#হিমরূপার_উষ্ণছোঁয়া
#পর্ব_১৪ ( ক্ষনিকের বিচ্ছেদ)
#কলমে_অনামিকা_তাহসিন_রোজা
অনেক কষ্টে নিজেকে শান্ত রেখেছে শৈলী। রাত নেমে এসেছে তালুকদার বাড়ির চারপাশে। বাইরে জোছনার আলো ছড়িয়ে পড়েছে উঠোনে, কিন্তু শৈলীর ঘরের ভেতরটা যেন আন্ধারে ঢেকে আছে। দুলতে থাকা পর্দার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া হালকা বাতাস কিছুই শান্ত করতে পারছে না। রাগে দুঃখে অভিমানে শৈলীর ইচ্ছে করছে ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে ম'রে যেতে। চোখদুটো লাল হয়ে ফুলে গেছে খানিকটা, ক্ষত হওয়া শরীরও কিছুটা কাঁপছে। ঘরের দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। জানালার পর্দা টেনে দেওয়া, বাতিটা জ্বলছে ক্ষীণ আলোয়। বিছানার এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে সে। চোখদুটো লাল হয়ে ফোলা, নাক টানার অস্পষ্ট শব্দ মাঝে মাঝে ঘরের নিস্তব্ধতা ছেদ করছে। তার কাঁধ জুড়ে এখনো বেঁধে রাখা ছোট ব্যান্ডেজ, তবুও সেই তুলনায় বেশি আহত যেন তার হৃদয়।
বিছানায় অবহেলায় পড়ে রয়েছে শৈলীর ফোনটা,পড়ে না বলে বরং ছুঁড়ে ফেলা বলাই ঠিক। যার উপরই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি নিক্ষেপ করে রক্তাক্ত চোখজোড়া টলমল করছে। কিন্তু এতকিছুর নিশ্চয়ই কোনো বড়সড় কারন রয়েছে। কারন টা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে শৈলীর ফোনের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করা একজোড়া কপোত-কপোতীর ছবি।স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে একটি ছবি, সদ্য পাওয়া। যেখানে মেয়েটা হলো খাদিজা তালুকদারের একমাত্র উড়নচন্ডি ভাগ্নি সীমা, এ নিয়ে কোনো মাথা ব্যাথা নেই শৈলীর। কিন্তু সাথে থাকা ছেলেটাকে দেখে মুহূর্তেই চোখ থেকে ছিটকে পানি বের হয়েছে শৈলীর। ছবিটায় সীমার গলায় ঝুলে আছে একজোড়া বাহু। ছেলেটার মুখে একরাশ প্রশান্তি, আর সেই মুখ,নিঃসন্দেহে নিশান তালুকদার।
শৈলীর পুরো শরীর ঠান্ডা হয়ে গেছে, আর রাগে গরমও। চোখ জ্বলে যাচ্ছে, ক্ষতের ব্যথাও যেন চাপা পড়ে গেছে মনে জমে থাকা অভিমানে। সে এতটুকুন গলায় ফিসফিস করে নিজের মনেই বলে ওঠে,
—"আপনি তো বলেছিলেন... আমাকে ছাড়া চলবেন না। আপনি তো বলেছিলেন আমার দাগ, আমার দুঃখ, সব ভালোবাসেন। তাহলে এই ছবি কেনো? সীমার পাশে আপনি এত স্বচ্ছন্দ কেন? কেনো ওর সাথে এমন ঘনিষ্ঠ ছবি?"
হঠাৎ করে শৈলী রাগে হাতের পাশে থাকা একটা কুশন ছুঁড়ে ফেলে দেয় মেঝেতে। তারপর সজোরে মুখ চেপে ধরে কান্না চেপে রাখতে চেষ্টা করে। কিন্তু কিছুতেই পারছে না। চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে গড়িয়ে নামছে, আর গলার মধ্যে জমে থাকা কান্না যেন বুক ভেঙে ফাটতে চাইছে। সে বিছানার মাথায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ বসে থাকে। তারপর এক সময় কাঁপা হাতে ফোনটা আবার তুলে নেয়। আঙুল চলে যায় ছবিটার উপর, তারপর থেমে যায়। কিছু একটা করতে চাইছে, হয়তো ডিলিট করবে, হয়তো কাকে যেন কল করবে, কিন্তু পারছে না। তারপর ধীরে ধীরে শুধু একবার ফিসফিস করে, ঠোঁট কাঁপিয়ে বলে ওঠে,
—"নিশান ভাই... আপনি যদি প্রতারক হোন, তাহলে আমি কার উপর ভরসা রাখব?"
বাতাস থেমে থাকে কিছু সময়। বাইরে কোথাও একটা পাখি ডাকে, আর ঘরের ভেতরে শুধুই শৈলীর ভাঙা কান্নার শব্দ।
-------
বিষয়টার সূচনা হয়েছে সন্ধ্যার দিকে। বিকেলের কিছু পরে শৈলী হাত মুখ ধুয়ে নিজের রুমে এসে জানালার পাশে উপন্যাস নিয়ে বসতে চেয়েছিল। বিছানায় এলিয়ে পড়া একটুখানি সময় পেয়ে প্রিয় উপন্যাসটা হাতে নিয়েছিল সে। বাইরে তখন মৃদু বাতাস বইছে, খাবার ঘর থেকে ভেসে আসছে সুগন্ধি রান্নার গন্ধ। সবকিছু শান্ত, স্বাভাবিক, নির্ভরতার মতো।
কিন্তু ওই সময়ে হোয়াটসঅ্যাপে হুট করে মেসেজ আসে সীমার আইডি থেকে। শৈলী একটু অবাকই হয়। সীমা তার তেমন কোনো ঘনিষ্ঠ নয়। বরং ছোটবেলা থেকেই সীমাকে সে এড়িয়ে চলে। কারণ সীমা সবসময়ই ছিল অস্বস্তিকরভাবে কাঁদুনে, ছ্যাচড়া, আর অকারণে বেশি বেশি আদিখ্যেতা করা টাইপের। এবং সবচেয়ে বড় কথা, সীমা ছিল সেই মেয়ে,
যে কিশোরী বয়সেই নিশানের আশপাশে ঘোরাঘুরি শুরু করেছিল। সেই কিশোরী বয়স থেকেই নিশান ভাইয়ের জন্য পাগল। বাসায় এলেই নানা অজুহাতে ওর সামনে যেত, কল্পনায় নিজের নামের পাশে নিশানের নাম বসিয়ে খাতার পাতায় লিখত, আর কখনো রান্না শিখে এনে বলত,
—" নিশান ভাই, আপনার জন্য রান্না করেছি!"
বাড়ির সবাই হাসাহাসি করে উড়িয়ে দিলেও শৈলীর মনে সীমার প্রতি সবসময়ই একটা অনাগ্রহ জন্মেছিল। তবুও সে কখনো কিছু বলেনি। কারণ নিশান কখনো পাত্তাই দেয়নি সীমাকে। অন্তত শৈলীর যতদূর জানা। সীমা অনেকবার প্রপোজও করছে নিশানকে, কিন্তু পরবর্তীতে নিশানের কী প্রতিক্রিয়া ছিল তা এখনো জানেনা শৈলী।
কিন্তু আজকের এই মেসেজটা সব পাল্টে দিল।স্ক্রিন খুলতেই শৈলীর চোখ আটকে গিয়েছিল একটা ছবিতে। ছবিটায় সীমা দাঁড়িয়ে আছে নিশানের একদম গা ঘেঁষে। তাদের মুখে হাসি, আর সীমার হাতে ক্যামেরা, একটু বাঁকিয়ে তোলা সেলফি। ছবিটায় সীমার মাথা প্রায় নিশানের কাঁধে রাখা। এমনভাবে তোলা যেন বোঝানো হচ্ছে, ওরা খুব কাছের কেউ। এরপরই সীমার টেক্সট—
" দেখো শৈলীপু, নিশান ভাই অবশেষে আমায় একসেপ্ট করেছে, আমরা এখন রিলেশনে আছি। বুঝতেই পারছো নিশ্চয়ই!" সাথে তিনটা হার্ট ইমোজি। আরো অনেক কিছু লিখেছে যেগুলো পড়ার ইচ্ছে হয়নি শৈলীর।
শৈলীর মাথা যেন ঝিম ধরে গেল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য সে তাকিয়েই রইল ছবিটার দিকে। তারপর বুকের ভেতরটা ধড়াস করে কেঁপে উঠল। রিলেশনে? কে? নিশান ভাই? মানে কি? এইসব কি সত্যি? নিশান কি সীমার সাথেই? না, এমন তো হওয়ার কথা না। নিশান তো কখনো এসব বলেনি! অথচ সীমা আজ এমনভাবে লিখেছে যেন বিষয়টা অনেকদিনের পুরনো। নিশানের সাথে যে শৈলীর বিয়ে! শৈলী জানে সীমা একটা ছ্যাচড়া মেয়ে, জানে সীমা অনেকবার নিশানকে প্রপোজ করেছিল। কিন্তু এমন ছবি? এমন শব্দ? এত নিশ্চিত ভাষা? কোনো ব্যাখ্যা মাথায় ঢুকছে না শৈলীর। ছবিটার প্রতিটি পিক্সেল এখন তার চোখে বিষ। বুকের ভিতর জ্বলছে ভয়ংকর এক আগুন, আর মাথার ভেতর চলতে থাকা আশাহীন প্রশ্ন। তাহলে আমায় কেন এত যত্ন করলেন? আমার দাগে চুমু খেয়ে... অন্য মেয়ের কাছে গেলেন?
নিজেকে প্রতারিত লাগছে শৈলীর। সে ফোন ছুঁড়ে ফেলে দেয়, মুখ গুঁজে ফুপিয়ে কাঁদতে শুরু করে। রাগ, কষ্ট, অভিমান,সব একসাথে মিশে যেন পুড়িয়ে দিচ্ছে ভেতরের সমস্ত শান্তি। এইভাবেই সন্ধ্যার শান্ত বিকেলটা রূপ নেয় নিঃশব্দ কান্নায় ডুবে যাওয়া এক অন্ধকার রাতে। অথচ, বোকা, আনাড়ি, অপদার্থ শৈলী ঠিকঠাক করে ছবিটা দেখলোই না! শুধু নিশানের চেহারা চোখে পড়তেই অশ্রুসিক্ত করেছে নয়নজোড়া!
°°°°°°°°′°°°°°°°°
বাইরে থেকে একটানা ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ, আর দূরে কোনো টিভির হালকা আওয়াজ। ঘড়ির কাঁটা রাত সাড়ে নয় ছুঁইছুঁই করছে। তখনই মূল দরজা পেরিয়ে মাত্রই ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকল নিশান। হাতে গাড়ির চাবি ঘোরাতে ঘোরাতে, কাঁধে একটু ঝুঁকে, পাশে আকাশ। দুজনেই কিছুক্ষণ আগেও জমিয়ে গল্প করছিল। একটু আড্ডা দিয়ে কেবলই বাড়িতে ফিরল, আকাশকে জোর করে নিজের বাড়িতে এনেছে নিশান। আকাশ এখনো কিছু একটা বলে হেসে ফেলল, আর নিশান কেবল ঠোঁটের কোণে একফোঁটা মৃদু হাসি নিয়ে মাথা নাড়ল। কিন্তু ঘরের ভেতর পা রাখতেই, ডাইনিং টেবিলের দিক থেকে ভেসে এলো খাদিজা তালুকদারের অভিযোগভরা গলা। তিনি হতাশ হয়ে জোর গলায় বললেন,
—" এই নিশান! এসেছিস ভালো করেছিস! একবার গিয়ে দেখ তো শৈলীর ঘরে! শৈলী সেই বিকাল থেকে ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে আছে। ডাকতে ডাকতে আমি আর মিমি ক্লান্ত হয়ে গেছি। কিচ্ছু খায়নি! রাতে ওভাবে না খেয়ে থাকলে অসুস্থ হয়ে যাবে আবার।"
নিশান থমকে দাঁড়াল। মুখ থেকে হাসি এক ঝটকায় ঝরে পড়ল যেন। চোখে মুহূর্তেই ছায়া পড়ল চিন্তার। আকাশ ভ্রু কুঁচকে তাকালো। নিশান এগিয়ে এসে উদ্বিগ্ন গলায় বলল,
—" আশ্চর্য! আবার কী হয়েছে? খায়নি কেনো? অসুস্থ অবস্থায় আবারো বাঁদড়ামি করছে? হয়েছে টা কী?"
খাদিজা তালুকদার এবার টেবিলের একপাশে রাখা থালাটার দিকে ইশারা করে বললেন,
—" তা তো মুখ ফুটে বের করাতেই পারলাম না। এই যে দেখ, ওর জন্য খিচুড়ি করেছিলাম, গরম গরম দিয়ে আসবো বলে অপেক্ষা করছিলাম। কিন্তু দরজা খোলেই না! বিকাল থেকেই একটানা ঘরের ভেতর! কিছু একটা হয়েছে নিশ্চয়ই, মুখে তো বলেও না! তুই যা তো বাবা, তুই ছাড়া কেও তো শাসন করতেও পারেনা!"
আকাশ একটু হকচকিয়ে নিশানের মুখের দিকে তাকাল। আশেপাশে তাকিয়ে সতর্ক হয়ে নিশানের কানের কাছে মুখ এগিয়ে নিয়ে দুষ্টু হেসে বলল,
—" কী ব্যাপার বন্ধু? তুমি কি বেবিকে ফিডার খাওয়াও নি? দরজা আটকে বসে আছে কেনো? নিশ্চয়ই ফিডার খাওয়ার বায়না করেছিল, আর তুমি না দিয়ে নিষ্ঠুরের মত চলে এসেছো? উহু, ভেরি ব্যাড! ভেরি ব্যাড বন্ধু!"
নিশান চোখ মুখ কুঁচকে তাকালো আকাশের দিকে। ছেলেটা কী বলছে এসব? এমন বদনা মার্কা আজগুবি কথাবার্তায় নিশান চোখ সরু করে দাঁত চেপে কন্ঠ খাদে নামিয়ে হুমকি ছুঁড়লো,
—" আমি তোকে খুন করে ফুল বডি ৩২ পিস করব, এরপর ১৬ পিস বুড়িগঙ্গা, আর ১৬ পিস নর্দমায় ছুঁড়ে মারব আকাশ! মাইন্ড ইট!"
আকাশ হালকা গলা ঝাড়ল,
—"না ভাই, না! এমন নিষ্ঠুরতা করবেন না। আমার বিয়ে এখনো বাকি। যাক, মূল কথা হলো, তুই শৈলীর প্রতি কেয়ারিং না। এইজন্যই বলি, প্রেম করতে গেলে শুধু ঝড়তুফানের নায়ক হলে হবে না,রোজকার আদুরে সংসারী পেট-ঘষা কবুতরের অভিনয়টাও শিখতে হয়।"
নিশানের চোখ একদম সরু হয়ে এলো। ঠোঁটের কোণে টান পড়ে, ঠিক যেন বজ্রপাতে ঝলসে ওঠার আগে আকাশে একটা নিস্তব্ধতা নামে।
—"আকাশ... আর একটা শব্দ বললে, তোর কানটা টেনে এমনভাবে বাঁশের মাথায় বেঁধে দেব, পরেরবার আদুরে বললেই ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শুনবি।"
আকাশ হাঁ করে নিশানের দিকে তাকিয়ে রইলো, তারপর নাক চুলকে বলল,
—"ওই যে, কথা বললে মুখের ভেতর থেকে মেঘের গর্জন বের হচ্ছে! মানে ঠান্ডা রাগ! আমি তো একেবারে ভুল কিছু বলিনি ভাই... আমার ভবিষ্যদ্বাণী ঠিক, আপনার সুইট কিউট বেবি রেগে আছে! প্ল্যানেট মার্স আর ভেনাসের মাঝে এখন টেম্পারেচার গরম, এইটা বুঝা যাচ্ছে।"
নিশান ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই একটু থেমে চোখ টিপে আকাশ আবার বলল,
—"তবে শোন, আমি তো বললাম ঠাট্টা করে, কিন্তু তোর চেহারা যা দেখছি, এখানে প্রেমের মার খাওয়া টাইপ কেস চলছে। এখন তো তোদের বিছানা ঝামেলাও শুরু হয়ে গেছে বুঝি?"
ব্যাপারটা গভীরে যেতেই নিশান এবার ঠাণ্ডা গলায় বলল,
—"আকাশ, শাট আপ!"
আকাশ ঠোঁটে আঙুল রেখে চুপ থাকার ভান করলে নিশান এবার চোখ ঘুরিয়ে শৈলীর ঘরের দরজার দিকে তাকালো। এরপর পা চালালো ধীরে, যাওয়ার সময় কেবল একটা ঠান্ডা ঝাপসা বাক্য ফেলল,
—"তুই নিজের মুখটা এভাবেই বন্ধ রাখ। না হলে প্রেমের ক্লাস না করে হাসপাতালে ওটিতে ডাক্তারদের পেছনে কাজ শিখতে হবে তোকে।"
আকাশ আবারও নাক চুলকে হেসে বলল,
—"ওহ! মানে আপনি শৈলী আপুর ওটি, ওহ! ওটাই মানে ওটা, মানে... আচ্ছা ঠিকাছে, আর না বলি! ফিডার দিয়ে ওটিকে নিয়ে যা খুশি করো!"
খাদিজা তালুকদার আবারো হাঁক ছুঁড়লেন রান্নাঘর থেকে,
—" নিশান! কি করছিস টা কি? তাড়াতাড়ি ডেকে আন না শৈলীকে। খাবার পরে ভালো লাগবেনা। গল্প পরে করিস। "
নিশান পেছনে না তাকিয়েই একদম শান্ত, গম্ভীর চালে শৈলীর ঘরের দিকে রওনা দিল। কিন্তু চোখে-মুখে এখন আগুনের মত একটা ভাব। আকাশ ওখানেই দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে বলল,
—"ভাইরে ভাই... প্রেমিকরা যত রুক্ষই হোক, বউ যদি না খেয়ে কাঁদে, তাহলেই দেখা যায় সেই সিংহও ভিজে বিড়াল হয়ে যায়! বেচারা, নিশান তালুকদার, আপনার জন্য কষ্টে আমার খুব হাসি পাচ্ছে! "
নিশান ততক্ষণে এক পা, দু’ পা এগিয়ে গিয়েছে শৈলীর ঘরের দিকে, চোখে গাঢ় গম্ভীরতা জমেছে। ওর চেহারার সেই শীতল কাঠিন্য ফেরত এসেছে, যা সাধারণত থাকে না যদি না ওর ভিতরে কিছু ভাঙতে শুরু করে।
°°°°°°′°°°°°°
শৈলীর শয়নঘরের সামনে এসে দাঁড়ায় নিশান। দরজাটা বন্ধ, নিঃশব্দ ঘরটার বাইরে তখনও একটু বাতাসে জানালার পর্দা দুলে ওঠে, ভিতরের অস্থিরতা বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে। নিশান কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে গভীর নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর দরজার বাঁ পাশে মুখ ঘুরিয়ে ঠান্ডা গলায় ডাক দিল,
—"শৈলী?"
কোনও উত্তর নেই। নিশান দ্বিতীয়বার ডাকে, এবার একটু গলা নিচু করে, অনেকটা অভ্যস্ত সুরে,
—"শৈলী, দরজাটা খোল। ঘুমিয়েছিস?"
ভেতরটা নিস্তব্ধ। নিশান কপালের ভাঁজ আরো গভীর করে দরজায় কড়া নাড়ে,
—"শৈলী, নাটক করিস না! রাত-বেরাতে হয়েছে টা কি? এই অসুস্থ শরীর নিয়ে ঢঙ করছিস তুই? দরজা খোল! আমি জানি তুই ঘুমাসনি!"
ভেতর থেকে কোনও শব্দ নেই, কিন্তু শৈলী ঠিকই শুনছে। বিছানায় বসে বসে, বুকের কাছে বালিশটা জড়িয়ে ধরে সে নিশানের প্রতিটা শব্দ গিলে নিচ্ছে। চোখের পানিতে ভিজে যাওয়া বালিশে মুখ গুঁজে সে ফিসফিস করে বলে উঠলো নিজের ভেতরেই
—"আপনি এত সহজে ‘জানতে চাওয়া’র অভিনয় করছেন? আমার কাছে আপনার সব অভিনয় এখন ঘৃণ্য লাগছে... সীমার ছবিটা কি ভুলে গেছেন? ওর সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে ছবি তুলেও এখন দরজা ধাক্কাচ্ছেন, হাহ!"
শৈলী উঠে এসে দরজার কাছে গিয়েও দাঁড়ায় না, বরং মৃদু পায়ে আবার বিছানায় ফিরে আসে। বুকের ভেতর রাগ, অপমান আর অভিমান ঝড়ের মত কাঁপছে। নিশান এবার বাইরে থেকে একটু জোরেই বলে উঠলো,
—"তুই একটাও কথা বলছিস না কেনো শৈলী? খাবি না কিছু? বিকাল থেকে কিছু খাসনি তো! ট্রাস্ট মি, আমাকে যদি দরজা ভাঙতে হয়, তাহলে ভেতরে ঢুকেই দুটো চড় মারব তোকে!"
এ পর্যায়ে ডুকরে কেঁদে উঠে শৈলী। তবুও ভেতর থেকে কোনও শব্দ আসে না। একটুও না। নিশান আবারো ঠকঠক করে কড়া নাড়লে শৈলী এবার উঠে দাঁড়ায়, কিছু একটা ভেবে নিজেকে শক্ত করে, ধুপধাপ করে এগিয়ে এসে ফট করে দরজা খুলে। নিশান অপেক্ষাতেই ছিল, এ পলকই শৈলীর আপাদমস্তক স্ক্যান করে নিশান প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
—" হোয়াটস রঙ? সমস্যা কী তোর? এমন ফালতু কাহিনী করার মানে কী? বিকাল থেকে ঘরে বসে করছিস টা কী? মা ডাকছে শুনিস নি?"
এ পর্যায়ে মেঝেতে নামিয়ে রাখা চোখজোড়া তুলল শৈলী, সোজা দৃষ্টি ফেলল নিশানের দিকে। তৎক্ষনাৎ নিশানের কুঁচকে যাওয়ার ভ্রু শিথিল হয়ে আসে, পকেট থেকে হাতও বেরিয়ে আসে। মুখে ফুটে উঠে অস্থিরতা, কারন শৈলীর চোখ দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে মেয়েটা অনেকক্ষণ যাবৎ কান্না করেছে।
নিশানের ঠোঁট শুকিয়ে এলো শৈলীর চোখে সেই বিস্ময়কর রঙ দেখে। রাগ, অভিমান, আর একরাশ অপমানের ছায়া লেগে আছে সেখানে। সে এক পা এগিয়ে এলো। চোখে দুশ্চিন্তার ছাপ নিয়ে কণ্ঠটা একটু নরম করেই বলল,
—"শৈলী... তুই ঠিক আছিস তো? কান্না করেছিস কেনো? কিছু হয়েছে না কি? মুখটা এমন ফুলে গেছে কেন? চোখ দুটো লাল, কী হয়েছে?"
শৈলী চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। একটুও নড়ল না। নিশান এবার একধাপ এগিয়ে শৈলীর হাতটা ধরল। ওর আঙুলের গাঁটে ছুঁয়ে গেল শৈলীর কাঁপুনি।
—"কি হয়েছে রে? বল না! আমি তোর জন্য পাগল হয়ে যাচ্ছি। কেউ কিছু বলেছে? শরীর খারাপ লাগছে? আমাকে না বললে....প্লিজ, বল তো কী হয়েছে? আমি না বুঝে কিছু করলে....."
শৈলী এবার হঠাৎ করে হাতটা ছুঁড়ে ছাড়িয়ে নিল। এক ঝটকায় ছাড়ালো। চোখদুটো বিস্ফোরিত, তীব্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
—"আপনি না থাকলেও আমি বাঁচতে পারি, নিশান ভাই। দয়া করে আমার জন্য আর তথাকথিত ‘পাগল’ হয়ে যাবেন না। আপনার প্রেয়সীর খোঁজ রাখাটাই হয়তো এখন বেশি জরুরি আপনার জন্য!"
নিশান থমকে গেল। মুখটা যেন জমে গেল হঠাৎ। ভ্রু কুঁচকে শুধালো,
—"হোয়াট? প্রেয়সী? কিসের কথা বলছিস তুই? কি বলছিস এসব!"
শৈলী বোধহয় হুট করেই সমস্ত সাহস একত্রিত করেছে,
—"আপনার এসব মায়া-মমতার অভিনয় আর সহ্য হয় না আমার। আপনি হয়তো ভাবছেন, আমি কিছু বুঝিনি। কিন্তু ভুল ভেবেছেন আপনি। আমি সব বুঝি। কিন্তু সবকিছু বলি না। কারণ, কেউ যদি বোঝার না থাকে, তাকে বোঝানোও বৃথা।"
নিশান থমকে দাঁড়িয়ে গেল। মুখে হতভম্ব ভাব। সে কিছু বলতে যাবে, কিন্তু শৈলী তার আগেই চোখ সরিয়ে সরে গেল পাশ দিয়ে। মুখ ঘুরিয়ে বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। পেছনে পায়ের শব্দ না পেয়ে বুঝল নিশান স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শৈলী এবার পেছন না ঘুরেই খুব নিচু স্বরে বলল,
—"আপনি যেতে পারেন। আমি ঠিক আছি। আমার জন্য কিছু করার নেই এখন আপনার।"
নিশান নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল শৈলীর পিঠের দিকে। মেয়েটা কী জানে? কতটুকু জানে? কী দেখেছে? কী ভেবেছে? কী হয়েছে? নিশান তো অসহায়! কিছুই বুঝতে পারছেনা! তার হিমরূপার কন্ঠে এই প্রথম তেজ দেখলো নিশান, তাও আবার ঘৃণার সহিত! কেনো? এমনটা তো হওয়ার কথা না! শৈলীর ঠোঁটদুটো তখনো কাঁপছে, বুকটা ওঠানামা করছে কান্না চেপে রাখার ভারে। তবুও নিজেকে শক্ত রাখল সে।
নিশান এবার গলা একটু নামিয়ে ধীরে ধীরে বলল,
—"একটু আগে বললি না, কেউ যদি বোঝার না থাকে, তাকে বোঝানো বৃথা? তাহলে আমি বুঝতে চাইলে, তুই বলবি না? খোলাসা করে বলবিনা?"
শৈলী এবার ধীরে ধীরে পেছন ফিরে তাকালো। মুখে অভিমান, চোখে কষ্ট, আর ঠোঁটের কোণে ছুরির মত কাটা এক বাক্য ছুঁড়ে দিল,
—"আপনি বুঝতে চাইলেই তো বোঝা যায় না। বুঝতে হলে চোখ থাকতে হয়, মন থাকতে হয়। সেটুকু থাকলে, এমনটা হতো না।"
শব্দ ফুরাতেই আবার মুখ ঘুরিয়ে নিল শৈলী। নিশানের মন বুঝে গেল, আজ সে ভেতরে ঢুকলেও শৈলীর কাছে পৌঁছাতে পারবে না। কিন্তু মস্তিষ্ক খেপে উঠলো। সে সব সহ্য করতে পারলেও শৈলীর এমন তীক্ষ্ণতা, অবহেলা সহ্য করতে পারল না। বিরক্ত হলো। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারল না নিশান। গটগট করে এগিয়ে গিয়ে সজোরে চেপে ধরল শৈলীর কনুই, টেনে নিজের দিকে ঘুরিয়ে হিসহিসিয়ে বলল,
—" নাটক করছিস তুই হ্যাঁ? নাটক? তামাশা করার জায়গা পাস না? কীসব আজেবাজে কথা বলছিস তুই হ্যাঁ? আর মরা কান্না কেঁদেছিস কেনো? বলদ মেয়ে, কিছু না বললে বুঝবো কি করে আমি! আবার আমার সাথে উঁচু গলায় কথা বলছিস? এত সাহস কে দিল? এমন করছিস কেনো তুই? কেনো? বল কেনো?"
শৈলী নিজের কনুই ছাড়িয়ে নিতে আপ্রাণ চেষ্টা করছে। নিশানের শক্ত হাতের চাপে ওর ক্ষতস্থানে যন্ত্রণা হচ্ছে, কিন্তু সে শব্দ করল না। ঠোঁট কামড়ে নিজেকে শক্ত রাখল। তবুও নিশান থামছে না, ওর চোখ জ্বলছে, দম যেন ক্ষিপ্র হয়ে উঠেছে। শৈলীর চোখে জমে থাকা জল এবার ধীরে গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু সে মাথা ঘুরিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
—"ছাড়ুন আমাকে! আপনি কি জানেন না আমার গায়ে ব্যথা আছে? আপনি জানেন না আমি ঠিক মতো দাঁড়াতেও পারি না? তবুও আপনি এমন করছেন? এতটুকু সহানুভূতিও নেই আপনার ভেতরে?"
নিশান এবার আরও জোরে ঝাঁকিয়ে বলল,
—" কথা ঘোরাবি না একদম! আমি তো কিছু জানিই না! তোরা তো কিছু বলিস না! শুধু চুপ করে কষ্ট করে যাবি, আর আমার চোখে চোখ রেখে বলতে যাবি আমি কিছু বুঝি না! আমি কী করিনি তোর জন্য বল? এখনো যদি বোঝার মানুষ না হতাম, তাহলে তোকে..!"
শৈলী এবার আচমকা হাঁপাতে হাঁপাতে কাঁপা গলায় বলে উঠল,
—"আপনি যদি সত্যিই বোঝার মানুষ হতেন, তাহলে...যাক, ছাড়ুন আমাকে! আপনি কে আমাকে এমন করে ধরার? স্বামী? নাকি প্রেমিক? আপনার তো অনেক রঙিন ইতিহাস আছে, সেখানে আমি কি এক্সট্রা হয়ে গেলাম? আপনি তো অভ্যস্ত, একজনকে রেখে আরেকজনের কাছে যাওয়া, একজনকে কথার মালা পরিয়ে আরেকজনের হাতে ছবি তুলে দেওয়ার! আমার সাথে অভিনয় করছেন না তো আপনি? ভাবছেন আমি বুঝিনি?"
নিশানের মুখটা মুহূর্তেই সাদা হয়ে গেল, চোখের পাতা আর নড়ে না। হাতটা যেন নিজে থেকেই আলগা হয়ে গেল শৈলীর হাত থেকে। ওর চোখজোড়া বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠলো। মুখের সব রঙ মুহূর্তে ফ্যাকাশে হয়ে পড়ে। এতটা তীব্র, এতটা নির্মমভাবে কেউ তার চরিত্রের উপর প্রশ্ন তুলবে— এটা সে কল্পনাতেও আনেনি। ঠোঁট নাড়ল একটু, কিন্তু শব্দ বের হলো না।
শৈলী এবার ঝটকা দিয়ে নিজের হাত ছাড়িয়ে নেয়। তারপর থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
—"আমি একটা ক্ষতবিক্ষত শরীর নিয়ে আপনার কাছে ফিরেছি ভেবেছিলাম, আপনি হয়তো আগলে রাখবেন। কিন্তু আসলে আমি কি ছিলাম? এক্সপেরিমেন্টাল পিস? কেমন করে বলব, কতটা ভুল করেছিলাম আপনার চোখে নিজেকে স্পেশাল ভাবতে গিয়ে!"
নিশান এখনো কিছু বলতে পারছে না। একটা বিশাল কিছু এসে যেন বুকের মধ্যে আটকে গেছে। চোখে কেবল বিস্ময়। দৃষ্টি শূন্য। শৈলী এবার দম নিয়ে খুব শান্ত গলায় বলল,
—"আপনার মতো মানুষকে বিশ্বাস করা, এক জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল আমার। আপনি যদি সত্যিই সৎ থাকতেন, তাহলে আমার সামনে দাঁড়াতে গিয়ে গলায় এই নোংরা দাগগুলো দেখে ঘুরে যেতেন না। আপনার দৃষ্টি তো কোথায় ঘুরে ছিল, সেটা আমি খুব ভালো করে জানি।"
এইবার নিশান আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। এক পা পিছিয়ে গিয়ে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়ালো। শৈলীর তীক্ষ্ণ বাক্যগুলো যেন মর্মে ছুরি হয়ে বিঁধলো। শেষে কিনা শৈলী নিশানের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলল? নিশান নাকি শৈলীকে শুধু ভো'গ করতে চায়, এমন কথা ঘুরিয়ে বলল? কী বলছে এসব শৈলী? কাকে বলছে? যে কিনা দিনরাত এক করে হসপিটালে তার সেবা করল? যে কিনা পাগলের মত ভালোবাসলো? তাকে?কিন্তু তবুও শৈলী ছবির কথা একটিবারও মুখে আনলো না। কারণ সে দেখতে চায়, নিশান নিজে থেকে সত্যিটা বলে কিনা।
নিশান এবার অস্ফুটস্বরে মর্মান্তিক গলায় জিজ্ঞেস করল,
—" তুই...তুই আমার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলছিস?"
শৈলী এতক্ষণ পর হুঁশ ফিরে পেলো। রাগের মাথায় উত্তেজিত হয়ে কী জঘন্য কথা বলে ফেলেছে উপলব্ধি করতেই চমকে ভয়ে আতঙ্কে নিজের মুখ চেপে ধরল শৈলী, চোখজোড়া বড় হলো সহসা। আল্লাহ! এ কিসব কথা বলল সে? এ কি জঘন্য অপবাদ দিল? কাকে বলল? কেনো বলল? এত বেশি বলল কেনো? শৈলী ভয় পেলো। কিন্তু তখনো থমকে গিয়েই হতবাক দৃষ্টি নিশানের। নিশান নিঃশব্দে একপা পেছনে সরে গেল। যেন কেউ বুকের মাঝখানে হাত ঢুকিয়ে ধাক্কা দিয়েছে। চোখ দুটো ঘোলাটে হয়ে এলো। এইটুকু স্পষ্ট হয়ে গেল, শৈলীর একটা বাক্যেই আজ নিশান তালুকদারকে একেবারে থামিয়ে দিয়েছে।
নিশানকে এক পা দুপা করে পেছাতে দেখে চরম ভয় পেলো শৈলী। সে আসলেই এত বলতে চায়নি! মোটেই চায়নি! কিন্তু রাগে দুঃখে মুখে যা আসে, বলে দিয়েছে! এখন কী হবে? আগাম ঝড়ের পূর্বাভাস পেয়ে স্তব্ধ হয়ে পিছাতে থাকা নিশানের দিকে এক পা এগোতে চাইলো শৈলী। নিশান সাথে সাথে এক হাত তুলে থামিয়ে দিল শৈলীকে। এবার নিশানের চোখেও একটু জ্বলজ্বল করতে দেখা গেলো? লোকটা কি কাঁদছে?
শৈলী নিশানের এমন বিধ্বস্ত অবস্থা দেখে একটু আগের সব ঘটনা সহসাই ভুলে গেলো। ভুলে গেলো সেই ছবির কথা, ভুলে গেলো রাগ-অভিমান! সবকিছু ভুলে " নিশান ভাই! " বলে ছুটে আসতে চাইলো। সাথে সাথেই তীব্র গর্জনে কেঁপে উঠলো পুরো ঘর, নিশান এক হাত উঠিয়ে সিংহের ন্যায় গর্জন করল,
—" থাম, থাম, থাম! ওখানেই থাম। আমার কাছে আসবিনা। খবরদার শৈলী, কাছে আসিস না আমার। তুই আমার হাতে খু'ন হবি। তোকে আমি মেরে ফেলব। কাছে আসিস না! আসবিনা কাছে। দুরে থাক!"
নিশানের চোখজোড়া এখন আর আগের মতো নরম নেই। সেই চোখ দুটোতে যেন আগুন জ্বলছে, তবে সে আগুন শৈলীকে পোড়ানোর নয়, বরং নিজের ভেতরেই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার আগুন। রক্তলাল চোখে দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে আছে নিশান তালুকদার। সারা শরীর কাঁপছে রাগে, কষ্টে আর অপমানে। শৈলী নিশানের কথার ধরন দেখে থমকে রইলো। সে দমবন্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে ঠিক সামনেই। মুখে তীব্র আতঙ্ক, চোখে জল, ঠোঁটে অনুশোচনার ফিসফিস। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। অনেক দেরি।
নিশান এবার এক পা পিছিয়ে এলো, গলা ঝাঁকিয়ে বলল,
—"এতদিন তোকে চোখের মণির মতো আগলে রেখেছি। তোকে দেখলেই মনে হতো আমার নিজের পৃথিবী। হাসপাতালে তোর মাথার কাছে বসে দিনরাত কাটিয়েছি। নিজের হাতে খাইয়েছি তোকে। একটা পলকেও দৃষ্টির বাইরে যেতে দিইনি। সারাজীবন, এতদিন সবসময় তাই করে এসেছি। আর তুই? তুই শেষে আমায় কী বললি? আমি তোর শরীর চেয়েছি? তোকে ছুঁয়েছি বলে সেই স্প'র্শ নোংরা বললি?"
কথা ফুরোতে না ফুরোতেই নিশান নিজের শার্টের কলার দু’হাতে টেনে ছিঁড়ে ফেলল। মুখের প্রতিটা রেখায় ক্ষোভ ফুটে উঠলো। গলায় অস্ফুট সুরে ফেটে বের হলো আরও এক তীব্র বাক্য,
—" তবে শুনে রাখ, আজ থেকে, এই মুহূর্ত থেকে, আমি তোর মুখ দেখতে চাই না। তুই আমার কিচ্ছু না। তোর দাগ, তোর কান্না, তোর শরীর, কিছুই না। তুই একটা ভুল ছিলি আমার জীবনে। একটা বিশ্রী, নোংরা ভুল। তোকে ভালোবেসে আমি নিজের জীবনটাই পুড়েছি। এখন থেমে যেতে হবে। আজ থেকে, আমি তোকে ঘৃণা করি। শুনলি তুই? ঘৃণা। আমার মতো চরিত্রহীনকে আর দেখতে হবে না তোকে। ঘৃণা করিস তো তুই আমায়? যাহ, আমিও ঘৃণা করলাম তোকে।"
এই শেষ লাইনটা উচ্চারণ করতেই নিশানের কণ্ঠ ভাঙল। ঠোঁট কাঁপল। কিন্তু সে চোখ সরায় না শৈলীর দিক থেকে। বরং শক্তভাবে দাঁড়িয়ে রইল। শৈলীর পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেল যেন। নিশানের প্রতিটা শব্দ যেন বুকের ঠিক মাঝখানে কুড়ালের আঘাত। সে চিৎকার করে কাঁদতেও পারছে না, শুধু ঠোঁট কামড়ে রক্তাক্ত মুখ করে কেঁপে কেঁপে উঠছে। নিশান যদি তাকে গালিও দিত,তা হলেও সহ্য করতে পারত। কিন্তু এইভাবে ঘৃণা? এইভাবে অবজ্ঞা? এইভাবে সম্পর্ক শেষ? সে ফিসফিস করে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বেরোল না। বরং শরীরটাই কাঁপতে কাঁপতে পিছনে সরে গেল। চোখে এখন শুধু দুটো কথা, ভয় আর ভাঙা বিশ্বাস।
নিশান পেছন ঘুরে গেল। ধীর পায়ে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। পেছনে তাকায়নি একবারও। আর দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার শব্দে শৈলী হাঁটু গেঁড়ে মেঝেতে বসে পড়ল। বুকের ভেতর থেকে হু হু করে কান্না বেরিয়ে এলো, নিঃশব্দে। ঠোঁট কাঁপছে, আর বারবার ফিসফিস করে বলছে,
—"আমি এটা বলতে চাইনি... আমি তো এটা বলতে চাইনি... আমি..আমি....
হুট করে শৈলী উপলব্ধি করল, নিশান তো চলে যাচ্ছে! নিশান তো এখন বাড়ি থেকে বের হয়ে যাবে, আর যদি চলে যায় তাহলে তো? চলে গেলে তো আর ফিরবে না। আজ চলে গেলে আর কখনও এই চোখজোড়া, এই হাতজোড়া, এই মানুষটা… আর হবে না তার। আর কিছু না ভেবেই সবকিছু পেছনে ফেলে ছুট লাগালো শৈলী। নিশানের পিছু পিছু দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে চিৎকার করতে থাকলো,
—" নিশান ভাই, কথাটা শুনুন, যাবেন না নিশান ভাই।"
একটুও সময় নিল না শৈলী। অস্থির এক পাগলের মত ছুটে উঠল। হাঁটু গেঁড়ে থাকা অবস্থা থেকে হোঁচট খেতে খেতেই উঠে দাঁড়াল, পায়ের জুতো পরারও ফুরসত নেই, চুল এলোমেলো, মুখে কান্নার আঁচড়, কিন্তু সে ছুটলো।
—"নিশান ভাই!!! প্লিজ! একবার শুনুন! আমার কথা শুনুন! আপনি যাবেন না! প্লিজ... প্লিজ!!"
তার কণ্ঠে এক বিষন্ন কাকুতি। সিঁড়ি নামার শব্দে বাড়ির ভিতর টালমাটাল। নিচে রান্নাঘরে থাকা খাদিজা তালুকদার ভয়ে থমকে দাঁড়ালেন। রান্নাঘর থেকে থালা হাতে বেরিয়ে এসে হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকলেন। মিমি, রিমি ছুটে এলো। আকাশও শৈলীর চেঁচানো শুনে উপরে তাকালো।
শৈলী পা দুটো টেনে টেনে ছুটছে নিশানের পেছনে। চোখ ঝাপসা, তবুও বুঝতে পারছে,নিশান দ্রুত পায়ে চলে যাচ্ছে। সামনে উঠোনে দাঁড়িয়ে আকাশ বিভ্রান্ত মুখে জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিল কী হয়েছে,তার আগেই নিশান পাশ কাটিয়ে বলে উঠল,
—"চল, আকাশ। এখান থেকে বেরোতে হবে এখনই।"
—"ভাই কিন্তু... কী হয়েছে..শৈলী তো.."
—" আমার সাথে যাবি কিনা !"
নিশানের কণ্ঠে ঝড়। চোখে আগুন। আকাশ বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। সেই মুহূর্তে পেছন থেকে ছুটে আসে শৈলী। দম নিতে পারছে না, দুচোখে ঝর্ণার মত কান্না। চিৎকার করেই কাঁপা কণ্ঠে বলে ওঠে,
—"নিশান ভাই! আপনি প্লিজ... এমন করে যাবেন না... প্লিজ.. আমায় ভুল বুঝবেন না..নিশান ভাই, শুনুন, বড় মা তোমার ছেলেকে আটকাও!"
নিশান পেছনে তাকায় না। বাড়ির মেইন গেট পেরিয়ে যাওয়ার আগমুহূর্তে সে একবার থামে, সামান্য মুখ ঘুরিয়ে খুব শান্ত কণ্ঠে বলে,
—"মা... ভালো থেকো।"
খাদিজা তালুকদার হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, শৈলীর কথা শুনেও তিনি কিছু বুঝতে পারেননি। ভেবেছিলেন নিশান হয়তো বকেছে। কিন্তু ছেলের মুখে এমন কথা শুনে ঠোঁটে কথা জড়ায়,
—" বাবা! কী হয়েছে রে! এইভাবে যাচ্ছিস কোথায়?"
কিন্তু নিশান ততক্ষণে গেট পেরিয়ে যাচ্ছে। আকাশও দিকভ্রান্তভাবে তাকিয়ে শৈলীর দিকে একবার, তারপর নিঃশব্দে অনুসরণ করে। শৈলী দাঁড়িয়ে থাকে সিঁড়ির একদম শেষ ধাপে। ঠোঁট কাঁপে। একরাশ কান্না চেপে ধরে। নিশানের গাড়িতে করে চলে যাওয়ার আওয়াজ মিলিয়ে যেতে যেতে সে হঠাৎ করে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ে। বুক থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে আসে একবিন্দু আকুতি,
—"আমি তো শুধু আপনাকে ভালোবেসেছিলাম... কপালে কি এতটুকুও ছিল না? আমি বুঝিনি নিশান ভাই, আমার কথাটা শুনে যান!"
চলবে.........
বকবেন না আমাকে🫶
🙂 আসলে আপনাদের লেখিকার মন খারাপ, তাই আর কি! হে হে! তবে হতাশ হবেন না। আপনারা অন্তত জানেন, যত খনিকের বিচ্ছেদ, তত ভালোবাসা! বুঝেন নি? পরের পর্বে বুঝবেন🥹🤌🏻