#তোর_ছোঁয়ায়_ফাগুন
#পর্ব_২৯
#লেখিকা_অনামিকা_তাহসিন_রোজা
হিমেলের চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরচ্ছে! রামিসা খুব তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে পড়ে! রাজিব তো একঘুষি খেয়েই ভয়ে সিটকে গেছে! বাকি ছেলেগুলো হিমেলের মুখোমুখি হতে চাইলো না! একেকটা তাড়াহুড়ো করে গাড়ি থেকে নেমে পালিয়ে গেলো! হিমেলও আটকালোনা! তার তো দরকার রাঘব বোয়াল কে! এসব পুঁটি মাছ দিয়ে তার কাজ নেই!
প্রথম আঘাত হিমেলই করে। সে ক্ষিপ্ত স্বরে বলে উঠে,
" কু*ত্তা*র বা*চ্চা!" বলেই আঘাত করে রাজিবকে! তার শক্ত মুষ্টি রাজিবের চোয়ালে আঘাত করে। রাজিব হোঁচট খেয়ে পেছনে সরে যায়, কিন্তু তৎক্ষণাৎ ফিরে এসে পাল্টা আঘাত করতে চেষ্টা করে। কিন্তু হিমেল ছিলো প্রস্তুত। সে চটজলদি সরে গিয়ে রাজিবের হাত ধরে টেনে তাকে মাটিতে ছুঁড়ে মারে। রামিসা ভয়ে পুরো গুটিসুটি হয়ে গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে হিমেলের মারপিট দেখচ্ছে! কিন্তু তার মনে অন্য এক প্রশ্ন উঁকি দেয়। হিমেল এখানে আসলো কীভাবে? উনি কীভাবে জানলো যে আমি এখানে আছি? উনি কি আমাকে বাঁচাতে এসেছেন?
দু'জনের মধ্যে তখন তীব্র লড়াই শুরু হয়। রাজিব বারবার চেষ্টা করে হিমেলকে পরাজিত করতে, কিন্তু প্রতিবারই হিমেল আরও শক্ত হয়ে তার সামনে দাঁড়ায়। তারা একে অপরকে আঘাত করে, মাটিতে গড়াগড়ি খায়, একে অপরকে চেপে ধরে রাখে। একেরপর এক আক্রমনে রাজিব পেরে উঠতে না পেরে হঠাৎ পকেট থেকে ছুরি বের করে। রামিসা ছুরি দেখে আরো ভয় পেয়ে যায়! রাজিব ছুরিটা হিমেলের দিকে ছুঁড়ে দেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু হিমেল তো কাঁচা খেলোয়াড় নয়! সে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখায়, রাজিবের হাত ধরে ছুরিটা কেড়ে নিয়ে দূরে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। কিন্তু ছুরির ধারালো অংশ তার হাতের তালুতে লেগে কেটে যায়! ঝরঝর করে রক্ত ঝরতে থাকে হিমেলের হাত দিয়ে! হিমেলকে আঘাত পেতে দেখে রামিসা ভয়ে হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে ফুঁপিয়ে উঠে! হিমেল নিজের ক্ষত অনুভব করলেও তা পাত্তা না দিয়ে তার সমস্ত শক্তি দিয়ে রাজিবের মুখে আরেকটা শক্তিশালী লাথি মারে, যা রাজিবকে মাটিতে পড়ে যেতে বাধ্য করে।
রাজিবের মুখে তখন রক্তের বন্যা বয়ে যাচ্ছে, সে নড়াচড়া করতে পারছে না। তবুও হিমেল থামে না। সে আবারো রাজিবকে উঠিয়ে এলোপাথাড়ি ঘুষি মারতে থাকে আর চেঁচিয়ে বলতে থাকে,
" কা'পু'রু'ষ! অ'মানুষের বা'চ্চা! তোর সাহস কী করে হয় ওর গায়ে হাত দেয়ার? জা'নো'য়া'রের বাচ্চা! জান নিয়ে নিবো আমি তোর!!"
রাজিবের মুখ থেকে গলগল করে রক্ত পড়চ্ছে। তবুও হিমেল তাকে মেরেই যাচ্ছে। অবস্থা বেগতিক দেখে রামিসা দ্রুত গতিতে ছুটে আসলো তাদের দিকে। হিমেলের বাহু ধরে তাকে থামানোর চেষ্টা করতে থাকলো আর ফুঁপিয়ে বলতে থাকলো,
" থামুন! কী করচ্ছেন আপনি ?? ও তো ম'রে যাবে! আল্লাহ্ র দোহাই লাগে থামুন প্লিজ। ম'রে যাবে ও !!!"
রামিসার জোরাজোরিতে হিমেল থেমে যায়। রাজিব জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়ে মাটিতে! হিমেল রাগে ফোসফোস করতে করতে অগ্নিচোখে রামিসার দিকে তাকায়! তার এই ভয়াবহ চোখ দেখে রামিসার সারা শরীর ভয়ে ঠান্ডা হয়ে আসে! এই লোক কি এখন তাকেও মা'রবে নাকি! রামিসা একটা শুকনো ঢোক গিলল। অশ্রুভেজা চোখে ধীরে ধীরে কিছু বলতে নিলে হিমেল এক হাত উঠিয়ে তাকে থামিয়ে দেয়!
“কী ভেবেছিলিস তুই ?” হিমেলের ঠান্ডা কণ্ঠ, কিন্তু সেখানে রাগ নিয়ন্ত্রণের তীব্র প্রয়াস স্পষ্ট! হিমেল রীতিমতো "তুই তোকারি" করে কথা বলল রামিসার সথে!
রামিসা ঢোক গিলে মাথা নিচু করে চুপ রইলো। লোকটার মাথায় আগুন জ্বলচ্ছে!
তার এই নীরবতা আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করলো!
রাগ নিয়ন্ত্রন করতে না পেরে হিমেল হুংকার দিয়ে একনাগাড়ে বলতে থাকলো,
"চুপ করে আছিস কেনো হ্যাঁ?? কী ভেবেছিলি টা কী তুই? মাথায় কি ঘিলু নেই তোর! গোবর আছে মাথায়? নিজেকে কী মনে করিস ? শুধু কি সারাদিন তোতা পাখির ছানার মতো বকবক করতেই জানিস?? কথা বলার সময় মুখ তো বেশ ভালো চলে! কাজের সময় মাথা চলেনা??এইভাবে কোনো কিছু না বুঝেই তুই এই কু'কু'র'টার সাথে চলে এলি? একবারও ভাবলি না যে সে কী করতে পারে? মাথায় এটুকু কমনসেন্স নেই তোর ইডিয়েট!!!!”
রামিসা হিমেলের একেকটা হুংকারে শুধু কেঁপে উঠচ্ছে। তার চোখে অনুশোচনার ছাপ। হ্যাঁ সত্যিই সে একটা নির্বোধ! রামিসা চুপচাপ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে আর ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে।
প্রবল ক্রোধ নিয়ে হিমেল এইবার রামিসার বাহু চেপে ঝাঁকাতে থাকে আর দাঁত চেপে বলতে থাকে,
" এই! এই মেয়ে! এদিকে তাকা তুই! লুক এট মি ননসেন্স! মানা করেছিলাম না তোকে আমি ! আমি তোকে মানা করিনি? বলি নি যে ওর সাথে আর কথা বলবি না? আমাকে তোর জোকার মনে হয় হ্যাঁ?এইইই!!! আমার কি খেয়ে দেয়ে কাজ নেই যে আমি তোকে হুদাই একজনের সাথে কথা বলতে বারণ করব? কিন্তু যেহেতু আমি তোকে বারণ করেছি। তাহলে নিশ্চয়ই কোনো কারণেই করেছি! সেটা তোর এই গোবড়পোড়া মাথায় আসেনি তোর?বল!!!!!!!!"
রামিসা এইবার ভেজা চোখে তাকালো হিমেলের দিকে। হিমেল তার করুণ চাউনী পাত্তা না দিয়ে একটু নিঃস্বাস নিয়ে আবারো বলল,
"তুমি জানো না এই মুহূর্তে কী ঘটতে পারতো? আমি সময়মতো না পৌঁছালে কী হতো? কী হতো এখানে?? এইই ভাবতে পারচ্ছো তুমি? কে বাঁচাতো তোমায়? কী হতো এরপর? কোথায় যেতে তুমি? আঙ্কেল, আন্টি, আয়ানকে মুখ দেখাতে কী করে তুমি? বেঁচে থাকতে কী করে তুমি????? একবারো ভেবে.............."
আর বলতে পারলো না হিমেল। রামিসা ঝাঁপিয়ে পড়লো হিমেলের বুকে!! আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করলো! হিমেলও অবাক হয়ে গেলো! এতক্ষণের রাগ ক্ষোভটা অদ্ভুত অনুভূতি তে পরিণত হলো! মানুষ নিজের খারাপ ও দুঃখের মুহূর্তে নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষ টাকে পেলে ভেতরে থাকা সব কষ্ট উগলে দেয়! এই মুহুর্তে রামিসা তার কাছে সেই সবচেয়ে কাছের ও ভরসার মানুষটা হিসেবে হিমেল ছাড়া কাউকে খুঁজে পেল না! বাচ্চাদের মতো করে হিমেলের বুকে মাথা রেখে দুই হাতে জড়িয়ে কাঁদতে থাকলো! দুই হাতে খাঁমচে ধরলো হিমেলের পিঠের কাছের টি-শার্ট! হিমেলের প্রশস্ত বুকে মাথা রেখেই হেঁচকি তুলতে তুলতে বলল,
" বলবেন না! দোহাই লাগে আপনার! আর কিছু বলিয়েন না! আমি বুঝতে পারিনি! আমাকে মা'রবেন না প্লিজ! আমি সত্যিই খুব নির্বোধ! ভুল হয়ে গেছে আমার! আমায় প্লিজ আপনার সাথে নিয়ে চলুন! আমার খুব ভয় করচ্ছে! আমি আপনার সাথে যাবো।"
নিষ্পাপ সরল আবেদন! কিন্তু রামিসার এ সরল আবেদন হিমেলের রাগে প্রভাব ফিলল কিনা বোঝা গেল না! সে আগের মতোই ঠায় দাঁড়িয়ে আছে! আর ভ্রু কুচকে তাকিয়ে রয়েছে তার বুকে গুঁটিসুটি করে পড়ে থাকা রামিসার দিকে! মেয়েটা ভাবছে সে তাকে মারবে?একটু পরে হিমেল শান্ত ও ঠান্ডা স্বরে আবারো বলে উঠলো,
" তুমি যা করেছো, সেটা শুধু নিজের জন্য না, তোমার পরিবারের জন্যও ভয়ঙ্কর ছিলো, সেটা বুঝতে পারচ্ছো তুমি?"
রামিসা এখনো হিমেলের বুকেই পড়ে আছে। সে তো আর হুঁশে নেই! নাহলে কি আর তাকে পটলের নানি বলা চিকার বাপের বুকে এভাবে আশ্রয় নিতো! একটু পরে রামিসা বলে উঠে,
" আমি তো ওকে সত্যিই ভালোবেসেছিলাম!"
ব্যাস! এতক্ষণের গলে যাওয়া রাগটা আবারো স্ফুলিঙ্গের ন্যায় জ্বলে উঠলো হিমেলের মাথায়! সে এক ঝঁটকায় রামিসাকে বুক থেকে সরায়। এরপর টানতে টানতে তাকে নিজের গাড়ির কাছে নিয়ে আসে! তার চোখে ক্রোধের ছায়া, আর মুখের ভঙ্গিতে তীব্রতার ছাপ। রামিসাকে তার পাশে বসিয়ে গাড়ির দরজা বন্ধ করার সাথে সাথে, সে রেগে গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট করে। গাড়ির গতি দ্রুত বেড়ে যায়, আর গাড়ির সাসপেনশন কঠিনভাবে ঝাঁকুনি খেতে থাকে।
“ ভালোবাসা !!!! Go to the hell with your f*u*c*k*i*n*g love! আয়ান যদি জানতে পারে তাহলে তোকে জীবন্তই কবর দিয়ে দেবে রে ইডিয়েট! তুই দাঁড়া! তোকে আগে তোর ভাইয়ের হাতে তুলে দিই! তারপর বুঝবি মজা !”
হিমেল গর্জন করে বলে, গাড়ির স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে। তার হাত শক্তভাবে স্টিয়ারিংয়ে ধরা, এবং তার পা প্যাডেলে জোরালোভাবে চাপ দিচ্ছে। রামিসার এতক্ষণে হিমেলের হাতের দিকে চোখ গেলো! পুরো হাতটা র'ক্তা'ক্ত হয়ে আছে! নিশ্চয়ই লোকটার য'ন্ত্র'ণা করচ্ছে! তাও কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই!
রামিসার শরীর কাঁপছে। সে জানে যে হিমেলের রাগ এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। গাড়ির গতি এত দ্রুত যে রাস্তার ধারে গাছ আর বিলবোর্ডগুলো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। রামিসা ভয় আর আতঙ্কে কুঁকড়ে বসে আছে, তার হৃদস্পন্দন দ্রুতগতিতে চলছে। রামিসা তার সিটবেল্ট শক্ত করে ধরে আছে, তার শ্বাস নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিটি ঘূর্ণন আর গতি বৃদ্ধির সাথে তার ভয় আরও বাড়ছে।
গাড়ির এক কোণে হিমেল দ্রুতগতিতে চালাচ্ছে, যখন তার মনের মধ্যে সমস্ত হতাশা আর রাগ জমে আছে। রামিসার মনেও দুঃস্বপ্নের মতো সেই মুহূর্তগুলো ভাসছে। তবে কিছুক্ষণ পর, ধীরে ধীরে হিমেল তার গতি কমাতে শুরু করে, রাগের ঝড় কিছুটা শান্ত হয়। গাড়ির গতি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়, কিন্তু রামিসা তখনও ভয়ে কাঁপছে, তার চোখে অনুতাপের ছায়া। হঠাৎ হিমেল তার পকেট থেকে ফোন বের করে একবার সিঁটিয়ে থাকা রামিসার দিকে তাকিয়ে আয়ানের নাম্বারে কল দিলো! রামিসা ভয়ে ঢোক গিলল! কী যে হবে কে জানে!
চলবে................
\\\রামিসার জন্য সবাই দোয়া করবেন🤧\\\