ফন্ট সাইজ:
থিম:
প্রেমের লালনছোঁয়া

১১তম পর্ব

লেখক: অনামিকা তাহসিন রোজা

#প্রেমের_লালনছোঁয়া

#পর্ব_১১

#লেখিকা_অনামিকা_তাহসিন_রোজা

কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঠিকই বলেছেন,

❝ বেদনার মতো সঙ্গী আর কেউ হয় না,

যখন সবাই চলে যায়, বেদনা একাই থেকে যায়।❞

বাস্তবতা তো এমনই হয়? তাইনা? শৈলী নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করল বারংবার। আজ কি তাহলে সে বাস্তবতার স্বীকার? জীবনটা তাহলে তার বাস্তবতা উপলব্ধি করতে করতেই কেটে যাবে? কী এমন হতো যদি সেই রূপকথার গল্পের রাজকুমারীদের মতো তার জীবন হতো? সেই পঙ্খীরাজ ঘোড়ায় চড়ে আসা রাজকুমার টা তার হলে কি খুব মন্দ হতো? জীবনটা সেই রূপকথা হলেই বোধহয় খুব সুন্দর হতো! একটু বেশিই সুন্দর! লোকমুখে একটা কথা আছে,

❝ মানুষ তার কল্পনাতেই বেশি সুখী!❞

এটার সত্যতা যাচাই করার প্রয়োজন নেই। কারন এটা চিরন্তন সত্যি!

শৈলী মনে মনে আবারও এই লাইনটা আওড়ায়। নিজের ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের কথা ভেবে আবারো তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে শৈলীর ঠোঁটের কোণে। আচ্ছা, সে যে এখন চলে এলো! নিশান ভাই কি তাকে খুঁজবে? তাকে মিস করবে?শৈলী জানে না, জানার সাহসও নেই। এখন নিশান ভাই কী করছে? নিশ্চয়ই নামায পড়ে অফিসের কাজ নিয়ে ঘরে বসে আছে। একবারও বাইরে বের হয়নি। হয়তো একটু লক্ষ্য করেনি শৈলীর ঘরটা। একটুখানি করলে দেখতে পেতো কতটা নীরবতায় জর্জরিত হয়ে থমকে গেছে শৈলীর ঘরটা।

হঠাৎ বাসের ব্রেক কষার বিকট শব্দে শৈলী চমকে উঠলো! ধপাস করে বাস্তবে ফিরে এলো। ভাবনার জালে পুরোপুরি আটকে যাওয়া মন, কল্পনার রাজ্যের দরজাটা যেন মুহূর্তেই বন্ধ হয়ে গেল। শৈলী চারপাশে তাকালো, তারপর জানালার বাইরে চোখ ফেলল। বাসটা থেমেছে, বাইরে ভোরের আলো ফুটেছে, হালকা অন্ধকারের মাঝেও ঝাপসা হলুদ আলো জ্বলছে। সামনের দোকানগুলোর সাইনবোর্ড ঝুলে পড়েছে, কয়েকটা হোটেলের ভেতর থেকে মৃদু গল্পগুজবের শব্দ আসছে।

সুনামপুর বাজার।

বাসের কন্ডাক্টর গলা ফাটিয়ে বলতে শুরু করে,

"সুনামপুর! কে কে নামবেন? তাড়াতাড়ি নামুন! সুনামপুর এসে গেছে!"

শৈলী এক দীর্ঘ শ্বাস ফেলে চোখ বন্ধ করল। হ্যাঁ, সে এসে গেছে। বাস্তবের মাটিতে পা রাখার সময় হয়তো হয়ে গেছে। দেরি করল না মেয়েটা। ধীরে ধীরে হাতের ভারী ব্যাগটা শক্ত করে ধরল। তারপর আস্তে করে উঠে দাঁড়াল। দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার কারণে শরীরটা যেন অবশ হয়ে এসেছে। তবু কোনোভাবে গায়ের ওড়নাটা ঠিক করে নিয়ে বাসের সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল শৈলী।

কন্ডাক্টর আবারও তাড়া দিল,

"ও আপা, নামবেন না? তাড়াতাড়ি নামেন!"

শৈলী মাথা ঝাঁকিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে শুরু করল। শেষ ধাপে পা দিতেই ভোরের শীতল বাতাস একসঙ্গে তার গায়ে এসে লাগল। হালকা অন্ধকার এখনো ছড়ানো, তবে পূর্ব আকাশে একচিলতে লাল আভা দেখা যাচ্ছে। সামনের বাজারে এখনো পুরোপুরি ভিড় জমেনি। দোকানগুলো অর্ধেক খোলা, কেউ স্টোভ জ্বালাচ্ছে, কেউবা কাঠের বেঞ্চে বসে তন্দ্রাচ্ছন্ন অবস্থায় গল্প করছে। ফুটপাতের ধারে চায়ের দোকানের কেটলির মুখ দিয়ে ধোঁয়া উড়ছে। হোটেলের দরজার সামনে এক-দুজন কাস্টমার দাঁড়িয়ে নাস্তার অপেক্ষায়।

শৈলী ধীর পায়ে সামনে এগোল। পায়ের নিচে কাঁচা মাটির সঙ্গে কংক্রিটের রাস্তার মিলেমিশে যাওয়া পথটা কিছুটা কাদামাটিতে ভেজা। আশপাশে তাকিয়ে কিছু একটা খোঁজার চেষ্টা করল শৈলী। এই জায়গাটা তার চেনা, কিন্তু দীর্ঘদিন না আসার কারনে কেমন অচেনা লাগছে, এক অদ্ভুত শূন্যতা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। যেন এই নির্জন বাজারের ভেতরেও একা হয়ে গেছে শৈলী।

একটা শুকনো শ্বাস ফেলে নিজের কোটের হাতায় আঙুল চালিয়ে শৈলী ফোন বের করল। রিং হওয়ার সাথে সাথেই কলটা অপাশ থেকে ধরল কেও। পুরুষালি উৎফুল্লতার কন্ঠ চিৎকার দিচ্ছে,

" কীরে শৈলী? কই তুই? তোকে তো খুঁজে পাচ্ছি না রে।"

শৈলী এবার আশেপাশে তাকিয়ে বলে,

" আমি বাজারের উল্টোদিকে আছি, সমুদ্র ভাইয়া। তুমি এদিকে এসো।"

"ওরে বাব্বা! একদম বাজারের উল্টোদিকে চলে গেছিস? কী সর্বনাশ! দাঁড়া দাঁড়া, আমি আসছি! ওখান থেকে নড়িস না যেন!"

সমুদ্রের কণ্ঠে সেই চিরচেনা উচ্ছ্বাস। ফোনের ওপাশ থেকে তার ব্যস্ত কণ্ঠে কাকে যেন ডেকে বলল,

" এই তুহিন, আমার ব্যাগটা ধর! আমি শৈলীকে আনতে যাচ্ছি! বেডি উল্টোদিকে গেছে! জীবনে সোজা যাইতে পারল না!"

এদিকে শৈলী ফিক করে হেসে ফেলল। এই মানুষটাই খুব মজার। সমুদ্র হলো শৈলীর মামাতো ভাই, বয়সে নিশান ভাইয়ের সমান, তবে এখনো বাচ্চা স্বভাবটা আছে। এই গ্রামে নানু বাড়িতে শৈলীর মামা, মামী, সমুদ্র আর তার ছোট বোন মিলি ছাড়া কেউ নেই! শৈলী ফোনটা নামিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এতো বছর পরেও সমুদ্র ভাইয়া একদম আগের মতোই আছে। কথাবার্তার ধরন, উৎফুল্লতা, যত্ন, কিছুই বদলায়নি।

শৈলী ব্যাগটা আরেকটু শক্ত করে ধরে চারপাশে তাকাল। বাজারের এই চেনা জায়গাটা এখন অনেক বদলে গেছে। আগের সেই পুরোনো চায়ের দোকানটা আর নেই, সেখানে নতুন করে একপাশে একটা মুদি দোকান উঠেছে। রাস্তার ধারে একটা কাঁচাবাজার বসেছে, দু-একজন মাছওয়ালা মাছ সাজিয়ে বসেছে, আর কাঁধে গামছা ঝুলিয়ে দোকানি হাঁকডাক দিচ্ছে।

শৈলী কোটের হাতা দিয়ে হালকা করে শীতল বাতাসের ধাক্কা সামলানোর চেষ্টা করল। এতদিন পর এই জায়গায় ফিরে আসাটা কেমন যেন স্বপ্নের মতো লাগছে। যেন সে এক সময়ে থমকে যাওয়া স্মৃতির মধ্যে এসে দাঁড়িয়েছে।

কিছুক্ষণ পরেই রাস্তার ওপাশ থেকে দ্রুতবেগে একটা ছায়ামানব দৌড়াতে দৌড়াতে এদিকে আসতে দেখা গেল। জিন্স আর ঢিলেঢালা সোয়েটার পরা, চুলগুলো এলোমেলো হাওয়া খেয়ে উড়ছে, মুখে প্রশস্ত হাসি, হ্যাঁ, ওটাই সমুদ্র! একদম কাছে এসেই সমুদ্র দম নিয়ে বলল,

"হ্যাঁ রে শৈলী! কী খবর? একদম আগের মতোই আছিস তো! এতোদিন পর আসলি! খোঁজ খবর তো নিস না!"

শৈলী কেবল হাসল, ঠোঁটের কোণে একচিলতে ম্লান হাসি।

" ও বাড়ির অবস্থা তো জানোই ভাইয়া! তুমি কেমন আছো বলো তো?"

সমুদ্র হাসিমাখা মুখে বলল,

" যেমন দেখছিস, একদম ঝাকানাকা আছি! নো টেনশন। গতকাল সকিনার সাথে ব্রেকআপ হয়েছে বুঝলি। আজ তোকে বাড়িতে রেখে আবারো সকিনার কাছে যাব। রাগটা ভাঙাতে হবে। এসব ব্রেকআপ আমি মানিনা! শহর থেকে এসব ব্রেকআপ ট্রেকআপ শিখে এসেছে! নইলে আমার ছন্টুমন্টু এসব জানতোই না!"

শৈলী একটু অবাক হয়ে তাকাল সমুদ্রের দিকে। ছেলেটা এতগুলো বছর পরও একইরকম আছে! তার এই প্রাণখোলা কথা, জীবন নিয়ে কোনো বাড়তি ভাবনা নেই, যেন সব কিছুই একটা সহজ খেলাধুলার মতো।

"সকিনা, ওই মেয়ে আবার রেগে গেল কেন?"

শৈলী কৌতূহলী গলায় বলল।

সমুদ্র চোখ ঘুরিয়ে বলল,

"আরে, কী একটা ভুজুংভাজুং কথা বলেছিলাম, ওর ভালো লাগেনি! বলে নাকি, আমি সিরিয়াসলি ওকে নিই না! এইটা কোনো কথা হলো?"

শৈলী এবার খিলখিল করে হেসে উঠল,

" তুমি আর সিরিয়াস! মানুষকে কি ভয় দেখাচ্ছো নাকি ভাইয়া?"

সমুদ্র একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

"এই জন্যই বলি, তুই না থাকলে আমাকে কেউ বুঝতে পারে না!"

কপট রাগ দেখিয়ে আবারো সমুদ্র বলল,

"আচ্ছা, বাদ দে। তুই বল, শহর থেকে এসে কেমন লাগছে?"

শৈলী চারপাশে তাকাল। কুয়াশায় মোড়া সুনামপুর বাজারটা এখনো অনেকটা আগের মতোই আছে, তবু কেমন যেন একটা অদ্ভুত অচেনা ভাব লেগে আছে তার চোখে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

"ভালো লাগছে, আবার কেমন জানি অচেনা লাগছে। মনে হচ্ছে, সময় অনেক বদলে গেছে, অথচ সবকিছু একইরকম আছে।"

সমুদ্র কাঁধে হাত রেখে বলল,

" সময় তো বদলাবেই, রে পাগলি। শুধু আমাদের জায়গা বদলায় না। তাই এখানে ফিরে এলে সবকিছু পুরনো মনে হয়।"

একটা মুহূর্তের জন্য শৈলী চুপ করে গেল। সময় কি সত্যিই বদলে গেছে? নাকি শুধু সে-ই বদলে গেছে?

সমুদ্র হঠাৎ বলল,

"যাই হোক, তুই দাঁড়িয়ে থাকিস না! ব্যাগটা দে, আমি নিয়ে নেই। চল বাড়ি গিয়ে অনেক আলাপ করব। তোকে মা দেখলে কেঁদে ফেলবে নিশ্চিত! আর বাবা তো ফিট খেয়ে পড়ে যাবে। চল, আগে বাড়ি যাই।"

শৈলী একটু হাসল, তারপর ব্যাগটা সমুদ্রের হাতে দিয়ে তার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল। সুনামপুরের বাতাসে তখনো সেই পুরোনো, পরিচিত গন্ধ ভাসছে, নস্টালজিয়ার মতো নরম, অথচ বাস্তবের চেয়েও বেশি জীবন্ত! হাঁটতে হাঁটতেই শৈলীর মনে উঁকি দিল নিশানের মুখটা! লোকটা কি খবর পেয়েছে? সে কি জানতে পেরেছে যে তার হিমরূপা আর তার কাছে নেই! সে এখন বহুদুরে!

~~~★

সূর্যটা একটু একটু দেখা যাচ্ছে। সকালটা কুয়াশামাখা। জানালার ওপাশে আকাশটা ধূসরচাপা, সূর্যের আলো ঝাপসা হয়ে আস্তে আস্তে মাটি ছুঁতে শুরু করেছে। গাছের পাতাগুলো এখনো শিশিরে ভেজা, পাখিরা একে একে ডেকে উঠছে নতুন দিনের সুরে। শহরটা ধীরে ধীরে জেগে উঠছে, কিন্তু নিশানের ঘরে এখনো সুনসান নীরবতা।

নিশান বাথরুম থেকে গোসল করে কেবলই বেরিয়ে এল, ভেজা চুলগুলো হাত দিয়ে এলোমেলোভাবে ঝাঁকিয়ে তোয়ালে দিয়ে মুছতে লাগল সে। আজ খুব তাড়াতাড়ি অফিস যেতে হবে। গুলশানের ফ্যাক্টরির ম্যানাজার আসবে দেখা করতে। আজ একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেই সে। আলমারির দরজা খুলে নিশান একটা কালো শার্ট বের করল, তারপর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে ভেজা চুলগুলো ঠিক করল।

নিশান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে এক মুহূর্তের জন্য নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকাল। চোখে ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু তার চাহনিতে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা। কালো শার্টের বোতামগুলো একে একে লাগাতে লাগাল সে, ভাবলেশহীন মুখে। আজকের দিনটা গুরুত্বপূর্ণ। সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা। ঘরটা নিরব, বাইরের সকালটা ব্যস্ত হয়ে উঠলেও নিশানের ঘরের ভেতর যেন অন্যরকম একটা স্থিরতা কাজ করছে। ঘড়ির কাঁটা দ্রুত এগোচ্ছে, কিন্তু নিশানের মনে হচ্ছে সময় যেন তার জন্য একটু থমকে গেছে। ফ্যাক্টরির ম্যানেজারের সঙ্গে বৈঠক, ব্যবসার ভবিষ্যৎ...এসবই ভাবতে হবে তাকে। কিন্তু কোথাও যেন একটা শূন্যতা ঘুরপাক খাচ্ছে নিশানের ভেতর, অজানা এক অস্বস্তি। নিশান অবশ্য এসব অনুভূতিকে পাত্তা দিল না। হাতে ঘড়িটা পরে নিয়ে পারফিউম স্প্রে করল, তারপর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হলো।

নিশান দ্রুত ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে দরজাটা খুলে বেরিয়ে এল। ঘড়ির কাঁটার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে বুঝল, দেরি হয়ে যাচ্ছে। তাই আর দেরি না করে তাড়াহুড়ো করেই সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগল।

বাড়িটা তখনও একেবারে নিস্তব্ধ নয়। রান্নাঘর থেকে হালকা তরকারির গন্ধ আসছে, হয়তো নাস্তার আয়োজন চলছে। নীচতলার লিভিং রুমে রিমি আর মিমির হাসাহাসির আওয়াজ ভেসে আসছে। কিন্তু নিশান এসবের কিছুতেই মন দিল না। একটাই লক্ষ্য, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বেরিয়ে যাওয়া।

সিঁড়ির শেষ ধাপে পৌঁছে এক ঝলক চারপাশে তাকাল সে, যেন কিছু একটা খুঁজছে। তবে কিছু না পেয়ে আবার দ্রুত পায়ে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। বাইরে গাড়িটা তৈরি আছে কি না, সেটা দেখতেই দরজাটা খুলল সে।

নিশানকে সদর দরজা খুলতে দেখে রান্নাঘর থেকে খাদিজা জোরে হাঁক ছেড়ে ডাকলেন,

" নিশান, কই যাস?"

নিশান জুতা পড়তে পড়তে জবাব দিল,

" অফিসে মা। "

রাশিদা তখুনি হতবাক হয়ে গেলেন,

" বলিস কী? এখনো তো খাস নি তুই? নাস্তা!"

" বাইরে খেয়ে নেব মামনি। আজ একটু তাড়া আছে। তোমরা খেয়ে নিও।"

বলেই নিশান একটুকুও দেরি না করে বেরিয়ে পড়ল।

খাদিজা এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাশিদাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,

" ওই নবাবজাদী কোথায়?"

জুস বানাতে থাকা রাশিদার হাতটা মুহুর্তেই থমকে গেল, স্থির হলো চোখ জোড়া। শৈলীর কথা মনে পড়তেই রিমিও বলে উঠলো,

" আসলেই তো! সকাল থেকে শৈলীপুকে দেখতে পাচ্ছি না! কোথায় গেল?"

মিমিও উৎসুক হয়ে তাকালো জানার জন্য। আজ তারা তিন বোন একসাথে ঘুরতে যাওয়ার প্ল্যান করেছে। এই কারণে তারাও কলেজে যায়নি। অথচ এখন শৈলীকে তারা কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না। মিমি ভেবেছিল, শৈলী হয়তো রান্না ঘরে কাজ করছে। অথচ এখানে এসে সেও তাকে দেখতে পেল না।

রাশিদা এবার আমতা আমতা করে বললেন,

" আসলে শৈলী তো..সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েছে। ওর নাকি কলেজে কি একটা কাজ আছে।"

খাদিজা ভ্রু কুঁচকে বললেন,

" না খেয়ে গেলো? টাকা আছে ওর কাছে? বাইরেও তো খেতে পারবে না!"

রিমি অদ্ভুত দৃষ্টি ফেলল খাদিজার দিকে। কেনো যেন মনে হলো হঠাৎ করেই খাদিজা শৈলীর প্রতি মায়া দেখাচ্ছে। রাশিদা মোটেই মিথ্যে বলতে অভ্যস্ত নন। তার প্রচন্ড অস্বস্তি হচ্ছে। মনের মধ্যে প্রচুর খচখচ করছে। এটা অন্যায় হচ্ছে সেটা তিনিও জানেন। কিন্তু কিছু করার নেই। তিনি একটা শুকনো ঢোক দিলে বলে উঠলেন,

" আমি কিছু জানি না ভাবি। ও সকাল সকাল বেরিয়ে পড়েছে। ওর নাকি অনেক কাজ আছে। আর আজ অনেক দেরি করে বাড়িতে ফিরবে। খাওয়া নিয়ে সমস্যা নেই। আমার কাছে টাকা নিয়ে গেছে, বাইরে খেতে পারবে।"

খাদিজা এবার মুখ কুঁচকে নিজের কাজে মন দিলেন। মিমিও সস্থির সাথে টিভি দেখা শুরু করল। অথচ অসস্তি দেখা গেল রিমির মধ্যে। সে তীর্যক দৃষ্টি ফেলে তাকিয়ে রইল নিজের মা এবং চাচীর দিকে।

রিমি এবং মিমি সমবয়সী হলেও মিমির থেকে রিমির বোধগম্য এবং বোঝার শক্তি অনেক বেশি। তাদের তিন বোনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চালাক হলো রিমি। এমনকি শৈলীও যেসব কৌশল ধরতে পারে না, সেসব কৌশল রিমি অনায়াসে খুব ভালো করেই ধরতে পারে। এই মুহূর্তে তার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় এখন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে তার মা মিথ্যে কথা বলছে। আর এমনিতেও রিমি খুব ভালো করেই জানে শৈলী যদি সকাল সকাল বাড়ি থেকে বেরিয়েও যায়, তাহলে অন্তত তাকে বলে যাবে। কারণ রিমির সাথে শৈলী অনেক বেশি খোলা মনের। আজ পর্যন্ত এমন হয়নি যে শৈলী বাইরে যাওয়ার সময় রিমিকে বলে যায়নি। রিমি যদি কখনো ঘুমিয়েও থাকে, তাও কানের কাছে ফিসফিস করে বলে গিয়েছে, রিমি আমি যাচ্ছি। তাহলে আজ কেনো না বলে চলে গেল? আর এত সকাল সকাল কলেজ! উঁহু! এটাও তো খুব একটা ভালো ইঙ্গিত নয়। আকাশ-পাতাল চিন্তা ভাবনা করে রিমি টিভির দিকে তাকালো। মনে মনে একটু অস্বস্তি দেখা গেলেও নিজেকে বুঝ দিলো যে তার মা মিথ্যা কথা বলতে পারে না। তবে হ্যাঁ, বিকেলের পর যদি শৈলী বাড়িতে না আসে, তাহলে সে এবার সঠিক ব্যবস্থা নেবে। কারণ শৈলী সন্ধ্যের আগেই সব সময় বাড়িতে ফিরে আসে।

~~~~★

নিশান গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত পা চালিয়ে অফিসের ভেতরে ঢুকল। রিসেপশন পেরিয়ে করিডোর দিয়ে এগিয়ে গিয়ে এক দমে নিজের কেবিনে ঢুকে দরজাটা টেনে দিল। কেবিনের ভেতরে ঢুকে চেয়ারটা টেনে নিয়ে ধপ করে বসে পড়ল সে। টেবিলের ওপর রাখা ল্যাপটপটা খুলে সঙ্গে সঙ্গেই স্ক্রিনে চোখ রাখল। আজ অনেক কাজ বাকি, এক মুহূর্তও নষ্ট করা চলবে না।

কীবোর্ডে আঙুল চালিয়ে দ্রুত মেইল চেক করতে লাগল নিশান। ফ্যাক্টরির ম্যানেজারের মেসেজ এসেছে, কিছু জরুরি কাগজপত্র তৈরি রাখতে বলেছে। নিশান এক দমে সবগুলো খুঁজে বের করে প্রিন্ট করার নির্দেশ দিল। চোখেমুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট, যেন আজকের মিটিংটা তার জন্য বিশেষ কিছু।

হঠাৎ দরজায় নক পড়লো। নিশান এক পলক তাকিয়ে বলল, " কাম ইন!"

গম্ভীর মুখ নিয়ে ভেতরে ঢুকলো আকাশ। নিশান অবাক হয়ে তাকালো তার দিকে। বাঁকা হেসে তাচ্ছিল্য করে বলল,

" আরেহ বাহ! এটা কে? আকাশ নাকি? তুই আবার কবে থেকে আমার কেবিনে নক করে ঢোকা শুরু করেছিস!"

" আজ থেকেই করলাম। ফর্মালিটিস তো সবার জন্যই!"

বিষাদ মুখে আকাশ বলেই সে ভেতরে ঢুকে দরজাটা আস্তে করে বন্ধ করল। সাধারণত তার মুখে সবসময় হাসি লেগে থাকে, উৎফুল্ল চেহারা যেন তার স্বাভাবিক পরিচয়। কিন্তু আজকে? নিশান ভালো করেই লক্ষ্য করল, আকাশের চোখেমুখে কোনো উচ্ছ্বাস নেই, কণ্ঠে কোনো প্রাণ নেই। গাম্ভীর্য ছাপিয়ে যাচ্ছে পুরো ব্যক্তিত্বে। কপালের মাঝখানে ভাঁজ পড়েছে, ঠোঁট শক্তভাবে চেপে রাখা। যেন কোনো গভীর চিন্তার জালে আটকে আছে সে। নিশানের দিকে একবার তাকিয়েই সরিয়ে নিল দৃষ্টি, যেন কোনো ভাবনা তাকে ঘিরে রেখেছে, কিন্তু সেটা প্রকাশ করবে না।

নিশান ভ্রু কুঁচকে তাকাল, কৌতূহলী গলায় বলল,

" কী হয়েছে তোর? আজ কি তোর মাদারবোর্ডের সার্ভিসিং করিয়ে নিয়েছিস? এমন মুখ গোমড়া করে আছিস কেনো?"

আকাশ এক মুহূর্ত চুপ করে থাকল, তারপর ঠান্ডা কণ্ঠে বলল,

" না, এমনিতেই। কাল রাতে খুব মাথা ব্যাথা ছিল তো! ঘুম হয়নি!"

স্বভাবসুলভ ঠাট্টা-তামাশার কোনো ছোঁয়া নেই তার কণ্ঠে। কোনো রসিকতাও নেই। আজ তার মধ্যে এক ধরনের ভারী নীরবতা ছড়িয়ে আছে, যা নিশানকে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলল। আজ পর্যন্ত নিশান আকাশকে এত কম কথা বলতে দেখেনি। আগে হলে তো ভেতরে ঢুকে বকবক করা শুরু করে দিত। একদম ইতিহাসের প্রথম থেকে রচনা করে প্রবন্ধ লিখে ফেলে বর্তমান পর্যন্ত টেনে আনতে সক্ষম আকাশ। অথচ আজ কথাই বলছে না। নিশানের তীরের ন্যয় দৃষ্টি আকাশের দিকে। কিছুক্ষণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থেকে নিশান বললো,

" সারারাত ধরে মেয়েদের সাথে পিরিতের আলাপ করলে তো মাথা ব্যথা করবেই! বোস।"

আগে হলে নিশানের এমন কথার তীব্র প্রতিবাদ করত আকাশ। অথচ তাকে অবাক করে দিয়ে আকাশ চুপচাপ বসে পড়ল চেয়ারে, হাতে থাকা ফাইলটা এগিয়ে দিল নিশানের দিকে। নিশান সরু চোখে একবার তাকিয়ে ফাইল টা হাতে নিল।

নিশান ফাইলের ওপর হাত বোলাতে বোলাতে বলল,

"গুলশানের ফ্যাক্টরি নিয়ে কী অবস্থা? ম্যানেজারের সাথে মিটিং ঠিক আছে তো?"

আকাশ সামান্য গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,

"হ্যাঁ, ওরা আজ দুপুরের মধ্যেই চলে আসবে। আগের প্ল্যান মতোই চলছে সব। কিন্তু... "

নিশান এক দৃষ্টিতে তাকাল আকাশের দিকে,

"কিন্তু কী?"

আকাশ এবার একটু গম্ভীর স্বরে বলল,

"ম্যানেজার সোহেল সাহেব কিছু শর্ত যোগ করতে চাচ্ছেন। তিনি চান, আগামী ছয় মাসের মধ্যে উৎপাদন দ্বিগুণ করতে হবে, নইলে ওরা কন্ট্রাক্ট রিনিউ করবে না।"

নিশান ঠান্ডা কণ্ঠে বলল,

"এটা তো আগে থেকে বলা হয়নি। এখন হঠাৎ করে এই অতিরিক্ত চাপ কেন?"

"বলছে, কোম্পানির গ্রোথ বাড়ছে, প্রতিযোগিতা বাড়ছে। আমাদেরও বাড়াতে হবে। নাহলে ওরা অন্য ক্লায়েন্টের দিকেও যেতে পারে।"

নিশান ঠোঁট চেপে ধরে ফাইলের পৃষ্ঠা উল্টাতে লাগল।

"আমরা কি পারব এত দ্রুত প্রোডাকশন বাড়াতে?"

আকাশ মাথা নাড়িয়ে বলল,

"শ্রমিক বাড়ালে সম্ভব, কিন্তু তার জন্য বাজেট বাড়াতে হবে। আর নতুন মেশিনারির কথাও ভাবতে হবে।"

নিশান কিছুক্ষণ চিন্তিত মুখে ফাইলের তথ্যগুলো দেখল, তারপর গভীর স্বরে বলল,

"ম্যানেজারের সাথে আগে মিটিং করি, তারপর দেখি কী করা যায়। আমাদের পক্ষে কতটুকু সম্ভব, সেটা ওদের বুঝিয়ে বলতে হবে।"

আকাশ মাথা ঝাঁকাল, কিন্তু তার চোখেমুখে সেই অদ্ভুত ভারী ভাবটা এখনো রয়ে গেছে। নিশান সেটা লক্ষ্য করল, কিন্তু আপাতত অফিসের আলোচনাতেই মনোযোগ দিল। আরো কিছুক্ষন পর্যবেক্ষন করে নিশান ফাইলটা বন্ধ করে আকাশের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল,

"ঠিক আছে, দুপুরে মিটিং শুরু করার ব্যবস্থা কর তুই। ম্যানেজার আসার আগে সব ডকুমেন্ট রেডি করে রাখিস, যাতে কোনো ঝামেলা না হয়।"

আকাশ ফাইলটা নিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বলল,

"ঠিক আছে।"

নিশান এবার ভ্রু কুঁচকে আকাশের দিকে তাকাল।

"আর কিছু বলবি?"

আকাশ এক মুহূর্ত নিশানের দিকে তাকিয়ে থাকল, যেন কিছু বলতে চাইছে, কিন্তু পরক্ষণেই মাথা নাড়িয়ে বলল,

"না, আর কিছু না। আমি তাহলে যাই।"

নিশান হালকা গলায় বলল,

"হুম, যা!"

আকাশ কোনো উত্তর না দিয়ে চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল, তারপর নীরব পায়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল। নিশান কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল, আকাশের অদ্ভুত মনমরা ভাবটা তার নজর এড়ায়নি। তবে এখন সে এসব নিয়ে ভাববে না। সামনে কঠিন মিটিং, আগে সেটা সামলাতে হবে।

হঠাৎ করেই আকাশের চলন্ত পা দুটো থেমে গিয়ে আবারো পিছনে ঘুরে নিশানের কেবিনে এসে থামলো। নিশান ফোন নিয়ে কিছু একটা করছিল খট করে আবারো দরজা খোলার শব্দে চোখ তুলে তাকালো, আকাশকে দেখে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলল,

" কী?"

আকাশ এবার ঠোঁট ভিজিয়ে মুচকি হেসে বলল,

" নিশান... তোকে অভিনন্দন জানাতে এলাম। কংগ্রাচুলেশনস!"

নিশানের গোটানো ভ্রু আরো গভীর হলো,

" ফর হোয়াট?"

আকাশ বাঁকা হেসে বলল,

" ফর ইউর ফ্রিডম এন্ড নিউ আম্যাজিং লাইফ।"

( For your freedom and new amazing life!")

বলেই এক মুহুর্তে না দাঁড়িয়ে বেরিয়ে গেল আকাশ।

নিশান খানিক ভ্রু কুঁচকে থেকে আকাশের কথাটা রীতিমতো উড়িয়ে দেয়, বিড়বিড় করে বলে,

" পাগল! "

অথচ নিশান নামক লোকটা বুঝতেই পারল না যে আকাশ তার আগাম কিছু একটার ইঙ্গিত দিয়ে গেল। সে ধরতেই পারল না যে সে যেটা এখন পর্যন্ত জানে না, তা আকাশ জানে। অনেক আগে থেকেই জানে।

~~~★

সুনামপুর গ্রামটা আসলেই খুব সুন্দর৷ সারি সারি তালগাছ, খেজুর গাছের ফাঁক দিয়ে রোদের আলোর সরলরেখা মাটিতে আঁচড় কাটছে। টলটলে খালের জলে আকাশের নীলিমা মিশে গেছে, দু-একটা মাছ পানিতে লাফ দিয়ে আবার ডুব দিচ্ছে। মাঠের ধারে বাঁশঝাড়ের পাতাগুলো বাতাসে দোল খাচ্ছে, পাখিরা সেই বাঁশের ডগায় বসে কলকাকলি করছে। কোথাও গরুর গাড়ির চাকার শব্দ, কোথাও কৃষকদের আনন্দভরা হাসির সুর, সব মিলিয়ে এক শান্ত, স্নিগ্ধ সকাল।

গ্রামের এক ধুলোমাখা মাঠের ঠিক মাঝখানে শৈলী একা বসে আছে। সুনামপুর গ্রাম এখন প্রকৃতির ছোঁয়ায় এক অন্য রূপ ধারণ করেছে। আকাশজুড়ে মেঘের আনাগোনা, কখনো কালো, কখনো ধূসর, কখনো আবার সাদা তুলোর মতো ছড়িয়ে আছে। হালকা বাতাস বইছে, তার সঙ্গে মিশে আছে ভেজা মাটির ঘ্রাণ। দু-এক জায়গায় জমে থাকা বৃষ্টির পানিতে আকাশের ছায়া প্রতিফলিত হচ্ছে, আর হাঁসের দল সেই পানিতে নেমে ডানা ঝাপটাচ্ছে। কাঁচা রাস্তার দুপাশে থইথই জল, কোথাও কোথাও কাদার স্তর গাঢ় হয়ে গেছে, পথচারীরা সাবধানে চলাফেরা করছে।

ফসলের ক্ষেতগুলো আরও সবুজ হয়ে উঠেছে। ধানের চারা জলে ডুবে মাথা উঁচিয়ে আছে, পাটগাছগুলো একদম তরতরিয়ে বেড়ে উঠেছে। মাঠের এক কোণে, যেখানে বৃষ্টির পানি জমে ছোট্ট একটা জলাশয়ের মতো তৈরি হয়েছে, সেখানেই শৈলী বসে আছে। সে একদৃষ্টিতে সামনের দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন কল্পনার মাঝে হারিয়ে গেছে।

বাতাস মাঝে মাঝে একটু জোরে বইলে গাছের পাতাগুলো দুলে ওঠে, আর মাঠের ওপাশে থাকা বেতের ঝাড়গুলো একসঙ্গে নড়েচড়ে ওঠে। একটু দূরে ছোট্ট কুঁড়েঘরের চাল দিয়ে বৃষ্টির ফোঁটা টুপটাপ পড়ে, কোথাও কোথাও খড়ের ছাউনি বৃষ্টিতে ভিজে গাঢ় বাদামি হয়ে গেছে।

শৈলী উদাস দৃষ্টিতে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। যেন সময় এখানে থমকে গেছে, যেন চারপাশের প্রকৃতি তার মনের শূন্যতার সঙ্গী হয়ে গেছে। একসময়ের চেনা গ্রাম, চেনা মাঠ,সবকিছু কেমন যেন বদলে গেছে, অথচ একই রকম আছে। মানুষ বদলায়, অনুভূতি বদলায়, কিন্তু প্রকৃতি? প্রকৃতি কি বদলায়? এই ক্ষেত, এই বাতাস, এই আকাশ কি আজও তার অপেক্ষায় ছিল?

শৈলী গভীর শ্বাস নিয়ে চারপাশে চোখ বোলায়, একপাশে তালগাছের নিচে একটা ছেলে গরু চরাচ্ছে, আরেক পাশে একদল কিশোরী নদীর ঘাটে হাঁস নিয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোনো কোলাহল নেই, কেবল প্রকৃতির নিজের সুর বাজছে। শৈলী বুঝতে পারে, এই জায়গা তাকে শান্তি দেয়, অথচ আজ তার মন যেন আরও বেশি অস্থির হয়ে উঠছে।

শৈলী হাতের তালুতে থুতনি রেখে বসে থাকে, ঘাসের উপর তার পায়ের পাতায় কাদা লেগে আছে, কিন্তু সে খেয়াল করছে না। চারপাশের সবকিছু ভিজে, তবু তার মনের মধ্যে এক শুষ্ক শূন্যতা যেন বয়ে চলেছে। এই নির্জন, শান্ত বর্ষার প্রকৃতির মাঝেও তার মনে ঝড় বইছে।

শৈলী নিজের ভাবনায় এতটাই ডুবে ছিল যে, পেছন থেকে আসা পায়ের শব্দ টেরই পায়নি। আচমকা পাশে বসার শব্দে সে চমকে তাকাল। দেখল, তার মামি রাহেলা বানু পাশে বসেছে, একজন প্রকৃত গ্রাম্য নারী, যার মুখে সারাজীবনের পরিশ্রমের ছাপ পড়ে আছে, তবু হাসির রেখা কখনো মলিন হয়নি।

রাহেলার পরনে লালপাড় নীল রঙের ছাপা শাড়ি, পাড়টা কাঁধে একপাশে গুঁজে রাখা, ভেজা আঁচল কোমরে পেঁচিয়ে বসেছেন। শরীরের গায়ের রঙ মেহেদির মতো টকটকে শ্যামলা, চোখদুটো ছোট ছোট কিন্তু মায়াময়, গভীর। চুল পিঠে ছড়ানো, কিছুটা এলোমেলো, হয়তো ঘরকন্নার কাজের ব্যস্ততায় বেঁধে উঠতে পারেননি।

পাশেই একটা কলাগাছের পাতার ওপর হাত রেখে বসলেন রাহেলা, মাটিতে পা ছড়িয়ে দিয়ে। তাঁর চেহারায় এক অদ্ভুত প্রশান্তি, অথচ গলার স্বরে সহজ-সরল এক গ্রাম্য স্নেহ ঝরে পড়ল,

"এতক্ষণ ধরে চুপচাপ বইসা আছিস কেন রে! মনডা কাহিল হইছে বুঝি?"

শৈলী হালকা হাসল, কিছু বলল না। রাহেলা তার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে নরম গলায় বললেন,

"বৃষ্টি হইলে ধুলা থাহে না, কিন্তু মনডা ভারি লাগে। জানি না ক্যান, আমারও আজ কেমন জানি লাগতাছে...."

তারপর একটুখানি নড়েচড়ে বসলেন তিনি, গায়ের শাড়িটা আরেকটু ঠিক করলেন, তারপর মাঠের দিকে তাকিয়ে বললেন,

" দ্যাখ, ধানগাছগুলা কেমন তাজা হইয়া উঠছে! আল্লাহ, এইবার ফসলডা ভালো অইলে বুঝবি খুশির দিন!"

শৈলী চুপচাপ শুনতে থাকল, রাহেলার কথাগুলো যেন হালকা বাতাসের মতো তার মনের ভার কমিয়ে দিচ্ছে। বর্ষার প্রকৃতির মতোই, এই গ্রাম্য নারীর সহজ-সরল কথার মধ্যেও একটা শান্তি লুকিয়ে আছে যেন।

শৈলীকে এখনো নীরব থাকতে দেখে রাহেলা এবার তাকে বাহু দিয়ে ঠেলে জিজ্ঞেস করে,

" কীরে? তোর হইছে কী? তহন থিকা বইসা আছোস!"

মিষ্টি হেসে শৈলী মাথা নেড়ে বলে,

" কিছু না মামি, কিছু হয়নি!"

ব্যাঙ্গ করে রাহেলা মুখ বাঁকালেন,

" এহ! আমি মনে হয় কিছু বুঝিনা। আইছে! আচ্ছা শোন তো, তোর মামা বাড়িত নাই। এহন ক, তুই হঠাৎ কইরা গ্রামত আইলি কেন? তোর বাপ না অসুস্থ! "

শৈলী কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। রাহেলার প্রশ্নের জবাব দেওয়ার মতো ভাষা যেন খুঁজে পাচ্ছিল না। রাহেলা চোখের এক ঝলকেই শৈলীর সব বুঝতে পারেন। শৈলীর মুখের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে রাহেলা এবার গলার স্বর একটু নরম করলেন,

"বুঝছি, তুই কিছু লুকাইতেছোস... কইবি না?"

শৈলী শুকনো হাসল, তারপর মুখ ফিরিয়ে সামনের মাঠের দিকে তাকিয়ে বলল,

"কিছু লুকানোর নেই মামি, আসলে...তেমন কিছুই না। আসলে একটু শান্তি দরকার ছিল। তাই চলে এলাম।"

রাহেলা মৃদু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

"শান্তি! হ, শান্তি লাগে। কিন্তু শান্তি কি আর এমনে পালাইয়া পাওয়া যায় মা?"

তার গলার স্বরে অভিজ্ঞতার ছাপ। যেন জীবনের অনেক উত্থান-পতন দেখে এসেছেন, তাই শৈলীর এই নীরব ছুটে আসা তার কাছে অচেনা নয়। তিনি একটু থেমে শৈলীর মাথায় হাত রাখলেন,

"তোদের শহরের মানুষজন না, একটু কষ্ট হইলেই শান্তি খুঁজতে দৌড় দেয়। আমার মত গেঁয়ো মাইয়া কি কই! আমাগো জীবনেই তো কষ্ট, তবুও সব সইয়া থাকতে হয়!"

শৈলী এবার মাথা নামিয়ে ফেলল। মামির কথাগুলো যেন তার হৃদয়ের গোপন কষ্টটাকে আলতো করে ছুঁয়ে দিল। রাহেলা আবার তার স্বভাবসুলভ রসিকতায় ফিরে এলেন,

"যাই হোক, তুই তো আইছোস, তোর খাওনদাওনের একটু ব্যবস্থা করতে হবে! তোর মামা নাহলে পরে যা কথা শোনাবে! বাঁধাকপির চপ বানাইছি, তোর মেলা পছন্দের, মনে আছে?"

শৈলী একটু হাসল,

" আছে মামি, সব মনে আছে।"

" এহন, বাড়িত চল! এইনে বইসা থাইকা কোনো লাভ নাই! চল !"

শৈলী এক মুহূর্ত রাহেলার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। মামির সহজ-সরল ভালোবাসার ছোঁয়াটা যেন মনের ভেতর কোথাও গিয়ে লাগছে। এই গ্রাম, এই মানুষগুলো... সবকিছুই তার ছোটবেলার মতো আছে, শুধু সময় বদলে গেছে, আর হয়তো সে নিজেও।

রাহেলা ততক্ষণে তার গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। শৈলীর হাত ধরে টান দিয়ে বলল,

"উঠ, মা! এই রাস্তায় বইসা থাকলে কী লাভ? বাড়ি চল! গরম গরম চপ দিমু, দেখি কতগুলা খাইতে পারস!"

শৈলী একরকম বাধ্য হয়েই উঠে দাঁড়াল। মামির কণ্ঠের আদর মাখা রসিকতায় একটু হেসেও ফেলল।

"বাঁধাকপির চপ কিন্তু তোমার হাতে বেশি মজার হয় মামি!"

রাহেলা গর্বিত ভঙ্গিতে মাথা ঝাঁকালেন,

"এ তো আর বলতেই হবে! চল, কয়েকটা বড়ইও তো পাইরাই রাখছি, চপের লগে দিবো!"

শৈলী ধীর পায়ে রাহেলার সঙ্গে হাঁটা ধরল। বর্ষার কাদা মাখা পথ, চারপাশে সবুজ ধানের ক্ষেত, আর দূরে কোথাও মৃদু ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ছে। এই গ্রাম, এই নিস্তব্ধ প্রকৃতি.....একটুখানি হলেও যেন মনে প্রশান্তির ছোঁয়া দিল।

চলবে..........

★ ছোট পর্বের জন্য দুঃখীত😓 আমি একটু দুশ্চিন্তায় আছি। দোয়া রাখবেন। আগামীকাল আসবে। একটা হিন্টস দিই, গ্রামে প্রেম ভালো জমে!👀❤️ নিশান গ্রামে চলেও আসতে পারে🤧

আর হ্যাঁ, আমি আঞ্চলিক ভাষা সম্বন্ধে একটুও অবগত নই। তাই আঞ্চলিক ভাষাতে ভুল গেলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন