ফন্ট সাইজ:
থিম:
হিমরূপার উষ্ণছোঁয়া

১০ম পর্ব

লেখক: অনামিকা তাহসিন রোজা

#হিমরূপার_উষ্ণছোঁয়া

#পর্ব_১০

#কলমে_অনামিকা_তাহসিন_রোজা

গাড়ির জানালা দিয়ে মাথা বের করে উঁকি দিচ্ছে রিমি, আকাশ, রোহান, তুলি, ইমা। সবার মুখেই অস্থিরতা আর উত্তেজনা। বাড়ির নিচে বেশ জটলা তৈরি হয়েছে ইতোমধ্যে। গেটের পাশে দুটি গাড়ি দাঁড়িয়ে, সব কাজিন আর বন্ধুরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে হাসাহাসি করে সময় কাটাচ্ছে। আকাশ, রোহান, তুলি, ইমা সবাই কারো না কারো ফোন হাতে, কেউ চুল ঠিক করছে।

আকাশ ঘড়ি দেখে একটু বিরক্ত হয়ে বলল,

—" আরে শালা, ওই বউ-বরের দেখা নাই! প্রেম করবি ঠিক আছে, কিন্তু অতিরিক্ত করতেছে! এই লোকটা আসছে না কেনো? আর কতক্ষন?"

তখনই দূর থেকে দেখা গেল নিশান আর শৈলী ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। নিশানের একহাত পকেটে, মুখে হালকা স্বভাবসিদ্ধ গাম্ভীর্য, আর পাশেই সাদারঙের গোল জামা পরিহিত শৈলী, একেবারে অন্য রকম এক আলোয় ভেসে যাচ্ছে। চোখে মায়া-মাখা চাহনি, ঠোঁটে প্রশান্ত হাসি। চুলগুলো খোলা, কিন্তু নিয়ন্ত্রিত। দেখে মনে হচ্ছে যেন এক নতুন শৈলী।

আকাশ প্রথমে ওদের দেখে চোখ কুঁচকাল, তারপর মুখে হালকা বাঁকা হাসি এনে ঠোঁট কাঁমড়ে খ্যাকঁ খ্যাঁক করে হাসতে হাসতে বলে উঠলো,

—"বাহরে বাহ্! কী কাইন্ড অফ ম্যাজিক ব্যাপার ভাই!আহা! দ্যাখো দ্যাখো, আমাদের বর সাহেব অবশেষে রাগ ভাঙাইতে পারছে! কী কারিশমা!এইটা তো দেখি সরাসরি প্রেমের কারিশমা! আহা! একবারে শালার সিল্ক রুটে প্রেম! ঐ দেখ না রে, শৈলীর গালেও আবার হাসি ফুটেছে! ও মুখে এতক্ষণ কান্না ছিল, নাকি গ্লোইং হাইলাইটার মাখাইছে নতুন বউডা? আহারে আমার সুপার হিরো নিশান ভাই!"

রোহানও হেসে বলে,

— " হুম, বাপরে! ভাবছি, আমাদের নিশান ভাইয়েরে একটা পদক দেওয়া উচিত-'অভিমান ভাঙানোর সেরা স্টাইলিশ পুরস্কার'। ভাইরে ভাই! এই ব্যাটাকে এখনই সিনেমায় কাস্ট করা উচিত! নাম দিব ‘দি গ্রাম্পি লাভার বয়’!"

তুলি মুখ ঢেকে হেসে বলে উঠল,

—" আরেহ ধুর। আগে দ্যাখো কী সুন্দর মানাচ্ছে দুজনকে!"

ইমা ভিডিও করতে করতে বলল,

— " এইটা বিয়ের ট্রেইলার। ফুল মুভি কাল।"

নিশান আর শৈলী তখন সবাইকে অপ্রস্তুত করে, একসাথে গেটে এসে দাঁড়ায়। শৈলী একটু লাজুক ভঙ্গিতে হাসে, আর নিশান পেছন থেকে একটা সাবধানে দৃষ্টি দেয় আকাশের দিকে। ইশারায় বুঝিয়ে দেয় বকবক না করতে। কিন্তু আকাশ কি ওর কথা শুনেছে? আকাশ এবার হাত উঁচিয়ে বলে ওঠে,

—" চল বন্ধু! বউরে খুশি করেছিস, এখন আমাদের আইসক্রিম ট্রিট তো দিতেই হবে!"

শৈলী লাজুক মুখে নিচে তাকিয়ে ফেলল, আর নিশান চোখ পাকিয়ে আকাশকে বলল,

—" চুপ থাক, না হলে তোকে বাসায় না রেখে গ্যারেজে রাখব আজ!"

সবাই হো হো করে হেসে উঠল, আনন্দের এক ঝলক ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। গাড়ির দরজা খুলে একে একে সবাই উঠে পড়ছে। আর শৈলী, ও এবার সাহস করে একটু পাশ ফিরে নিশানের দিকে তাকাল। চোখে যেন একটাই প্রশ্ন, কোথায় বসব?নিশান একপলক তাকিয়ে মুচকি হাসল, নিঃশব্দে মাথা নেড়ে জানিয়ে দিল,— আমরা আলাদা গাড়িতে যাব।

মিমি আর রাইদা আসেনি তাদের সাথে। এর অবশ্য বিশেষ একটা কারন আছে। মিমি মূলত নিজের ফ্রেন্ডদের ইনভাইট করতে তাদের বাসায় গেছে। আর এদিকে রাইদার হুট করেই মাইগ্রেনের ব্যাথা উঠেছে। তাই মিমি আর রাইদা বাদে সবাই ফুচকা খাওয়ার উদ্দেশ্যে রওআনা দিল।

°°°°°°°′°

বাড়ির বসার ঘরের এক কোণায় সবাই চলে যাওয়ায় চা হাতে বসেছেন খাদিজা তালুকদার আর রাশিদা তালুকদার। বাড়ি জুড়ে বিয়ের প্রস্তুতির আনন্দ, হাসি আর ব্যস্ততার ছাপ স্পষ্ট। দুজনেই নিজেদের মত ব্যস্ত হলেও এখন একটু ফাঁক পেয়ে বসেছেন একসাথে।

খাদিজা হুট করেই বলে উঠলেন,

—"এই যে বিয়েটা এমন তাড়াহুড়োয় হচ্ছে, আমি তো ভাবি সব ঠিকঠাক হবে তো? আয়েশা বিয়েতে আসতেই পারল না! ও থাকলে অনেক কাজ ভাগ হয়ে যেত।"

রাশিদা চায়ে চুমুক দিয়ে একটু দম নিয়ে বলল,

—"এই যে বললে, আয়েশা না থাকায় তো আমারও চিন্তা বেড়েছে। তার ওপর ছেলেটা আবার এমন গম্ভীর স্বভাবের! এর হাবভাব আমি কিছুই বুঝিনা! এত তাড়াতাড়ি বিয়ের আয়োজনের কী দরকার ছিল বলোতো!"

খাদিজা মুচকি হেসে বললেন,

—"খুশি তো আছে, এটাই অনেক। ছেলেটা মনের ভিতর অনেক কিছু রাখে, প্রকাশ করতে পারে না। কিন্তু ওর চোখে আমি সব বুঝি। ও যেটা চাচ্ছে সেটাই হোক! আমার ছেলেটা কখনো কোনো বড় আবদার করেনি!"

রাশিদা চোখ সরু করে তাকিয়ে, একটু গম্ভীর হয়ে বললেন,

—"হুম। চোখ অনেক কিছু বলে দেয়, আবার অনেক কিছু লুকিয়েও রাখে। যাক ওসব বাদ দিই!"

খাদিজা চমকে বললেন,

—"মানে?"

রাশিদা মুখ ঘুরিয়ে, হালকা গলায় বললেন,

—"না, কিছু না। এইসব বিয়ের সময় এমন হয়। মনের কথাগুলো কেমন যেন জড়ো হয়ে থাকে।"

খাদিজা তালুকদার এবার মাথা নেড়ে স্বাভাবিক হয়ে বললেন,

—" ওরা আইসক্রিম খেয়ে আসার আগে বাকি কাজগুলো করতে হবে। কালই তো বিয়ে আবার!"

সবাই আইসক্রিম খেতে বাইরে গেছে কথাটা শুনে কিছু একটা মনে পড়ল রাশিদা তালুকদারের। থমকে গিয়ে এই পর্যায়ে হঠাৎ রাশিদা উঠে দাঁড়ায়, খাদিজা একটু অবাক হয়ে তাকান।

—"রাশিদা? কোথায় যাচ্ছো হঠাৎ?"

রাশিদা হালকা হাসি দিয়ে আমতা আমতা করে বললেন,

—"একটু মাথা ধরেছে। বিশ্রাম নিতে ঘরে যাচ্ছি। তুমি বসো, আমি আবার আসছি!"

রাশিদা ধীরে ধীরে চলে যায় নিজের ঘরের দিকে। দরজার কাছে এসে একবার পেছনে তাকায়। তারপর দরজায় ধাক্কা না দিয়ে একেবারে ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দেয়. ঘরের ভেতর হালকা অন্ধকার। রাশিদা ধীরে ফোন হাতে নেয়। কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে কনট্যাক্ট লিস্ট থেকে কারো নাম খুঁজে বের করে। তারপর থমথমে মুখে সেই নামটাতে চাপ দেয়। ফোনের ডিসপ্লেতে ভেসে ওঠে — "Calling..."

ঘরের ভেতর হালকা হলুদ আলোয় আবছা ঝাপসা সবকিছু। ঘড়ির কাঁটা প্রায় সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই করছে। কিন্তু রাশিদা তালুকদারের ঘরের ভেতর ঘন হয়ে আছে এক ধরণের ছায়াময় নিস্তব্ধতা। ফোনটা কানে ধরে বেশ কয়েক মুহূর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি। ওপাশ থেকে যখন কল রিসিভ হয়, তখনও তিনি কিছু বলেন না,শুধু এক নিঃশ্বাস নিয়ে ধীরে বলেন,

—" ওরা বেরিয়েছে। চারপাশে অনেক ভিড় থাকবে... চেনার মতো মুখ নেই ওদের পাশে। প্ল্যান একটুও পরিবর্তন করিস না। এটা জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগ। হাতছাড়া করবি না।"

একটু থেমে চোখ বুজে রাশিদা নিচু গলায় সংযোজন করলেন,

—"তুই জানিস, আমি কী চাই। আমার কথাটা তুই বুঝিস বলেই তো তোকে ফোন করলাম। এবার যদি ভুল করিস... আমি নিজে শেষ করে দিব।"

কলটা কেটে দেন তিনি। ফোনটা বিছানায় ছুঁড়ে ফেলে কিছুক্ষণ নীরব দাঁড়িয়ে থাকেন। তার মুখে এখন আর কোনো হালকা হাসি নেই, নেই দয়ালু একরাশ ভাব,শুধু এক শীতল কঠিনতা, যেন এক আগ্নেয়গিরির স্থির বহ্নিশিখা।

°°°°°°°°°°°

নিশানের সাথে অন্যায় করা হয়েছে। বড়সড় অন্যায়! সবাই বলেছিল তারা শুধু আইসক্রিম খেতে এসেছে। কিন্তু এটা নাকি একদম মিথ্যা? নিশান বসেছিল গাড়ির সামনের সিটে, একেবারে চুপচাপ। সেও তাই ভেবেছিল, ওরা সবাই মিলে একটা আইসক্রিম খেয়ে ফিরে যাবে, এইটুকুই। কিন্তু তার ধারণা কতটা ভুল ছিল, তা সে বুঝল ব্রিজের পাশে গাড়ি থামতেই। আকাশ এক লাফে দরজা খুলে বলল,

—"এই এই এই! সবাই নাম, ফুচকার স্পট তো এইটা! আগে ফুচকা, তারপর আইসক্রিম!"

নিশান একদম ঘাবড়ে তাকিয়ে বলে,

—"ফুচকা? কিন্তু তোরা তো বলছিলি আইসক্রিম...!"

রিমি দুষ্টু হেসে গুনগুন করে বলে,

—"সত্য কথা কেউ বলে নাকি? আপনি ভাবলেন, আপনি বর হয়ে আমাদের বোকার স্বর্গে রাখবেন? নট পসিবল!"

ইমা, তুলি, রোহান, সবাই একে একে নেমে পড়েছে গাড়ি থেকে। কেউ কেউ আগে থেকেই পরিচিত ফুচকার ঠেলার সামনে লাইনে দাঁড়িয়েছে। আকাশ এক চিমটি দিয়ে নিশানের বাহুতে খোঁচা দিয়ে বলল,

—"ভাই, আগে তুই একটু নাম, দেখি কোন ফুচকা টেস্ট তোর জন্য পারফেক্ট!"

নিশান বিরক্ত হয়ে গাড়ির দরজা ঠেলে বেরিয়ে এলো।

—"এইটা অন্যায় হয়েছে আকাশ। তোরা সবাই বললি আইসক্রিম খেতে যাবি, এখন দেখি ফুচকা! হোয়াট দ্যা হেল! আজকে এসব হাবিজাবি খেয়ে কাল ডায়রিয়া বাঁধাবি তখন?"

আকাশ হেসে বলল,

—"তুই বুঝলি না নিশান! এইটা প্রেমিকদের জন্য বানানো বিশেষ ফুচকা। তোরে খাওয়ানো ফরজ! আগে ফুচকা গিলি, ঝাল মেটাতে তারপর আইসক্রিম!"

রোহান পেছন থেকে বলে উঠল,

—"এরপর আবার,এইসব বিয়ের আগের দিন ব্রিজের পাশে দাঁড়িয়ে ফুচকা না খেলে রোমান্স কনফার্ম হয় না!"

শৈলীও তখন অন্য পাশে দাঁড়িয়ে, গালে একটু লজ্জার আভা। যদিও অভিমান এখন নেই, তবুও নিশানের রাগের কথা মনে পড়ছে। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে দেখছে, নিশান এখন মুখ কালো করে কী করে! নিশান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

—"তোরা সবাই মিলে একটা করে দানব! ফুচকার নামে প্রতারণা করছিস তোরা!"

আকাশ তখন গম্ভীর হয়ে বলে,

—"না ভাই, ফুচকা জীবনের প্রথম প্রেম! শৈলী তোকে বুঝবে, কিন্তু ফুচকা আগে!"

সবাই হেসে উঠে, ফুচকার ঝাঁঝালো গন্ধ বাতাসে মিশে গেছে। নিশান দাঁড়িয়ে, মনে মনে বলে,

—" এইবার ইচ্ছে করছে আইসক্রিম না খাওয়াই, একেকটা তো বাটপার!"

--------

ব্রিজের ওপরে হালকা বাতাস বইছে। চারপাশে নরম আলো, দূরের গাড়ির হেডলাইট গুলো জ্বলজ্বল করছে। নিচে নদীর কালচে পানির ঢেউগুলো হালকা ঝাপটায় সাড়া দিচ্ছে, আর ঠিক উপরে,চোখ জুড়ানো একখানা দৃশ্য। আকাশ, রোহান, তুলি, রিমি, ইমা—একেকজন একেকটা ফুচকার প্লেট হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে গোল হয়ে। কেউ কেউ দুই হাতে ব্যালান্স করে ঝাঁপাঝাঁপি করছে যেন একটা ফুচকা ছিনিয়ে নিলেই বুঝি আত্মা শান্তি পায়। আকাশ ঝাল ফুচকার একটা ঢোক গিলে জিভ বের করে বলে,

—"ওই শালা, তোদের ফুচকার দইটা বেশি হইছে! আমাদেরটায় তো ঝাল দিয়া আগুন ধরাইছে!"

রিমি চিবুতে চিবুতে হাসে,

—"ওই ঝালেই তো স্বাদ! প্রেমে যেমন ঝাল লাগে, ঠিক তেমনই!"

রোহান ওদিকে দাঁত চেপে বলে,

—"ভাই, ঝাল আর প্রেম,দুইটাই চোখে পানি আনে!"

সবাই হেসে ফেলে। শুধু এক পাশে একটু দূরে দাঁড়িয়ে শৈলী। ওর হাতে কিছু নেই। ফুচকার প্লেট তো দূরের কথা, পানি খাওয়ার বোতলও না। কিন্তু চোখে মুখে এক ধরণের লাজুক জেদ। আকাশ হুট করে লক্ষ্য করে বলে,

—"কী ব্যাপার,শৈলী! তোমার হাতে প্লেট কই? ফুচকা খাবা না?"

শৈলী একটু মুচকি হেসে মাথা নাড়ে। লজ্জায় কিছু বলতেও পারছেনা। মুখ নিচু করে ঠোঁট কাঁমড়ে মিনমিন করে বলে,

—' নিশান ভাইয়ের কাছে আমার ফুচকা!"

চারপাশ থেমে যায় যেন। সবাই চোখ সরু করে তাকায়। ঠোঁট কামড়ে আকাশ এক ধাক্কায় নিশানের কাঁধে চেপে ধরে বলে,

—"ওই শালা! কাহিনী কী? ফুচকার হ্যান্ডফিডিং চলতেছে বুঝি? তোর হাতে ক্যান শৈলীর ফুচকা?"

নিশান দাঁড়িয়ে ফুচকার প্লেট থেকে একটা ফুচকা আলতো করে তোলে, ধীরে ধীরে শৈলীর দিকে এগিয়ে যায়। বাকিরা দম চেপে তাকিয়ে থাকে। কেউ মুখে হাত দেয়, কেউ কনুই দিয়ে পাশেরজনকে খোঁচায়।

নিশান গম্ভীরভাবে বলে,

—" ওর হাতে ঝাল লাগবে। তোরা তোদের কাজ কর!"

বলেই নিশান শৈলীর মুখের কাছে ফুচকা ধরে। শৈলী লাজুক হেসে মুখ তুলে তাকায়। নিশানের দেওয়া ফুচকাটা দেখে ঠোঁট ভিজিয়ে নিলে, নিশান চোখ দিয়ে খেতে ইশারা করে। শেষে বাধ্য হয়ে সকলের পরোয়া না করেই নিশানের হাত থেকে ফুচকাটা মুখে নেয় শৈলী।

সাথে সাথে সবাই হেসে উঠে। আকাশ রীতিমতো মুখ কুঁচকে বলে,

—" শালা সিঙ্গেল হইয়া বড় বিপদে আছি। এসব দৃশ্য কি নেয়া যায় বল? ধুর, আজ কেও নাই বলে!"

তৎক্ষনাৎ রিমিও ভ্রু উঁচিয়ে কৌশলে তাকায় আকাশের দিকে। চোখ সরু করে বুঝিয়ে দেয়, আমি বেঁচে আছি এখনো। রিমির মুখমণ্ডল দেখে ভীত হয় আকাশ, ঢোক গিলে চোখ টিপে বলে ফিসফিস করে বলে —মজা করছি।

°°°°°°°°

ফুচকা খাওয়ার পর্ব শেষ হতেই ব্রিজের পাশে বড় খোলা জায়গাটায় গাড়ি পার্ক করে নিশান। সবাইকে সেখানেই অপেক্ষা করতে বলে নিজে চলে আসে ব্রিজে। এখানে সারি সারি করে সব আইসক্রিম, ফুচকা, চটপটি, মোমো, দোসাসহ সব ধরনের স্ট্রিট ফুডই বসে। সন্ধ্যা হতেই প্রতিদিন জায়গাটা ভীড়ে ভরে ওঠে। এর অবশ্য কারন আছে— ব্রিজের খোলা হাওয়া, চারপাশের সুন্দর পরিবেশ সবকিছু মিলে জায়গাটা মনের রিফ্রেশমেন্ট করতে একদম পার্ফেক্ট।

নিশান এদিকে ব্রিজের ডান পাশের সারিগুলোয় থাকা সবচেয়ে বড় আইসক্রিমের দোকানে গিয়ে দাঁড়ালো। এদিকে রাস্তার উল্টোপাশে সবাই দাঁড়িয়ে আছে। শৈলী তো ঘাড় উঁচিয়ে দেখার চেষ্টা করছে নিশানকে। এত ভিড়ের মধ্যে দেখতেই পাচ্ছে না মানুষটাকে। হুট করেই শৈলীর মনে পড়ল নিশানকে বলবে যে সে চকলেট ফ্লেভারের আইসক্রিম খাবে। লোকটা না জানি কোন ফ্লেভারের আসে। বাকিদের মধ্যে থেকে শৈলী হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠল। ওর মনে পড়ে গেল, চকলেট ফ্লেভার! ও তো বলেইনি কী আইসক্রিম খাবে! একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে রিমিকে কনুই দিয়ে খোঁচা দিয়ে বলে,

—"রিমি, আমি একটু যাচ্ছি ওদিকে। আমি না নিশান ভাইকে বলতেই ভুলে গেছি কোন ফ্লেভার আমার ভালো লাগে!"

রিমি গুরুতর কন্ঠ নিয়ে বলে,

—"ওই! একাই যাবি? ভাই তুই তো ভীড়ের ভেতরে হারায় যাবি!"

শৈলী সাথে সাথে মুখ কুঁচকে তাকিয়ে বলে,

—" আমি মোটেই ছোট বাচ্চা নই।"

শৈলীর ঠোঁট ফোলানো কথা টা শুনে হাসে রিমি। আর বলে,

—" ঠিক আছে। তাহলে নিশান ভাই কে বলিস আমি স্ট্রবেরি ফ্লেভারের খাব।"

শৈলী —"ঠিক আছে" বলে রাস্তার কিনারার দিকে ছুটে যায়। চোখ বড় করে সারি সারি স্টল খুঁজে খুঁজে দেখে, কোথায় মানুষটা? এত ভিড়! এত আলো! এত আওয়াজ! একসময় দূরে চোখে পড়ে একখানা পরিচিত অবয়ব — টি শার্টে গাঢ় ছায়ায় দাঁড়িয়ে থাকা নিশান। কিন্তু ও দাঁড়িয়ে আছে রাস্তার একেবারে উল্টো পাশের আইসক্রিম স্টলে। চারপাশে টপাটপ আইসক্রিম বানাচ্ছে বিক্রেতারা। রঙিন বাতিতে আলো আর মানুষের হাঁকডাক সব মিলে নিঃশব্দে গিলে নিচ্ছে চারদিকের শব্দ।

শৈলী দাঁড়িয়ে গেল রাস্তার ঠিক একপাশে। বুকের ভেতর ধকধক করছে, না জানি কী নিয়ে আসে! আইসক্রিম বিষয়ে সে খুবই সিরিয়াস। সে জোরে ডাকল,

—"নিশান ভাই!"

অনেকবার ডাকার পরেও নিশানের কানে পৌঁছাতে পারলনা শৈলীর কন্ঠস্বর। এমনিতেই শৈলীর কন্ঠ বেশ খাটো, তার উপর এত ভীড়, কোলাহল। কিন্তু হাল ছাড়লো না শৈলী। পা উঁচু করে রাস্তার এপাশ থেকেই ডাকতে থাকলো। অনেকক্ষন নিশান মাথা ঘুরিয়ে তাকালো ঠিকই। কিন্তু এত আলো আর ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট শৈলীকে সে খুঁজে পেল না। তার চোখ শুধু সারাদিক চিরে কারা ডাকছে যেন সেটা বোঝার চেষ্টা করছে।

শৈলী এবার গলা আরেকটু জোরে বলে,

—"নিশান ভাই! এদিকে! "

কিন্তু মানুষ আর গাড়ির শব্দে ওর গলা মিশে যায় শহরের কোলাহলে। নিশান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। নিজের চোখ ছায়ার মধ্যে মেলে চেনা সেই কণ্ঠ খোঁজে। কিন্তু ওর মুখে শুধু একটাই ভাব।শৈলী তখন রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে হতাশ হয়ে নিজের দুই গাল ফুলিয়ে ফেলে।

—"উফফ! এই লোকটা কানে শুনতে পায় না নাকি!"

এ পর্যায়ে একটানা হতাশ হয়ে চোখ বন্ধ করে অনেক বড় করে দম নিল। ভেতরে ভেতরে গুমরে ওঠা আবেগ আর অধৈর্যতা একাকার হয়ে যায়। তারপর,সে হঠাৎই বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত জোর দিয়ে রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার নাম ধরে চিৎকার করে উঠল,

—"নিশা....আন ভাই!!!"

চারপাশ কেঁপে উঠলো যেন মুহূর্তেই। কয়েকজন পথচারী কৌতুহলী হয়ে তাকালো মেয়েটার দিকে। দোকানিরাও একপলক মাথা তুলে দেখে নিল। নিশান এক ঝটকায় ঘুরে দাঁড়ালো। দূরে শৈলী, সাদা জামায় খোলা চুল, পাগলাটে চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকেই। নিশানের চোখ বিস্ময়ে গোল হয়ে গেল। তীব্র কণ্ঠস্বরে সে ভিড়ের মধ্যেই বলে উঠল,

—"তুই এখানে কী করছিস? রাস্তার এত কাছে এলি কেন! ওখানে দাঁড়াস না! শৈলী, পেছনে যা! এখনই!"

শৈলী তখন দুই হাত মুঠো করে গলা উঁচিয়ে চিৎকার করে বলল,

—"চকলেট... ফ্লেভারের.... আইসক্রিম খাব।"

কিন্তু ভিড়ে রাস্তার এপাশ থেকে কথাটা শুনতে পেলো না নিশান। ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আবার বলল,

—"কি?! কী বলছিস তুই? পিছনে যা বলছি! রাস্তার একেবারে পাশে দাঁড়িয়ে আছিস কেন? মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি তোর? পরে এসে শুনছি। ওদিকে যা!"

শৈলী এবার এক পা এগিয়ে এসে এক নিঃশ্বাসে আরও জোরে চিৎকার করল,

—" আরেহ! আপনি পরে চলে আসলে আমি চকলেট আইসক্রিম পাব কীভাবে! "

কিন্তু চারদিকের গাড়ির হর্ন, মানুষের হাঁকডাক, পাশের স্টলের টিনে চামচ পড়ার আওয়াজে তার কণ্ঠ যেন নিমেষেই হারিয়ে যায়। নিশান মুখে বিরক্তি আর চোখে ভয় নিয়ে আবারও চিৎকার করে বলল,

—"শৈলী! তোকে বলেছি রাস্তা থেকে সরে যা! তুই জানিস না, এখানে হঠাৎ কিছু হলে আমি... প্লিজ, ওখানে দাঁড়াস না!"

নিশান এতটাই উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ল যে কয়েক পা আগাতে গিয়ে আবার থেমে গেল। চারদিকে মানুষ আর গাড়ির প্রবাহ। এত ভিড়ে হুট করে দৌড়ে যাওয়া বিপজ্জনক। শৈলী কিন্তু এক ইঞ্চিও নড়ল না। মুখ ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে, চোখে রাগ আর অভিমান। সে বোঝে না, এতটা ভয় করে কেন লোকটা! এতটুকুতেই বোঝা যায়, নিশানের বিরক্তি আসলে ভয়।

অবশেষে নিশানের আগুনঝরা চোখ দেখে দমে গেল শৈলী। ধুর লোকটা ভালো না! কীভাবে তাকাচ্ছে দেখো! যেন খেয়ে ফেলবে। আমি কেনো গিয়েছিলাম ওদিকে? একেবারে ভুল করলাম! হুহ! মুখ ভেঙচিয়ে আবারো ওদিকে খোলা জায়গাটায় এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।

মুখ গোমড়া করে শৈলী যখন ফিরে আসছে ঠিক তখনই দেখতে পেল নিশানের দিকে হঠাৎ রাস্তার ওপাশ থেকে একটা কালো প্রাইভেটকার অস্বাভাবিক গতিতে ছুটে আসতে শুরু করল। নিশানের পাশে আরও দু-একজন দাঁড়ানো, কিন্তু গাড়িটা যে স্পিডে আসছে, সেটা কোনো সাধারণ চলাচলের মতো না। কোনো গতি বিধি মেনে আসছে না সেটা শৈলী মুহূর্তেই বুঝে গেল। অস্বাভাবিক গাড়ির এই গতি দেখে চমকে নিশানের দিকে তাকালো শৈলী, আবারো রাস্তার গাড়িটার দিকে তাকালো। ওর মুখ থেকে একটুখানি শ্বাস বের হলো, চোখ বিস্ময়ে গোল হয়ে উঠল। কি জানি, ছোট্ট মাথায় কি বুঝলো মেয়েটা! তারপর হঠাৎই সেই ভয়ংকর গর্জনের শব্দে শৈলী চিৎকার করে উঠল,

—"নিশান ভাই! নিশান ভাই! সরে যান! সামনে থেকে যান! গাড়ি! গাড়ি!!"

কিন্তু ভিড় আর শোরগোলের মাঝে সেটা পরিষ্কার করে শুনতে পেল না নিশান। বরং ওর ধমক দেওয়া ভঙ্গিতেই এবার গলা চড়িয়ে জবাব দিল,

—"তুই যাচ্ছিস না কেনো? পাগলের মত রাস্তায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করছিস! আমি তো জানিই তুই চকলেট ফ্লেভারের আইসক্রিম খাবি। যা তুই৷ আনছি আমি!"

কিন্তু নিশানের কথাও কানে নেয়ার প্রয়োজন বোধ করল না শৈলী। সে বারবার ওই গাড়িটার দিকে তাকিয়ে পাগলের মত চিৎকার দিতেই থাকলো,

—' নিশান ভাই, সরে যান! সরে যান প্লিজ!"

শৈলী এবার কাঁপতে কাঁপতে আরও জোরে চিৎকার করে উঠে,

—"পেছনে তাকান! সরুন! গাড়ি আসছে! নিশান ভাই!!"

সে ততক্ষণে দুহাত মুখে চেপে ধরে দাঁড়িয়েছে রাস্তার পাশে দাঁড়ানো একজন মানুষের মতই, চোখে শুধু আতঙ্ক। নিশান তখনও পুরো পরিস্থিতি ধরতে পারেনি। আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড, গাড়িটা নিশান থেকে কিছু গজ দূরে, শৈলী যেন দম বন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে।

নিজেকে আর সামলাতে পারল না শৈলী। কুন্ঠায় অস্থির হয়ে হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে পড়লো। মাথায় কিছু না আসলেও হুট করে কিছু একটা ভাবনা আসতেই ঠোঁট ভিজিয়ে তাকালো শৈলী। নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে একটানে ছুটে চলল সেই ভয়াল মুহূর্তের দিকে। চোখে পানি, মুখে একরাশ আতঙ্ক, আর বুকের মধ্যে কেবল একটাই প্রার্থনা, নিশান ভাই যেন বেঁচে যায়!

ভিড়ের মধ্যে থাকা সবাই হঠাৎ শৈলীর এমন ছুটে আসা দেখে থমকে গেল। কেউ কিছু বোঝার আগেই ও পাগলের মত ছুটে আসতে থাকলো। এরমধ্যেই হাতে আইসক্রিমের প্যাকেট নিয়ে ঘুরে তাকালো নিশান। শৈলীকে এদিকে ছুটে আসতে দেখে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়াতেই গাড়ির গর্জন যেন কান ফাটানো শব্দে চারপাশ কাঁপিয়ে তুলল। তখনই নিশান শুনল সেই শব্দটা! ততক্ষণে সেও বুঝে গেল অস্বাভাবিক স্পিড নিয়ে একটা গাড়ি এগিয়ে আসছে ঠিক তার দিকেই। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।

ছুটে আসতে থাকা শৈলী সর্বশক্তিতে দৌঁড়ে এসে এক ধাক্কায় নিশানকে পাশে ছিটকে ফেলে দিল। পিচ ঢালা রাস্তায় পড়ে গিয়েও হতবুদ্ধি হয়ে রইলো নিশান। এদিকে গাড়ির আলো ঠিক শৈলী মুখের উপর। নিশানকে ধাক্কা দিয় ফেলে দেয়ায় শৈলী দাঁড়িয়েছে ঠিক নিশানের জায়গাটায়। তাই যা অঘটন হওয়ার হয়েই গেলো। মুহূর্তে সরতে পারল না মেয়েটা। চিৎকার দিয়ে উঠলো,

—" নিশান ভাইইইইই!"

ধপ করে শব্দ হলো। চারপাশ কেঁপে উঠলো। যেন মুহূর্তে একটা বোমা ফেটে গেল, গাড়ির গর্জন, মানুষের চিৎকার। গাড়ির ভয়ানক ধাক্কায় একটা শরীর ছিটকে গিয়ে রাস্তার অপর পাশে গিয়ে পড়ল। সাদা জামার ওড়নাটা উড়তে উড়তে থেমে গেল রক্তমাখা রাস্তায়। চুলগুলো ছড়িয়ে পড়ল, চোখের কোণায় অস্পষ্ট একটা অশ্রু, আর গালের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে লাল বর্ণের তরল পদার্থ। শৈলী পড়ে আছে নিথর হয়ে। চারপাশ থমকে গেছে। স্ট্রিট ফুডের দোকানের হর্ণ থেমে গেছে,পাশ দিয়ে হাঁটতে থাকা মানুষের পা থেমে গেছে, বাতাসটাও যেন থেমে গেছে। আশ্চর্য! এতক্ষণের কোলাহল টা এমন ভয়ানক স্তব্ধতার রূপ নিল কেনো?

অন্ধকারে আলো মেখে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে, নিশান কিছুই বুঝতে পারছে না। সে পড়ে আছে নিজের ধাক্কা খাওয়া অবস্থানে। হাতে এখনো দুটো আইসক্রিমের প্যাকেট। তবে ওর চোখ আটকে গেছে শুধুই ওই সাদারঙা জামায় আর তার চারপাশে ছড়িয়ে থাকা রক্তে। তাকিয়ে আছে নিশান, নির্বাক সে, নড়তে পারছে না মানুষটা। চোখের পলক পড়ছে না। হতবুদ্ধি হয়ে কিছুক্ষন থমকে রইলো সে।

—" শৈলী...?" শব্দটা খুব নিঃশব্দে ওর ঠোঁট থেকে বের হলো। কিন্তু ততক্ষণে আশেপাশের শোরগোল শুরু হয়ে গেছে। হুট করে সব স্তব্ধ হওয়াতে রাস্তার এদিকে থাকা সবাইও বেশ অবাক হয়। আকাশ দৌঁড়ে ছুটে আসছে। মুখে অস্পষ্ট চিৎকার,

—" শৈলী... শৈলী!" পেছন থেকে রিমি, ইমা, রোহান, সবাই পাগলের মতো ছুটে আসছে।লোকজনেরা চিৎকার দিচ্ছে,

—' অ্যাকসিডেন্ট হইছে ভাই। তাড়াতাড়ি এম্বুলেন্স ডাকেন!"

শৈলীর শরীরটা ছড়িয়ে আছে রাস্তার পাশে। রক্তে ভিজে গেছে সাদারঙা জামাটা। একটা হাত অদ্ভুতভাবে বাঁকানো, চোখ আধখোলা, নিঃশব্দে শূন্যের দিকে তাকিয়ে। কিন্তু নিশান এখনো দাঁড়ায়নি। ওর ভেতরে যেন একটা কিছু ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। সেই মুহূর্তে আকাশ সহ সবাই পাগলের মত এসে শৈলীর কাছে বসলো। রোহান চিৎকার দিয়ে আশেপাশের মানুষদের বলল,

—" দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তামাশা দেখছেন আপনারা! অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন জলদি! প্লিজ ডাকুন!"

রিমি, ইমা কাঁদতে কাঁদতে বসে পড়লো। নিশান দম বন্ধ করে ফেলল। চোখ সরাতে পারছে না সে। ওর পৃথিবী, ওর হাসি, ওর শান্তি, সব পড়ে আছে ওখানে, একটা নিঃশব্দ, রক্তমাখা শরীরে।

চারপাশের কোলাহল এক নিমেষে নিশানের কানে ঝিম ধরানো গুঞ্জনে পরিণত হলো। লোকজন দৌঁড়োচ্ছে, কেউ ডাকছে, কেউ কাঁদছে, কিন্তু নিশান? সে যেন পৃথিবীর বাইরে চলে গেছে। এক মুহূর্ত পর হঠাৎই নিশানের ভেতরকার বেসামাল কাঁপনটা জেগে উঠল। প্রথমে একটা ধাক্কার মতো শ্বাস খেল, তারপর "শৈলী!" বলে ছেঁড়াখোঁড়া গলায় চিৎকার করে ছুটে গেল সে রাস্তার অপর পাশে।

পাগলের মতো ছুটে এসে উবু হয়ে পড়ল নিশান। কাঁপা কাঁপা হাতে শৈলীর মাথার নিচে হাত রেখে, নিজের কোলে তুলে নিল নিথর শরীরটাকে। বুকের কাছে জাপ্টে ধরে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালো মুখের দিকে। একি অবস্থা! ফর্সা মুখটা এমন লালিত হয়ে আছে কেনো? মাথা কাজ করছেনা নিশানের। ও শৈলীকে চেপে ধরে চিৎকার করতে থাকলো,

—" শৈলী... শৈলী! এই শৈলী। শৈলী, চোখ খোল প্লিজ, কথা বল! কিছু হয়নি তোর বল। এই মেয়ে, চোখ খোল!"

বলতে বলতেই তার বুকের মাঝে গুঁজে নিল শৈলীকে, তবুও মেয়েটার শরীরে কোনো নড়াচড়া নেই। নিশান মাথা দুলিয়ে কান্নারত কণ্ঠে বলছে,

—" কিছু হয়নি ওর। কিচ্ছু হয়নি। কিছু হতেই পারেনা। ও ঠিক আছে। "

বিড়বিড় করে কথাগুলো বলে হঠাৎই হুংকার ছুঁড়লো নিশান,

—" সিনেমা দেখছিস তোরা হ্যাঁ? আকাশ, এম্বুলেন্সের অপেক্ষা করছিস কেনো তুই? গাড়িটা আন তাড়াতাড়ি! জলদি আন!"

ভেঙে পড়ছে ওর কণ্ঠ। রিমি এসে কাঁদছে, আকাশ আর রোহান ওকে টানতে চাচ্ছে কিন্তু ও কিছুতেই ছাড়ছে না শৈলীকে। আকাশ শেষে দৌঁড়ে গাড়ি আনতে গেলো। সবাই পিছু পিছু গেলো। নিশান সর্বশক্তি দিয়ে চেপে ধরল শৈলীকে। জাপ্টে ধরে মেয়েটার মাথায় হাত রেখে বিড়বিড় করে বলল

—" তামাশা করছিস তুই শৈলী? চোখ খুলছিস না কেনো? ঢঙ করার জায়গা পাস না? কিচ্ছু হবেনা তোর। কিচ্ছু হতেই পারেনা। এই মেয়ে চোখ খোল তাড়াতাড়ি। "

অথচ এই কোলাহলের মধ্যে কেও বুঝতেই পারল না, শৈলীকে ধাক্কা দেয়া গাড়ির ড্রাইভার সুযোগ বুঝে পালিয়ে গেছে।

চলবে..........

🤏 ভালো হয়নি আজকের পর্ব। মানিয়ে নিন কষ্ট করে। অ্যাকসিডেন্টের পার্টটা ভালো করে বর্ননা করতে পারলাম না। শুধু কল্পনা করতে পারছি ভয়াবহ অবস্থাটা🤌🥹 তবে ভয় পাওয়ার কিছু নেই!

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন