#তোর_ছোঁয়ায়_ফাগুন
#পর্ব_২৩ ( Different something )
#লেখিকা_অনামিকা_তাহসিন_রোজা
সকালের প্রথম আলো যখন পৃথিবীর বুকে ছড়িয়ে পড়ল, চারপাশের প্রকৃতি যেন নতুন করে জেগে উঠল। সূর্যের সোনালি রশ্মি মেঘের ফাঁক গলে নরমভাবে ভেসে আসছে, পুরো আকাশ যেন এক সোনালি চাদরে ঢাকা। গাছের পাতায় জমে থাকা শিশিরবিন্দু রূপার মতো ঝিকমিক করছে, আর সেই ঝিকিমিকি আলো ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। পাখিরা তাদের মধুর কণ্ঠে সুর তুলেছে, যেন আজকের সকালকে স্বাগত জানাচ্ছে। বাতাসে ফুলের মিষ্টি সুবাস ভাসছে, যা মনে প্রশান্তি এনে দিচ্ছে। নদীর পানি ধীরে ধীরে বয়ে চলেছে, তার মৃদু কলকল শব্দ যেন প্রাকৃতিক সংগীতের মতো শোনা যাচ্ছে।
আজকের সকালটা বিশেষ, কারণ সূর্যের আলো মাটিতে ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথেই অনিমা চৌধূরীর বাড়ির সবাই আনন্দে জেগে উঠেছে। বিয়ের সাজসজ্জায় ঘেরা বাড়ির প্রতিটি কোণে এক ধরনের উত্তেজনা আর আনন্দের বাতাস বইছে।
বাড়ির উঠানে ফুলের তোড়া সাজানো হচ্ছে, আর গাছের ডালে ডালে রঙিন আলোর মালা ঝুলছে। বাতাসে মিষ্টি গন্ধ, মেহেদির সৌরভ আর সজীব ফুলের সুবাস মিলেমিশে এক মুগ্ধকর পরিবেশ তৈরি করেছে। পাখিরা যেন এই আনন্দময় সকালে বিশেষ করে সুর তুলছে, তাদের মধুর কণ্ঠে চারপাশে খুশির রঙ ছড়িয়ে পড়ছে।
দুপুরের পরেই সমস্ত মেহমান আসতে শুরু করবে। বাড়ির ছেলেদের তো বসে থাকার সময় নেই! বিয়ের অনুষ্ঠানটা আমেরিকায় হচ্ছে! কিন্তু এখানকার কর্মী তো বাঙালি নিয়মে বাড়ি, স্টেজ সাজাতে পারবে না! এই কারণে সমস্ত আয়োজন, সাজগোছ বাড়ির ছেলেদের করতে হচ্ছে!
মেহেন্দী অনুষ্ঠানটা বাড়ির ছাদে করা হবে প্লান করা হয়েছে।
সেই তখন থেকে আদ্রিকা আয়ানের পিছু পিছু খাবারের প্লেট ধরে ঘুরছে আর বলচ্ছে,
" একটু খেয়ে নিন আগে। তারপর কাজ করুন।"
বলেই আবার আয়ানের পিছে পিছে ইউটার্ন মারচ্ছে।
আর আয়ানও বারবার বলচ্ছে,
"সময় নেই আদ্রিকা, একদম সময় নেই। এখনো গেট সাজানো বাকি! ছাদে স্টেজ করা হয়নি এখনো! ওহ্ শিট ! গোলাপ ফুল গুলোও এখনো আনা হয়নি! এইইই হিমেল! ফুলগুলো কই!"
বলে আয়ান আবারো আদ্রিকাকে পেরিয়ে চলে গেলো। কিন্তু আদ্রিকাও হার মানলো না! সব কাজ ফেলে আয়ানের পিছে ছুটতে থাকলো! আরে বাবা! না খেলে শক্তি আসবে কই থেকে! আর কাজ করবে কীভাবে? এই লোকের কি এটাও ঘটে ঢুকে না!
এরকম করতে করতে অবশেষে আয়ান বলল,
"আদ্রিকা! লক্ষী বউ আমার! সোনা বউ ! কথা শোনো! আমার সত্যিই সময় নেই! তুমি পারলে এক কাজ করো। খাইয়ে দাও আমায়।"
সবশেষে এটাই মানলো আদ্রিকা। সে এখন রীতিমতো আয়ানের পিছু পিছু ঘুরচ্ছে আর আয়ানের মুখে ক্ষনে ক্ষনে খাবার তুলে দিচ্ছে ! যেনো আয়ান একটা দু বছরের বাচ্চা! এই দৃশ্য দেখে রাবেয়া বেগম আজিম চৌধূরীর উদ্দেশ্যে বললেন,
" দেখেছো! দেখেছো তোমার ছেলেকে! দেখো! কেমন নিজের বউকে পিছু পিছু নিয়ে বেড়াচ্ছে! আহারে মেয়েটা! নিজে এখনো খায়নি, অথচ তোমার ছেলেকে বাচ্চাদের মতো ঘুরে ঘুরে খাওয়াচ্ছে। তোমার ছেলে একদম তোমার মতো হয়েছে! তোমরা বাপ ছেলেই বউদের খাটাতে খুব ভালোবাসো তাই না !!! "
স্ত্রীর কথায় আজিম চৌধূরী দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি তো জানেন এখন একটু কথা বলতে গেলেই এই অনুষ্ঠানেই কুরুক্ষেত্র বানিয়ে ফেলবে তার বউ! তার থেকে চুপ থাকাই শ্রেয়!
___________________
কিছুটা বেলা গড়িয়েছে। অনুষ্ঠানের জন্য গেট সাজানো, বাড়ি সাজানো আংশিক শেষ হয়েছে। আদ্রিকা সহ বাড়ির সকল মেয়েরা খাবারের দিকটা আয়োজন করছে। সবাই যে যার মত ব্যস্ত। সকালের নাস্তাটাও সবাই একসাথে করতে পারল না। সবাই কোনোমতো খেয়ে নিলো। আয়ান তো আদ্রিকার হাতে খেয়ে জমিয়ে কাজ করছে। এদিকে রামিসা পড়েছে আরেক বিপাকে। যতবারই সে হিমেলের দিকে তাকাচ্ছে ততবারই হিমেল তাকে চোখ পাকাচ্ছে, যার অর্থ "বেশি লাফালাফি করলে খবর আছে তোর !!!" হিমেলের ভয়ে এখন সে লাফাতেও পারছে না। চুপচাপ বসে মুখে আঠা মেরে বসে আছে। বিষয়টা খেয়াল করে অবাক হয় আদ্রিকা! ব্যাপারটা কি হলো! মেয়েটা হঠাৎ এমন ফাঁটা টায়ারের মতো চুপসে গেছে কেন! সকাল থেকে নয়নতারা আর সারজিসের তো দেখা নেই! সারজিস একটু আগে নিজের বাড়িতে চলে গেছে। সন্ধ্যায় একবারে পরিবারসহ মেহেন্দী অনুষ্ঠানে আসবে। সবার কাজকর্ম প্রায় হয়ে গেলে যে যার ঘরে গেল বিশ্রাম নেওয়ার জন্য। দুপুরের পর আত্মীয়রা শুরু করল। আদ্রিকাও নয়নতারার সাজের জন্য বিউটি পার্লারের সাথে যোগাযোগ করলো। বিকেলের আগেই বাড়ির সব মেয়েদের সাজগোজ শেষ করতে হবে।
________________________
আদ্রিকা একটু আগেই সব কাজ শেষ করে ঘরে এসে দেখল আয়ান বিছানায় বসে আছে। আদ্রিকাকে আসতে দেখে আয়ান টেনে টেনে বলল,
" সেকিই!! তুমি !! আমি তো ভেবেছিলাম তুমি মনে হয় ঘরে আসার পথ ভুলেই গেছো। অবশেষে মহারাণীর ঘরে পা পরল তবে!"
আদ্রিকা ভালোই বুঝলো সকাল থেকে আয়ানের সাথে কথা বলার সময় পায়নি দেখে সে এখন খোঁচা মারচ্ছে। আয়ানের পাশে বসে আদ্রিকা বলল,
" এভাবে বলছেন কেন? আপনি তো দেখলেন সকাল থেকে কত কাজ করতে হলো সবাইকে! আমি তো আপনাকে খাইয়ে দিলাম! এমনকি আপনি নিজেও ব্যস্ত ছিলেন কাজে!"
আয়ান টেনে টেনে বলল,
" হ্যাঁ হ্যাঁ এখন বাহানা বানাও। আসল কথা হচ্ছে আমাকে তুমি এখন আগের মতো কেয়ার করো না!"
আদ্রিকা ভ্রু কুঁচকে বলল,
" আপনার মতলবটা কী বলুন তো! এরকম বাচ্চাদের মত করছেন কেন!"
আয়ান চোখ বড় বড় করে বলল,
" আরিব্বাস!! আমার বউ দেখছি খুবই বুদ্ধিমতী!!"
এরপর ধরফর করে উঠে এসে আদ্রিকার কাছে ঘেঁষে বসলো। আর বাচ্চাদের মত করে বলে উঠলো,
" ঠিক বলেছ, আমার একটা মতলব আছে।"
আদ্রিকা ভ্রু উপরে উঠিয়ে জিজ্ঞেস করল," কী মতলব?"
আয়ান হাত দিয়ে নিজের গাল ইশারা করল। আদ্রিকা বুঝতে না পারে তাকিয়ে রইল। আয়ান বলল,
" এখানে একটু আ'দ"র করে দাও।"
আদ্রিকার চোখ বড় বড় হয়ে গেল, আর বলল,
"আপনি কি দিন দিন নি"র্ল'জ্জ বে'হা'য়া পুরুষে পরিণত হচ্ছেন?"
আয়ান মাথা নেড়ে বলল,
" উহু, বে"হা"য়া হলে তোমাকে জিজ্ঞেস করতাম না। নিজেই চু"মু নিয়ে নিতাম। তবে আমি তো আবার ভদ্র, সুশীল, একটা সরল মানুষ। এ কারণে চেয়ে নিচ্ছি। এই যে গালে, এখানে একটা সুন্দর জবোরদস্ত চু"মু দাওতো। সকাল থেকে ভিটামিন চু'মু শূন্যতায় ভুগছি আমি।"
আদ্রিকা আগের মত করে বলল,
" আপনি এগুলো কোথা থেকে শিখে এসেছেন বলুন তো?"
আয়ান এবার বিরক্তিকর দৃষ্টিতে তাকালো, আর বলল,
" তুমি যদি আমাকে চুমু না দাও, এখান থেকে আমি যেতে দেব না তোমাকে। এক্ষুনি ভদ্র ভালো মেয়ের মতো এখানে একটা চুমু দিয়ে চলে যাও। আটকাবো না। কারণ আমি খুব ভালো করেই জানি আজকে সারারাত তোমাকে আমি আর পাবোই না। এমনকি হতে পারে আগামী দুদিন বিয়ের অনুষ্ঠানের কারণে তোমার আশেপাশেও যেতে পারব না। তাই এখন ফটাফট একটা সুন্দর করে চুমু দাও তো বউ!"
আদ্রিকা আগে হলে লজ্জা পেতো। কিন্তু এখন সে অবাক হয়েই কুল পাচ্ছে না। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রয়েছে আয়ান নামক মানুষটির দিকে! লোকটা একদম হুট করেই বদলে গেলো! কেনো!
___________________
সন্ধ্যার আবেশ নেমে এসেছে, আকাশে লালচে-গোলাপি আভা মিশে গেছে গোধূলির আলোতে। তাদের বাড়িটি যেন রূপকথার মতো সাজানো হয়েছে আজকের মেহেন্দি অনুষ্ঠানের জন্য। বাড়ির প্রতিটি কোণ আলোয় ঝলমল করছে, টিমটিমে লাইটের সারি যেন তারার মালা হয়ে উঠেছে।
ছাদের পরিবেশটাও কোনো অংশে কম নয়। এখানেই তো মূল অনুষ্ঠান- নয়নতারাকে মেহেন্দী পরানো হবে। চারদিকে ফুলের মালা ঝুলছে, বাতাসে মৃদু সুগন্ধ ভাসছে। সাদা, গোলাপি ও সবুজ রঙের কাগজের লণ্ঠনগুলো নরম আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে, আর মাটিতে সাজানো দীপাবলির প্রদীপগুলো যেন ছাদের শোভা আরো বাড়িয়ে তুলেছে।
আলোর ঝলকানির মধ্যে, গাছপালার সবুজ শীতলতা আর ফুলের রঙের বাহার এক অনন্য মাধুর্য তৈরি করেছে। সব মিলিয়ে ছাদটি যেন কোনো জাদুকরী বাগান, যেখানে আজকের মেহেন্দি অনুষ্ঠানকে ঘিরে তৈরি হয়েছে এক মোহনীয় আবহ।
বাড়ির সবাই সেজেগুজে ছাদে এসে বসেছে, যেখানে আজকের মেহেন্দি অনুষ্ঠানের মূল কেন্দ্রবিন্দু তৈরি হয়েছে। ছাদের মাঝখানে বিরাট এক স্টেজ সাজানো হয়েছে, যা যেন রাজকীয় আসন। স্টেজের চারপাশে ঝুলছে সুদৃশ্য পর্দা, যার প্রান্তে ঝিলমিল করছে মখমল রঙের লাল আর সোনালি জরি।
স্টেজের পেছনে ফুলের পর্দা, যা বিভিন্ন রঙের গাঁদা, রজনীগন্ধা, আর গোলাপ দিয়ে তৈরি, যেন এক ফুলেল স্বর্গ। স্টেজের উপরে ঝুলছে রুপালি ঝাড়বাতি, যার আলোর ঝিলিক চারপাশের সবকিছুকে আরো উজ্জ্বল করে তুলেছে।
সবাইকে ঘিরে রয়েছে নরম কুশন, রেশমী কাপড়ে মোড়ানো সুন্দর আসন, যেখানে তারা বসে অনুষ্ঠান দেখছে। হালকা গানের সুরে ছাদটি ভরে উঠেছে, আর সকলে যেন এক স্বপ্নময় সন্ধ্যার অপেক্ষায় আছে। সারা পরিবেশে আনন্দের আবহ, হাসির ঝংকার আর রঙিন পোশাকের আভা মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অসাধারণ দৃশ্য।
আয়ানসহ বাড়ির সব ছেলেরা সবুজ পাঞ্জাবি পরে ছাদের এক কোণে বসে আছে। আজকের এই মেহেন্দী অনুষ্ঠানের বিশেষত্ব হলো-সবাই সবুজ রং পরবে। মেয়েরা সবুজ শাড়ি আর ছেলেরা সবুজ পাঞ্জাবী! আয়ানও নিজের ও আদ্রিকার জন্য ম্যাচিং ডিজাইনের সবুজ পাঞ্জাবী ও শাড়ি এনেছিলো। একটু আগেই সে শাড়ি টা আদ্রিকার হাতে তুলে দিয়ে এসেছে এবং বরাবরের মতোই আদেশ করেছে যেনো সে বেশি না সাজে! হালকা করে সাজলেই হবে! ঐ একটু সাজই আয়ানের হৃদস্পন্দন থামিয়ে দিতে সক্ষম! চারপাশের সাজসজ্জা আর পরিবেশের সৌন্দর্য আয়ানের চোখে ধরা দিচ্ছিল, কিন্তু তার মন ছিল অন্য কোথাও।
কিছুক্ষণ পর বাড়ির মেয়েরাও ছাদে আসা শুরু করলো। আয়ান খুব আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে সিড়ির দিকে! হয়তো এখনই চলে আসবে তার হৃদয়হরণী আর এক্ষুনি তাকে খুন করে ফেলবে তার মুগ্ধতায়!
হিমেলও দেখছিল আগত মেয়েদেরকে। তার ভাবনায় এক একটা মেয়েকে শাড়ি পরে অ্যানাকোন্ডার মতো লাগচ্ছে! আসলে তাদের অনেক আমেরিকান আত্মীয়রাও আজ আনন্দ করার জন্য শাড়ি পরেছে...যা হিমেলের একদম পছন্দ হচ্ছে না! শাড়ি বাঙালি কেই মানায়! হিমেল যখন সবাইকে একবার দেখে তার চোখ ফেরাতে যাবে, তখনই তার চোখ আটকে গেল সবুজ শাড়ি পরিহিতা অদ্ভুত রমণীর দিকে !!! তার মণি থেমে গেলো! কী ব্যাপার?এই মেয়েকে খুব চেনা চেনা লাগছে তো!! আগে তো কখনো দেখিনি!! দূর থেকে খুব মনোযোগ দিয়ে হিমেলের তাকানোর মাঝেই উক্ত রমণী যখন ধীরে ধীরে এগিয়ে আসলো স্টেজের দিকে, তখনই হিমেল চমকে উঠল!
এতো রামিসা!!! এত সুন্দর লাগছে কেন আজকে তাকে!!! শাড়ি পড়ে তো দেখচ্ছি হুট করে মেয়েটা বড় হয়ে গেল!!বহু সময় নিয়ে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে হিমেল চোখটা সরিয়ে নিল। এভাবে কেনো তাকাচ্ছে সে! ঐ পটলের মধ্যে আবার কী দেখার আছে! শাড়ি পরেছে দেখে কি সুন্দর হতে পারবে নাকি! এইসব ভাবনার মাঝেও ছেলেটা আড়চোখে কয়েকবার রামিসা কে পর্যবেক্ষণ কললো! এরই মধ্যে আয়ান বলে উঠলো,
" দেখেছিস আমার বোনকে কত সুন্দর লাগছে! তাহলেই ভাব, আমার বউটাকে ঠিক কতটা .............."
বলতে পারলে না আয়ান। থেমে গেল তার কন্ঠনালী! বরাবরের মতোই চোখের মনি আটকে গেল আদ্রিকার অস্তিত্বে ! স্তব্ধ হয়ে গেল ছেলেটা!
হঠাৎ করেই ছাদে আদ্রিকার উপস্থিতি যেন সবকিছুকে থমকে দিলো। আদ্রিকা সবুজ শাড়িতে সেজে আসার সাথে সাথে চারপাশের সব আলো যেন তার সৌন্দর্যের সামনে ম্লান হয়ে গেল।
শাড়ির নরম সবুজ রঙ তার কোমল চেহারাকে আরো উজ্জ্বল করে তুলেছে, আর তার মাথায় গাঁথা ফুলের মৃদু গন্ধ বাতাসে ছড়িয়ে পড়েছে। তার প্রত্যেকটি পদক্ষেপে শাড়ির কুঁচিরা নড়ছে, আর তার মৃদু হাসি যেন চারপাশের সবাইকে মুগ্ধ করে দিচ্ছে।
আয়ানের হৃদয়ে যেন একঝলক আলোড়ন জাগে। তার চেহারায় মুগ্ধতার ছাপ স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেন সে এই মুহূর্তটিকে কখনো ভুলতে পারবে না। সবকিছু ছাপিয়ে আদ্রিকার সৌন্দর্য আর তার উপস্থিতির মোহনীয়তায় ছাদটি যেন স্বপ্নের মতো হয়ে উঠেছে।
এই মুগ্ধতার মধ্যে, ছাদের টিমটিমে আলো, স্টেজের শোভা, আর অনুষ্ঠানের আবহ মিলেমিশে তৈরি করেছে এক রোমাঞ্চকর, হৃদয়ছোঁয়া মুহূর্ত, যা আয়ানের মনে এক অনন্য স্মৃতি হিসেবে থেকে যাবে।
আয়ান আশেপাশে থাকা মানুষের পরোয়া না করে আদ্রিকাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এসে নরম এবং ধীর গলায় বললো,
"তুমি আজকের এই সন্ধ্যাকে যেন এক অন্যরকম রূপ দিয়েছো। সবুজ শাড়িতে তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন প্রকৃতি নিজেই তোমার মাঝে আশ্রয় নিয়েছে। তোমার সৌন্দর্য, তোমার এই মৃদু হাসি... আমার সমস্ত পৃথিবীকে আলো করে দিয়েছে। আজকের এই সন্ধ্যায়, তোমার চোখের তারায় আমি সেই আবেগ আর কোমলতাকে দেখছি, যা হাজার কথা বলার পরেও বোঝানো যায় না। তুমি আমার জীবনের সব থেকে সুন্দর মুহূর্ত হয়ে উঠছো, প্রতিটি শ্বাসে যেন তোমাকে অনুভব করতে পারি। তোমার উপস্থিতি আমার হৃদয়কে পূর্ণ করে দিয়েছে, যেমন চাঁদ পূর্ণিমার রাতে আকাশকে আলোয় ভরিয়ে দেয়।"
এই কথা বলার পর, আয়ানের চোখে সেই মুগ্ধতা আর ভালোবাসা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেন এই মুহূর্তটি তার জীবনের সবথেকে প্রিয় স্মৃতি হয়ে থাকবে।
__________________
একটু পরেই মেহেন্দী অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যায়। নয়নতারাকে স্টেজে বসানো হয়। সারজিসও তার পরিবারসহ হাজির হয় অনুষ্ঠানে। সবার চোখে মুখেই উৎফুল্লতা। আদ্রিকা আর রামিসা দুজনে মিলে নয়নতারার দু হাতে মেহেন্দী পরিয়ে দিএ থাকে। আর আত্মীয়রা সবাই খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ করচ্ছে। মেহেন্দী পরানোর এক পর্যায়ে আদ্রিকা নয়নতারাকে বলে,
" সারজিসের নাম কোন হাতে লিখে দেবো নয়ন?"
নয়নতারা বলে,
" ওর নাম হাতে লিখতে হবে কেনো? এটাও কি নিয়ম?"
আদ্রিকা হেসে বলে,
" এটা নিয়ম না। তবে অনেকেই ভালোবেসে এটা করে।"
নয়নতারা একবার সারজিসের দিকে তাকিয়ে বলল,
" বাম হাতের তালুতে দাও।"
" আচ্ছা।"
রামিসা বলে,
"জানো নয়ন আপু , তোমার মেহেন্দীর রং এর উপর ডিপেন্ড করবে যে সারজিস ভাই তোমায় কতটা ভালোবাসে!"
নয়নতারা অবাক হয়ে বলে,
"সেকি! কীভাবে ? "
" আরেহ! তোমার মেহেন্দীর রং যদি বেশি লাল হয় ,তাহলে সারজিস ভাই তোমায় ভালোবাসে। আর যদি লাল না হয় তাহলে......."
বলেই রামিসা শয়তানি হাসলো।
এটা শুনতে পেয়ে সারজিস বলে উঠলো,
" শালিকা তুমি কি আমার বিয়ে হওয়ার আগেই আমার সংসারে আগুন দেয়ার চেষ্টা করছো?"
নয়ন তারা রেগে বলল,
" কেন? তোমার ভয় হচ্ছে? সত্যি বলছি! আই সোয়ার, আমার মেহেন্দি যদি লাল না হয়, তাহলে তোমার খবর আছে! হাত পা বেঁধে একদম উগান্ডা পাঠিয়ে দেবো!"
সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। আর বেচারা সারজিসের মুখটা কালো হয়ে গেল।
______________________________
রাত গভীর হতে থাকলো এবং আত্মীয়-স্বজনও ধীরে ধীরে কমতে থাকল। আজকে সবাই প্ল্যান করেছে যে,রাত্রে বেলা খুব আনন্দ করবে। সারজিসসহ আত্মীয় স্বজনরা সবাই চলে গেলে অনিমা চৌধুরী,রাবেয়া বেগম এবং আজিম চৌধুরী তারাও নিচে চলে যায় আগামী কালকের আয়োজন করতে। বসে থাকার একদম সময় নেই। আর বাকি সবাই ছাদে থেকে যায় আনন্দ করার জন্য।
হিমেল বলে উঠলো,
"এখন কি খেলা যায় বলোতো?"
রামিসা বললো,
" চলো লুকোচুরি খেলি।"
হিমেল বিরক্তিতে চোখ পাকিয়ে তাকালো। এই মেয়ে কি আমাদেরকে নিজের মতো বাচ্চা ভাবে! অসহ্য!!!
আয়ান বলে উঠল,
" উমমম.. তার থেকে ট্রুথ এন্ড ডেয়ার খেলি ! ভালো হবে না!"
নয়নতারা বলল,
"হ্যাঁ হ্যাঁ ভাইয়া! ইট্স গ্রেট!"
আয়ান বলল,
" রামিসা যা। নিচ থেকে একটা বোতল নিয়ে আয়।"
________________________
শুরু হয়ে গেল ঐতিহাসিক ট্রুথ এন্ড দেয়ার খেলা। প্রথমে রামিসা বোতল ঘুরালো। কিন্তু সেটা ঘুরে রামিসার দিকেই গিয়ে থামলো।
রামিসা অভিমানী কন্ঠে বলল,
"যাহ্ বাবা! এটা তো বেইমানি!"
আয়ান বলল," বল কী নিবি?"
রামিসা সাহসের সাথে বলল, " ডেয়ার!"
হিমেল যেন এটারই অপেক্ষায় ছিল। সে উৎফুল্ল কন্ঠে বলে উঠলো,
"ডেয়ার টা আমি দিই আয়ান?"
আয়ান বলল," সিওর!"
রামিসার ভ্রু কুচকে গেল। এই লোক কেন ডেয়ার দিতে চাচ্ছে? না জানি কী দিয়ে দেয়!
হিমেল একটা শয়তানি হাসি দিয়ে বলল ,
"এই মুহূর্তে সিড়ি দিয়ে ছাদ থেকে নিচে,আবার নিচ থেকে ছাদে আসতে হবে। মোট ২৫ বার করতে হবে। "
রামিসার মুখটা হা হয়ে গেল। এই লোক বলে কী! হিমেলের চোখে শয়তানি হাসি। নয়নতারার যেন পছন্দ হলো বিষয়টা।
রামিসা কাতর চোখে আদ্রিকার দিকে তাকিয়ে বলল,
" ভাবি!"
আদ্রিকা কাঁধ উচালো যার অর্থ তার কিছুই করার নেই। হিমেলের দিকে কটমট করে তাকিয়ে রামিসা বলল,
"যাচ্ছি।"
হিমেল আরো খোঁচা দিতে আদ্রিকাকে বলল,
" ভাবি তুমিও একটু কষ্ট করে ওর সাথে যাও। দেখো সত্যিই ২৫ বার করে কিনা। বলা তো যায় না!ফাঁকিবাজ বলে কথা!"
রামিসা আরেক ধাপ রেগে উঠে দাঁড়ালো আর ধপধপ করে ছাদের সিড়ির দিকে চলে গেল। আদ্রিকাও পিছে পিছে গেল। ওরা যাওয়ার পর সবাই হেসে উঠল।
আয়ান বলল,
" তুই আমার বোনটাকে এতো জ্বালাস কেন বলতো?"
হিমেল হাসলো শুধু। মিনিট দশেক পর রামিসারা ফিরে এলো। রামিসার হাতে ঠান্ডা পানির বোতল। আদ্রিকা এসে বসে বসতে বসতে বলল,
"হুম। ২৫ বার করেছে ।"
নয়নতারা বলল,
"মিস.রামিসা ২৫ বার ছাদ থেকে নিচে, নিচ থেকে ছাদে উঠানামা করে আপনার অনুভূতি কেমন?"
রামিসা আরেকবার পানি খেয়ে উত্তর দিল,
" খুবই জঘন্য!!!"
এরপরে দ্বিতীয়বারের মতো বোতল ঘোরানো হলো ।এবার গিয়ে বোতল থামলো আদ্রিকার দিকে। সবাই ওওওওও করে উঠলো। হিমেল বলে উঠলো,
" ভাবি কী নেবে তুমি?"
রামিসা বলল," ভাবি তুমিও ডেয়ার নাও।"
আদ্রিকা বলল," আচ্ছা ডেয়ার!"
এইবারে রামিসা বলে উঠল,
"ভাবি এই ডেয়ার টা আমি তোমাকে দেব। একটা গান গেয়ে শোনাও।"
আদ্রিকা এমনভাবে তাকালো যেন কেউ তার কলিজাটা চেয়ে নিয়েছে !
"অ্যাঁ !!!"
" অ্যাঁ না ভাবি হ্যাঁ। আমি মমের কাছে শুনেছি, তুমি অনেক সুন্দর গান করতে পারো। এমনকি তুমি তো কলেজ লাইফে গানের জন্য অনেক পুরস্কারও পেয়েছো। একদম কোনো বাহানা বানাবে না। একটা সুন্দর করে গান শোনাও তো।"
আয়ানও যেন অবাক হয়ে বলল,
" তুমি গান গাইতে পারে আদ্রিকা? কই আমাকে তো কখনো বলোনি?"
আদ্রিকা আমতা আমতা করে বলল,
" আরে না! আমি গান পারি না! রামিসা!!"
রামিসা বলল,
"নো এক্সকিউজ! মিথ্যে বলবে না। এক্ষুনি গাও। এটা ডেয়ার।"
আদ্রিকা সবার দিকে অসহায় চোখে তাকালো। কিন্তু কেউ তাকে পাত্তা দিল না। নয়নতারাও বলে উঠলো,
" ভাবি প্লিজ গাও।"
আদ্রিকা এক পলক আয়ানের দিকে তাকালো। আয়ানও উৎফুল্ল চোখে তাকিয়ে রয়েছে। আদ্রিকা এইবার একটা বড় শ্বাস নিয়ে গান শুরু করল।
( Don't skip ! Enjoy the lyrics!)
পূর্ণতার আলো মনে হয় ডুবেছে
আমার এই হৃদয়ে তোমাতেই পড়েছে
তবু এ মন আবার তুমি ডাকো বারে বার
কেন কথা বলো না আবার
ভালোবেসেছি যে আমি তোমায়
ভালোবেসেছি যে আমি তোমায়
এক ফালি সুখ পাওয়ার আশায়
মন শুধু দিয়েছি যে তোমায়
তোমাকে নিয়ে এ মন আমার
কত সপ্ন যে সাজায়
মন শুধু দিয়েছি যে তোমায়
ভালোবেসেছি যে আমি তোমায়
যত দূরে যাই ভুলি না তোমায়
এই হৃদয় জানে তুমি শুধু আমার
দৃষ্টি যায় তোমার দিকে
জানিয়ে দিই তোমাকে
তোমাকে ছাড়া আমিই অসহায়
তুমি আমার পূর্নতা, তুমি আমার প্রিয়তা
তবু এ মন ভাবে শুধু, তুমি আমার কল্পনা
চলে যায় এ সময়
থমকে দাঁড়ায় এই হৃদয়
বোঝোনা শুধু তুমি
ভালোবাসি যে আমি তোমায়
বলে দাও আমাকে
কী করে বোঝাই মনটাকে
তোমাকে ছাড়া আমিই অসহায়
ভালোবেসেছি আমি তোমায়
ভালোবেসেছি যে আমি তোমায়
( লেখিকা_অনামিকা_তাহসিন_রোজা )
( গানের লেখা আমার তৈরি করা। কোনো ভুল ত্রুটি হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গানের সুর কপি করা হলেও লেখাগুলা আমার তৈরি )🤧💝
চলবে......................
⚠️বি:দ্র: প্রিয় পাঠকগণ, আমি খুব একটা গাইতে পারি না।🤧 তবে এই গানের অরিজিনাল ভার্সন ( Dil by Shreya ghosal) টা আমার খুবই ভালো লাগে।🥰অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল এটার বাংলা তৈরি করা।😅 তাই নিজের ভাষায় নিজের মতো করে এটির বাংলা ভার্সন তৈরি করলাম😐। মনে যা আসছে তাই লিখেছি😶। এরপর আবার নিজেই খালি গলায় গেয়ে নিলাম। 😬 আমার কাকফাঁটা কন্ঠ শুনে কেউ ভয় পাবেন না প্লিজ।🙂🤧👀 আমি দুঃখিত আপনাদের এমন জঘন্য একটা সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য😕। কেউ আবার আমারে বয়কট কইরেন না।🤧 রিচেইক দেওয়া হয়নি। ভুলগুলো ধরিয়ে দেবেন।😊💝👀
( #লেখিকা_অনামিকা_তাহসিন_রোজা )