীর আঙুলে। শুধু তাই নয়, ফিরিয়ে দিয়েছে গত রাতে শৈলীর বলা সেই কথাটাও। নিশানের কা/ম/ড়ের তোপে হাতে প্রচন্ড য/ন্ত্র/ণা অনুভব করে শৈলী যখন অবাক হয়ে নিশান র দিকে তাকালো, তখন নিশান বেশ সরল মুখ করে বলে উঠলো,
" আমি কীভাবে বুঝব যে কোনটা মাগুর মাছ আর কোনটা তোর নরম আঙ্গুল!"
শৈলী চোখ বড় বড় করে তাকিয়েই রইল নিশানের দিকে। এতক্ষণ সে খাবার খাওয়ানোর সময় যতটা মনোযোগী ছিল, এখন তার সমস্ত মনোযোগ নিশানের এই "বদলা নেওয়া" কাণ্ডের দিকে। সে হতভম্ব গলায় বলল,
"আপনি..আপনি আমায় কা...কামড় দিলেন?"
নিশান মুখে দারুণ নির্দোষ একটা ভাব এনে গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
"কী করব বল? তুই তো আবার মাছের টুকরোটা আমার মুখের সামনে এনে ধরে রেখেছিলি। আমি কীভাবে বুঝব যে এটা মাছ নাকি তোর আঙুল? একবারে নরম তুলতুলে মনে হচ্ছিল! দ্যাটস নট মাই প্রবলেম!"
শৈলী হতবাক হয়ে বিষাদ চোখে নিশানের দিকে তাকিয়ে রইলো। একটু ভাবার পর মিনমিন করে বলল,
" আপনি প্রতিশোধ নিলেন, তাই না?"
" গাধা! এতক্ষণ পর বুঝলি!"
শৈলী এবার ঠোঁট উল্টিয়ে বলতে থাকলো,
"আপনি... এটা! "
তার বাক্য শেষ হওয়ার আগেই নিশান চোখ গম্ভীর রেখেই বলল,
"এটা কী? গতরাতে আমার আঙুলের কী অবস্থা করেছিলি? মনে নেই?"
" ওটা তো আমি ভুল করে করেছি নিশান ভাই! তাই বলে আপনি ইচ্ছে করে...!"
নিশান তার কথা শেষ করার আগেই ভ্রু উঁচিয়ে তাকালো। শৈলী এবার সত্যিই বোবা হয়ে গেল। সে হাতের প্লেটটা টেবিলে রেখে দাঁড়িয়ে পড়ল,
"আমি তাহলে যাই, নিশান ভাই!"
নিশান নির্লিপ্তভাবে বলল,
" হুম যা। কিন্তু আঙুলটা একটু আড়ালে রাখিস!"
শৈলী ক্ষণিকের জন্য থমকে গেল। সে মাথা নিচু করে নিজের হাতের দিকে তাকাল। আঙুলটা সত্যিই লাল হয়ে আছে! আকাশ যদি জিজ্ঞেস করে, তাহলে কী বলবে? নিশান তো এমনিতেই কিছু বলবে না, তারপর আবার আকাশ যদি কিছু বুঝে ফেলে...
এদিকে নিশান প্লেট সরিয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে শৈলীর মুখের সব অভিব্যক্তি গোপনে লক্ষ্য করছে। মেয়েটা এখন কী করবে, সেটাই দেখার বিষয়!
শৈলী কিছু বলতে চাইলে হঠাৎ নিশান ধীর গলায় বলে উঠলো,
" আমি জানতাম আমার জন্য তুই-ই খাবার নিয়ে আসবি।"
শৈলী অনুভূতিশূন্য চোখে তাকিয়ে বলে,
" বড় মা বলেছিল?"
নিশান দুদিকে মাথা নেড়ে বলে,
" উহু! তবে আমি জানতাম, অন্তত খাটানোর অযুহাতে হলেও মা তোকে পাঠাবে।"
শৈলী নিশানের দিকে কিছুক্ষণ ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর একরকম নিজের মনেই ফিসফিস করে বলল,
"হুম...!"
নিশান ঠোঁটের কোণে হালকা হাসির রেখা টেনে গম্ভীর স্বরে বলল,
" এটা আমার বিশ্বাস ছিল।"
শৈলী এবার চোখ নামিয়ে নিল। সত্যিই, বড় মা যদি কিছু বলেও থাকেন, তাহলেও সে তো নিজে থেকেই চলে এসেছে। অথচ, নিশান আগেই জানত যে সে আসবে! একটু ইতস্তত করে শৈলী বলল,
" বাকি খাবার টা শেষ করুন, আপনার খাবার শেষ হয়ে গেলে আমি বেরোবো।"
নিশান এবার ভ্রু কুঁচকে তাকাল,
"তুই কি অফিসে এসেছিস শুধু আমাকে খাইয়ে দিয়ে যাওয়ার জন্য?"
শৈলী জবাব দিল না। নিশান তখন আস্তে আস্তে বলল,
" খাবার আনলি, খাওয়ালি...এবার নিজেও খেয়ে যা।"
শৈলী দ্রুত মাথা নাড়ল,
"না নিশান ভাই, আমার খেতে ইচ্ছে করছে না।"
নিশান কিছুক্ষণ শৈলীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর অদ্ভুত এক কৌশলী হাসি দিয়ে বলল,
"ঠিক আছে, তাহলে বাকিটা বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে যা!"
শৈলী হতভম্ব হয়ে বলল,
" না না, পুরো খাবার শেষ করুন। আপনার মা কিন্তু খুব বকবে। খাবার নষ্ট হবে নিশান ভাই! "
নিশান নির্লিপ্ত স্বরে বলল,
" মা কাকে বকবে?"
" আপনাকে! "
" এটা তাহলে তোর ভাবার বিষয় না!"
শৈলী রীতিমতো থ হয়ে গেল। এই লোকটা এমন অদ্ভুত আচরণ করছে কেনো? তার নিজের খাওয়া না খাওয়ার সাথে নিশানের কী?
~~~★
❝৫ই মার্চ, ২০২৫
আজকের দিনটা একদম স্বাভাবিক ছিল। খুব একটা খারাপ যায়নি।আজ নিশান ভাই কেমন একটা অদ্ভুত আচরণ করলো! শুধু আজ নয়, এর আগেও মাঝে মাঝে এমন অদ্ভুত আচরণ করেছেন, যে তাকে চিনতে পাওয়াও খুব মুশকিল হয়ে পড়ে। উনি যে আজ আমার আঙ্গুলে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য কা/ম/ড়ে দেবেন এটা ভাবতেও পারিনি আমি। এখনো খুব জ্বলছে। উনি বলেছিলেন যে আমার দাঁত ধারালো। অথচ নিজের দাঁত যে কোদালের মত শক্ত, সেটা তো বলেননি। আঙুলে র/ক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে এখনো। না জানি কতদিন থাকবে! তবে হ্যাঁ, নিশান ভাইয়ের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার মত সৌভাগ্য আমার হয়েছে, এটাতে অবশ্য আমি খুব খুশি। কখনো ভাবিইনি যে উনাকে খাইয়ে দিতে পারব। নিশান ভাইয়ের অফিসটাও বেশ সুন্দর। আকাশ ভাইয়ার সাথে পুরো অফিসটা ঘুরে খুব ভালো লেগেছে। ভালো কথা, এদিকে আজ বড়মা আমাকে একটুও বকেনি। এটাও একটা দুষ্কর জিনিস। এভাবে দিনগুলো কেটে গেলেই হয়, খুব তাড়াতাড়ি যেন সময় গুলো চলে যায়। আমি সেই দিনটা অপেক্ষায় আছি যেদিন আমার আর কোনো পিছুটান থাকবে না!"❞
আজকের মতো ডায়েরী লেখা শেষে বুক ফুলিয়ে শ্বাস নিল শৈলী৷ এখন রাত দুটো বাজে। চারপাশ নিস্তব্ধ, নিদ্রাচ্ছন্ন অন্ধকারের চাদরে ঢাকা গোটা পৃথিবী। জানালার পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া মৃদু বাতাসে পর্দাগুলো মাঝে মাঝে দুলে উঠছে। বাইরে চাঁদ নেই, কিন্তু তারাগুলো যেন একটু বেশি উজ্জ্বল আজ। নীরব এই রাতে, প্রকৃতির শীতলতা যেন শৈলীর একান্ত আপন হয়ে উঠেছে। স্বভাবতই সবাই এখন গভীর ঘুমে মগ্ন থাকলেও শৈলী বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে শুয়ে নিত্যদিনের কাজটা সাড়ছে। সারাদিনে হওয়া ঘটনাগুলো স্মৃতি হিসেবে লিখে রাখছে তার ডায়েরীতে।সে নড়েচড়ে উপুড় হয়ে শুয়ে ডায়েরির শেষ পাতায় তার হাতখানি স্থির রাখল। অল্প অল্প বাতাসে তার কাঁধ ছুঁয়ে যাওয়া এলোমেলো চুলগুলো যেন আলতো করে ফিসফিসিয়ে বলছে,
" তুমি আজ অন্যরকম!"
নিশান ভাইয়ের আজকের আচরণ.. ডায়েরির পাতায় লেখা কথাগুলো ফিরে ফিরে মনে পড়ছে শৈলীর। আঙুলের জ্বা/লা এখনো পুরোপুরি যায়নি, কিন্তু নিশান কো খাইয়ে দেওয়ার মুহূর্তটা মনে পড়তেই গাল লাল হয়ে উঠল। একবারও কি সে ভাবতে পেরেছিল, এমন কিছু হবে?
ঘরের কোণে রাখা টেবিল ল্যাম্পের নরম আলো শৈলীর মুখ ছুঁয়ে একরকম স্বপ্নময় ছায়া তৈরি করেছে। আলো-আঁধারের মিশেলে তার ত্বক মোমের মতো চিকচিক করছে, যেন রাতের রহস্যময়তায় হারিয়ে যেতে চায়। চোখে একটু ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু গভীর অন্ধকারের মতোই সেখানেও একটা মায়া লুকিয়ে আছে। লম্বা, কোঁকড়ানো চোখের পলকগুলো মাঝে মাঝে ঢুলুঢুলু হয়ে আসছে, কিন্তু ঘুম আসছে না একটুও।
রাতের এই সময়টা শৈলীর সবচেয়ে বেশি পছন্দ। যখন পুরো বাড়ি গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়, তখন সে নির্জনতার মধ্যে নিজেকে খুঁজে পায়। মনে হয়, এই সময়টুকুই তার একান্ত, যেখানে সে নিজের মতো করে অনুভূতিগুলো সাজিয়ে রাখতে পারে।
চাঁদহীন রাতে প্রকৃতিও যেন তার মতোই অনুভূতিশূন্য হয়ে আছে। গাছের পাতাগুলো থেমে আছে, দূরের কুকুরগুলোর ডাকও আজ শোনা যাচ্ছে না। জানালার ওপাশে কেবল রাতের শূন্যতা, আর শৈলীর ভেতরে জমে থাকা একরাশ অনুভূতি, বিভ্রান্তি, বিস্ময়, আনন্দ আর এক অজানা কাঁপুনি।
ডায়েরির ওপর আলতো করে হাত রেখে সে চোখ বন্ধ করল। নিশান ভাইয়ের গভীর চোখদুটো মনে পড়তেই হঠাৎ বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল। মনে হলো, রাতের নিস্তব্ধতার মাঝেও কোথাও যেন তার নাম ধীরে ধীরে উচ্চারিত হচ্ছে- ❝ হিমরূপা...!❞
---★
ঠকঠক.. ঠকঠক..
রাতের নিস্তব্ধতাকে ভেঙে আচমকা দরজায় শব্দ হলো। শৈলী চমকে উঠল। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো বদ্ধ দরজার দিকে। এত রাতে! কারো আসার তো কথা নয়! বুকের ভেতর ধুকপুক করে উঠল শৈলীর। নিস্তব্ধ ঘরে হঠাৎ এই শব্দ কেমন যেন অস্বাভাবিক লাগছে। বাতাসের হালকা শোঁ শোঁ শব্দের মাঝেও এখন কেবল সেই শব্দটাই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। ভয় নয়, তবে একটা অজানা শঙ্কা ছড়িয়ে পড়ছে শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে।
দরজার ওপাশে কে থাকতে পারে? বড়মা তো কখনো এভাবে আসে না, নিশান ভাইয়ের আসার তো প্রশ্নই ওঠে না। রিমি বা মিমি? ওরা কেনো আসবে এত রাতে! না কি কোনো সার্ভেন্ট? কিন্তু তারা তো সাধারণত রাত নামলেই নিজেদের কোণে চলে যায়।
ঘড়ির কাটা দুটো পার হয়েছে। শৈলী ডায়েরিটা বালিশের নিচে রেখে ধীরে ধীরে উঠে বসল। মাথার ভেতর হাজারো প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কী করা উচিত? ডাকবে? না, তাতে যদি ঘরের অন্য কেউ জেগে ওঠে! নিঃশব্দ পায়ে দরজার কাছে গিয়ে সে কাঁপা কাঁপা হাতে তালাটা খুলল।
ধীরে ধীরে দরজাটা খুলতেই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল শৈলীর। দরজার ওপাশে গম্ভীর মুখাবয়ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেস রাশিদা তালুকদার। রাতের অন্ধকারে তার মুখটা ধূসর ছায়ার মতো দেখাচ্ছে। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট, ঠোঁটের কোণে যেন কিছু বলতে চাওয়ার তীব্র ইচ্ছে কিন্তু ভাষাহীনতা।
শৈলী বিস্ময় আর উদ্বেগ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
" মামনি? তুমি! এত রাতে?"
রাশিদা একটা ঢোক গিলে ধীর কন্ঠে বললেন,
" ভেতরে আসব? একটু কথা ছিল তোর সাথে!"
শৈলী মুখভর্তি হেসে সাথে সাথে দরজা থেকে সরে দাঁড়ালো,
" হ্যাঁ নিশ্চয়ই, এসো মামনি।"
রাশিদা শাড়ির আঁচল ঠিক করে নিয়ে ভেতরে ঢুকে বললেন,
" ঘুমোচ্ছিলি নাকি? বিরক্ত করলাম?"
" না না, মোটেও না। তুমি তো জানোই আমি পারলে সারারাত ধরেও উপন্যাস পড়তে পারি! একটু আগেই নিশিপদ্ম টা আবারো শেষ করলাম!"
বলেই বিনয়ী হাসলো শৈলী। আগে হলে রাশিদাও তাল মিলিয়ে হাসতেন। কিন্তু আজ তেমন ভাবে হাসলেন না। মুখে কেন যেন বিষাদের কালো ছায়া স্পষ্ট। রাশিদার এমন অভিব্যক্তির সাথে একদমই পরিচিত নয় শৈলী। সে সন্দিহান হয়ে তাকিয়ে রইলো রাশিদার দিকে। তার চোখে কৌতূহল স্পষ্ট, একটু আগে পর্যন্ত যে স্বাভাবিক ছিল, এখন কেন যেন মনে হচ্ছে পরিস্থিতিটা একটু অন্যরকম। রাশিদার চোখেমুখে অদ্ভুত এক চাপা গাম্ভীর্য। যেন কিছু বলতে চাচ্ছেন, কিন্তু ঠিক কোথা থেকে শুরু করবেন, বুঝতে পারছেন না।
রাশিদা তালুকদার এগিয়ে এসে ধীর পায়ে চেয়ার টেনে বসলেন। হাতের আঙুলগুলো একসঙ্গে চেপে ধরে সামনের টেবিলের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। মুখে একটা অস্বস্তিকর ভাব স্পষ্ট, যেন তার ভিতরটা এলোমেলো হয়ে আছে। চোখের কোণে অনুচ্চারিত কিছু শব্দ জমাট বেঁধে আছে, কিন্তু সে শব্দগুলো বেরিয়ে আসার পথ পাচ্ছে না।
শৈলী কিছুটা আনমনা হয়ে রাশিদার সামনেই হাঁটু গেড়ে বসলো। রাশিদার দুহাঁটুতে হাত রেখে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকল। ফর্সা মুখটায় একধরনের দ্বিধা ছায়া ফেলেছে। সাধারণত হাসিখুশি, প্রাণোচ্ছল রাশিদাকে এমন দেখলে যে কেউ অবাক হবে। শৈলীরও তাই মনে হচ্ছে।
"কী হলো মামনি? কিছু বলবে না?"
শৈলী মৃদু স্বরে বলল, গলায় উদ্বেগের সুর।
রাশিদা তাকালো, কিন্তু সে দৃষ্টি যেন কোথাও আটকে আছে। ঠোঁটের কোণে একটু নড়াচড়া হলো, কিন্তু কোনো কথা বের হলো না। তিনি কীভাবে এই এতিম মেয়েটার সাথে অ/ন্যায় করবেন? শৈলী দেখল, রাশিদা একবার শ্বাস টেনে নিলেন, তারপর আবার থেমে গেলেন।
এই চুপচাপ পরিস্থিতি শৈলীর অস্বস্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে। সে গলায় উষ্ণতা এনে বলল,
"তুমি তো কখনো এমন থাকো না মামনি। কী হয়েছে বলবে? নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে! বলো আমায়!"
রাশিদা এবার মুখ তুলে তাকালেন শৈলীর দিকে, চোখের গভীরে একধরনের অস্থিরতা। দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরে বললেন,
"শৈলী, তোর সাথে আজ একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলতে এসেছি। কিন্তু জানি না, তুই সেটা কেমনভাবে নিবি।"
শৈলীর বুকের ভেতর ধক করে উঠল। এত রাতে এমন গম্ভীর কথা! সে আস্তে করে ফুঁ দিয়ে বলল,
" তুমি আমাকে ভয় দেখাচ্ছো, মামনি। খুলে বলো, কী বলবে?"
রাশিদা কিছুক্ষণ নীরব রইলেন। তারপর হাতের আঙুলগুলো শক্ত করে চেপে বললেন,
" আমি সেদিন অনুমতি ছাড়া তোর ডায়েরি দেখেছি, শৈলী।"
শৈলীর হাসিমাখা মুখটা মুহূর্তেই নিভে গেল। সে স্থির নয়নে চেয়ে রইল, রাশিদার দিকে। তার ডায়েরি দেখার অর্থ কী হতে পারে সেটা শৈলী বেশ ভালো করেই জানে। শৈলীর মুখ থেকে যেন সমস্ত রং সরে গেল। ঠোঁটদুটো হালকা ফাঁক হয়ে রইল, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না। বুকের ভেতর ধুকপুক ধুকপুক শব্দে হৃদস্পন্দন বাড়তে থাকল।
ডায়েরি দেখেছে? শৈলী অনুভব করল, তার শরীরের ভেতর দিয়ে যেন একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল। এতদিন ধরে লুকিয়ে রাখা সব কথা, সব অনুভূতি, এখন কি তাহলে রাশিদার সামনে উন্মোচিত হয়ে গেছে? নিশানকে নিয়ে তার প্রতিটা না বলা কথা, বুকের গোপন কষ্ট, আনন্দ, বেদনা, সব?
নিঃশ্বাস চেপে শৈলী ধরা গলায় বলল,
"কোন...কোন অংশ দেখেছ, মামনি?"
রাশিদার চোখে একধরনের করুণ মমতা ভেসে উঠল। কিন্তু সেই মমতার আড়ালে কিছু ছিল, যা শৈলী ধরতে পারছিল না। হয়তো সেটা দুঃখ, হয়তো উদ্বেগ। তিনি ধীরে বললেন,
"সব দেখিনি। কিন্তু যা দেখেছি, তা যথেষ্ট।"
শৈলীর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এল। মাথার মধ্যে হাজারটা চিন্তা ঘুরপাক খেতে লাগল। মামনি কি তাকে ধমক দেবে? বুঝিয়ে বলবে যে সে যা করছে ভুল? নাকি...
রাশিদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শৈলীর হাত ধরে বললেন,
"শৈলী, তুই কি নিশানকে ভালোবাসিস?"
শৈলী এক মুহূর্ত চোখের পাতা ফেলতে ভুলে গেল। এই প্রশ্নের উত্তর কীভাবে দেবে সে? মামনির সামনে স্বীকার করবে? নাকি অস্বীকার করবে? কিন্তু যে সত্যিটা এতদিন নিজের কাছেও লুকিয়ে রেখেছিল, সেটা তো এখন উন্মুক্ত হয়ে গেছে! তার বুকের ভেতর ভয় আর আবেগ একসঙ্গে ধাক্কা দিল। চোখ নামিয়ে নিয়ে, অনেকক্ষণ চুপ থেকে, আস্তে করে শৈলী শুধু "হ্যাঁ" টা বলতেই চাইলো, তখুনি রাশিদা কান্নাভেজা চোখে তাকিয়ে ভাঙা গলায় বললেন,
" বিশ্বাস কর শৈলী তোকে এই প্রশ্নটা করার আগে আমি এই একই প্রশ্ন আরেকজনকে করে এসেছি। সেও কিন্তু 'হ্যাঁ' উত্তর দিয়েছে। এখন যদি তুই 'হ্যাঁ' উত্তর দিস, তাহলে মনে কর.... সব শেষ।"
শৈলী বিস্ময়কর দৃষ্টিতে তাকায় রাশিদার দিকে, অস্ফুটস্বরে বলে,
" মানেহ?"
রাশিদা এবার সোজা হয়ে বসলেন। দুহাতে আগলে নিলেন শৈলীর থমকে যাওয়া মুখটা। নাক টেনে ঠোঁট ভিজিয়ে একটা শুকনো ঢোক গিললেন তিনি। এরপর যথাসম্ভব স্পষ্ট কন্ঠে বলতে শুরু করলেন,
" শৈলী...মা আমার। তুই তো জানিস, আমি বিধবা। আমার স্বামী নেই। আমার দুই মেয়ে নিজেদের বাবাকে হারিয়েছে। তোর ফুফাতো বোন দুটোকে তো এতিম বললে ভুল হবে না। তুই তো নিজেও দেখেছিস। আমরা কতটা অবহেলিত, আমার মেয়ে দুটোও এ বাড়িতে কতটা অবহেলিত। তোর বড় আব্বু না থাকলে নিশানের মা যে আমাদেরকে কত কথা শোনায় তুই তো সবই দেখেছিস। একবার ভেবে দেখ মা, ওই মেয়ে দুটো! নিজেদের বাবা ছাড়া কিভাবে...... আমি ওদের কোনো আবদার অপূর্ণ রাখিনি, বিশ্বাস কর। ছোট থেকে যা যা চেয়েছে নিজের সাধ্যমতো সবটাই পূরণ করেছি। আজ.... আজ আমার ছোট মেয়েটা যে আমার কাছে এমন কিছু চেয়ে বসবে, আমি ভাবতেও পারিনি। "
বলতে বলতেই অঝোরে কেঁদে দিলেন রাশিদা।
শৈলীর মুখ এখনো অনুভূতিশূন্য। সে তো এখনো কথাগুলোর সারমর্ম ধরতে পারেনি। সে তো বুঝতেই পারছেনা যে এখন তাকে নিজের জীবনের সর্বশেষ অবলম্বন টুকুও দান করতে হবে!
রাশিদা কিছুক্ষণ থেমে আবারো বললেন,
" আমি জানি.... আমি জানি তুই নিশানকে ভালোবাসিস। খুব ভালোবাসিস সেটাও জানি। বিশ্বাস কর মা.... আমি পারলে নিজ হাতে, যে করেই হোক নিশানের হাতে তোর হাতটা উঠিয়ে দিতাম। কিন্তু....! "
"কিন্তু কী মামনি?"
অস্ফুটস্বরে জানতে চাইলো শৈলী।
রাশিদা শৈলীর হাতটা আরও শক্ত করে চেপে ধরলেন, যেন এই মুহূর্তে তাকে ছেড়ে দিলে তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারবেন না। একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন শৈলীর দিকে, তারপর একরকম ফিসফিসিয়ে বললেন,
"মিমি....!"
শৈলী প্রথমে কিছুই বুঝল না, কিছু বুঝতে পারল না। কপাল কুঁচকে তাকাল রাশিদার দিকে।
"মিমি?"
রাশিদা মাথা ঝুঁকিয়ে চোখ মুছলেন। তারপর গভীর শ্বাস নিয়ে বললেন,
" মিমি নিশানকে ভালোবাসে, শৈলী। দু বছর ধরে।"
শৈলীর সমস্ত শরীর যেন জমে গেল। সে অনুভব করল, তার চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে আসছে, শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। কিছু একটা যেন গভীর শূন্যতায় টেনে নিয়ে যাচ্ছে তাকে।
"কীহ?"
অস্ফুট স্বরে বেরিয়ে এল শৈলীর ঠোঁট থেকে।
"হ্যাঁ, শৈলী। মিমি নিশানকে ভালোবাসে। গত দু বছর ধরে। আর আমিও সেদিন জানতে পেরেছি। প্রথমে বিশ্বাস করিনি জানিস। পরে যখন মিমিকে জিজ্ঞেস করলাম, তখন ও স্বীকার করলো। হাসিমুখে বলল যে হ্যাঁ নিশানকে ভালোবাসে ও। আজ হঠাৎই আবার আমার কাছে এসে একরকম কান্নাকাটি করে বলল, ‘মা, নিশান ভাইকে তুমি আমার জন্য চাইবে না?"
রাশিদা আবারও কেঁদে ফেললেন, কিন্তু এবার নিজেকে সামলে নিয়ে ফিসফিস করে বললেন,
"আমি জানি না আমি কী করব, শৈলী! আমি জানি, তুই নিশানকে ভালোবাসিস। কিন্তু আমি আমার মেয়ের মন ভাঙতে পারব না, মা! আমি তোদের দুজনকেই ভালোবাসি। আমি তোদের কারও মন ভাঙতে চাই না! কিন্তু একজনকে তো আমাকে ছাড়তে হবেই। আমি জানি, আমি যা চাইছি, সেটা অ/ন্যায়। আমি জানি, আমি তোর কাছে অ/ন্যায়ভাবে ত্যাগ চাইছি। কিন্তু আমি কী করব বল? আমি আমার মেয়ে দুটোর জন্য সারাজীবন লড়েছি। আজ যদি তার একমাত্র চাওয়া আমি পূরণ না করতে পারি, তাহলে ওরা আমাকে কখনো ক্ষমা করবে না, শৈলী! আমার মেয়েটাকে আমি কখনো কিছু দেই নি রে। ওই ছোট মেয়েটা... জানিসই তো ও কেমন আবেগী! দেখা গেল ও যদি নিশান কে না পায়, পরে যদি সু'ই'সা'ইড করতে যায়, তখন আমি....!"
শৈলীর মাথার ভেতর ঝড় বয়ে গেল। পুরো ঘরটা যেন ঘুরতে লাগল তার চারপাশে। নিশানের কথা, রাশিদার কথা, মিমির নাম,সবকিছু একসঙ্গে মিলেমিশে যেন একটা অসহ্য ভার হয়ে তার বুকে চেপে বসলো।
"সু....সু'ই'সা'ই'ড?"
শৈলীর কণ্ঠ ফাঁকা শোনালো, যেন কোনো অনুভূতিই নেই তাতে।
রাশিদা অশ্রুসজল চোখে তাকালেন তার দিকে।
"আমি জানি, এটা শোনার পর তোর কেমন লাগছে, মা। কিন্তু বিশ্বাস কর, আমি যদি পারতাম, তাহলে তোকে এই কথা বলতে আসতাম না।"
শৈলীর ঠোঁট কাঁপল, কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না। সে যে নিশানকে অনেক ভালোবাসে। নিশানকে না পেলে শৈলী বেঁচে থাকার ইচ্ছে মাটিতে মিশিয়ে দেবে।কিন্তু সেই মুহূর্তে এই প্রশ্নের চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিলো আরেকটা বাস্তবতা, তার ভালোবাসার মানুষটাকে হয়তো তাকে ছেড়ে দিতে হবে। কারণ মিমি... শৈলী জানে, মিমি আসলেই খুব আবেগপ্রবণ। মিমি যদি সত্যিই নিশানের জন্য এই পর্যায়ে চলে যায়, তাহলে কী হবে? শৈলীর ভালোবাসার কাছে কি একটা প্রাণের মূল্য কম?
রাশিদা আবার বললেন,
"আমি জানি, এটা বলা সহজ, কিন্তু করা কঠিন। কিন্তু মা, তোর ভালোবাসা থাকলেও সমাজ আছে, পরিবার আছে, পরিস্থিতি আছে। আমি চাই না, তোর জন্য মিমি কষ্ট পাক। আর আমি চাই না, তুইও কষ্ট পা। কিন্তু আমার মেয়ে যদি....!"
তার কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে এল, যেন পরবর্তী কথাগুলো বলার শক্তি নেই তার।
শৈলী ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। সে জানে, এখানে কেউ জিতবে না। কেউ সুখে থাকবে না। যে-ই ত্যাগ করুক, ক্ষতিটা স্থায়ী হবে। তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। নিশানের প্রতি তার অনুভূতি, তার নিঃশব্দ ভালোবাসা, তার সমস্ত স্বপ্ন, সবকিছু এক মুহূর্তে মাটির মতো ধুলো হয়ে গেল।
গভীর শ্বাস নিয়ে সে চোখ খুলল, রাশিদার দিকে তাকাল। শৈলীর মুখ থেকে হঠাৎই সব রং সরে গেল। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এল। বুকের ভেতর চাপা যন্ত্রণা অনুভব করল সে। নিশানের নামের সঙ্গে তার নাম জুড়ে গিয়েছিল এতদিন ধরে, চুপচাপ, নিঃশব্দে, কারও অগোচরে। কিন্তু আজ? আজ সেটা কি সত্যি এক মুহূর্তেই শেষ হয়ে যাবে? তার ঠোঁট শুকিয়ে এল।
শৈলী খুব আস্তে করে বলল,
"তাহলে, তুমি আমাকে কী করতে বলছো, মামনি?"
রাশিদা ভিজে চোখে তাকালেন তার দিকে। কীভাবে বলবেন এই কথা। তবুও নিজেকে শক্ত করে কাঁপা কণ্ঠে বললেন,
" শৈলী, তুই কি মিমির জন্য নিশানকে ছাড়তে পারবি?"
এবার শৈলী ফিক করে হেসে ফেলল। ধীরে ধীরে হাসতে হাসতে ওর হঠাৎ এই হাসিটা খিলখিল করে হাসার পর্যায়ে চলে গেল। হঠাৎ করে শৈলীকে এমন অদ্ভুত ভাবে হাসতে দেখে রাশিদা অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন। মেয়েটার হঠাৎ কী হলো বুঝতে পারলেন না তিনি। শৈলী এবার হাসতে হাসতে মেঝে থেকে উঠে দাঁড়ালো। হাসির তোপে পুরো শরীর কাঁপছে তার। এরপরে দুহাত দিয়ে ঘষে চোখ মুছলো। কোনো মতে হাসিটা থামিয়ে শৈলী একদম স্বাভাবিক কণ্ঠে বলার চেষ্টা করলো,
" তুমি এসব কী বলছো মামনি? ছাড়বো মানে! কী ছাড়তে কথা বলছো তুমি আমায়।"
রাশিদা বিভ্রান্তিকর দৃষ্টিতে তাকালে শৈলী ঢোক গিলে মুখে হাসিটা রেখে চোখে টলমল করা পানি নিয়েই হতাশ, ক্লান্ত গলায় বলে উঠলো,
" যা কখনো আমার ছিলই না, সেটা আমি কীভাবে ত্যাগ করবো মামনি?"
চোখ খিঁচে বন্ধ করলেন রাশিদা। ঠোঁট চেপে রাখলেন। শৈলীর কথার সাথে তার চোখের কোনো মিল পাচ্ছেন না তিনি। শৈলী আবারো ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
" যা আমি কখনো ছুঁয়েও দেখিনি, সেটা আমি কীভাবে ছেড়ে দেবো? মামনি, আমার কিছু নেই। আমি কী ছেড়ে দেব বলো। ছেড়ে দেওয়ার মতো এখন শুধু প্রাণটাই আছে। যেখানে আমার কখনো অধিকারই ছিল না, সেটাই বা আমি কোন অধিকারে ছাড়বো?"
রাশিদা শৈলীর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। তার বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল। এই যে তার প্রাণের ভাতিজিটা দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে, চোখে পানি, মুখে হাসি, অথচ কণ্ঠে এমন এক শূন্যতা, যা একজন পরাজিত মানুষের কণ্ঠেই শোনা যায়। এটা কি তিনি চেয়েছিলেন?
শৈলী ধীরে ধীরে একপাশে পা বাড়িয়ে জানালার দিকে তাকাল। গাঢ় রাতের অন্ধকারে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আছে। হালকা বাতাস পর্দাটা উড়িয়ে দিচ্ছে।
সে এক নিঃশ্বাসে বলল,
"জানো মামনি, একসময় ভাবতাম, ভালোবাসা মানে হচ্ছে পাশে থাকা। হাতে হাত রাখা। কিন্তু এখন বুঝি, ভালোবাসা মানে পাশে থেকেও দূরে থাকা। মুখ ফুটে কিছু না বলেও সারাজীবন বলে যাওয়া। তুমি যার কথা বলছো, আমি একবারও তাকে বলিনি যে আমি তাকে ভালোবাসি। অথচ তুমি বলছো, আমি তাকে ছেড়ে দিই?আমার তো হারানোর কিছুই নেই।"
গলা কেঁপে উঠল শৈলীর।
"তবে, আমি চাই না মিমি হারাক। চাই না সে দূর থেকে ভালোবেসে যাক।"
রাশিদা হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন শৈলীর দিকে। মেয়েটার চোখে কী অদ্ভুত শান্তি! অথচ সেই শান্তির আড়ালে কী নিদারুণ বেদনা লুকিয়ে আছে, সেটা তিনি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন। শৈলী এবার গভীর শ্বাস নিল। কণ্ঠটা ভারী হয়ে আসছে। তবুও নিজেকে স্থির রাখল।
হঠাৎ করেই এবার শৈলী ভ্রু কুঁচকে রাশিদা তালুকদারের দিকে তাকিয়ে খুব দৃঢ় কন্ঠে বলে উঠলো,
"তোমাকে কে বলল মামনি যে, আমি নিশান ভাইকে ভালোবাসি। আমি কি একবারও বলেছি তোমায়। আমিতো তোমায় বলিনি যে আমি নিশান ভাইকে ভালোবাসি। এসব ভুয়া তথ্য তোমাকে কে দিয়েছে?"
বলেই আরেক দফা হাসলো শৈলী। রাশিদা তালুকদার হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেন শৈলীর দিকে। এক মুহূর্ত আগে যে মেয়েটা তার চোখের সামনে নিজেকে নিঃশেষ করে দিতে প্রস্তুত ছিল, সে এখন এমনভাবে কথা বলছে, যেন তার কিছুতেই কিছু আসে যায় না।
শৈলী চোখের পানি লুকিয়ে আরও একটা হাসি দিল, তবে এবার সেটা বিদ্রূপের হাসির মতো শোনাল।
"মামনি, আমি তো বুঝতেই পারছি না তুমি এসব কোথা থেকে শুনলে! নিশান ভাই? আমি তাকে ভালোবাসি? উঁহু! দুঃখিত, তুমি ভুল শুনেছো। আমাকে নিয়ে গুজব ছড়িয়েছে মনে হচ্ছে!"
শৈলী একটুও কাঁপল না, একটুও দমল না। কেবল শক্ত করে দাঁড়িয়ে থাকল, যেন তার কথাগুলোই একমাত্র সত্য। রাশিদা বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। এই মেয়ে কি সত্যিই এসব বলছে? নাকি সে নিজেকেই ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করছে?
শৈলী এবার চোখ সরিয়ে জানালার দিকে তাকাল। বাইরে কুয়াশাচ্ছন্ন রাত, যেন আকাশও আজ তার মনের মতো অস্পষ্ট। খুব ধীর কণ্ঠে বলল,
" তুমি কি ওই ডায়েরির জন্য বেশি কিছু মনে করছো মামনি? ওটা ভুলে যাও! ওটা তো আমি এমনি এমনিই লিখেছিলাম। ওই যে এক ধরনের খেলা হয় না? ট্রুথ ডেয়ার! সেই ট্রুথ ডেয়ার খেলে ডেয়ার নিয়েছিলাম। সেটার জন্যই আমি ওইসব ডায়েরিতে লিখেছিলাম। ওসব তো মূল্যহীন!"
রাশিদা তালুকদার তবুও সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকালেন। তার চোখে এখন পানির সাথে বিস্ময়। শৈলী আবারো সাফাই গাইতে বলে উঠলো,
" আচ্ছা মামনি, তুমি নিজেই বলো....আমি যদি সত্যিই নিশান ভাইকে ভালোবাসতাম, তাহলে কি এত সহজে বলতাম যে আমি তাকে ভালোবাসি না? আমি কি তোমার সামনে বসে কেঁদে ফেলতাম না, আবেগে ভেসে যেতাম না? উঁহু! আমি তো তা করিনি, আমি তো দিব্যি হাসছি, তাই না? আমি তো দিব্যি মজা নিচ্ছি এই প্রসঙ্গটা নিয়ে!"
সে চোখ সরিয়ে রাশিদার দিকে তাকাল, ঠোঁটের কোণে একটা হাসি রেখেই।
"ভালোবাসা কী মামনি? সেটা কি কোনো একটা নামের সঙ্গে জুড়ে দিলেই হয়ে যায়? আমি তো জানতাম না! যদি জানতাম, তাহলে হয়তো নিশান ভাইয়ের নামও জুড়ে দিতাম নিজের সঙ্গে! কিন্তু আমি তো তা করিনি, তাই না? আমি তো কখনোই কাউকে বলিনি যে আমি নিশান ভাইকে ভালোবাসি! তবে কেনো তুমি আমার দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছো, যেন আমি মিথ্যা বলছি?"
রাশিদা এবার ধীরে ধীরে চোখ নামালেন। ভেতরে কোথাও একটা বেদনার ঢেউ আছড়ে পড়ছে। শৈলী গভীর শ্বাস নিল। এবার কণ্ঠটা একটু নরম হলো, যেন সে নিজেকেই বুঝিয়ে বলছে,
"তুমি নিশ্চিন্ত থাকো, মামনি। আমি যদি সত্যিই নিশান ভাইকে ভালোবাসতামও, তাহলে মিমির জন্য সেটা ভুলে যেতে আমার এক মুহূর্তও লাগত না। কারণ, আমি জানি হারানোর কষ্ট কেমন! মিমিকে আমি খুব ভালোবাসি। আমার এই অচেনা পৃথিবীতে তোমরাই তো আমার আপনজন মামনি। তোমাদের জন্য আমি নিজের জীবনও দিতে পারি। আর সবচেয়ে বড় কথা, আমি আমার বোনের দুঃখ দেখতে পারবো না। আমি জানি, কাউকে দূর থেকে ভালোবাসতে কেমন লাগে। আমি চাই না মিমিও সেটা অনুভব করুক।"
এই প্রথম শৈলীর কণ্ঠটা কেঁপে গেল। কিন্তু সে সামলে নিল নিজেকে।
"তুমি যদি চাও, আমি মিমির জন্য সব ছেড়ে দেবো, তাতে কোনো আপত্তি নেই। কিন্তু সত্যিটা এই যে, আমি কিছু ছাড়ছি না। মিমির জন্য আমি কিছুই ছাড়ছি না, কারণ আমার কাছে রাখার মতো কিছুই ছিল না। নিশান ভাই আমার জন্য ছিল না, কোনোদিন ছিল না, হয়তো কখনো হবেও না। আর আমার চাইও না!"
রাশিদা এবার সত্যিই আর কিছু বলতে পারলেন না। তিনি অনুভব করলেন, তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়ে শুধু তার চোখের জল চেপে রাখেনি, বরং তার সমস্ত অনুভূতিকে একটা শক্ত দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে ফেলেছে। শৈলী আবারো হাসল, একটা নিখুঁত, পরিপাটি হাসি, যেটা দেখে মনে হয় যেন কিছুই হয়নি, কিছুই বদলায়নি। অথচ রাশিদা জানেন, এই রাতের পর কিছুই আর আগের মতো থাকবে না। রাশিদার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। তিনি শুধু অসহায়ের মতো শৈলীর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটা যে এই এক মুহূর্তে কতটা বড় হয়ে গেল, সেটা তিনি শুধু তিনিই বুঝতে পারলেন।
শৈলী এবার শূন্য আকাশের দিকে তাকিয়ে রাশিদা তালুকদারের উদ্দেশ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিথ্যে টাই জোর গলায় বারংবার বলে উঠলো,
" এই মেঘলা আকাশ শুনছে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তারাগুলোও শুনছে, মামনি তুমিও শুনে রাখো। আমি নিশান ভাইকে ভালোবাসি না। কখনোই ভালোবাসিনি, ভবিষ্যতে কখনো ভালোবাসবোও না। শুধু তাকে কেনো, আমি শৈলী এই মেঘলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে প্রতিজ্ঞা করলাম, পৃথিবীতে কাউকেই কখনো ভালোবাসবো না। ভালোবাসা নামক কোনো জিনিস আমার মত এতিমের জীবনে আসবে না!"
তৎক্ষনাৎ আকাশটা গর্জন দিয়ে উঠলো। এই গভীর রাতেই যেন প্রকৃতি প্রতিবাদ করে উঠল শৈলীর এই নিষ্ঠুর সিদ্ধান্তে।
~~~★
ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে বাজছে। বড় কাটা টা এখন তিনটা পেরিয়ে গিয়েছে। রাতের আকাশটা মেঘলা থেকে নেমে এখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হতে শুরু করেছে। রাশিদা তালুকদার এখনো শৈলীর ঘরেই আছেন। নীরব হয়ে চেয়ারে বসে শৈলীকে অবাক হয়ে দেখেই চলেছেন। শৈলী এখন তার পড়ার টেবিলের কাছে রাখা কফি মেকার থেকে কফি তৈরি করছে রাশিদার জন্য। তার মুখে এখনো মিষ্টি হাসিটা ঝুলানো রয়েছে। একটুও বিষাদে ছায়া নেই, একটুও কষ্ট নেই, একটুও বেদনা নেই, কেউ দেখে কখনোই বলবে না যে সে একটু আগে নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ত্যাগ টা করে ফেলেছে। পরিবেশটা নিস্তব্ধ ও রহস্যময়। ঘরের বাতি শুধু নরম আলোর স্রোত ছড়াচ্ছে, তার সাথে বাইরের বৃষ্টি ঝিরিঝিরি শব্দে মিলেমিশে এক সুর সৃষ্টি করছে।
শৈলী নিজস্ব ভঙ্গিতে কফি তৈরি করছে। তার হাতের নিখুঁত চালে কিছুই ভ্রষ্ট হয়নি। কফি মেকারের মধ্যে গরম জল ঝরছে আর ভাপ উঠছে, চারপাশে মৃদু গরম, দমকা বাতাসের একটা শীতল টান আর বৃষ্টির গাঢ় সুর।
রাশিদা তালুকদার কিছুক্ষন আগে সেই ভয়াবহ সিদ্ধান্তের প্রভাব অনুভব করেছিলেন, এখন শৈলীর দিকে চেয়ে আছেন এক ভিন্ন দৃষ্টিতে। তার চোখে গভীর ভাবনা, যেন কিছু কষ্টের পরিণতি এখনও অনুভূত হচ্ছে, কিন্তু শৈলী সেসবকে এত সহজেই পাশ কাটিয়ে গেছে। শৈলীর হাসি, যেটি এতক্ষণ ধরে তার মুখে রয়েছে, যেন কোন চিহ্নও কাটেনি, কোন কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। তার চোখে কোনো দুঃখ নেই, মনে কোনো প্রকার অসুবিধাও নেই। কফির ঘ্রাণ বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে, আর সে যেন এক স্বপ্নের ভেতর হারিয়ে গেছে।
শৈলী এবার কফির একটা কাপ নিয়ে রাশিদার সামনে এসে, আবারো হাঁটু গেড়ে বসল। রাশিদা চেয়ারে এলিয়ে দেয়া দেহটা সোজা করে বসলেন। শৈলী হাসিমুখে কাপটা এগিয়ে দিলে রাশিদা সেটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলেন শৈলীর দিকে। শৈলী ইশারা দিতেই তিনি কফিটা ঠোঁটে ছোঁয়ালেন। শৈলী এবার কিছুক্ষণ অন্যমনষ্ক থেকে মিনমিন করে বলল,
" মামনি, নিশান ভাই কে কবে এ বিষয়ে বলবে?"
রাশিদা ঠোঁট চেপে বললেন,
" আমি তো আজই বলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু ওই ডায়েরিটার কারনে আগে তোর কাছে এলাম। দেখি কালকেই ভাবিকে আর নিশানকে বলব। দেরি করব না!"
" ওও আচ্ছা! "
শৈলী মাথা নেড়ে কিছু একটা ভাবতে ব্যস্ত হলো। হঠাৎই সে বলে উঠলো,
"মামনি, তোমায় একটা কথা বলার ছিল।"
রাশিদা তৎক্ষনাৎ বললেন,
" বল...!"
শৈলী ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
" আমি কিছুদিনের জন্য একটু গ্রামে যেতে চাচ্ছি।"
কফি খাওয়া থামালেন রাশিদা,
" গ্রামে? কী বলছিস? কোন গ্রামে?"
" নানু বাড়িতে। সুনামপুর!"
" কিন্তু, হঠাৎ কেনো?"
শৈলী ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
" আসলে এমনিতেই...গতকাল মামাও কল করেছিল। অনেকদিন যাওয়া হয়নি। আর অ্যাডমিশন শুরু হয়ে গেলে তো কোথাও যেতে পারব না। তাই একটু ঘুরে আসি। অনেকদিন গ্রামে যাওয়া হয়নি তো!"
রাশিদা কিছুক্ষণ থেমে জিজ্ঞেস করেন,
" তুই সত্যিই নিশানকে ভালোবাসিস না?"
" উঁহু, মোটেও না!"
" তাহলে পালাতে চাইছিস কেনো?"
শৈলী আঁতকে উঠল, তড়িঘড়ি করে বলল,
" আরেহ, না না মামনি, ভুল বুঝছো। পালাব কেনো? কি আজব কথা! কখনোই না! আমি শুধু যাব, আর কদিন থেকেই চলে আসব!"
রাশিদা বিভ্রান্তিকর দৃষ্টি ফেললে শৈলী আবারো বলে উঠলো,
" মামনি, আজ আমার খুব শান্তি লাগছে জানো। তোমায় আমি বলে বোঝাতে পারবো না যে, আমি কতটা খুশি। অবশেষে আজ আমি উপলব্ধি করতে পারছি যে, আমার কোনো পিছুটান নেই!"
রাশিদা তালুকদার কিছু না বুঝে এবার কিছু বলতে চাইলে শৈলী আবারো উৎফুল্ল হয়ে বলল,
" শোনো মামনি, প্লিজ আমায় আটকে দিও না। তুমিই ভেবে দেখো, এর মধ্যে যদি আবার নিশান ভাই আর মিমির বিয়ে ঠিক হয়ে যায়, তখন তো আমি গ্রামে যেতে পারবো না। কত ব্যস্ত থাকবো৷ মিমির বড় বোন হিসেবে বিয়ের সব দায়িত্ব তো আমাকেই নিতে হবে। তার থেকে ভালো হবে, তুমি এখানে নিশান ভাই এবং মিমির বিয়ের পাকা কথাটা সেড়ে ফেলো আর আমি গ্রাম থেকে চট করে একটু ঘুরে আসি। আমার অনুপস্থিতিতে শুধু আমার বাবাকে একটু দেখে রেখো।"
রাশিদা এবার মাথা নেড়ে কিছু বলতে চাইলে শৈলী আবারো বলে,
" আর মামনি, ইয়ে একটা কথা, আমার কাছে কোনো টাকা নেই। তুমি আমাকে যাতায়াতের জন্য কিছু টাকা দিও প্লিজ। নানু বাড়িতে তো খালি হাতে যেতে পারিনা। এক কেজি মিষ্টি নিতাম।"
রাশিদা এবার বলেন,
" হ্যাঁ অবশ্যই। টাকা নিস, দশ হাজার দেবো। "
" না না, ওত দরকার নেই। পাঁচ হাজার দিলেই হবে মামনি।"
বলেই মুখ ভরে হাসলো শৈলী।
শৈলীর মুখটা এখন এতটাই মুখোশের আড়ালে চলে গিয়েছে যে রাশিদা সত্যি সত্যি ভাবলেন যে শৈলী নিশানকে ভালোবাসে না, এটা আসলেই ভুল বোঝাবুঝি ছিল। তিনি এবার স্বভাবিক হয়ে বললেন,
" ঠিক আছে, যেতে চাচ্ছিস যা। কিন্তু সাবধানে যাস!"
শৈলী এবার দাঁড়িয়ে পড়লো। কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,
" আর হ্যাঁ, আমার আরেকটা অনুরোধ রেখো মামনি। আমি যে গ্রামে যাচ্ছি, এটা যেন কেও জানতে না পারে।
রাশিদা হতভম্ব হয়ে গেলেন,
" মানে? এসব কী শৈলী? এটা আবার কেনো?"
শৈলী আবারো স্বাভাবিক হয়ে বলল,
" আসলে মামনি, বোঝার চেষ্টা করো। তুমি তো বড় মাকে চিনোই। যদি জানতে পারে আমি এখানে বাবাকে রেখে গ্রামে যাব, তখন আমাকে ফাঁকিবাজ ভেবে আর যেতে দেবে না। বলবে যে আমি কাজের ফাঁকি দিতে চলে যাচ্ছি। আর রিমি মিমি কে বলার দরকার নেই। মিমির বিয়ের পাকা কথা হলে আমি হঠাৎ এসে সারপ্রাইজ দেবো ওদের। আর নিশান ভাই কে তো ভুলেও বলো না। নিশান ভাই তো নিজের মা পাগল, তখন দেখা যাবে যদি উনি বড়মাকে বলে দেন। তাই সবচেয়ে ভালো হয়, তুমি কাউকে বলো না।"
রাশিদা একটু ভেবে বলেন,
" কিন্তু জিজ্ঞেস করলে কী বলব?"
শৈলী বিছানায় থাকা উপন্যাস গুলো গোছাতে গোছাতে বলল,
" বলবে যে আমি কিছুদিনের জন্য একটা বান্ধবীর বাড়িতে যাচ্ছি৷ আর মিথ্যা বলতে না চাইলে বলবে যে তুমি কিছু জানো না!"
রাশিদা তালুকদার শৈলীর গোপন কৌশলটা ধরতেই পারলেন না। বুঝতেই পারলেন না যে শৈলী আসলেই পালাচ্ছে। শৈলী এবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,
" এখন সাড়ে তিনটা বাজে। আমি তাহলে ভোরেই বেরিয়ে পড়ি, কী বলো মামনি?"
অবাক হলেন রাশিদা,
" ভোরেই? আজই?"
" হ্যাঁ! যত তাড়াতাড়ি যাব, ততো তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে পারবো। সবাই ঘুম থেকে উঠার আগেই বেরিয়ে পড়ি!!"
বলেই হালকা হাসলো শৈলী।
রাশিদা এবার সন্দিহান কন্ঠে বললেন,
" কিন্তু এমন সময় তুই একা...এভাবে তোকে আমি একা ছাড়ব না শৈলী। এই ভোর রাতে একা? অসম্ভব!"
শৈলী আলমারির ওপর থেকে বড় একটা ব্যাগ বের করে বলল,
" একা যাব,কে বলল মামনি? একজনের সাহায্য নেব?"
" কে?" কৌতুহলী হলেন রাশিদা।
শৈলী এবার কাপড় ভাঁজ করতে করতে খুব ঠান্ডা কন্ঠে বলল,
" আছে মামনি। একজন আছে। তুমি, মিমি, রিমি আর নিশান ভাই এর পরে, ভরসা করার মতো আরেকজন আছে, যে আমায় অবশ্যই সাহায্য করবে। ফিরিয়ে দেবে না!"
চলবে...........❤️
❤️🥹 No tension! Main hoon na! 👀 Sab thik kar dungi ! 🤲❤️