বাতাসের ভারী গন্ধে মিশে আছে ওষুধ আর লাশের হিমশীতল ঘ্রাণ। চারদিন দীর্ঘ চারটে দিন নরকযন্ত্রণা সহ্য করার পর অবশেষে খোঁজ মেলে কুহুর। কিন্তু একে কি আদেও খোঁজ মেলা বলে? একটা চাদরে ঢাকা বীভৎস, ছিন্নভিন্ন স্তূপ কিয়ামের সামনে এনে রাখা হয়েছে, যার কোনো অবয়ব নেই, কোনো পরিচয় নেই। ফরেনসিক রিপোর্ট আর হাতের একটা পোড়া ব্রেসলেট দেখে বলা হয়েছে এটাই কুহু। লায়লা বেগম হাসপাতালের মেঝেতে আছড়ে পড়ে বিলাপ করছেন। তার আর্তনাদে হাসপাতালের দেয়ালগুলোও শিউরে উঠছে। কুহু তো শুধু তার ভাইয়ের মেয়ে ছিল না। মেয়েটাকে নিজের মেয়ের মতো আদরে আগলে বড় করেছেন তিনি। তার হাসিখুশি কুহুটা আজ কেবল কতগুলো মাংসপিণ্ড হয়ে ফিরে আসবে, তা তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি। লায়লা বেগমের আহাজারি সহ্য করার ক্ষমতা কারো নেই। কুহুর বাবা-মা দেশের বাইরে থাকায় এখনো পৌঁছাতে পারেননি, তাই এই লাশের স্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে থাকার সবটুকু দায়ভার এখন কিয়ামের ওপর। কিয়াম চাদরের তলার বিভীষিকার দিকে তাকিয়ে থাকে। তার বুকের ভেতরটা মরুভূমির মতো খাঁ খাঁ করছে। সে বিড়বিড় করে শুধু একটা কথাই বলতে,
"অপেক্ষা করবি বলছিলি না? করলি না কেন? দেখ এখন কী অবস্থা হয়েছে, কেউ যে মুখটা দেখবে এই অবস্থায় তো তুই নেই। সারাদিন না আমাকে নিজের মুখ দেখার জন্য কত কী করতি, তাহলে আজ দেখাচ্ছিস না কেন? দেখ আমি এসেছি, চোখ খোল। নিজের মুখটা দেখা, দেখব আমি তোর মুখ। কুহু... আমি কিছু বলছি, চোখ খোল। সবসময় কি আমার অবাধ্য হয়ে চলবি তুই?"
কিয়ামের মুখ থেকে এই একটা কথা শোনার জন্য কুহু কত প্রহর গুনেছে, কত রাত চোখের জলে বালিশ ভিজিয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। আজ যদি কুহু বেঁচে থাকতো, তবে কিয়ামের এই আক্ষেপ শুনে সে হয়তো খুশিতেই মরে যেতো। কিন্তু এমন সুখের দিন কুহুর ভাগ্যে আর সইল না। নিয়তি তাকে এমন এক জায়গায় নিয়ে গেছে, যেখান থেকে কিয়ামের এই হাহাকার আর তার কানে পৌঁছাবে না।
বিকেল পাঁচটা নাগাদ কুহুর বাবা-মা বিধ্বস্ত অবস্থায় দেশে ফেরেন। নিজের আদরের সন্তানের নিথর দেহ দেখে তাদের আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। রাত দশটায় কুহুর পৈতৃক ভিটায় তার দাফনের আয়োজন করা হয়। কুহুর জানাজা শেষে যখন তাকে কবরস্থানের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, তখন কুহুর খাটিয়ার প্রথম পায়াটা কিয়ামই ধরে। নিজের কাঁধে কুহুর শেষ ভারটা বয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় কিয়ামের মনে হয়, সে তার জীবনের একটি সুখের ঠিকানা কে কবর দিতে যাচ্ছে। দাফন শেষ হয়ে যায়। একে একে সবাই চলে গেলেও কিয়াম নড়ে না। কবরের পাশে মৃত্যুপুরীর নিস্তব্ধতা নিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা বসে থাকে সে। কুহুর প্রিয় কামিনী ফুলের একটা শুভ্র গাজরা সে সাথে করে এনেছে। খুব যত্ন করে, পরম গাজরাটা কবরের ওপর রেখে দেয় কিয়াম। কুহু এই ফুলটা খুব ভালোবাসত, এর সুবাসে সে পাগল হয়ে যেত। গাজরাটা রাখা শেষ হলে কিয়াম উঠে দাঁড়ায়। ঝাপসা চোখে শেষবারের মতো কবরের মাটির দিকে তাকিয়ে সে নিঃশব্দে নিজের বাড়ির দিকে রওনা হয়। কুহু চলে গেছে তাকে মুক্তি দিয়ে, অথচ কিয়াম এখন নিজের ভেতরেই এক আজন্ম কারাবাসে বন্দি হয়ে রয়।
~
সকাল থেকেই তুরাগের কাণ্ডকারখানা দেখে চৈতি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। গত তিন মাসের ঘরসংসারে তুরাগকে সে কেবল লুঙ্গি আর ঢিলেঢালা শার্টেই দেখে এসেছে, অনেকটা বাউল বা ভবঘুরেদের মতো। কিন্তু আজ চিত্রটা একদম ভিন্ন। তুরাগ আজ বেশ ফিটফাট। পরনে টানটান একটা প্যান্ট, কবজিতে চকচকে একটা ঘড়ি। চৈতি আড়চোখে কয়েকবার তাকালো দেখল তুরাগ আজ নিজেকে আয়নায় দেখে আর তৃপ্ত হচ্ছে না। সে একবার আয়নার সামনে যাচ্ছে, নেচে নেচে নিজের মুখ দেখছে, আবার পরক্ষণেই চিরুনি চালিয়ে চুলগুলো ঠিক করছে। অন্তত দশবার তো হবেই যে সে তার চুলের স্টাইল পাল্টেছে। সারাদিন যে লোকটা দয়াল বাবার মতো উদাসীন হয়ে ঘুরে বেড়ায়, তার এই হঠাৎ বাবু সাজার রহস্য চৈতি উদ্ধার করতে পারল না। খাটুনির পর খাটে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিল চৈতি, কিন্তু তুরাগের এই আদিখ্যেতা দেখে তার বিরক্তি এবার চরমে পৌঁছালো। সে বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করেই বসল,
"আপনি এত সেজেগুজে কোথায় যাচ্ছেন শুনি?"
তুরাগ চৈতির অস্তিত্বই টের পেল না! সে সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে আপন মনে শিস দিতে দিতে গায়ের শার্টটা ঠিক করতে লাগল। এই অবহেলায় চৈতি প্রচণ্ড চটে যায়। সে তড়বড় করে খাট থেকে নেমে কোমরে হাত দিয়ে একদম তুরাগের সামনে গিয়ে রুখে দাঁড়ায়। তুরাগ এবার আলতো করে একটা ধাক্কা দিয়ে চৈতিকে সরিয়ে দেয়। তারপর আবারও আয়নায় নিজেকে একবার দেখে নিয়ে, চৈতির দিকে মায়াবী চোখে তাকিয়ে অমায়িক হাসল।
"বলেন তো রাজকন্যা, কেমন লাগছে আমাকে?"
চৈতি মুখটা একদম কুঁচকে ফেলল। রাগে আর বিরক্তিতে তার মাথায় আগুন জ্বলছে। সে ঠোঁট উল্টে ঝাঝালো গলায় জবাব দিল,
"কালো শার্ট প্যান্টে আপনাকে একদম কাকের আব্বা লাগছে! একটা কালো চশমা পরে নিন চোখে, তাহলে একদম কাকের ডিজে আব্বা লাগবে। এবার হয়েছে? এখন বলেন কোথায় যাচ্ছেন?"
তুরাগ চৈতির কথা শুনেও রাগ করল না, বরং শব্দ করে হেসে উঠল।
"শহরে যাচ্ছি একটু কাম আছে।"
চৈতির কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে। যে মানুষটা আজকাল বাড়ির চৌকাঠ পেরোতে চায় না, তার হঠাৎ শহরের কাজে এত সাজগোজ? সে আবারও জেদ নিয়ে প্রশ্ন করে,
"কিসের এমন কাজ পড়ল হঠাৎ? আগে তো কখনো বলেননি!"
তুরাগ এবার শার্টের কলারটা আর একবার টেনে ঠিক করে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত দায়সারা ভাবে বলে,
"আইয়া কমুনে।"
চৈতি এই অস্পষ্ট উত্তরে মোটেও শান্ত হয় না। তুরাগের এই এড়িয়ে যাওয়ার ভঙ্গি তার মনে খটকা বাড়িয়ে দিচ্ছে। সে তুরাগের পথ আটকে দাঁড়িয়ে অনেকটা ধমকের সুরে জিজ্ঞেস করে,
"না, আমাকে এখনই বলে যাবেন। লুকিয়ে কী করছেন আপনি?"
এবার তুরাগের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে যায়। তার মুখের হাসিখুশি ভাবটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গিয়ে সেখানে এক কঠোর কাঠিন্য ফুটে ওঠে। সে কড়া চোখে চৈতির দিকে তাকিয়ে ধমক দিয়ে বলে,
"কইছি না আইয়া কমু? তাও কেরে বারবার এক কথা নিয়া জোর করতাছেন? ঘরের ভেতরে থাকেন, বাইরের খবর নিয়া আপনার না ভাবলেও চলব!"
তুরাগের এমন রুক্ষ আচরণে চৈতি স্তব্ধ হয়ে যায়। তার চোখ দুটো অভিমানে ভিজে আসে, গলার কাছে এক দলা কান্না আটকে থাকে। তুরাগ তার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়, একবার পেছন ফিরে তাকানোর কিংবা বিদায় নেওয়ার প্রয়োজনও বোধ করে না। চৈতির দুচোখ বেয়ে অবিরল ধারায় পানি ঝরতে থাকে। অভিমানে সে আর নিজ থেকে জানতেও চায় না লোকটা কখন ফিরবে বা আদেও ফিরবে কি না। তুরাগ বেরিয়ে যাওয়ার মিনিট পাঁচেক পর চৈতি নিজেকে একটু সামলে নিয়ে ধীরপায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। উঠানে আসতেই দেখে আলো বেগম আর জাফর আলী রোদে বসে মনোযোগ দিয়ে মাছ কাটছেন। চারপাশের শান্ত পরিবেশটা তার মনের অস্থিরতার সাথে একদমই মিলছে না। চৈতিকে ওভাবে বিমর্ষ আর উদাস মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আলো বেগম হাতের বঁটিটা একটু সরিয়ে রাখেন। তিনি অভিজ্ঞ চোখে চৈতির ফোলা চোখ দুটো দেখে নেন।মমতাময় সুরে আলো বেগম ডাক দেন,
"ও নাতবউ! ওখানে ওভাবে খাম্বার মতো দাঁড়ায়ে আছ কেন? এদিকে আসো দেহি।"
চৈতি কোনোমতে নিজের চোখের পানি মুছে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে,জাফর আলী চশমার ফাঁক দিয়ে চৈতির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলেন,
"তুরাগ কি না বলে চইলা গেল নাকি? তা মুখখানা অমন আষাঢ়ে মেঘের মতো কইরা রাখছ কেন দাদি?"
চৈতি ম্লান হেসে তাদের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। জাফর আলী দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার মাছের দিকে মন দিয়ে নিচু স্বরে বলেন,
"তুরাগের রক্তের তেজটা একটু বেশি , ঠিক ওর বাপের মতো। কিন্তু ওর মনে কোনো প্যাঁচঘোঁচ নাই। রাগটা ওর চড়া ঠিকই, কিন্তু রাগ কমলে দেখবা ওই পোলারি ঠিকই নিজে থাইকা আইসা সোহাগ শুরু করছে। তুমি মিছা মন খারাপ কইরো না।"
চৈতি এবার বেশ লজ্জা পেয়ে যায়। সে বুঝতে পারে ঘরের ভেতর তুরাগের সাথে তার মনোমালিন্যের শব্দ দাদি আর দাদাজান দুজনই শুনেছেন। লজ্জায় তার ফর্সা মুখটা কিছুটা রক্তিম হয়ে ওঠে। সে আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়। মাছ কাটা শেষ হতেই আলো বেগম আঁচল টেনে জাফর আলীর দিকে তাকিয়ে বলেন,
"ওগো, তুমি এখানে বসো। আমি আর চৈতি গিয়ে পুকুর থেকে মাছগুলো ধুয়ে নিয়ে আসি।"
চৈতি আর দেরি করে না, চট করে মাছের খারি দুটো নিজের হাতে তুলে নেয়। পুকুরঘাটে আসতেই চৈতির মনের ভেতর একটা অজানা ভয় কাজ করতে শুরু করে। পুকুরটা অনেক পুরনো, চারদিকের বিশাল বিশাল প্রাচীন বটগাছগুলো ডালপালা মেলে আকাশটাকে আড়াল করে রেখেছে। শ্যাওলা ধরা পিচ্ছিল সিঁড়িগুলো দেখে চৈতি সতর্ক হয়ে যায়। সে আলো বেগমকে একপাশে সরিয়ে দিয়ে বলে,
"দাদি, আপনার নামার দরকার নাই, সিঁড়িগুলো খুব পিচ্ছিল। আপনি এখানেই বসেন, আমি ধুয়ে নিয়ে আসছি।"
আলো বেগম হাসিমুখে ওপরের সিঁড়িতে বসেন। চৈতি পা টিপে টিপে নিচে নেমে মাছ ধুতে শুরু করে। মাছ ধুতে ধুতে হঠাৎ তার মনে একটা কৌতূহল চাড়া দিয়ে ওঠে। মনের ভেতর কথাটা চেপে রাখতে না পেরে সে আলো বেগমের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে বসে,
"দাদি, আপনাদের কি নিজস্ব কোনো ছেলে-মেয়ে নেই?"
প্রশ্নটা করেই চৈতি আলো বেগমের মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকায়। সাথে সাথে এক অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটে যায় সেখানে। মুহূর্ত আগেও যে মুখটা হাসি-খুশিতে উজ্জ্বল ছিল, সেখানে হঠাৎ অমাবস্যার নিকষ অন্ধকার নেমে আসে। আলো বেগম একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন, যেন কয়েক দশকের জমানো পাথরচাপা কষ্ট নিশ্বাসের সাথে বেরিয়ে এল। তিনি শূন্য দৃষ্টিতে পুকুরের জলের দিকে তাকিয়ে ধরা গলায় বলেন,
"সাতটা মেয়ে হয়েছিল আমার রে নাতবউ, কিন্তু অভাগী মায়ের কপাল... একটাও বাঁচে নাই।"
আলো বেগমের হাহাকার মাখা উত্তর শুনে চৈতির ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে যায়।তার নিজের ওপর প্রচণ্ড রাগ হতে থাকে; কেন সে অহেতুক কৌতূহল দেখিয়ে এই বৃদ্ধ মানুষটার পুরনো ক্ষত খুঁঁচিয়ে তুলল? তার নিজের অজান্তেই মুখটা অপরাধবোধে শুকিয়ে যায়।
সে নিচু স্বরে, অত্যন্ত অপরাধী কণ্ঠে বলে,
"দুঃখিত দাদি... আমি সত্যিই জানতাম না। আমার এমন প্রশ্ন করা উচিত হয়নি।"
আলো বেগম নিজেকে সামলে নেন। তিনি ম্লান হেসে চৈতির দিকে তাকিয়ে কোমল স্বরে বলেন,
"আরে, তুই কেন দুঃখিত বলছিস পাগলি? এতে তোর কী দোষ? যা হওয়ার তা তো হয়েই গেছে। আল্লাহ যা কপালে লিখে রাখছেন, তার ওপর তো আমাদের হাত নাই। তুই ওসব কথা বাদ দে, তাড়াতাড়ি মাছ ধুয়ে উঠে আয়।"
চৈতি কোনো কথা না বলে দ্রুত হাতে মাছ ধোয়া শেষ করে।
চলবে….
(ক্যায়সা লাগা মেরা মজাক? আজকে আমার লেখালেখির শুরু করার একমাস হলো তাই ভাবলাম একটু কষ্ট করে হলেও আপনাদের খুশি করার প্রয়োজন।এই এক মাসেই আপনারা আমাকে যে ভালোবাসা দিয়েছে তা আমি স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারিনি।আজকে একটু বেশি বেশি করে আমাকে উৎসাহিত করুন যাতে এইভাবে সামনে এগিয়ে যেতে পারি।)