প্রতিটি মেঠো পথ আর অচেনা সব জায়গায় কিয়ামের লোকেরা হন্যে হয়ে একজনকে খুঁজছে।কিয়াম প্রতিটা ক্ষণে ক্ষণে চাতক পাখির মতো খবরের অপেক্ষায় থাকে।ফোনের রিংটোন বাজলেই তার বুকটা ধক করে ওঠে,এই বুঝি কোনো সুসংবাদ এল! কিন্তু প্রতিবারই ওপাশ থেকে যখন বিফলতার খবর আসে, কিয়ামের দুচোখে তৃষ্ণা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।কিয়াম এখন বুঝতে পারছে, মেয়েটা তার মনে বসে আছে মোমবাতির সুতোর মতো হয়ে। মোমবাতির সুতো যেমন মোমবাতির বুকের গভীরে সযতনে থেকে মোমটাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দেয়, চৈতির অনুপস্থিতিও কিয়ামকে ঠিক সেভাবেই ভেতরে ভেতরে শেষ করে দিচ্ছে। একেকটা মুহূর্ত তার কাছে একেকটা দীর্ঘ বছরের মতো মনে হয়।সে নিজের অন্ধকার ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের মেঘের দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে,
"আমি তোকে ধরে রাখতে পারলাম নারে জান। কই চলে গেলি তুই? একটু অপেক্ষা করতি আমার জন্য।"
কিয়ামের কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে আসে।বত্রিশ বছরের এই সুঠাম পুরুষের দুচোখে এখন হাহাকারে ভরা। রাজনীতির ময়দানে সে সিংহ, কিন্তু চৈতির কাছে সে এক পরাজিত প্রেমিক।১২ বছর! দীর্ঘ এক যুগ ধরে সে এই মেয়েটার জন্য নিজের হৃদয়টাকে আগলে রেখেছে।ক্ষমতার লোভে কত নারী তার পায়ের কাছে লুটিয়ে পড়েছে,কুহুর মতো কত মায়াবিনী তাকে জাল দিয়ে বাঁধতে চেয়েছে, কিন্তু কিয়ামের মনে তো কেবল এক চিলতে নামই খোদাই করা।সে এই কিভাবে মুছে অন্য কাউকে এখানে আশ্রয় দিবে?"
~
গত তিনটে দিন ধরে চৈতির অবস্থা শোচনীয়। জ্বরের ঘোরে সে বিছানায় এমনভাবে মিশে আছে যে পিঠ তুলে বসার শক্তিটুকুও তার নেই। কাদা মাথায় নিয়ে রোদে পুড়ে আর বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করল, তারপর থেকেই শরীরটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। মেয়েটার শরীরে এই বুনো কাদা-মাটির জল সহ্য হয়নি। প্রচণ্ড জ্বরে তার কপাল পুড়ে যাচ্ছে, আর নাক দিয়ে অনবরত জল ঝরছে।চৈতি বিছানায় শুয়ে শুয়ে ফুঁসছে। তার এই অবস্থার জন্য দায়ী একমাত্র ওই লোকটা। অথচ পাষাণ লোকটা চৈতিকে একনজর দেখে মায়া করা তো দূরের কথা, শয়তানের মতো দাঁত বের করে হাসে। তুরাগের বাঁকা হাসি দেখে চৈতির ইচ্ছে করে বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে ওর ঝাকড়া চুলগুলো টেনে ছিঁড়ে দিতে।বদ লোকটা একবারও ভাবল না যে একটা মেয়েকে দিয়ে এভাবে খাটিয়ে নেওয়া ঠিক নয়। চৈতি নিজের মনেই বিড়বিড় করে গালমন্দ করে,
"এই অসভ্য, ইতর লোকটার জন্যই আজ আমার এই দশা! নাহলে তো বছরে একবারও আমার জ্বর-ঠান্ডা আসে না।"
তুরাগ অবশ্য একেবারেই যে কিছু করেনি তা নয়। সে বাইরে থেকে কিছু বুনো লতাপাতা আর তেতো শিকড় নিয়ে আসে। চৈতির সামনে ওগুলো রেখে বিদ্রূপের সুরে বলে,
"শহরের মেমসাহেব যে, একটু মাটির ছোঁয়া লাগতেই কাবু হয়া গেলেন?এই যে এই লতাপাতা খান একদম ঠিক হইয়া যাইবেন।"
চৈতি রাগে ওগুলো ছুঁড়ে ফেলে দিতে চায়, কিন্তু জ্বরের ঘোরে হাত তোলার জোরও পায় না।সে শুধু লাল টকটকে চোখ নিয়ে তুরাগের দিকে তাকিয়ে থাকে।
জ্বর হওয়ার ঠিক পাঁচ দিনের মাথায় চৈতি আজ বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে।শরীর এখনো একটু দুর্বল, কিন্তু গত কয়েক দিনের নরকযন্ত্রণা আর নেই।এই সুস্থ হওয়ার পেছনে অবশ্য ওই খ্যাপাটে লোকটারও হাত আছে।তুরাগ প্রথম তিনদিন পাত্তাই দেয়নি, বরং চৈতিকে ধুঁকতে দেখে বাঁকা হাসত।কিন্তু বিপত্তি ঘটে চতুর্থ রাতে। চৈতির ওইদিন প্রচণ্ড হাঁচি আর খকখক কাশির শব্দে তুরাগের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়।চৈতির কাশির শব্দে সে বারবার বিরক্ত হয়ে পাশ ফিরছিল।শেষমেশ যখন আর সহ্য হয় না, তখন সে মাঝরাতেই বিছানা ছেড়ে গজগজ করতে করতে বাড়ির থেকে বেরিয়ে গেছে।পরদিন সকালে এক পাতা কড়া পাওয়ারের ট্যাবলেট আর একটা কাশির সিরাপ এনে চৈতির সামনে ধপাস করে রাখে।মুখ কুঁচকে কর্কশ গলায় বলে,
"এই লন, গিলে ফেলেন।আপনার এই শিয়ালের মতো কাশিতে তো আমার রাতের ঘুম মাটি হইয়া গেছে।শান্তি নাই এই জমানায়, মানুষ নিজের বাড়িতে শান্তিতে ঘুমাইতেও পারে না!"
চৈতি দরজার চৌকাঠে চুপচাপ বসে আছে। পুরো বাড়িতে এই জায়গাটাই ওর সবচেয়ে প্রিয়। চারপাশের ঘন গাছপালা আর ঝোপঝাড়ের আড়ালে বাড়িটা এমনভাবে ঢাকা যে, বাইরে থেকে হুট করে বোঝার উপায় নেই ভেতরে কেউ আছে কি না। অথচ এখানে বসে পুরো বিলের দৃশ্যটা একদম পরিষ্কার দেখা যায়। বিলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাস আর পাখির কিচিরমিচির শব্দে চৈতি যখন মগ্ন, তখন ওর নজর কাড়ে তুরাগ।তুরাগ বাড়ির পেছনের দিক থেকে ধীরপায়ে এগিয়ে আসছে। চৈতি একদৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকায়। গত কয়েকদিন ধরে সে এই একটা জিনিস খুব খেয়াল করছে তুরাগ মাঝে মাঝেই চুপিচুপি বাড়ির পেছনের ওই জঙ্গলমতো জায়গাটাতে যায়। সেখানে গিয়ে সে বেশ কিছুক্ষণ সময় কাটায়, আবার চারপাশ দেখে ফিরে আসে। চৈতির মনে খটকা লাগে। এই ভাঙাচোরা বাড়ির পেছনে এমন কী সম্পদ আছে যে তুরাগকে অত সাবধানে যেতে হয়? তুরাগ কাছে আসতেই চৈতি নিজেকে স্বাভাবিক করে নেয়, কিন্তু ওর কৌতূহলী চোখ দুটো তুরাগের কাদা মাখা হাতের দিকে আটকে থাকে। তুরাগ চৈতিকে ওভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে অভ্যাসবশত বাঁকা হেসে বলে,
"কী গো মেমসাহেব, এমনে চাতক পাখির মতো চাইয়া আছেন কেন? আমারে কি আইজকা একটু বেশি সুন্দর লাগতাছে নাকি?"
চৈতি মুখটা বিশ্রীভাবে কুঁচকে তাচ্ছিল্যের স্বরে বলে,
"আপনার মতো চোরকে দেখার শখ আমার নেই। বাড়ির পেছনে অত কী কাজ আপনার? সারাক্ষণ ওখানে গিয়ে কী ওলটপালট করেন?"
তুরাগের চোখের মণি এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে যায়। পরক্ষণেই সে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে কাঁধের গামছা দিয়ে ঘাম মুছতে মুছতে বলে,
"কয়ডা তামাক গাছ লাগাইছি কিন্তু গাছ গুলা হইতাছে না।"
চৈতি এবার জ্বলে উঠে বলে,
"ফালতু লোক একটা!"
তুরাগ কলপাড়ে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েও থেমে যায়। ঘাড় ঘুরিয়ে দাঁত কিড়মিড় করে শুাধায়,
"এমনেই মাথা গরম, তার ওপর আপনের এই কুতকুতানি!"
চৈতি দাওয়ায় এক পা ঠুকে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে ওঠে,
"কুতকুতানি মানে কী? এখনই গিয়ে পুলিশকে খবর দেবো, অবৈধ কাজকাম করে বেড়ায়!"
তুরাগ ঝপাঝপ মাথায় পানি ঢালতে ঢালতে ত্যাড়াব্যাঁকা গলায় চেঁচিয়ে বলে,
"বেশি প্যাঁচপ্যাঁচ কইরেন না, বিরক্ত লাগে।"
চৈতি রাগে গজগজ করতে করতে ঘরের ভেতর ঢুকে যায়। ধাম করে দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে বিড়বিড় করে বলে,
"অসভ্য, ইতর একটা লোক!"
তুরাগ গোসল শেষ করে ভেজা গামছাটা কাঁধে ফেলে কলপাড় থেকে ধীরপায়ে ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ায়। সে দরজার কপাটে দুবার শব্দ করে গম্ভীর গলায় বলে,
"দরজা খুলেন।"
ভেতর থেকে কোনো শব্দ আসে না। চৈতি নড়লও না। তুরাগ এবার বেশ বিরক্ত হয়। এই মেয়েটা ত্যাড়ামিতে তাকেও ছাড়িয়ে গেছে। সে ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে এক লম্বা শ্বাস ছাড়ে, নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করে আবার বলে,
"বলতাছি না, খোলেন!"
চৈতি এবারও খোলে না। তুরাগ যখন রাগে আরও কিছু বলতে যাবে, তখনই দূর থেকে এক ছেলে চিৎকার করতে করতে দৌড়ে বাড়ির উঠোনে ঢোকে,
"তুরাগ ভাই! ও তুরাগ ভাই!"
তুরাগ বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে ছেলেটার দিকে ফিরে তাকায়। মেজাজটা এমনিতেই বিগড়ে ছিল, সে কর্কশ গলায় ধমক দিয়ে বলে,
"কী হইছে? চিল্লাইতাছস কেন?"
ছেলেটা দৌড়ে আসার কারণে বুক ভরে হাঁপাচ্ছে। কথা বলতে গিয়েও তার গলা আটকে যায়। কোনোমতে দম নিয়ে সে আতঙ্কিত গলায় বলে,
"আপনার বউরে কিয়াম ভুঁইয়া হন্যে হইয়া খুঁজতাছে।গুন্ডাপান্ডা নিয়া কিয়াম ভুঁইয়া এই দিকেই আইতাছে!"
ছেলেটার কথা শেষ হওয়ার আগেই হাজির হয় কিয়াম। চারপাশে কে আছে না আছে, সেদিকে তাকানোর তিলমাত্র ধৈর্য তার নেই। সে সোজা এসে তুরাগের বুক বরাবর সজোরে এক লাথি বসায়।
তুরাগ অপ্রস্তুত ছিল, লাথির চোট সামলাতে না পেরে ছিটকে দুই পা পিছিয়ে যায়। সামলে ওঠার আগেই কিয়াম বাজপাখির মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে ওর ওপর। এলোপাথাড়ি কয়েকটা ঘুষি চালায় তুরাগের নাকে-মুখে। চামড়া ফেটে গিয়ে তুরাগের নাক দিয়ে টকটকে লাল রক্ত গড়িয়ে পড়ে ওর ভেজা গায়ের ওপর। কিয়াম এবার তুরাগের গলা টিপে ধরে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে। ওর গলার শিরাগুলো রাগে ফুলে উঠেছে, চিৎকার করে বলে,
"আমার পাখি কই? বল, কোথায় লুকিয়ে রেখেছিস আমার জানরে?"
তুরাগ যন্ত্রণায় নীল হয়ে গেলেও ওর ঠোঁটের কোণের বাঁকা হাসিটা সরে না। সে হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে নাকের রক্ত মুছে নিয়ে নিস্পৃহ গলায় বলে,
"পাখি তো আকাশে থাকে... আকাশেই হইবো। মাটিতে খুঁজতে আইছেন কেন?"
কথাটা শোনা মাত্র কিয়ামের হিতাহিত জ্ঞান লোপ পায়। গত কয়েক দিনের দহন তাকে উন্মাদ পশুরে পরিণত করেছে। সে আরও হিংস্র হয়ে তুরাগকে মারতে হাত তুলতেই খটাস করে ঘরের দরজা খুলে যায়।চৈতি ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।
চৈতি দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কিয়ামের বুকের ভেতরটা নিমিষেই ওলটপালট হয়ে যায়। প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে যে তৃষ্ণা বুকের ভেতর পুষে রেখেছে, আজ সেই তৃষ্ণা যেন দাবানলের মতো জ্বলে ওঠে। কিয়ামের মনে হয়, ওর নিঃশ্বাসের প্রতিটি অণু-পরমাণু কেবল চৈতির নাম জপছে।ওর চোখের সামনে অন্য কেউ অবশিষ্ট নেই।আছে শুধু ওর আজন্ম লালিত পাখি।কিয়ামের মনে হচ্ছে, চৈতিকে ছাড়া ওর জীবনটা এক অর্থহীন মরুভূমি, আর আজ সেই মরুভূমিতে প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা পড়েছে। ওর সমস্ত রাগ, হিংসা আর আক্রোশ এক নিমেষে মায়ার সাগরে মিশে যায়। চৈতির ওই বিধ্বস্ত রূপ, আলুথালু চুল আর ভয়ার্ত চোখের দিকে তাকিয়ে কিয়ামের কলিজাটা ছিঁড়ে আসতে থাকে।
কিয়ামের হিতাহিত জ্ঞান তখন লোপ পেয়েছে। দীর্ঘ বারোটি বছর যে মেয়েটিকে পাওয়ার নেশায় সে নিজের প্রতিটি রক্তবিন্দুতে বিষ পুষেছে, আজ বহুদিন পর চোখের সামনে দেখে সে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। এক উন্মত্ত ঘোরের মধ্যে কিয়াম এগিয়ে গিয়ে চৈতিকে দুহাতে শক্ত করে জাপটে ধরে। চৈতির কাঁধে মুখ গুঁজে কিয়াম অস্ফুট স্বরে বিড়বিড় করে ওঠে,
"পাখি... আমার জান! তুই কই চলে গেলি? আমি তোকে ছাড়া এক মুহূর্ত বাঁচাব না রে। দেখ, তোর জন্য আমি পাগল হইয়ে গেছি। চল আমার সাথে, আর কোনোদিন তোকে চোখের আড়াল করবো না।"
কিয়াম আরো চৈতিকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিতে চায়, কিন্তু কিয়ামের স্পর্শ পাওয়া মাত্রই ওর ভেতরের সমস্ত সুপ্ত শক্তি আগ্নেয়গিরির মতো জেগে ওঠে। সে নিজের সর্বশক্তি দিয়ে কিয়ামের বুকে সজোরে ধাক্কা মারে।ধাক্কাটা এতই আকস্মিক আর তীব্র ছিল যে কিয়াম কয়েক পা পিছিয়ে গিয়ে থমকে দাঁড়ায়। ওর দুচোখে তখন রাজ্যের বিস্ময় আর অবিশ্বাস। যে পাখির জন্য সে পুরো দুনিয়া ছারখার করতে পারে, সে পাখি আজ তাকে এভাবে ছুড়ে ফেলে দিল? চৈতি হাঁপাতে হাঁপাতে চিৎকার করে ওঠে,
"খবরদার! আমার গায়ে হাত দেবেন না।"
কিয়াম থমকায় না, বরং মায়াবী দৃষ্টি নিয়ে আবার এগিয়ে যায় চৈতির দিকে।
"মায়ের ওপর রাগ করে এভাবে চলে আসলি জান?"
"খুন করে ফেলব আমাকে আর একবার ছুঁতে চেষ্টা করলে!"
"করে ফেল খুন, তাও প্লিজ বল কেন পালিয়ে এলি এখানে?"
চৈতি এবার সব জমে থাকা ক্ষোভ উগড়ে দেয়,
"গিয়ে জিজ্ঞেস করুন আপনার মাকে কেন উনি আমার গায়ে হাত তুলেছেন? আমার চরিত্রে দাগ লাগিয়েছেন? আমার মাকে নিয়ে বাজে কথা বলেছেন?"
কিয়াম এবার তাচ্ছিল্যের হাসি হাসে।
"তুই এই সামান্য কারণে চলে এলি? আমার জন্য একটু অপেক্ষা করা গেল না? আমি কি সব ঠিক করে দিতাম না?"
বলতে বলতে কিয়াম আবার চৈতির হাত টেনে ধরে।
"চল, আজই বিয়ে করব আমরা। তারপর মা আর কিছু করতে পারবে না। প্রয়োজনে আমরা আলাদা চলে যাব!"
চৈতি এক ঝটকায় নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বজ্রকঠিন গলায় বলে,
"আমার বিয়ে হয়ে গেছে কিয়াম ভাই!"
কথাটা কিয়ামের কানে পৌঁছায় ঠিকই, কিন্তু ওর মস্তিস্ক তা গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। সে আবারও চৈতির দিকে হাত বাড়াতে যায়, কিন্তু এবার আর পারে না। মাঝখানে পাহাড়ের মতো এসে দাঁড়ায় তুরাগ। এতক্ষণ রক্তাক্ত মুখে সে চুপ করে সব তামাশা দেখছিল, কিন্তু এবার তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। তুরাগ নিজের লুঙ্গির খুঁটে মুখ মুছে কিয়ামের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,
"দাদাগিরি বহুত করছেন। হবু চেয়ারম্যান বইলা খালি চুপ কইরা আছি, নাহলে হাত চালানো আমিও জানি। ঢের হইছে, এবার বিদায় হন।"
তুরাগের সাহস দেখে কিয়ামের পিত্তি জ্বলে ওঠে। সে গর্জে উঠে তুরাগকে পুনরায় আঘাত করতে উদ্যত হয়। কিন্তু কিয়ামের হাত তুরাগের গায়ে পড়ার আগেই চৈতি তুরাগের সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে ওঠে,
"খবরদার! আমার স্বামীর গায়ে হাত দিলে হাত একদম ভেঙে দেব!"
~
বিকেলের আকাশটা তখন ঘন কালো মেঘে ছেয়ে আছে , অসময়েই সন্ধ্যা নামার প্রস্তুতি চলছে। লায়লা বেগম শহর থেকে ফিরেছেন কিছুক্ষণ হলো। শরীর আর মন দুটোই অবসন্ন। তিনি জানতেন কিয়াম বাড়িতেই আছে, কিন্তু এই মুহূর্তে ছেলের মুখোমুখি হওয়ার মতো মানসিক শক্তি তাঁর নেই। তাই নিজের ঘরে ঢুকে দরজা ভেজিয়ে দিয়েছেন। তবে লায়লা বেগম না গেলেও খবর ঠিকই পৌঁছে যায়। কিয়াম তার অন্ধকার ঘরে গত দুদিন ধরে একরকম বন্দি হয়ে আছে। নির্বাচনী প্রচার, মিটিং, মিছিলে যাওয়ার কোনো আগ্রহই তার অবশিষ্ট নেই। হৃদয়ের গহিনে যে দহন শুরু হয়েছে, সেই ব্যথা নিয়ে সে বাইরের কোলাহলে মিশবে কী করে? মায়ের আসার খবর পেতেই কিয়াম ধীরপায়ে নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। ওর পরনের পাঞ্জাবিটা কুঁচকানো, চোখের নিচে কালি পড়া। কিয়াম করিডোর দিয়ে হাঁটার সময় দেখে লায়লা বেগমের ঘরের দরজা আধখোলা। কিয়াম এগিয়ে গিয়ে লায়লা বেগমের পায়ের কাছে বসে। তার শরীরের প্রতিটি ভাঁজে ভাঁজে আজ নির্লিপ্ততা, গভীর ক্লান্তি। ছেলের এমন নিস্তেজ, পাংশুটে মুখ দেখে লায়লা বেগমের বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে ওঠে। মাতৃত্বের সহজাত প্রবৃত্তিতেই কি তবে আসন্ন কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস পেলেন? এমন নিঃস্ব, এমন অসহায় রূপে কিয়ামকে তিনি কোনোদিন দেখেননি।কিয়াম কাঁপা হাতে লায়লা বেগমের হাত দুটো শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। যেন ডুবন্ত মানুষ খড়কুটো আঁকড়ে বাঁচার শেষ চেষ্টা করছে। রুদ্ধস্বরে সে বলে ওঠে,
"মা নাকি সন্তানের জন্য নিজের প্রাণ বিলিয়ে দেয়, আম্মু? তবে তুমি মা হয়ে নিজের সন্তানকে এভাবে জীবন্ত দাফন করলে কী করে? এই বিষাক্ত জাল বোনার আগে কি একবারও আমার কথা তোমার মনে পড়েনি? একটা নিষ্পাপ মেয়ের চরিত্রে কলঙ্ক লেপন করার আগে কি তোমার হাতটা একবারও কাঁপল না? তুমি কি বুঝতে পারোনি আম্মু, তাকে কলঙ্কিত করা মানে আসলে তোমার নিজের রক্তকেই অপবিত্র করা?"
লায়লা বেগম শুকনো ঢোক গিলছেন। বুঝতে বাকি নেই যে কিয়ামের কাছে সব সত্য উন্মোচিত। চৈতি তাকে সব বলে দিয়েছে। পুরনো অভ্যেসবশত লায়লা বেগম মনে মনে মিথ্যে নাটকের ছক সাজাতে চান, নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার অজুহাত খুঁজছেন। কিন্তু কিয়াম তাকে আর সুযোগ দেয় না। সে ভাঙা গলায়, আর্তনাদের স্বরে বলে চলে,
"বত্রিশটা বসন্ত পার করেছি আমি। প্রতিটি মুহূর্ত পার করেছি শুধু একটি মানুষের সঙ্গে জীবনের পূর্ণতা পাব বলে। আমার বেঁচে থাকার আশাটাকে তুমি নিজ হাতে খুন করলে কী করে, আম্মু?"
লায়লা বেগম তবুও স্তব্ধ হয়ে থাকেন।নিজের ভুল স্বীকার করার মতো মানসিকতা তাঁর নেই।তিনি এখনও নিজেকে বোঝাচ্ছেন, যা করেছেন সব কিয়ামের মঙ্গলের জন্যই করেছেন।ছেলের হাহাকার তাঁর কানে পৌঁছালেও হৃদয়ে বোধহয় পৌঁছায় না।কিয়ামের দু’চোখ বেয়ে তখন শ্রাবণের ধারা।সে ডুকরে কেঁদে উঠে,
"বুকের ভেতরটা বড্ড পুড়ে যাচ্ছে আম্মু, মনে হচ্ছে এবার আমি মরেই যাব। মানুষ কি তার প্রাণভোমরা ছাড়া বাঁচতে পারে বলো? আমার প্রাণ তো তুমি নিজ হাতে কেড়ে নিয়েছ, এখন এই দেহটা দিয়ে আমি কী করব?"
জোর করে লায়লা বেগমের হাতটা নিজের মাথার ওপর রাখে কিয়াম। মিনতির সুরে বলে,
"আমি মারা গেলে ওকে একবার খবর দিও, আম্মু। ওকে বোলো আমার নিথর দেহটা অন্তত একবার এসে দেখে যেতে। আর... বাবাকে বোলো আমার কবরের পাশে যেন একটা কামিনী ফুলের গাছ লাগিয়ে দেয়।"
চলবে….?
(আজকে কেউ বলবেন না বড় করে দিতে।