#তোর_ছোঁয়ায়_ফাগুন
#পর্ব_২২
#লেখিকা_অনামিকা_তাহসিন_রোজা
"আমি তোমাকে কিছু জিজ্ঞেস করেছি রামিসা!"
হিমেলের অগ্নিঝরা কন্ঠে ঘাবড়ে যায় রামিসা।
ওই সময় হিমেল কোনো কথাবার্তা ছাড়াই রামিসার ঘরে হুড়মুড় করে ঢুকে যায়। হিমেলকে এভাবে আসতে দেখে রামিসা বলে ওঠে,
"আশ্চর্য! আপনি তো বড় অদ্ভুত মানুষ! একটা মেয়ের ঘরে নক করে ঢুকতে হয়! জানেন না ! তাওহআপনি আমার রুমে ঢুকেছেন! সাহস তো কম না!"
এসব কথাকে পাত্তা না দিয়ে হিমেল শুধুমাত্র জিজ্ঞেস করে,
"তুমি! তুমি রাজীব কে চেনো?"
এই একটা প্রশ্নেই রামিসার বুকটা ধক করে উঠে।
হিমেল আবারো দ্বিতীয়বারের মতো ধমকে বলে,
" তোমাকে আমি কিছু জিজ্ঞেস করেছি রামিসা! Answer me! Damn it! ওর সাথে তোমার সম্পর্ক কী?"
রামিসা খুব ভালো করে জানে যে হিমেল যদি কিছু জানতে পারে তাহলে আয়ানও জেনে যাবে। নিজের বড় ভাইয়ের ভয়ে সে একটু গুটিয়ে গেল। এরপরে সাহস নিয়ে কাঁপাকাঁপা কন্ঠে বলল,
"আ..আপনি আগে ব..বলুন আমার ফোন কেন আপনি ধরেছেন? বিনা অনুমতিতে অন্যের ফোন ধরতে হয় না, আপনি জানেন না?"
হিমেল যেন পাত্তাই দিল না তার সেই উপদেশ। আবারো
বলল,
" আমি তোমাকে আর একবার জিজ্ঞেস করবো! এরপর যদি আশানুরূপ উত্তর না পাই,তাহলে এই মুহূর্তে আমি আয়ান কে কল করব!"
হিমেলের রাগ সম্পর্কে রামিসা খুব ভালো করেই জানে! এই লোক তার ভাইয়ের মতোই রাগী! সবসময় চিল মুডে থাকলেও যখন রেগে যায় তখন তার ভাইয়ের রাগকেও ছাড়িয়ে যায়! হিমেল কে দেখে যতটা শান্তশিষ্ট মনে হয় তার থেকেও সে বেশি রাগী! রামিসা এটা জানে। তাই হিমেল কে সত্যিটা বলার সিদ্ধান্ত নিলো সে।
একটু কাঁপা কন্ঠে বলে উঠলো,
" রাজীব আমার বয়ফ্রেন্ড! ভালোবাসি ওকে!"
রামিসার বলতে দেরি, হিমেলের ফোন আছাড় মারতে দেরি হয় না! হিমেল মেঝেতে এক আছাড় মারল হাতে থাকা রামিসার ফোনটি!গুড়িয়ে ভেঙে গেল রামিসার শখের ফোন!এই ফোনটা সে এসএসসির পর অনেক কান্নাকাটি করে আয়ানের কাছ থেকে নিয়েছিল! অনেক শখের ফোন ছিলো এটা! জলে টইটুম্বুর চোখ নিয়ে সে হিমেলের দিকে তাকিয়ে বলল,
"এটা আপনি কী করলেন?"
হিমেল আবারও আগের মত রামিসাকে পাত্তা না দিয়ে তার তর্জনী আঙ্গুল উঁচু করে বলল,
" রাজিবের সাথে যেন আর কখনো কথা বলতে না দেখি! I swear, এর পরে এই ফোনের জায়গায় তুমি থাকবে! First and last warning for you !!!"
বলেই চলে যেতে চাইল হিমেল। কিন্তু ফোনটা আছাড় মেরে ভেঙে ফেলা এবং রাজিবের সাথে কথা বলতে বারণ করার ক্ষোভে রামিসা চোখ মুছে চেঁতে বলে উঠলো,
" আপনার কী সমস্যা? আমি আমার বয়ফ্রেন্ডের সাথে কথা বলবো! যা খুশি তাই করবো! আপনি কে বলার! আর আমি কার সাথে কথা বলবো, কার সাথে কথা বলবো না, তা কি আপনার কাছে শিখে নিতে হবে?"
এতক্ষণে নিয়ন্ত্রণে রাখা রাগটা হিমেলের এবার মাথা পর্যন্ত চলে গেল! ফট করে রামিসার কাছে এসে তার হাত চেপে ধরতে গিয়েও ধরল না! চোখ বন্ধ করে একটু শ্বাস ফেলে দাঁত চেপে চেপে বলল ,
" রাজিবের সাথে তুমি কথা বলবে না, তার মানে বলবে না! আমি বলেছি এই কারণে বলবে না! কারণটা আমি তোমায় বলতে বাধ্য নই।এরপর যদি একটা শব্দ উচ্চারণ করেছো ,তাহলে আমি আয়ান কে সব বলে দেবো!"
_________________________
রেস্টুরেন্টে ডিনারের পর আয়ান আর আদ্রিকা যখন গাড়িতে করে Napa Valley-এর পথে রওনা দেয়, তখন রাত গভীর হতে শুরু করেছে। চারদিকে অন্ধকার, কিন্তু সেই অন্ধকারের মাঝেও এক ধরনের মায়া, এক ধরনের রহস্যময়তা যেন ছড়িয়ে আছে।
যতই তারা Napa Valley-এর দিকে এগিয়ে যায়, ততই রাস্তার দু'পাশের আঙ্গুরের বাগানগুলো যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। গাড়ির জানালা দিয়ে আদ্রিকা বাইরে তাকিয়ে থাকে, দেখছে আঙ্গুরের সারি সারি গাছ, যাদের পাতায় জ্বলজ্বল করছে চাঁদের মায়াবী আলো। আয়ানের চোখে তখন এক ধরনের শান্তি, সে গাড়ি চালাতে চালাতে মাঝে মাঝে আদ্রিকার দিকে তাকায়, আর আদ্রিকার চোখে এক ধরনের বিস্ময় আর মুগ্ধতা দেখে। এই প্রথম আদ্রিকা কে সাথে নিয়ে ঘুরার সুযোগ পেয়েছে আয়ান! বিশেষ কিছু মুহুর্ত না জমালে সবই বৃথা!
Napa Valley-তে পৌঁছে তারা গাড়ি থেকে নামে, আর সঙ্গে সঙ্গে এক ধরনের শীতল বাতাস তাদের গায়ে লাগে। চারদিকে শুধু নিস্তব্ধতা, গাছের পাতার মৃদু সোঁ সোঁ আওয়াজ আর দূরের পাহাড়ের ছায়া। আকাশে অগণিত তারা, যাদের আলো মাটিতে ছড়িয়ে পড়ছে, পুরো ভ্যালি যেন এক স্বপ্নের জগতে পরিণত হয়েছে।
পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে তারা আঙ্গুরের বাগানের দিকে এগিয়ে যায়। বাতাসে আঙ্গুরের মিষ্টি গন্ধ ভাসছে, আর দূর থেকে কোনো পাখির ডানা ঝাপটার শব্দ মাঝে মাঝে ভেসে আসছে। আদ্রিকা সেই পরিবেশে মুগ্ধ হয়ে যায়, তার মনে হয় যেন তারা দুজনই এই বিশাল প্রকৃতির মাঝে একা, শুধু একে অপরের জন্যই এই রাত, এই পরিবেশ তৈরি হয়েছে।
আদ্রিকা উৎফুল্লে বলে উঠে,
"কত সুন্দর এই জায়গাটা!!! আপনি আগে এসেছিলেন এখানে!"
আয়ান বলল,
"না , আগে কখনো আসিনি। তবে যখন এ দেশে পড়াশোনা করতাম, তখন বন্ধুদের কাছে শুনেছিলাম জায়াগাটা অনেক সুন্দর! তাই তোমায় নিয়ে এলাম।"
এই রাত্রির গভীরতা, সেই নিস্তব্ধতার মাঝে তাদের হালকা কথোপকথন, সব মিলিয়ে Napa Valley যেন এক জীবন্ত স্বপ্ন, যেখানে প্রকৃতি আর তাদের ভালোবাসা একাকার হয়ে গেছে।
আয়ান আলতো করে আদ্রিকার হাতটা ধরে হাঁটতে লাগলো, যেন এই মুহূর্তে তার চেয়ে মূল্যবান কিছুই নেই। পাহাড়ের উপরে উঠে তারা দূরের পাহাড়ি উপত্যকার দিকে তাকিয়ে রইল, যেখানে সবুজের মাঝে ঝলমলে ছোট ছোট ঘরবাড়ি দেখা যাচ্ছে। চারপাশে নীরব প্রকৃতি, গাছপালা, আর মৃদু বাতাস তাদের সঙ্গ দিচ্ছে। আদ্রিকার হাতের কোমল স্পর্শ আয়ানের মনে যেন অদ্ভুত এক প্রশান্তি এনে দিচ্ছে। এই নীরবতা তাদের মনের অনুভূতিগুলোকে আরও গভীর করে তুলেছে, যেখানে কোনও কথা না বলেও তাদের মধ্যে এক গভীর বোঝাপড়া গড়ে উঠেছে। পাখিদের মৃদু গান আর নদীর কলকল ধ্বনি যেন তাদের এই মুহূর্তের সঙ্গীত হয়ে উঠেছে। এই নীরবতার মাঝে তারা একে অপরের হৃদস্পন্দন শুনতে পাচ্ছে, যেন পৃথিবীর সমস্ত সৌন্দর্য এই মুহূর্তে এসে মিশেছে তাদের মাঝে। থাক না এরকম কিছু নীরবতা! যার মাধ্যমে এক অদৃশ্য ভালো লাগার অনুভূতি পাওয়া যায়! জীবনের অধ্যায়ে নীরবতার এই মুহূর্তও সোনালী অক্ষরে গাঁথা থাকুক!
আদ্রিকা হঠাৎ থেমে আয়ানের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলল,
"এই মুহূর্তটা আমি কখনো ভুলব না। আপনাকে অনেক ধন্যবাদ, আমাকে আজকের এই সুন্দর মুহূর্ত টা উপহার দেয়ার জন্য। অনেক ধন্যবাদ!"
আয়ান আদ্রিকার চোখে চোখ রেখে একটু মুগ্ধতার সাথে বলল,
"তুমি জানো, এই মুহূর্তটা আমার কাছেও চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তবে ধন্যবাদ দেওয়ার মতো কিছু করিনি আমি। বরং, তোমার উপস্থিতিতেই এই মুহূর্তটা এত সুন্দর হয়ে উঠেছে। তুমি পাশে আছো বলেই সময়গুলো এমন মধুর, এমন অর্থপূর্ণ। আমার জীবন তোমার সঙ্গেই পরিপূর্ণতা পেয়েছে, আর এই ক্ষণগুলো তুমি আমাকে উপহার দিচ্ছ প্রতিটি নিঃশ্বাসে। ধন্যবাদ যদি দিতে হয়, তবে সেটা তোমাকেই দেব—আমাকে এই অমূল্য সময়ের অংশ করে তোলার জন্য।"
আদ্রিকা মুগ্ধ হয়ে শুনল আয়ানের মুখনিশ্রিত কথাগুলো!
চাঁদের রুপালি আলোয় লেকের জল যেন রূপার মতো ঝলমল করছে, আর সেই আলো আদ্রিকার চুলে পড়ে তার সৌন্দর্যকে যেন আরও দ্বিগুণ করে তুলেছে। আয়ান মুগ্ধ দৃষ্টিতে আদ্রিকার দিকে তাকিয়ে রইলো, তার চোখে যেন অজস্র ভালোবাসার কথা লেখা আছে, যা বলার ভাষা হয়তো তার নেই।
আদ্রিকা একটু লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে বলল,
"আপনি এমন করে তাকিয়ে আছেন কেন?"
আয়ান হাসি দিয়ে বলল,
"তোমার সৌন্দর্য আমার চোখকে আর অন্য কোথাও তাকাতে দিচ্ছে না। এইযে এতো সুন্দর প্রকৃতিও তোমায় দেখে হিংসা করবে। "
আদ্রিকার ঠোঁটে লাজুক হাসি ফুটে উঠল, আর সেই হাসিতে আয়ানের হৃদয় ভরে গেল আনন্দে।
পাহাড়ি পথ ধরে তারা হাত ধরে হাঁটতে লাগলো, পায়ের নিচে পড়া শুকনো পাতা মৃদু খসখস শব্দ তুলছে। বাতাসে হালকা শীতলতা, কিন্তু আয়ানের হাতের উষ্ণতা যেন আদ্রিকার হৃদয়ে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগিয়ে তুলছে। পাখিদের মিষ্টি সুর, পাখিরা যেন তাদের ভালোবাসার গান গাইছে, আর সূর্যাস্তের আলোর রেশ তাদের চারপাশে একটি সোনালি মায়াজাল ছড়িয়ে দিচ্ছে।
একটি উঁচু পাহাড়ি জায়গায় এসে তারা দাঁড়ালো, যেখানে দাঁড়িয়ে চারপাশের পুরো প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য চোখে পড়ে। দূরের পাহাড়ের ঢালে ঘন সবুজ বন আর সেই বনের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা একটি ছোট নদী দেখা যাচ্ছে। নদীর ধারের গাছগুলোতে পাখিরা ঝাঁক বেঁধে উড়ছে, আর সেই দৃশ্য দেখে আদ্রিকা বলে উঠলো,
"এতো সুন্দর! এটা যেন কোনো গল্পের বইয়ের দৃশ্য!"
আয়ান মৃদু হেসে বলল,
"হয়তো আমাদের গল্পেরই কোনো এক অধ্যায়।"
আকাশের নীলাভ সৌন্দর্যের এই প্রকৃতির মাঝেই তাদের হৃদয়ে এক নিঃশব্দ প্রতিজ্ঞা জন্ম নিল, তারা চিরকাল এইভাবে একে অপরের পাশে থাকবে, যেভাবে এই পাহাড়, নদী আর প্রকৃতি চিরকাল অটুট থাকবে।
__________________________________
রামিসা গত ১ ঘন্টা ধরে 'থ' মেরে বসে আছে। সে যে রিলেশনে আছে, সেটা আজ পর্যন্ত কেউ জানে না। এমনকি সে তার প্রাণের বান্ধবী, তার বেস্ট ফ্রেন্ড কেউ বলে নি। রাজিবর সাথে তার সম্পর্ক গত এক বছর ধরে। কলেজে ওঠার পর রাজিব প্রথমে রামিসাকে প্রপোজ করেছিল। প্রথমে রিজেক্ট করলেও পরবর্তীতে আর পারেনি। এভাবেই সে দিনে দিনে রাজিবের প্রতি আরো বেশি দুর্বল হয়ে গিয়েছিল। ফলস্বরূপ সৃষ্টি হয়েছিল ভালোবাসা!!! আজ পর্যন্ত সে কাউকে এ কথা বলে নি। গোপনেই তারা একে অপরের সাথে সময় কাটিয়েছে, দিনরাত কথা বলেছে। রামিস এখন এটাই বুঝতে পারছে না যে, সে এখন কি করবে! সে ভাবতেই পারিনি যে সে এইভাবে ধরা পড়ে যাবে! তাও আবার তার জাত শত্রু হিমেল এর কাছে! সমস্যা এটা না যে হিমেল জানতে পেরে গেছে! আসল সমস্যাটা হচ্ছে এখন আয়ানও জেনে যেতে পারে, যেটা এখন রামিসার জন্য খুবই বিপজ্জনক! রামিসা টেনশনে সারা ঘর পায়চারি করছে আর নখ কামড়াচ্ছে! কিভাবে কি করবে কিছু বুঝতে পারছে না। তখন তো রাগের মাথায়, ভয় পেয়ে হিমেলকে বলে দিল যে, রাজিব তার বয়ফ্রেন্ড! কিন্তু এখন কি হবে? পায়চারি করতে করতে হঠাৎ থেমে গিয়ে সে মনে মনে ভাবলো,
" রাজিবের নাম উনি কিভাবে জানলেন? আমি তো ওর নাম্বার নাম দিয়ে সেভ করে রাখিনি! আবার রাজিবের সাথে আমাকে কথা বলতে বারণ করেছেন! তাহলে রাজিব কে উনি চিনে! আর উনি যদি রাজীবকে চিনেও থাকে তাহলে আমাকে বারণ করলো কেন এভাবে?"
পরবর্তীতে এই চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলল রামিসা, মনে মনে ভাবল,
" বারণ তো করবেই! আমার ভালো থাকাটা তো সহ্য হবে না! যত্তসব চিকার বাপ কোথাকার!"
এরপরে সে মেঝেতে পড়ে থাকা গুড়িয়ে যাওয়া ফোনের দিকে কাতর হয়ে তাকালো। কত শখের ফোন ছিল সেটা! আর ঐ হা'রা'মিটা ভেঙ্গে দিলো!"
মন খারাপ করে বিছানায় শুয়ে পড়ল রামিসা।এখন একটা ঘুম দরকার! না হলে খুব খারাপ লাগবে! মনে মনে সে এও সিদ্ধান্ত নিল যে, "উনাকে আটকাতে হবে! নাহলে ভাইয়া জেনে যাবে!"
চলবে..................
⭕Note: 🥰☺ পাঠকগণ, আপনাদের জন্য একটা বিশেষ চমক নিয়ে আসতে চলেছি। তবে চমকটা একটু ভিন্ন!আগামী পর্বেই চলে আসবে। কিন্তু সেটা আপনাদের পছন্দ হবে কিনা জানিনা!🤧 আগে থেকেই জানিয়ে রাখলাম👀 আর এই কারনে কাল নতুন পর্ব নাও আসতে পারে।💝 পরশু দিন ইনশাআল্লাহ্ নতুন পর্ব আসবে😊সবার আগে নতুন পর্ব পেতে আমার পেজে চোখ রাখুন 🥰
Anamika Tahsin Roza - অনামিকা তাহসিন রোজা