গ্রামের মেঠো পথ ধরে ধুলো উড়িয়ে কয়েকটা মোটরসাইকেল আর একটা সাদা গাড়ি এসে থামে ভুঁইয়া বাড়ির সামনে। গাড়ি থেকে নামে এক দীর্ঘদেহী পুরুষ, কিয়াম। রাজনীতিতে নাম লিখিয়েছে বলে তার অঙ্গে সবসময় শোভা পায় ধবধবে সাদা সুতি পাঞ্জাবি। বয়স এখন বত্রিশের কোঠায় একদম টগবগে যুবক। পুরোদস্তুর এক সুপুরুষ বলতে যা বোঝায়, কিয়াম ঠিক তাই।এবারের উপজেলা নির্বাচনে সে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী। তাই প্রচার-প্রচারণা আর জনসভার ভিড়ে নাওয়া-খাওয়া ভুলে ছোটাছুটি করতে হয়, নিজের বাড়িতে ফেরার একদম সময় মেলে না। নিজের লোকদের সাথে কথা বলতে বলতে সে বাড়ির সদর দরজায় এসে দাঁড়ায়। ক্লান্ত হলেও তার চেহারায় আভিজাত্যের ছাপ অটুট। চুলে হাত বুলিয়ে সে সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে গম্ভীর গলায় বলে,
"আজকের মতো যা কাল সকাল সকাল এসে পরিস।"
সবাইকে বিদায় দিয়ে কিয়াম ভেতরে ঢোকে, তার মাথাটা যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। কিন্তু শারীরিক কষ্টের চেয়েও বড় এক হাহাকার তার বুকের বাম পাশে দলা পাকিয়ে আছে। সাতটা দিন! সাতটা দীর্ঘ বছর কেটে গেছে মায়াবী মুখটা না দেখে।মুখ খানা এক পলক দেখতে পেলেই কিয়ামের সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে নামে যাবে,মানুষটা কে এক পলক দেখার জন্য তার তৃষ্ণার্ত আত্মাটা ছটফট করছে। কিয়াম দ্রুতগতিতে এগিয়ে যায়। কলিং বেল টেপার আগেই দরজা খুলে যায়। সামনে দাঁড়িয়ে এক রমণী। টকটকে লাল শাড়ি, খোঁপায় গোঁজা কামিনী ফুলের গাজরা, চোখে টানা গাঢ় কালো কাজল। দুই হাত ভর্তি লাল কাঁচের চুড়ি। যেকোনো পুরুষ এই রূপে মুগ্ধ হতে বাধ্য, কিন্তু কিয়ামের চোখেমুখে ফুটে ওঠে চরম বিরক্তির ছায়া।সে কুহুকে অবজ্ঞা করে পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকতে নিলেই কুহু বিষমাখা কণ্ঠে তাচ্ছিল্য করে বলে,
"যার জন্য এত তারা সে তো ছেলে নিয়ে পালিয়েছে।"
কথাটা তার শ্রবণে প্রবেশ করেই কিয়ামের সারা শরীরে হাজার ভোল্টের বিদ্যুৎ খেলে যায়। তার সমস্ত পৃথিবীটা এক লহমায় দুলে ওঠে। বুকের বাম পাশে তীরের মতো এক তীব্র ব্যথা বিঁধে থাকে। সে পাথরের মতো জমে গিয়ে ধীর পায়ে পেছন ফেরে। তার চোখের মণি তখন আগুনের পিণ্ড,অগ্নিদৃষ্টির সামনে কুহু একবার ঢোক গিলে কুঁকড়ে যায়।কিয়াম আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ায় না। টলমল পায়ে সিঁড়ি ভেঙে প্রায় দৌড়ে যায় দোতলার বিশেষ কক্ষটার সামনে। সে কথা বিশ্বাস করে না, করার প্রশ্নই ওঠে না। কিয়ান কাঁপা হাতে বাইরের লক খুলে ভেতরে প্রবেশ করতেই দেখে ঘরটা খাঁ খাঁ করছে। নেই! তার প্রাণের স্পন্দন, তার বেঁচে থাকার একমাত্র রসদ চৈতি নেই! বাতাসের সাথে পরিচিত ঘ্রাণটা উধা। কিয়ামের সারা শরীর বিষিয়ে আসে, দাঁড়িয়ে থাকার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলে সে। বিছানার ওপর সে আছড়ে পড়ে এক খণ্ড লাশের মতো।চোখ দুটো বুজে ফেলে, এই শূন্য ঘরটা আর দেখার ক্ষমতা তার নেই। তার মনে হয় সে বাড়িতে ফেরেনি, ফিরেছে এক শ্মশানে।কুহু তখনো পিছু ছাড়েনি। সে ঠোঁট কামড়ে ঘরে ঢুকে ভেতর থেকে দরজাটা আটকে দেয়। এরপর আলতো করে কাঁধ থেকে শাড়ির আঁচলটা নিচে নামিয়ে সে বিছানার দিকে এগিয়ে যায়। কিয়ামের নির্জীব, পাথুরে দেহের ওপর নিজের শরীরের সমস্ত ভার ছেড়ে দিয়ে সে ঝুঁকে শুয়ে পড়ে। কিয়ামের তপ্ত নিশ্বাসে নিজের নিশ্বাস মিশিয়ে ফিসফিস করে শুধায়,
"তোমার অশান্ত মনে শান্তি দেওয়ার জন্য আমি আছি।"
কুহুর ফিসফিসানি কিয়ামের কানে পৌঁছাতেই তার ভেতরের সুপ্ত আগ্নেয়গিরিটা সজোরে ফেটে পড়ে। চোখের পলকে কিয়ামের শক্তপোক্ত হাতটা কুহুর ফর্সা গলার ওপর চেপে বসে।আকস্মিক এই আক্রমণে কুহু কিছু বুঝে ওঠার সুযোগই পায় না। কিয়ামের আঙুলগুলো লোহার সাঁড়াশির মতো বসে যাচ্ছে তার গলায়। কুহুর দম বন্ধ হয়ে আসে, ফর্সা মুখটা নীলচে হয়ে যায়, আর চোখের মণিগুলো আতঙ্কে ঠিকরে বেরিয়ে আসতে চায়।কিয়াম দাঁতে দাঁত চেপে হিংস্র হয়ে কুহুকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে বিছানা থেকে নিচে ফেলে দেয়। কুহু ছিটকে মেঝেতে পড়তেই কিয়াম টলমল পায়ে উঠে দাঁড়ায়। এক পলক কুহুর আলুথালু অবস্থার দিকে তাকিয়ে সে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চায়। কিন্তু কুহু উন্মত্তের মতো মেঝে থেকে উঠে দৌড়ে গিয়ে কিয়ামকে পেছন থেকে জাপটে ধরে। কিয়ামের পিঠে মুখ ঘষতে ঘষতে নির্লজ্জের মতো বলে ওঠে,
"আমাকে ফালিয়ে কোথায় যাও। ? আমার কাছে আসো কিয়াম, আমি কথা দিচ্ছি... ওই চৈতির চাইতেও বেশি সুখ আমি আপনাকে দিবো!"
কথাটা শেষ করার সুযোগ পায় না কুহু। কিয়াম এবার আগের চেয়েও দ্বিগুণ শক্তিতে কুহুকে ছাড়িয়ে নিয়ে সজোরে ধাক্কা মারে।
"ছাড় মাগি! তোর মতোন নর্দমার কীটের ছোঁয়া আমি সহ্য করতে পারি না!"
কুহু এবার ছিটকে গিয়ে দেয়ালের কোণে পড়ে, তার মাথায় সজোরে আঘাত লাগে। কপাল বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়লেও কিয়াম একবার পেছন ফিরে তাকানোর প্রয়োজন বোধ করে না।তার সমস্ত অস্তিত্ব এখন জ্বলে পুড়ে খাক হয়ে গেছে।ঘর থেকে বেরিয়েই সে কাঁপাকাঁপা হাতে নিজের ফোনটা বের করে ফোন লাগায় তার লোকদের কাছে।কিয়ামের সন্দেহ এখন দৃঢ় বিশ্বাসে পরিণত হয়। যে মা শহরের নাম শুনলেই মুখ কুঁচকান, আজ হঠাৎ সেই মা কেন শহরে গেলেন? কুহু আর তার মা মিলে নিশ্চিত চৈতির সাথে এমন কিছু করেছে যা তার অগোচরে রয়ে গেছে।চৈতি স্বেচ্ছায় তাকে ছেড়ে যেতে পারে না,এটা কিয়ামের মন কোনোভাবেই মানছে না।
~
রাত তখন দশটা। বাইরে ঝিঁঝিঁ পোকার একটানা কনকনে ডাক আর বিলের দিক থেকে আসা হু হু বাতাসে পুরো বাড়িটা কে ভূতুড়ে রূপ দিয়েছে। জরাজীর্ণ মাটির ঘরটায় চৈতি একাই শুয়ে। চকির এক কোণে গুটিসুটি মেরে শুয়ে সে জানলার ভাঙা ফাঁক দিয়ে বাইরের ঘুটঘুটে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছে।
তুরাগের সাথে তার সম্পর্কের সুতোটা একটুও গড়ায়নি। বিয়ের চার দিন পার হয়ে গেছে, অথচ এই চার দিনে তাদের মধ্যে হয়তো চারটা বাক্যও বিনিময় হয়নি। তুরাগ মানুষটা বড় অদ্ভুত। সূর্য ডুবলেই সে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, সারা রাত কোথায় থাকে সে জানে না। একদম ভোরে যখন ভোরের আলো ফুটে ওঠে, তখন সে টলতে টলতে বাড়ি ফিরে সরাসরি বিছানায় আছড়ে পড়ে। সারাদিন মড়ার মতো ঘুমিয়ে আবার বিকেলের দিকে কোথায় উধাও হয়ে যায়।চৈতির বড় ভয় লাগে এই জনমানবহীন ভিটায় একা থাকতে। চারপাশের ঝোপঝাড় থেকে শেয়ালগুলো যখন দল বেঁধে ডাকে, তখন ওর বুকের ভেতরটা দুরুদুরু করে কাঁপে। মনে হয় অন্ধকার থেকে কেউ ওকে সারাক্ষণ দেখছে। গতরাতের কথা মনে পড়লে এখনো চৈতির হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসে। মাঝরাতে টয়লেটে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হতেই উঠোনের এক কোণে লম্বা কালো একটা সাপকে কিলবিল করে চলে যেতে দেখেছে সে। ওই মুহূর্তেই ওর কলজেটা শুকিয়ে গিয়েছিল। ভয়ে আতঙ্কে সে সারারাত আর চোখের পাতা এক করতে পারেনি। চৈতি বালিশটা জাপটে ধরে নিজের মনেই বিড়বিড় করে,
"কোন নরকে এসে পড়লাম খোদা!"
রাতের নিবিড় স্তব্ধতা ভেঙে দরজায় হঠাৎ খটখট শব্দ হয়। চৈতি ধড়ফড় করে বিছানায় বসে। এই জনমানবহীন বিলের বাড়িতে তপ্ত দুপুরেও যেখানে গা ছমছম করে, সেখানে মাঝরাতের এই শব্দ ওর বুকের ভেতর হাতুড়ি পেটা শুরু করেছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে কিছুই দেখা যায় না, শুধু বোঝা যায় দরজার ওপাশে কেউ ছায়ার মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। চৈতি কাঁপাকাঁপা হাতে বালিশের পাশ থেকে ওড়নাটা টেনে মাথায় তুলে নেয়। গলা শুকিয়ে কাঠ, অনেক কষ্টে সাহস সঞ্চয় করে ফিসফিসিয়ে শুধায়,
"কে? কে বাইরে?"
ওপার থেকে পুরুষালি কণ্ঠ ভেসে আসে,
"ভূত!"
কণ্ঠস্বরটা শোনা মাত্রই চৈতি এক লাফে খাট থেকে নামে। দুপা এগিয়ে গিয়ে হুরকো খুলে দরজা দিতেই তুরাগ ওকে পাশ কাটিয়ে ঝড়ের বেগে ঘরে ঢোকে। কোনো কথা নেই, বার্তা নেই সে সোজা গিয়ে খাটের ওপর ধপাস করে শুয়ে পড়ে।চৈতি ভ্রু কুঁচকে কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। রাগী গলায় বলে,
"আপনি? আপনি এখানে কেন?"
তুরাগ বিরক্তিতে এক গাল বাতাস ছেড়ে বলে,
"আমার বাড়িতে আমি থাকমু না তো কি আফনে থাকবেন?"
চৈতি থতমত খেয়ে বলে,
"না, মানে... আপনি তো রাতে বাড়ি আসেন না!"
তুরাগ পাশ ফিরে শুতে শুতে অবলীলায় উত্তর দেয়,
"এহন থাইকা আসমু।"
চৈতি এবার বিষম খায়। চিৎকার করে বলে,
"আপনি আসলে আমি শোবো কোথায়? এই"
তুরাগ একবার অন্ধকারেই পুরো বিছানার দিকে তাকায়। ওর শুয়ে থাকার পরও সেখানে আরও একজনের জায়গা অনায়াসেই হবে। সে আবারও বিরক্তির সুরে বলে,
"আমার মাথার ওপর হুন!"
চৈতি এবার আর নিজেকে সামলাতে পারে না, চেঁচিয়ে বলে,
"ফাজলামি করবেন না! আপনি এতদিন যেখানে রাত কাটাতেন ওইখানেই চলে যান।"
তুরাগ এক লম্বা হাই তুলে শরীরের ওপর তালি দেওয়া কাঁথাটা টেনে নিতে নিতে জানায়,
"মগের মুলুক পাইছেন নাকি? এইডা আমার বাপ-দাদার ভিটা।"
"ঠিক আছে, তাহলে আপনিই থাকুন, আমি যাচ্ছি!"
তুরাগ নির্বিকার। চোখ বন্ধ করেই উত্তর দেয়,
"ওই যে কোণায় আপনার ব্যাগ, ওইডাও লইয়া যান। একবার গেলে আর ফিরার নাম নিয়েন না।"
কথাটা বলে সে একদম নিথর হয়ে যায়। চৈতি দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাগে দরজার দিকে এগোয়, কিন্তু বাইরে শেয়ালের হুক্কাহুয়া ডাক শুনেই ওর পা থমকে দাঁড়ায়। যদি শেয়াল বা অন্য কোনো জানোয়ার এসে পড়ে? ভয়ে সে তড়িঘড়ি দরজাটা বন্ধ করে দেয়। ঘরে বসার মতো কোনো চেয়ার বা মোড়া নেই আসবাব বলতে কেবল এক ভাঙা তক্তপোশ, এক নড়বড়ে আলনা আর এক মরচে পড়া সিন্দুক। এর মধ্যে ঘরের বারান্দা দিয়ে কয়েকটা শেয়াল শোঁ শোঁ করে দৌড়ে যায়। চৈতি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে উপায় না দেখে তুরাগের থেকে হাত দুয়েক দূরত্ব রেখে বিছানার খালি জায়গায় গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ে। সে শোয়া মাত্রই তুরাগ নিজের মাথার তলা থেকে বালিশটা টেনে এক ঝটকায় চৈতির দিকে বাড়িয়ে দেয়। গজগজ করতে করতে বলে,
"কেডায় যে কইছিল বিয়া করতে! এহন নিজের বালিশ ছাড়াই ঘুমাইতে হইব।"
তুরাগের কথা শুনে চৈতি চমকে ওঠে। সে ভেবেছিল তুরাগ হয়তো এতক্ষণে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। সে অবাক হয়ে শুধায়,
"আপনি ঘুমাননি?"
তুরাগ ত্যাড়াব্যাঁকা গলায় উত্তর দেয়,
"এত তাড়াতাড়ি আমি মুতু করতেও পারিনা।"
চৈতি চুপ হয়ে যায়। তুরাগের এত কাছে শুতে ওর খুব অস্বস্তি হয়। তার ওপর তুরাগের শরীর থেকে কড়া তামাক আর ঘামের মিশ্র গন্ধ আসছে। মিনিট তিনেক চুপ করে থেকেও আর থাকতে পারে না চৈতি। নাক কুঁচকে ঝাঁজালো গলায় বলে,
"আপনি ওইদিকে সরুন তো! আপনার গা থেকে কেমন পচা গন্ধ আসছে। অসহ্য!"
তুরাগ এবার সজোরে এক নিশ্বাস ছেড়ে আধা-শুয়ে বসে। অন্ধকারে ওর চোখ দুটো বিড়ালের মতো জ্বলছে। সে খ্যাসখসে গলায় বলে ওঠে,
"শয়তান মহিলা! এইডারে গন্ধ কইবেন না, এইডা হইলো গরিবের পারফিউম।গাঁধী মহিলা একটা! এইডারে কইবেন সুগন্ধ আসছে আপনার শরীর থাইকা।মনটা চায় দুইটা কড়া চুমু খাই!"
চৈতি কুঁকড়ে যায় এই লোকটার মুখে কোনো লাগাম নেই! সে ওড়নাটা আরও শক্ত করে জড়িয়ে দেয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে পড়ে।