#তোর_ছোঁয়ায়_ফাগুন
#পর্ব_২৮
#লেখিকা_অনামিকা_তাহসিন_রোজা
সকালের নরম আলো আস্তে আস্তে ঘরটাকে আলোকিত করছে। জানালার পর্দা দিয়ে রোদের কিরণ ঠিকরে পড়ছে ভেতরে। বাতাসে এক ধরনের স্নিগ্ধতা মিশে আছে, যেনো প্রকৃতি নিজেই কোনো সুরের মূর্ছনা বাজাচ্ছে। চারপাশে পাখির কিচিরমিচির শব্দ, যা শুনে মন ভরে যায়। বাইরের বাগানে শিশিরে ভেজা ঘাসগুলো ঝকঝক করছে, আর ছোট ছোট ফুলের গাছগুলো যেনো আনন্দে নুয়ে পড়ছে। এ সকালের মিষ্টি অনুভূতিতে, মনে হয় যেন সব কিছু নতুন করে শুরু হচ্ছে। হালকা কুয়াশার আস্তরণটা ধীরে ধীরে সরছে, আর তার মাঝে প্রকৃতি তার অপার সৌন্দর্য উন্মোচন করছে।
আদ্রিকার চোখের পাতাগুলো একটু একটু করে কেঁপে ওঠে, যেন কোনো সোনালি স্বপ্ন থেকে জাগছে। সে একবার চোখ খুলে আবার বন্ধ করে। নরম বালিশে মুখটা ঘষে একটু আরাম করে নেয়। পাশেই আয়ান, যার মুখে এখনও অর্ধেক ঘুমের ছাপ লেগে আছে। তার চোখের পাতা ধীরে ধীরে কেঁপে উঠছে, যেন সে জানে যে সকালে কিছু মিষ্টি অপেক্ষা করছে।
আদ্রিকা চোখ খুলে আয়ানকে দেখে মৃদু হাসে। তার ঘন চুলগুলো আলতো করে আয়ানের মুখে পড়ছে। আয়ান হালকা আলসেমি নিয়ে চোখ মেলে তাকায়, এবং আদ্রিকার চোখে চোখ রেখে তারও ঠোঁটে এক টুকরো হাসি খেলে যায়।
মিষ্টি হেসে বলে,
"Good morning bou"
তাদের এই ছোট্ট মুহূর্তটি যেন সকালের এই মিষ্টি পরিবেশের সঙ্গে এক হয়ে গেছে। দুজনের মাঝের এই শান্ত, মধুর অনুভূতিটা যেন আর একটু সময় ধরে ধরে রাখতে চায়, ঠিক যেমন সকালের প্রথম রোদ ধীরে ধীরে গায়ে মেখে যায়।
আদ্রিকা আলতো করে বিছানা থেকে উঠতে গেলে আয়ান তার হাতটা ধরে একটু টেনে কাছে নিয়ে আসে। আদ্রিকা অবাক হয়ে আয়ানের দিকে তাকায়, আর তার মুখে লজ্জার এক টুকরো হাসি খেলে যায়। আয়ান তার হাতের আঙুল গুলো আদ্রিকার আঙুলে জড়িয়ে ধরে। দুজনের হাতের স্পর্শে যেন নতুন এক উষ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে।
আদ্রিকার চুলের কয়েকটা গোছা তার মুখের ওপর এসে পড়েছে। আয়ান নীরবে সেই চুলগুলো সরিয়ে দেয়, আদ্রিকার চোখের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে থাকে। আদ্রিকা তার চোখের ভাষা বুঝতে পারে, তার মনের গভীরে এক ধরনের স্নেহ আর ভালোবাসার ঢেউ বয়ে যায়।
আয়ান আলতো করে আদ্রিকার গালে স্পর্শ করে, আর তার ঠোঁটের ঠিক কোনায় এক মিষ্টি চুমু এঁকে দিয়ে বলে,
"আমার জীবনের প্রতিটি সকাল এমন তুমিময় হোক!"
আদ্রিকা লজ্জায় একটু সরে যায়, কিন্তু আয়ান হাত ছাড়ে না। তাই সে আয়ানের বুকে মাথা রাখে, যেন এই ছোট্ট মিষ্টি মুহূর্তটি চিরদিনের জন্য ধরে রাখতে চায়।
আয়ানও তার হাতের আলিঙ্গন একটু শক্ত করে ধরে, যেন এই ভালোবাসার মধুর মুহূর্ত থেকে তারা কখনও বিচ্ছিন্ন না হয়। নীরবতার মাঝে, দুজনের হৃদয় কথা বলে। ঘরের বাইরে পাখির কিচিরমিচির ধ্বনি, আর নরম রোদের আলো যেন তাদের এই ভালোবাসার মুহূর্তকে আরও সুন্দর করে তুলেছে।
_________________________
বেলা গড়ালে আদ্রিকা দুপুরের রান্না শেষে কেবলই ঘরে এসে আলমারি গোছানো শুরু করেছে, সেই মুহূর্তে রামিসা দরজা থেকে উঁকি মেরে বলল,
"ভাবি!!! "
আদ্রিকা পেছনো ঘুরে বলল,
" হ্যাঁ রামিসা। ভেতরে এসো । কিছু বলবে?"
রামিসা ঝরে ঢুকে আদ্রিকার পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলল,
" না ভাবি তেমনকিছু না। আসলে তুমি কী করচ্ছো?"
আদ্রিকা একটু হেসে বলল,
"এইতো তোমার ভাইয়ের জামাকাপড় গুলো গুছিয়ে রাখচ্ছি।"
রামিসা ছোট করি বলল, "ওও।"
পরক্ষণেই আবার জিজ্ঞেস করলো,
" ভাবি, ভাইয়া কখন আসবে? "
আদ্রিকা মিষ্টি হেসে বলল,
"প্রতিদিন যেই সময়ে আসে সেই সময়েই।"
"না মানে রাত ১০ টার আগেই তো আসবে তাই না?"
আদ্রিকা একটু ভেবে বলল,
" কয়েকদিন আমেরিকায় থাকার কারণে অফিসে অনেক কাজ আটকে আছে রামিসা। রাত ১০ টার আগে আসতে পারবেনা।"
রামিসা আগের মতোই ছোট করে উত্তর দিলো,
"ওও।"
রামিসার হাবভাব আদ্রিকা কাছে খুব একটা ভালো ঠেকলো না। যে মেয়ে সারা বাড়ি মাতিয়ে রাখে, সেই মেয়ে এতো মনমরা হয়ে থাকে কেন এখন? মেয়েটা তো এমন চুপচাপ করে থাকে না! কেমন জানি মিইয়ে গেছে !
______________________________
রাতের গভীরতা যেন সমস্ত শহরকে একটি অদৃশ্য চাদরে ঢেকে রেখেছে। চারপাশে কোনো শব্দ নেই, শুধু হালকা বাতাসের শোঁ-শোঁ শব্দ কানে আসছে। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকা রামিসার মনে অজানা ভয়ের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। তার হৃদপিণ্ড দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছে, যেন এই নীরবতা ভেদ করে কোনো অদৃশ্য বিপদ আসছে তার দিকে। রাস্তায় থাকা স্ট্রিটলাইটের মৃদু আলোয় তার ছায়া আরও দীর্ঘ এবং বিভ্রান্তিকর মনে হচ্ছে। অন্ধকারের মধ্যে সে একা, নিঃসঙ্গ এবং ভীত; প্রতিটি মুহূর্ত তার মনে আরও বেশি আতঙ্কের সৃষ্টি করছে। মনে হচ্ছে, যেন পুরো পৃথিবীটি তার বিপক্ষে, আর সে নিজেই নিজের ছায়া থেকে পালাচ্ছে। সে কাওকে না জানিয়ে আয়ান বাড়িতে ফেরার আগেই বাড়ির পেছনের দরজা থেকে পালিয়ে এসেছে!
রামিসা যখন নিজের ভয়ের সাথে লড়াই করছে, ঠিক তখনই দূর থেকে একটা গাড়ির শব্দ শোনা যায়। নীরব রাতের মধ্যে সেই শব্দটা আরও গম্ভীর আর ভীতিকর মনে হয়। রামিসা ধীরে ধীরে মাথা তুলে তাকায়, তার চোখে আতঙ্ক আর কৌতূহলের মিশেল। গাড়ির হেডলাইটের আলো তার দিকে ধেয়ে আসে, সেই আলোতে তার মুখটা পরিষ্কার হয়ে ওঠে—ভীত, কাঁপা কাঁপা।
গাড়ি ধীরে ধীরে তার সামনে এসে থামে, আর রাজিব গাড়ির জানালা নামিয়ে তাকে দেখে। রাজিব কে দেখে কেনো জানি রামিসার ভয় আরো বাড়তে থাকলো! কেনো জানি তার মনে হলো এটা ঠিক হচ্ছে না!
রাজিব তাকে ইঙ্গিত করে গাড়িতে ওঠার, আর রামিসা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে, তার ভয়ার্ত চোখ দুটো একটু আশ্বাসের সন্ধানে রাজিবের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। রাজিব বলল,
" আরে দেরি করচ্ছো কেনো? তাড়াতাড়ি উঠে পড়ো।"
রামিসা চুপচাপ রাজিবের পাশে গাড়িতে বসে আছে, গাড়ির ভেতরটা ধীর লয়ে আঁধার হয়ে আসছে। কিছু রাস্তা যাওয়ার পর রামিসা বুঝতে পারলো এটা কোনো সাধারণ জনমানবের রাস্তা নয়। আশেপাশে কোনো আলোর রেখা নেই। রামিসা ভয়ার্ত চোখে বলি উঠলো,
"এটা কোন রাস্তা রাজিব? এটা তো একদম জনমানবশূন্য!"
রাজিব বাঁকা হেসে বলল,
" আমি শর্ট কার্ট নিয়েছি জান। Don't worry!"
রাজিবের কথা বলার ধরন রামিসার ঠিকঠাক লাগলোনা। হঠাৎ রাজিব রাস্তার একপাশে গাড়ি থামিয়ে দিল। ওই সময়ে কয়েকটা ছেলে রাজিবের গাড়িতে উঠে পড়ল। রামিসা বুঝতে পারল না কি হচ্ছে? সে রাজিবকে অবাক হয়ে বলল,
"এরা কারা রাজিব ? আমাদের গাড়িতে কেন উঠেছে?"
রাজিব ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলল,
"ভয় পেয়ো না রামিসা। এরা আমার বন্ধু। এরাও যাবে আমার সাথে।" বলে রাজিব আবার গাড়ি স্টার্ট করল।
রামিসার এবার হাত-পা ভয়ে কাঁপতে থাকলো। একদমই ঠিকঠাক লাগছিল না তার! ছেলেগুলোকে দেখতে খুব একটা ভালো মনে হয় না! কেমন কা'মু'ক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে!
হঠাৎ রাজিব গাড়ি থামিয়ে দিলো। প্রথমে রামিসা কিছু বুঝতে পারেনি, সে কাঁপা কন্ঠে বলল,
" কী হলো রাজিব? গাড়ি থামালে যে!"
ধীরে ধীরে রাজিবের মুখের ভঙ্গিমা এবং তার তীব্রতা বদলে যেতে লাগলো। রামিসার মনে অজানা আতঙ্কের ছায়া পড়তে শুরু করলো। তার হৃদস্পন্দনের গতি বাড়ছে, রাস্তার পাশের দৃশ্যগুলো ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ করেই রামিসা অনুভব করলো রাজিবসহ বাকি ছেলেগুলোর চোখের দৃষ্টিতে কিছু একটা ভয়ংকর লক্ষ্য আছে। তার সারা শরীরে এক ধরনের শীতল ভীতি ছেয়ে গেল। সে বুঝতে পারলো কিছু একটা ভয়ানক হতে চলেছে। তার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল, শরীরের প্রতিটি পেশী সংকুচিত হলো, রাজিব গাড়ির মধ্যেই রামিসার দিকে এগিয়ে গেলে রামিসা চিৎকার করে উঠলো।
গাড়ির ভেতর সেই চিৎকার প্রতিধ্বনিত হলো, কিন্তু বাইরের পৃথিবী তখন শান্ত, এক নির্জন রাস্তা ধরে তারা চলেছে। রাজিবের চোখে এখন হিংস্রতা ফুটে উঠেছে। বাকি ছেলেগুলোও হাসতে শুরু করলো। সে রামিসার মুখ চেপে ধরতে চাইলো, কিন্তু সেই সময় কেউ তৎক্ষনাত রাজিবের মাথায় জোরে এক ঘুষি মেরে রামিসার থেকে সরিয়ে নিলো। বাকি ছেলেরাও চমকে গেলো। রামিসা তার খিঁচে বন্ধ করা চোখ খুলে ফেলল। সেই মুহূর্তে গাড়ির সামনে হেডলাইটের আলোয় উদ্ভাসিত হলো এক পরিচিত অবয়ব...
সেই আগন্তুকের অবয়বের দিকে তাকিয়ে রামিসা যেনো আশার আলো খুঁজে পেলো। রামিসা বিড়বিড় করে অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, " হি..হিমেল!!!!!!!"
চলবে..................
বি:দ্র: রিচেইক দিইনি পাঠকগন 🤧