ফন্ট সাইজ:
থিম:
হিমরূপার উষ্ণছোঁয়া

১৯তম পর্ব

লেখক: অনামিকা তাহসিন রোজা

#হিমরূপার_উষ্ণছোঁয়া

#পর্ব_১৯

#কলমে_অনামিকা_তাহসিন_রোজা

তীব্র এক সুখের বর্ষন শেষ হয়েছে ভোর রাতের একটু আগে। সারারাতটা সবার জন্য নিছক এক জোছনা রাত হলেও নিশান ও শৈলীর কাছে ছিল এক ভয়ানক সুখের রাত, প্রথম ভালোবাসাবাসির রাত, যেখানে ছিলনা কোনো বাঁধা, প্রতিবন্ধকতা। কতটাই না বিপত্তি পেরিয়ে একে অপরকে পেয়েছে তারা। জড়িয়েছে এক অমোঘ পবিত্র বন্ধনে। তাই এত কষ্টের পর যখন সুখের দোলনা তাদের হাতের নাগালে এলো, কেওই রইলো না শান্ত, নির্জীব। দুজনেই ভেঙে ফেলল নিজেদের অবাধ সংকোচ, হারিয়ে গেলো সেই অসহ্যকর সুখের রাজ্যে। বিলিয়ে দিল একে অপরের সত্তা। সবচেয়ে বেশি অভিভূত হয়েছে শৈলী। নিশানের পাগলামিতে অবাক হয়েছে বারংবার, নিজেও হয়েছে একটু অশান্ত। জানালার ফাঁক গলে একটুখানি আলোর রেখা ঠিক যেন ধোঁয়ার মতো ঢুকে পড়েছে ঘরের কোণে। বাতাসে এখনও কাঁপছে রাতের সেই ভারী উষ্ণতা, যেন নিশান আর শৈলীর শ্বাসের শব্দ এখনো মিশে আছে বাতাসে।

বিছানার চাদরটা এলোমেলো, কাঁথাটা এক পাশে গড়িয়ে পড়েছে। শৈলীর চুলগুলো ছড়িয়ে আছে বালিশের ওপর, চোখ দুটো আধা বন্ধ। ঠোঁটের কোণে একটুকরো পরিতৃপ্তির হাসি। নিশান এক হাত দিয়ে শৈলীর আঙুল আঁকড়ে ধরে বুকে জাপটে ধরে আছে, যেন সারারাতের সেই আবেগ এখনো ছাড়তে চাইছে না। ভোরের আলোয় স্পষ্ট হচ্ছে তাদের সেই প্রেমমাখা যুদ্ধের চিহ্ন, শৈলীর ঘাড়ে এক টুকরো গোলাপি ছায়া যতটা স্পষ্ট তার থেকেও বেশি দৃশ্যমান নিশানের বুকে নখের আঁচড়। সারারাতের সবকিছু যেন অস্থির এক কবিতা হয়ে তাদের গায়ে লেখা হয়ে গেছে।

শৈলী একটুখানি নড়েচড়ে উঠে নিশানের বুকে মুখ গুঁজে ফেলে। তার চোখে কোনো ঘুম নেই, আছে কিছুক্ষণের আগে ঘটে যাওয়া সেই বেপরোয়া ভালোবাসার জ্যোৎস্না। নিশান একটু ঘুমিয়েছে, মাঝে মাঝে আদর করেছে শৈলীকে।

শৈলীর এখনো মনে পড়ছে সেই সময়ের বেপরোয়া মুহুর্ত টুকু। নিশান যে এতটা অস্থির, এতটা অধৈর্য, তা গতরাতে বুঝেছে সে। লোকটা কত আদরে সামলেছে তাকে। মাঝে মাঝে কানের কাছে গিয়ে গলায় তৃষ্ণামাখা কণ্ঠে ফিসফিসিয়ে বলেছে,

—" আমার নেশা, আমার প্রিয়তমা, আমার শৈলী।"

শুধু তাই-ই না, আদরের চূড়ান্ত মুহুর্তে যে কতবার লোকটা ভালোবাসি বলেছে তা এখনো অস্ফুট ভাবে মনে আছে তার। শৈলী লাজুক ঘুমন্ত নিশানের পিঠ চেপে ধরে বুকে মুখ লুকায়। রাতের সেই আদরমাখা উন্মাদনা ভোরের আলোয় ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে, কিন্তু তাদের ভিতরের আবেগ যেন আরও তীব্র হয়ে জেগে উঠছে। বাইরে পাখিরা ডাকছে, সকাল আসছে, কিন্তু নিশান আর শৈলীর ভুবনে এখনো রাতের মাদকতা গা ছমছম করে বাজছে। তাদের প্রথম ভালোবাসাবাসির রাতের পর সেই ভোরটা আর পাঁচটা দিনের মতো নয়। এ এক নতুন সকাল, যেখানে দুটি মানুষ, দুটি হৃদয়, আর দুটি শরীর, পুরোপুরি এক হয়ে গেছে।

-------------

সময় পেরোলো খানিকটা। ভোরের প্রথম আলো জানালার কাচে এসে পড়েছে ধীরে ধীরে। গাঢ় নীল থেকে হালকা ধূসর হয়ে আসছে আকাশ, আর ঘরের এক কোণে রাখা বাতিটা এখনো ক্ষীণ আলো দিয়ে জেগে আছে। শৈলীর চোখের পাতা ধীরে পুরোপুরি খুলে গেল নিশানের গাঢ় নিঃশ্বাসের শব্দে। গাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন নিশানের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। একরাশ শান্তি ছড়িয়ে আছে তার মুখে, যেন এক যোদ্ধা দীর্ঘ যুদ্ধ শেষে ফিরে পেয়েছে নিজের আশ্রয়।

শৈলী নিশানের বুকের উপর মাথা রাখতেই শুনতে পেলো তার হৃৎস্পন্দন, গভীর, ধীরে, আর এক অদ্ভুত নির্ভরতায় পূর্ণ। একচিলতে হাসি ফুটে উঠল শৈলীর ঠোঁটে। তার চোখে আজ আর ভয় নেই, দ্বিধা নেই, শুধু এক অপূর্ব মুগ্ধতা। সেই মুগ্ধতাতেই সে ঝুঁকে এসে এক মৃদু চুমু এঁকে দিল নিশানের বুকে, সেই বুক, যেখানে রাতভর সে আশ্রয় পেয়েছিল। চুমুটার আবেগ নিশানের নিঃশ্বাসে একটা হালকা কম্পন তুলল। কিন্তু সে এখনো ঘুমিয়ে। শৈলী আস্তে করে উঠে বসল, আলগোছে চুলগুলো সামলে নিয়ে বিছানার ধারে বসে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল নিশানের দিকে। চোখ ভরে নিতে চাইছে এই মানুষটাকে, যার ছোঁয়ায়, ভালোবাসায়, স্পর্শে সে হারিয়ে গেছে বারবার, আর প্রতিবারই নিজেকে নতুন করে ফিরে পেয়েছে।

তারপর নিঃশব্দে বিছানা ছাড়ল শৈলী। একপলক পেছনে ফিরে তাকিয়ে নিয়ে পা টিপে টিপে চলে গেল বাথরুমের দিকে। আর তখনই ঘরের নীরবতা একটু নড়ে উঠল ভোরের বাতাসে। জানালার পর্দা সামান্য দুলল, যেন রাতের সব ভালোবাসা ধুয়ে মুছে নতুন একটা সকাল তাদের জন্য অপেক্ষা করছে।

-----------

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকাতেই শৈলীর চোখে যেন একটু অচেনা আলো খেলে গেল। জলভেজা চুল তার ঘাড় বেয়ে নেমে এসেছে, গালের ওপর লালচে একটা রেখা, নিশানের স্পর্শের স্মৃতি। গলায় হালকা দাগ, ঠোঁটে একরাশ নিঃশব্দ কাঁপুনি। সে আয়নায় নিজের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। আজকের শৈলী যেন আর কালকের সেই চুপচাপ মেয়েটা নয়। আজ সে নিজেকে অনুভব করছে আরও সম্পূর্ণ, আরও সত্যি। তার ঠোঁটে একধরনের দুর্বোধ্য হাসি খেলে গেল, লজ্জা, তৃপ্তি আর অস্থিরতার মিশেলে এক অদ্ভুত হাসি। ভেতরটা জুড়ে একটা ফিসফিসে ভাবনা বেজে চলেছে। আমি কি সত্যিই..এতটা চেয়েছিলাম? এতটা ভালোবেসে ফেলেছি? কোনো উত্তর না দিয়ে শৈলী চুল আঁচড়ে আবার আয়নার সামনে দাঁড়ায়। এবার তার চোখে খানিকটা দৃঢ়তা, খানিকটা ভয়। যেন সেই রাত্রির পবিত্রতা তাকে বদলে দিয়েছে চিরতরে। সে আবার একবার নিজের ঠোঁট ছুঁয়ে দেখে, নিঃশব্দে ফিসফিসিয়ে বলে ওঠে,

—" আপনি আমার অন্ধকার জগতের আলো নিশান। আপনি সত্যিই আমার জীবনের নিশান!"

তারপর গোসল শেষ করে আয়না থেকে চোখ ফিরিয়ে ধীরে ধীরে ঘরের দিকে পা বাড়ায়, যেখানে নিশান এখনো ঘুমিয়ে, নিশ্চিন্ত।

গোসল শেষে শৈলীর মধ্যে এক স্বর্গীয় স্নিগ্ধতা ভেসে উঠল। তার ত্বকটা আরও উজ্জ্বল, আরও নিখুঁত লাগছে, জলধারায় ধোয়া নরম গোলাপি আভা যেন নিজের রঙেই আলো ছড়াচ্ছে। চুলগুলো ঘন ভিজে, কোমরের নিচে নেমে এসেছে, আর সেখান থেকে একধরনের ঘ্রাণ মিশে গেছে বাতাসে, স্নিগ্ধতা, সাবলীলতা আর একরাশ ভালোবাসা মিলে একটা কোমল অনুভূতির জন্ম দিচ্ছে।

শৈলী ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে নীরবতার একটা হালকা হাসি ফুটল ঠোঁটে। কিছুক্ষণ আগেই যে মুহূর্তে হারিয়ে গিয়েছিল, তার রেশ এখনও চোখে লেগে আছে। এক হাতে তোয়ালে তুলে নিয়ে আস্তে আস্তে ভেজা চুল মুছতে লাগল। চুল থেকে টুপটুপ করে পানি ঝরছিল, আর চুল সজোরে ঝাড়ার কারনে সেই পানিকণা বিছানায় শোয়া নিশানের মুখে এসে পড়ল। নিশান একটু কুঁকড়ে উঠল, চোখ না খুলেই একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। শৈলীর ঘ্রাণ, তার ভেজা চুলের ছোঁয়া, সব মিলিয়ে যেন ঘুম ভাঙার আগেই সে ফিরে গেল সেই মুহূর্তে, যেখানে শৈলীর স্পর্শে সে হারিয়ে গিয়েছিল কিছু সময় আগে।

চোখ মেলে ধীরে ধীরে তাকাল নিশান। প্রথমেই তার চোখে পড়ল আয়নার প্রতিচ্ছবিতে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মেয়েটিকে, যে তার পুরো পৃথিবী। শৈলীর পিঠ অবধি ভেজা চুল, ধোয়া মুখ, হালকা ভেজা কাজল, পরনে লাল শাড়ি, হাতে দুটো চিকন সোনার চুড়ি, আর সেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেন একেবারে অসংলগ্নভাবে মুগ্ধ করে দিল তাকে।

নিশান বিছানা থেকে ধীরে ধীরে উঠল, যেন নিঃশব্দে কোনো স্বপ্নের মধ্যেই হেঁটে যাচ্ছে। চোখেমুখে এখনো ঘুমের ধোঁয়াশা, কিন্তু দৃষ্টিতে ঝকঝকে এক মুগ্ধতা। শৈলী তখনো আয়নার দিকে মুখ করে চুল মুছছে, বুঝতেই পারেনি ঠিক তার পেছনেই কারো দমচাপা পায়ের শব্দ জমছে প্রতিটি মুহূর্তে। এক মুহূর্তের মধ্যে, ধুপ করে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরল নিশান। ভেজা পেটে হাত গলিয়ে দিয়ে মুখ রাখলো শৈলীর ভেজা কাঁধে। আবেশে টেনে নিল চুলের স্নিগ্ধ সুঘ্রাণ!

শৈলী চমকালো। আয়নার মধ্য দিয়ে সুঠাম দেহের অধিকারী পুরুষটিকে দেখে একটু কাঁপলো। কি আশ্চর্য! এখন আবার কেনো ভয় লাগছে তার? আবারও কেনো লজ্জা লাগছে! ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসি খেলে গেল শৈলীর। নিশানের বুকের স্পর্শ, ভেজা চুলে জমে থাকা পানি, আর কাঁধে ঠেকা নিশানের নরম নিঃশ্বাস, সব মিলিয়ে যেন শরীরজুড়ে একটা ঘোর ছড়িয়ে পড়ল। নিশানের গলা তখন শৈলীর কাঁধের কাছে। খুব আস্তে, গভীর আর মোহভরা কণ্ঠে বলল,

—"এত সুন্দর হতে পারিস কী করে বলতো? ঘুম ভাঙতেই এমন স্বপ্ন দেখা অন্যায় না?"

একটু থেমে নিশান কন্ঠ খাদে নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,

—" আমার মনে হয়, বেশি আদর পেয়েই এমন সুন্দর হয়েছিস!!"

শৈলী মুখ নিচু করে হাসল। কিন্তু কিছু বলল না। শুধু নিজের হাতটা নিয়ে পেছনের সেই শক্ত হাতের ওপর রাখল। নিশান এবার ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল ওর গলায়, একটুখানি চুল সরিয়ে বড় করে চুমু খেলো কাঁধে। নাক ঘষে বলতে থাকলো,

—"এই মুহূর্তটা থেমে যাক, চাইছি শুধু... তোকে এইরকম করে ধরে থাকতে, দিনের পর দিন, বছরের পর বছর..."

শৈলী এবার নিঃশব্দে চোখ বুঁজল। তার মুখে কোনো কথা নেই, কিন্তু পুরো শরীর যেন বলে উঠল, থেমে যাক... হ্যাঁ, ঠিক এইখানেই।

--------------

কোচিং থেকে বাড়ি ফেরার পথে কয়েকটা গুন্ডা ধাওয়া করেছিল সীমাকে। তাদের থেকে বেঁচে পালাতে গিয়েই রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়ে গিয়েছে মেয়েটা। আপাতত দুই পা-ই ভেঙে হাসপাতালে পড়ে আছে। ছয় মাসের আগে ভাঙা পা ঠিক হবেনা। খবরটা শোনামাত্রই অবাক হলেন নাসিরুল তালুকদার সহ বাড়ির সকল সদস্য। শুধু অবাক হতে পারল না আকাশ। সে শুধু মেকি হেসে দুঃখ প্রকাশ করল। তাকে অবাক হতে না দেখে রিমি চোখ পাঁকিয়ে জানতে চাইলো ঘটনা কী। নিজের একমাত্র ছন্টুমন্টু কে দ্বিতীয় বারের মত মিথ্যা বলে আকাশ দাঁত-কপাটি সব বের করে বলেছিল,

—" ঘটনা কিছুই না! আসলে গুন্ডারা হয়তো সেলফি তোলা হাত টা ভাঙতে চেয়েছিল, ভুল করে পা ভেঙে দিয়ে চলে এসেছে, হেহে। ব্যপার না, বেটার লাক নেক্সট টাইম!"

এরপর বেচারা আকাশ বিড়বিড় করে বলল,

—" হিটলার বাবাজি যদি জানতে পারে সেলফি করে ইডিট করা হাতদুটো না ভেঙে পা ভাঙা হয়েছে, তাহলে আমার কোঁমড় ভেঙে দেবে ব্যাডা। হায় আল্লাহ! কথা তো হাত ভাঙার ছিল, ওরা পা কেনো ভাঙলো? কম তো টাকা দিইনি। গুন্ডাগুলো আর আমার আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি!"

এদিকে রাশিদা তালুকদার বেশ ভালোই বুঝলেন নিশানই গুন্ডা লাগিয়ে সীমার এই অবস্থা করেছে। তারও যে হাড়গোড় ভাঙবেনা, এরই বা কি গ্যারান্টি। তাই তিনি তল্পিতল্পা গুছিয়ে দুই মেয়ে কে রেখে বাপের বাড়ির উদ্দেশ্য রওয়ানা দিলেন। পরিবেশ ঠান্ডা না হওয়া পর্যন্ত আসবেন না তিনি। এবং মনে মনে ঠিকও করলেন, নিশান-শৈলীর পেছনে আর লাগবেন না। যে যেভাবে ভালো আছে সেভাবেই থাকুক!

------------

আকাশের কথা সত্যি হলো। মিলে গেলো কথাটুকু। লেগে গেলো ভয়ানক অভিশাপ! নিশান সত্যি সত্যি ঘর থেকে বের হওয়ার পর থেকে এই যে দুপুর হয়ে যাচ্ছে, এখনো শৈলীর দেখা পেলো না। মেয়েটা আসলেই তার সামনে আসছে না! মনে মনে বিরক্ত হলো নিশান। আশ্চর্য! এমন চলতে থাকলে কীভাবে হবে? এর একটা বিহিত করতেই হবে। মনে মনে কঠিন এক সাজার কথা মাথায় রেখে খাবার টেবিলে এগিয়ে গেলো নিশান। কিন্তু তার আগেই কোথ থেকে আকাশ এসে নিশানকে নিয়ে অন্য এক পাশে নিয়ে এলো। নিশান প্রথমে বোঝেনি, আকাশের চিন্তিত মুখ দেখে ভ্রু কুঁচকে বলল,

—" কী হয়েছে?"

আকাশ এবার সিরিয়াস মুখে কিছু একটা বলতে যাবে, কিন্তু তার আগেই নজরে এলো নিশানের শার্ট ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা বুকের উপরে লাল দাগগুলো, কেও খাঁমচি দিয়েছে বোঝা যাচ্ছে। সাথে সাথে আকাশের ঠোঁটে ফুটে উঠলো বাঁকা হাসি, সে একটু কেশে টেনে টেনে বলল,

—" কী ব্যাপার বন্ধু? আজকাল প্রেমের চিহ্ন নিয়ে ঘোরাঘুরি করছো যে! ওহহো, শিট! তোমার তো কালকে বাসর রাত ছিল। আয়হায়! আমি তো ভুলেই গিয়েছিলাম, ওপস! তো বাসর রাত ভালোই গেছে মনে হচ্ছে, কাহিনী বলো, হুম হুম?"

নিশান নির্বিকার ভঙ্গিতে চোখ সরু করে রইলো। এই ছেলের সাথে কথা বলা মানেই নিজের মান-সম্মানের রফাদফা করা। তাই শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আকাশ আরেকটু সুযোগ পেয়ে আরো সরু দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

—" নিশান, ভালো বন্ধু আমার, চট করে শার্টটা খুলে ফেলো তো দেখি। আমাকেও একটু দেখতে দাও বেচারি শৈলী সিংহের উপর কি অত্যাচার করেছে!"

নিশান এবার ঠান্ডা ভঙ্গিতে তাকিয়ে থাকলো আকাশের দিকে, চোখের কোণে স্পষ্ট বিরক্তির রেখা। মুখটা কঠিন করে বলল,

—"তোর মাথায় গরম হাওয়ার প্রবাহ বেড়ে গেছে নাকি আকাশ? এসব কেমন কথা?"

আকাশ হেসে ফেললো, কিন্তু সেটা যেন একটু ভয় মিশ্রিত হাসি। নিশানের দৃষ্টিটা এমন ছিল, যেন পরক্ষণেই আকাশের কলিজা চিরে ফেলবে। তবুও সে নিজের ঠাট্টাটুকু থামাল না।

—"আরে ভাই রাগ করিস না! আমরা তো বন্ধু, তোর প্রেম কাহিনির একটুখানি সাক্ষী হওয়ার অধিকার তো রাখি, না? আচ্ছা শোন না, শৈলীর মত বাচ্চা মেয়ে কীভাবে তোকে এত অত্যাচার করল! বিষয়টা মেনে নিতে পারলাম না বন্ধু!"

এক মুহুর্তের জন্য গতরাতের কিছু মুহুর্ত ভাবল নিশান। অজান্তেই ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো সূক্ষ্ম রেখা, সে এবার ঠোঁট কাঁমড়ে বলল,

—" শৈলীকে সহজ-সরল বাচ্চা ভাবিস তুই?'

আকাশ চোখ বড় করে বলল,

—" অভিয়াসলি! ও তো বাচ্চাই!"

নিশান এবার বাঁকা হাসলো,

—" সহজ-সরল বাচ্চার আসল রূপ তো দেখিসনি! যাক, ওটা আমারই দেখার অধিকার আছে শুধু! আপাতত বুকের দাগ দেখে নিশ্চয়ই সহজ-সরল বাচ্চার কাজ মনে হচ্ছে না?"

আকাশ এবার নিশানের ঠিক পাশে আরেকটু এগিয়ে আসলো। মুখটা গম্ভীর করে আগ্রহের সহিত ফিসফিসিয়ে বলল,

—"মানে কী! তুই বলছিস তোর... মানে তোর গায়ে দাগ দিয়েছে শৈলী? আয়হায়? সেই শৈলী? যে নরম গলায় 'আপনি' বলেই কথা বলে? ও এত বড় হয়ে গেছে! ভাই, সবই তোর কেরামতি!"

নিশান হাসলো, মাথা নেড়ে বলল,

—" ওর সেই 'আপনি'ও একেক সময় এমনভাবে 'তুমি' হয়ে যায়... তখন বোঝা যায় না ও নরম, না ভয়ঙ্কর।"

আকাশ চোখ গোল করে তাকিয়ে থাকল নিশানের দিকে, যেন সে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না। তারপর ধপ করে আবার হাসতে শুরু করল,

—"না ভাই! আমি মানতেই পারছি না! ওই মেয়ের চেহারা দেখে যে কেউ ভাববে ও এখনো ক্লাস সেভেন পড়ে! আর তুই বলছিস ও... দাগ রেখে গেছে? ছিঃ! শৈলীকে নিয়ে কোনো অভিযোগ শুনতে আকাশ খান রাজি নয়!"

নিশান একটু ঝুঁকে এসে, গলায় চাপা স্বরে বলল,

—"দাগ শুধু শরীরে না আকাশ... মনে, মনেও কেটে গেছে কিছু আঁচড়। ওর চোখের ভিতর একরকম পাগলামি আছে... যা ছুঁয়ে দিলে ফেরার রাস্তা থাকেনা। তুই বুঝবিনা বলদ!"

আকাশ এবার একেবারে চুপ হয়ে গেলো। মুখের হাসি মুছে গিয়ে জায়গা নিলো একরাশ অবাক হওয়া, খানিকটা ভয়ও বটে।

—"তুই তো সিরিয়াসলি পড়ে গেছিস রে নিশান। আমি ভাবছিলাম, সাময়িক এক্সাইটমেন্ট... কিন্তু তোর চোখের ভাষা তো বলছে, এই মেয়েটার জন্য তুই নিজের শান্তিটাও বিসর্জন দিতে রাজি। আরেহ ধূর, এগুলো তো আগেই বুঝেছিলাম!"

নিশান কেবল মৃদু হাসলো। চোখে একরকম নরম অথচ জেদি চাহনি।

—"শান্তি তো অনেক পেয়েছি আকাশ... এবার একটু ঝড় ভালোবাসতে ইচ্ছে করে।"

আকাশ ঠোঁট চেপে হেসে বলল,

—" হুম হুম, বুঝেছি। এতই ঝড়ের তাড়াহুড়ো করছিলি যে, শরীরেও যেন প্রমাণ রেখে দিয়েছিস! কি ভাই, বাসর রাতেই এমন ছাপ রেখে এলি? তুই নাকি খুব ভদ্র ছেলে হুম? এই তোর ভদ্রতার প্রমান!"

নিশান থমকে গেলো। এক সেকেন্ডের জন্য ভ্রু কুঁচকে চাইল আকাশের দিকে, তারপর নিচে তাকিয়ে নিজের শার্টের ওপরের দিকে চোখ ফেলতেই বুঝে গেলো, কী নিয়ে খেপাচ্ছে ও। সে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,

—"আকাশ, ফালতু কথা বলিস না।"

আকাশ আবার হেসে উঠলো,

—"ফালতু বলি? আচ্ছা, একটা কথা বল... শৈলীর হাতের নখ কি গোলাপি নেইলপলিশে রাঙানো ছিল? কারণ দাগগুলো ঠিক গোলাপি রঙের খামচির মতোই লাগছে!"

নিশান এবার একটু রেগে গেলো, কিন্তু মুখে একটা শান্ত ভাব রাখার চেষ্টা করে বলল,

—"শুধু চোখে দেখেই বিচার করিস না। আর তোর মাথায় যা ঘুরছে, সেটা...!"

আকাশ হাত তুলেই থামিয়ে দিলো,

—"না না, বুঝে গেছি! আমি তো আর কিছু বলিনি। কিন্তু ভাই, যা-ই বলিস, তোর মুখের লাজুক ভাব আর শরীরের এই দাগ... ম্যাচ করছে না রে!"

নিশান এবার মাথায় গাট্টা মারল আকাশের, দৃঢ় গলায় বলল,

—" প্যানপ্যানানি বাদ দে। কী বলতে এসেছিলি, সেটা বল!"

আকাশ এবার মাথা ঘষতে ঘষতে বলল,

—" আর বলিস না, হয়েছে কি, ওই গুন্ডাগুলো হাত ভাঙার পরিবর্তে পা ভেঙে দিয়ে চলে এসেছে! বিশ্বাস কর,এতে আমার কোনো দোষই নাই। আমি তো জানতামও না যে, ওরা আবেগে আপ্লূত হয়ে ঠ্যাং টাও ভেঙে দিয়ে আসবে!"

নিশানকে দেখে মনে হলোনা যে ও রাগ করেছে, বা অসন্তোষ প্রকাশ করছে। বরং মাথা নেড়ে বলল,

—" ঠিকই আছে। ব্যাপার না। থাকুক ক'মাস হসপিটালে। জন্মের শিক্ষা হয়ে যাবে!"

চলবে.......

ছোট পর্বের জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি না 🙂 কারন আগামীকাল আসছে অন্তিম পর্ব✨ আর এর মধ্য দিয়েই " নিশান তালুকদার" এর গল্প শেষ হবে। এরপর আর কখনো ফেসবুকে তার কোনো গল্প আসবেনা। তবে পাঠকদের চাহিদা থাকলে ইবুক আনতে পারি ভবিষ্যতে ইনশাআল্লাহ ❤️

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন