#হিমরূপার_উষ্ণছোঁয়া
#পর্ব_১৩
#কলমে_অনামিকা_তাহসিন_রোজা
দুপুরে নাসিরুল তালুকদার এসে শৈলীর সাথে দেখা করেছেন। মাথায় হাত বুলিয়ে ডক্টরের কাছে কিছু পরামর্শও নিয়েছেন। এরপর হাতে করে আনা ফলের ব্যাগ রেখে অফিসের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়েছেন, আর নিশানকে বলে গিয়েছেন যেন তারা বিকালের মধ্যেই বাড়িতে ফেরে। কথা অনুযায়ী নিশান হসপিটালের বিভিন্ন ফর্মালিটিজ পূরণ করল, প্রয়োজনীয় কিছু ঔষধ কিনে শৈলীকে কোলে করে এনে বসালো গাড়িতে। আকাশ অনেকবার বলেছে সেও শৈলীকে নিতে গাড়ি নিয়ে আসবে। কিন্তু নিশান সবাইকে আসতে নিষেধ করেছে এবং জোর গলায় জানিয়েছে সে একাই শৈলীকে নিয়ে বাড়ি ফিরবে।
তপ্ত দুপুরের আলো ধীরে ধীরে নরম হতে শুরু করেছে। রাস্তার দুইপাশে গাছের পাতাগুলো ঝিম ধরে আছে, বাতাসও আজ নিশানের মতোই নিঃশব্দ। গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে নিশানের হাত, কিন্তু চেপে ধরা নয়, বরং যেন কারো শরীরের স্পন্দন ছুঁয়ে চালাতে হচ্ছে গাড়ি, এমন কোমল আর মনোযোগী স্পর্শ।নিশান খুব ধীরে, সাবধানে গাড়ি চালাচ্ছে। চোখ দুটো রাস্তায়, কিন্তু হৃদয়টা শৈলীর প্রতিটা নিঃশ্বাসে বাঁধা। প্রতিবার ব্রেক ধরার সময়, বাঁক নেয়ার সময়, ও দশবার ভেবে নিচ্ছে, কোনো ধাক্কা যেন না লাগে। বারবার চোখ রাখছে শৈলীর দিকে।
গাড়ির অন্যপাশে, জানালার পাশে গুটিসুটি হয়ে বসে আছে শৈলী। শরীরটা এখনো ক্লান্ত, নিঃশ্বাসে ঘন ঘন একরাশ নীরবতা। মাথাটা হেলানো জানালার কাঁচে। চোখ দুটো বাইরের দিকে, কিন্তু জানালা ভেদ করে বাইরের দৃশ্য যতটা দেখা যাচ্ছে, তার চেয়ে বেশি না-দেখা কোনো চিন্তায় ডুবে আছে সে। কখনো চোখ বুঁজে নিচ্ছে কয়েক সেকেন্ডের জন্য, কখনো হালকা ঠোঁট কামড়ে কি যেন ভাবছে। নিশান একবার চোখ ঘুরিয়ে দেখল ওকে। মুখে বলল না কিছু, শুধু জানালার কাঁচে শৈলীর কপালের ছায়া দেখে একফোঁটা নিঃশ্বাস ফেলল। গাড়ির মধ্যে ছায়া আর নীরবতা। কিন্তু এই নীরবতা কোনো দূরত্ব নয়, বরং গভীর এক মায়া, একে অপরকে নিঃশব্দে ছুঁয়ে থাকবার ভাষা। বাড়ি যতই কাছে আসছে, নিশানের গতি আরো মন্থর হয়ে যাচ্ছে, যেন এই পথ শেষ না হয় কখনো।
গাড়ির জানালার কাঁচে একটানা তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎই শৈলী চোখ ফিরিয়ে আনলো। নিঃশ্বাস টেনে একবার তাকালো সামনের দিকের লুকিং গ্লাসে, আর ঠিক সেখানেই নিজের প্রতিবিম্ব দেখে মুহূর্তেই স্থির হয়ে গেল। গালের পাশে লালচে এক ক্ষতের রেখা, কপালের পাশে ব্যান্ডেজ খোলা জায়গাটা এখনো গোলাপি হয়ে আছে। গলার বাম দিকের একপাশে উঁকি দিচ্ছে হালকা একটা কাটা দাগ। শৈলী নিঃশব্দে চোখ নামিয়ে ফেলল। ঠোঁট কামড়ে চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্ত। মনটা খারাপ হয়ে গেল প্রচণ্ড। নিজের আঙুল দিয়ে গাল ছুঁয়ে দেখল ক্ষতের ওপর, আহত জায়গাটা কেমন কালচে আর লাল হয়ে আছে! চোখের কোণে একটা অপ্রকাশিত প্রশ্ন জমে উঠল শৈলীর,
—" নিশান ভাই কি এই দাগগুলো দেখে মুখ ফিরিয়ে নেবেন? আমাকে দেখতে কি খুব বাজে দেখাচ্ছে?"
একটু পর চোখ তুলে নিঃশ্বাস টেনে তাকাল পাশে বসে থাকা নিশানের দিকে। নিশান তখনও আগের মতোই ধীরে, সংযতভাবে গাড়ি চালাচ্ছে, একবারও তাড়া দিচ্ছে না, একটুও বিরক্তির ছাপ নেই মুখে। শৈলী চোখ নামিয়ে ফেলল আবার। নিজেকে গুটিয়ে নিল আরও একটু। সেই লুকানো ভয়, সেই না বলা কষ্টটুকু বুকের ভিতর চেপে রাখল।
গাড়ির স্টিয়ারিং-এর উপর হাত রাখা নিশান একবার চেয়ে দেখল পাশে বসে থাকা শৈলীর মুখটা। একটুও শব্দ নেই, চোখের দৃষ্টি জানালার কাচ ভেদ করে কোথায় যেন হেলে আছে, ঠোঁট চেপে ধরা, আর গালের নিচে অদ্ভুত একটা থমথমে ছায়া। নিশান একপলক ওর দিকে তাকিয়েই বুঝে গেল, কিছু একটা হচ্ছে। নরম গলায় জিজ্ঞেস করল,
—" কি হয়েছে? "
শৈলী চমকে উঠল না, সাড়া দিলও না প্রথমে। শুধু চোখ আরও নিচু করল, আর ঠোঁটের কোনা কেঁপে উঠল একটু। নিশান এবার গাড়ির গতি একটু কমিয়ে শৈলীর দিকে তাকিয়ে আরো মৃদু কণ্ঠে বলল,
—" কিছু জিজ্ঞেস করেছি তোকে৷ কী হয়েছে? ব্যাথা করছে কোথাও?"
শৈলী এবার দম নিয়ে চোখ বন্ধ করল। কিন্তু কথা বলার বদলে গলা বুঁজে এলো। একটা অচেনা কষ্ট যেন জমাট বাঁধল বুকের মাঝখানে। নিশানকে কিছু বলতে চাইলেও পারল না। শুধু মাথা নাড়িয়ে চোখের পানি আটকে রাখতে চাইল। কিন্তু তাও পারল না। ফিসফিস করে বলল,
—"না... কিছু না।"
নিশান এবার কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে গাড়িটা ধীর গতিতে সাইডে পার্ক করে দিল। একদম ধীরে ধীরে ঘুরে শৈলীর মুখের দিকে তাকাল। আর সেই মুহূর্তেই শৈলী মুখ ঘুরিয়ে কান্না চেপে রাখতে চাইল, কিন্তু চোখের জল থেমে রইল না। ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করে দিল সে। নিশান ভেতরে ছটফট করল। শৈলীর এমন গুটিয়ে যাওয়া শুকনো মুখ সে কোনো ভাবেই সহ্য করতে পারেনা। হাত বাড়িয়ে আস্তে করে শৈলীর চিবুকে রাখল। আর বলল,
—" লিসেন, আমার বউ হতে হলে রীতিমতো সবকিছু, আবারো বলছি, ইচ এন্ড এভরি থিঙগ অফ ইউর লাইফ, আমার কাছে শেয়ার করতে হবে। কাহিনী বাদ দে। কী হয়েছে বল? আবার মুখ অন্ধকার করে রেখেছিস কেনো?"
শৈলী মুখ না তুলেই ফিসফিস করে ভাঙা কণ্ঠে বলল,
—"আমার গালে.. কপালে...গলায়..দাগ পড়েছে নিশান ভাই। খুব বাজে দেখাচ্ছে আমাকে। আপনি এখন কীভাবে বিয়ে করবেন আমায়! দেখতে খুবই জঘন্য লাগছে তো! সাজলেও ভালো লাগবেনা!"
নিশান মুখ কুঁচকে নির্বিকার হয়েই রইলো। শৈলীর কথাটা ভ্রু কুঁচকে শুনলেও বুঝতে সময় লাগলো কিছুটা। কথার সারমর্ম ধরতে পেরে আলগোছে এক পলকেই সারামুখে নজর বুলালো। পুরোপুরি শৈলীর মুখ দেখে সরু চোখে জিজ্ঞেস করল,
—" কে বলেছে তোকে দেখতে খারাপ লাগছে?"
সরল স্বীকারোক্তি শৈলীর, তর্জনী উঠিয়ে লুকিং গ্লাসে তাক করে বলল,
—" আয়নাতে দেখলাম। খুবই খারাপ লাগছে।"
শৈলীর বলতে দেরি হলো, ঝনঝন করে ভীষণ জোর শব্দে লুকিং গ্লাসটাকে ঘুষি মেরে ভেঙে ফেলতে দেরি করল না নিশান। লুকিং গ্লাসে চোখ রেখে শৈলী যখন নিজেকে ছোট করে ফেলছিল, ঠিক তখনই তো একটা কাচভাঙা বিকট শব্দ ছড়িয়ে পড়ল পুরো গাড়িতে। সহসা শৈলী চমকে উঠল। চোখ মেলে দেখল, নিশানের তীব্র ঘুষিতে গাড়ির লুকিং গ্লাসটা ভেঙে চৌচির হয়ে গেছে। কাচের টুকরোগুলো ঝরে পড়ছে নিচে, আর তার নকশা আঁকা শীতল কাচে ফুটে উঠেছে কিছু রক্তের দাগ।
নিশানের হাতের কড়া আঙুল কেটে গিয়েছে। ফিনকি রক্ত বেরোচ্ছে। তবুও, চোখের পাতা পর্যন্ত কাঁপল না লোকটার। একটুও প্রতিক্রিয়া দিল না। সে বরং স্থির, ভীষণ স্থির। যেন নৈমিত্তিক কোনো কাজ ঘটালো। আর ঠিক সেই দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল শৈলীর চোখে, ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে ভাঙা কাঁচের টুকরো থেকে চোখ সরিয়ে বলল,
— " ঐ আয়না তোকে চেনে না, তোকে বোঝে না। যে আয়না তোকে এভাবে দেখে, তাকে আমি স্বাভাবিক বলবো না— বরং পাপী বলব। কারণ, তোকে দেখে কেউ যদি ‘জঘন্য’ বলতে পারে, তাহলে সে কমদৃষ্টি..না, সে পুরোপুরি অন্ধ।"
শৈলী শব্দ খুঁজে পেল না। ওর মুখের দিকে তাকিয়েই রইলো থমকে গিয়ে। ঠোঁটজোড়া ফাঁক হলো সহসা। একজন ঠান্ডা মানুষের এমন ভয়ানক প্রতিক্রিয়া আশা করেনি শৈলী। নিশান এবার ওর হাতের উপর নিজের কা"টা হাতটা রাখল। কান্না যেন ওখানেই গলে গেল, সেই ক্ষতগুলোয়। আরেকহাত গলিয়ে দিল শৈলীর গালে। তৎক্ষনাৎ গালে টুপটুপ করে গড়িয়ে পড়ল অশ্রুকণা। নিশানও দায়িত্ব নিয়ে মুছে দিল সেটা৷ এরপর হতবাক হয়ে চেয়ে থাকা শৈলীর দিকে তাকিয়ে কন্ঠ খাদে নামিয়ে বলল,
—" লেট মি শো ইউ অ্যান এসথেটিক থিঙগ! চোখ বন্ধ কর তো!"
আদেশ ছুঁড়েই বাঁকা হাসলো নিশান। শৈলী কথার মানে পুরোপুরি না বুঝলেও শেষের কথাটা আমলে নিয়ে বাধ্যের মত চোখ বুঁজলো। এ পর্যায়ে চোখের চাহনী আরেকটু মুগ্ধতায় ভরে উঠলো নিশানের। অন্য হাতটাও এবার গলিয়ে দিল শৈলীর গলায়। গাড়ির সিট ঠিক করে অনেকটা কাছে চলে এলো। শৈলী চোখ বন্ধ করে বুঝলো না কিছুই। কিন্তু, নিঃশ্বাসটা আটকে আছে বুকের ঠিক মাঝে। সময় যেন হঠাৎ থেমে গেছে তার জন্য। ঠিক তখনই, একটা উষ্ণ, কোমল স্পর্শ পড়ল তার কপালে। ধীরে, অথচ নিশ্চিতভাবে কেও চুমু খেল কপালের সেই দাগের উপর। গায়ের সমস্ত লোম দাঁড়িয়ে গেল শৈলীর। মাথার ভেতর ছড়িয়ে পড়ল শিহরণ। শিউরে উঠলো সে, কিন্তু তবুও চোখ খোলার মত সাহস করল না। সাহসটুকুও যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। উষ্ণতার ছোঁয়া, এই প্রশ্রয়ভরা স্পর্শ,এটাই যেন এক অমর শপথ।
নিশান এরপর চুপচাপ কিছুক্ষণ শৈলীর কপালে ঠোঁট রাখল। অনেক সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর ঠোঁট সরালো কপাল থেকে। কিন্তু ততক্ষণে নিশানের নিঃশ্বাস শৈলীর গাল ছুঁয়ে গেছে। শৈলী বোঝে, নিশান ভাই এখনো সরে যায়নি। ভেতর থেকে নিঃশব্দে ফুপিয়ে ওঠে তার বুক। একফোঁটা জল আবারো গড়িয়ে পড়ে গাল বেয়ে, আর নিশান তৎক্ষণাৎ সেটাও মুছে ফেলে আবারো চুপচাপ হয়ে। তারপর ঠোঁট এগিয়ে এনে খানিক চাপ বসায় ক্ষত হওয়া শৈলীর নরম গালে৷ এ পর্যায়ে সিটবেল্ট খাঁমচে ধরে শৈলী। জান বেরিয়ে যাচ্ছে তার! লোকটা চাচ্ছে টা কী? এভাবে তো মরেই যাবে সে! শৈলীর জুবুথুবু অবস্থা হয়তো লক্ষ্যই করলনা মানুষটা। সে আপাতত কিছু একটার প্রমাণ দিতে ব্যস্ত।
কপালে আর গালে প্রগাঢ় এক উষ্ণ চুমু খাওয়ার পরও থামলো না নিশান। এবারে খুব ভয়ানক একটা কাজ করে ফেলল সে। এক হাতে শৈলীর ঘাড় থেকে ঘামে ভেজা চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে মুখ কাছে এনে গলার বাম পাশটাতে ঠোঁটের ছোঁয়া দেয়, শব্দ করে চুমু খায় সেই গলার দাগটাতে। খুবই অপ্রত্যাশিত! এতক্ষণ যা হলো, তা সহ্য করে নেয়ার মত হলেও গলার বাম দিকে নাজুক জায়গাটায় পাশে নিশানের নিঃশ্বাস আর ঠোঁটের স্পর্শ একসাথে পেতেই সাথে সাথে আঁতকে উঠে নিশানের শার্টের কলার আঁকড়ে ধরল শৈলী, মুখ থেকে অজান্তেই বেরিয়ে এলো অস্ফুটস্বরে করা আর্তনাদ। কপাল আর গালের থেকেও গলায় একটু বেশি সময় নিল নিশান, হয়তো ইচ্ছে করেই। চুমু খাওয়ার সাথে সাথে প্রিয়তমার শরীরে বেলি ফুলের মত ঘ্রাণটাও আবেশে টেনে নিল। কিন্তু নিশানের ছোট ছোট দাঁড়ির খোঁচা পেতেই পা শিরশির করল শৈলীর। এ কি মহাবিপদ! এ কেমন এসথেটিক জিনিস? নিশান ভাই তাকে কি দেখাতে চাইলো? শৈলীর মনে হলো নিশান তার জীবন মরণ নিয়ে এক্কাদোক্কা খেলছে।
মনে একরাশ প্রশান্তি পেয়েই সরে আসলো নিশান, কিন্তু দুরত্ব বাড়ালোনা। শৈলীর নাকের ডগায় চিকচিক করতে থাকা ঘামটুকু বৃদ্ধাঙ্গুলে মুছে দিয়ে সারামুখে ফু দিল, সাথে সাথেই ঠোঁট কাঁমড়ে চোখ পিটপিট করে তাকালো শৈলী, তবে দৃষ্টি নতই রাখলো। নিশান এমন ভান করল যেন কিছুই হয়নি। সে এবার ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল,
—" আর কিছু বলবি? তোকে দেখতে খারাপ লাগছে, জঘন্য লাগছে, হেনতেন আরো কি কি, এগুলো বাজে কথা বলবি আর? নাকি আরো কিছু দেখাবো?"
শৈলী নিজের ঠোঁট কামড়ে মাথা নিচু করে বসে রইল। লজ্জায় হাঁসফাঁস করছে সে। নিশানের প্রশ্নটা শরীরের প্রতিটি স্নায়ুতে বিদ্যুৎ খেলে দিল। মুখ তুলতে সাহস হলো না তার। হাতের মুঠোয় এখনো নিশানের শার্টের কলার ধরা, কিন্তু এবার ওটা ধরে আছে নিজের সম্বল মনে করে, যেন কোনো ঝড়ে উড়ে যাওয়া থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র ভরসা।
নিশান এক চুলও নড়ল না। তার চোখে এখনো তীব্র দৃষ্টি। তবে সেই তীব্রতার মধ্যে নেই আগুন, আছে নির্বাক ঘোষণা— তুই আমার, তোর প্রতিটি ক্ষত আমার অহংকার। শৈলী একটু কাঁপা গলায় ফিসফিস করে বলল,
—"আপনি ...আপনি তো ভয় দেখাচ্ছেন আমাকে!"
নিশান চোখে ঠাণ্ডা হাসি টেনে বলল,
—" ভয় না মিসেস তালুকদার, ওয়ার্মিং আপ। তোর মতো জেনুইন একটা মেয়ে যদি নিজের মুখে বলে যে সে নিজেকে জঘন্য মনে করে, তখন আমার মাথা ঠিক থাকে না, বুঝলি? এখনো বিশ্বাস না হলে বল, আমি আরেকটু প্রমাণ দিই যে তোকে কেমন লাগছে।"
শৈলী সজোরো দুদিকে মাথা নাড়লো। একটু থেমে নিশান আবার গম্ভীর স্বরে বলল,
—" আয়নার দোষ নিজেকে দিবি না, ও তো শুধু প্রতিচ্ছবি দেখায়। কিন্তু প্রতিচ্ছবির ভেতরে থাকা জীবন, অনুভব, আত্মা,সেগুলো আমি দেখি, বুঝলি? আমি তোকে দেখি কেমন করে নিজের ব্যথা লুকিয়ে হাঁটিস, কেমন ভেঙে পড়েও নিজেকে শক্ত রাখছিস, কীভাবে এই কটা দিন যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলি সেগুলো আমি দেখেছি। দাগগুলো সেই যুদ্ধে পাওয়া মেডেল, শৈলী। সেগুলো লুকাবি না, ওগুলো গর্ব করে রাখবি।"
শৈলী এবারো কিছু বলল না। চোখের জল গড়িয়ে পড়ল থুতনিতে। ধীরপায়ে একটা নিঃশ্বাস নিল সে, নিশানের প্রতিটা শব্দ গিলে নিচ্ছে নিজের অস্তিত্বে মিশিয়ে নিতে। নিশান আবারো ফিসফিস করে বলে উঠল,
—"এই মুখটাকে আগলে রাখার দায়িত্ব এখন আমার। কারো দৃষ্টিও যেন ছুঁতে না পারে। কেমন?"
শৈলী এবার আস্তে করে মাথা নাড়ল। শব্দহীন, কিন্তু প্রতিধ্বনি তীব্র। সে বুঝে গেছে, নিশান তালুকদার শুধু ভালোবাসে না, ওর প্রতিটা দাগকে ভালোবেসে ফেলেছে। তবুও একটু আগের ঘটনায় লজ্জায় মুর্ছা যাচ্ছে সে। আলতো করে নিশানের শার্টের কলার টা ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে বসল শৈলী। নিশান তবুও ঝুঁকে রইলো, সরু চোখে পর্যবেক্ষণ করল মেয়েটার অভিব্যক্তি। শৈলী এবার আড়চোখে তাকিয়ে নিশানকে এক পলক দেখে বলে উঠলো,
—"আপনি কি... সবসময় এমনই থাকবেন?"
নিশান ভ্রু কুঁচকে এক চুলও নড়লো না। ঠোঁটের কোণায় একপাশে টেনে গড়া নিঃশব্দ একটা হাসি খেলে গেল। গলার স্বর খাদে নামিয়ে বলল,
—"মানে?"
শৈলী দম নিয়ে বলে উঠল,
—"মানে... এমন ভয়ংকরভাবে কোমল? এমন নিষ্ঠুরভাবে স্নেহশীল? এমন রাগ করে ভালোবাসা ঢেলে দেওয়া মানুষ আপনি... সবসময় এমনই থাকবেন?"
নিশানের চোখে একরাশ প্রশান্তি খেলে গেল। আড়ালে মুচকি হাসতে ভুলল না। ও বুঝেই গেল, মেয়েটা যা বলতে চায়, সেটা আসলে ভালোবাসার পরিণতি। সে এবার আর ঝুঁকে নয়, বরং সোজা হয়ে বসে শৈলীর দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,
—"আমি জানি না ভবিষ্যতে কীভাবে থাকব, কেমন থাকবো, কিন্তু জানি আমার হিমরূপা সাথে থাকলে আমি অন্তত বেঁচে থাকব। আর যেদিন থাকবে না, সেদিন আমি আবারো সেই কঠিন নিশান হয়ে যাব,যাকে কেউ বোঝে না, আর যাকে কেউ বোঝার চেষ্টাও করে না।"
শৈলীর চোখ ভিজে উঠল। তবুও একটু হাসল সে। হালকা করে গাল স্পর্শ করল ওর আঙুল। বলল,
—"আপনি যদি এমন থাকেন, তাহলে... দাগ থাকুক। না হয় আরো কিছু থাকুক। আমি ভয় পাব না আর।"
নিশান চোখ বন্ধ করে শ্বাস ছাড়ল। ফিক করে হেসে গাড়ির ইঞ্জিন চালু করে বলল,
—"তাহলে চল, বাড়ি যাই। বাকি গল্পটা ওখানেই হোক। উমম...না না, বাকি কথা বাসর ঘরে হবে!"
শৈলী মাথা নিচু করে লজ্জা পেল। গাড়ি আবার স্টার্ট হলো। কিন্তু এবারের যাত্রাটা দুজনের একটা নতুন গল্প শুরুর যাত্রা।
°°°°°°°°°°°°°
তালুকদার বাড়ির মূল ফটকটা ধীরে ধীরে খুলে গেল নিশানের গাড়ির সামনে। বিকেলের আলো ঠিক তখনই সোনালি হয়ে উঠেছে। চারদিকটা নিঃশব্দ হলেও, বাড়ির আঙিনায় এক অদৃশ্য প্রস্তুতি চলছে। সাজানো বাগানের ঘাস গুলো ছাঁটা, ফুল গুলো এখনো সতেজ। একেকটা পাতায় সূর্যের আলো পড়ে হালকা ঝিকিমিকি করছে। পেছনের রান্নাঘর থেকে ভালোবাসায় মাখা ঘি আর বাসমতির সুবাস ভেসে আসছে, খাদিজা তালুকদারের রান্না শেষ হয়নি এখনো। গাড়ি থামতেই দরজার কাছে অপেক্ষারত মিমি ছুটে এলো প্রথমে। তার মুখে স্বস্তির ছায়া, কিন্তু চোখের ভেতর লুকোনো উদ্বেগ আজও মুছে যায়নি। রিমি আর আকাশও এলো দ্রুত গতিতে। এরপর ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন খাদিজা তালুকদার। তাঁর চোখে জল টলমল করছিল, তবে মুখে একখানা প্রশান্ত হাসি। রাশিদা তালুকদার একটু আড়ালেই দাঁড়িয়ে আছেন, গলার কাছের ওড়না শক্ত করে চেপে ধরেছেন। চোখে তার অস্থিরতা, পায়ে বিচলন। তাঁর মুখে কোনো শব্দ নেই, কিন্তু মিমির একপলকের দৃষ্টিতে ঠিকই ধরা পড়েছে, এই চুপচাপ মুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকা অপরাধবোধ।
নিশান একহাতে শৈলীর কাঁধ আগলে গাড়ি থেকে নামিয়ে আনল খুব সাবধানে। শৈলীর মুখে এখনো ক্লান্তি, কিন্তু চোখে একরাশ সাহস আর নিশ্চয়তা। তালুকদার বাড়ির উঠানে পা রাখতেই চারপাশটা যেন এক মুহূর্তের জন্য নিঃশব্দ হয়ে গেল। নিশান কাওকে তোয়াক্কা না করেই কোলে করে নিয়ে আসলো শৈলীকে। আকাশ এই দৃশ্য দেখে বরাবরের মত বাহ্বা দিতে ভুলল না, বিড়বিড় করে বলল,— সাব্বাশ ব্যাটা!
নাসিরুল তালুকদার তখন বাড়ির সামনের চেয়ারে বসে পত্রিকা পড়ছিলেন। সবাই রান্নাবান্না আর হুটোপাটিতে ব্যস্ত হলেও, তিনি ছিলেন অপেক্ষার স্থির এক চিত্র। শৈলীকে দেখে তিনি পত্রিকা পাশে রেখে উঠে দাঁড়ালেন। মুখে একগাল প্রশস্ত হাসি এনে এগিয়ে এলেন। শৈলীর চোখ ভিজে উঠল। নিশান তখনো ওর পাশে দাঁড়িয়ে, একহাতে শৈলীর হাত ধরা। শৈলীর দৃষ্টিতে একরাশ ভালোবাসা, একফোঁটা আত্মবিশ্বাস।
খাদিজা তালুকদার শৈলীকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন, সেই আদরে শৈলীর চোখ ভিজে উঠল। বললেন,
—"আলহামদুলিল্লাহ্, তুই ফিরলি মা। এই বাড়ির ঘরদোর আজ বাঁচল।"
তারপর চোখের পানি খেয়াল করে বললেন,
—"চোখে পানি কেন রে! কিচ্ছু ভাববি না, তোর সব দায়িত্ব এখন আমার। সব ঠিক হয়ে যাবে!"
রাশিদা তালুকদার কিছুটা দুরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। মিমি পেছন থেকে এসে বলল,
—" বড় মা,, শৈলী আপু কিন্তু খুব সুন্দর হয়ে গেছে। দেখো কত মায়াবতী লাগছে।"
রিমি ততক্ষণে ব্যস্ত হয়ে ছুটে গেল ভেতরের ঘরে,বিছানা গুছাতে, পরিষ্কার জামাকাপড় বের করতে। এই মাঝেই হুট করে নিশান ঠাণ্ডা কণ্ঠে বলে উঠল,
—" অনেক আদর হয়েছে। এখন ওর বিশ্রাম দরকার। রিমি, মিমি, তোরা ওকে নিয়ে গিয়ে আগে ফ্রেশ করা তো। গোসল করিয়ে দে, তারপর বিশ্রাম নিতে বল। ওর শরীর এখনো ক্লান্ত।"
শৈলী আপত্তি করতে গিয়েও পারল না। নিশানের কণ্ঠে এমন একটা নির্দেশের রেশ ছিল, যেটা মানা যায় না। তবুও একপলক চেয়ে রইল ওর দিকে,চোখে একরাশ প্রশ্রয়। নিশান এবার নিজেই ওর কাঁধে হাত রেখে শৈলীকে ঘরের ভেতর নিয়ে গেল। পিছু পিছু রিমি আর মিমিও গেলো। খাদিজা তালুকদার রান্নাঘরে আবারো ফিরে আসলেন, নাসিরুল তালুকদারও সস্থির শ্বাস ফেলে ঘরে বিশ্রাম নিতে গেলেন। শৈলীকে ঘরে বসিয়ে রেখে বাইরে আসলো নিশান। তখনি দেখতে পেলো আকাশ চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে। নিশানকে দেখেই এগিয়ে এলো উৎফুল্লিত চিত্তে,
—" ভাই, শৈলী তো বাড়ি ফিরেছে। এবার চল ওই বিষয়টা একটু দেখি। গাড়ির নাম্বার টা আমার মনে আছে!"
নিশান এক হাত তুলে থামিয়ে দিল আকাশ, দুহাত পকেটে গুঁজে বলল,
—" ওসব পরে, আমার সাথে চল আগে!"
আকাশ বিভ্রান্ত হয়ে নিশানের পিছুপিছু গেল। রাশিদা তালুকদার কেবলই নিচ থেকে উপরে এসে ঘরে ঢুকতে চাচ্ছিলেন। নিশান আর আকাশ কে এদিকে আসতে দেখে থমকে দাঁড়ালেন। তার মুখের নিচু ছায়ায় এক অস্বস্তির রেখা। নিশান ধীরে ধীরে হেঁটে এলো সামনে, পকেটে হাত গুঁজে, কাঁধ একটু বাঁকানো, গলায় হালকা শ্লেষ। আকাশ তাঁর পাশে এসে দাঁড়াতেই থমকে গেল, কারণ নিশানের মুখভঙ্গি হঠাৎ করে কেমন যেন কঠিন হয়ে উঠেছে। নিশান এক পলক রাশিদার দিকে তাকিয়ে থাকলো। তারপর শান্ত স্বরে বলল,
—" মামনি, আমাদের বাড়ির উঠোনটায় এখন যেমন সূর্যের আলো ঝরে পড়ছে, ঠিক তেমন ভাবেই সব অন্ধকারও একদিন ছেঁকে ফেলা যায়। শুধু খুঁজে নিতে হয়,আলোটা কোথা থেকে আসছে।"
রাশিদার কপাল ভাঁজ পড়ল। হুট করে এসব কী বলছে নিশান? আকাশও ভ্রু কুঁচকে তাকালো। নিশান আবারো বলল,
—"শৈলী আজ বাড়ি ফিরেছে। ভাবছিলাম, যাদের কারণে ওর এই অবস্থা, তারা বুঝি অন্তত একবার নিজের আয়নায় চোখ মেলবে।"
রাশিদা মুখ শক্ত করে ফেললেন, কিন্তু কিছু বললেন না। নিশান থামল না, এক পা আরও এগিয়ে শান্ত কণ্ঠেই বলল,
—" মামনি তুমি জানো, যারা পরিবারের হয়ে থেকেও পরিবারের ক্ষতি করে, তারা বাইরের শত্রুর চেয়েও বেশি ভয়ংকর হয়। কারণ তাদের মুখে হাসি, আর পেছনে ছুরি।"
আকাশ একটু বিভ্রান্ত হয়েই তাকিয়ে রইল, বুঝতে পারছে না, নিশান ঠিক কার কথা বলছে। আর কী-ই বা বলছে! নিশান এবার গলার স্বর নামিয়ে বলল,
—"ভাগ্য ভালো, শৈলী বেঁচে গেছে। কিন্তু সবার ভাগ্য এমন ভালো থাকে না, মামনি। জানোই তো?"
এবার রাশিদার চোখের ভেতরে আতঙ্ক ছড়িয়ে গেল। ছেলে টা কি তাকে হুমকি দিলো? নিশান বাঁকা হেসে তাকাল, একদম স্বাভাবিক গলায় বলল,
—"ওকে, আমরা একটু বের হচ্ছি। তুমি শৈলীর ঘরের ওদিকে বেশি হাঁটাহাঁটি করো না। আর হ্যাঁ, সবাই কিন্তু এখন খুব সাবধান হয়ে গেছে।"
নিশান ঘুরে আকাশকে বলল,
—"চল, ভাই। বিয়ের আয়োজন করি!"
আকাশ মাথা চুলকে বলল,
—" তা তো ঠিক আছে, কিন্তু ভাই, তুই যা বললি কিছুই বুঝলাম না।"
নিশান কেবল মৃদু হাসল। পেছনে দাঁড়িয়ে রাশিদা তালুকদার একটুও নড়ল না। তার পা যেন জমে গেছে মাটিতে। শুকনো ঢোক গিলে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন রাশিদা, বুঝতে পারলেন নিশান সন্দেহ করেছে। উহু, রীতিমতো সব বুঝতে পেরে হুমকি ছুঁড়ে দিয়ে গেলো।
°°°°°°°°°°
তালুকদার বাড়ি থেকে বেরোতেই জোরে জোরে পা চালালো নিশান। আকাশ পেছন পেছন দৌড়ে এলো।
—"ভাই! দাঁড়া, প্লিজ দাঁড়া তো!"
নিশান একটু এগিয়েই হঠাৎ থেমে গেল। কিন্তু পেছনে তাকালো না। আকাশ এসে পাশেই দাঁড়ালো। কপালে ভাঁজ ফেলে বলল,
—"তুই একটু আগেই যে কথাগুলো বললি আন্টিকে... ওসবের মানে কী? তুই কী জানিস কিছু? আমি কনফিউজড ভাই!"
নিশান পকেটে হাত গুঁজে রেখে উপরের দিকে তাকালো, শৈলীর ঘরের বারান্দাটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, কিঞ্চিত সময় নিয়ে বলল,
—"সবকিছু জানার দরকার নেই আকাশ। কিছু কিছু ব্যাপার শুধু বোঝা যায়, বলা যায় না।"
আকাশ বিরক্ত হয়ে মাথা নেড়ে বলল,
—" ধ্যাত! আবার শুরু করলি আধ্যাত্মিক কথাবার্তা! তুই সবসময় এইরকম করিস! একটা ভয়ানক এক্সিডেন্ট হলো। তোকে মারার জন্যই গাড়ি ছুটেছিল। তবু তুই শান্ত! এখন আবার আন্টিকে ইঙ্গিতে কীসব বললি! প্লিজ, আমাকে একটু ক্লিয়ার কর ভাই! আমি তোর ওসব সাধু ভাষা বুঝিনা!"
নিশান এবার ধীরে মাথা ঘোরাল, চোখে থেমে থাকা আগুন। গলায় একটুও রাগ নেই, কিন্তু স্বরটা ভারী।
—"আকাশ, বিশ্বাস কর, আমার চুপ থাকাটাই এখন যতটা বিপজ্জনক, কথা বললে ততটাই আমাদের ক্ষতি হবে। কারণ কেউ কেউ আমাদের এতটা কাছের, যে প্রমাণ থাকার আগেই মুখ খুললে নিজেরাই... যাক বাদ দে।"
আকাশ থমকে গেল। নিশানের চোখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল কিছু। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
—"তুই কি কাউকে সন্দেহ করছিস?"
নিশান এক পলক তাকাল, তারপর হেঁটে সামনে চলতে চলতে বলল,
—"না, আমি নিশ্চিত। শুধু সময় দিচ্ছি, যেন নিজেরাই নিজেদের ফাঁসিয়ে ফেলে।"
আকাশ নিঃশ্বাস টেনে বলল,
—"ভাই, এইবার আমাকেও সাথে রাখ। আমি রেডি!"
নিশান এবার ভ্রু কুঁচকে বিরক্তির স্বরে বলল,
—" ওসব কাহিনী সাইডে রাখ তো আকাশ। আমার কথা শোন, পরশু দিন বিয়ে করব আমি। ওসবের ব্যবস্থা কর দ্রুত। অত কাহিনী করতে হবেনা, শুধু কাজী, উকিল যা যা লাগে, সবকিছুর ব্যবস্থা কর!"
আকাশ চোখ কপালে তুলে তাকালো নিশানের দিকে। এমন দৃষ্টি বানালো যেন এমন কথা সে আগে কখনো শুনেইনি,
—"কি বললি তুই? পরশুদিনই বিয়ে করবি? ভাই, এত তাড়া কিসের রে? শৈলীকে আবার কেউ ছিনিয়ে নিয়ে যাবে নাকি? কেবলই সুস্থ হচ্ছে মেয়েটা!"
নিশান এক দৃষ্টিতে তাকালো, তবু আকাশ থামল না। মুখে ঠোঁট চেপে একটা হাসি চাপতে চাপতেই বলল,
—" না মানে, অত তাড়াহুড়োর কি আছে তাই বলছিলাম!"
নিশান একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
—"কিছু জিনিস সময়ের হাতে না রেখে নিজের হাতে তুলে নিতে হয়। শৈলীকে নিয়ে আর ঝুঁকি নিতে পারব না আমি।"
আকাশ একটু হেসে বলল,
—"তাই বুঝি? কিসের এমন ভয়? হবু ভাবি আবার পালাবে নাকি?"
নিশান তাকাল আকাশের দিকে, কিন্তু মুখে রাগ নেই, চোখে কেবল একটা দৃঢ়তা ধীরে বলল,
—"ও আমার নামের আগের কিছু না হলেও, এবার থেকে ও আমার পদক্ষেপের ছায়া হয়ে থাকবে। বাকি কারো সাহস হবে না তাকানোরও।"
আকাশ এবার একটু থতমত খেল, ঠোঁট কামড়ে নিচু স্বরে বলল,
—"তোর কণ্ঠের মধ্যে যে আগুন দেখছি, তাতে বুঝতেছি, তুই কিছু ধরেছিস... আবার কিছু লুকাচ্ছিসও।"
নিশান এবার হালকা হেসে কাঁধে হাত রাখল আকাশের।
—" বহুত বকেছিস, এখন চুপ করে গিয়ে যা বলেছি সেটাই কর। বিয়ের কাজটা নিখুঁতভাবে হোক। আর... কিছু বুঝলেও এখন কিছু জিজ্ঞেস করিস না। সময় হলে সব বলব।"
আকাশ আবার খিলখিলিয়ে হেসে বলল,
—"হ্যাঁ ভাই, ঠিক আছে। আমি কাজ করছি, তুমি ভাবি নিয়ে ভাবছো। তবে একটা কথা বলি,তোর জন্য যদি শেভ করে সালোয়ার কামিজ পরে বিয়েতে না আসি, তাহলে আমার নাম আকাশ না!"
নিশান এবার চোখ ঘুরিয়ে হালকা মুচকি হাসল, কিন্তু কিছু বলল না। পেছনে মুখ ফিরিয়ে হাঁটা দিল। আকাশ তখনো পেছনে দাঁড়িয়ে বলে উঠল,
—" এ শালা, যাস কই? আমিও যাব তোর সাথে। থাম, এই বেডা!" বলেই নিশানের পিছনে দৌঁড় দিল আকাশ।
চলবে.........
⚠️ নোট— পরবর্তী পর্বের জন্য আগে থেকেই দুঃখ প্রকাশ করছি। আগামী পর্বে কেও আমায় বকতে পারবেন না🫤🤲