আকাশজুড়ে মেঘের ঘনঘটা, যেন এক বিষণ্ণ চাদরে মুড়িয়ে রেখেছে পুরো বিল। বর্ষার প্রথম ঢল নেমেছে আজ। গ্রামের নিচু পথগুলো ছাপিয়ে ঘোলাটে জলরাশি ধেয়ে আসে মাঠের পানে। সোঁদা মাটির ঘ্রাণ আর নতুন জলের কলকল ধ্বনিতে চরাচর মায়াবী রূপ পরিগ্রহ করেছে। থৈ থৈ জলে ভেসে বেড়াচ্ছে পানা আর আবর্জনা প্রকৃতির এ যেনো এক নির্মল প্রক্ষালন উৎসব।প্রবহমান জলের দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুই ভিন্ন মেরুর মানুষ। একজনের পরনে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি, সযত্নে আঁচড়ানো চুল তাকে দেখলে মনে হয় কোনো এক রাজপুত্র ভুলবশত এই কাদা-মাটির জনপদে পথ হারিয়েছে। আর তার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি এই মাটিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ পরনে মলিন লুঙ্গি, গায়ে-পিঠে কাদার দাগ আর অবিন্যস্ত কেশরাশি।কিয়াম আড়চোখে একবার তুরাগের দিকে তাকায়। তুরাগ নির্বিকার, একমনে কাঁচা পেয়ারা চিবোচ্ছে সে। কিয়ামের অন্তরাত্মা হাহাকার করে ওঠে। এই সেই পুরুষ।যার অঙ্গে বুনো গন্ধ, যার করতল কর্দমাক্ত, যার নেই কোনো খ্যাতি কিংবা অঢেল অর্থ - সম্পদ ? তবে চৈতির মতো এক অনিন্দ্যসুন্দরী রাজকন্যা এর ভাগ্যলগ্নে জুটল কেন?কিয়ামের মস্তিষ্কে বারবার একই প্রশ্ন প্রতিধ্বনিত হয় তুরাগের এমন কী আছে যা তার নেই? সে কি নিজের সর্বস্ব বিসর্জন দিলে চৈতিকে পাওয়ার মতো সৌভাগ্য ফিরে পাবে? তার তীব্র ইচ্ছে হয় তুরাগকে একবার শুধোতে, চৈতিকে জীবনসঙ্গিনী হিসেবে পেতে হলে ঠিক কী করতে হবে? তুরাগ তো বড্ড দরিদ্র, এই জরাজীর্ণ কুটিরে নুন আনতে পান্তা ফুরায় তার। সে কি অর্থের লালসায় চৈতিকে ফিরিয়ে দেবে? একবার প্রস্তাব দিয়ে দেখবে নাকি? কয়েকটা টাকার বান্ডিল তুরাগের সম্মুখে ধরলে হয়তো সে সানন্দে চৈতিকে কিয়ামের হাতে সমর্পণ করবে।কিন্তু পরক্ষণেই কিয়ামের বিবেক তাকে বাধা দেয়। অর্থের বিনিময়ে চৈতিকে পাওয়া মানে তো তাকে পণ্য হিসেবে ক্রয় করা। একজন প্রকৃত প্রেমিক হয়ে সে কীভাবে নিজের ভালোবাসাকে কেনাবেচার সামগ্রী বানাবে?
পুনরায় এক দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে কিয়ামের বুক চিরে। এক নিথর হাহাকার ওর পাঁজরের অস্থিগুলো গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। আচ্ছা, চৈতি তার হলে কি খুব ক্ষতি হয়ে যেত? দীর্ঘ এক যুগ বারোটি বছর ধরে সে কেবল একটি মেয়ের প্রতীক্ষায় নিজের যৌবন উৎসর্গ করল। এত দীর্ঘ অপেক্ষার পর আজ সে কী পেল? একরাশ তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। সে পায়নি চৈতিকে, পায়নি সেই অধিকার যা সে নিজের অস্তিত্ব দিয়ে আগলে রাখতে চেয়েছিল।কিয়াম আবার প্রবহমান ঘোলাটে জলের দিকে দৃষ্টিপাত করে। বর্ষার প্রথম ঢল যেমন দুকূল ছাপিয়ে পুরোনো গ্লানি ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে, তার হৃদয়ে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসগুলো কি সেভাবে ধুয়ে যাবে না? যন্ত্রণা তার হৃৎপিণ্ডটাকে ফালাফালা করে দিচ্ছে। সে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অগোছালো তুরাগের দিকে আরও একবার তাকায়। লোকটা তখনো ভাবলেশহীনভাবে পেয়ারা চিবোচ্ছে। কিয়ামের ইচ্ছে হয় বিলের নিস্তব্ধতা চিরে চিৎকার করে জিজ্ঞেস করতে,
"ওর মতো এক ভবঘুরে, ছন্নছাড়া মানুষের ভাগ্যে আমার বারো বছরের সাধনা কীভাবে ধরা দিল?"
তুরাগ পেয়ারা চিবুতে চিবুতে অন্য হাতের একটা পেয়ারা কিয়ামের দিকে বাড়িয়ে দেয়। কিয়াম তা গ্রহণ করে না তার আভিজাত্য আর অন্তরের দহন তাকে এই সামান্য সৌজন্যবোধটুকুও প্রদর্শন করতে দেয় না। দীর্ঘক্ষণ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকার পর অবশেষে স্তব্ধতা ভেঙে সে মুখ খোলে,
"চৈতিকে আমি চাই...!"
তুরাগ এবার আলস্যভরে হাসে। নির্বিকার কণ্ঠে বলে,
"চাইতেই পারেন। চাওয়া তো দোষের কিছু না।"
কিয়াম তুরাগের চোখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে প্রশ্ন করে,
"দেবেন আমাকে?"
তুরাগ হাতের অবশিষ্টাংশটুকু একবারে মুখে পুরে নেয়। বেশ আয়েশ করে চিবুতে চিবুতে জবাব দেয়,
"আপনি চাইলেই বুঝি আমি আপনারে দিয়া দিমু? শখ তো কম না আপনার!"
কিয়ামের চোয়াল শক্ত হয়ে আসে। ক্রোধে তার প্রতিটি শিরা-উপশিরা প্রকম্পিত হচ্ছে। সে দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে বলে,
"দ্বিতীয়বার আমি চাইব না, ছিনিয়ে নেব। আমার যা প্রাপ্য, তা আমি যেভাবেই হোক হাসিল করি।"
"আপনি ছিনাইয়া নিতে চাইলেই বুঝি আমি আমার বউ দিয়া দিমু?"
কিয়ামের চোখ দুটো আগুনের গোলার মতো জ্বলে ওঠে।
"বউ? কার বউ? বারো বছর ধরে যে মেয়েটাকে আমি নিজের কলিজার ভেতর পুষেছি, সে আজ এই দুই দিনের তোর বউ হয়ে গেল? ক্ষমতার দাপট আপনি দেখেন নাই তুরাগ সাহেব। আমি চাইলে এই মুহূর্তে আপনার এই জরাজীর্ণ ঘরসহ আপনাকে জ্যান্ত পুঁতে ফেলতে পারি। আমার জিনিস আমি নিবই, তাতে কার ঘর পুড়ল আর কার প্রাণ গেল তা দেখার সময় কিয়াম ভুঁইয়ার নেই।"
তুরাগ আবারও গা-ছাড়া ভাব নিয়ে এক সিগারেট ধরায়।
"আমি তো আজ আছি কাল নাই। মারার ভয় আমারে দেখাইয়া লাভ নাই।"
তুরাগ দু-পা এগিয়ে পুনরায় থমকে দাঁড়ায়। পেছন ফিরে ধীরলয়ে বলে,
"ওরে নিয়া যাওয়ার আগে একবার ওরে জিগাইয়া দেইখেন সে কি কিয়াম ভুঁইয়ার সোনার খাঁচায় ফিরতে চায়, নাকি এই ভাঙা ঘরে আমার বুকে প্রতিদিনের মতো ঘুমাইতে চায়।"
কথাটা বলে সে সম্মুখে অগ্রসর হতে হতে ভাঙা গলায় সুর ধরে,
"বসে ভাবি নিরালা..
আগেতো জানিনা বন্ধের, পিরিতের জালা
ইটের বাটায় কয়লা দিয়ে, আগুন জালাইছে
হায়গো, ইটের বাটায়
কয়লা দিয়ে, আগুন জালাইছে
দেওয়ানা বানাইছে...
কি যাদু করিয়া বন্ধে, মায়া লাগাইছে"
~
হাতে একটি কচি লাউ আর এক ডালা ছোট চিংড়ি নিয়ে বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়ায় তুরাগ। লাউটি নিজের হাতে লাগানো মাচার ফল, আর চিংড়িগুলো আজ তপ্ত দুপুরে হাঁটু জলে ঠেলা জাল দিয়ে ধরা।চৈতি দাওয়ায় বসে ছিল। তুরাগের হাতের ডালার দিকে তাকাতেই বিতৃষ্ণায় তার মুখটা কুঁচকে যায়। ছোটবেলা থেকেই চিংড়ি মাছ দেখলে তার গা রি রি করে ওঠে এই মাছে তার প্রচণ্ড অ্যালার্জি। একটু খেলেই সারা শরীর চাকা চাকা হয়ে লাল হয়ে যায়। চৈতি নাসিকা কুঞ্চিত করে তড়বড় করে বলে ওঠে,
"এইসব অখাদ্য নিয়ে ঘরে ঢুকবেন না একদম! আমার চিংড়ি মাছে এলার্জি আছে, দেখলেই চুলকায়। ফেলে দিয়ে আসুন এগুলো।"
তুরাগ গামছা দিয়ে ঘাড়ের ঘাম মুছতে মুছতে একবার চৈতির দিকে আড়চোখে তাকায়। তারপর ঠোঁটের কোণে ত্যাড়াব্যাঁকা হাসিটা ফুটিয়ে নির্বিকার গলায় বলে,
"আপনার এলার্জি আছে তো আমার কী? আমি কি আপনারে খাওনের দাওয়াত দিছি নাকি? এইগুলা আমি নিজের জন্য আনছি, নিজের হাতে রাইন্ধা খামু। আপনার যদি খুব চুলকায়, তবে ঘরে গিয়া খিল দিয়া বইয়া থাহেন।"
চৈতি রাগে গজগজ করে দাঁড়িয়ে পড়ে।
"অসভ্য লোক একটা! জানতেন না যে আমার এই মাছে সমস্যা হয়? কতবার বলেছি আপনাকে?"
তুরাগ লাউটা দাওয়ায় নামিয়ে রেখে চিংড়ির ডালাটা নিয়ে কলপাড়ের দিকে যেতে যেতে তাচ্ছিল্যের সুরে বলে,
"জানি তো কত কিছুই, কিন্তু মানি না। যান, গিয়া নিজের জন্য আলু ভর্তা ভাত মাখেন।"
চৈতি ক্রুদ্ধ পদক্ষেপে ঘরের ভেতর ঢুকে যায়। গত দুই দিন ধরে তার কপালে কেবল আলু ভাতে আর লবণই জুটছে। তুরাগ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, হোটেলের খাবার আর আসবে না। নিরুপায় হয়ে এখন এই খেয়েই দিন গুজরান করতে হচ্ছে তাকে।চৈতি একটি পাতিলে চারটি আলু নিয়ে কলপাড়ে যায়। তুরাগ তখন উন্মুক্ত গায়ে কল চেপে গোসল করছে। ওর পেশিবহুল পিঠ বেয়ে শীতল জল গড়িয়ে পড়ছে শ্রাবণের ধারার মতো। চৈতি কিঞ্চিৎ ইতস্তত করে তুরাগের দিকে তাকিয়ে অতি মৃদু স্বরে বলে,
"ধুয়ে দিন।"
তুরাগ কলের হাতল টেপা থামায়। ওর ভেজা চুলের ডগা দিয়ে টুপটুপ করে জল ঝরছে কপালে। কোনো বাক্যব্যয় না করে সে চৈতির হাত থেকে আলুগুলো তুলে নেয়। নিজের খসখসে বড় হাত দুটো দিয়ে আলুর গায়ে লেপ্টে থাকা কাদা-মাটি অতি যত্নে ঘষে ঘষে ধুয়ে দেয় সে। পরিষ্কার আলুগুলো আলতো করে যখন চৈতির হাতের পাতিলে নামিয়ে রাখে, তখনো ওদের মাঝে মৌনতা।চৈতি পাতিলটা নিয়ে আর পেছন ফিরে তাকায় না। রান্নাঘরের এক কোণে থাকা মাটির উনুনটার সামনে গিয়ে বসে সে।দিয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বেলে শুকনো লতাপাতায় আগুন ধরানোর এক আপ্রায় চেষ্টা শুরু হয়। পাতিলটা উনুনে চাপাতেই কুণ্ডলী পাকানো ধোঁয়ায় ওর ফর্সা মুখটা আরক্তিম হয়ে ওঠে, আগুনের তাপে আর ধোঁয়ার ঝাঁজে চোখ দিয়ে অজান্তেই গড়িয়ে পড়ে নোনা জল।গোসল শেষ করে কাঁধে ভেজা গামছা ফেলে তুরাগ রান্নাঘরে প্রবেশ করে। এক হাতে টাটকা লাউ আর অন্য হাতের ডলায় রাখা পরিষ্কার করা চিংড়ি মাছ। কলপাড়ে বসে সে নিজেই অতি নিপুণতায় মাছগুলো বেছেছে। মাছগুলো এখন বেশ ঝকঝকে দেখাচ্ছে। চৈতি তখন উনুনের একপাশে বসে আলু সেদ্ধ হওয়ার অপেক্ষায় মগ্ন। আগুনের আঁচ আর ধোঁয়ার তীব্রতায় ওর ফর্সা কপালটা স্বেদবিন্দুতে ভিজে উঠেছে।তুরাগ আলতো করে চৈতিকে সরিয়ে দিয়ে নিজেই ওর জায়গায় বসে। বঁটি হাতে নিয়ে দক্ষ হাতে লাউটা কুচিয়ে নেয়, সেদ্ধ হওয়া আলুগুলোর খোসা ছাড়িয়ে দেয় একে একে। চৈতির হাতের কাজ ফুরিয়ে এলেও সে তুরাগের সান্নিধ্য ছেড়ে ওঠে না, ঠায় বসে থাকে ওখানেই।কড়াইয়ে লাউ-চিংড়ির মেলবন্ধন ঘটতেই এক চমৎকার সুবাস চৈতির নাসিকায় এসে লাগে। অদ্ভুত ব্যাপার, সচরাচর এই অ্যালার্জি উদ্রেককারী মাছগুলোর প্রতি ওর চরম বিরাগ থাকলেও আজ জিভে জল চলে আসে। সম্ভবত গত দুই দিনের আলু-ভাতের একঘেয়েমিই ওর রুচির এই আকস্মিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। চৈতি একবার আড়চোখে রাঙা চিংড়িগুলোর দিকে তাকায়, তারপর খুব নিচু স্বরে বলে ওঠে
"খুব সুন্দর করে রেঁধেছেন তো! একটা দেখি?"
বলেই সে হাত বাড়িয়ে একটা বড়সড় চিংড়ি মাছের গায়ে আঙুল ছোঁয়াতে চায়। কিন্তু তুরাগ বাজপাখির মতো ছোঁ মেরে পাতিলটা সরিয়ে নেয়। সে চৈতির দিকে এক পলক তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলে,
"খবরদার! হাত দিবেন না কইলাম। আপনার না এলার্জি? ছুঁইলেই তো সারা শরীর চুলকানি দিয়া ভইরা যাইব। তখন আবার আমারে দোষ দিবেন যে আপনার জাত মারছি।"
চৈতি একটু গাল ফুলিয়ে বলে,
"একটা চিংড়িতে আর কী হবে? একটু দেখিই না কেমন লাগে।"
তুরাগ পাতিলটা আবার উনুনের ওপরের তুলে রেখে গম্ভীর গলায় জানায়,
"একটাতেও যা হবে, একশটাতেও তা-ই হবে। আপনি নিজের আলু সেদ্ধ নিয়া থাকেন। আমার চিংড়ির দিকে নজর দিলে কিন্তু কপালে দুঃখ আছে।"
চৈতি আলু ভর্তা আর ভাত নিয়ে ঘরে চলে যায়। তুরাগও লাল চালের ভাত আর লাউ-চিংড়ির তরকারি নিয়ে ঘরে ঢোকে। চৈতি নিজের থালায় তখন মাত্রই আলু সেদ্ধ আর এক পোড়া শুকনো মরিচ চটকে নিয়েছে। দুই দিন ধরে একই খাবার খেতে খেতে ওর মুখে চড়া পড়ে গেছে। সে আড়চোখে তুরাগের থালার দিকে তাকায়। নির্লজ্জের মতো আবার তার কাছে একটু নিচু স্বরে, অনেকটা মিনতির সুরে বলে,
"শুনুন... এই যে এতগুলো মাছ রান্না করেছেন, একা কি সব শেষ করতে পারবেন? দুটো চিংড়ি দিন না আমার পাতে, জাস্ট একটু চেখে দেখব।"
তুরাগ এক দলা ভাত মুখে পুরতে যাচ্ছিল, চৈতির কথা শুনে হাতটা মাঝপথেই থামিয়ে দেয়। ওর ভেজা চুল থেকে তখনো দু-এক ফোঁটা জল চুঁইয়ে পড়ছে। সে একপলক চৈতির থালার ম্যাড়মেড়ে আলু ভর্তার দিকে তাকায়, তারপর খুব শান্ত গলায় বলে,
"না, দেওয়া যাইব না।"
চৈতি অবাক হয়ে চোখ বড় বড় করে তাকায়।
"কেন? সামান্য দুটো মাছ দিলে কি আপনার ভাণ্ডার ফুরিয়ে যাবে?"
তুরাগ এবার আয়েশ করে এক চিংড়ি চিবোতে চিবোতে বলে,
"ভাণ্ডার ফুরাইব না, কিন্তু আপনার জান ফুরাইয়া যাইতে পারে।বেশি কথা না বলে খান আমারেও খাইতে দেন যা হইছে না রান্ধাটা।"
~
চৈতির কাছে সকাল মানেই বেলা আটটা কি নয়টা। এর আগে চোখের পাতা মেললে তার শরীরের আড়মোড়াই ভাঙে না, মনে হয় ঘুমটা অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে।কিন্তু তুরাগের স্বভাব ঠিক এর বিপরীত মেরুর। ফজরের আজান হওয়ার সাথে সাথেই সে খাট ত্যাগ করে। অনেকটা বিড়ালের মতোই ঘর থেকে বেরিয়ে কোথায় যে অদৃশ্য হয়ে যায়, তার হদিস কেবল সেই জানে।চৈতি আজ প্রত্যাশার চেয়ে খানিকটা আগেই জেগে উঠেছে। কলপাড়ে গিয়ে চোখে-মুখে শীতল জলের ঝাপটা দিয়ে সে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। এক মাস দীর্ঘ একটি মাস এই বিলঘেঁষা বাড়িতে সে একরকম বন্দি জীবন অতিবাহিত করছে। চারদিকে কেবল জলরাশি আর ধূ ধূ নির্জনতা। মাঝে মাঝে মনে হয়, এই অমোঘ একাকীত্বই বুঝি তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে গিলে খাবে।কলপাড় থেকে সে বাড়ির সম্মুখপানে অগ্রসর হয়। তখনই তার দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় বাড়ির পশ্চাৎভাগে। ঘন ঝোপঝাড় আর লতাপাতায় ঘেরা এক অন্ধকারাচ্ছন্ন কোণ থেকে তুরাগ বেরিয়ে আসে। সে একা নয়, সাথে আরও এক অচেনা লোক। লোকটার পরনে মলিন লুঙ্গি, মাথায় গামছা বাঁধা।তুরাগ চৈতিকে দেখে। ওর ললাটে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে, আর করতল কর্দমাক্ত। কিন্তু সে চৈতিকে পাশ কাটিয়ে গটগট করে ঘরের ভেতর ঢুকে যায়। তুরাগের হাবভাব দেখে মনে হয় চৈতি সেখানে নেই, কিংবা থাকলেও তার কোনো অস্তিত্ব তুরাগের কাছে গুরুত্বহীন। সাথে থাকা লোকটিও কোনো বাক্যব্যয় করে না কেবল এক পলক চৈতির দিকে বিজাতীয় দৃষ্টিতে তাকিয়ে দ্রুত পায়ে বাড়ির সীমানা পেরিয়ে প্রস্থান করে। চৈতি আর স্থির থাকতে পারে না। একরাশ কৌতূহল আর জমাটবদ্ধ সন্দেহ ওকে তাড়িয়ে নিয়ে আসে অন্দরে। তুরাগ ততক্ষণে বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পড়েছে বাইরের পৃথিবীর কোনো খবরই ওর কানে পৌঁছাচ্ছে না। চৈতি ওর শিয়রে গিয়ে কোমরে হাত দিয়ে দাপুটে ভঙ্গিতে দাঁড়ায়। রাগে আর সন্দেহে ওর কণ্ঠস্বর সপ্তমে চড়ে যায়,
"আপনি সত্যি করে বলুন তো, ওই ঝোপঝাড়ের আড়ালে কী মতলব আঁটেন? কার সাথে আপনার ওই গোপন শলাপরামর্শ চলে? কোনো নিষিদ্ধ কারবারে লিপ্ত নন তো আপনি?"
তুরাগ আধবোজা চোখে একবার চৈতিকে অবলোকন করে। ওর অবিন্যস্ত কেশরাশি আর তেজি রূপ দেখে তুরাগের ওষ্ঠাধরে এক চিলতে হাসি ফুটে ওঠে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই তুরাগ এক ঝটকায় উঠে বসে এবং আচমকা সজোরে টানে চৈতিকে নিজের বুকের ওপর আছড়ে ফেলে। দুই বাহুর নিবিড় বন্ধনে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে ওকে।অপ্রত্যাশিত এই কাণ্ডে চৈতি সম্পূর্ণ স্তম্ভিত হয়ে যায়। পাথরের মতো কঠিন আর রৌদ্রদগ্ধ চর্মের উত্তপ্ত স্পর্শে চৈতির হৃৎস্পন্দন মুহূর্তেই বহুগুণ বেড়ে গেছে। তুরাগ তো এর আগে কখনো ওর সাথে এমন আচরণ করেনি! ভয়ে আর প্রবল উত্তেজনায় চৈতির অঙ্গপ্রত্যঙ্গ থরথর করে কাঁপে, বুকের ভেতরটায় যেন কেউ হাতুড়ি দিয়ে পেটায়। সে প্রাণপণ চেষ্টা করে নিজেকে মুক্ত করে নিতে, কিন্তু তুরাগ ওর বাঁধন আরও সুদৃঢ় করে।সে চৈতির কপালে পরপর দুটো উষ্ণ চুম্বন এঁকে দেয়। তারপর ওর গালের কোমল ত্বকে ওষ্ঠ ডুবিয়ে অতি নিভৃত আর ফিসফিসানি কণ্ঠে বলে,
"আমি মানুষ হইয়া ফাইসা গেছি রে... পাখি হইলে আপনারে লইয়া কোনো এক গহীন আকাশে উড়াল দিতাম।"
তুরাগ মুখ খুলতেই এক তীব্র আর উৎকট ঘ্রাণ নাসিকায় এসে বিঁধে। ঘ্রাণটা চৈতির নাকে পৌঁছানো মাত্রই ওর পাকস্থলী উল্টে আসে মনে হয় নাড়িভুঁড়ি সব কণ্ঠনালির কাছে উঠে আসছে। সে সর্বশক্তি নিয়োগ করে তুরাগকে ঠেলে সরিয়ে খাট ত্যাগ করে।
চৈতির মাথা ঘুরছে, বমি ভাবটা এতটাই প্রবল যে সে ওয়াক ওয়াক শব্দে কুঁকড়ে যায়। কিন্তু সকালে উঠে কিছু না খাওয়াতে উদরে কিছুই অবশিষ্ট ছিল না, তাই কেবল পিত্তরসের তেতো জল ছাড়া আর কিছুই বের হয় না। সে দুই হাতে নিজের কণ্ঠনালি চেপে ধরে কাঁপতে কাঁপতে মেঝেতে বসে পড়ে।চৈতি ওভাবেই কুঁকড়ে বসে থাকে প্রায় পাঁচ মিনিট। বুকের ধড়ফড়ানিটা এখনো থামেনি, আর তুরাগের বিশ্রী তামাকের গন্ধটা যেন ওর নাসারন্ধ্রে গেঁথে গেছে। ওপাশে বিছানায় তুরাগ ততক্ষণে গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে।ওর নাসিকা গর্জনের শব্দে ঘরের নিস্তব্ধতা খানখান হয়ে যাচ্ছে। লোকটা একটু আগেই অন্য কোনো জগতে ছিল, আর এখন সব ভুলে আয়েশি ঘুমে মগ্ন।চৈতি আর একবারও তুরাগের দিকে ফিরে তাকায় না।উড়নাটা ভালো করে শক্ত করে গুঁজে সে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। আজ সে দেখেই ছাড়বে এই রহস্যের শেষ কোথায়। কোনো বাধা, কোনো সাপখোপের ভয় আজ আর তাকে আটকাতে পারবে না।বাড়ির পেছনের ঘন ঝোপঝাড়ের সামনে এসে দাঁড়ায় চৈতি। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয় দুর্ভেদ্য এক জঙ্গল, যেখানে সূর্যের আলোও ঠিকমতো পৌঁছাতে পারে না। চৈতি কণ্টকাকীর্ণ লতাগুলো সরিয়ে সাবধানে ভেতরে পা বাড়ায়। ঝোপের ভেতরটা গুমোট আর স্যাঁতসেঁতে। কয়েক পা এগোতেই লতাগুল্মের আড়ালে একটা পরিষ্কার জায়গার মতো চোখে পড়ে।সেখানে পা রাখতেই চৈতির চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে মদের খালি বোতল, পোড়া তামাকের অবশিষ্টাংশ আর ছোট ছোট প্লাস্টিকের পুঁটলি যেগুলো থেকে এক কটু রাসায়নিক গন্ধ আসছে।হঠাৎ চৈতির নজর পড়ে ঝোপের এক কোণায়। লতাপাতার ওপর অঘোরে ঘুমিয়ে আছে একজন লোক। ওর নাক ডাকার শব্দে ঝোপের পাতাগুলোও যেন কাঁপছে। চৈতি ভয়ে ভয়ে লোকটার মুখের দিকে একটু ঝুঁকে তাকায়। ময়লাটে গাল, রুক্ষ চুল আর কপালে এক কাটা দাগ।চৈতি স্মৃতি হাতড়াতে থাকে। এই লোকটাকে সে আগে কোথাও দেখেছে। হ্যাঁ, খুব ভালো করে দেখেছে!
চলবে…
(খুব ব্যস্ত আমি অনেক কষ্টে ২২০০+ শব্দ লিখেছি।আপনাদের কথা দিয়েছিলাম ৩০০০+ শব্দের পর্ব দিবো কিন্তু হয়নি তার জন্য আমি দুঃখিত)