তুরাগ আর চৈতি জাফর আলীর বাড়ির ঘাটে এসে পৌঁছায়। গ্রামের সবচেয়ে উঁচু এবং বনেদি এই বাড়িটি নিয়ে লোকমুখে নানা গল্প প্রচলিত। শোনা যায়, শত বছর আগে যখন জমিদারি প্রথা ছিল, তখন জাফর আলীর পূর্বপুরুষরা অত্যন্ত প্রভাবশালী ছিলেন। সেই জমিদারি আমলের ব্যবসায়িক সমৃদ্ধির কারণে আলী বংশের প্রতিপত্তি ছিল দেখার মতো। বর্ষার প্লাবন থেকে বাঁচতে তারা অনেক উঁচু জমিতে এই বিশাল অট্টালিকা নির্মাণ করেছিলেন। তুরাগ চৈতির হাত ধরে বাড়ির ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে গলা ছেড়ে ডাক দেয়,
"ও দাদা! কই তুমি?"
বিশাল অন্দরমহলের গাম্ভীর্য ভেদ করে ভেতর থেকে জাফর আলীর দরাজ কণ্ঠ ভেসে আসে,
"ঘরে আয়।"
অন্দরমহলে পা রাখতেই তুরাগ আর চৈতি থমকে দাঁড়ায়। তাদের চোখে পড়ে এক অদ্ভুত আর বৈপরীত্যে ভরা দৃশ্য। বিশাল হলঘরের মাঝখানে রাজকীয় মেহগনি কাঠের কারুকার্য করা এক বিশাল সোফায় বেশ আয়েশ করে বসে আছেন আলো বেগম। কিন্তু সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, জাফর আলী আলো বেগমের পায়ের কাছে বসে আছেন। হাতে একটি ছোট্ট মাটির বাটি, তাতে টকটকে লাল রঙের তরল আলতা। তিনি অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে, নিপুণ শিল্পী তার শ্রেষ্ঠ কারুকাজ করছেন, সেভাবে বাটি থেকে আলতা নিয়ে আলো বেগমের পায়ে লাগিয়ে দিচ্ছেন। তুরাগ এই দৃশ্য দেখেও না দেখার ভান করে দাঁত বের করে হাসে। সে ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছে, জাফর আলী আলো বেগম কে খুব যত্ন করে। চৈতি তো বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে থাকে। তার কল্পনাতেও ছিল না যে জাফর আলী তার স্ত্রীকে এতটা ভালোবাসেন! এই বয়সে এসেও কেউ নিজের স্ত্রীর পায়ে এভাবে আলতা পরিয়ে দিতে পারে, তা চৈতির কাছে এক অবিশ্বাস্য সুন্দর দৃশ্যের মতো মনে হয়।
জাফর আলী তড়িঘড়ি করে আলতার বাটিটা একপাশে রেখে চশমাটা ঠিক করে নেন। তারপর ভ্রু কুঁচকে তুরাগের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় ডেকে বলেন,
"কিরে? তোরা এই সন্ধ্যায় হুট কইরা এইখানে? কোনো অঘটন ঘটল নাকি?"
তুরাগ চৈতির হাত ধরে আরও একটু সামনে এগিয়ে গিয়ে তাদের সামনে দাঁড়ায়। ঠোঁটের কোণে হাসিটা ঝুলিয়ে তুরাগ আলগোছে বলে,
"অঘটন আর কি! তুমগোর বাড়িতে বেড়াইতে আইছি। থাকতে দিবানি?"
তুরাগের এই রসিকতা মেশানো কথা শুনে জাফর আলীর মেজাজ চট করে চড়ে যায়। তিনি সোফার পাশে রাখা তার শক্ত লাঠিটা হাতড়ে খুঁজে বের করেন এবং মুহূর্তের মধ্যে তুরাগের পায়ে একখানা সজোরে বাড়ি দেন।
"বেয়াদব! জমিদারি হাকাস আমার লগে?" জাফর আলী গর্জে ওঠেন।
তুরাগ ব্যথায় কুঁকড়ে গিয়ে এক হাতে পা ডলতে ডলতে চিৎকার করে বলে ওঠে,
"উহ্! বুড়া মানুষের হাতে তো দেখি এখনো অনেক জোর! থাকমু না তোমার বাড়িতে, যাও। বউ, চলো এখান থেকে!"
তুরাগ নাটকীয়ভাবে চৈতির হাত ধরে উল্টো ঘুরে বাড়ির সদর দরজার দিকে হাঁটা দিতে শুরু করে। চৈতি তো অপ্রস্তুত হয়ে তুরাগের সাথে পা বাড়াতে যাচ্ছে, পেছন থেকে আলো বেগমের মায়াবী কণ্ঠস্বর ভেসে আসে। তিনি সোফা থেকে একটু উঠে দাঁড়িয়ে কড়া গলায় ডাক দেন,
"এক পা বাড়ির থেকে বের হলে পা একদম কেটে ফেলবো!"
আলো বেগমের ধমক শুনে তুরাগ থমকে দাঁড়ায়। সে মুচকি হেসে চৈতির দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় বোঝায় 'কেল্লা ফতে'। বাড়ির মালিকানা যার হাতেই থাক, আসল হুকুম যে দাদিমার, সেটা তুরাগ ভালো করেই জানে। জাফর আলী আবারও লাঠি ঠুকে বলেন,
"বউটারে নিয়া ঘরে ঢোক। এই রাইতে ঢং করিস না।"
তুরাগ এবার বিজয়ী হাসি দিয়ে আবার ঘরে ঢুকে একদম জাফর আলীর গা ঘেঁষে বসে পড়ে। জাফর আলী বিরক্তিতে মুখ কুঁচকে তামাকের নলটা সরিয়ে নিয়ে বলেন,
"দূরে যা! গায়ের মধ্যে এমনে সপসপ করতাছস কেরে?"
তুরাগ সরলই না সে আরও একটু জাফর আলীর সঙ্গে লেপ্টে বসে রয়। জাফর আলী সঙ্গে সঙ্গে খেঁকিয়ে উঠে বসেন, গা থেকে একটা আস্ত বিটকেল কিছু ঝেড়ে ফেলতে চাইছেন। আলো বেগম এই দৃশ্য দেখে হেসে কুটিপাটি। তিনি পরম মমতায় চৈতির হাত ধরে বলেন,
"চল মা, এদের কাহিনি আজ শেষ হবে না। রাত কাবার হয়ে যাবে, তাও এদের ঝগড়া থামবে না।"
চৈতি নিজেও এই খুনসুটি দেখে মুচকি হেসে আলো বেগমের সঙ্গে ভেতরের দিকে যায়। আলো বেগম চৈতিকে একটা নরম সোফায় বসিয়ে দিয়ে দ্রুত পায়ে রান্নাঘরে যান। কিছুক্ষণ পর একটা বড় কাঁচের বয়ামভর্তি ধবধবে সাদা নারকেল নাড়ু এনে চৈতির হাতে ধরিয়ে দেন। চৈতি লাজুক ভঙ্গিতে না করতে যাবে, তার আগেই আলো বেগম কৃত্রিম রাগে চৈতির কানটা হালকা করে টেনে ধরে বলেন,
"না করলে একদম মার খাবি! আমার হাতের নাড়ু একবার খাইলে পরেরবার নিজেই চাইয়া নিবি।"
চৈতি ভয়ে আর কিছু বলার সাহস পায় না, শুধু বিনম্রভাবে নাড়ুর বয়ামটা ধরে থাকে। তুরাগ হলঘর থেকে চেঁচিয়ে চৈতিকে ডেকে বলে,
"ও বউ! আমারে দুইডা দাও তো।"
চৈতি এবার সুযোগ বুঝে উঠে গিয়ে তুরাগের কাছে পুরো বয়ামটাই দিয়ে আসে। তুরাগ এক সঙ্গে দুটো নাড়ু মুখে পুরে দিয়ে আয়েশ করে চিবিয়ে বলে,
"তোমার বউ কি মজার খানা বানায় দাদা! আহা! আমার বউটা তো জুতমতো একখান লাউও কুটতে পারে না, রান্না তো দূরের কথা।"
তুরাগের কথা শেষ হতে না হতেই আলো বেগম পেছন থেকে এগিয়ে এসে তুরাগের মাথায় কষে এক চাটি মারেন। তিনি ধমক দিয়ে বলেন,
"বউকে এভাবে বলে না। আস্তে আস্তে সব শিখে যাবে। বিয়ের পর আমিও তো কিছু পারতাম না, তোর দাদাই তো আমারে হাত ধইরা সব শিখাইছে।"
আলো বেগম আবার আয়েশ করে সোফায় গিয়ে বসলেন। তুরাগ চৈতির জড়তা দেখে আলতো করে চোখের ইশারায় পাশে বসতে বলে বলে,
"বয়ও।"
চৈতি চুপচাপ তুরাগের পাশে বসে পড়ে। ঘরটায় এখন নিস্তব্ধতা। জাফর আলী আবারও বাটিটা হাতে তুলে নেন এবং খুব যত্ন করে আলো বেগমের পায়ে আলতা মাখাতে শুরু করেন। বড়দের এই মধুর দৃশ্য দেখে চৈতির মনের ভেতরের কৌতূহল আর চেপে রাখা যায় না। সে নিজের লজ্জা ভেঙে হুট করেই জিজ্ঞেস করে বসে,
"আপনারা কি প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন?"
চৈতির এই বাচ্চার মতো সরল প্রশ্ন শুনে জাফর আলী আর আলো বেগম দুজনেই একসাথে হেসে ওঠেন। আলো বেগম একটু লাজুক মুখে আঁচলে মুখ চেপে হেসে বলেন?
"শোনো তবে নাতবউ সেই গল্প। তোমার দাদা তখন জোয়ান পোলা, আমার বাপের বাড়িতে বাউল গান গাইতে যাইতো। সেই সময় গ্রামে গ্রামে বাউল গানের খুব চল ছিল। আমার বাপ ছিল বাউল গানের জন্য পাগল, সপ্তাহে একদিন আসর বসাইত। তোমার দাদাও গান গাইতে আসত। যুবক কালে সে দেখতে ছিল রাজার মতো সুন্দর। আমার আবার গান-বাজনা খুব একটা পছন্দ ছিল না, তাই ঘর থেকে বের হইতাম না। কিন্তু আমার বোনরা সারাদিন এই দয়ালের গলার প্রশংসা করত, দেখতে নাকি অনেক সুন্দর! তো একবার শখ হইলো লোকটারে দেখার, গেলাম দেখতে। দেইখা ভালোই লাগল, কিন্তু তখন তো আমি বড় হইছি, পড়াশোনা করার জন্য শহরে যামু মাস খানেক পর। তাই আর এসব নিয়া মাথা ঘামাই নাই। কিন্তু এরপর কয়েকবার গেছিলাম গান শুনতে। একদিন পুকুরঘাটে গিয়ে দেখি উনি দাঁড়িয়ে আছে। প্রথমে দেখে ভয়ই পাইছিলাম। পরে শুনলাম রাতে প্রচণ্ড বৃষ্টির জন্য যেতে পারেন নাই, আমাদের বাড়িতেই ছিলেন। ওইদিনই প্রথম সামনাসামনি দেখা। এরপর যখনই গান শুনতে যাই, দেখি বেডায় গান গাইতে গাইতে আমার দিকেই তাকিয়ে থাকে। মনকে অনেক বুঝাইলাম যে এখন পড়ার সময়, মন দেওয়া-নেওয়ার সময় না।কিন্তু মন কি আর মানে?"
আলো বেগম থেমে শ্বাস নিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন,
"কয়েকমাস পর নিজেই একখান চিঠি লিখলাম। আব্বায় তখন গানের দলরে খামে করে টাকা দিত, আমি খামের ভেতরেই চিঠিটা ঢুকিয়ে দিলাম। সাথে চেনার জন্য একটা ছবিও দিয়া দিলাম। পরের সপ্তাহে উনি আর আসলেন না! আমার তো মন খারাপ, ভাবলাম বুঝি সব শেষ। গান না শুনেই ঘরে চলে গেলাম। কিন্তু ঘরে গিয়ে যা দেখলাম, তা তো কল্পনার বাইরে! গিয়ে দেখি উনি আর আমার বাপ সোফায় বইসা কথা বলছে, সাথে আরও মুরুব্বিরা আছে। ছোট বোন দৌড়ে এসে বলল, 'বুবু, তোমার জন্য বিয়ের প্রস্তাব আসছে, সবাই রাজি। তুমি হ্যাঁ করলেই আজই বিয়ে হয়ে যাবে!' আমি আর দেরি করি নাই মা, সলজ্জে হ্যাঁ বলে দিলাম। ওইদিন রাতেই আমি এই বাড়ির বউ হয়ে চলে আসলাম।"
আলো বেগম আর কাউকে কিছু বলার সুযোগই দিলেন না। তিনি তুরাগের চোখের দিকে তাকিয়ে তাড়া দেন,
"আগে বল এখানে হঠাৎ আসলি কেন? কোনো বিপদ হইছে?"
তুরাগ অপরাধী মুখে মাথা চুলকিয়ে নিচু স্বরে বলে,
"বাড়িতে পানি ডুকছে দাদি… দেয়াল ধইসা পড়তাছে!"
আর কিছু বলতে হয় না, তুরাগের কথা শেষ হওয়ার আগেই জাফর আলী খেঁকিয়ে ওঠেন। তিনি আলতার বাটিটা মেঝেতে রেখে রাগত স্বরে বলেন,
"কতবার বলেছি কিনিস না এই বিলের ধারের বাড়ি! আমার কথা তো কানে নিস না, এখন বুঝ ঠ্যালা।"
আলো বেগম হাত তুলে জাফর আলীকে থামিয়ে দিয়ে বলেন,
"হইছে, উনার বকবক আর শুনতে হবে না। যা হওয়ার হইছে।"
তারপর তিনি তুরাগ আর চৈতির দিকে তাকিয়ে ঘোষণা করেন,
"তোরা গিয়ে তোদের ঘর ঠিক করে নে। আমি আর তোদের কোনো জায়গায় যেতে দেবো না। যতদিন আমি বেঁচে আছি, তোরা আমার সাথেই এই বাড়িতে থাকবি।"
আলো বেগমের এই হুকুমে তুরাগ হাতে চাঁদ পায়! সে আহ্লাদে আটখানা হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে নিজের লুঙ্গিটা কোমরে শক্ত করে গিঁট দিয়ে বেঁধে নেয়। তারপর জাফর আলীর দিকে তাকিয়ে একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলে,
"তোমার মতো এমন খাটাস বুড়ারে আমার দাদি যে কেমনে প্রেমে ফালাইল, এইডাই আমার বুঝে আসে না!"
জাফর আলী এবার আর রাগের মাথায় কথা বলেন না, শুধু ভ্রু কুঁচকে একটা তাচ্ছিল্যের দৃষ্টি দেন। তুরাগ চৈতির হাত ধরে তাকে নিয়ে চলে তাদের থাকার ঘরের দিকে। অবিবাহিত অবস্থায় তুরাগ এই ঘরেই থাকত। এই ঘরটা আসলে বাড়ির সীমানার একটু কাছে, যেখান থেকে তুরাগের সাধের পুকুরটা দেখা যায়। গ্রামের মানুষ রাতের অন্ধকারে চোরের মতো এসে তার পুকুরে জাল ফেলত, মাছ চুরি করত। চোর তাড়ানোর জন্য তুরাগ রাত জেগে এই ঘরে পড়ে থাকত। বিয়ের পরও যতদিন না মাছগুলো বিক্রির উপযুক্ত হয়েছিল, সে এখানেই রাত কাটাত। কিন্তু চৈতি একা বাড়িতে রেখে তুরাগের ভালো লাগতো না। তাই সে মাছগুলো বড় হওয়ার আগেই কয়েকমাস আগে সব বিক্রি করে দিয়ে বাড়িতে ফিরে গিয়েছিল। ঘরটার দরজা খুলতেই কাঠের এক অদ্ভুত সোঁদা গন্ধ চৈতির নাকে লাগে। অন্ধকার ঘরে জানালা দিয়ে বিলের ধারের হিমেল হাওয়া ধেয়ে আসছে। তুরাগ একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে চৈতির দিকে তাকিয়ে নরম স্বরে বলল,
"তুমি বইসা থাহো, আমি সব গোছায়া দিতাছি।"
হঠাৎ তুরাগের মুখে এমন তুমি ডাক শুনে চৈতি চমকে ওঠে।সে অবাক হয়ে শুধায়,
"তুমি করে বলছেন যে?"
তুরাগ বিছানার ওপরের পুরনো চাদর আর ধুলোবালি ঝেড়ে সব ফিক্কিয়ে ফেলে দিতে দিতে বলে,
"এখন তো প্রেম প্রেম পেলে তো আর সমস্যা নেই "
চৈতি মুখ চেপে হাসে। লজ্জা পেলেও সে পা টিপে টিপে তুরাগের দিকে এগিয়ে যায়। কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে বলে,
"আবার দেখছি শুদ্ধ ভাষায়ও কথা বলছেন? ব্যাপার কী?"
তুরাগ চাদরটা ঠিক করতে করতে বলে,
"আমার গ্রামের ভাষায় কথা বলতে ভালো লাগে তাই বলি। আব্বা বেঁচে থাকতে কোনোদিন শুদ্ধ ভাষা ছাড়া কথা বলতে পারতাম না।"
চৈতি ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করে,
"কেন?"
"আব্বা চাইতেন তার অবর্তমানে আমি যেন গ্রামের মানুষের কাছে তাঁর মতো বড় এক মাস্টার হই।"
"হননি কেন?"
তুরাগ এবার একটু মলিন হাসে।তারপর শান্ত গলায় বলে,
"সুযোগ হয়নি, তবে পড়ালেখা ছেড়ে দিইনি। আমি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি শেষ করেছি।"
তুরাগের মুখে বিএসসি পড়ার কথা শুনে চৈতি যেন আকাশ থেকে পড়ে! সে স্বপ্নেও ভাবেনি যে বিলের ধারে নৌকা বাওয়া এই মানুষটা এত উচ্চশিক্ষিত। তার তো কোনোদিন চলাফেরা বা পোশাকে মনে হয়নি যে সে বড় কোনো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নিয়েছে। চৈতি বিস্ময় সামলে জিজ্ঞেস করে,
"আপনি এত পড়াশোনা করেছেন, তাহলে এমন সাধারণ হয়ে থাকেন কেন? লোকে তো মাস্টার কিংবা বড় অফিসার হয়!"
তুরাগ সব কাজ ফেলে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে এগিয়ে আসে চৈতির দিকে। মোমবাতির কাঁপা আলোয় তার অবয়বটা অনেক বেশি গম্ভীর দেখাচ্ছিল। সে ধীরস্থিরে বলে,
"ভালো লাগে এইভাবে মাটির কাছাকাছি থাকতে, তাই থাকি। আর এই লুঙ্গিগুলো দেখছ এগুলো আমার আব্বা নিজ হাতে তৈরি করেছেন। উনার স্মৃতি জড়িয়ে আছে এগুলোতে, তাই পরি। নাহলে তোমার মতো এই সাদা বউ ছাড়া অন্য কোনো সাদা রঙ আমার পছন্দ না।"
চৈতি দাঁত কিড়মিড় করে তাকায় তুরাগের দিকে। রোমান্টিক কথার আড়ালে লোকটা যে তাকে আবার খ্যাপালো, সেটা সে ঠিকই বুঝেছে। কিন্তু চৈতির মন এখন অন্য কিছু জানতে চাইছে। সে গম্ভীর হয়ে জিজ্ঞেস করে,
"আপনার পুরো পরিবার কই? তারা কি গ্রামের বাড়িতে থাকে না?"
তুরাগ এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে যায়। তারপর খুব নিস্পৃহ গলায় মাথা নেড়ে বলে,
"আত্মহত্যা করেছে সবাই।"
চৈতির মনে হয় তার বুকের ভেতরটা কেউ বরফ দিয়ে জমিয়ে দিয়েছে। তার আত্মা কেঁপে ওঠে। সে কম্পিত স্বরে বলে,
"কে কে ছিল আপনার পরিবারে? আর কেন তারা এমন করল?"
তুরাগ চোখের পলক না ফেলে চৈতির দিকে তাকিয়ে প্রথম প্রশ্নের উত্তর দেয়,
"আব্বা, আম্মা, বড় বোন, ছোট দুই ভাই আর আর ছোট এক বোন।"
এতগুলো মানুষ একসাথে চলে গেছে! চৈতি আরও কিছু জিজ্ঞেস করতে চায়,তুরাগ সম্পর্কে সে কিছুই জানেনা তার অনেক কিছু জানা বাকি। কিন্তু তুরাগ তাকে সেই সুযোগ দেয় না। সে ধপ করে বিছানায় বসে পড়ে এবং খুব ক্লান্ত স্বরে বলে,
"আর কিছু জিজ্ঞেস করবেন না। আমার ভালো লাগছে না।"
কথাটা বলেই তুরাগ বালিশে মাথা রেখে চোখ বুঁজে ফেলে। চৈতি একদম থমত খেয়ে যায়। এই তো কিছুক্ষণ আগেই লোকটা হেসে হেসে কথা বলছিল, আর মুহূর্তের মধ্যেই তার ভালো লাগছেনা বলে বালিশে মাথা গুঁজে দিলো? চৈতি এগিয়ে গিয়ে তুরাগের ওপর ঝুঁকে পড়ে ডাকে,
"আমার প্রশ্নের জবাব দিন। কী হয়েছে আপনার?"
তুরাগ ওঠে না, এমনকি চোখের পাতাও নড়ায় না। সে নির্জীব হয়ে শুয়ে থাকে। তুরাগের এই আকস্মিক পরিবর্তনের কারণ চৈতির মাথায় খেলে না। তার কাছে তুরাগ সবসময়ই এক মস্ত বড় ধাঁধার মতো ছিল, কিন্তু আজ এই অসমাপ্ত কথাগুলো শুনে সেই ধাঁধা আরও জটিল হয়ে উঠল। অন্ধকার ঘরে মোমবাতিটা শেষ হয়ে আসছিল, চৈতি নিস্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে এক অজানা রহস্যের পাহাড়ের সামনে।
চলবে….
(নয়টা বাজে দিবো বলেও সাতটা বাজে দিয়েছি এই খুশিতে ৯০০ রিয়েক্ট করে দিন।)