ফন্ট সাইজ:
থিম:
হিমরূপার উষ্ণছোঁয়া

৩য় পর্ব

লেখক: অনামিকা তাহসিন রোজা

#হিমরূপার_উষ্ণছোঁয়া

#পর্ব_৩

#কলমে_অনামিকা_তাহসিন_রোজা

টকটকে লাল রঙের গোলাপ ফুল, বেলী ফুল, গন্ধরাজ আর রজনীগন্ধা দিয়ে সাজানো হয়েছে নিশানের ঘরটা। শৈলী লামিয়াকে ঘরে দিয়ে যেতে এসে এমন ফুলের সমাহার দেখে থমকে গেল মুহুর্তেই। এবার না চাইতেও চোখের কোণ থেকে ছিটকে অশ্রুকণা বেরিয়ে পড়ল। নিচের ঠোঁট কাঁমড়ে ধরে কান্না আটকে খুব সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে ঘরটা দেখে নিল শৈলী। কত সুন্দর করে সাজানো হয়েছে ঘরটা! ফুলের গন্ধে মো মো করছে। রিমি ছাড়া কেওই লক্ষ্য করল না শৈলীর অবস্থা টা। এদিকে শৈলী আবার নিজ হাতে সাজিয়ে দিয়েছে লামিয়া কে। গোলাপি শাড়ি টা ইচ্ছে করে ঢিলেঢালা করে পড়িয়ে চুল বেঁধে দিয়েছে, লিপস্টিক না দিয়ে হালকা চ্যাপস্টিক দিয়েছে। মনের মত করেই সাজিয়েছে সে। লামিয়াকে ঘরে আনতেই মিমি লাফিয়ে উঠে ওর হাত ধরে বলল,

—" দেখো তো, নতুন ভাবি, ঘর পছন্দ হয়েছে? সুন্দর করে সাজিয়েছি। বিছানায় ফুল দিইনি, শুধু একটু পাপড়ি ছিটিয়েছি, কেমন হয়েছে বলোতো?"

— " খুব সুন্দর! "

নরম স্বরে বলল লামিয়া। তার চোখে সত্যিই প্রশংসা, প্রশ্রয়, যেন এ ঘর, এই ফুল, এমনকি এই পরিবারটাও কিছুটা নিজের মনে হচ্ছে তার। কিন্তু পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা শৈলীর বুকের ভেতর ঠিক তখনই আবার যেন কিছু একটা গুঞ্জন তুলল। এই 'সুন্দর' শব্দটার মধ্যে কী যেন লুকিয়ে থাকে, যা শৈলীর কাছে বড় বেশি নির্মম। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে, চোখ সরিয়ে নিচ্ছে ঘরের প্রতিটি কোণ থেকে, যেন কোথাও তার কোনো স্মৃতি পড়ে আছে, ধূলার নিচে চাপা পড়ে যাওয়া কিছু মুগ্ধতা, আর কিছু অবুঝ অপেক্ষা, যেগুলো আর কোনোদিন নিশানের বিছানার ফুলের গন্ধে গাঁথা হবে না।

মিমি আবারও কথা বলে উঠল,

—" ভাবি, তুমি জানো? এই ঘরটা আমাদের নিশান ভাইয়ের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। উনি এখানে একা থাকতেই পছন্দ করেন। কেউ ঢুকলে খুব রাগ করে। কিন্তু আজ তোমাকে নিজের হাতে এনে এই ঘরে ঢুকার অনুমতি দিয়েছে। ভাবতেই কেমন ভালো লাগছে, তাই না রিমি?"

রিমি কিছু বলল না, শুধু চুপচাপ শৈলীর দিকেই তাকিয়ে রইল। শৈলীর চোখ তখন ঘরের মাঝখানে রাখা ফুলের রাজ্যের ভিতরের সাদা বিছানাটার দিকে, ফুলের পাপড়িতে ঢাকা, কোমল আর সুন্দর। কিন্তু তার চোখে সেটার কোনো সৌন্দর্য নেই, বরং কেবল একটুকরো অপরিচিত যন্ত্রণা। তবুও সে ভাঙা গলায় হাসল। জোর করেই হাসল। তারপর ধীরে এগিয়ে এসে লামিয়ার কানে ফিসফিস করে বলল,

—" আপনি এ ঘরের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসটা এখন। যত্নে থাকবেন, আর, যত্নে রাখবেন। নিশান ভাইয়ের মনটা কখনো ভাঙবেন না। টেবিলে দুধের গ্লাস রাখা আছে। একটু পর মামনি আসবেন, উনি আপনাকে সবকিছু বুঝিয়ে দেবেন। "

কথাটা বলে একটুও দেরি না করে পেছন ফিরে হাঁটা দিল শৈলী। একটুও কারো মুখ না দেখে মাথা নিচু করে বের হলো সেই ঘর থেকে। তাকে থামানোর মতো সাহস সবারই যেন হারিয়ে গেছে। তার লাল ওড়না উড়ে গেল বাতাসে। কিছু তো রেখে যাওয়া গেল না, শুধু দীর্ঘশ্বাস টাই ফেলে গেল শৈলী।

রিমি বুঝে উঠতে পারল না, এই ঘরটা সাজানো হলো কার জন্য, আর কাঁটা হয়ে রইল কার ভিতরে। সে শুধু কাতর চোখে তাকিয়ে রইলো দরজা টার দিকে। রিমি আসলেই কখনো ভাবেনি এই দিনটা দেখতে হবে। কখনোই না।

°°°°°°°°°°°

নিজের ঘরে না গিয়ে নিচে নেমে বাগানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল শৈলী। একটু পরেই হয়তো নিশান চলে আসবে। সবাই তখন তাদেরকে নিয়ে মেতে উঠবে। ওসব দেখার ক্ষমতা নেই শৈলীর। তার থেকে বাগানে গিয়ে নিশান ভাইয়ের গোলাপ গাছগুলোর পাশে বসে থাকা ভালো। চোখের পানি মুছে গায়ে থাকা চাদরটা ওড়নার মত করে নিয়ে সদর দরজা পার হওয়ার জন্য পা বাড়ালো শৈলী। কিন্তু সদর দরজা খোলার সাথে সাথে থমকে দাঁড়ালো মস্তিষ্ক। নিশান কেবলই কলিং বেল চাপতে যাচ্ছিল, কিন্তু হুট করে কলিং বেল চাপার আগেই দরজা খট করে খুলে যেতে চমকে তাকিয়েছে সেও। চোখে চোখ পড়ে গেল দুইজনের, একটা মুহূর্ত যেন সময়ের বাইরে দাঁড়িয়ে গেল। বাহিরের বাতাস থেমে রইল, ল্যাম্পপোস্টের আলো নিঃশব্দে ঝিমিয়ে পড়ল, আর নিশান.. নিশান তাকিয়ে রইল সেই মেয়েটার দিকে, যে একদিনও তাকে "আমি আপনাকে ভালোবাসি" বলেনি, তবু সেই চোখ দুটো এত বছর ধরে নিশানের সমস্ত নির্জনতাকে সঙ্গ দিয়ে এসেছে।

শৈলীর ওড়নার কোণটা হালকা বাতাসে উড়ছিল, চোখ দুটো লাল হয়ে আছে কান্নায়, আর ঠোঁটে চাপা একটা ক্লান্ত বিষাদের হাসি। এই হাসির মানে বুঝে নিতে নিশানের একটুও সময় লাগল না, এটা বিদায়ের হাসি, হার মেনে নেওয়া এক মেয়ের হাসি।

শৈলী নিশানকে খুব ভালো করে দেখল, চোখের মণিটা স্থির রেখে গলা স্বাভাবিক করেই নিত্যদিনের মত বলে উঠলো,

—" আপনি এসেছেন?"

নিশান কিছু বলল না, শুধু তাকিয়ে রইল। নিজের মধ্যেই দ্বিধা করছে সে, কী বলবে? কাকে বলবে? এতদিন যেভাবে ধমক দিয়ে বলেছে," হ্যাঁ আমি এসেছি, দেখতে পাচ্ছিস না? যা এক কাপ কফি নিয়ে আয়! " সেভাবে কি আজও নিশানের বলা উচিত?

শৈলী এবার চোখ নামিয়ে নিল, তারপর বলল,

—" ঘরে যান। সবাই আপনার অপেক্ষায় আছে নিশান ভাই। ভাবি তো এসেই গেছে আপনার ঘরে, ওনার একা লাগবে। পাঞ্জাবি রিমির ঘরে রাখা আছে। পড়ে নিবেন।"

শব্দগুলো কাঁটার মতো বিঁধে গেল নিশানের বুকের গভীরে। চোখ খিঁচে বন্ধ করে মেঝেতে নজর রাখল নিশান। সে জানে, এই মেয়ে, এই চুপচাপ, নরম অথচ অসহ্য রকম শক্ত মেয়ে, যাকে সে কখনো ছুঁয়ে বলে উঠেনি কিছু, সে ভেঙে গেছে, নিঃশব্দে, তার চোখের সামনেই। অতিরিক্ত আঘাতে মানুষ পাথর হয়ে যায়।

নিশানকে কথাটা বলেই শৈলী পাশ কাটিয়ে বের হতে চাইলে নিশান শুষ্ক কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,

—" কোথায় যাচ্ছিস তুই?"

শৈলী একটু চমকে তাকালো, তারপর ঠোঁটে আবার সেই সুন্দর হাসি এনে বলল,

—" একটু বাগানে যাচ্ছি। তবে যেখানেই যাই, আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন নিশান ভাই, আমি পালিয়ে যাব না, আপনার বাড়ির মান-সম্মান ভাঙবো না তো!"

নিশান ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইলো,

—" খোঁটা দিচ্ছিস তুই আমায়? "

শৈলী তৎক্ষনাৎ দুদিকে মাথা নেড়ে বলল,

—" বালাইষাট, আপনাকে খোটা দেব কেনো? আমি তো নিজের কথা বলছিলাম। আমি একটু বাগানে যাব। আপনি একটু তাড়াতাড়ি ঘরে যান। নতুন ভাবি একা অনেকক্ষণ আছে!"

নিশান এবারো কিছু না বলে ভ্রু কুঁচকে থাকলে শৈলী এবার নিচে তাকিয়ে দরজার পাশ দিয়ে একটু সরে দাঁড়াল, একটা হাত দিয়ে দরজা ঠেলে পুরোটা খুলে দিল নিশানের জন্য। তারপর নিচু গলায় বলল,

—" ভিতরে যান নিশান ভাই। নতুন বউয়ের জন্য ঘরটা খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। বিছানায় ফুল ছড়ানো, আপনার পছন্দ হবে। "

বলেই শৈলী এই প্রথমবার নিশানকে গ্রাহ্য না করে সদর দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে এলো। শব্দগুলো নিশানের হৃদয়ে কাঁমড় বসালো। সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো ওর লম্বা চুলগুলোর দিকে। মেয়েটা আজ চুল বাঁধেনি কেনো? এ তো বহুত মুশকিল বিষয়! এভাবে চুল না বেঁধে নাচতে নাচতে বাইরে যাচ্ছে ও? হিংসা হচ্ছে মনে হয় নিশানের! চাঁদের আলো গায়ে পড়ে একটুও উজ্জ্বল লাগছিল না। শৈলী নিচের দিকে হাঁটতে থাকল, নিঃশব্দে, অথচ তার প্রতিটি পদচিহ্নে নিশানের বুক ধক ধক করে উঠছিল। এগিয়ে গিয়ে শৈলী ডানে ফিরে বাগানের দিকে যেতেই চোখ নামালো নিশান। দাঁড়িয়ে রইল পাথরের মতো। তার গলা শুকিয়ে গেছে। সে কোনো শব্দ খুঁজে পাচ্ছে না।

নিশান দাঁড়িয়ে রইল দরজার ফ্রেমে হেলান দিয়ে, আর ভেতরে একটা অদৃশ্য কণ্ঠ ফিসফিস করছিল,

—" তুই নিজের সবকিছু খুইয়ে ফেলেছিস..আজ! "

নিশান বাঁকা হাসলো। সে আবিষ্কার করতে পারল সে আজ কী কী হারিয়েছে। প্রতিদিন সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পর শৈলীর তাড়াহুড়ো করে দরজা খুলে দেয়া, দ্রুতগতিতে নিশানের জন্য খাবার তৈরী করা, কফি নিয়ে ঘরে যাওয়া, নিশানের কাপড় ধুয়ে দেয়া, মাথা টিপে দেয়া, আজকের দিন কেমন গেল জিজ্ঞেস করা— সবকিছু, সবকিছু হারিয়েছে নিশান।

°°°°°°°°°°°°

ঘরের আলো-শব্দ থেকে বহু দূরে তালুকদার বাড়ির এক কোণে ছায়ায় মোড়া বাগানটা যেন শৈলীর জন্য আশ্রয় হয়ে রইল। তার চেনা জায়গা, চুপচাপ গা ঢাকা দিয়ে থাকা নিশান ভাইয়ের লাগানো গোলাপগাছগুলোই তো তার ছোট্ট গোপন পৃথিবী। সে ধীরে ধীরে গিয়ে বসল একপাশে, ঠিক যেখান থেকে লাল গোলাপগুলো দেখা যায় কাছ থেকে। আজ মনে হয় ফুলগুলোও তাকে করুণা করছে। নিস্তব্ধ চারপাশ, কেবল হালকা বাতাসে গোলাপের পাপড়িগুলো দুলে উঠছে, ঠিক তার হৃদয়ের মতো, কাঁপছে, নিঃশব্দে ভাঙছে।

শৈলী চোখ তুলে তাকালো গোলাপের দিকে। নিশানের খুব প্রিয় এই লাল গোলাপ, যা সে প্রতিদিন পানি দিয়ে আগলে রেখেছে, একেকটা কাঁটাও যত্ন করে ছেঁটে দিয়েছে শৈলী নিজ হাতে। আজ সেই ফুলের পেছনে যার ছায়া ছিল। সেই মানুষটা তার সামনে দাঁড়িয়ে, অথচ শৈলী তাকে ছুঁয়ে বলতেও পারেনি,

—" আপনি কেনো এমন করলেন নিশান ভাই? এতকিছু বোঝেন, অথচ আমার চোখদুটোর ভাষা বুঝতে পারলেন না?"

শৈলী ঠোঁট কামড়ে ধরে কান্না আটকে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করল। কিন্তু পারল না। চোখ বেয়ে নেমে এলো জল। চুপচাপ, শব্দহীন, অথচ তীব্র। সে মাথা নিচু করে দুই হাঁটুর ফাঁকে মুখ লুকিয়ে বলল ফিসফিস করে,

—" আপনি আমায় একটিবারও থামাননি, নিশান ভাই। একটিবারও বলেননি যে আমি ভুল ভাবছি। একটিবারও বলেননি যে, আমি ভালোবাসতে পারি আপনাকে, আপনি জানতেন, সব জানতেন, তবু চুপ ছিলেন, কেনো ছিলেন এমন?"

হঠাৎ করে শৈলী যেন দম আটকে কান্না চাপতে না পেরে মুখ তুলে তাকালো আকাশের দিকে, চোখ দুটো লাল, আর ঠোঁটটা ফেটে যাচ্ছে কান্না চেপে রাখার চেষ্টায়। শৈলী নিজের মত করে ভাবতে থাকলো, নিশান এখন ঘরে ঢুকবে, নতুন বউটার মুখ দেখবে, তাকে ছুঁয়ে দেখবে, আদর করবে, তারপর...? আর ভাবতে পারলরনা শৈলী। সে হাত বাড়িয়ে একটা গোলাপ তুলতে গেল, তখনই কাঁটা বিঁধে গেল আঙুলে। কাঁচের টুকরো লেগে কেটে যাওয়া আবারো সেই একই জায়গায় কাঁটা বিঁধে টকটকে লাল রক্ত বেরিয়ে এসে গড়িয়ে পড়ল।

শৈলী মৃদু কণ্ঠে ফিসফিস করে নিজেকেই বলল

—" আমি তো গোলাপকে ভালোবেসেছিলাম, কাঁটাকে না। তবু কেন কাঁটাই বারবার আমায় র'ক্তাক্ত করে?"

আর কিছু না বলে শৈলী হাতে গোলাপ নিয়ে কাঁপতে কাঁপতে কান্না করতে শুরু করল। পেছনে কেউ ছিল না, কেউ দেখেনি, শুধু অন্ধকার, বাতাস, আর লাল গোলাপেরা, তারা সবাই জানে, এই মেয়েটার ভালোবাসার গল্পটা, একতরফা হলেও কী গভীর ছিল!

নিশান ভেতরে যেতে পারেনি। শৈলীকে বাইরে রেখে সে কোনোমতে ভেতরে যাবেনা, তাই শৈলীকে ধমক দিয়ে ঘরে নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত একপ্রকার ঝড়ের মত নিয়েছিল নিশান। সে জানে, ওর যা স্বভাব, চুপ করে এভাবে কোথাও বসে থাকলে কেউ টেরও পাবে না, আর কষ্ট, সেটা তো ও গিলে নিতে জানে অপার দক্ষতায়। তাই সিদ্ধান্তটা নিয়েই নিশান চুপিচুপি বাগানের দিকেই এগিয়ে গেল। বাড়ির সবাই লিপ্ত অন্য কাজে, কেউ লক্ষ্য করেনি। শুধু তার বুকের গভীর কোথাও একটা চাপা ক্ষোভ আর অপরাধবোধ গুমড়ে উঠছিল।

— "কী ভেবে একা বসে আছে?"

—"আবার কিছু উল্টাপাল্টা ভাবছে না তো?"

—"এই সময়টায় কারো সঙ্গ না থাকলে, মানুষ খুব ভেঙে পড়ে! আকাশ বলেছিল!"

এইসব চিন্তায় তাড়িত হয়ে নিশান লাল গোলাপের গাছগুলোর দিকে এগিয়ে গেলো, যেখানে শৈলীর থাকার কথা। তবে চলার গতি হঠাৎই স্তব্ধ হলো। কারন, হাওয়ায় মিশে একটুকরো মিনমিনে কান্নার শব্দ কানে এলো। নিশানের বুকটা ধ্বক করে উঠল। কান্নাটা খুব নিঃশব্দ, কিন্তু খুব কষ্টের। জীবনে হাজারো শব্দ শুনেছে সে, কিন্তু এই কান্না, এই একটুকরো ফিসফিসানিতে এমন এক যন্ত্রণা লুকিয়ে ছিল, যেটা কোনো গালাগালি, কোনো ধমক দিয়েও ঢেকে রাখা যায় না।

নিশান ভেবেছিল শৈলী মন খারাপ করে বসে আছে হয়তো। কিন্তু মেয়েটা যে আসলেই কাঁদতে শুরু করবে তা মাথাতেও আসেনি নিশানের। সে আর এগোতে পারল না। পা জমে গেল মাটিতে। আড়াল থেকে তাকিয়ে দেখল, চাঁদের আলোয় ভিজে আছে একজোড়া কাঁপতে থাকা কাঁধ, হাতের তালুতে গোলাপ, আর চোখ থেকে অবিরাম গড়িয়ে পড়ছে নোনা জল। কি সুন্দর একটা দৃশ্য! নিশানের নিষ্ঠুর মনটাতে এক মুহুর্তের জন্য হলো এই দৃশ্য খুব একটা খারাপ নয়। কোনো চিত্রশিল্পী চাইলে এই দৃশ্য টা ফুটিয়ে তুলতে পারত। কিন্তু নিশানের এখন কী করা উচিত? সে কি এগিয়ে যাবে? না কি ফিরে যাবে? তার হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেল। জিহ্বায় উঠে এলো হাজারটা কথা, মনে মনে বলল,

—" কাঁদিস না, কাঁদিস না শৈলী। শুনতে একদম ভালো লাগছেনা। খুব নি'র্মম ঠেকছে! ভালো লাগছে না আমার!"

কিন্তু কিছুই উচ্চারণ করতে পারল না। ফিসফিস করেই আওড়ালো। একটা দীর্ঘশ্বাস চাপা পড়ল বুকের গভীরে, আর চোখ দুটোও মুছল না, কেন জানি নিজেও টের পেল না, ওখানেও যে জমে উঠছে দু’ফোঁটা পানি। আচমকা কান্নার সেই অসহায় শব্দটা বুক ভেঙে দিলেও, নিশান জানে এখন এগিয়ে গিয়ে সান্ত্বনার হাত রাখার মানুষ সে নয়। আজ সে-ই অপরাধী, আজ তার কাছে শৈলীর চোখের জল অভিশাপের মত।

নিশান ভেবেই নিল সে এসব কিছু দেখেনি। তাই সে পিছিয়ে এলো কয়েক কদম, গলা ঠিক করল, মুখে টানটান কাঠিন্য এনে দূর থেকে হাঁটার ভান করে হাঁক ছুঁড়লো, একেবারে যেন কিছুই জানে না এমন স্বরে।

—" শৈলী! শৈলী? শৈলী কি তুই এখানে আছিস?"

শৈলী চমকে তাকাল সেই চেনা কণ্ঠে। তড়িঘড়ি করে চোখের জল মুছে ফেলল হাতের চাদর দিয়ে, চোখ দুটো রগড়ে রগড়ে স্বাভাবিক করার ব্যর্থ চেষ্টা করল। ঠোঁট কামড়ে কিছু একটা গিলে নিল যেন। চেহারায় ফিরিয়ে আনল সেই চিরচেনা নির্বিকারতা, যেটার আড়ালে লুকিয়ে থাকে তার সমস্ত আবেগ আর অভিমান।

নিশান এখন একেবারে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। চোখের কোনে যেন কিছু খেয়াল করেই একটু থামল,

তবু মুখ শক্ত রেখে বলল,

—" এইসব কী ছেলেমানুষি হ্যাঁ? রাত এতো হয়ে গেছে! সবাই ঘরে, আর তুই এখানে বসে আছিস! তোর তো বুদ্ধিশুদ্ধি বলে কিছু নেই। বাড়িতে যা, এখনই।"

শৈলী কপালে ভাঁজ ফেলে বলতে চাইলো,

—" আপনি এখনো ঘরে যাননি কেনো..!"

কিন্তু তার কথাটা পুরোপুরি অবহেলা করে নিশান বলে উঠলো,

—" তোকে ঘরে যেতে বলেছি আমি। যা ভেতরে যা!"

—" কিন্তু আমি তো আপনাকে বলেই এলাম। একটু থাকি আজ।"

নিশান এবার কপোট রাগ দেখিয়ে বলল,

—" কেনো? আজ কি বিশেষ কোনো রাত যে তোকে এখানে থাকতে হবে? যা বাড়িতে ঢোক। আমি আর একবার বলব শৈলী। তারপর দেখবি শুধু! "

শৈলী মাথা নিচু করে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে উঠে দাঁড়াল। একবারও চোখে চোখ রাখল না। শুধু নিঃশব্দে মাথা নাড়ল। চোখের কোনায় এখনো কিছু টলটল করছে, তবু সে নিজেকে যথাসম্ভব গুছিয়ে বলল খুব শান্ত কণ্ঠে,

—" ঠিক আছে। যাচ্ছি! "

তারপরে সে পেছন না ফিরে হাঁটতে শুরু করল। আর নিশান দাঁড়িয়ে রইল, পেছন থেকে তাকিয়ে সেই হেঁটে যাওয়া মেয়েটার দিকে, যে কাঁদে একা, হাঁটে একা, সহ্য করে সব, তবু কখনো কিছু বলবে না। আজও না।

নিশান শৈলীর পিছু পিছু আসতে থাকলো। দৃষ্টি নিবদ্ধ করা আছে শৈলীর খোলা চুলে। আজ অনেকদিন পর চুল খোলা রেখেছে শৈলী, আর নিশান আবিষ্কার করে ফেলল আগের থেকে চুল একটু লম্বা হয়েছে বোধহয়। ঢোক গিলল নিশান। সে জানে না কেনো খোলা চুলে শৈলী কে দেখার ক্ষমতা নেই তার। অদ্ভুত ইচ্ছে মনের মধ্যে জেগে উঠে প্রায়। তাই নিজের ওসব দুর্বলতা লুকিয়ে ধমকে উঠলো প্রতিবারের মত,

—" চুল বেঁধে রাখ বেয়াদব! এই রাতে এভাবে চুল খোলা রাখছিস কেনো? পেত্নির মত লাগছে। চুল বাঁধ!"

এ আর নতুন কিছু নয়! শৈলী জানে নিশান কোনো এক অজানা কারনে তার খোলা চুল সহ্য করতেই পারেনা। অনেকবার দুঃখে কষ্টে শৈলী চুল কেটে ঘাড় পর্যন্ত করার সিদ্ধান্তও নিয়েছিল। তবে রিমি কাটতে দেয়নি। আর এদিকে ধমক খেতে হয় নিশানের কাছে। তাই আজও প্রতিদিনের মত ধমক শুনে চুল খোপা করতে থাকলো শৈলী। সেটাও খুব মনোযোগ দিয়ে দেখল নিশান। মনের কথাটা চিৎকার দিয়ে বলতে পারল না,

—" চুল খোলা রাখার সঠিক সময় আসেনি শৈলী। যেদিন তোকে আমি ছুঁতে পারব, সেদিন মন খুলে ছেড়ে দিস তোর অবাধ্য চুলগুলো! তাদের বাধ্য করার গুরুদায়িত্ব আমার!"

°°°°°′°°°°°°°°

শৈলী বাড়িতে ঢুকে নিজের ঘরের দিকে এগোতে চাইলে নিশান আদেশ ছুঁড়ে দিল,

—" পাঞ্জাবি দে আমার!"

শৈলী ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো, বিভ্রান্ত হয়ে বলল,

—" রিমির ঘরেই তো রেখেছি নিশান ভাই। ওখানে গিয়ে বদলে নিন। আর তৈরী হয়ে নিন!"

নিশান ভ্রু কুঁচকে গলা টানটান করে জবাব দিল,

—" আশ্চর্য! তুই আমার মুখের উপর কথা বলছিস কেনো? যা বলছি তাই কর। যা, রিমির রুম থেকে পাঞ্জাবি এনে দে আমার!"

বলেই নিশান খট করে শৈলীর ঘরের দরজা খুলে ঢুকে গেল। শৈলী এবার চোখ পিটপিট করে তাকালো। নিশান তার ঘরে ঢুকলো কেনো? তার মানে রিমির ঘরে পাঞ্জাবি না পড়ে তার ঘরে পড়বে? কেনো? আরও বেশি যন্ত্রণা দিতে চায় নাকি? এমনিতেই ভালো লাগছেনা শৈলীর। তার উপর এভাবে তার সামনেই বাসর রাতের জন্য তৈরী হতে চায় এই লোক! ইশ! কত নিষ্ঠুর নিশান!

শৈলী পাঞ্জাবি হাতে নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকলো। নিশানকে শৈলীর বিছানায় বসে থাকতে দেখা গেল। এইমাত্র শৈলীর বাথরুম থেকেই ফ্রেশ হয়ে এসেছে সে। শৈলী এবার শুকনো ঢোক গিলে এগিয়ে এসে পাঞ্জাবি বাড়িয়ে দিলে নিশান হাতে নেয় সেটা। এরপর দাঁড়িয়ে যায়। সাদা রঙের পাঞ্জাবি তে বেশ সুন্দর লাগবে নিশানকে, আর তাই শৈলী এই পাঞ্জাবি টা পছন্দ করে রেখেছে। শৈলী ভেবেছিল নিশান এখন বাথরুমে ঢুকবে পাঞ্জাবি পড়ার জন্য, তাই ও ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। কিন্তু শৈলীকে ভীষণ রকম চমকে দিয়ে নিশান সেকেন্ডের মধ্যে গায়ে থাকা নীলরঙা টি- শার্ট টা ধুপ করে খুলে ফেলে। বিষম খেলো শৈলী। সে ভাবতেও পারেনি তার সামনেই নিশান শার্ট খুলে ফেলবে। শুধু তাই নয়, খোলা টি-শার্ট টা শৈলীর হাতে ধরিয়ে দিল। হা করে তাকিয়ে থাকা স্তম্ভিত শৈলী কোনোমতে আঁকড়ে ধরে টি শার্টটা। কারন তার চোখ তো নিশানের অনাবৃত শরীরে।

নিশানের নগ্ন বুকের তামাটে গায়ের রঙে মাখানো সূক্ষ্ম পেশিগুলো স্পষ্ট। একটু আগে মুখ-হাত ধুয়ে আসার কারনে বুকের কাছে পানির ফোঁটাও দেখতে পাওয়া যায়। চওড়া কাঁধ, ঠিকঠাক ঘষে গড়া বুকের খাঁজ, আর সেই বুকের মাঝ বরাবর নেমে যাওয়া এক সরু রেখা, সেটা শৈলীর সোজা বুকের ওপর এসে আঘাত করল নিঃশব্দে। নিশানের শরীরটা তেমন ভারী নয়, কিন্তু প্রত্যেকটা শিরা-উপশিরা স্পষ্ট, কোনো নির্মোহ ভাস্করের নিখুঁত নিপুণতায় গড়া। তার বুকের বাঁ পাশে, জামার ঘষা এড়িয়ে অল্প একটু কাটা দাগ, যেটা এক সময়ের কোনো শৈশবের দস্যিপনার চিহ্ন কিনা, শৈলী জানে না, তবে সেদিকে চোখ পড়তেই মনে হলো, খুব চেনা।

শৈলী ঢোক গিলে প্রচণ্ড অস্বস্তি নিয়ে চোখ সরাতে চাইল। কিন্তু চোখ যেন ঠিক তেমনভাবে সরতে পারল না। দৃষ্টি আটকে রইল সেই রোদচাটা চামড়ায়, বুকের টানটান রেখায়, নিশানের জোরালো নিঃশ্বাসে। সারা মুখটা গরম হয়ে উঠেছে শৈলীর। চোখমুখ লাল, গলা শুকিয়ে কাঠ। আশ্চর্য! লোকটা এখনো পাঞ্জাবি পড়ছে না কেনো? শৈলী হাতের মুঠোয় ধরা নিশানের ঘর্মাক্ত টি-শার্টটা যেন আরও ভারী হয়ে গেছে। খাঁমচে ধরে থাকলো টি শার্ট টা। তারপর হঠাৎই মুখ ফিরিয়ে ফেলল, চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,

—" আপনি... অন্তত বাথরুমে গিয়ে..চেন্জ করতে পারতেন! "

নিশান পাত্তা দিল না কথাটায়, সে তখন পাঞ্জাবি খুটিয়ে খুটিয়ে দেখছে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে। একটাও কথা বললো না, একবারও পিছনে তাকাল না, তবে আয়নার ভেতর দিয়ে ঠিক দেখে ফেলল শৈলীর চোখের তাপ, কাঁপা ঠোঁট , আর লাল হয়ে যাওয়া গাল বেয়ে নেমে পড়তে চাওয়া অচেনা অশ্রু।

এই মুহূর্তে শৈলী ঠিক জানে না সে লজ্জিত, দুঃখিত, না অভিমানী, শুধু জানে, নিশান আরও একবার তাকে এমন জায়গায় এনে দাঁড় করিয়ে দিল, যেখান থেকে আরেকটা পা এগোলেই ভালোবাসা বলে কিছু থাকবে না।

নিশান আয়না দিয়ে শৈলীর লাজুক অবস্থা দেখে বাঁকা হাসলো। কিছুই করল না, কিছুই বলল না, তাতেই এই অবস্থা মেয়েটার। নিশান ইচ্ছে করে আরেকটু জ্বালাতে চাইলো শৈলীকে। মুখের হাসি ধুম করে সরিয়ে ফেলে আদেশ ছুঁড়ে দিল শৈলীর দিকে,

—" পাঞ্জাবি টা পড়তে পারছিনা। শরীর ভেজা। পিঠটা মুছে দে তো।"

নিশানের ঠান্ডা কণ্ঠে ছুঁড়ে দেওয়া আদেশটা শৈলীর বুকের ভেতর কাঁপন ধরিয়ে দিল। মনে মনে চমকে উঠলো ও। নিঃশব্দে গিলে ফেলল এক চুমুক অস্থিরতা। মনে হলো, চারপাশের বাতাসটা হঠাৎ করেই ভারী হয়ে গেছে। নিজের কাঁধে ওড়ানো চাদরটা আরও শক্ত করে গায়ে জড়ালো সে।

নিশ্চিত হতে আবারো জিজ্ঞেস করল,

—" ক..কী বললেন?"

চরম বিরক্তির সাথে পাঞ্জাবি টা ড্রেসিং টেবিলের উপর রেখে নিশান বলল,

—" কানে কি মেকআপ করেছিস? শোনা যায়নি? পিঠটা মুছে দিতে বললাম। হাত মুখ ধুতে গিয়ে ভেজা লাগছে। পাঞ্জাবি পড়তে পারবনা ভেজা অবস্থায়। বুক আর পিঠ ওই টি-শার্ট দিয়েই মুছে দে!"

শৈলী চোখের পলক ফেলল, শুকনো ঢোক গিলে মিনমিন করে টি-শার্ট টা এগিয়ে দিয়ে বলল,

—" কষ্ট করে আপনি নিজেই করে.....

কথা শেষ করার আগেই নিশানের চোখ থেকে দাউদাউ করে আগুন বের হতে শুরু করল, যা দেখে পিলে চমকে উঠল শৈলী। তার এবার ঠোঁট ভেঙে কান্না পাচ্ছে। কিন্তু নিশান ততক্ষণে আয়নার দিকে পিঠ করে দাঁড়িয়েছে। পাঞ্জাবি হাতে ধরা, যেন সত্যিই পড়তে পারছে না, যেন সত্যিই সাহায্যের দরকার। অথবা হয়তো চায় এই মুহূর্তে, তার সব আবেগের ভারটা শৈলীর হাতেই তুলে দিতে।

শৈলী ধীরে পা বাড়ালো। বুক ধুকধুক করছে, গলা শুকিয়ে আসছে, হাতে এখনও নিশানের ঘর্মাক্ত টি-শার্টটা ধরা। তার সমস্ত চেতনা যেন সঙ্কুচিত হয়ে এসেছে একটা ছোট্ট দৃষ্টিতে, একটা লাজুক স্পর্শে। নিশানের কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালো সে। তার চোখ এখনো একটু ভেজা, মুখটা যেন কেমন লালচে। নিজের কাঁধ থেকে ওড়নাটা নামিয়ে এক হাতে আঁকড়ে ধরল সেই ঘর্মাক্ত টি-শার্টটা। আর তারপর, নিঃশব্দে খুব সন্তর্পণে স্পর্শ করল নিশানের পিঠে।

গরম, শক্ত আর শীতল ঘামের পুরুষালি গন্ধমিশ্রিত এক চামড়া ছুঁয়ে শৈলীর ভেতরটা কেঁপে উঠল। খুব সাবধানে মুছে দিতে লাগল সে, পেছনের দিক থেকে কাঁধ হয়ে নিচে, আর তারপর আবার উপর দিকে। তার আঙুলের ডগা কাঁপছে। কিন্তু স্পর্শে অভিমানও আছে, ব্যথাও আছে, ভালোবাসাও আছে যা বলে কিছু কখনো স্বীকার করেনি।

নিশান চোখজোড়া বন্ধ করে ফেলেছে। খুব করে চাইছে টি- শার্ট টা শৈলীর হাত থেকে পড়ে যাক, তাহলে নরম হাতের ছোঁয়াটা সরাসরি পাওয়া যেতে পারে। শৈলীর হাত হালকা কাঁপছিল। নিশান তা আয়নার ভেতরেই দেখে ফেলল। তবুও সে কিছু বলেনি। শুধু এক মুহূর্তের জন্য আবারো চোখটা বুঁজল। সেই ছোট্ট ছোঁয়ায় জুড়িয়ে নিল কিছু পুরনো ক্লান্তি।

শৈলী বুঝতে পারছে না সে কেন এই কাজটা করছে। আদেশ ছিল, হ্যাঁ, কিন্তু সে তো প্রতিবাদ করতে পারত, চিৎকার করতে পারত, না বলতে পারত। তবুও করছে। কারণ হয়তো এই স্পর্শেই তার নিজের অনুচ্চারিত অভিমানগুলো কিছুটা লাঘব হচ্ছে।

পিঠ মুছে দিয়ে শৈলী তাড়াতাড়ি সরে গেল একপাশে। তার চোখ নিচু, হাতজোড়া কাঁপছে, মুখে কথা নেই। মুখ তখন টকটকে লাল, নিঃশ্বাসটা কেমন যেন এলোমেলো। দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়ে, নিশানের দিকে না তাকিয়েই বলল,

—" বুকটা নিজে মুছে নিন নিশান ভাই। একটু কাজ আছে আমার, আমি যাচ্ছি।"

দরজা খুলে বেরিয়ে গেল শৈলী। নিশান আয়নার ভেতর তার চলে যাওয়ার প্রতিবিম্ব দেখতে দেখতে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। আর নিজের মনের গভীরে একটা কথা চাপা দিয়ে ফেলল,

—" একটুখানি স্পর্শে আমারই এই অবস্থা, আমি সত্যিই জানিনা, যেই বিষটা পান করতে তুই ছুটছিস, সেটা আদৌও সইতে পারবি কিনা। "

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিশান ফিক করে হেসে ফেলে বিড়বিড় করে বলল,

—" সত্যিই আজকে বাসর রাত, এইতো অর্ধেক বাসর হয়ে গেল আমার। বুক মুছে দিতে গেলে নিশ্চিত কিছু একটা হয়ে যেত। না দিয়ে ভালোই করল! "

°°°°°°°°°°°°°

পাগলের মত ছুটে এসে ছাদের ঘরের দরজাটা এক ঝটকায় খুলে ফেলে ঢুকে পড়ল শৈলী। হাতে এখনো শক্ত করে ধরা নিশানের সেই ঘর্মাক্ত টি-শার্টটা। চাদরটা পিঠ থেকে খানিকটা পড়ে গেছে, চুলগুলো এলোমেলো, মুখটা লালচে আর ভেজা। বোঝাই যাচ্ছে, কিছু একটা থেকে পালিয়ে এসেছে সে। কিছু একটা চেপে ধরে রেখেছে তাকে ভিতর থেকে।

দেয়ালের সাথে গা ঘেঁষে বসে পড়ে শৈলী। হাঁটু দুটো বুকের কাছে টেনে নিয়ে চুপচাপ বসে পড়ে। কিন্তু নিঃশ্বাসটা আটকে রাখা যায় না। থরথর করে কাঁপছে সে। বুকের ভেতর যেন একটা অজানা আগুন জ্বলে উঠেছে। লজ্জা, অনুশোচনা, ভালোবাসা, কষ্ট, অপমান—সবকিছুর এক অনির্বচনীয় মিশ্রণ। নিঃশ্বাস নিচ্ছে, ছাড়ছে, আবার নিচ্ছে। পুরো শরীরটাই বুঝে উঠতে পারছে না কী হয়ে গেল একটু আগে।

হাতটা কাঁপছে, কিন্তু তবুও সে নিশানের টি-শার্টটা মুঠো করে ধরে আছে। একটা ছোট্ট কাপড়ের টুকরো, কিন্তু কতটা ভারী! পুরো একটা অতীত, একটা হারিয়ে যাওয়া বিশ্বাস, একটা গোপন অনুভব সব ঠাঁই পেয়েছে তার ভাঁজে ভাঁজে।

শৈলী চোখ বন্ধ করে ফেলল। ঠোঁট কামড়ে নিজেকে আটকে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করল। কিন্তু চোখের কোনা দিয়ে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। সেটা আনন্দের নয়, অভিমানের নয়, বরং এমন এক যন্ত্রণার, যার ভাষা হয় না। হয়তো নিজের অক্ষমতায়, নিজের ভাঙা হৃদয়ের সামনে দাঁড়ানোর ব্যর্থতায়। নিজেকেই প্রশ্ন করল শৈলী,

—" কেনো এমন করছেন নিশান ভাই? কেন এমন করে ভেঙে দিচ্ছেন আমায়? কষ্ট দিয়ে কী আনন্দ পাচ্ছেন আপনি?"

হাতে শক্ত করে ধরে রাখা নিশানের টি-শার্টটায় তীব্র, স্পষ্ট, পুরুষালি এক ঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছে। কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইল শৈলী, একদৃষ্টিতে, সেটার ভাঁজে ভাঁজে ওর সব অগোচর অনুভূতি লুকিয়ে আছে যে। বুকের গভীর এক লোভ, এক নিষিদ্ধ আকাঙ্ক্ষা চেপে বসল হঠাৎ। এমন কিছু, যেটা সে স্বীকার করবে না কারো সামনে, এমনকি নিজের কাছেও না। কিন্তু আজকের রাত, আজকের সেই মুহূর্ত, যেন নিজের সব বাঁধ ভেঙে দিয়েছে। ধীরে ধীরে শৈলী টি-শার্টটা কাছে টেনে আনলো। একটু দ্বিধা, একটু লজ্জা, কিন্তু সবকিছুকে চাপা দিয়ে শেষমেশ চোখ বন্ধ করে নিঃশ্বাস টেনে নিল গভীর করে।

পিঠের কাছে গিয়ে যেই ঘ্রাণটা পাচ্ছিল শৈলী,সেটা এবার পুরোপুরি পেল সে। বুকভরে শ্বাস নিয়ে চোখ বন্ধ করল ও। একটা ছোট্ট কাপড়ের টুকরোই যেন নিশানের সবচেয়ে কাছের উপস্থিতি হয়ে উঠলো শৈলীর কাছে। সে জানে, এটা ঠিক না। এটা সে কখনো কাউকে বলবে না। কিন্তু এই মুহূর্তে, এই নিঃসঙ্গ ছাদে, এই একাকীত্বে, শুধু এইটুকু ভালোবাসা চাই তার। ঘ্রাণ নিতে নিতে হঠাৎ শৈলীর চোখে পানি চলে এলো। ভেজা গাল মুঁছে নিতে গিয়েও টি-শার্টটা ছুঁয়ে ফেলল। মনে হলো নিশান ছুঁয়ে ফেলল ওকে।

ফিসফিস করে শৈলী আওড়ালো,

—" আপনি না....এত নিষ্ঠুর কেনো নিশান ভাই? একটু ভালোবেসে বললে... আমি কি একটুও না বলতাম? একটাবার ফিরে তাকালেন না কেনো? একটা বছর ধরে পাগলের মত ভালোবেসে গেলাম আপনাকে। আজ বিয়ে করে এসে তবুও আমায় আরো দুর্বল করে দিচ্ছেন! "

চোখ দুটো বন্ধ হয়ে গেল শৈলীর। নিশানের টি-শার্টটা দুহাতে মুঠো করে যত্ন করে নিজের বুকে টেনে নিল। নিশানের শরীরের সেই ঘ্রাণ, হালকা ঘাম মেশানো, তবুও অদ্ভুতরকম পুরুষালি এক উষ্ণতা। মাথা ঘোরানো সেই গন্ধে এক মুহূর্তের জন্য যেন

জগতের সব যুক্তি, সমস্ত রাগ-অভিমান, অপমান আর না বলা অনুভূতি মিলিয়ে গেল।

শৈলী চোখ বুঁজে নিশ্বাস নিতে থাকে গভীর করে, ধীরে ধীরে। সেই ঘ্রাণের ভেতরেই যেন ওর সমস্ত একাকীত্ব বিলীন হয়ে যেতে থাকে। এমন না যে সে কিছু ভুল করছে। এমনটা বহুদিন চায়নি, কিন্তু আজ এতটাই কাছে পেয়ে আর নিজেকে ফেরাতে পারছে না। এই গন্ধ, এই কাঁপুনি, এই অচেনা শিহরণ... সব কিছু মিলিয়ে যেন নিশান নামটা এক নতুন অর্থ নিয়ে ওর মনে বাজতে থাকে। শৈলীর ঠোঁট কাঁপে। চোখ বন্ধ রেখেই ও ফিসফিস করে গেয়ে উঠে,

— ❝তুমি বুকে টেনে নাও না প্রিয় আমাকে,

আমি ভালোবাসি,

ভালোবাসি, ভালোবাসি তোমাকে!❞

চলবে.............

নোট: 😞একটু বেশিই রোমান্টিক মনে হচ্ছে নাকি? শৈলীর চরিত্রটাই এমন দুর্বল করে সাজিয়েছি। কোনো অভিযোগ থাকলে ইনবক্সে বলবেন। আর অনুভূতি নিয়ে কিছু বলবনা, এগুলো বাস্তব তো। তাই ন্যাকামি বলা যাবেনা।🫶 আর...ভুলত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন