#তোর_ছোঁয়ায়_ফাগুন
#পর্ব_১৫ ( বোনাস পর্ব )
#লেখিকা_অনামিকা_তাহসিন_রোজা
সন্ধ্যার আকাশে লাল-কমলা রঙের আভা মিশে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। সূর্য পশ্চিমে ডুবে যাচ্ছে, আর তার শেষ রশ্মিগুলো গাছের পাতা আর নদীর জলে মৃদু প্রতিফলিত হচ্ছে। হালকা বাতাসে চারপাশের গাছপালার পাতা নরম নাচছে। পাখিরা তাদের শেষ গান গেয়ে ঘরে ফিরছে। দূর থেকে কোনো মন্দির বা মসজিদের প্রার্থনার ধ্বনি শোনা যাচ্ছে, যা এই মুহূর্তকে আরও পবিত্র করে তুলছে। নদীর ধারে বা গ্রামীণ পথে কয়েকটি ছোট ঘরের জানালা দিয়ে আলো ছড়িয়ে পড়ছে, যেন আশেপাশের প্রকৃতি রাত্রির স্বপ্নে হারিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এই সোনালী সন্ধ্যায় আদ্রিকা নিজের ঘরে লাগেজ গোছাতে শুরু করেছে। একটু আগে সে রাবেয়া বেগমকে ঔষধপত্র খাইয়ে ব্যাগ গুছিয়ে দিয়ে এসেছে। এখন রাবেয়া বেগম, রামিসা দুজনেই ঘুমোচ্ছে। কাল সকাল সকাল উঠতে হবে যে! তাই বিশ্রাম নিচ্ছে তারা। আয়ানের খবর আদ্রিকা আপাতত জানে না। দুপুরে খাওয়া দাওয়া শেষে সে ঘরে ঢুকেছে ঘুমানোর জন্য। আদ্রিকা একে একে সব জামাকাপড় এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিচ্ছে। সে একটু বেশি কাপড় নিলো, কারন রাবেয়া বেগম বলেছেন যে ওখানে নাকি অনেক দিনই থাকতে হবে। লাগেজের দিকে তাকিয়ে আদ্রিকা যখন কাপড়-চোপড় নিয়ে চিন্তায় ব্যাস্ত তখন সে দরজা থেকে গলা খাকাড়ির আওয়াজ পেলো। সাথে সাথে পেছনে ঘুরে আয়ানকে দেখে অবাক হলো। তাড়াতাড়ি করে মেয়েটা ওড়না ঠিকঠাক করে নিলো। আর ধীর কন্ঠে বলে উঠলো,
" আপনি,, এ সময়! ঘুমোন নি!"
আয়ান মাথা চুলকে জিজ্ঞেস করলো,
" ভেতরে আসি?"
আদ্রিকা উৎসুক হয়ে বলল ,
" হ্যাঁ হ্যাঁ আসুন না! ভেতরে আসুন।কিছু লাগবে আপনার?"
আয়ান ভেতরে ঢুকে বলল,
" আসলে একটা কথা বলতাম.....আ ,, তুমি কিছু মনে না করলে আর কি!"
আয়ানের মধ্যে নারভাসনেস দেখে আদ্রিকা আরো বেশি উৎসুক হয়ে বলল,
" বলুন না! সমস্যা নেই ! বলুন আপনি।"
আয়ান আমতা আমতা করে বলল,
" উম..আমার লাগেজ গুছিয়ে দিতে একটু সাহায্য করবে?"
আদ্রিকা একটু অবাক হলো। এতো বড় মানুষটা লাগেজ গোছাতে পারে না! এটা কোনো কথা নাকি! আদ্রিকা কিছু বলতে যাবে তার আগেই আয়ান আবারো তাড়াহুড়ো করে বলে উঠলো,
" না মানে মাকেই বলতাম। কিন্তু মা তো মেডিসিন নিয়ে ঘুমোচ্ছে আর আমার পাঞ্জাবিগুলোও খুঁজে পাচ্ছি না।"
মূলত আয়ানের কোনো সাহায্যের প্রয়োজন ছিলোই না আর না সে পাঞ্জাবি নামক কোনো বস্তু আদৌও খুঁজেছে!! তার তো প্রধান লক্ষ্য অন্য কিছু!
বেচারি আদ্রিকা তো আর সেটা বুঝলো না।
তবে পাঞ্জাবির কথা বলতেই সে চোখ বড় করে এক হাত মাথায় দিয়ে বলল,
" হায় আল্লাহ্! আমি তো আপনার সব পাঞ্জাবি ধুঁয়ে দিয়েছি! ওগুলো কাল সকালের মধ্যে শুকোবে না তো। আর শুকোলেও আয়রন করতে লাগবে! আপনার তো আর কোনো পাঞ্জাবি নেই তাই না!"
আয়ান বোকা বনে গেলো। সে তো পাঞ্জাবি খুঁজেই নি! বাহ্! অন্ধকারে মারা ঢিলটা লেগে গেল! আয়ান বলে উঠলো,
" আরে না! সমস্যা নেই। আমি তো এমনিই খুঁজছিলাম পাঞ্জাবি। আমি তো পাঞ্জাবি নিয়ে যাবো না। আমরা তো আমেরিকায় গিয়েই শপিং করবো। আমার এতোকিছু নিয়ে যাওয়ার লাগবে না।"
এরপর আয়ান আদ্রিকার লাগেজের দিকে তাকিয়ে বলল,
" সেকি! তুমি এতো কাপড় নিয়েছো! এতো কাপড় নেয়ার লাগবে না আদ্রিকা । ২-৩ টে নাও। ওখানে গিয়ে তোমায় আমি নতুন কাপড় কিনে দেবো।"
" না না , আমার লাগবে না তো।"
আয়ান দুই হাত কোমড়ে রেখে বলল,
"আমি তোমায় জিজ্ঞেস করিনি বুঝেছো! বলেছি। আমেরিকায় যাবে আর কিছু কিনবে না! তা কি হয় নাকি বোকা! আমরা সবাই ওখানেই নতুন করে শপিং করব। আর, নয়নতারার বিয়ের জন্য তো শপিং করতেই হবে। এখন চলো আমার লাগেজ গুছিয়ে দিতে সাহায্য করো।"
_______________________________________
আদ্রিকা আয়ানের ঘরে এসে আলমারি থেকে বেছে বেছে কাপড় নিচ্ছে আর লাগেজে গুছিয়ে দিচ্ছে।
কয়েকটা কাপড় গুছিয়ে আদ্রিকা আয়ানকে বলল,
"আপনি একটু দেখুন তো এই কয়টা দিয়ে আপনার হবে?"
" অবশ্যই হবে।" বলে আয়ান লাগেজের চেইন লাগিয়ে দিলো।
আদ্রিকা বলল,
" আমি কি এখন যাবো?"
" না না ,,,একটু দাঁড়াও।"
আয়ান নিজের কাবার্ড থেকে একটা শপিং ব্যাগ বের করলো আর আদ্রিকার দিকে বাড়িয়ে দিলো। আদ্রিকা একবার আয়ানের দিকে তাকালো, একবার আয়ানের হাতে থাকা ব্যাগের দিকে তাকালো।
আয়ানকে দেখেই মনে হচ্ছে যে সে অপ্রস্তুত। বাম হাত দিয়ে নিচের ঘাড় স্লাইড করে ঠোঁট ভিজিয়ে আমতা আমতা করে বলল,
"এটা তোমার।"
আদ্রিকা এখনো অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আয়ানের দিকে। আদ্রিকার হেলদোল না দেখে আয়ান বাম হাত দিয়ে আদ্রিকার কাঁপতে থাকা ডান হাতটা নিজেই ধরলো এবং শপিং ব্যাগ টা ধরিয়ে দিলো।
আবারো আয়ানের অপ্রত্যাশিত স্পর্শে আদ্রিকা কেঁপে উঠলো। তবে বুঝতে দিলো না সেই মানুষটিকে! আয়ানও যে আদ্রিকার হাত ধরে স্বাভাবিক ছিলো তা কিন্তু না!
আদ্রিকা একবার ব্যাগটার দিকে তাকিয়ে আয়ানকে বলল,
" এ..এটা! এটা আমার জন্য?"
আয়ান মুচকি হেসে বলল,
" হুম। তোমার জন্য..শুধু তোমার জন্য। "
আদ্রিকা আবারো বলল,
" কী আছে এতে?"
আয়ান আরেকটু হেসে বলল, "খুলে দেখো..."
আদ্রিকা ব্যাগটা খুলে ভেতর থেকে একটা বড় প্যাকেট পেলো। আবারো আয়ানের দিকে এক পলক তাকিয়ে প্যাকটটাও খুলে ফেলল। আদ্রিকা দেখলো যে একটা ডার্ক মেরুন রংয়ের শাড়ি!!!!
আয়ান তো অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তার অর্ধাঙ্গিনীর প্রতিক্রিয়া দেখতে ব্যস্ত! সে তো মূলত এই শাড়িটা দিতেই আদ্রিকা কে এ ঘরে নিয়ে এসেছে! লাগেজ গোছানো তো বাহানা মাত্র!!!
আদ্রিকা খুশিতে নিঃশব্দে কেঁদেই দিলো। আদ্রিকার চোখে পানি দেখে আয়ান ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলো। উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
"কী হলো আদ্রিকা?? তুমি কাঁদছো কেনো?"
আদ্রিকা চোখ মুছে ভিজে যাওয়া আঁখিপল্লব মেলে আয়ানের দিকে তাকিয়ে হাসার চেষ্টা করে বলল,
" আপনি আমার জন্য শাড়ি এনেছেন? আমার জন্য?"
আদ্রিকার মন চাইছে শাড়িটাকে বুকের মধ্যে চেপে ধরে হাজারটা চুমু খেতে। তার প্রিয় মানুষের দেয়া প্রথম উপহার বলে কথা!!! সে নিজের চাওয়াটা আংশিক পূর্ণ করলো। শাড়িটাকে আষ্টেপৃষ্টে দু হাত দিয়ে জড়িয়ে নিয়ে আয়ানের দিকে তাকালো।
আয়ান তো নীরবে তার প্রিয় অর্ধাঙ্গিনীকে দেখচ্ছে। মেয়েটা কত্ত খুশি! এটুকুতেই? একটা মাত্র শাড়ি পেয়েই মেয়েটা এত খুশি! অবশ্য যেই মেয়ে ভালোবাসার জন্য আয়ানের দেয়া গত ৯ মাসের অবহেলা ভুলে গেছে, সেই মেয়ে তার দেয়া ছোট্ট জিনিসেও খুশি তো হবেই!! সে তো আর ফারজানার মতো টাকা লোভী নয়! আদ্রিকার খুশি দেখে আয়ানের যেনো বুকটা ঠান্ডা হয়ে গেলো। খুব ইচ্ছে করলো আদ্রিকাকে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু পারলো না! তার বিবেগ বাঁধা দিচ্ছে। মেয়েটা যদি তাকে ভুল বুঝে রাগ করে!
আয়ান মায়াময় কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো,
" পছন্দ হয়েছে ?"
আদ্রিকা উপর নিচ মাথা নেড়ে খুশিতে বলল,
" খুব!! খুব বেশী পছন্দ হয়েছে! ভীষন সুন্দর!"
আয়ান যেনো আরোও খুশি হলো। আর আবারো বলে উঠলো,
" জানো, এই কালার টা তোমায় অনেক সুন্দর মানাবে।গতকাল শপিং মলে একবার দেখেই শাড়িটা আমার অনেক পছন্দ হয়েছে। অনেক সুন্দর লাগবে তোমায়। কাল সকালে তুমি এই শাড়িটা পড়েই আমেরিকা যাবে।"
আদ্রিকা চোখ পিটিপিট করে জিজ্ঞেস করলো,
" শাড়ি পরে আমেরিকা ????"
আয়ান বলল, " হ্যাঁ।"
আদ্রিকা বাচ্চাদের মতো করে আবারো বলে উঠলো,
" শাড়ি পরে ঐ দেশের মানুষ আমায় মেনে নেবে কি?"
আয়ান হো হো করে হেসে বলল,
" অবশ্যই মেনে নেবে। সবাই অবশ্য অবাক হবে। সমস্যা কী? তুমি সবার থেকে এক্সসেপশনাল হয়ে থাকবে। আর মামনিও খুশি হবে।"
আদ্রিকা অবাক হলেও কিছু বলল না। কারন তারও ইচ্ছে করচ্ছে! সে তো পারলে এখনি শাড়িটা পড়ে নেয়!!!!!
চলবে...............................
⚠️বি:দ্র: দুইদিন গল্প দিইনি তো😅। তাই একটা ছোট্ট বোনাস পার্ট দিলাম 🥰 শাড়ি পড়ে আমেরিকা যাওয়া নিয়ে কেও হাসবেন না প্লিজ 🤧 আসলে এতে আয়ান আদ্রিকার দোষ নেই🥺। এই শখটা আমার 🙂👍🏻