#তোর_ছোঁয়ায়_ফাগুন
#পর্ব_১৬
#লেখিকা_অনামিকা_তাহসিন_রোজা
সূর্যের প্রথম আলো মেঘের আড়াল থেকে বেরিয়ে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। আকাশটা ফিকে নীল, আর বাতাসে একরকম সজীবতার গন্ধ। দূরে কোথাও পাখির কাকলি শোনা যাচ্ছে, যেন নতুন দিনের আগমনী বার্তা। পৃথিবীটা যেন ধীরে ধীরে জেগে উঠল ঘুম ভেঙে।
তবে চৌধূরী বাড়িতে এখন মোটেও নীরবতা বিরাজ করচ্ছে না। সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত। আর ১ ঘন্টার মধ্যেই তাদের এয়ারপোর্টে যেতে হবে। রাবেয়া বেগম বাড়ির সার্ভেন্টদের সবকিছু বুঝিয়ে সুঝিয়ে দিয়ে যাচ্ছেন। রামিসা সেই তখন থেকে ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে সেজেই যাচ্ছে। তার আর সাজগোজ শেষ হচ্ছে না। আয়ান ধবধবে সাদা রংয়ের একটা শার্ট পড়েছে, হাতা গুটিয়ে সব লাগেজ- ব্যাগ গাড়িতে তুলচ্ছে। তবে আদ্রিকা এতক্ষণ রাবেয়া বেগমের সাথে সার্ভেন্টদের উপদেশ দিলেও সবাই মিলে তাকে তৈরি হওয়ার জন্যে জোর পাঠিয়ে দিয়েছে।
আয়ান ব্যাগপত্র সব গাড়িতে তুলে জোরে হাঁক ছুঁড়লো,
"মা,,, কী হলো? এসো তাড়াতাড়ি। আর এক ঘন্টার মধ্যেই তো এয়ারপোর্টে পৌঁছতে হবে। রামিসা তাড়াতাড়ি আয়।"
কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্যাঙ এর মতো লাফাতে লাফাতে রামিসা এসে হাজির হলো। আর বলল,
" ভাইয়া আমি এসে গেছি।"
আয়ান একবার সদর দরজার দিকে তাকিয়ে বলল,
" তোর ভাবি কই?"
রামিসা বাঁকা হেসে ফিসফিস করে বলল,
" উহুম,ভাবি তো শাড়ি পড়চ্ছে ভাইয়া। বুঝতে হবে! এই কারনে একটু সময় লাগবে বুঝলে। হয়ে গেছে মনে হয়। একটু তো ধৈর্য্য ধরতে পারো নাকি!"
আয়ান কিছু না বলে একবার উপরে আদ্রিকার রুমের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলো। না জানি মেয়েটাকে শাড়ি পড়ে কতটা সুন্দর লাগবে। আয়ান একটু আগেই তাকে বারবার করে বলে এসেছে যেন সে তেমন না সাজে! আদ্রিকা বাধ্য মেয়ের মতো মাথা দুলিয়েছে। এমনিতেই শাড়ি পরলে সুন্দর লাগবে , তার ওপর সাজলে তো আয়ান এখানেই শহিদ হয়ে যাবে ! তখন দেখা যাবে তাকে আমেরিকায় না গিয়ে হসপিটালে ঝুলে থাকতে হবে!!!
কিছুক্ষণ পর রাবেয়া বেগমও চলে আসলেন। এসেই বললেন,
" কীরে রামিসা? এখনো উঠিস নি কেনো? উঠে পড়। আর আয়ান হিমেলকে কল দে। তাড়াতাড়ি আসতে বল। ও কোথায়?"
রামিসার চোখ সতর্ক হলো। বলে উঠলো,
" Wait ! Wait ! উনি কেনো আসবেন?"
রাবেয়া বেগম গাড়িতে উঠতে উঠতে বললেন,
" হিমেলও যাবে আমাদের সাথে।"
রামিসা যেনো অবাকের শিকড়ে পৌছে বলল,
" আজব ! উনি কেনো যাবে?"
তারপর পকেট থেকে ফোন বের করতে থাকা আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল,
" ভাইয়া ঐ লোক কেনো আসবে?"
রাবেয়া বেগম বললেন,
" ওমা ! হিমেল কি আমাদের পর নাকি! আর তাছাড়া তোর মামনি ওকেও যেতে বলেছে। কতদিন হয়ে গেলো ছেলেটাকে দেখেনা!"
আসলে আয়ান আর হিমেল ছোটবেলার বেস্ট ফ্রেন্ড হওয়ায় আয়ানের ফুফু অনিমা চৌধূরী হিমেলকেও অনেক আদর করে। আয়ান আর হিমেল যখন ছোট ছিলো, ঐ সময় অনিমা বেগম দেশেই থাকতেন। এই কারনে তার সাথে আয়ান আর হিমেলের বেশ সখ্যতা গড়ে উঠেছিলো। বড় হলেও মামনীর কাছে আয়ান আর হিমেল সেই ছোট্ট। কিন্তু অনিমা বেগমের বিয়ের ৩ বছর পর তারা আমেরিকায় পারি জমায়। মূলত অনিমা বেগমই হিমেলকেও তাদের সাথে আসতে বলেছেন। গত ৩ বছর ধরে দেখেনি যে!
আয়ান হিমেলকে কল করলো।
" হ্যাঁ দোস্ত বল !"
" কীরে কই তুই হিমেল? তাড়াতাড়ি আয়।"
" আরে তোরা বেরিয়ে পর। আমি একবারে এয়ারপোর্টেই আসছি। ওখানেই মিট করি।"
আয়ান কিছু বলতে যাবে তার আগেই চোখ পড়ল বাড়ির সদর দরজার দিকে। তখনই তার হৃদয় থমকে গেলো! স্তব্ধ হয়ে গেলো তার কন্ঠনালী! এক মোহনীয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সেই মানবীর দিকে, যে মেরুন শাড়িতে মোড়ানো এক অপরূপ রূপে ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে। প্রতিটি পদক্ষেপে শাড়ির কুচি যেন বাতাসে হালকা করে দুলছে, আর আদ্রিকার চুলগুলো যেন নরম বাতাসে খেলা করছে।
এদিকে হিমেল কলে সাড়াশব্দ না পেয়ে বলে উঠলো,
" কী রে আয়ান ? হ্যালো! চুপ হয়ে গেলি কেন বে?"
কিন্তু হিমেলের কথা তো আয়ানের কানে পৌছচ্ছে না! সে তো অন্য এক জগতে হারিয়ে গিয়েছে!
হিমেল নেটওয়ার্কের সমস্যা ভেবে জোরে জোরে বলল,
" কিছু শোনা যাচ্ছে না আয়ান! তুই এয়ারপোর্টে চলে আয়। আমি ওখানেই আসবো। রাখলাম।"
বলেই হিমেল কল কাটলেও আয়ান তখনও ফোন কানে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
আদ্রিকার প্রতিটি পদক্ষেপ যেন আয়ানের হৃদয়ের গভীরে এক মধুর কম্পন সৃষ্টি করল। মেরুন শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে লুকানো ছিল এক স্বপ্নিল রূপ, যা আয়ানকে এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ করে রাখল। তার মনে হলো, এই পথ যেন কোনও এক পরির দেশে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে আদ্রিকা তার স্বপ্নের আভাস হয়ে ধরা দিয়েছে।
আদ্রিকা যখন আরও কাছে এলো, আয়ানের হৃদয়ে এক অদ্ভুত প্রশান্তি ও উত্তেজনার মিশ্রণ ছড়িয়ে পড়ল। তার চোখে ছিল ভালোবাসার গভীরতা, আর মনে ছিল এক অতল আবেগের ঢেউ।
আয়ানের শ্বাস প্রশ্বাসে এক অজানা উত্তেজনা ভর করল, তার চোখের পাতা এক মুহূর্তের জন্যও নড়ল না। আদ্রিকার তার দিকে এগিয়ে আসা যেন তার হৃদয়ের স্পন্দন আরও জোরালো করে তুলল।
আয়ান বিড় বিড় করে বলল,
"এই মুহূর্ত, এই সৌন্দর্য, আমি সারাজীবন ধরে রাখতে চাই।"
আদ্রিকা আয়ানের সামনে এসে দাঁড়ালো। আয়ানকে এভাবে ফোন কানে নিয়ে তার দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকানো দেখে আদ্রিকা নিজেকে একবার পরখ করলো। নাহ্! সবই তো ঠিক আছে! ব্লাউজ তো বড় সাইজের পড়েছে। এমনকি শাড়িতে একশোরও বেশি সেফটি পিন মেরেছে যাতে শরীরের অযাচিত কোনো অংশ দেখা না যায়। তাহলে আয়ান কেনো ওর দিকে এভাবে তাকিয়ে আছে ভেবে পেলো না বেচারী আদ্রিকা!
আয়ানের মনোযোগ পেতে হালকা কাশলো সে।আয়ান আস্তে করে ফোন কান থেকে নামালো। ঐ মুহূর্তে গাড়ি থেকে মাথা বের করে দিয়ে রামিসা বলে উঠলো,
" কী ব্যাপার ভাইয়া? ভাবি কি এখনো......"
আদ্রিকাকে দেখেই রামিসার মুখ বন্ধ হয়ে গেলো। সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি থেকে নেমে ছুঁটে আসলো আদ্রিকার দিকে।
" ওয়াও ভাবি!!! Just Jossss! কী সুন্দর লাগচ্ছে তোমাকে! একদম পরী! হায়! মার ডালা!"
আয়ান এখনো চুপ করেই তাকিয়ে আছে। গাড়ির জানালা থেকে একটু উঁকি মেরে রাবেয়া বেগম বললেন,
" দেখতে হবে না বৌমাটা কার!! আমার বৌমা! সুন্দর তো লাগতেই হবে। "
এরপর আদ্রিকার দিকে তাকিয়ে বললেন,
"এদিকে আয় তো মা! তোর কানের পিছনে একটা নজরফোটা দিয়ে দিই। সবাই যেভাবে নজর দিচ্ছে তোকে! তাড়াতাড়ি আয়!"
আদ্রিকা লজ্জা পেয়ে আয়ানের দিকে একটু তাকিয়ে গাড়ির কাছে গেল।
রামিসা একটু বাঁকা হেসে আয়ানের কানের কাছে গিয়ে বলল,
" ভাইয়া! মম কীভাবে বুঝলো যে তুমি ভাবির দিকে নজর দিচ্ছো?"
আয়ান ভ্রু কুচকে নিজের বে'হা'য়া বোনের দিকে তাকালো।
রামিসা একটু ভাব নিয়ে বলল,
" সদর দরজার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে ছিলে তো। তাই বললাম আর কি!"
আয়ান এইবার জোরে রামিসার কান মুলে ধরল আর বলল,
" খুব পেকে গেছিস না! দাঁড়া তোর বিয়ের ব্যাবস্থা করচ্ছি।"
রামিসা চেঁচিয়ে উঠলো,
"আ......না,,,, ভাইয়া প্লিজ লাগচ্ছে ছাড়ো। প্লিজ। আর কখনোই সত্যি কথা বলব না......"
আয়ান রামিসার কান ছেড়ে দিয়ে গাড়ির কাছে চলে গেল।
রামিসা কান ঘষতে ঘষতে বলল,
" ধুর! এই দুনিয়ায় আসলেই সত্যি কথার ভাত নাই!"
চলবে...............
⚠️বি:দ্র: একটু ছোট করে দিলাম।🤧 সময় ছিলো না তো😅 এটুকুই লিখতে পেরেছি।🤗