#হিমরূপার_উষ্ণছোঁয়া
#পর্ব_২০ ( প্রথম পরিচ্ছদের সমাপ্তি)
#কলমে_অনামিকা_তাহসিন_রোজা
—" নিশান ভাই, আই এম সরি। কেনো এমন করছেন? আমি তো ভুলে মিস্টেক করেছি। ছোট বাচ্চা ভেবে ক্ষমা করে দিন প্লিজ!"
শৈলীর এমন অসহায় মুখে বলা আকুতি শুনেও আজ নির্বিকার রইলো নিশান তালুকদার। পাত্তা না দিয়ে রীতিমতো অবজ্ঞা করল খুব সহজে। কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছে শৈলীর! তবুও কিছুই করার নেই। অবশ্য শৈলী যেই কাজ করেছে তাতে এটাই সঠিক প্রাপ্য বলে মনে করে বাড়ির সকল সদস্য।
আজ শুক্রবার। সবাই যে যার মত করে বাড়িতে রয়েছে। তবে তালুকদার নীড়ে আজকের শুক্রবার একটু বেশিই স্পেশাল বললেই চলে। কারন আজ আকাশ খান ও রিমি তালুকদারের বিয়ে হবে। অবশেষে আকাশ ও রিমি নিজেদের সম্পর্কের পূর্নতা পাচ্ছে। খুব সহজে যে পেয়ে গেছে তাও নয়। অন্তত আকাশের কাছে মনে হয়, অনেক কাঠখড় পুড়িয়েই আজকের দিনে পৌঁছাতে হয়েছে তাদের। নিশান -শৈলীর বিয়ের ঠিক ছয় মাস পর হঠাৎ নাসিরুল তালুকদার সিদ্ধান্ত নেন রিমি মিমির বিয়ে দেবেন। কথাটা শুনে সবাই স্তব্ধ হয়েছিল, খাদিজা তালুকদার বাদে। এমনকি নিশানও অবাক হয়েছিল।
কিন্তু বিয়ের কথা শুনতেই রিমি এদিকে হতাশ হয়ে বসে রইলো। বিরক্তির চরম পর্যায়ে পৌঁছে আকাশকে সাফসাফ জানিয়ে দিল, সে যদি এই মুহুর্তে বাড়িতে এসে বিয়ের প্রস্তাব না দেয়, তাহলে রিমি আত্ম"হ"ত্যা করবে। খুবই ভয়ানক হুমকি! সফলভাবে কাজেও লেগে গেছে৷ বেচারা আকাশ নিজের জীবনের পরোয়া না করে কাঁপা হাঁটু নিয়ে তালুকদার বাড়ির সকল সদস্যের সামনে দাঁড়িয়ে রিমিকে বিয়ে করার জন্য বুক ফুলিয়ে প্রস্তাব জানিয়েছিল। যদিও কলিজা ঝুলে ছিল হাতে।
প্রথমে বাকিরা বাদে নাসিরুল তালুকদার এবং খাদিজা তালুকদার থমকে গিয়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিল। নিশান ছিল বরাবরের মতো নির্বিকার। কিন্তু খুশি হয়েছিল শৈলী ও মিমি। এতদিন পর আকাশের মত গাধার মুখে বুলি ফুটতে দেখে মনে মনে আকাশকে বাহবা দিলো শৈলী।
তবে নাসিরুল তালুকদার প্রথমে এমন প্রস্তাবের থ মেরে বসে রইলেন। কারণ আকাশকে যে তার অপছন্দ এমনটা নয়। আকাশ নিঃসন্দেহে একজন ভালো মনের মানুষ, এবং জীবনসঙ্গী হিসেবে অনেক ভালো হবে। কিন্তু তিনি এত সহজে রাজি হওয়ার মানুষ নন। নিজের দাম্ভিকতা বজায় রেখে তিনি সময় চেয়েছিলেন।
পরের দিন নিশানের সাথে আলোচনা বসেছিলেন তিনি। নিশান নির্বিকার ভঙ্গিতে জানিয়েছিল, আকাশের সাথে রিমির বিয়ে হলে তার কোনো আপত্তি নেই। এতে খারাপ কিছু দেখতে পাচ্ছে না সে। যদিও বুদ্ধিমান নিশান আগে থেকেই তাদের সম্পর্কের কথা জানতো। তবে আকাশের মুখ ফোটারই অপেক্ষায় ছিল সে। বলদটা যেই মুখচাপা! রিমির বিয়ের কথা না উঠলে এ জন্মে আর বলত না! নিশান বাদে মোটামুটি সবাই তাদের সম্পর্কের কথা জানতে পেরেছিল। তাই বাকিরাও কোনো আপত্তি করলো না তাদের বিয়ে নিয়ে। নাসিরুল তালুকদার নিজেও এমন কথাই ভেবেছেন। তাই অবশেষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো আকাশ এবং রিমির বিয়ে হবে।
এত সহজে যে আকাশ ও রিমির বিয়ের সিদ্ধান্তটা কনফার্ম হয়ে যাবে এটা মোটেই ভাবতে পারেনি আকাশ। সে ওই দিন খুশিতে তাই বদ্ধ ঘরে লুঙ্গি খুলে ডান্স দিয়েছিল। আর রিমি বুক ভরে শ্বাস নিয়েছিল প্রশান্তিতে। অবশেষে আজ ঠিক পনেরো দিন পর তাদের বিয়ের তারিখ ঠিক করা হয়েছে। সেই অনুযায়ী আজই তাদের বিয়ে।
------------
তবে এদিকে আবার আজ একটা আকাম করে ফেলেছে বেচারি শৈলী। আবেগে আপ্লুত হয়ে রান্নাঘরে বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য পায়েস রান্না করতে গিয়ে নিজের কোমল হাতখানা পুড়িয়ে মেকি হেসে ঘরে ফিরে এসেছে। যা হবার তাই হয়েছে! নিশান তালুকদার শৈলীর পোড়া হাত দেখেই ক্ষিপ্ত বাঘের ন্যায় হুংকার ছুঁড়েছে। গর্জন দিয়ে পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে,
—" বেয়াদব, তুই খবরদার আমার সামনে আসবি না শৈলী। এই পোড়া হাত নিয়ে বের হ আমার ঘর থেকে! গেট আউট ইডিয়ট!"
হতাশ হয়ে চোয়াল ঝুলিয়ে ফেলেছে শৈলী। সামান্য এটুকু একটা কারণে তার নিশান ভাই তাকে অবজ্ঞা করলো, অবহেলা করলো। আদর না করে ধমক দিলো। বিষয়টা দেখেই ঠোঁট ফুলিয়ে কান্না আসতে চাইলো শৈলীর। হাতে কোনোমতে একটা ব্যান্ডেজ করা। সেভাবেই হাত ঝুলিয়ে ঠোঁট ফুলিয়ে চোখে ফুঁড়ে আসতে চাওয়া কান্না নিয়েই রাগে জ্বলন্ত নিশানের পিছু পিছু ঘুরঘুর করতে থাকলো সে। বারবার বোঝানোর চেষ্টা করে বলতে থাকলো,
—" বাচ্চা ভেবে ক্ষমা করে দিন নিশান ভাই। আমি কি ইচ্ছে করে হাত পুড়িয়েছি বলুন। এমন করলে তো বেশি কষ্ট হচ্ছে। এমন করবেন না। ও নিশান তালুকদার, আমার বাজিগার! কথা শুনুন!"
নিশান সত্যিই আজকে অদ্ভুত রকমের চুপচাপ। তাই শৈলীর দুষ্টুমির কথাগুলো শুনেও ঠোঁট টিপে রইলো। চোখে এক ধরনের জ্বলন্ত শীতলতা, যা বাইরে থেকে বোঝা মুশকিল, কিন্তু ভিতরে কেমন যেন ঘূর্ণিপাক। শৈলী তার পিছু পিছু সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছে। কেউ হয়তো মনে করবে, নতুন বউ নিশ্চয়ই স্বামীর ভীষণ ভক্ত। বাস্তবতা হলো, সে এখন ক্ষমা চাওয়ার লড়াইয়ে আছে। নিচে পৌঁছেই আবার কাঁপা কণ্ঠে বললো,
—" নিশান ভাই, শুনুন, আমি জানতাম না, এমন কিছু হয়ে যাবে, এমন রাগ করবেন না। আমি তো শুধু ভালো কিছু করতে চেয়েছিলাম। বিয়েতে মিষ্টি না থাকলে কেমন হয়, বলুন তো? আমি চাইছিলাম পুরো বাড়িটা মিষ্টিময় থাকুক..! তাইতো, পায়েশ করতে গিয়েছিলাম!"
নিশান থেমে দাঁড়ায়, পেছনে তাকায় না। শুধু দাঁড়িয়ে থাকে। পেছন থেকে শৈলী আবার দৌড়ে গিয়ে সামনের দিকে এসে দাঁড়িয়ে পড়ে, চোখ ভেজা, গাল ফোলা।
—" আপনি না বলেন, আমি এখনো বাচ্চা! তাহলে এখন কেনো এত রাগ করছেন? বাচ্চারা তো ভুল করেই। আর আমি তো আপনার জন্যই কষ্ট করে রান্না করতে গেছিলাম। এটা কি আমার অপরাধ হয়ে গেলো?"
নিশান এবার নিচু স্বরে ঠান্ডা গলায় বললো,
—" শৈলী, দুর হ আমার সামনে থেকে। শাট ইউর মাউথ! কানের নিচে থাপ্পড় মারব কিন্তু! "
শৈলী এবার আর পারলনা। ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। সজোরে চিৎকার করে কেঁদে বলে উঠলো,
—' আপনি একটা নিরামিষ। একটুও ভালো না আপনি। আমায় ভালোবাসেন না আপনি! কিন্তু, আমি তো আপনাকে ভালোবাসি। আপনার না পায়েশ খুব পছন্দ। তাই তো রান্না করতে গেছিলাম। আপনি খুশি না হয়ে হাতের জন্য রাগ করছেন!"
নিশান শুধু দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
—" ভালোবাসা মানে নিজের ক্ষতি করে প্রমাণ দেওয়া না। বলদ কোথাকার! তুই বুঝবি না, না এখন, না আগামী কয়েক বছর।"
শৈলী আরো কিছু বলতে চাইলে নিশান থমথমে গলায় বলে,
—' নিশান তালুকদার কে ভালোবাসা শেখাতে আসবিনা শৈলী! এই শব্দের অর্থ, গভীরতা সব কিছু তোর থেকে হাজারগুণ বেশি জানা আছে আমার!"
তারপর সে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে চাইলো। কিন্তু শৈলী এবার নিচু স্বরে, কাঁপা কণ্ঠে বলে ফেললো,
—" সবই ঠিক আছে। কিন্তু আপনার তো আমায় বকা দেয়া উচিত না। হাত পুড়ে গেছে, তাই তো আপনার এখন উচিত একটু... না না, বেশি বেশি আদর করে দেয়া!"
কথাটা বলেই শৈলী চোখ তুলে মানুষটার অভিব্যক্তি বোঝার চেষ্টা করল। নিশান মুখে বিরক্তি নিয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে ফোঁস করে শ্বাস ফেলল। শৈলী এবার একটু পোড়া ডান হাত টা তুলে ধরল নিশান মুখের সামনে, চোখে পানি নিয়েই মিষ্টি হেসে বলল,
—" নিন, একটু আদর করে দিন। দেখবেন, খুব তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে যাবে!"
নিষ্ঠুর নিশান এবারো হতাশ করল শৈলীকে। তুলে ধরা হাতটা তো ছুঁয়ে দেখলোই না, সাথে একটুও কথা না বলে পুরোপুরি অবহেলা করে চলে যেতে থাকলো উপরে। হতাশ হয়ে মাথা নিচু করল শৈলী। হাতটাও নামিয়ে নিল। গলার খাঁজে চিবুক ঢুকিয়ে নিতেই চোখের কোণ থেকে এতক্ষণ ধরে আটকে রাখা দু ফোঁটা অশ্রুকণা পড়লো মেঝেতে। এতক্ষণ হাতের জ্বালা টা টের না পেলেও এবার খুব কষ্ট হতে শুরু করল।
অভিমান হলো শৈলীর। যেখানে সবাই সাজগোজ করছে, শাড়ি পড়ে মেকআপ করছে। সেখানে সে সকাল থেকে রান্নাঘরে এত কাজ করল, নিশানকে খুশি করবে বলে ওর পছন্দের পায়েশ করল। অথচ লোকটা এভাবে অবহেলা করল তাকে। ঠোঁট কাঁমড়ে যখন কষ্টে, রাগে, দুঃখে নাক টানতে শুরু করল শৈলী।
তখুনি কেও তাকে পেছন থেকে এসে ঝট করে কোলে তুলে নিল। এভাবে ফট করে তুলে নেয়াতে চমকে তাকালো শৈলী। কিন্তু চোখের সামনে প্রিয় পুরুষের গালটা আর শক্ত চোয়ালটা দেখেই এতক্ষণের সব ভুলে গিয়ে মুখে হাসি ফুটে উঠলো। নিশান যায়নি, পেছন থেকে কোলে তুলে নিয়েছে নিজের বউকে। রওয়ানা দিয়েছে ঘরের দিকে।
শৈলী এবার চোখে পানি নিয়েই মুখ ভরে হাসলো, নিশানের গলা জড়িয়ে এগিয়ে এসে গালে একটা টুপ করে চুমু খেলো। ভ্রু কুঁচকে কোলে থাকা শৈলীর দিকে তাকালো নিশান। শৈলী পাত্তা দিল না তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, হাসিমুখে বলল,
—" সরি, নিশান তালুকদার! "
নিশান কোনো কথা না বলেই সোজা শৈলীকে কোলে নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকল। তার চোখের দৃষ্টি এখনও গম্ভীর, ঠোঁটের কোণে একটুও হাসি নেই। শৈলী একটু সঙ্কুচিত হয়ে নিশানের গলা আঁকড়ে ধরেছিল, যেন তার রাগের ভেতরে কোনো কষ্ট লুকানো আছে কি না বুঝতে চাইছে। ঘরে ঢুকেই নিশান শৈলীকে বিছানায় বসিয়ে দিল। আলমারি খুলে ফার্স্ট-এইড বক্সটা বের করল। একটা কাঁচের বাটি, পরিষ্কার পানি আর তুলো এনে নিথর গলায় বলল,
—" কানের নিচে বড়সড় একটা জ্বলন্ত থাপ্পড় খেতে না চাইলে চুপ করে বসে থাক। নড়বি না।"
শৈলী হাসল, একটু ভীতু ভঙ্গিতে ফিসফিস করে বলল,
—"আমি কিন্তু ভয় পাচ্ছি না। শুধু...আপনি এখনো রাগ করছেন, তাই মনে হচ্ছে আমার হাতটা বোধহয় বেশি ব্যথা করবে।"
নিশান কোনো জবাব দিল না। খুব শান্ত, ধীর ভঙ্গিতে পোড়া হাতটা নিজের শক্ত হাতের তালুর ওপর তুলে নিল সে। পুরনো ব্যান্ডেজ খুলে ফেলল। শৈলী ব্যথায় একটু কেঁপে উঠতেই নিশান একহাতে কবজি আরো শক্ত করে ধরে অন্য হাতে ধীরে ধীরে ফুঁ দিল, শীতল বাতাসের ছোঁয়ায় জ্বালা একটু কমল। নিশান এবার চোখ তুলে তাকাল শৈলীর দিকে। সে দৃষ্টি নরম ছিল না, কিন্তু যেন অসহায় রাগের এক অদ্ভুত ছায়া ছিল।
শৈলী মুচকি হেসে বলল,
—"এমন করে তাকাবেন না। আমি কাঁদব কিন্তু।"
ভ্রু কুঁচকে যথাসম্ভব কড়া গলায় বলল নিশান,
—" তোর কান্না কে ভয় পাই আমি?"
শৈলী চোখ সরু করে দুষ্টু হেসে বলল,
—" পান না বুঝি?"
কথাটা এড়িয়ে গেলো নিশান। আগের থেকেও গম্ভীর হয়ে বলল,
—" বাচ্চামো করা শেষ তোর? শান্তি হয়েছে? নাকি কাল দুটো পা'ও পুড়িয়ে আসবি?"
শৈলী কিছু বলল না, হাসলো শুধু। নিশান ওষুধ লাগিয়ে খুব যত্ন নিয়ে ব্যান্ডেজ করে দিল শৈলীর হাত। এত নিখুঁত যত্ন যে শৈলী নিঃশব্দে তাকিয়েই রইল তার দিকে। নিশান একটু জোরে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল। শৈলী ফিসফিস করে বলল,
—"আহ্.... ব্যথা লাগছে।"
তখনই নিশান নিচু গলায় বলল,
—" ঠাটিয়ে চ'ড় মারব একটা। এখন ব্যাথা লাগছে? কে বলেছিল মাতব্বরি করতে। আহাম্মক কোথাকার। ঠিকই আছে। হোক ব্যাথা! আরো বেশি করে হোক! এতটুকু ব্যথা তোকে মনে করিয়ে দেবে, তুই নিজের যত্ন না নিলে আমি কীভাবে থাকব।"
শৈলী নিশানের দিকে তাকাল, চোখের কোণে জমে থাকা পানি মুছে ফেলল। ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠল। সে হাত বাড়িয়ে নিশানের আঙুল চেপে ধরল। নিশান কিছু বলল না, কিন্তু তার আঙুলের দৃঢ়তা শৈলী বুঝতে পারল,সেখানে সমস্ত ভালোবাসা লুকানো আছে। শৈলী মিষ্টি গলায় বলল,
—"আমাকে এভাবে আদর যত্ন না করে রাগ দেখালে কিন্তু আমি আরও বেশি বেয়াদবি করব।"
নিশান শুধু ভ্রু কুঁচকে তাকাল, কিন্তু এবার আর কঠোর রাগ ছিল না। শৈলী হেসে নিশানের হাতের আঙুলেই আলতো চুমু দিল, আর ঠোঁট কাঁমড়ে ধরল। নিশান এবারো নির্বিকার থেকে নিজের কাজ শেষ করল, আলতো করে শৈলীর কবজিটা নিজের তালুর মধ্যে তুলে ধরে বলল,
–"হাতটা একটু উঁচু করে রাখবি। পানি লাগাবি না, রান্নাঘরে যাস না। আমি বলছি যাস না, মানে যাস না! কথাটা তোর এই গোবরপোড়া ঘটে ঢুকিয়ে রাখবি!"
শৈলী চুপচাপ তাকিয়ে মাথা নাড়ালো বাধ্য মেয়ের মত। নিশান এবার উঠে চলে যেতে চাইলে ওর বাহু আঁকড়ে ধরল শৈলী, মিনমিন করে বলল,
—" ইয়ে... আমার পাওনা টা?"
নিশান ভ্রু কুঁচকালো,
—" কিসের পাওনা?"
শৈলী ঠোঁটে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে বলল,
—" এতক্ষণ ধরে যে নিষ্ঠুরের মতো বকাঝকা করলেন, এখন আদর টা কে দেবে? এটা তো আমার পাওনা!"
নিশান থমকে দাঁড়ালো। চোখের কোণে একফোঁটা নরম হাসি উঁকি দিলেও মুখটা আগের মতই গম্ভীর রাখল। কিন্তু শৈলী জানত, নিশানের কঠোর মুখোশের আড়ালেই লুকিয়ে আছে তার সমস্ত কোমলতা। নিশান ধীরে ধীরে ফিরে এসে শৈলীর চোখের সামনে ঝুঁকে পড়ল। তার চোয়াল শক্ত, চোখে একরকম হুঁশিয়ারি, কিন্তু ঠোঁটে অল্প নরম ভাব।
—"তোর আজকাল খুব সাহস বেড়েছে, তাই না?"
শৈলী আবারও ঠোঁট কামড়ে নিচু স্বরে হেসে বলল,
—" হুম হুম, আমার শ্রদ্ধেয় ভালোবাসার পতি এত সাহসী, সেই হিসেবে তো আমারো একটু সাহস রাখা উচিত! "
নিশান এবার ঠোঁট কাঁমড়ে এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল,
—" মাঝরাতে এই সাহসটা যায় কোথায় তোর?"
সাথে সাথে চোয়াল ঝুলে পড়ল শৈলী। একদম সবচেয়ে গুরুতর পয়েন্টেই আঘাত দিয়েছে নিশান তালুকদার। এই এক জায়গাতেই কোনো কথা বলতে পারেনা শৈলী। তাই মুখে আঁধার নামিয়ে শুকনো ঢোক গিলল, সাফাই গাইতে মিনমিন করে বলল,
—" তখনও তো সাহস থাকে আমার। আমি মোটেই ভয় পাই না হুহ!"
বাঁকা হাসলো নিশান,
—" এই কারনে একটু বেশি কাছে গেলেই হাঁপানি রোগীর মত ছটফট করিস! চুমু খেতে গেলে নিঃশ্বাস নিতে পারিস না! হুম.. খুব সাহস তোর! তোর সাহস দেখে আমি চমকিত, শিহরিত, আতঙ্কিত, ভীত, আহত! হতে পারে একদিন নিহত হয়ে পটল তুলব!"
নিশানের কণ্ঠে ব্যঙ্গের গন্ধ, কিন্তু চোখে যেন টলমল করা একরাশ আদর। শৈলীর মুখটা ততক্ষণে একেবারে গোমড়া। সে জানে, নিশান ইচ্ছে করেই এমন করে, তাকে পটাতে, তাকে ধরা দিতে, আবার একটু মজা পেতেও। শৈলী এবার চোখ কুঁচকে গম্ভীর সুরে বলল,
—" আপনি এসব বলে আমাকে ছোট করছেন, আমি কিন্তু সত্যি খুব সাহসী। শুধু মাঝে মাঝে ভয় পেয়ে যাই!"
নিশান এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। নরম হেসে তার গাল ছুঁয়ে বলল,
—" ঠিক আছে, প্রমাণ দে। আজ রাতে পালিয়ে যাই, কেউ কিছু জানবে না। সাহস থাকলে আসবি আমার সাথে।"
শৈলীর মুখে ভয় আর উত্তেজনার মিশ্র ছায়া। সে কাঁপা গলায় বলল,
—" মোটেই না। যাব না আপনার সাথে। খেঁকশিয়ালের মত কাঁমড় দেন আপনি! "
নিশান এবার আর হাসি আটকাতে পারল না। ফিক করে হেসে ফেলল, এরপর আহত নয়নে শৈলীর হাতের দিকে তাকিয়ে, হাতটা ঠোঁটের কাছে এনে সময় নিয়ে চোখ খিঁচে বন্ধ করে চুমু খেলো, মনে হলো টেনে নিতে চায় পোড়া হাতটার সমস্ত ব্যাথা! শৈলী এবারে খুশি হলো। নিশান হাত সাবধানে ছেড়ে ওর কপালে একটা লম্বা চুমু দিল। তারপর গলায় হাত রেখে বলল,
—" আর একবার রান্নাঘরেন কাছাকাছিও গেলে, এই আদরটাও বন্ধ হয়ে যাবে। তুলে এক আঁছাড় মেরে তোর হাড্ডির রফাদফা করে দেব, বুঝলি?"
শৈলী চুপচাপ মাথা নাড়ল। ওর চোখে এবার সত্যিকারের অনুতাপ ছিল, তবে সেই অনুতাপের নিচে একটা লুকোনো তৃপ্তি, কারণ যে মানুষটা কিছুক্ষণ আগে ধমক দিচ্ছিল, সেই মানুষটা এখন ওর কপালে নরম চুমু দিচ্ছে। নিশান এবার আস্তে করে বলল,
—"বসে থাক, আমি খাবার গরম করে দিচ্ছি। আবারো বলছি, তুই চুপচাপ বসে থাকবি। আর আমার পেছনে পেছনে ঘুরবি না, নয়তো আবার হাতে ব্যাথা হবে।"
শৈলী হেসে বলল,
—"আচ্ছা, ঘুরব না। কিন্তু আপনি যদি একদম চোখের সামনে না থাকেন, তাহলে আবার ভয় হয় যে হারিয়ে যাবেন না তো?"
নিশান এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না। নিজের সব কঠোরতা পেছনে ফেলে একগাল হেসে ফেলল। তারপর শৈলীকে টেনে নিল বুকের মাঝে, চুলের মাঝে উষ্ণ এক চুমু এঁকে দিয়ে প্রেমিকের সুরে বলে উঠলো,
—" হারিয়ে যাবো বলেছিস? তুই জানিস না, তোর বুকের বাঁ পাশে আমার ঘর বাঁধা। তুই চোখ বন্ধ করলেই আমি তোর নিঃশ্বাসে থাকি, তোর আঙুলের ছোঁয়ায় আমি ফিরে পাই আমার পথ।"
শৈলী চমকে তাকালো নিশানের চোখের দিকে। হতবাক হয়ে বলল,
—" আপনি মাঝে মাঝেই কিন্তু নিরামিষ থেকে আমিষ হয়ে যান। ব্যাপার টা ইন্টারেস্টিং! কীভাবে পারেন এভাবে গিরগিটি হতে?"
নিশান শৈলীর মাথায় গাট্টা মারে। দুহাতে টেনে আনে আদুরে মুখটা। ঠোঁটে লম্বা সময় নিয়ে একটা চুমু খেয়ে বলে,
—' আরেকটা কথা মাথায় ঘুরঘুর করছে। তোর ভাষ্যমতে যেটা আর কি আমিষ মার্কা কথা! বলব?'
উদগ্রীব হলো শৈলী, দ্রুত গতিতে বলল,
—" বলুন বলুন!"
নিশান শৈলীর নাকের ডগায় চুমু খেলো। কোঁমড় জড়িয়ে কাছে টেনে এনে চোখে চোখ রেখে বলতে থাকলো,
—❝ জীবনের সব রংই ফিকে লাগে
তোর না থাকার কাছে,
কিছু ভালোবাসা হয় বোধহয় জন্মগত অভ্যাসে।
তুই যেন নীরবতার গায়ে লাগানো প্রেমের হাওয়া, একলা রাতের নিঃশ্বাসে মিশে থাকা
আমার হিমরূপার উষ্ণছোয়া।❞
~ —১ম পরিচ্ছেদ সমাপ্ত — ~
আপাতত প্রথম পরিচ্ছেদ এখানেই সমাপ্তি টানা হলো।🫶 ইনশাআল্লাহ ১০ আগস্টের পরই শুরু হয়ে যাবে দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ। যেখান থেকে শেষ করা হলো, সেখান থেকেই আবারো শুরু হবে। সবই সেম টু সেম থাকবে। কাহিনী ধারাবাহিক ভাবেই এগোবে ইনশাআল্লাহ ❤️
আপাতত নিশান ভাই এর কাছে থেকে বিদায় নিচ্ছি।
সবার জন্য একমুঠো ভালোবাসা ✨❤️