ফন্ট সাইজ:
থিম:
হিমরূপার উষ্ণছোঁয়া

৮ম পর্ব

লেখক: অনামিকা তাহসিন রোজা

#হিমরূপার_উষ্ণছোঁয়া

#পর্ব_৮

#কলমে_অনামিকা_তাহসিন_রোজা

শৈলী লজ্জায় আয়নায় তাকাতেই পারছেনা। আজ সে অনেক ভয়ানক এক কাজ করে ফেলেছে। নিশানের সাথে শপিং এ বের হবে বলে একটা সুন্দর সাদা রঙের গোল জামা পড়েছে, আর লাল রঙের ওড়না। কানে ছোট্ট একটা দুল, আর সাহস করে চোখে একটু কাজলও লাগিয়েছে। নিশানের আদেশ অনুযায়ী চকলেট ফ্লেভারের লিপবাম টা দিতে ভুলল না। কিন্তু সাজগোজ শেষ করেই শৈলীর মনে হলো সে একটু বেশিই পাগলামি করছে। কিন্তু তারই বা কি আর করার! আজ নিশান ভাইয়ের সাথে যাবে বলে তার তো পেটে হাজারো প্রজাপতি উড়ছে। সেও চাইছে একটু সুন্দর করে নিজেকে উপস্থাপন করতে। কিন্তু আগে কখনোই এভাবে সাজেনি শৈলী। তাই এখন ঘর থেকে বের হতেও ভয়, অসস্তি লাগছে। না জানি সবাই কি বলবে?

আসলে মেয়েদের এক অদ্ভুত অভ্যাস রয়েছে। তারা সর্বদাই চায় নিজের প্রিয় মানুষ টার কাছে নিজেকে সর্বশ্রেষ্ঠ সুন্দরী হিসেবে উপস্থাপন করতে। কোনোকিছুর যেন কমতি না থাকে, এই চিন্তা মাথায় রেখেই প্রতি কদমে এগিয়ে চলে মেয়েরা। কিন্তু মাঝে মাঝে দেখা যায়, কিছু আধুনিক যুগের সাথে গা ভাসানো অনুভুতিহীন পুরুষ সবসময়ই মেয়েদের খুঁত খুঁজে বেড়ায়। কোনো কিছুতেই সন্তুষ্ট হতে রাজি নন তারা। অথচ সে এটা ভাবেনা, এই যে মেয়েটা তার সামনে আসলো, না জানি কত আকুল হয়ে মনে একরাশ আবেগ নিয়ে এসেছে! এখন যদি তার সাজগোজ বা খুঁত নিয়ে কিছু বলা হয়, সেটা তীরের মত গিয়ে বিদ্ধ করে নারীদের হৃদয়ে। কারন নারীরা তো নিজেদের সবটুকু দিয়েই চেষ্টা করে প্রিয় পুরুষটার কাছে নিজেকে শ্রেষ্ঠ করে উপস্থাপন করতে। এসব কি তারা বোঝেনা?

তবে শৈলী এসব ভেবে মন খারাপ করল না। তার নিশান ভাই তো এমন না, তাই না? উনি তো কখনোই এমন কিছু করেন নি। তবুও কেনো বারবার ইচ্ছে করে একেকসময় একেক রূপে গিয়ে তাকে মুগ্ধ করে দিতে, কেনো অবচেতন মনটায় একটুখানি প্রশংসার লোভ জেগে উঠে? এসব কি সবার ক্ষেত্রেই হয়?

হুট করেই দরজায় ধাক্কা পড়তে লাগলো, বাইরে থেকে ভেসে এলো মিমির অস্থির উৎফুল্লিত আওয়াজ,

—" শৈলী, কই রে তুই? নিশান ভাই গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছে। তাড়াতাড়ি যা, ভাইয়ার কাছে আছাড় খাবি নাহলে!"

শৈলী —"আসছি" বলেই তাড়াতাড়ি করে ওড়নাটা গলায় ঠিকঠাক করে নিল। তবুও ভয় কাটছে না। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে একবার আয়নার দিকে তাকালো,সাদা গোল জামায় যেন দুধ-সাদা নিঃসঙ্গ চাঁদের মতো লাগছে নিজেকে, লাল ওড়নায় এক টুকরো উৎসব। কিন্তু তবুও মুখে একরাশ শঙ্কা। চোখে কাজল, ঠোঁটে চকলেট লিপবাম, সবকিছু যেন হঠাৎ করে খুব সাহসী মনে হচ্ছে। নিজেকেই সাহস দিল শৈলী, তারপর ধীরে দরজা খুলে বের হলো।

আর বেরোতেই ঠিক সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মিমির মুখটা এক মুহূর্তে থেমে গেল। ও চোখ বড় বড় করে শৈলীর দিকে তাকিয়ে বলল,

—" হোয়াট দ্য হেল! ও আমার আল্লাহ! এটা কে রে ভাই? তুই নাকি? আয়হায়! এ কি রূপ তোর!"

শৈলী এবার ঠোঁট ভিজিয়ে মেকি হাসার চেষ্টা করল, আর কিছুক্ষন মুখে হাত দিয়ে হেসে উঠল মিমি,

—" নিশান ভাইয়ের কাছে তো নয়, তুই তো আমার কাছেই আছাড় খাবি আজ! কী রে? আজ সালোয়ার কামিজ ছেড়ে এত সুন্দর সাজ, আর তোর ঠোঁটে আবার গোলাপি আভাসও পাচ্ছি! ইশশ! এ যে একদম.....লালপরি লাগছে তোকে।"

শৈলী লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। তার চোখের কোণে লুকানো হাসিটা চাপা দিতে পারল না। শুধু তাই নয়, বসার ঘরে নেমে আসার পরও সবাই এমনভাবে তাকিয়ে রইলো যেন শৈলী এক মুহুর্তের জন্য মানুষ থেকে পাখি হয়ে গেছে। কি এক অবস্থা! আসলে, ছোট থেকেই শৈলী বড্ড সাধারন ছিল। চুলও কখনো তেমন খোলা রাখেনি সে, রঙচঙা জামাকাপড় দেখা যায়না বললেই চলে, এমনকি চোখে হয়তো আজ এই প্রথমবার কাজল পড়ল। ঠিক এই কারনেই বাড়ির প্রত্যেকটা সদস্য অবাক। তাদের এমন মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখে মনে মনে ঢোক গিলল শৈলী, নিশান ভাইয়ের কথা মনে পড়ল তার। নিশান ভাইও কি সবার মত অবাক হবে?

রাশিদা তালুকদার বাদে বাড়ির সব সদস্যের ঢালা প্রশংসা নিয়ে লাজুক মুখে সদর দরজা পার হলো শৈলী। এবার তার সামনে সবচেয়ে বড় যুদ্ধক্ষেত্র! নিশান গাড়ির দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, গায়ে ফিটফাট করে জড়ানো শুভ্র সাদা শার্ট এক হাতে ঘড়ির কাঁচে ঠুকঠাক করে ঘড়ির কাটায় চোখ রেখেছে। বিরক্তি স্পষ্ট তার চোখেমুখে। শৈলী মুগ্ধ হয়ে হাসলো। নিশান ভাইয়ের শার্টের সাথে তার জামার রঙের মিল হয়েছে, কি যে আনন্দের ব্যাপার!

শৈলী এবার ঠোঁট গোল করে শ্বাস ফেলে আসতে থাকলো গাড়ির দিকে। ঠিক তখনই নিশান মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। আর সেই মুহূর্তেই অঘটনটা ঘটলো৷ সময় যেন থমকে গেল এক মুহুর্তে। চোখজোড়া বিস্ময়ে বড় হয়ে স্থির হলো নিশানের চোখের কালো মণিদুটো। ঠোঁটজোড়াও অজান্তে ফাঁক হয়ে গেলো। এ কি দেখছে সে! কে এই মেয়ে? এটা কি শৈলী? সাদা গোল জামা, লাল ওড়না, খোলা চুলে আলতো ঢেউ, চোখে প্রথমবারের মতো কাজলের স্পষ্ট রেখা, কানের ছোট্ট দুলজোড়া চকচক করছে সকালের আলোয়, আর ঠোঁটে হালকা গোলাপি ছায়া। এ রূপ তো আগে কখনো দেখা হয়নি নিশানের, এ কেমন অপরিচিত মারাত্মক রূপ শৈলীর। নিশান অস্পষ্ট ফিসফিস করে বলল,

—" শী ইজ রিয়েলি ট্রায়িং টু কিল মি! "

তার চোখ এক সেকেন্ডের সরে এসে আবারো তাকালো। গলার স্বর আর কঠিন থাকল না, চোখ থেকে বিরক্তি কোথায় যেন উবে গেল। নিশান চুপচাপ তাকিয়ে রইল। চোখ নামাতে পারল না, কারণ যেটা দেখছে, সেটা সে কোনোদিন কল্পনাও করেনি।

শৈলী লাজুক পায়ে সামনে এগিয়ে এলো। একহাতে ওড়নার কোনা মুঠো করে ধরা, অন্যহাতে ছোট ব্যাগ। চোখ তার ভিজে, কিন্তু মাথা নিচু। সেই মুখে একটুকরো অনিচ্ছা, একটুকরো আশা। একেবারে নিশানের সামনে এসেই থামলো শৈলী। এ পর্যায়ে নিশান ভ্রু কুঁচকে তাকালো। শৈলী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

—" চলুন...!"

নিশান এবার ঠোঁট ভিজিয়ে শ্বাস নিল বড় করে। অন্যদিকে ফিরে কোঁমড়ে দুহাত রেখে দম নিয়ে শৈলীর দিকে ত্বরাক করে তাকালো, কিছুক্ষন কাজলপড়া চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে খুব তীক্ষ্ণ স্বরে জানিয়ে দিল,

—" আমি ড্রাইভ করতে পারবনা! "

শৈলী অবুঝের ন্যায় তাকিয়ে রইলো নিশানের দিকে। এতক্ষণে খেয়াল করল লোকটা চরম ভাবে ঘামছে। শৈলী এবার অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করল,

—" কেনো নিশান ভাই? শরীর খারাপ লাগছে?"

নিশান দুদিকে মাথা নেড়ে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে বলল,

—" নাহ!"

শৈলী আরো আকুল হয়ে শুধালো,

—" তাহলে এমন করছেন যে! ড্রাইভ করতে পারবেন না কেনো?"

নিশান এবার শৈলীর চোখের দিকে তাকালো৷ মেয়েটা কি তার সাথে ফাজলামো করছে? অপ্সরার মত সেজে তার সামনে আসলো, নিশানের বুকে কাঁপন ধরালো, আর এখন নিজেই কারন জিজ্ঞেস করছে! অদ্ভুত মেয়ে তো! রীতিমতো ঢোক গিলে হাত মুঠো করে নিশান বলে উঠলো,

—" এই মুহুর্তে ড্রাইভ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। হাত জমে গেছে আমার। চল রিকশায় যাই!"

বলেই এগিয়ে গিয়ে গাড়ির চাবি দারোয়ানের হাতে তুলে দিল নিশান। এদিকে শৈলী হা করে তাকিয়ে রইলো। এইমাত্রই না মানুষটা ঠিকঠাক ছিল। কী হলো আবার? কিন্তু রিকশায় যাওয়ার কথা শুনেও শৈলী বেশ খুশি হলো। তার অনেকদিনের শখ ছিল নিশানের পাশে বসে রিকশা নিয়ে ঘোরা। আজ বোধহয় সেটা পূরণ হবে। তাই অত চিন্তা না করেই রিকশায় উঠার জন্য হাসিমুখ করে রইলো শৈলী। এদিকে ও বুঝতেই পারলো না কেও একজন তাকে দেখে বরফের মত স্তব্ধ হয়ে গেছে বলেই ড্রাইভ না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

°°°°°°°°°

রিকশাটা এসে থামলো বাড়ির মূল ফটকের সামনে। রিকশার চাকায় তখন কিশোরী রোদ এসে পড়েছে, আর তার সঙ্গে যেন একধরনের পরিপূর্ণ সকাল এসে মিশেছে শৈলী আর নিশানের প্রথম একসাথে চলার মুহূর্তে। নিশান ঠোঁট চেপে দাঁড়িয়ে রইল রিকশার পাশে, নিজেরই ভিতরে এক অদ্ভুত অস্থিরতা জমে উঠেছে,যেন হার্টবিট ছাপিয়ে শরীরের প্রতিটি শিরায় রক্ত নয়, চলাচল করছে শৈলীর লুকচুরির রঙ! সাদা জামা, লাল ওড়না, হালকা কাজলের ছায়া আর সেই মিষ্টি ঠোঁটজোড়া, ভেতরে ফিসফিস করে উঠল নিশানের মন। কিন্তু বাইরের কণ্ঠস্বর রুক্ষ আর খোলামেলা রাখতে হলো।

নিশান এবার ফট করে রিকশায় উঠে বলল,

—" চল, ওঠ!"

শৈলী চোখ সরু করে তাকালো। নিশান ভাই কি কিছুই জানেন না! কেনো? একটু হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে শৈলীকে উঠতে সাহায্য করলে কি-ই বা হতো? মনে মনে মুখ ভেঙচিয়ে শৈলী একটু ইতস্তত করে, তারপর নিজের ওড়নার খুঁটিটা সামলে ধীরে ধীরে রিকশায় উঠে বসলো। একেবারে একপাশে গিয়ে বসলো সে, যেন নিশানের জায়গাটা আগেই ছেড়ে দিল। চোখ নিচু করে রেখেছে, কিন্তু গালজোড়া লাল, আর কপালের ঠিক মাঝখানে বিন্দু বিন্দু ঘাম।

নিশান কয়েক সেকেন্ড পাথরের মত বসে থেকে তারপর নিজের শরীরের ওপর বিরক্ত হয়ে মনে মনে গালাগাল দিল -" আশ্চর্য, দেখছিস না! একদম সাধারণ একটা মেয়ে., তাও হাত কাঁপছে তোর! আগে কখনো দেখিস নি ওকে? এত কাঁপা-কাঁপির কি আছে। সামান্য কাজলই তো দিয়েছে! আর তো কিছু হয়নি!"

তারপর এক নিঃশ্বাসে মাথা নাড়িয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে নিশান শৈলীর পাশে এগিয়ে গিয়ে ঠিকমতো বসল। রিকশাচালক জিজ্ঞেস করলো,

—"কোথায় যাবেন ভাই?"

নিশান অল্প থেমে বলল,

—" যমুনা ফিউচার পার্ক।"

রিকশা চলতে শুরু করলো। এত কাছে বসা, তবু যেন এত দূর। শৈলীর ওড়নার একপ্রান্ত উড়ে এসে নিশানের হাত ছুঁয়ে গেল বারবার। নিশান একবার চেষ্টা করল সরিয়ে রাখতে, কিন্তু মনে হলো, ওড়নার এই স্পর্শই তার আজকের নীরব বেহালার সুর। শৈলী ধীরে ধীরে চোখের কোণ দিয়ে তাকাল পাশের মানুষটার দিকে, নিশানের চেহারায় এখনো ধরা পড়ছে না কোনো প্রশংসা বা রাগ, বরং খুব নিঃশব্দ, খুব গভীর এক অনুভূতি। শৈলী একটু প্রশংসা তো আশা করেইছিল! কিন্তু এখন পর্যন্ত কিছুই পেলো না তেমন!

শৈলী সাহস করে অবশেষে বলেই ফেললো,

—" আপনি আজ খুব অস্বাভাবিক আচরণ করছেন নিশান ভাই। আপনি ঠিক আছেন তো? অসুস্থ লাগছে?"

নিশান তাকিয়ে রইলো শৈলীর দিকে। তার কাছে মনে হলো, একটা ছুরি তাকে আ"ঘাত করার পর নিজেই জিজ্ঞেস করছে, আপনার বেশি কি ব্যাথা লেগেছে! বিষয়টা আজব লাগলো নিশানের কাছে। তারপর ধীরে ধীরে চোখ সরিয়ে, একটুখানি হাসলো। এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে বলল,

—" ঠিক আছি।"

নিশানের সংক্ষিপ্ত জবাব টাই শৈলীকে বুঝিয়ে দিল সে মোটেই কথা বলতে ইচ্ছুক নয়। এ পর্যায়ে মাথা নিচু করে হতাশ হয়ে বসে রইলো শৈলী। রিকশা ধীর গতিতেই এগোচ্ছে। কারন ঢাকার জ্যাম তো মাশাআল্লাহ! নিশান আড়চোখে তাকালো গুটিয়ে বসে থাকা শৈলীর দিকে, ভয় হলো যদি পড়ে যায় রিকশা থেকে। সাথে সাথে নিশান শৈলীর এক হাত ধরল শক্ত করে, মুখে বলল,

—" সাবধানে এগিয়ে এসে বোস, পড়ে যাবি তো!"

শৈলী মুচকি হাসলো, এই ছোট্ট যত্নটাই কতটা সুখখর তার জন্য! সত্যিই মেয়েরা বোধহয় অল্পতেই খুব বেশি খুশি হয়ে যায়! এ পর্যায়ে হুট করেই নিশান ঢোক গিলে খুব কঠোর স্বরে বলল,

—" তুই কাজল পড়বি না শৈলী।"

শৈলী এবার কৌতুহলী চোখ নিয়ে নিশানের দিকে তাকালে নিশানও তাকায়। একে একে আবারো পরখ করে নেয়ে মেয়েটার পুরো মুখ, এরপর আবারো বলতে শুরু করে,

—" তুই চোখে কখনো কাজল পড়িস না, কখনো এভাবে চুল খোলা রাখিসনা, হুট করে এত সুন্দর করে নিজেকে সাজিয়ে তুলিসনা। নয়তো দেখবি একদিন আমি... আমি আর চোখের পলকই ফেলতে পারছিনা। এভাবে, এই রূপে শুধু একটা সময়েই তোকে দেখতে চাই আমি...সেই নিষিদ্ধ সময়টাতে। এর বাইরে কখনো এভাবে আমার সামনে আসবিনা, এটা আমার কড়া আদেশ। অকালে মরতে চাইছিনা আমি!"

শৈলী হতবাক হয়ে তাকিয়েই রইলো নিশানের দিকে। চোখের পলক পড়লনা। থমকে গেল মুহুর্তেই। নিশানের কণ্ঠে হঠাৎ এমন নিষেধ, তাও এতটা আবেগ আর জোরে মেশানো,ওর হৃদয়টাকে কেমন যেন ঝাঁকুনি দিয়ে নিল। চোখ মেলে চেয়ে রইল সে,নিশানের দিকে। লোকটা কোনোদিনও এতটা স্পষ্টভাবে কিছু বলেনি, এতটা অধিকার নিয়ে, এতটা গভীর ভরসার সুরে নয়।

রিকশার ঝাঁকুনিতেও যেই মানুষটা চোখ সরিয়ে নেয় না, সেই মানুষটা যদি একবারও নিজের ঠোঁটে এমন সংযমহীন অথচ আবরণে মোড়া ভালোবাসা ছুঁইয়ে যায়, তবে সে তো আর শুধুই ভালোবাসা থাকে না৷ সে হয় মর্যাদার দাবী।

শৈলী এবার হঠাৎ করেই সাহসী হলো, ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি টেনে নিচু গলায় বলল,

—" তাহলে আপনি আমাকে শুধু ওই সময়ের জন্যই সাজতে দেবেন? বাকি সময় আমি কি তবে নির্বর্ণ থেকে যাবো, নিশান ভাই?"

নিশান তার কথার উত্তরে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ে। গম্ভীর গলায় উত্তর দেয়,

—" বাকি সময়ে তুই আমার কাছে এমনিতেই রঙিন। তোকে যেভাবে প্রতিদিন দেখি তুই সেভাবেই রঙিন। চোখ বুঁজে ঘুমালেও তুই সুন্দর, ঘুম থেকে উঠলেও তুই সুন্দর, মুখ অভিমানে ফুলিয়ে রাখলেও তুই সুন্দর, অসুস্থ হয়ে চোখ ভারি হলেও তুই সুন্দর, কাঁদলেও তুই সুন্দর, হাসলেও তুই সুন্দর। তুই শুধুই সুন্দর, রঙিন সুন্দর! এই সৌন্দর্যের কোনো ব্যাখ্যা নেই।"

শৈলী ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে নিল। অন্যপাশে মুখ ফিরিয়ে হতবাক হয়ে থাকলো কিছুক্ষণ, এরপর আবারো আকুল চোখে নিশানের দিকে তাকিয়ে বলে উঠলো,

—" আপনি আমায় একবার ওই নিষিদ্ধ শব্দ টা বলবেন, নিশান ভাই? শুধু একটাবারের জন্য ভালোবাসি বলুন না! আর কিছু চাইবোনা তো আপনার কাছে।"

তবে এটা মনে মনেই আওড়ালো শৈলী। মুখে বলার সাহস নেই তার, শুধু তাকিয়েই রইলো। চোখ দিয়েই বোঝানোর চেষ্টা করল তার ক্ষুদ্র এই আবেদনটুকু! নিশান বরাবরের মত এবারেও বুঝল না।

°°°°°°°°°°

আধঘন্টা ধরে ঘুরে ঘুরে শাড়ি দেখেই যাচ্ছে নিশান। অথচ একটাও কিছু পছন্দ করছেনা। শৈলীও চুপচাপ নিশানের পিছু পিছুই হাঁটছে। মাঝেমধ্যে কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে, আবার চুপ করে সামনের দিকে চলে যাচ্ছে, প্রতিটি মুহূর্তে অনুভব করছে, দুজন পাশাপাশি হেঁটে চলার চেয়েও আর কোনো বড় সুখ এই পৃথিবীতে নেই। তবে এর মধ্যে নিশান নিজের দেয়া কথামত শৈলীকে বিভিন্ন ফ্লেভারের লিপবাম কিনে দেয়ার পাশাপাশি আরো কিছু টকটকে লিপস্টিক কিনে দিল৷ গোটা সময়টাতেই মুখ লজ্জায় নামিয়ে রাখলো শৈলী। এ আবার কেমন পরিস্থিতি!

একটা দৃষ্টিনন্দন শাড়ির দোকানে ঢুকে অবশেষে একটা মেরুন রঙের শাড়ি হাতে তুলে দেখলো নিশান। বেশ কিছুক্ষন স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে চোখ বুঁজে ভাবলো কিছু একটা। এরপর শৈলীর দিকে তাকিয়ে বলল,

—" দেখ তো, এটা তোর পছন্দ হয় কিনা?"

শৈলী শাড়িটার দিকে এক পলক তাকিয়ে নিশানের দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে বলল,

—" আপনার পছন্দ হয়েছে নিশান ভাই? "

নিশান ঠোঁট চেপে বলল,

—" হুম, ভালো লাগবে তোকে। "

শৈলী প্রথমে লাজুক হেসে চুপ করে রইল, তারপর নিশানের দিকে তাকিয়ে বলল,

—" তাহলে আমারো পছন্দ হয়েছে।"

নিশান মুচকি হেসে শাড়িটা প্যাক করতে বলল। শাড়ির শপিং শেষে তারা একটা পাঞ্জাবির দোকানে ঢুকলো। শৈলী কিছুটা অনিচ্ছা নিয়ে ঢুকেছে, কারণ ও মনে মনে ভাবছে নিশান কোন রঙের পাঞ্জাবি কিনবে। কিন্তু নিশান বোধহয় কোনো জাদুশক্তির মাধ্যমে শৈলীর মনের কথা বুঝতে পারল, তাই সেও মেরুন রঙেরই পাঞ্জাবি কিনল, এমনকি কৌশলে শৈলীর কাছে পছন্দ করেও নিল। যাবতীয় সবকিছু কেনাকাটা একদম শেষ হলো অবশেষে।

দুজনেই এবার পাশাপাশি হাঁটতে থাকলো। হাতভর্তি ব্যাগ, শৈলীর হাতে শাড়ি আর কিছু গয়না, নিশানের হাতে পাঞ্জাবি আর ঘড়ির প্যাকেট। চারপাশের ঝকঝকে আলো আর ঠাণ্ডা এসির মধ্যে একটা নরম, নিরব আনন্দ ছড়িয়ে আছে,ঠিক যেন স্বপ্নপুরীর মতো।

হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ শৈলীর চোখ আটকে গেল এক ঝলমলে আঙটির ওপর। কাঁচঘেরা এক দোকানের ভেতরে, একদম কর্নার শেলফে রাখা একটা সরল কিন্তু দারুণ নকশার রিং। পাতলা, মিষ্টি, তেমন ভারি নয়,ঠিক যেমন শৈলী চায়। সে হাঁটা থামিয়ে কাঁচের দিকে তাকিয়ে রইল। দৃষ্টিতে একধরনের কৌতূহল, আবার একটুখানি লুকানো আনন্দ। চোখে তার এক অদ্ভুত উজ্জ্বলতা, ঠোঁটে চাপা হাসি।

নিশান কয়েক কদম এগিয়ে গিয়েছিল। হঠাৎ লক্ষ্য করল শৈলী আর পাশেই নেই। ঘুরে দেখল, মেয়েটা কাঁচের সামনে দাঁড়িয়ে কী যেন দেখছে। একটু কপাল কুঁচকে এগিয়ে এলো নিশান, তারপর তাকিয়ে দেখল, শৈলী একটা আঙটির দিকে চুপ করে তাকিয়ে আছে।

নিশান কিছু না বলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ওর দিকে। এরপর জিজ্ঞেস করল,

—" কী দেখছিস?"

চমকে উঠল শৈলী। সঙ্গে সঙ্গে তড়িঘড়ি করে দুদিকে মাথা নাড়িয়ে বলল,

—" ক কই?... কিছু না নিশান ভাই। চলুন। বাসায় যাই। খিদে পেয়েছে আমার!"

নিশান ঠোঁট চেপে চুপ করে রইল। তারপর একবার শৈলীর চোখের দিকে তাকালো, তবে সে কিছুই বলল না। শুধু একটা হালকা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে চোখ সরু করে সেই দোকানের দিকে একবার তাকাল। এরপর আদেশ ছুঁড়ে দিল,

—" চল তাহলে, কিছু খেয়ে নিই!"

শৈলী মিষ্টি হেসে সায় দিল। নিশান মেয়েটার হাত আলতো করে ধরে হেঁটে একটা রেস্টুরেন্টের সামনে গিয়ে থামল নিশান। পেছন না ঘুরেই বলে উঠল,

—"চল, আজ তোর পছন্দের ফ্রাইড রাইস অ্যান্ড চিলি চিকেন খাবি। আর হ্যাঁ, কফিও খাব, বাট নো লিপবাম টুডে!"

নিশানের গলার সেই শেষ কথাটা শুনে শৈলী হঠাৎই থমকে দাঁড়াল। তারপর নিঃশব্দে ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে ফেলল। মনটা হালকা হয়ে গেল যেন। সে ঠিক করল, আজ কোনো জেদ করবে না। কেবল এই মানুষটার পাশে বসে, তার হাত থেকে একবার খাবার তুলে নেওয়ার অপেক্ষায় থাকবে। কারণ সে জানে, নিশান না বললেও, ঠিক বোঝে,সবটাই।

রেস্টুরেন্টের এক কোণায় টেবিল বরাদ্দ হলো। গাঢ় কাঠের টেবিল, হালকা সোনালি আলোয় চারদিকটা যেন আরও উষ্ণ হয়ে উঠেছে। শৈলী একটু মাথা নিচু করে বসে, চুল গলায় এসে পড়েছে। নিশান একবার তাকিয়ে নিয়ে, ধীরে ধীরে মেন্যু খুলল। পরিকল্পনা মোতাবেক সব অর্ডার করল। কিছুক্ষণের মধ্যে খাবার চলে এলো,ফ্রাইড রাইস, চিলি চিকেন আর দু’জনের জন্য এক কাপ কফি। শৈলী চামচে করে ভাত তুলে খেতে যাচ্ছিল, তখন নিশান হঠাৎ চামচ থামিয়ে বলল,

— "এই দিকটা থেকে একটু চুল সরা, মুখে এসে পড়ছে।"

চুপ করে থাকল শৈলী, তারপর ধীরে হাত তুলতেই নিশান এগিয়ে এসে নিজের হাতে চুল সরিয়ে দিল আলতোভাবে। শৈলী মুহূর্তে পাথরের মত ঠায় বসে রইল। নিশান কিছু না বলে আবার খেতে শুরু করল।

খাওয়ার মাঝে হঠাৎ শৈলী খুব ধীরে করে বলে উঠল,

—" খেয়ে কি বাড়িতে যাব নিশান ভাই?"

নিশান ভ্রু কুঁচকে বলল,

—" কেনো? আমার সাথে ডেটে যাওয়ার ইচ্ছে আছে নাকি?"

শৈলী সাথে সাথে বিষম খায়, ঠোঁট উল্টে মুখ কুঁচকে বলল,

—" না না, তেমন টা না। চলুন না, ফুচকা খাই একসাথে!"

নিশান থামল। এমনভাবে তাকালো যেন সবচেয়ে আজব একটা কথা তাকে বলা হয়েছে। চামচ নামিয়ে কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল,

—" ওইসব খাবার খাওয়া যাবেনা এখন। আমি ভালোই বুঝতে পারছি, তুই ওই ব্রিজের ওখানটায় রাস্তায় দাঁড়িয়ে ওইসব হাবিজাবি ফুচকা খেতে চাইছিস! আই ওন্ট আলাউ দিস!"

শৈলী হতাশ হয়ে মিনমিন করে বলল,

—" প্লিজ....!"

—" নো!"

শৈলী চুপচাপ নিশানের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ, এরপর মুখ ফোলানো গলায় বলল,

—" আপনি তো এমন ছিলেন না আগে! আগে তো মাঝেমধ্যে আমি বললে সত্যিই টেনে নিয়ে যেতেন ফুচকা খেতে! এখন একটু বললেই রেগে যান আপনি!"

নিশান এবার ঠোঁট চেপে একটু হাসল, চোখে বাঁকা দৃষ্টি এনে বলল,

—" কানের নিচে থাপ্পড় মারব। তুই নিজেই নিজের পথ আটকিয়েছিস। বেশি কথা বলিস না! এমন ভাবে সেজে না আসলে নিয়ে যেতাম!"

শৈলী বিস্মিত হয়ে তাকাল। তারপর লজ্জা পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে ফেলল অন্যদিকে, গালজোড়া রঙ ছুঁয়ে লাল হয়ে উঠছে। নিশান এবার হাসল পুরোপুরি, বলল,

—" ঠিক আছে, একটা কাজ করি। ফুচকার দোকান থেকে আমি প্যাক করিয়ে নিয়ে আসি, তুই বাড়িতে বসে খাবি। সিকিউর, ক্লিন, আর প্রাইভেট!"

শৈলী চোখ গোল করে তাকাল,

—" আপনি আমার জন্য ফুচকা কিনতে যাবেন? নিজের হাতে?"

নিশান হালকা ভ্রু নাচিয়ে বলল,

—" নাহ! মানুষের হাত দিয়ে আনিয়ে নেব!"

শৈলী খিলখিল করে হেসে উঠলো। নিশান কিছুক্ষণ আড়ালে মুগ্ধ হয়ে দেখলো হাসিটা। এরপর কিছু একটা ভেবে বলল,

—" তুই খাওয়া শেষ কর। আমি একটু আসছি!"

শৈলী অবাক হয়ে গেল। তারপর ধীরে হাসল, মাথা নিচু করে হ্যাঁ সুচক নেড়ে আবারো ভাত তুলল চামচে। চোখে কাজল ছুঁয়ে থাকা সেই চাহনি এবার টেবিলের কাঁচে প্রতিফলিত হলো,একটা মেয়ে, যার মনের ভেতরে ঠিক এই মুহূর্তেই বসন্ত নেমে এসেছে।

°°°°°°°°°°°°°°

রাত এখন অনেক গভীর। চারদিক নিস্তব্ধ, কেবল ঘড়ির কাঁটার টিকটিক শব্দটা যেন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। জানালার কাঁচ দিয়ে নরম চাঁদের আলো এসে পড়েছে বিছানার চাদরে। শৈলী চুপচাপ শুয়ে আছে তার নিজস্ব ঘরে, আলো নিভিয়ে দিয়েছে বহুক্ষণ আগেই, কিন্তু ঘুম তার চোখে নেই। তার চোখ এখন ফোনের স্ক্রিনে। একটু হালকা আলোয় জ্বলছে ওইটুকু ঘর। মুখে নরম এক হাসি, আর চোখে একচিলতে লজ্জা। হ্যাঁ, সে লুকিয়ে লুকিয়ে আজ শপিং মলের ভেতর বেশ কয়েকটা ছবি তুলেছে নিশানের। কখনো হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা, কখনো পাঞ্জাবি হাতে নিয়ে তাকিয়ে থাকা, আবার কখনো রিকশায় বসে পেছনের দিকে তাকানো সেই মুহূর্তের ঝাপসা একটা ক্লিক, সবই যত্ন করে তুলে রেখেছে সে।

ফোনের গ্যালারিতে ছবিগুলো একটার পর একটা স্ক্রল করছে শৈলী। একটা ছবিতে নিশান হালকা হেসে তাকিয়ে আছে দূরে কোথাও, হয়তো শৈলীর দিকেই, ক্যামেরা বুঝতেই পারেনি। শৈলী ছবিটার দিকে তাকিয়ে হঠাৎই ঠোঁট কামড়ে ধরল। একটু সময় নিয়ে জুম করল নিশানের ছবিটা। নিজেই ফিসফিস করে বলল,

—" নিশান ভাইয়ের চোখদুটো অনেক সুন্দর। সৃষ্টিকর্তা নিজ হাতে খুব যত্ন করেই বানিয়েছে....! ইশ! আমার যদি এমন চোখ হতো!"

তারপর হঠাৎই আরেকটা ছবি দেখে চোখ বড় বড় করে উঠল। নিশান একটা শার্ট ট্রায়াল দিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কলার ঠিক করছিল, সেই সময়েই কৌশলে ছবিটা তুলেছে শৈলী। ইশ! কি সুন্দর লাগছে!

শৈলী এক হাতে মুখ ঢেকে বিছানায় গড়াগড়ি খেতে লাগল। এসব পাগলামি সে নিজেই নিতে পারছেনা। মাঝে মাঝে ইচ্ছে করে এক দৌঁড়ে নিশানের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়তে, কিন্তু নিশানের সামনে গেলেই কেনো যেন সমস্যা পাগলামি উবে যায়, ঘিরে বসে একরাশ লজ্জা, আবেগ, অসস্থি! আর এক অসহ্যকর যন্ত্রণা! এই রোগ থেকে যে কবে মুক্তি মিলবে কে জানে। শৈলী দীর্ঘশ্বাস ফেলে একটু পর আবার বিছানায় চুপ করে বসে ফোনটা বুকের কাছে চেপে ধরে বলল,

—" আপনি যদি জানতেন, নিশান ভাই, আমি আপনাকে কতটা ভালোবাসি, তাহলে হয়তো একটু বুঝতেন... এই চুপচাপ ভালোবাসাও কত জ্বালার হয়! আপনি কি আমায় আমার মত ভালোবাসেন? আমি না আপনার অনুভূতি ঠিকঠাক বুঝতে পারিনা। কখনো তো মুখে বললেনই না! একটাবার, শুধু একটাবার আমি আপনার মুখ থেকে ভালোবাসি কথাটা শুনতে চাই নিশান ভাই। অন্তত নিজের মৃত্যুর আগে যেন কথাটা আমি শুনতে পাই— আপনার কাছে এটা আমার আবেদন!"

তারপর একটুখানি দম নিয়ে ফোনটা বালিশের নিচে রেখে চোখ বন্ধ করল শৈলী। চাঁদের আলোয় ঝিকমিক করছে তার গালের লাল আভা, লজ্জা, ভালোবাসা আর চেপে রাখা স্বপ্নে মোড়া এক অপার মুগ্ধতা।

°°°°°°°°°°°°°°°

—" আমার সোনা, জান, পাখি, রিমিসোনা, এমন করেনা প্রিয়তমা, আমার কথাটা একটু বোঝার চেষ্টা করো, দেখো, না মানে এখনই দেখার দরকার নেই, শুধু শোনো, তোমার হিটলার ভাইয়ের থুক্কু নিশানের বিয়েটা হয়ে যাক। আমি সাথে সাথে প্রস্তাব দিব, দরকার পড়লে তোমার বড় বাপের কাছে গিয়ে গড়াগড়ি খাবো। তুমি শুধু নিশানের বিয়েটা পর্যন্ত অপেক্ষা করো। তারপর সব হবে প্রমিজ!"

আকাশের কথা শুনে কলের অপর প্রান্তে রিমি ভ্রু কুঁচকে ঠান্ডা গলায় বলল,

—" আমার কি তোমাকে বিশ্বাস করা উচিত আকাশ!"

আকাশ সঙ্গে সঙ্গে হেসে বলল,

—" অবশ্যই! তুমি তো আমার হৃদয়ের রানী! আমায় বিশ্বাস না করলে কাকে করবে?"

রিমি এবার ঠোঁট চেপে ভাবলো একটু। তারপর বলল,

—" কিন্তু নিশান ভাই তো বিয়ের পর হানিমুনেও যেতে পারে! আরো বেশি দেরি হবে। তখন?"

এ পর্যায়ে মুখ কুঁচকালো আকাশ, চেহারা এক মুহূর্তে বিষণ্ণ থেকে বিদ্রোহী হয়ে উঠল। মুখ ভেঙচিয়ে বলে উঠলো,

—" ওই শালার প্রেমে নাই নুন, আর করবে হানিমুন? জীবনে না! পসিবলই না। ওই লোক তো প্রেমের জায়গায় ফাইলপত্র রেখে ঘুমায়, বুঝলা? আগে, বেডারে শৈলীকে প্রপোজ করতে বলো, সেই সাহসটাও তো নাই। আবার বলে কিনা হানিমুন! হানিমুন তো দুরের কথা, ওই হারামি হানিসান টাও করতে পারবেনা!"

রিমি এতক্ষণে হাসি চেপে রাখতে না পেরে হেসে ফেলল, ফোনের এপাশে আকাশের মুখ ভার দেখে আবার একটু গম্ভীর স্বরে বলল,

—" ঠিক আছে। তবে তুমি কথা রাখবে, বুঝলে? নিশান ভাইয়ের বিয়ে হলে পরেই...!"

আকাশ উঠে দাঁড়িয়ে ড্রাম বাজানোর ভঙ্গিতে বলল,

—" হ্যাঁ ম্যাডাম! নিশানের বিয়ে শেষ হলেই, তোমার দরজার সামনে আমার গিটারে তুমি হি হো গান বাজবে!"

রিমি চোখ ঘুরিয়ে হঠাৎ বলল,

—" আচ্ছা আকাশ, তো তুমি বলতে চাও, নিশান ভাই প্রেমে নুনও দেয় না? এ কথাটা বিশ্বাস করো নিজের আত্মায়? আমার কিন্তু মনে হয়না!"

আকাশ ঢোক গিলে বলল,

—" বিশ্বাস করবো না মানে? ওই লোকটার প্রেমের দুধে চিনি পড়েনি এখনো! এমন শুকনো সাইলেন্ট লাভ কোনো লাভ না! আমার তো মাঝে মাঝে মনে হয়, নিশান আসলে একটা হাঁস...মুখে কিচ্ছু নেই, কিন্তু জলে হাবুডুবু খাচ্ছে!"

রিমি হেসে ফেলল,

—" আর তুমিই বা কী? ফোনে ফোনে প্রেম কনফার্ম করো, সামনে গেলে দেখি চুপ! এবার দেখি প্রস্তাব তো দিচ্ছোই না, বরং অন্যের বিয়ের দিকে তাকিয়ে বসে আছো!"

আকাশ এবার ভীষণ বিরক্ত হয়ে বলল,

—" আরে রিমি, ওই শালা নিশানের বিয়েটা হোক আগে! নইলে ও বিয়ের আগেই আমায় বেয়াই বলবে, এইটাই আমার টানাটানি! তুমি শুধু ধৈর্য ধরো। প্ল্যান এমন, নিশান বিয়ে করবে, আমি বাসর রাতে তোমার হাতে আংটি পরাবো। বিয়েতে জোর করে তোমাকে পাশে বসাবো। লোকজন ভাববে নতুন কাপল আমরা!"

রিমি হেসে বলল,

—" আহা! তোমার মুখের কথা শুনলেই মনে হয়, সিনেমার প্রেমিক তুমি। বাস্তবে তো দেখি মায়ের ভয়, ভাইয়ের ভয়, পাড়ার কাকুর ভয়, সব মিলিয়ে আমায় প্রেম না করে প্রজেক্ট হিসেবে টেনো!"

আকাশ একদম গলায় কণ্ঠ এনে বলল,

—" এই যে বললা না রিমি, আমায় ভালোবাসো। না ভালোবাসলে এমন কথা বলতে পারতে না।"

রিমি থমকে বলল,

—" হুমম... হয়তো ভালোবাসি। কিন্তু তার মানে এই না, তুমি আমাকে শুধু টাইম পাসে রেখে দেবে। নিশান ভাইয়ের বিয়ে হোক, সে পর্যন্ত ঠিক আছে, কিন্তু এরপর দেরি করলে আমিও...!"

আকাশ চমকে উঠল,

—" এরপর কী?"

রিমি ঠোঁট কামড়ে একটু থেমে বলল,

—" এরপর আমিও হয়তো, হানিমুনে চলে যাব। কিন্তু, কার সঙ্গে, সেটা সিক্রেট! "

আকাশ চেয়ার থেকে লাফ দিয়ে উঠে বলল,

—" এমন কথা বলোনা জান। আমার হার্ট ভীষণ দুর্বল। ওই শালা নিশান! ওর জন্য আমি আমার প্রেমিকা হারাতে বসেছি! তুমি চিন্তা করোনা জান, এই শালার কেস শেষ হলেই আমি তোমার কেস দেখব!"

রিমি জানালার পাশে দাঁড়িয়েই খিলখিল করে হেসেই চলেছে, গলার স্বরে একরাশ প্রেমমাখা খুনসুটি। ওর হাসির শব্দটা জানালার কাঁচ ছুঁয়ে বাইরে ছড়িয়ে পড়ছিল ঠিক তখনই, একটা ছায়া নিঃশব্দে দাঁড়িয়েছিল জানালার উল্টো পাশে। চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে রিমির মুখের দিকে। মুখ অন্ধকারে ঢাকা, শুধু ধবধবে সাদা হাতের আঙুলে ধরা মোবাইলটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। সে শুনছে। গা ঢাকা দিয়ে, নিঃশব্দে, কৌতুহলী চোখে শুনছে প্রতিটি কথা।

রিমি তখনো হাসছে, মুখে টিপ দিয়ে হঠাৎ বলল,

—" আচ্ছা ঠিক আছে, রাখি এখন, কেউ দেখে ফেললে সমস্যা হবে। বাই!"

রিমি ফোন কেটে আবার জানালার বাইরে তাকাল। কিন্তু তখন আর কেউ ছিল না। জানালার ওপাশটা একেবারে খালি, ছায়াটাও নেই। চারদিক একদম নীরব, যেন কিছু ঘটেইনি। রিমি অবশ্য এসব খেয়ালই করলো না। তবে ঠিক ওই মুহূর্তে, একটা ঠান্ডা বাতাস জানালার ফাঁক গলিয়ে ঘরের পর্দাটাকে নেড়ে দিল একবার। সে জানত না, বাতাস নয়, আসলে কেউ একজন ছিল সেখানে। সে দেখেছে, শুনেছে, রিমির সমস্ত ভালোবাসার গোপন কথাগুলো। কিন্তু সে কে?

চলবে............

নোট— ছোট হয়েছে মনে হয়🤐 কষ্ট করে মানিয়ে নিন। আর রিচেইক দিইনি, তাই ভুল ত্রুটি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন ❤️

❤️ পড়ুন রোমান্টিক ই-বই "মেঘবালিকার প্রেমপত্র" মাত্র ৪০ টাকায়। রিভিউ দিতে ভুলবেন না🫠

https://link.boitoi.com.bd/uRKM

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন