ফন্ট সাইজ:
থিম:
চৈত্র শেষে শ্রাবণধারা

২২তম পর্ব

লেখক: চিন্ময়ী নূর

ভোর তখন পাঁচটা। চারপাশটা আবছা অন্ধকারে ঢাকা, পাখিরা সবে ডানা ঝাড়তে শুরু করেছে। তুরাগ খোলা বারান্দায় বসে খালি পেটে আয়েশ করে সিগারেট ফুঁকছে। ঘরের ভেতরে চৈতি তখনো অঘোরে ঘুমাচ্ছে। তুরাগ সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে একবার সামনের দিকে তাকায়। জাফর আলীর এই বিশাল বাড়ির চারপাশটা নানা রকমের ফুল ফলের গাছে ভরা, কিন্তু তুরাগের চোখ আটকে যায় একটা বিশাল নারকেল গাছের ওপর। হালকা কুয়াশার মাঝে তার মনে হয় নারকেলগুলো তার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। তুরাগের মনে হয়, এই মুহূর্তে এক ফোঁটা ডাবের পানি না খেলে তার জানটা বোধহয় বেরিয়ে যাবে। সে সিগারেটটা ঠোঁটে চেপে ধরে লুঙ্গিটা কষে বেঁধে নারকেল গাছের দিকে এগিয়ে যায়। ছোটবেলা থেকেই গাছে ওঠায় সে ওস্তাদ ঝড়-তুফানের মধ্যেও সে অবলীলায় মগডালে গিয়ে বসে থাকতে পারে। টানা কয়দিনের বৃষ্টির কারণে গাছটা শ্যাওলা জমে বেশ পিচ্ছিল হয়ে আছে। তুরাগ তা-ও একদম বাঁদরের মতো চটপটে ভঙ্গিতে তরতর করে উপরে উঠে যায়। আকাশে সূর্য এখনো মুখ দেখায়নি, মেঘের আড়ালে মুখ লুকিয়ে আছে। তুরাগ বেছে বেছে দশটা কচি ডাব নিচে ফেলে। ধুপধাপ শব্দ হতেই বাড়ির পেছন থেকে জাফর আলীর গমগমে কণ্ঠ ভেসে আসে,

"তুরাগ রে! তুই আজকেও সাতসকালে গাছে উঠছিস?"

তুরাগ গাছের ডাল ধরে দাঁত বের করে হাসে। উপর থেকেই চিৎকার করে বলে,

"আইয়ো দাদা, দুইটা ডাব খাইয়া যাও। দাদিরেও লগে লইয়া আইয়ো!"

জাফর আলী বিরক্তিমাখা আদুরে গলায় চেঁচিয়ে বলেন,

"তোর ডাব তুই-ই খা!"

তুরাগ আর কিছু না বলে ধীরে ধীরে গাছ থেকে নেমে আসে। ডাবগুলো এক জায়গায় জড়ো করে দা নিয়ে গাছের নিচে বসে সেগুলো কাটতে। কিন্তু কাটতে গিয়েই তার মাথায় একটা শয়তানি বুদ্ধি খেলে যায়। সে দা হাতে রেখেই চোরের মতো পা টিপে টিপে ঘরে ঢোকে,যে ঘরে চৈতি তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। চৈতিকে এভাবে ঘুমাতে দেখে তুরাগের পিত্তি জ্বলে যায়।সে বুঝতে পারে না একটা মানুষ আটটা-নয়টা পর্যন্ত কীভাবে ঘুমানোর ক্ষমতা রাখে! তুরাগ তো আজানের পর চাইলেও আর চোখ বুজতে পারে না, বেশিক্ষণ শুয়ে থাকলে তার গা-হাত-পা ব্যথা করে। তুরাগ আলতো করে চৈতির মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে। চৈতির শান্ত ঘুমের স্নিগ্ধ মুখখানার দিকে তাকিয়ে তুরাগের মাথায় শয়তানি বুদ্ধি খেলে যায়। সে মনে মনে এক চিলতে হাসে। তারপর হাতের ধারালো দা-টা চৈতির গলার বেশ কাছাকাছি নিয়ে গিয়ে গলাটা খাদে নামিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে,

"এই বেডি, চোখ খোল!"

চৈতি কোনো সাড়া দেয় না ঘুমের ঘোরে সে তখনো অঘোরে বিভোর। তুরাগ এবার হাতের নাগালে চৈতির কবজিতে কষে এক চিমটি কাটে। বিরস মুখে ডাকে,

"আরে বেডি, ডাকাত আইছে তোরে নিতে চোখ খোল।"

তাতেও কাজ হয় না দেখে তুরাগ এবার তার দুই আঙুল দিয়ে চৈতির নাকটা শক্ত করে চেপে ধরে। হঠাৎ ঘুমের মধ্যে শ্বাস বন্ধ হয়ে আসায় চৈতির মনে হয় দম আটকে আসছে বোধহয় আজরাইল চলে এসেছে তার জান কবজ করতে! সে হাঁসফাঁস করতে করতে বড় বড় চোখ মেলে তাকায়। চৈতিকে জেগে উঠতে দেখেই তুরাগ চট করে তার নাক ছেড়ে দেয়। তারপর দাঁত বের করে এক গাল হেসে ছন্দ মিলিয়ে বলে,

"এক বস্তা চাল, বউ তোমাকে শুভ সকাল!"

চৈতি বিরক্ত হয়ে তুরাগের বুক বরাবর জোরে ধাক্কা দিয়ে বিছানা থেকে উঠে বসে। সকাল সকাল ঘুমের বারোটা বাজিয়ে এই ধরনের ফাজলামি তার একদম সহ্য হচ্ছে না। চৈতির ধাক্কায় তুরাগ টাল সামলাতে না পেরে বিছানার একপাশে সরে বসে। চৈতির অগ্নিশর্মা মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে কতটা রেগে গেছে। চৈতি কোনো কথা না বলে রাগে গজগজ করতে করতে ওড়নাটা ভালো করে শরীরে পেঁচিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে চায়। পেছন থেকে তুরাগের খ্যাসখ‍্যাসে গলায় আজব এক সুর ভেসে আসে,

"বউ ছলাৎ ছলাৎ যায় রে,

আমার লগে রাগ কইরা রে

বউ ঘরের বাইরে গেলো রে,

জামাইয়ের লগে রাগ কইরা রে"

তুরাগ গানের কলি শেষ করে বউ বউ করে চৈতির পেছন পেছন ঘর থেকে বের হয়। চৈতি সেদিকে কানই দেয় না সে গটগট করে হেঁটে উঠানে চলে যায়। ভোরের স্নিগ্ধ আলো তখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। তুরাগ উঠানে রাখা ডাবগুলোর কাছে গিয়ে বসে পড়ে এবং দা দিয়ে কোপ দিয়ে একটা ডাব কাটতে কাটতে আবারও হাঁক ছাড়ে,

"ও রাজকন্যা! ডাব খায়া যাও।"

চৈতি এবার বিরক্তিতে তপ্ত শ্বাস ফেলে ঘুম ঘুম চোখে তুরাগের দিকে এগিয়ে যায়। সামনে দাঁড়িয়ে কোমরে হাত দিয়ে বেশ তেজ দেখিয়ে বলে,

"কী হইছে? সকাল সকাল অত চিল্লাচিল্লি কীসের?"

তুরাগ ডাবটা নিপুণভাবে কেটে উপরের অংশটা সরিয়ে ফেলে। তারপর ডাবটা চৈতির দিকে বাড়িয়ে দিয়ে দাঁত বের করে হাসে। সে একচোখ টিপে বলে,

"দিল তো পাগল হ্যায়! আই লাভ ইউ পুনা মাছের মা।"

চৈতির এবার সত্যি সত্যিই ইচ্ছা করছে হাতের ডাবটা দিয়ে তুরাগের মাথাটা ফাটিয়ে দিতে। লোকটা যে কত বড় ভণ্ড, সেটা চৈতি খুব ভালো করেই জানে। কাল রাতে যখন সে কথা বলতে চাইল, তখন তুরাগ এক নিমেষে চুপ হয়ে ঘুমের ভান করে পড়ে ছিলো। অথচ এখন সকাল হতেই কোত্থেকে এত ফুর্তি আর ভালোবাসা উথলে পড়ছে তার বুঝে আসে না।চৈতি ডাবটা তুরাগের দিকে ঠেলে দিয়ে রাগী স্বরে বলে,

"আপনার ডাব আপনিই খান, আমি খাব না!"

তুরাগ আর দ্বিতীয়বার সাধে না। সে বড়ই অদ্ভুত মানুষ চৈতি না করতেই সে নিজেই ডাবটা মুখে তুলে চুমুক দেয়। কিন্তু তাড়াহুড়ো করে খেতে গিয়ে অর্ধেকের বেশি পানি চিবুক বেয়ে তার নিজের গায়ে আর লুঙ্গিতে গড়িয়ে পড়ে।তুরাগ গেঞ্জিটা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে ভেজকুটি কেটে বলে,

"বদদোয়া লাগছে দেহি।"

চৈতি একদৃষ্টে তুরাগের এই কান্ড দেখছে। তুরাগ যে ভিজে একাকার হয়ে এক বিচ্ছিরি অবস্থা করে ফেলেছে, সেটা দেখে চৈতির রাগের মাঝেও একটা পৈশাচিক আনন্দ হয়। সে বাঁকা হেসে বলে,

"বেশ হয়েছে। সকাল সকাল মানুষের ঘুম হারাম করার ফল হাতে নাতে পেলেন তো?"

তুরাগ ভিজে যাওয়া লুঙ্গিটা একটু ঝাড়তে ঝাড়তে বাঁকা হাসি দেয়। সে চৈতির এই টিটকিরিটুকুও খুব উপভোগ করছে। সে দা-টা একপাশে রেখে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,

"ফল তো কেবল এইডাই না, সামনে আরও অনেক তিতা-মিঠা ফল আপনার লাইগা অপেক্ষা করতাছে।খালি অপেক্ষা করেন।"

~

সকাল ৮:৪০। আর মাত্র পাঁচ মিনিট, তারপরই কুহুর চিরচেনা এই শহর ছেড়ে চলে যাওয়ার শেষ সংকেত বেজে উঠবে। ট্রেনের সিটিটা হয়তো একটু পরেই কানে বিঁধবে, অথচ কুহু স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বসে আছে। সে জানে সে আসবে না, তবুও অবাধ্য মন বলছে যদি শেষ মুহূর্তে একবার অন্তত দেখা দেয়! কুহুর বুক ফেটে কান্না আসছে। যার জন্য বছরের পর বছর নিজের বাড়ি, নিজের শিকড় ছেড়ে অন্য একটা জায়গায় পড়ে রইল, সেই মানুষটা শেষ পর্যন্ত তার হলো না। যার জন্য সকল লাজ-লজ্জা বিসর্জন দিয়ে দিলো, সেই মানুষটা তাকে একবার বিদায় জানাতেও আসে না। কুহু টলমল পায়ে উঠে দাঁড়ায়। মনের কোণে মিছে যে ক্ষীণ আশাটুকু জমে ছিল, তা এখন মরীচিকার মতো মিলিয়ে গেছে। কিয়াম আসবে না, ওকে শেষবারের মতো দেখার কোনো তাড়না কিয়ামের নেই।সে হয়তো কোনো এক জাগায় সময় কাটাছে চৈতিকে ভেবে ভেবেই। কুহু এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বুকের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে, কেমন এক দমবন্ধ করা অনুভূতি। হাত-পা থরথর করে কাঁপে। আজ এই ট্রেনটা ছেড়ে দেওয়ার সাথে সাথেই কিয়ামের সঙ্গে তার সমস্ত স্মৃতি, সমস্ত না-বলা ভালোবাসা চিরতরে অপূর্ণ থেকে যাবে। আর কোনোদিন দেখা হবে না সেই মানুষটার সাথে। ঘড়ির কাঁটা আর মাত্র দুই মিনিট বাকি। কুহু জোর করে নিজের ভারী ব্যাগটা টেনে নিয়ে ট্রেনের শেষের বগিতে গিয়ে ওঠে। ট্রেনের একদম শেষ প্রান্তের জানালার ধারের সিটটায় গিয়ে বসে। সে বিষণ্ণ চোখে বাইরের ঝাপসা হয়ে আসা প্ল্যাটফর্মটার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে,

"এই না পাওয়ার যন্ত্রণায় আমি একদিন মরেই যাবো।"

কুহুর মনের গহিন থেকে আসা দীর্ঘশ্বাসটা ঠোঁটের আগায় আসার আগেই প্রকৃতি এক নিষ্ঠুর খেলায় মেতে ওঠে। মুহূর্তের মধ্যে পুরো পৃথিবীটা যেন ওলটপালট হয়ে যায়। প্রচণ্ড এক ঝাকুনিতে ট্রেনটা কেঁপে ওঠে, কানে তালা লাগানো ধাতব শব্দের আর্তনাদ ছাপিয়ে ভেসে আসে শত শত মানুষের গগনবিদারী চিৎকার। কুহু কিছুই বুঝে উঠতে পারে না। এক সেকেন্ড মাত্র এক সেকেন্ডের ব্যবধানে তার জীবন্ত শরীরটা অসাড় হয়ে আসে। চোখের পাতা দুটো ভারী হয়ে বন্ধ হয়ে আসার আগে সে শুধু এক পলক বাইরের ধোঁয়া আর ধ্বংসস্তূপ দেখতে পায়। ব্যস, সেটুকুই। কুহুর প্রাণের সব মায়া, সব হাহাকার আর না-পাওয়ার দহন দুনিয়ার বুক থেকে চিরতরে মুছে যায়। কুহু আর কোনোদিন কিয়ামের সামনে গিয়ে দাঁড়াবে না। কোনোদিন চোখের জল ফেলে ভালোবাসার আবদার করবে না। সেই যে অভিমান করে নির্লজ্জের মতো নিজেকে সঁপে দিয়ে কিয়ামের একটুখানি মনোযোগ কাড়তে চেয়েছিল, সেই তাড়নাও আজ স্তব্ধ। কুহুর সব ফুরিয়ে গেছে। তার বুকের ভেতর পাথর হয়ে জমে থাকা সেই না-পাওয়ার তীব্র যন্ত্রণাটা এখন আর নেই। আজ থেকে আর কিয়ামের অপেক্ষায় কোনো নির্ঘুম রাত তাকে পার করতে হবে না। কুহু এখন ঘুমাবে। এক গভীর, নিস্তরঙ্গ আর অনন্ত শান্তিতে সে তলিয়ে গেছে। আজ যদি পৃথিবী ফেটে চিৎকার আসে কিংবা কিয়াম নিজে এসে তাকে হাজারবার ডাকে, কুহু আর ফিরবে না। কিয়ামের প্রতি তার যে আজন্ম তৃষ্ণা ছিল, সেই আফসোসটুকু সঙ্গে নিয়েই সে পালিয়ে গেছে। কিয়ামকে তার এই একরোখা ভালোবাসার দায় থেকে চিরতরে মুক্তি দিয়ে কুহু এমন এক দেশে পাড়ি জমিয়েছে, যেখান থেকে ফেরার কোনো পথ নেই। তার অপূর্ণ ভালোবাসার গল্পটা ট্রেনের সেই শেষ বগিতেই রক্ত আর ধুলোর মিশেলে এক করুণ মহাকাব্য হয়ে রইল। কিয়াম হয়তো জানবেও না, তাকে মুক্তি দিতে গিয়ে কুহু নিজের অস্তিত্বটাই পৃথিবী থেকে মুছে দিয়ে গেছে।

চলবে…

(ছোট বলে কেউ লজ্জা দিবেন না।আমি ইচ্ছে করে ছোট পর্ব দেইনা।আমি যদি লিখতে পারতাম প্রতিদিন তিন চার হাজার শব্দের পর্ব দিতাম।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন