ফন্ট সাইজ:
থিম:
তোর ছোঁয়ায় ফাগুন

৩৫তম পর্ব

লেখক: অনামিকা তাহসিন রোজা

#তোর_ছোঁয়ায়_ফাগুন

#পর্ব_৩৫

#লেখিকা_অনামিকা_তাহসিন_রোজা

দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে লেপ্টে রয়েছে রামিসা, দুপাশে দুই হাত দিয়ে তার ওপর ঝুঁকে রয়েছে হিমেল! খুবই ভয়ানক এক অবস্থা! রামিসার হৃৎপিন্ড জোরে জোরে ঢোল পেটাচ্ছে! এভাবে ঝুঁকে আছেন কেনো উনি? হিমেলের চোখ দুটো লাল হয়ে রয়েছে। দেখেই বোঝা যাচ্ছে, গত দুদিন তার খুব একটা ভালো কাটেনি! আবার রামিসার করা ঘাড় ত্যাড়ামিতেও রাগ হচ্ছে!

একটু আগে,,,,,

হিমেল ধপধপ করে রামিসার ঘরের সামনে এসে জোরে জোরে দরজা ধাক্কাতে লাগলো! রামিসা প্রথমে আদ্রিকা ভেবে বলে উঠেছিল," ভাবি আমার ভালো লাগছে না এখন। পরে নাস্তা করবো।"

তবে দরজায় ধাক্কাধাক্কির আওয়াজ ক্রমশ বাড়তেই থাকলো। আর রামিসা মনে মনে ভাবলো তার ভাবি তো এত জোরে জোরে দরজা ধাক্কাবেনা! নাকি ভাবির কিছু হয়েছে। কিছুটা ভয় পেয়েই রামিসা দৌড়ে এসে দরজা খুলে দেয়। কিন্তু দরজা খোলার সাথে সাথেই তা ওপর আ'ক্র'মণ করে বসলো হিমেল! ফট করে ঘরের ভেতর ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল কিন্তু সিটকিনি লাগালো না! কারণ এখনো তো সেই অধিকার পায়নি! রামিসা অবাক হওয়ারও সুযোগ পেলো না। হিমেল এরপর রামিসাকে চেপে ধরল দেয়ালের সাথে আর র'ক্তচক্ষু নিক্ষেপ করলো।

গত দুদিন রামিসাও ঠিক মত ঘুমাতে পারেনি। চোখ বন্ধ করলেই হিমেলের চেহারা ভেসে উঠছিল। খুবই অদ্ভুত অনুভূতি! তাই হিমেলকে হঠাৎ এভাবে দেখে, সে দুর্বল হয়ে পড়ল। কিন্তু তৎক্ষণাৎ সেদিন রাতের কথা মনে পড়তেই আবার চেঁতে উঠলো। শক্ত কণ্ঠে বলে উঠলো,

" আপনি কী করচ্ছেন এসব? সকাল সকাল একটা মেয়ের ঘরে এভাবে ঢুকে যেতে ল'জ্জা করে না?"

হিমেল তবুও সেভাবেই তাকিয়ে রইল। পাত্তা দিলোনা রামিসাকে। রামিসা আবারো বলল,

"আপনি এভাবে ঘরে ঢুকেছেন! ভাবি কী ভাববে? আমার কাছ থেকে সরে দাঁড়ান। দূরে যান। না হলে কিন্তু আমি চিৎকার করে ভাবিকে ডাক দেবো।"

হিমেল বাঁকা হেসে বলল,

" চেঁচাও! ডাকো ভাবিকে।"

রামিসা জোর দিয়ে বলল,

"সত্যি সত্যি ডাকবো কিন্তু!!

একটু সময় নিয়ে হিমেল আবারো হেসে বলল,

" ভূত আমার পূ'ত

পে'ত'নি আমার ঝি

ভাবি তো আমার পাশে আছে

করবি আমার কী?"

এরকম ফালতু ছড়ায় রামিসা নাক কুচকালো। এহহ! শখ কত! তার ভাবি তার পাশেই থাকবে হাহ্ ! তোর মতো চিকার পাশে থাকতে বয়েই গেছে! ভেবেই রামিসা মুখ ভেংচিয়ে বলল,

" দেখুন, কেন এসেছেন এখানে? কী চাই?"

হিমেল রাগী কন্ঠে বলে উঠল,

" তোকে চাই।"

রামিসা ব্যঙ্গ করে বলল,

"আপনার এসব নাটক অনেক দেখেছি। এখন দয়া করে এসব নাটক বন্ধ করুন। আপনার আসল চেহারা বের হয়ে গিয়েছে ।"

হিমেল এমনিতেই তার রাগটা অনেক কষ্টে নিয়ন্ত্রণ করে ছিল। রামিসার এমন কথা শুনে সে তার হাতটা আরো জোরে চেপে ধরল আর দাঁত চেপে চেপে বলল,

" না জেনে, না শুনে, না বুঝে ,একদম রিয়েক্ট করবে না তুমি। আমি রাজিবের মতো চ'রি'ত্র'হী'ন নই।"

রামিসা থমকে গেলো! সে তো মোটেও হিমেলকে চরিত্রহীন বলে নি! সে তো এই কথাটা মাথাতেও আনেনি! কিছুক্ষণ চুপ থেকে রামিসা বলল ,

"আমি না জেনে, না বুঝে, না শুনে রিয়েক্ট করচ্ছি? ঐদিন রাতে ফোন দিয়েছিলাম মণিকে। কলটা কে ধরেছিল? ভূতে? আপনি ধরেছিলেন। আপনি! একটা মেয়ের সাথে ওত রাতে কী করছিলেন আপনি? লুডু খেলছিলেন?'

হিমেল কিঞ্চিত হেসে বলল,

"বাহ্বা! এখনি এতো অধিকারবোধ! আই লাইক ইট!

রামিসা কথা ঘোরাতে বলল,

" অধিকারবোধ মাই ফুট! আপনি আমার কেউ হন নাকি!নিশ্চয়ই মেয়েটা আপনার গার্লফ্রেন্ড হয়। ভালোই নাটক করেছেন আমার সাথে! অভিনয়ে এত পাকা আপনি? আমিতো জানতামই না!"

হিমেল সঙ্গে সঙ্গে ধমক দিয়ে বলে উঠলো,

" চুপ! আর একটা কথা বলবি না তুই। যেটা জানিস না সেটা নিয়ে আর কথা বলবি না! তোকে কতবার কল দিয়েছি দুদিন থেকে? কলটা ধরিস নি কেন ?আরে ভাই রিয়াক্ট করবি,ভালো কথা! আগে জানবি তো! তুই নিজে নিজে এতকিছু বুঝে বসে আছিস?;একবার তো জিজ্ঞেস করতে পারতিস যে বিষয়টা কী? আমার কথা বাদ দিলাম! নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড এর উপর বিশ্বাস নেই তোর? মণিকে বলতে পারতিস!"

রামিসা একটু সিঁটিয়ে গেলো। এই লোক রেগে গেলেই খালি তুই তোকারি শুরু করে দেয়! ব'দ'মে'জাজী লোক! রামিসা কিছুক্ষণ নীরব থেকে অন্য দিকে তাকিয়ে রইল যার অর্থ সে হিমেলের কোনো কথাকে পাত্তা দিচ্ছে না! রামিসা আজ মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেছে, সে কোনভাবেই দুর্বল হবে না।এই লোকটার কাছে আসলে সে দুর্বল হয়ে পড়ে! তার চোখের দিকে তাকালে রামিসার ভেতর উথাল পাথাল শুরু হয়ে যায়! কিন্তু আজ কোনোভাবেই তা হতে দেবে না সে! নিয়ন্ত্রণ করবে তার বে'হা'য়া মন টাকে!

রামিসা এইবার একটু জোরেই বলে উঠলো,

" আচ্ছা আমাকে শুধু একটা কথা বলুন তো! আপনি ওত রাতে মণির বাড়িতে ছিলেন কেনো? "

এইবার নিয়ন্ত্রন করতে না পেরে হিমেল চেঁচিয়ে বলে উঠলো,

" কারণ ওটা আমার বাড়ি! আর মণি আমার মায়ের পেটের আপন বোন হয়! বোন হয় ও আমার!"

রামিসা এইবার চোখ বড় বড় করে তাকালো। এটা কী শুনলো সে? বোন ??? কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বলে উঠলো,

" বোন হয় মানে? কীসের বোন? কার বোন? কোথাকার বোন? কেনো বোন? হঠাৎ করে এই বোন কোথা থেকে টপকালো আপনার ?"

হিমেল বলল,

" ও আমার বোন। আমার নিজের বোন। কোথাও থেকে টপকায়নি। আমি ইচ্ছে করেই এটা গোপন রেখেছিলাম যে মণি আমার বোন হয়! কারণ আমি মণির থেকেই তোমার সমস্ত খবর নিতাম! তুমি কোথায় যাচ্ছ! কী করছো!কী খাচ্ছো! কোন ধরনের আ'কা'ম করে বেড়াচ্ছো! সবকিছু আমি খোঁজ নিতাম মণির কাছ থেকে। এই কারণেই গোপন রেখেছিলাম গাধা!"

রামিসা চোখ বড় করে তাকিয়ে রইলো। তার এবার নিজের উপরে খুব রাগ হলো! সে কীভাবে এত বড় একটা ভুল করতে পারলো! না জেনে, না বুঝে, কিভাবে ভাই-বোনের মতো একটা পবিত্র সম্পর্কে সে এতটা জ'ঘ'ন্য'ভাবে অপমান করতে পারলো! এটা ঠিক হয়নি! আসলেই তো! সে তো খুব ভালো করেই জানে হিমেলের চরিত্র সম্পর্কে! কীভাবে সে এমন একটা জ'ঘ'ন্য কথা ভাবল! এটা একদম ঠিক হয়নি! নিজের প্রতিই ঘৃ'ণা আসলো তার! ছিঃ! সে কীভাবে এইরকম মনোভাব মাথায় আনলো!

হিমেল এবার রাগী কন্ঠে বলে উঠল,

"ওহ্হো! শুনলাম,তুমি তো আবার বিয়েতে রাজি হয়েছো না? আয়ান তোমার বিয়ে ঠিক করেছে নাকি। তুমি তো বলেছো তুমি বিয়ে করবে। রাইট? ওকে ফাইন! বিয়ে করে নিও তুমি! যেখানে বিশ্বাস নেই সেখানে ভালোবাসা থাকাটা বিলাসিতা! তবে আমার প্রতি বিশ্বাস শব্দটা কখনো আনতে পারলে...আমার মনের দরজা সবসময় তোমার জন্য খোলা!" বলেই রেগেমেগে গটগট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলো হিমেল!

রামিসা চমকে গেল। কী বলছে এই লোক? সামান্য একটা ভুল বোঝাবুঝির জন্য এভাবে সব অনুভূতি ম'রে গেলো? এই লোক না তাকে ভালোবাসে? এই তার ভালোবাসা? এতো ঠুঙ্ক ভালোবাসা! রামিসা কেঁদে ফেলল! কষ্ট হচ্ছে তার! এতোটা রিয়েক্ট করা উচিত হয়নি! তার এই কান্না দরজার আড়াল থেকে দেখে হিমেল বাঁকা হাসলো! কারণ সে যে ইচ্ছে করেই এতো কঠিন কথা বলে এসেছে! বিয়েটা যে হবে না এটা তো সে জানেই! কিন্তু হঠাৎ করে রামিসা অজ্ঞান হয়ে গেলো! হিমেল দরজার আড়াল থেকে এটা দেখে একটুও অবাক হলো না! সে এটাও জানতো যে এই মেয়ে অজ্ঞান হবে! একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে হিমেল রামিসাকে কোলে তুলে তার বিছানায় শুইয়ে দিয়ে গেলো!

_______________________

হিমেল সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো। সদর দরজা থেকে এগিয়ে গেলে আদ্রিকা পেছন থেকে ডেকে উঠলো,

"হিমেল কোথায় যাচ্ছো? এসো! সকালে নাস্তা করে যাও।"

হিমেল পেছনে ফিরে হেসে বলল,

" না ভাবি আজ না। একদিন খুব অধিকারবোধ নিয়ে তোমার হাতের রান্না খেতে আসব।"

আদ্রিকা বুঝতে পারল হিমেলের ইঙ্গিত দেওয়া কথাটা। তাই সে একটু হাসলো। আদ্রিকা এবার এগিয়ে এসে বলল,

"আচ্ছা ঠিক আছে। আচ্ছা, হিমেল আসলে আমার একটা সাহায্য করে দিতে পারবে?"

হিমেল যেন এবার একটু সিরিয়াস হলো। একটু আগের রাগটা ভুলে গেল সে। সুন্দর করে হেসে বলল,

" হ্যাঁ ভাবি বলো। কী করতে হবে?"

আদ্রিকা একটু অস্বস্তি নিয়ে বলল,

"না মানে .....বলা উচিৎ হবে কি? তুমি পারবে কিনা!"

" ভাবি..তুমি আমার যত সাহায্য করেছো, সেগুলোর ঋন তো আমি কখনোই শোধ করতে পারবো না। আর সেই তুমি আমার কাছে সাহায্য চাইবে আর আমি সেটা প্রত্যাখ্যান করবো? এটা হয় নাকি? নিজের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে চেষ্টা করবো। শুধু বলো কী সাহায্য চাও?"

আদ্রিকা এবার বলল ,

"আসলে তুমি তো জানো পরশুদিন ওনার জন্মদিন!"

হিমেল প্রথমে বুঝতে পারলো না। কিন্তু মুহুর্তেই কিছু একটা মনে পড়তেই সে উৎফুল্লে বলে উঠলো,

"ওহ্হো! শীট! শীট্! আমি একদম ভুলে গেছিলাম ভাবি! তাই তো! পরশুদিন তো আয়ানের জন্মদিন। দেখেছো, আমি আমার বেস্ট ফ্রেন্ডের জন্মদিনটাই ভুলে গিয়েছি! ছিঃ! আয়ান জানতে পারলে আমাকে নর্দমায় চোবাবে! সব তোমার ননদের দোষ ভাবি!"

আদ্রিকা হেসে বলল,

" সমস্যা নেই। আমি তো মনে করিয়ে দিলাম। উনি জানতেই পারবেন না।"

হিমেল এবার বলল,

"তো ভাবি তুমি কি আয়ানের জন্মদিন নিয়ে কিছু করতে যাচ্ছো নাকি?"

আদ্রিকা বলল,

" আসলে ....এটা তো আমাদের বিয়ের পর ওনার প্রথম জন্মদিন! উনার সাথে তো আমি আর কখনো আগে উনার জন্মদিন কাটাইনি! এটাই প্রথম। তাই আমি আসলে বিশেষ কিছু করতে চাচ্ছিলাম।"

হিমেল উৎফুল্লে বলল,

"বাহ্ গ্রেট! এই না হলে আমার ভাবি! তারপর?"

" উনাকে একটা সারপ্রাইজ দিবো ভাবছি। আমার মনে হয় না এতো ঝামেলার মধ্যে ওনার নিজের জন্মদিনের কথা মনে আছে।কিন্তু আমার ঠিকই আছে। আমি গত মাস থেকেই এই দিনটার অপেক্ষা করচ্ছি। উনাকে একটা ছোটখাটো সারপ্রাইজ দিতে চাচ্ছি। তাই তোমার একটু সাহায্য লাগবে।"

হিমেল নিজের কলার ঝাঁকিয়ে ভাব নিয়ে বলল,

" চিন্তা করো না তো ভাবি। এই হিমেল আছে না! তোমার যা লাগবে ,আমাকে তুমি বলবে। কী সাহায্য লাগবে তুমি জাস্ট আমাকে জানাও! কোনো সমস্যা নেই! আফটার অল আমার বেস্ট ফ্রেন্ড এর জন্মদিন বলে কথা!!"

আদ্রিকা এবার হেসে বলল,

" ধন্যবাদ। জানো ছোটো থেকেই আমার একটা ভাইয়ের খুব শখ ছিলো। যাক! তোমাকে পেয়ে সেই শখটা পূরণ হয়ে গেছে!"

হিমেল বিনয়ের সাথে একটু হাসলো।

"কী হলো? মুখটা ওমন করে রেখেছো কেনো ?"

হিমেল তাচ্ছিল্যে হেসে বলল,

" সে আমাকে ভুল বুঝেছে ভাবি জানো।"

হিমেল সব ঘটনা আদ্রিকাকে খুলে বলল। আদ্রিকাও অবাক হয়ে বলল,

"মণি তোমার বোন? আমিও তো জানতাম না!"

" আসলে ভাবি। ঐ সময় তো আমাদের তো দা কুমড়ার সম্পর্ক ছিলো। তাই ভেবেছিলাম, মণি আমার বোন জানলে রামিসা তাকে দূরে সরিয়ে দিবে। আসলে মণি তো রামিসাকে শুধু বেস্ট ফ্রেন্ড নয়, বোনের মতোই দেখে! এইজন্যই বলিনি। তবে আয়ান জানে ভাবি।"

"ওওও। চিন্তা করো না হিমেল। সব ঠিক হয়ে যাবে। ছোট মানুষ তো ও। জানোই তো ওর আবেগ টা একটু বেশি। এইজন্য বুঝতে পারেনি। আমি ওকে বুঝিয়ে বলব।"

হিমেল কিঞ্চিত হাসলো। এরপর বলল,

"ইয়ে....তোমার ননদ অজ্ঞান হয়ে গেছে ভাবি!"

আদ্রিকা অবাক হয়ে বলল,

"আজকেও? "

হিমেল মাথা চুলকে বলল, "হ্যাঁ!"

আদ্রিকা কপাল চাপড়ে বলল,

" হায় কপাল! আচ্ছা আমি দেখচ্ছি ওকে।"

কিছু একটা মনে পড়তেই আদ্রিকা বলল,

" ওহহো, ভালো কথা.. হিমেল তোমাকে একটা কথা জানানোর আছে।"

" কী কথা ভাবি?"

"পরশুদিন যেহেতু উনার জন্মদিন। আমি তো তাহলে কাল রাতের মধ্যেই সব কাজ শেষ করব। কারণ কাল রাত বারোটার সময়ই ওনাকে উইশ করতে লাগবে। তো...আমি চাচ্ছিলাম যে এক ঢিলে দুই পাখি মারলে কেমন হয়?"

হিমেল ভ্রু কুচকে বলল,

" মানে? বুঝলাম না ভাবি !"

আদ্রিকা হেসে বলল,

" মানেটা তোমাকে আমি পরে বলবো। তুমি শুধু আমি যা যা বলবো তাই করো।"

_____________________________

সময় প্রবাহমান। থেমে থাকার কোনো সুযোগ নেই তার। দিনের আলো থেকে রাতের অন্ধকার, ঋতুর পরিবর্তন, বয়ঃক্রম—সবই সময়ের সঙ্গে বাঁধা। মানুষের জীবনে সময় যেমন সাফল্য আনে, তেমনই আনে ব্যর্থতা, সুখ, দুঃখের মিশ্র অনুভূতি। সময়ের প্রবাহে কেউ এগিয়ে চলে অজানা গন্তব্যের দিকে, আবার কেউ হারিয়ে যায় অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অন্ধকারে। সময় অপেক্ষা করে না কারও জন্য; তার স্রোতে যে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, সেই এগিয়ে চলে নতুন দিগন্তের পথে।

আজ আদ্রিকা খুব খুশি, সাথে অনেক নার্ভাসও বটে! আজ রাতেই তো সে আয়ানের জন্মদিন উপলক্ষ্যে তাকে সারপ্রাইজ দেবে। সে ঠিক করেছে আজ রাত বারোটায় সেই প্রথম সবার আগে আয়ানকে উইশ করবে। কীভাবে কী করবে সবকিছু প্লান করতে করতেই বিকেল হয়ে গেলো।

আজ সে খুব জোর দিয়ে আয়ানকে বলে দিয়েছে সে যেনো রাত ১১ টার আগে বাড়িতে না ফেরে! এমনকি হুমকিও দিয়েছে যে, যদি ভুল করেও রাত ১১ টার আগে আয়ান বাড়িতে এসে যায়, তাহলে আজ তাকে ঘরেই ঢুকতে দেবে না সে! ভয়ানক এক হুমকি! অন্তত আয়ানকে কাবু করতে যথেষ্ট! এই কয়েকমাসে এক বদঅভ্যাস হয়ে গেছে আয়ানের! আদ্রিকাকে বুকে নিয়ে জড়িয়ে ধরে না ঘুমালে একদমই ঘুম আসে না তার! তার এই অভ্যাসের সুযোগটাই লুফে নিয়েছে তার দু'ষ্টু বউ! উঠতে বসতে এখন কিছু হলেই আলাদা ঘুমানোর হুমকি দেয়! তবে আয়ানকে ছাড়া আদ্রিকা যে নিজেও ঘুমাতে পারে তা কিন্তু নয়! সে তো শুধু ভয় দেখাতেই হুমকি দেয়! সেও জানে এই হুমকি কাজে লাগে!

আদ্রিকা সব কাজ শেষ করে হিমেলকে কল দেয়।

" হ্যালো হিমেল...এইদিকে সব কাজ শেষ। এখন তুমি শুধু বলো যে, আমার ননদ কি তোমার সাথে দেখা করতে গিয়েছে নাকি ?"

হিমেল অসহায় মুখে বলল,

" নাহ্ ভাবি! এখনো তো আসেনি।"

" চিন্তা করো না! আমি ওকে অলরেডি ওনার অফিসে পাঠিয়ে দিয়েছি !"

__________________________

সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। আকাশে সূর্যাস্তের লালচে আভা ছড়িয়ে পড়েছে, আর হালকা বাতাসে গাছের পাতা মৃদু নড়ছে। পাখিরা তাদের নীড়ে ফিরে যাচ্ছে, আর চারপাশে এক ধরনের শান্তি বিরাজ করছে।

এই সুন্দর বিকেলে, রামিসা আয়ানের অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। অফিসের সামনে ছোট্ট একটি বাগান, যেখানে কিছু ফুল ফুটে আছে।

রামিসার মন কিছুটা উদ্বিগ্ন, কারণ সে আজ অনেক দুঃসাহসীক এক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সে আয়ানকে এমন একটা গুরুতর কথা বলতে যাচ্ছে, যেটা শুনলে তার ভাই তাকে মে'রে'ও ফেলতে পারে। তার হৃদয় দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছে, কিন্তু সে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

আসলে প্রথমে রামিসা হিমেলের সাথে আর কথা না বলার জেদ ধরলেও পরে হিমেলের জন্য অস্থির হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে রামিসার মন যেন কোথাও স্থির হতে পারছে না। সে বারবার ফোনের দিকে তাকায়, কিন্তু কোনো মেসেজ বা কল আসে না। হৃদয় ভারী হয়ে আসে তার, আর চোখে অশ্রু জমে যায়। রামিসা বেশ ভালোই বুঝতে পারে যে, হিমেল তার জীবনে কতটা গুরুত্বপূর্ণ। হিমেল তাকে মায়ায় ফেলেই দিয়েছে! এটাও বুঝতে পারে যে, সে হিমেলকে সত্যিই ভালোবাসে। তার হৃদয় যেন হিমেলের জন্য কাঁদছে। এমনিতেও আয়ান তার জন্য ঘটকের সাথে আলোচনা করে পাত্র দেখতে যাওয়ার ডেটও ঠিক করে ফেলেছে। আদ্রিকাকে সব খুলে বললে আদ্রিকাও রামিসাকে বলে যে সবকিছু প্রকাশ করে দাও, অনুভূতি লুকিয়ে রাখতে হয় না। সবশেষে রামিসা সিদ্ধান্ত নেয় যে, তাকে এই কথা আয়ানকে জানাতে হবে। কী হয় হোক! আজ সে বলেই দেবে। আর হিমেল তো বলেছে তার জন্য মনের দরজা সর্বদা খোলা! তাহলে ভয় কীসের!

বড় একটা শ্বাস নিয়ে রামিসা এগিয়ে গেলো আয়ানের অফিসের দিকে। ধীরে ধীরে অফিসের ভেতরে ঢুকে। তার হৃদয় দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছে, আর হাতের তালু ঘামছে। অফিসের ভেতরের পরিবেশ শান্ত, কিন্তু তার মনে যেন ঝড় বয়ে যাচ্ছে।

আয়ান কেবিনে বসে কাজ করছে। রামিসা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর সাহস সঞ্চয় করে এগিয়ে যায়। কেবিনে নক করে বলে,"ভাইয়া!"

আয়ান মাথা তুলে তাকায়। রামিসাকে এইসময় এখানে দেখে সে মনে মনে অবাক হলো না। সে তো জানতো যে রামিসা আসবে। আদ্রিকা তো তাকে সব বলেছে! কিন্তু ছোট বোনকে বিভ্রান্তিতে ফেলতে আয়ান অবাক হওয়ার ভান করে বলল,

"রামিসা!! তুই এখানে! এই সময়! ভেতরে আয়"

বলেই আয়ান এগিয়ে যায় রামিসার দিকে। রামিসার একদম সামনে দাঁড়িয়ে আয়ান জিজ্ঞেস করে,

"কী রে ? হঠাৎ এখানে কেনো?"

রামিসা মাথা নিচু করে ধীরে ধীরে বলে,

“ভাইয়া, আমার তোমার সাথে একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে।” তার কণ্ঠস্বর কাঁপছে।

আয়ান সিরিয়াস ভঙ্গিতে বলল,

"কী কথা ?"

রামিসা একটু নীরব রইলো। আয়ান বলল,

"কী হলো? কী বলবি বল!"

রামিসা মাথা নিচু করে বলল,

" আমার জন্য পাত্র পছন্দ করতে যেও না ভাইয়া। আমি বিয়েটা করতে পারবো না!"

বলেই মাথা নিচু করেই চোখ খিঁচে বন্ধ করে রাখে। অপেক্ষায় থাকে আয়ানের ধমকের! হয়তোবা এখনি একটা বড়সড় ঝড় উঠবে!

কিন্তু আয়ান ঠান্ডা গলায় বলে,

"কেনো ?"

রামিসা একটা শুকনো ঢোক গিলে এক নিঃশ্বাসে বলে,

"আমি একজনকে ভালোবাসি । তাকেই বিয়ে করতে চাই।"

" কে সে ?"

আয়ানের ঠান্ডা কন্ঠস্বর রামিসার ভয়টাকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।

রামিসা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আবারো ঢোক গিলে আয়ানের চোখে এক পলক তাকায়। তারপর আবার মাথা নামিয়ে ধীরে ধীরে বলে,

" হিমেল....."

রামিসা মাথা নিচু করে অপেক্ষা করে থাকে আয়ানের তীব্র প্রতিক্রিয়ার। কিন্তু অনেকক্ষণ যাওয়ার পরেও আয়ানের কোনো শব্দ পাওয়া যায় না। কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে রামিসা ধীরে ধীরে চোখ তুলে তাকায় আয়ানের দিকে। আয়ান ঠাণ্ডা চোখে তাকিয়ে রয়েছে তার দিকে।

এরপর আয়ান নরম কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল,

" হিমেল তোকে ভালবাসে ?"

রামিসা উপরনিচ মাথা ঝাঁকালো, যার অর্থ হ্যাঁ।

আয়ান কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করল তার বোনের মনোভাব। এরপর বলল,

" যখন ভালোই বাসিস তাহলে ওকে কষ্ট দিলি কেনো? ওর প্রতি বিশ্বাস নেই কেনো তোর ?"

রামিসা ফট করে তাকালো আয়ানের দিকে। স্তব্ধ চোখে তাকিয়ে রইলো। রামিসার এই অবাক হওয়া দৃষ্টি দেখে আয়ান হাসি দমিয়ে রাখতে পারলো না। ফিক করে হেসে ফেলল!

প্রথমে আয়ানের কথাতেই রামিসা চমকে গিয়েছিল। এবার আয়ানের এরকম অসময়ের হাসিতে সে তাজ্জব বনে গেলো! অনেক কষ্টে বলে উঠলো,

" হাসছো কেনো ভাইয়া?"

আয়ান কোনোমতে হাসি আটকে বলে ওঠে,

" হাসছি, কারণ হিমেল যখন জানতে পারলো আমি সব জানি, তারও মুখের অবস্থা তোর মত হয়েছিল!!"

বলে আবারও হেসে উঠল আয়ান। রামিসা চমকে গেলো!

"তোরা!...তোরা কি ভাবিস বলতো? তোরা দুটোই গাধা! আজ পর্যন্ত কেউ আমাকে চিনলি না রে! আচ্ছা হিমেলের কথা বাদ দিলাম! তুই তো আমাকে চিনিস। অন্তত তোর তো জানার কথা যে তোর ভাই ওরকম হিটলার ভাই না!!"

রামিসার চোখ দুটো ছলছল করছে। অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু পাওয়ার আশায় সে উৎফুলে তাকিয়ে রয়েছে আয়ানের দিকে। সে ভাবতেও পারেনি এরকম কিছু হবে! চোখ থেকে দু ফোটা পানির গড়িয়ে পড়ল তার।

আয়ান এগিয়ে এসে যত্ন করে ছোট বোনের চোখের পানি মুছে দিল। এরপর তার দু গালে হাত রেখে বলল,

" সত্যিকারের ভালোবাসা কখনো অবজ্ঞা করতে হয় না রামিসা। এই আমাকেই দেখ না! সত্যি কারের ভালোবাসা চিনতে না পারার কারণে কি একটা বাজে অবস্থায় পড়তে হয়েছিল আমাকে! আজ যদি তোর ভাবি আমাকে এতটা ভালো না বাসতো, তাহলে আমি কি বেঁচে থাকতাম বল?শেষ হয়ে যেতাম! কিন্তু তোর ভাবিই আমাকে শিখিয়েছে আসল ভালোবাসাটা! নাহলে আমি আজও সেরকম ব'দ'মে'জাজি, রাগী থেকে যেতাম! হিমেলকে আমি ছোট থেকে চিনি আর আমি এটাও জানি, হিমেল যদি কাউকে ভালবাসে তাহলে তার জান দিয়ে ভালোবাসে! মৃ'ত্যু'র আগ পর্যন্ত ভালোবেসে! আর আমি এটাও খুব ভালো করেই জানি, হিমেল আমার বোনকে খুব ভালো রাখবে। খুব সুখী হবি তোরা। "

রামিসা আয়ানের দুটো হাত ধরে বলল,

" ভাইয়া! তুমি সব জানতে! তাও কেন এভাবে চুপ ছিলে?"

আয়ান হেসে বলল,

"তোদের দুজনকে মিলিয়ে দিতে। প্লান অবশ্য তোর ভাবির! আমার বউয়ের কত বুদ্ধি দেখেছিস! যাইহোক হিমেল আমার বেস্ট ফ্রেন্ড আর আমার বেস্ট ফ্রেন্ডকে তুই অনেক কষ্ট দিয়েছিস কিন্তু! তুই ওকে বিশ্বাস করতে পারিস নি কেন বলতো? ভালোবাসাতে বিশ্বাস হচ্ছে মূল ভিত্তি!"

রামিসা মাথা নিচু করে বলল,

" ভাইয়া আমি বুঝতে পারিনি। আর... আমার এমনিতেও তোমার আর মম-বাপ্পির ভয় ছিল। ভাবি তো সব জানতো। আমি বলেছিলাম।আচ্ছা উনি কোথায় ভাইয়া? জানো,উনি আমার ফোন তুলছে না! খুব রেগে আছে আমার ওপর!"

আয়ান সুন্দর করে হেসে বলল,

"হিমেলের সাথে এখন দেখা করতে চাস?"

রামিসা উৎফুলে মাথা ঝাঁকালো। সে তো চায়ই! খুব করে চায়!

আয়ান বলল,

"যুবমৈত্রী পার্কে তোর জন্য অপেক্ষা করছে ও।"

রামিসা অবাক হয়ে তাকালো।

"আমার জন্য অপেক্ষা করছে মানে?"

আয়ান কলার ঝাঁকিয়ে বলল,

" সবই তোর ভাবির কেরামতি বুঝলি! সবই তোর ভাবির পরিকল্পনা! আমি একদম নির্দোষ! আমি কিচ্ছু জানি না। সত্যি! তবে এটুকু জানি আমার বেস্ট ফ্রেন্ড হিমেল এখন যুবমৈত্রী পার্কে তোর জন্য অপেক্ষা করছে। যা, আর দেরি করিস না!"

রামিসা অবাক হয়ে তাকালো। কিছু একটা বলতে গেলেই আয়ান বলল,

" আরে বাবা ! পরে হবে। পরে যা বলার বলিস। এখন যা তো! কানের কাছে প্যানপ্যান করিস না। এমনিতেই তোর ভাবি আমাকে আজ হুমকি দিয়ে দেরিতে বাড়ি যেতে বলেছে। খুব টেনশনে আছি । বউটা আবার রাগ করলো নাকি আমার ওপর কে জানে! যাওয়ার সময় একটা বেলী ফুলের মালা নিয়ে যেতে হবে বুঝলি। তুই আর টেনশন দিস না তো। যা! যা সিমরান যা, জি লে আপনি জিন্দেগী!!!"

চলবে......................

®️ Note: প্রিয় পাঠকগণ, গল্প কিন্তু শেষ পর্যায়ে🥺। হয়তোবা, কালকেই শেষ পর্ব আসবে ইনশাআল্লাহ্ 💝💖 আজ অনেক বড় একটা পর্ব দিলাম 😬 আরেকটা কথা...কালকের পর্বটা একটু রো'মা'ন্টি'ক হবে🙂। আসলে কালকে দুটো কাপল থাকবে তো আর শেষ পর্ব একটু রো'মা'ন্টি'ক না দিলে আমার পেটের ভাত হজম হবে না!🙂👀

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন