#হিমরূপার_উষ্ণছোঁয়া
#পর্ব_৪
#কলমে_অনামিকা_তাহসিন_রোজা
নিশান জানে, খুব ভালো করেই জানে শৈলী এখন আর ছাদ থেকে নিচে আসবেনা। কীভাবে সবাইকে সবটা বোঝাবে সেটা ভেবেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিশান পাঞ্জাবি পড়ে শৈলীর রুম থেকে বের হলো, তখনি মিমিকে হাসতে হাসতে এদিকেই আসতে দেখা গেল। নিশানকে দেখে সে আরো বেশি উৎফুল্লিত হয়ে প্রায় লাফিয়ে আসলো, হাত নেড়ে বলতে শুরু করল,
—" নিশান ভাই, আপনাকেই ডাকতে যাচ্ছিলাম। এত দেরি করলেন কেনো? তাড়াতাড়ি ঘরে চলুন, দুধ কিন্তু ঠান্ডা হয়ে যাবে।"
নিশান সেই কথায় পাত্তা না দিয়ে এবার ভ্রু কুঁচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে জিজ্ঞেস করল,
—" রিমি কোথায়?"
মিমির মুখের আলোটা ধুপ করে নিভে গেল। সে ছোট থেকেই দেখে এসেছে নিশান রিমিকে বেশ গুরুত্ব দেয়, হয়তো ওর ম্যাচুরিটির জন্য। কিন্তু এদিকে সবসময় ধমক খেতে হয় মিমি আর শৈলীকে। আমতা আমতা করে মিমি বলে উঠলো,
—" রিমি তো আপনার ঘরেই আছে নিশান ভাই। নতুন ভাবির সাথে গল্প করছে।"
" নতুন ভাবি" শব্দটা শুনে নিশান মুখ শক্ত করে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। পাঞ্জাবির পেছনে হালকা বাতাসে ওড়ার মতো এক ধরনের দৃঢ়তা, তাড়া আর অভিমানের ঢেউ খেলে যাচ্ছে ওর চলায়। মিমির কথা যেন কানে গেঁথে থাকলেও তার একটাও ধৈর্যে ধরা পড়েনি। ঘরের দরজায় এসে নিশান ধীর নিঃশ্বাস ফেলে ধাক্কা দিলো। দরজাটা খুলে গেল। ভেতরে সাজানো বাসরঘর৷ টকটকে লাল গোলাপ আর বেলীফুলের মিশ্র সুবাসে ভরে আছে চারপাশ। বিছানার কিনারে বসে থাকা লামিয়া হালকা করে মাথা নিচু করে রেখেছে, যেন খুবই লাজুক। মুখে এক ধরনের মিষ্টি লজ্জার হাসি, যা হয়তো একটু কৃত্রিম।
রিমি তখন লামিয়ার হাত ধরে কিছু বোঝাচ্ছিল। নিশানকে দেখে সোজা হয়ে বসল ও। নিশানের ভারি গলায় একটা ডাকই ভেসে এলো,
—" রিমি!"
রিমি মুখ তুলে তাকাতেই বুঝে গেল কিছু একটা ঘটেছে। নিশানের কপালের শিরাগুলো টান টান, ঠোঁট শক্ত। মুখে একটুও বাসরের রাতের উজ্জ্বলতা নেই। রিমি ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
—" জ্বি ভাইয়া।"
নিশান এবার চোখ না সরিয়েই বলল,
—"তুই আর মিমি একটু বের হ। দরজা আটকে যা তো!"
রিমি আর কোনো কথা না বাড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। তবে যাওয়ার আগে এক ঝলকে নিশানের চোখে কিছু একটা খুঁজে নিল। নিশান ভাই আসলে চাইছে টা কী? মিমি একটু ইতস্তত করলেও রিমি তাকে চোখে ইশারা করতেই বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। দরজাটা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। শুধু লামিয়া এখনো বিছানায় বসে আছে, মাথা নিচু, চুলের একপাশ কপালে এসে পড়েছে, ঠোঁট চাপা হাসির মতো কাঁপছে,অভিনয়ের লজ্জা কি সত্যিকারের ভালোবাসার লজ্জার মতোই দেখতে হয়?
নিশান ওর দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ চুপচাপ। এরপর দুহাত কোঁমড়ে রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে তটস্থ হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—" আর কতক্ষণ এমন নাটক চলবে?"
লামিয়া ধ্বক করে উঠলো, এমনভাবে তাকালো যেন এমন কথা শোনার প্রস্তুতিই ছিল না। কিছুক্ষণ নিশানের রাগান্বিত মুখটার দিকে চেয়ে থেকে লামিয়া আমতা আমতা করে বলতে থাকলো,
—" না মানে...আমি তো এখনো..জানিনা!"
ধমকে উঠলো নিশান, চোখ রাঙিয়ে বলতে থাকলো,
—" জানো না মানে? তামাশা করছো তুমি? মানে কী তুমি জানো না! তুমি কি বুঝতে পারছো না, আমি কেনো এত বড় একটা নাটক করলাম? কেনো তোমাকে এই ঘরে এনে রাখছি? এসব তামাশা দেখার জন্য! "
লালচে আলোয় রাঙা বিছানার কিনারে বসে থাকা লামিয়া এবার আর নিজের অভিনয়ের আবরণ ধরে রাখতে পারল না। ওর ঠোঁট কাঁপছে, চোখে টলটল করছে অশ্রু। আস্তে করে বলল,
—"আমি তো চেয়েছিলাম, কেউ আমাকে টেনে বের করুক ওই বাড়ি থেকে। কিন্তু এভাবে... এই মিথ্যে বিয়ের ছলনায়! নিশান ভাই, আপনি জানেন না, ওরা আজ রাতে জোর করে আমার রেজিস্ট্রি করিয়ে দিত! আমি... আমি হাল ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমি তো জানতামও তো ওই ফালতু বেডা নিজে আসার বদলে আপনাকে পাঠাবে!"
নিশান মুখ সরিয়ে নিল। নিজের মনের ওপর রাগে, ক্লান্তিতে দম আটকে যাচ্ছে ওর। দুহাতে মাথা চেপে বলল,
—"তোমার ওই পাগলাটে প্রেমিক, শালা জিৎ! ও যদি সময়মতো ফিরত! প্লেন মিস না করত, তাহলে আমাকে আজ এই নাটক করতে হতো না। ওই হারামজাদার জন্য এদিকে আমার বাড়িতে আগুন লাগছে। বন্ধুত্বের দোহাই দিয়ে কাজটা করালো আমার দ্বারা! নাহলে জীবনে তোমাকে বিয়ের আসর থেকে প্রেমিকা পরিচয় দিয়ে তুলে আনতাম না! এত বড় মিথ্যা এ জন্মে বলিনি আমি।"
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে লামিয়া ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল, গলায় চাপা কান্না নিয়ে বলল,
—" আপনি চিন্তা করবেন না, জিৎ ফিরবে, তাই তো, তাই তো আপনি এই নাটক করলেন। আমাকে নিজের নামে এই ঘরে এনে রাখলেন! সবাই ভাবছে আমি আপনার বউ। কিন্তু চিন্তা করবেন না। ও আসুক, সব সত্যি সবাইকে খুলে বলব।"
নিশান এবার এক পা এগিয়ে এল, দু’হাতের আঙুলগুলো চেপে ধরে দাঁতে দাঁত ঘষে বলল,
—"সবাইকে বলবে? তুমি ভাবছো কথাটা এত সহজ? লামিয়া, এই সমাজ মুখের কথা নয়, চোখে যা দেখে সেটাই বিশ্বাস করে। আমি জানি, দিনশেষে আমাকেই কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। সবাই বলবে, নিশান তো একটা চরিত্রহী"ন! মেয়ে নিয়ে ঘরে ঢুকেছে, নাটক করেছে, বাসর সাজিয়েছে, আর শেষে বলে বিয়ে হয়নি!"
গলার নিচে ধরা পড়ে গিয়েছিল নিশানের স্বর। সে কষ্ট চাপতে পারল না। আবার মুখ ফিরিয়ে নিল, নিজের চোখের ভাষা কাউকে দেখাতে চায় না এখন। কিছুটা নরম গলায় বলল,
—"আমি বলেছিলাম তোমাকে, আমি এটা করব না। তুমি আর তোমার প্রেমিক, মানে আমার অযোগ্য বন্ধু জিৎ মিলে যখন পা ধরে বললে যে আমি ছাড়া আর কেউ পারবে না। তখনই বোঝা উচিত ছিল, তোমাদের বিশ্বাস করে আমি আবার ফাঁদে পড়ছি।"
লামিয়া এবার আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। বিছানার পাশে হাঁটু মুড়ে বসে মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলল,
—"আমার জন্য আপনি নিজের সম্মান, নিজের পরিবার, এমনকি, এমনকি আপনার ভালোবাসার চোখের বিশ্বাসও হারাচ্ছেন। আমি....আমি মাফ চাই, নিশান ভাই। আমি তো আসলেই আপনাদের কারো যোগ্য না...!"
নিশান চুপ করে তাকিয়ে রইল লামিয়ার দিকে। তার চোখে এখন আর রাগ নেই, বরং ক্লান্তি, ভার, আর একরাশ পরাজয়ের অনুভব। কিছুক্ষণ পর ধীরে বলে উঠল,
—"তুমি কিছু ভুল করো না, লামিয়া। এখন যা হোক, আমি কথা দিয়েছি জিৎকে, তোমাকে কোনো কিছুর মুখোমুখি হতে দেব না। এই নাটক যেমন আমিই শুরু করেছি, শেষটাও আমিই করব। শর্ত একটাই, তুমি সত্যিই নিজেকে বউ মনে করোনা, আর কাল বিকেলের মধ্যে জিৎকে হাজির হতে বলো!"
চোখ বুজে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল নিশান। তারপর ধীরে বলল,
—"এই নাটক চলবে আর মাত্র কয়েক ঘন্টা। কাল বিকেলের মধ্যে যেন জিৎ ফিরে। তখন.. তখন তোমাদের যা ইচ্ছা করো। আমি বলে দেব, বিয়েটা আসলে হয়নি, ভুল বোঝাবুঝি, ঘর সাজানো, ফ্যামিলি ফোর্স, সব মিথ্যে। "
লামিয়ার চোখ থেকে এবার অশ্রু গড়িয়ে পড়ল, সে ফিসফিস করে বলল,
—" আচ্ছা ঠিক আছে। আর আপনি? এরপর আপনি কী করবেন নিশান ভাই? শৈলী যে...
নিশান তীক্ষ্ণ হাসল,
—" নিজের থেকে বিশ্বাস করে ও আমাকে। নিজ চোখে আমায় খু"ন করতে দেখেও আমি যদি মুখে বলি, আমি কিছু করিনি, সে বিশ্বাস করবে। এক কথায় বিশ্বাস করবে।"
লামিয়ার গাল বেয়ে নেমে আসা অশ্রু থেমে গেল মুহূর্তে। তার চোখের সামনে হঠাৎ স্পষ্ট হয়ে উঠল এক বিস্ময়কর দৃশ্য। একজন মানুষ, যার বুক ফাটছে, কিন্তু মুখে হাসির ব্যারিকেড, যার ভেতর আগুন, অথচ বাইরে বরফের মতো ঠাণ্ডা। নিশানের সেই তীক্ষ্ণ হাসি দেখে লামিয়া নিঃশব্দে জিজ্ঞেস করল,
—"আর আপনি? আপনি নিজের সেই বিশ্বাসী মেয়েটার চোখে চোখ রাখবেন কীভাবে, যাকে আপনি এই কয়েক ঘন্টার একটা মিথ্যে নাটকের জন্য সারাজীবনের কষ্ট উপহার দিয়ে যাচ্ছেন?"
নিশান এবার আর চোখ সরাল না। গলার স্বর নরম হলো, কিন্তু সেই নরমে ছিল হিম শীতলতা।
—"আমি রাখব না লামিয়া। ওর চোখে চোখ রেখে বলব না কিছুই। আমি চুপ করে থাকব। যদি ওর বিশ্বাস সত্যি হয়, তাহলে ও নিজেই বুঝে যাবে, আমি যা করেছি তা ওর জন্যই। আর যদি না বোঝে...!"
একটা ছোট্ট বিরতি দিয়ে নিশান নিচু গলায় বলল,
—"তাহলে আমার সমস্ত কিছু মিথ্যে ছিল। তখন আমি নিজেকেই মাফ করে দেব, এই বলে যে, আমি শুধু একটা বন্ধুর অনুরোধ রেখেছিলাম, নিজের হৃদয় ভেঙে।"
এই মুহূর্তে ঘরের এক কোণে জমাট বেঁধে থাকা বাতাসের মধ্যেও কেমন একটা চাপা কান্নার শব্দ যেন শোনা গেল। নিশান আর লামিয়া দুজনেই চমকে তাকাল দরজার দিকে। দরজাটা ভেজা। বাইরে কেউ কি দাঁড়িয়ে ছিল এতক্ষণ? এক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে নিশান ধীরে পা বাড়াল দরজার দিকে। বাইরে চোখ রেখে দেখল কেও নেই। কিন্তু তারা যে শব্দটা স্পষ্ট শুনেছে, কেউ কি পেছন থেকে সব শুনে ফেলল?
°°°°°°°°°°
ছাদের এক কোণায় কিছুক্ষণ পাথরের মতো বসে ছিল শৈলী। ঠান্ডা বাতাস ওর গাল ছুঁয়ে যাচ্ছিল বারবার, কিন্তু তার চেয়ে অনেক বেশি গরম হয়ে ছিল ওর চোখ। হাতের মুঠোয় চেপে ধরা ছিল সেই নীল রঙা টি-শার্টটা, যেটাতে নিশানের শরীরের গন্ধ মিশে ছিল, গভীর, ভারী, আর হঠাৎ যেন নেশার মতো টেনে নেওয়া। শৈলী চোখ মুছে ধীরে ধীরে উঠল। বুকের ভেতরটা কেমন ছ্যাঁৎ ছ্যাঁৎ করছে, অথচ নিজেকে ঠিক করতে হবে। এই মুহূর্তে কিছু না ভেবে নেমে যাওয়া দরকার। সে জানে না কেন, শুধু মনে হচ্ছে, নিশানের কিছু বলার ছিল হয়তো। কিংবা... ওর সামনে আর এক মুহূর্ত থাকলে নিজেকে ধরে রাখতে পারবে না।
ধীরে ধীরে ছাদের সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করল শৈলী। বুকের কাছে চেপে ধরা সেই টি-শার্টটা যেন তার ভয়, অভিমান আর দুর্বলতার সমস্ত ভার হয়ে গেছে। সিঁড়ি ধরে নিচে নেমে এসে হলঘর পেরিয়ে সামনে যেতে গিয়েই শৈলী থমকে গেল। পায়ের গতি একটু থেমে গেল। সে কৌতূহলী চোখে এদিক-সেদিক তাকিয়ে নিশানের সন্ধান করতে লাগল। এমন সময়ই দেখতে পেল, নিশান ঘর থেকে বেরিয়ে অনেকটা দূরে, সোজা বারান্দা পেরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে অন্য দিকে। এখন নিশানের রুমের দরজা খোলা। আলো জ্বলছে, তবে নিশান চলে গেলো কেনো নিজের ঘর থেকে। এক মুহূর্তে অনেক কিছুই এসে হানা দিল শৈলীর মনে।
নিশান কি লামিয়ার জন্য খাবার আনতে গেল? নাকি অন্য কিছু? বাসর ঘরে ফিরে যাবে? তবে কি, টি-শার্ট টা শৈলীর কাছে ফেলে রেখে গেল ইচ্ছা করেই? তবে কি,এতক্ষণ যা যা হয়েছে, সবই শুধুই একটা তামাশা?
শৈলীর চোখ ভিজে উঠল। সে অভিমানী চোখে নিশানের চলে যাওয়া পেছনটা দেখতে থাকল। চিন্তারা এলোমেলো ঘুরপাক খেতে লাগল মাথায়। তার বুকের ভেতরে একটা অচেনা হাহাকার দানা বাঁধতে লাগল। আর হাতের সেই টি-শার্টটা, এবার যেন জ্বালা ধরিয়ে দিল হাতের তালুতে। শৈলীর চোখের কোণ ভিজে উঠেছিল আগেই, এবার তা নিঃশব্দে গড়িয়ে পড়ল গালে। বুকের মাঝে জট পাকানো প্রশ্ন আর উত্তরহীন কষ্ট একসাথে দলা পাকিয়ে উঠল। নিশানকে নিয়ে এতটুকু ভাবা, এতটুকু অনুভব, সবকিছুকে হঠাৎ করে অশোভন, অপ্রয়োজনীয় মনে হলো ওর।
শৈলী সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, আর না।আর এক বিন্দুও ভাববে না নিশানকে নিয়ে। ওর কোনো হাসি, কোনো আদেশ, কোনো চোখের ভাষা আর স্পর্শ করবে না তাকে। দ্রুত পায়ের শব্দে নিজের ঘরের দিকে হাঁটা ধরল শৈলী। বুকের কাছে চেপে ধরা নিশানের টি-শার্টটা একসময় আলগা হয়ে পড়ল হাতে, তারপর ওর অবচেতনে শক্ত করে মুঠো করে ধরল সেটা। ঘরে ঢুকেই শৈলী দরজা বন্ধ করে দিল শব্দ না করে। তারপর ছিটকিনি এঁটে এক দমে বিছানায় পড়ে গেল। চোখের জল আর সংবরণ করা গেল না। বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়ল সে। বালিশে মুখ গুঁজে কাঁদতে থাকল নিঃশব্দে। গলার কাছে আটকে থাকা শব্দগুলো যেন পাথরের মতো ভারী হয়ে দাঁড়িয়ে রইল, শুধুই একটা নাম উচ্চারণ করতে চাইছে, —"নিশান ভাই..!" কিন্তু আর উচ্চারণ করল না সে। শুধু কাঁদতে থাকল—রাগে, দুঃখে, আর অচেনা এক অভিমানে পুড়ে পুড়ে। আর এভাবেই এক সময় তন্দ্রা নেমে এলো চোখজোড়ায়!
°°°°°°°°°°°°
রিমির হাত পা ভয়ে অসাড় হয়ে গেছে। হাতের তালু ঘেমে ভিজে গেছে হয়তো। মাথা নিচু করে সে কাঁপছে। থরথর করে কাঁপতে থাকা রিমির দিকে তাকিয়ে নিশান আবারো প্রশ্ন করে,
—" সব শুনে ফেলেছিস?"
রিমি চোখজোড়া খিঁচে বন্ধ করল। ঐ সময় নিশান নিজের ঘর থেকে সবাইকে বের করে দিলেও দরজার সামনে আড়ি পেতে সব কথা শুনে নেয় রিমি। আসলে তার মনের খুতখুতানি টা কিছুতেই থামছিল না। কারন তারও অগাধ বিশ্বাস, নিশান এই কাজ করতেই পারেনা। তাই বাধ্য হয়ে এভাবে লুকিয়ে কথা শুনেছিল সে। কিন্তু নিশান যে খপ করে বুঝে ফেলবে তা মাথাতেই আসেনি রিমির। সে তো শব্দ হওয়ার সাথে সাথে নিজের ঘরে চলে এসেছিল।
আর এদিকে বুদ্ধিমান নিশান ঘর থেকে বেরিয়ে কাওকে দেখেনি, কিন্তু ঠিকই মস্তিষ্ক ধরে ফেলে চুপচাপ হেঁটে সে চলে এসেছে রিমির রুমে। আর এসেই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে আসলেই রিমি সব শুনেছে কিনা। বেচারি রিমি নিশানকে যমের মত ভয় পায় ছোট থেকেই। তাই মিথ্যে বলার প্রশ্নও আসেনা। ঠোঁট ভিজিয়ে বাধ্যের মত মাথা নাড়িয়ে মিনমিন করে জবাব দেয় রিমি,
—" জ্বি শুনেছি।"
নিশান বোধহয় রাগ করল না, বরং খানিক কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—" শুনে কী মনে হয়েছে? বিশ্বাস হয়নি?"
রিমি এবার হতবাক হয়ে যায়, হা হয়ে বলে,
—" বিশ্বাস হবেনা কেনো নিশান ভাই? আলবাত বিশ্বাস হয়েছে। আমি তো আগেই বুঝেছিলাম পেছনে কোনো কাহিনী আছে।"
নিশান এবার চোখ সরু করে চাপা স্বরে বলল,
—" তুই যেভাবে বিশ্বাস করলি, শৈলী কি সেভাবে বিশ্বাস করবেনা? ও কি বিশ্বাস করবে যে আমি আসলেই বিয়ে করিনি, শুধু বাধ্য হয়ে নাটক করেছি।"
রিমি এবার অবাক না হয়ে পারল না। শৈলী যে নিশানকে পাগলের ভালোবাসে, এটা তো তার জানা। কিন্তু শৈলীকে নিয়েও যে নিশান ভাবে তা তো আজ পর্যন্ত কেও জানেনা। কেও বুঝতেও পারেনা! নিশান ভাই এভাবেই দুর থেকে আড়ালে থেকেই ভালোবাসেন নাকি? রিমির চোখজোড়া বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। এই প্রথম, এই একদম প্রথমবারের মতো, রিমি নিশান ভাইয়ের মুখে শৈলীকে নিয়ে কোনো আবেগ, কোনো প্রশ্ন, এমনকি নিজের জায়গা থেকে ভয় মেশানো টেনশন দেখল। সে খানিকক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকল, মনে হয় শব্দ করতে ভয় পাচ্ছে। তারপর ধীরে ধীরে বলে উঠল,
—" শৈলী তো আপনাকে নিঃশর্তভাবে বিশ্বাস করে নিশান ভাই। আপনি যদি ওর চোখে চোখ রেখে বলেন, আপনি কিছুই করেননি, তাহলে ও চোখ বুঁজে বিশ্বাস করবে। ঠিক যেমন আপনি করতেন।"
নিশান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। রিমির এই কথাটা বুকের কোথাও গিয়ে দপ করে বাজলো।
তবে সে নিজেকে সামলে নিয়ে ঠোঁটের কোণে একপাশে তাচ্ছিল্যের হাসি ঝুলিয়ে বলল,
—" বিশ্বাস করলেই তো হয় না রিমি। ও এখন কাঁদছে। একা নিজের ঘরে। আমার ঘরটা সাজিয়ে দিয়েছিল লামিয়ার জন্য। আর আজ আমি ওরই চোখের সামনে...আর কিছু বললাম না।"
রিমির গলা কাঁপতে শুরু করল। সে ভেবেছিল নিশান হয়তো একটা তীব্র ধমক দেবে, অথবা কিছু না বলেই চলে যাবে। কিন্তু এই মানুষটা এমন ভাঙা কণ্ঠে, এমন ঝিম ধরা কণ্ঠে যখন শৈলীর কথা বলছে, তখন রিমি আর ভুল করতে পারেনা। সে সাহস করে এবার একধাপ এগিয়ে এসে বলল,
—" নিশান ভাই, আপনি জানেন, ও কখনো আপনার মুখোমুখি না হলে, আপনার চোখে চোখ না রেখে সত্যিটা জানার সুযোগ না পেলে, ও আপনাকে বিশ্বাস করলেও এই ভুল বোঝাবুঝির কষ্টটা সারাজীবন বয়ে বেড়াবে। একটা সুযোগ দিন ওকে। সত্যিটা ওর কাছে পৌঁছাতে দিন।"
নিশান দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কপালে হাত রেখে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর একটানা বলে উঠল,
—" সময় লাগবে। জিৎ না আসা পর্যন্ত কাউকে কিছু বলা যাবে না। "
রিমি এবার উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল,
—" কিন্তু নিশান ভাই, আপনি তো অন্যভাবেও লামিয়াকে বাঁচাতে পারতেন। মানে ধরুন বান্ধবী পরিচয় দিয়ে নিয়ে এসে, বা অতিথি হিসেবে এনে আশ্রয় দিতে পারতেন। বিয়ের এই নাটকের কী দরকার ছিল?"
নিশান এবার ঠোঁট গোল করে শ্বাস ফেলে বলল,
—" লামিয়ার পরিবার।"
—" মানে?"
নিশান এবার একধরনের অসহায়তা মেশানো বিরক্তি নিয়ে রিমির দিকে তাকাল। একটু থেমে যেন কথা গুছিয়ে নিলো, তারপর গভীর গলায় বলল,
—" লামিয়ার বাবা-মা না, ওর চাচা-ফুপু, দাদা-দাদীরা। সমাজ নামের বিষাক্ত দেয়ালের কারিগর এরা। নিজের পছন্দের ছেলেকে বিয়ে করতে চায় মেয়েটা, এই কারণেই ওর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা শুরু করেছিল তারা। এমনকি জিৎএর কথাও শোনেনি তারা। বলেছে, বিয়ের আগে যদি ছেলেটা মেয়েকে নিয়ে পালায়, তাহলে সেটা অপমান। আর জিৎ তো দেশে নেই এখন। তাই লামিয়াকে বিয়ের আসর থেকে তুলে আনতে গেলেও আমার একটা পরিচয়ের দরকার ছিল! ওরা আমায় মেনে নিতে রাজি, কিন্তু জিৎকে নয়।"
রিমির মুখটা দুঃখে ভরে উঠল। নিশান এবার কাঁধ ঝাঁকিয়ে শান্ত গলায় বলে গেল,
—" তারা শুধু একজন স্বামীকেই গ্রহণ করবে, একজন জামাইকেই। তার বাইরে কিছু নয়। আমি যদি বলতাম, ও আমার বান্ধবী, আশ্রয় দিচ্ছি। তারা এটাকেই দুশ্চরিত্র প্রমাণের শেষ হাতিয়ার বানিয়ে ফেলত। অথচ বিয়ে শব্দটা বলতেই, তারা মুখ বন্ধ করেছে। আমি ওকে বিয়ে করব শুনে ওনারা শান্ত হয়েছে। ইভেন, আমাদের বাড়িতে আসা পর্যন্ত ফলো করেছিল। এতটাই নাটকীয় ওরা, রিমি এবং তাই আমাকেও নাটকীয় হতে হয়েছে।"
একটু থেমে নিশান কাঁপা গলায় যোগ করল,
—" আমি জিৎকে কথা দিয়েছি লামিয়াতে বাঁচানোব। জিৎ বাঁচাতে পারবে তার প্রেমিকাকে, আমার উপর ভরসা করে। এই আর কি। যদিও বিষয়গুলো অযৌক্তিক। কিন্তু কিছু করার নেই। সবকিছু পার্ফেক্টলি লামিয়ার পরিবারের কাছে তুলে ধরার জন্যই এতকিছু!"
একটু থেমে নিশান ফিক করে হেসে ফেলল। ঠোঁট কাঁমড়ে বলল,
—" এ কাজ করে এক দিক দিয়ে আমার লাভ হয়েছে।"
ভ্রু কুঁচকে রিমি বলল
—" কেমন লাভ নিশান ভাই?"
নিশান এবার অন্যদিকে তাকিয়ে অদ্ভুত স্বরে বলল,
—" একজনের অনুভূতির জোর, আবেগের সত্যতা, কোনো এক অজানা শব্দের মারাত্মক তীব্রতা টের পেয়েছি। একজনের হৃদয়ের তীব্রতা টা বুঝতে সক্ষম হয়েছি। কোনো একজন যে কি মারাত্মক মায়ায় জড়িয়ে গেছে তা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি।"
রিমি কিছু বুঝলো কিনা বোঝা গেল না। সে শুধু হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো নিশানের দিকে। চোখের পলকও পড়তে দেখা গেল না। নিশান এবার ভ্রু নাচিয়ে বলে উঠলো,
—" কিছু বুঝেছিস?'
রিমি যন্ত্রের ন্যয় মাথা নেড়ে বলল,
—" খুব বুঝেছি। "
ভ্রু কুঁচকে শুধালো নিশান,
—" কী বুঝেছিস বল তো?"
রিমি এবার ঠোঁট চেপে একটু অভিজ্ঞের সুরে বলে উঠলো,
—" আপনার ঘরে বসে থাকা লামিয়ার জায়গায় অন্য একজনের থাকার কথা। ভুল করে ভুল জিনিস ভুল জায়গায় এসেছে। "
নিশান ঠোঁট চেপে হাসলো রিমির কথা শুনে। মেয়েটাকে এজন্যই ভালো লাগে তার! আর বাকিদের থেকে বেশ ম্যাচুউরড আর সব বুঝে যায় মুহুর্তেই। নিশান এবার হাসলে রিমি সন্দিহান হয়ে বলল,
—" আমার ধারনা ভুল হয়নি তবে।"
ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম হাসি টানলো নিশান। এরপর ঠোঁট ভিজিয়ে বলল,
—" আজকের রাতটা আমার ঘরে লামিয়ার সাথে থাক তুই। বিছানায় পাগলের মত দেয়া ফুলগুলো সরিয়ে ঘুমাস।"
রিমি তৎক্ষনাৎ প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল,
—" আপনি কোথায় ঘুমোবেন নিশান ভাই? "
কোনো কিছু না বলে বাঁকা হাসলো নিশান। চোখ দিয়েই কিছু একটা বুঝিয়ে দিয়ে বলল,
—" মা আর বাবার রুমের দিকে খেয়াল রাখিস। কেও যেন শৈলীর ঘরের দিকে না আসে। আর আমাকে একটা বালিশ দিয়ে যা, সোফার বালিশে ঘুমোতে অভ্যস্ত নই।"
রিমি এক মুহূর্তের জন্য নিশানের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল। তার চোখে বিস্ময়, তলানিতে জমে থাকা একরাশ আনন্দ। একটু আগে পর্যন্তও যে মানুষটা ঠোঁট চেপে কেবল নিজের দায় স্বীকার করে যাচ্ছিল, সে মানুষটাই এখন চোখের ইশারায় এমন কিছু বলে ফেলল, যার অর্থ রিমির হৃদয়ের ভেতর বাজিয়ে দিল এক অজানা বাঁশির সুর। সে নিঃশব্দে ফুঁ দিয়ে একগাল চুল সরিয়ে নিয়ে ধীর কণ্ঠে বলল,
—" সোফার বালিশ আপনার জন্য নেবো, তবে রাতটা শৈলীর ঘরের পাশে কাটাবো আমি। বড়মা-বড় আব্বু তো দূরের কথা, বাতাসও যদি ওর ঘরের দিক নেয়, আমি আগেই পথ রোধ করে দাঁড়াবো। নো টেনশন!"
নিশান এবার আর মুখে কিছু বলল না, শুধু কৃতজ্ঞতায় মাথা হেঁট করে নিল। ওর চোখের কোণে একটা চাপা প্রশান্তি খেলা করে গেল, জীবনের সব নাটক, আবেগ, এবং ভুল বোঝাবুঝির ভিড়ে কেউ একজন ঠিক বুঝে নিচ্ছে ওকে। রিমি এবার ঘরে গিয়ে বালিশ আনলো, একপা এগিয়ে নিশানের হাতে বালিশটা ধরিয়ে দিয়ে হাসল,
—" আপনার জন্য তো একটা ঘুমই যথেষ্ট না নিশান ভাই, শান্ত ঘুম দরকার। কোনো একজনের পাশে না হোক, তার ছায়ার কাছেই ঘুমোতে পারেন অন্তত। আর এতটুকু শান্তি যদি পাওয়া যায়, সেটাও তো লাভের মাঝে পড়ে, তাই না?"
নিশান মাথা নিচু করে হাসল। গলায় রিনরিনে স্বরে শুধু বলল,
—" রিমি, তুই আমার ছোট বোন না হয়ে যদি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড হতি, তাহলে হয়তো তুই-ই ওই একজনের কাছে আমার হয়ে কথা বলতি। আকাশ কোনো কাজেরই না, তোর উচিত ছিল আমার বেস্ট ফ্রেন্ড হওয়া!"
আকাশ নামটা শুনে হাসিটা গিলে ফেলল রিমি। না জানি সত্যিটা সামনে আসলে কি হবে? নিশান ভাই তো এখনো জানেন না যে আকাশের সাথেই রিমি গত চার মাস ধরে রিলেশনশিপে আছে। যদি একবার জানতে পেরে যায়, তখন যে কি রকম অশান্তি হবে ভেবেই মাথা ঘুরে রিমির। এসব লুকোচুরি আর ভালো লাগছেনা! এদিকে ভীতুর ডিম আকাশ তো কোনোভাবেই নিশানের সামনে এই কথা বলতে পারেনা!
°°°°°°°°°°°°
অন্ধকার ঘরের নিস্তব্ধতা ভেঙে শৈলীর চোখ ধীরে ধীরে খুলে গেল। একটা অস্পষ্ট অনুভূতি। রোদের আলোয় চোখ কাঁপতে শুরু করলে শৈলী অনুভব করে গায়ের ওপর কিছু ভারী নরম কিছু পড়ে আছে। হাত বাড়িয়ে ছুঁতেই বুঝল, একটা কম্বল। চমকে উঠে বসে পড়ল সে। কম্বল? এটা তো সে নেয়নি! কোথা থেকে এলো। তখনই আবারো চোখে পড়ল, ওর পাশে একটা কোলবালিশ রাখা। এমনভাবে, যেন কেউ চুপিচুপি এসে ওর পাশটা পূর্ণ করে রেখে গেছে। এই কোলবালিশ টাও তো শৈলী আনেনি। হাতটা নাড়াতে গিয়েই সে হঠাৎ টের পেল আঙুলে কিছু একটা বাধা। তাকিয়ে দেখে, ওর কা*টা আঙুলে নিখুঁতভাবে জড়ানো একটা ব্যান্ডেজ। যেন কেউ খুব যত্ন করে পরিষ্কার করে তারপর ব্যান্ডেজ করেছে, নিয়ম মেনে, নিঃশব্দে।
শৈলীর নিঃশ্বাস আটকে এলো। মাথার ভেতর তখনই ঝড় বইতে শুরু করল। কারা এই কাজগুলো করল? কে ওর ঘুমন্ত অবস্থায় এতো মমতায় গায়ে কম্বল দিল? কে কোলবালিশ রাখল? আর সেই আঙুলের ব্যান্ডেজ, কেউ ওর না বলা ব্যথাও অনুভব করেছে? কে হতে পারে? নিশান ভাই? নামটা মাথায় আসতেই নিজেই বিরক্ত হলো শৈলী। এটা তো সম্ভবই না। অসম্ভব! কিন্তু...মনের গভীর থেকে একটা মৃদু আওয়াজ উঠল
—" উনিই তো পারে, নিশান ভাই ছাড়া আর কে?
শৈলীর গলা শুকিয়ে এলো। নিজের বুকের ভেতর হাত রাখলে অনুভব করত, ওর হৃদপিন্ড যেন কিছু একটা আন্দাজ করছে, যেন কোন এক অদৃশ্য নিশ্বাস ওর গালে এসে ঠেকেছে কিছুক্ষণ আগেই। ও ধীরে মাথা নাড়িয়ে ফিসফিস করে বলল,
—" কে এসেছিল? কেন এসেছিল? আমি তো কাউকে ডাকিনি...তবুও কেউ এসেছিল.."
তারপর হঠাৎ নিজের কাঁধ জড়িয়ে বসে পড়ে বিছানায়। কাঁপা ঠোঁটের কোণে একফোঁটা হাসির ছায়া খেলে যায়, ভালোবাসা কখনো কখনো এমনভাবে আসে, না বলে, না জিজ্ঞেস করে,কেবল পাশে থেকে যায়।
°°°°°°°°°
টংয়ের দোকানে পাশাপাশি বসে চা খাচ্ছে নিশান আর আকাশ। আকাশের হাসি দেখে নিশানের গুটিকয়েক মারাত্মক ঘুষি মারতে ইচ্ছে করছে। কোনোরকমে দাঁত চিপে নিজেকে সামলে রেখেছে নিশান। এদিসে হুহা করে হেসেই যাচ্ছে আকাশ। অনেকক্ষণ পর হাসি থামার উপক্রম না দেখে নিশান এবার বেঞ্চের উপরে থাকা ছুরিটা নিয়ে বলল,
—" ট্রাস্ট মি আকাশ, আর একবার দাঁত কেলালে এটা পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে দেব। মুখ দিয়ে গিলবি, ফুঁটোটা দিয়ে সব বেরিয়ে যাবে।"
আকাশ আরো জোরে হাসতে হাসতে বলল,
—' ভাই আমার, যে কথা শোনালি তুই। হেসে যে মরে যাইনি এই অনেক। কী যেন বললি তুই? আবার বল না প্লিজ!"
নিশান দাঁত খিঁচে চোখ বন্ধ করে আবারো বলল,
—' আমি ওকে বিয়ে করতে চাই।"
আকাশ আবারো ফিক করে হেসে ফেলে,
—" কাকে বিয়ে করতে চাও সোনা? যদি একটু ক্লিয়ারলি বলতে..না মানে আমি আবার বেশ অবুঝ তো!"
নিশান এবার দাঁত কিড়মিড় করে তাকালে আকাশ মুখে চায়ের কাপটা ঠোঁটে ধরেই হাঁ করে হেসে ফেলল, ফলে অর্ধেক চা গড়িয়ে পড়ল গালে। নিজেই কাপ নামিয়ে কাশি চাপার ভান করে বলল,
—" এই যে ভাই নিশান, তোমার মুখে হালকার উপর ঝাপসা প্রেমের কথা শুনে আজকে যদি বজ্রপাত না হয়, তাহলে সত্যিই আবহাওয়া অফিসকে ধন্যবাদ দিতে হবে!"
নিশান কপাল চাপড়ে বলল,
—" আকাশ, প্লিজ! আর একবার হাসলে তোর দাঁতের জায়গায় শুধু মাড়ি থাকবে! আই সোয়ার!"
আকাশ এবার গলা নামিয়ে ভাবুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
—" তাহলে এখন তুই বলছিস...তুই ওকে বিয়ে করতে চাস? মানে তুই! যেই কিনা ছোটবেলায় ওর জোড়া বিনুনি টেনে বলেছিলি—তোর মাথার চুলে পাখির বাসা হয়েছে?"
নিশান কাঁচুমাচু করে বলল,
—" ওটা তখন ছোট ছিলাম, আর এখন..!"
আকাশ তৎক্ষণাৎ যোগ করল,
—" এখন মনে হচ্ছে পাখিটা তোর হৃদয়ে বাসা বেঁধেছে? ভাইরে ভাই! কোথা থেকে কোথায় গেলি! ভালোবাসার এই মহাসমুদ্র পাড়ি দিচ্ছিস, আমি ভেবেছিলাম তুই এক্সেল শিট আর রেজিস্ট্রির বই নিয়ে বুড়ো হয়ে মরবি!"
নিশান এবার ঠোঁট কামড়ে নিচু গলায় বলল,
—" এমন ভান করছিস যেন কিছুই জানিস না। একদম নাটক করবিনা তুই। ভবিষ্যতে কিন্তু ভালোই পস্তাবি।"
আকাশ পাত্তা না দিয়ে টেনে টেনে বলল,
—" আসলে কি হয়েছে বলতো নিশান, তুই লোকলজ্জার ভয়ে বলতে পারছিস না যে ওকে দেখলেই সব ভুলে যাস তুই, হাসলেও লাগে যেন বুলেট। আর চোখে চোখ পড়লে মনে হয় রক্তচাপটা একবারে ছাদের উপর চলে যায়। ইশশশ... ভাইরে! তুই তো একেবারে রোমান্টিক হিরো হয়ে গেছিস। তোকে এখন একটা সাদা পাঞ্জাবি আর হাতে একটা গোলাপ দিয়ে পোস্টার বানানো উচিত, শিলপাটা, আমি বাঁচি তোর চোখে, মরতে চাই তোর কোলে!"
নিশান এবার বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
—" আর কিছু বললে টংয়ের চা না, তোর নাকে গরম পানি ঢেলে দেব। ফালতু কথাবার্তা বন্ধ করবি?"
আকাশ হেসে পিঠে চাপড় মেরে বলল,
—" ঠিক আছে ঠিক আছে, আমি থেমে গেলাম। কিন্তু একটাই কথা বলি ভাই, এই যে এত কষ্ট করে উহুম উহুম অনুভূতি এনেছিস, সময় থাকতেই বলে দে, কারণ একদিন যদি দেরি হয়ে যায়, তুই এই টংয়ের দোকানেই বসে কান্না করবি, আর আমি তখন শুধু বলব,‘তোরে বলছিলাম রে হাবলা!"
নিশান দাঁতে দাঁত চেপে ফিসফিস করে বলল,
—" আগে লামিয়ার নাটক শেষ হোক, তারপর ওকে ঠিক করে সব বলে দেব।"
আকাশ এবার নিঃশব্দে চোখ বড় করে বলল,
—" নাটক? আরে ওটা তো বাসর রাতের নাটক! তোর জীবনটাই এখন থিয়েটার ভাই!"
নিশান এবার মুখ ঘুরিয়ে চায়ের কাপটা এক চুমুকে শেষ করে বলল,
—" হ্যাঁ, আমি থিয়েটারের হিরো না হতে পারি, তবে ওর জীবনের একমাত্র রিয়েল হিরো হবো, এবার যেভাবেই হোক!"
আকাশ এবার মুখ গম্ভীর করে বলল,
—" ওমা! এতো ডায়লগ! হিরো সাহেব, তাহলে যাও! নাটক শেষ করে নায়িকাকে জিতে আনো! আর সবসময় ও' ও না করে শৈলী নামটাও তো নিতে পারো। মুখে কি এলার্জি আছে নাকি?"
তাৎক্ষণিক বিষম খেলো বিচারা নিশান। গলায় চা আটকে গেলো তার। জ্বলন্ত আগুনের ন্যয় চোখ গরম করে নিশান আকাশের দিকে তাকিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে বলে উঠে,
—" আকাশ, তুই আমার ধৈর্যের সীমা পরীক্ষা করিস না! আর একবার ওর নাম নিয়ে টিজ করলি তো এই টং দোকানের বেঞ্চ দিয়েই পেটাবো! ঠোঁট দিয়ে বলার আগে মাথায় চেপে ঢুকিয়ে দিবো নামটা!"
আকাশ এবার গালে হাত দিয়ে নাটুকে ভঙ্গিতে বলল,
—" ওফ্! কী রে, এত রাগ! আমি যদি না বলি, তাহলে তোর এই মুখ দিয়েই তুই কবে বলবি শৈলী, আমি তোমায় ভালোবাসি। স্বপ্নেও তোকে তো দেখি শুধু হুঁ হা করতে!"
নিশান এবার ঠোঁট কামড়ে বলল,
—" আমি কাউকে বলতে আসিনি যে আমি... হাওএভার, আমি শুধু প্রমাণ দিতে চাই আমি ছাড়া ওর পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। মুখে বললে সবাই পারে।"
আকাশ এবার কপালে ভাঁজ ফেলে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
—" তুই সত্যি ভালোবাসিস রে, এত গভীরভাবে। শুধু প্রেম নয়, এটা দায়, দায়িত্ব, মায়া। তোর ও যদি কখনো বুঝে ফেলে, তোকে হারানোর ভয়েই বুঝি, কাঁদবে, আবার হয়তো তোর বুকে এসে মাথা রাখবে একদিন। ভেবেই লজ্জা লাগছে আমার! "
নিশান এবার মৃদু হেসে বলল,
—" তখনও তুই আমার পাশেই থাকবি তো আকাশ?"
আকাশ এবার হাত বাড়িয়ে চায়ের কাপটা ঠুকে বলল,
—" আমি ছিলাম, আছি, থাকবো। তবে একটা কথা বলি বন্ধু, ওকে ভালোবাসিস। এটা ওকে বলবি, ঠিকভাবে, একদিন, নাটকের পরেই। কারণ মেয়েরা বোঝে চোখের ভাষা, কিন্তু নিশ্চিত হতে চায় শব্দে।"
নিশান এবার চায়ের দোকান থেকে চোখ সরিয়ে আকাশের দিকে তাকাল, চোখে মিশ্র অনুভূতির ধোঁয়া। তারপর ধীরে মাথা নাড়ল। হুট করে আকাশ কেশে উঠে বলল,
—" বন্ধু...কাল বাসর রাত কেমন গেল?"
নিশান কিছুক্ষণ ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে আকাশকে অবাক করে মৃদু হেসে বলল,
—" অনেক জোস। একদম ঝাকানাকা টাইপ বাসর করেছি আমি।"
আকাশ এবার ঠোঁট গোল করে "ওও" বললে নিশান হুট করে অন্যমনস্ক হয়ে বলে উঠে,
—" গতকাল মেয়েটা আঙুল কা"টলো কীভাবে কে জানে! "
আকাশ ঘাড় উঁচিয়ে বলল,
—" আহারে, আদর করে দিতে পারিস নি?'
নিশান এবার চোয়াল শক্ত করে তাকালে আকাশ বিস্কুট চায়ে ভিজিয়ে ঠোঁট চেপে হেসে ফেলে। নিশান তর্জনী তুলে বলে,
—" একদম এক লাথি মেরে বুড়িগঙ্গায় আঁছাড় মারব তোকে। লাথি চিনিস তো?"
মুহুর্তেই আকাশের চোখজোড়া চকচক করে উঠলো,
—" কী যে বলো না বন্ধু! এসব চেনাজানার ব্যাপারে আমি খুবই এক্সপার্ট, শোনো তবে,,"
বর্ননার ঝড়ের আভাস পেয়ে নিশান এবার চোখ খিঁচে বলল,
—" আকাশ...নো! "
আকাশ চা সাইডে রেখে বলে উঠলো,
—" আরে বন্ধু শোনোই তো।
আকাশ ঘাড় উঁচিয়ে একটা নাটুকে ভঙ্গিতে বলল,
—" লাথি চিনিস বলছিস! ধুর! তুই তো নিজেই জানিস না লাথি কাকে বলে! শোন, আমি তোকে বুঝিয়ে বলি।"
নিশান এবার ঠোঁট শক্ত করে চায়ের কাপটা নামিয়ে রাখল। আকাশ হাতের মুঠি বানিয়ে রীতিমতো মঞ্চ কাঁপানো স্বরে শুরু করল,
—" লাথি মানে জানিস কী? এক ধরনের আর্ট! এক পায়ের ভরসায় দাঁড়িয়ে, অন্য পায়ে যে শক্তি সঞ্চয় করে সামনের জনের পেট বা বক্ষদেশে এমনভাবে আছড়ে দেওয়া হয়, যাতে পাঁজরের হাড় গুনে বলা যায় হ্যাঁ, এখানে মোট ১২টা ছিল!"
নিশান এবার ঠোঁট কামড়ে ধরে কপাল চাপড়ে বলল,
—" আকাশ, হয়েছে চুপ করে শেষ কর, সাবধান করছি...!"
আকাশ থামেনি, বরং এবার মাটিতে পা ঠুকে বলল,
—" তুই আগে শিখে নে। এবং ওই লাথির কম্পনে, ভিকটিম হালকা লাফ দিয়ে পেছনের পাঁচটা চেয়ার গুনে মাটিতে পড়ে যায়, পাশে রাখা কাচের গ্লাসগুলো থরথর করে কাঁপে আর কেউ না কেউ বলে উঠে, ভাই, কি দিছিলেন! কিপ্টা না কিপটে!"
এটুকু বলে আকাশ নিশানের দিকে চেয়ে ধমক খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, কিন্তু নিশান এবার ঠাণ্ডা স্বরে বলল,
—" তোর নাটক দেখে মনে হচ্ছে তোর পেছনে এখনই একটা ডেমো লাথি দেয়া দরকার।"
আকাশ হেসে উঠে বলল,
—" ঠিক আছে, ভাই, দিস। কিন্তু প্লিজ, ওই ঝাকানাকা বাসর কথাটায় একটু ব্যাখ্যা দিস, যেন আমিও জানি এই বাসর কীভাবে শুধু গোলাপে না, ব্যান্ডেজ দিয়েও সাজে!"
নিশান এবার বিস্কুট মুখে ঢুকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
—" অভিশাপ দিলাম,একদিন তোরও এমন বাসর হবে রে আকাশ, তখন বুঝবি ব্যান্ডেজ লাগানোর জায়গা কোনটা!"
আকাশ হাতজোড় করে বলল,
—" আমিন ভাই! তোর মুখেই মধু পড়ুক! শুধু এখন বল গতরাতে কী হয়েছে। প্লিজ এক্সপ্লেইন দ্য ঝাকানাকা বাসর!"
নিশান এবার বিস্কুটটা শেষ করে চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে চোখ মেলল আকাশের দিকে। চোখের ভেতরে একরাশ ঘুমহীন ক্লান্তি, আর নিচে লুকানো একরাশ কোমলতা। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে সূক্ষ্ম হাসি টেনে বলল,
—"গতরাতে কিছুই হয়নি, আকাশ। শুধু একজন মানুষ কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছিল। আমি গিয়েছিলাম ঠিক তখনই। দরজার ফাঁক দিয়ে ওকে দেখতে পেয়েছিলাম, পিঠটা কাঁপছিল, বালিশ ভিজে যাচ্ছিল অশ্রুতে। ওর চোখ থেকে পানি মুছে দিয়েছিলাম। কাঁপা শরীরটা ঢেকে দিয়েছিলাম আমার চাদর দিয়ে। তারপর ধীর হাতে আঙুলের কাটা জায়গাটা পরিষ্কার করে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিয়েছিলাম। তাতে ব্যথা লেগেছিল হয়তো, কিন্তু সে ঘুমিয়ে ছিল, অনুভব করেনি।"
আকাশ এবার হাসি থামিয়ে গম্ভীর হয়ে গেছে। নিশান আবার ধীরে বলে চলে,
—"বিছানার পাশে একটা কোলবালিশ দিয়েছিলাম, যেন ও বুঝতে না পারে একা আছে। তারপর আমি, ওই এক কোণে রাখা ছোট্ট সোফায় বসে ছিলাম সারা রাত। একটিবারও চোখ না সরিয়ে, ওর দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মনে হচ্ছিল, চোখ ফিরালেই হারিয়ে যাবে।"
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে নিশান নিচু গলায় যোগ করল,
—"ভোরের আলোয় যখন ঘরটা একটু একটু করে আলোকিত হচ্ছিল, তখন নীরবে বেরিয়ে এসেছিলাম। ও যেন কখনো জানতেই না পারে, কেউ সারারাত ওর চোখের পাহারাদার হয়ে ছিল।"
আকাশ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। এরপর হঠাৎ বলল,
—" ডিজিটাল বাসর করেছিস ভাই। এমন ভদ্র বাসর দুটো দেখিনি। ভদ্রতার বাসর সেড়ে কি নিজেকে ভদ্র প্রমাণ করতে চাইছো তুমি বন্ধু! আমি কিন্তু খুব ভালো করেই জানি লাইসেন্স টা পেয়ে গেলে এইসব ভদ্র বাসর কিসে রুপান্তরিত হবে! "
চলবে.......…
নোট— ছোট পর্বের জন্য দুঃখীত🫶 একটু বিজি আছি..তাই লিখতে পারিনি। আজ শুধু নিশানের বিয়ের রহস্যটাই বের করলাম।
⚠️ 220+ রিয়েক্ট না হলে পরের পর্ব দেব না হুহ😞