বর্ষার শুরু। মেঘলা আকাশের নিচে দিগন্তজোড়া বিলের চারপাশ এখন থৈ থৈ জলে টইটম্বুর।পলিমাখা মাটির সোঁদা গন্ধ আর বৃষ্টির ঝিরঝিরে হাওয়ায় প্রকৃতি নতুন রূপ ধরেছে।বিলের ধারের কাদা-জলে নেমে কৃষকেরা ব্যস্ত হয়ে আমন ধানের চারা রোপণ করছে।কেউ হালের বলদ সামলায়, কেউবা সারিবদ্ধভাবে সবুজ চারাগুলো গেঁথে দিচ্ছে মাটির গভীরে।চৈতি দাওয়ায় বসে একমনে তাকিয়ে দেখছে কৃষকদের এই কর্মযজ্ঞ।উপজেলা শহরে বড় হওয়ার সুবাদে এমন দৃশ্য তার কাছে একদমই নতুন।সিনেমার পর্দার চেয়েও জীবন্ত এই দৃশ্য তার দুচোখে খুবই সুন্দর লাগছে। গত চল্লিশ মিনিট ধরে সে ঠায় একই জায়গায় বসে আছে, কিন্তু একবিন্দু বিরক্তিবোধ করে না।তবে এই প্রশান্তির আড়ালে এক সূক্ষ্ম বিষণ্ণতাও বিরাজমান।এই জনহীন বিলে তার আসলে কোনো কাজ নেই। উনুনের ধোঁয়া সহ্য করার অভ্যাসও নেই। তাই নিয়ম করে তুরাগকেই প্রতি বেলা বাইরে থেকে খাবার কিনে পাঠাতে হয়। কখনো শুকনো রুটি-ভাজি, কখনোবা গ্রামের হোটেল থেকে আনা সস্তা বিরিয়ানি এভাবেই কাটেছে গত কয়েকটা দিন।ঘরের কাজ করতেও চৈতির একদম ইচ্ছে হয় না। এই মাটির বাড়ি, যার পলেস্তারা খসে পড়ছে আর চালের ওপর পলিথিন তালি দেওয়া এই ঘর পরিষ্কার করলেই বা কী,আর না করলেই বা কী! চৈতির মনে হয়, এই ভাঙা কুঁড়েঘর হাজার গুছালেও কখনো সুন্দর লাগবে না।
এগারোটা নাগাদ দূর থেকে তুরাগের অবয়ব চোখে পড়ে। তুরাগ একা নয়, তার সাথে আরও একটা কমবয়সী ছেলে আছে। ছেলেটার কাঁধে আর তুরাগের হাতে ধানের চারার বড় বড় কয়েকটা আঁটি। কাদা মেখে তুরাগের লুঙ্গি তখন হাঁটু অবধি তোলা, গায়ের গেঞ্জিটাও ঘামে ভিজে একাকার।চৈতি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। এই লোকটা তো সারাদিন বাইরে বাইরে ঘোরে, আজ হঠাৎ ধানের চারা নিয়ে হাজির কেন? তুরাগ বাড়ির উঠোনে পা রাখতেই সাথে থাকা ছেলেটাকে উদ্দেশ্য করে খ্যাসখসে গলায় বলে,
"আইজকা এইডাই শেষ খেপ। বাকিগুলা কাল সকালে নিয়া আইলে চলব। এহন এইগুলা ঘরের কোণায় নামায়া রাখ।"
ছেলেটা বাধ্য ছেলের মতো চারাগুলো বারান্দার এক কোণে ধপাস করে নামিয়ে রাখে। কাঁচা মাটির আর ধানের চারার তীব্র সোঁদা গন্ধ চৈতির নাকে আসতেই সে মুখ কুঁচকে ফেলে। তুরাগ চৈতির দিকে একবার আড়চোখে তাকিয়ে কপাল থেকে ঘাম মোছে।চৈতি মুখ ঝামটা দিয়ে শুধায়,
"এসব কী? এই পচা ঘাসগুলো ঘরে আনলেন কেন?"
তুরাগ দীর্ঘশ্বাস ফেলে দাওয়ার এক কোণে বসে। সাথে আসা ছেলেটা তখন আড়চোখে চৈতি কে দেখছে। তুরাগের চোখ পরতেই ধমক দিয়ে ছেলেটাকে বিদায় করে দিয়ে চৈতির দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসে।
"ওরে আমার শৌখিন মেমসাহেব! এইডাই হইলো আমন ধানের চারা। এইগুলা না রুইলে তো না খাইয়া মরতে হইব।"
চৈতি অবাক হয়ে বলে, "কেনো?"
তুরাগ এবার শব্দ করে হেসে ওঠে। সে নিজের হাতের কাদাগুলোর দিকে তাকিয়ে নিস্পৃহ গলায় জানায়,
"আপনেরে তো আর সারাজীবন হোটেলের বিরিয়ানি খাওয়ানো সম্ভব না। বিয়া যখন করছি, তখন তো দুই বেলা ভাতের ব্যবস্থা করতে হইব, নাকি?"
চৈতি চুপ করে থাকে। লোকটা কি তাকে খাবারের খোঁটা দিচ্ছে? তুরাগ দাওয়ার এক কোণে বসে হাত-পায়ের কাদা ডলতে ডলতে হুকুমের সুরে বলে,
"এক গ্লাস পানি দেন তো, কলিজাটা শুকাইয়া কাঠ হইয়া গেছে।"
চৈতি বিনা বাক্যব্যয়ে ভেতরে যায়। কলপাড়ের জগ থেকে এক গ্লাস জল ভরে এনে তুরাগের সামনে ধরে। তুরাগ গ্লাসটার দিকে একবার তাকায়, তারপর নিজের কাদা মাখা হাতের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়ায় না। সে চৈতির দিকে আড়চোখে চেয়ে বেশ গম্ভীর গলায় বলে,
"পানিটা মুখে ঢাইলা দেন। গ্লাসে ময়লা লাগলে তো আবার মুখটা দশটা বেহা দিবেন! আমার কোনো কিছু তো আর সহ্য হয় না আপনার।"
চৈতি গ্লাস হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তুরাগের এই বিদ্রূপমাখা কথাগুলো শুনলে ওর রাগ হওয়ার কথা, কিন্তু কেন জানি আজ মায়া লাগে। লোকটা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে কাদা মেখে খাটছে কেবল দুবেলা ভাতের সংস্থানের জন্য। চৈতি গ্লাসটা তুরাগের ঠোঁটের কাছে ধরে। তুরাগ এক নিঃশ্বাসে সবটুকু পানি খেয়ে এক তৃপ্তির ঢেকুর তোলে।পানি খাওয়া শেষ করে তুরাগ নিজের লুঙ্গির খুঁটে মুখ মুছতে মুছতে বাঁকা হেসে বলে,
"বিলে যাইবেন?"
চৈতি ভ্রু কুঁচকে শুধায়, "কেন?"
তুরাগ কোনো উত্তর দেয় না। সে ঝটপট উঠে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ায়। কিছুক্ষণ পর সেখান থেকে যখন বেরিয়ে আসে তখন তার এক হাতে কাদা মাখা বড় অ্যালুমিনিয়ামের বোল আর অন্য হাতে মরিচা ধরা কোদাল।তুরাগ বোলটা উঠানের এক কোণে রেখে কোদালটা কাঁধে তুলে নেয়। চৈতির দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বলল,
"দুই ঘোমটা দেন, গেরামের মানু ভালা না…!"
তুরাগের কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই চৈতি তাচ্ছিল্যের সুরে বলে,
"আমি কি ভালো?"
তুরাগ বোলটা চৈতির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
"আফনে তো জানেন আপনি পবিত্র।"
চৈতি দুই ঘোমটা না দিলেও সুন্দর করে পুরো শরীর ঢেকে ওড়নাটা দেয়।তারপর তুরাগের হাত থেকে বোলটা নিয়ে বলে,
"চলুন।"
তুরাগ একবার চৈতির দিকে তাকিয়ে সামনে এগিয়ে যায়, চৈতিও ধীরপায়ে তুরাগের পিছু নেয়। মেঠো পথের দুপাশে বর্ষার নতুন ঘাস আর কাদার পিচ্ছিল পথ ভেঙে সে হাঁটতে শুরু করে।বিলের কিনারায় পৌঁছাতেই একঝলক ঠান্ডা বাতাস ওদের ঝাপটা দেয়। কৃষকেরা তখনো হাঁটু সমান পানিতে নেমে কাজ করছে। তুরাগ বোলটা চৈতির হাত থেকে নিয়ে শুকনো জায়গায় নামিয়ে রেখে চৈতিকে ইশারায় হিজল গাছের নিচে দাঁড়াতে বলে। তারপর নিজের লুঙ্গিটা আরও উঁচুতে মালকোঁচা মেরে বেঁধে কোদাল হাতে কাদার ভেতর নেমে পড়ে। তুরাগ কোদাল দিয়ে এক কোপ মেরে এক দলা কাদা তুলে বোলে রাখে। তারপর বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আড়চোখে চৈতির দিকে তাকায়। চৈতিকে হিজল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে অবলীলায় বলে,
"যান তো, এইডা নিয়া পাক ঘরের পেছনে ফালায়া দিয়া আহেন।"
চৈতি এবার আকাশ থেকে পড়ে। সে স্থির হয়ে তুরাগের দিকে তাকিয়ে থাকে। মনে মনে ভাবে এই লোকটা কি পাগল নাকি শয়তান? সে এই ময়লা কাদা বয়ে নিয়ে যাবে! চৈতিকে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তুরাগ আবার ধমক দিয়ে ওঠে,
"কী হইলো? হাঁ কইরা কী দেখেন? যান, অন্তত দশ বোল ফালায়া আহেন, বাকিটুকু আমি দেখমু। শরীরটা একটু ঘামাইলে রাতের ঘুম ভালো হইব।"
চৈতি বেশ জোর দিয়ে উত্তর দেয়,
"আমি পারব না! এই কাদা আমি হাতেও ছোঁব না।"
তুরাগ কোদালটা কাঁধে রেখে বাঁকা হাসে।
"পারবেন না? আচ্ছা, তাইলে এক কাম করেন কোদাল লন, মাডি কাডেন। আমিই না হয় বয়ে নিয়া যামু।"
চৈতি মুখ গোমড়া করে তুরাগের হাতের মরিচা ধরা কোদালের দিকে তাকায়। একবার ভাবে, কাদা বয়ে নেওয়ার চেয়ে মাটি কাটা হয়তো সহজ হবে। কিন্তু যদি অসাবধানে কোদালটা নিজের পায়ে মেরে বসে? সেই ভয়েই সে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিরক্তিভরা গলায় তুরাগকে শুধায়,
"মাথায় উঠিয়ে দিন।"
তুরাগ মনে মনে এটাই চাচ্ছিল। সে ঠোঁটের কোণে এক চিলতে শয়তানি হাসি ফুটিয়ে কাদাভর্তি বোলটা যত্নে তুলে নিয়ে চৈতির মাথায় বসিয়ে দেয়। কিন্তু বসানোর মুহূর্তে সে কায়দা করে বোলটা একটু ত্যাড়া করে, যাতে বেশ খানিকটা কাদা গড়িয়ে চৈতির কাঁধের ওপর পড়ে।চৈতি আঁতকে উঠে বলে,
"উফ! এটা কী করলেন? আমার সারা শরীর কাদা মেখে গেল তো!"
তুরাগ খুব নিরীহ ভঙ্গিতে মাথা চুলকিয়ে জানায়,
"আহারে! পা পিছলায়া গেল যে! যান যান, সাবধানে গিয়া ফালায়া আহেন।"
কথাটা বলে সে গান ধরে,
"ও আমার দেশের মাটি, তোমার পরে ঠেকাই মাথা।
চৈতি রাগে গজগজ করতে করতে কাদার বোল মাথায় নিয়ে মেঠো পথ ধরে বাড়ির দিকে হাঁটা দেয়। তুরাগ কিন্তু এখানেই থামে না। এক এক করে পুরো বারো বোল কাদা সে চৈতিকে দিয়েই বয়ে নেয়। প্রতিবারই বোলটা মাথায় উঠিয়ে দেওয়ার সময় সে কোনো না কোনো বাহানায় চৈতির শরীরে কাদা ছিটিয়ে দেয়। চৈতির ফর্সা মুখটা তখন রাগে আর ঘাম-কাদায় একাকার হয়ে অদ্ভুত রূপ নিয়েছে। চৈতি এবার এসে বোলটা রেখে মাটিতে বসে পড়ে। হাঁপাতে হাঁপাতে সে বলে,
"আর পারবো না।"
তুরাগ এসে চৈতির গা ঘেঁষে বসে। চৈতি একটুও না নড়ে ক্লান্তিতে তুরাগের কাঁধে মাথা এলিয়ে দিয়ে স্থির হয়ে থাকে। তুরাগ চৈতির ওড়না দিয়ে ওর মুখ মুছতে মুছতে শুধায়,
"কোনো কিছু নিয়া আর মুখ কুঁচকাবেন?"
চৈতি তুরাগের কাঁধ থেকে মাথা উঁচিয়ে বলে,
"না।"
তুরাগ এবার এক গাল হেসে বলে ওঠে,
"এইতো আমার মিষ্টি বউ। চলেন, এহন গোসল করবেন।"