ফন্ট সাইজ:
থিম:
চৈত্র শেষে শ্রাবণধারা

২৫তম পর্ব

লেখক: চিন্ময়ী নূর

দুপুরে তপ্ত রোদটা জানালার কাঁচ চিরে এসে তুরাগের পায়ের কাছে লুটিয়ে আছে। ঘরটা অদ্ভুত রকমের শান্ত, কিন্তু এই স্তব্ধতা তুরাগের ভেতরের অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।একপাশে রাখা লেদারের কাউচটার দিকে সে একবার তাকায়, তারপর আবার নামিয়ে নেয় চোখ।টেবিলের ওপর রাখা ভারী কাঁচের পেপারওয়েটটা বিকেলের আলোয় চকচক করছে। তুরাগ চুপচাপ বসে আছে। হাতের ঘড়িটার সেকেন্ডের কাঁটার দিকে তার সমস্ত ধ্যান, সময়টা আজ বড্ড ধীরে বইছে।আরো পনেরো বিশ মিনিট অপেক্ষার পর কেবিনের দরজাটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে খুলে যায়। চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করতে করতে ডক্টর ইমতিয়াজ ভেতরে ঢোকেন। তুরাগকে এই অবস্থায়, এভাবে সেজেগুজে নিজের সামনে দেখে তিনি যতটা না অবাক হন, তার চেয়ে বেশি বিরক্ত হন। হাতের ফাইলটা ধপাস করে টেবিলের ওপর ফেলে দিয়ে তিনি চেয়ারটা টেনে বসেন। তুরাগের চোখের ওপর নিজের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রেখে বেশ কড়া গলায় বলেন,

"কিরে, তুই কই ছিলি? একমাস ধরে তোকে কতবার ফোন করেছি তার কোনো হিসাব আছে? একবারও কলটা ধরলি না!"

তুরাগ কিছু বলতে চায়, কিন্তু তাকে সুযোগ না দিয়ে ডক্টর আবারও ঝাড়ি মেরে ওঠেন,

"খালাকেও কতবার বললাম তোকে ফোনটা দিতে, সে তো উল্টো হাসে! বলে তুই নাকি বউ পেয়ে এমনই পাগল হইছিস যে বাড়ির থেকেই বের হস না?"

তুরাগ নির্লজ্জের মতো একটা চওড়া হাসি দেয়। ইমতিয়াজের কথাগুলো যেন ওর গায়েই লাগে না। সে আয়েশ করে শার্টের উপরের বোতামটা খুলে চেয়ারে গা ছেড়ে দিয়ে হেলান দিয়ে বসে। তারপর চোখ টিপে আড্ডার ছলে বলে,

"আমার বউ যে পরিমাণ আদুরে ডাক্তার সাহেব, ওরে ছাইড়া কোনো জায়গায় যাইতে মন সায় দেয় না।"

ইমতিয়াজ এবার সত্যি সত্যি ক্ষেপে যান। টেবিলের ওপর রাখা কলমটা হাতে নিয়ে রাগে গজগজ করতে করতে বলেন,

"ফাজলামি করিস না। এতই যদি সোহাগ উথলায়া পড়ে, তো বউয়ের কাছেই থাক! আমার এখানে সময় নষ্ট করতে এসেছিস কেন? যা, বাড়ি যা!"

তুরাগ আরও গা ছাড়া ভাব নিয়ে, অনেকটা উদাসীন গলায় বলে,

"আরে রাগের কী আছে? আসছি তো দরকারে। কয়দিন ধরে কেমন জানি ওলটপালট লাগছে সব। জেগে জেগে স্বপ্ন দেখতেছি। এই যেমন এখন এখানে বসে আছি, হুট করে মনে হয় বউয়ের এইটা হইছে, ওইটা হইছে। মনে হয় ও কোনো বিপদে পড়ছে, কেউ ওরে নিয়া যাইতেছে। শান্তি পাইতেছি না রে দোস্ত।"

ইমতিয়াজ এবার বেশ নড়েচড়ে বসেন। তুরাগের এই জেগে জেগে স্বপ্ন দেখা বা হ্যালুসিনেশনের ইতিহাস অনেক পুরনো। তিনি হাতের ফাইলটা টেনে নিয়ে চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে গম্ভীর গলায় শুধান,

"জেগে জেগে স্বপ্ন দেখছিস মানে? ঠিক কী কী দেখিস ডিটেইলসে বল তো।"

তুরাগ খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে সবটা মনে করার চেষ্টা করে। তারপর শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ধীরপায়ে বলতে শুরু করে,

"একদিন রাতে মনে হলো বউকে বাইরে থেকে কেউ ডাকছে। বাইরে তখন ঝুম বৃষ্টি। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি বৃষ্টি থেমে গেছে, চারদিকে কেউ নেই। আবার ঘরে ফিরে দেখি বউও নেই! আতঙ্কে দিশেহারা হয়ে যখন তাকে খুঁজতে বের হই পাইনি কিন্তু হঠাৎ করে সে আমার সামনে হাজির হলো। সারারাত আমি আর ঘুমাতে পারিনি, বসেই কাটালাম। পরে সকালে বিলে গিয়ে ঠান্ডা মাথায় ভেবে দেখলাম সবটাই আমার কল্পনা ছিল, আসলে এমন কিছুই হয়নি।"

তুরাগ থামে, একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে আবার বলতে শুরু করে,

"আরেকদিন বউকে নিয়ে নৌকায় ঘুরতে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো নৌকাটা বুঝি উল্টে গেছে, সে তলিয়ে গেল পানির নিচে আমি আর তাকে খুঁজে পেলাম না। এমন আরও দুই-একবার হয়েছে। প্রতিবারই দেখি বউ আমারে একা ফেলে হুট করে গায়েব হয়ে যাচ্ছে।"

ইমতিয়াজ কিছুক্ষণ হাতের কলমটা টেবিলের ওপর রেখে নিস্তব্ধ হয়ে ভাবেন। তুরাগের অবচেতন মনের ভয়গুলো যে এভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে, তা বেশ চিন্তার বিষয়। তিনি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন,

"এইটা সম্পূর্ণ তোর হ্যালুসিনেশন। তুই তোর মনের অজান্তে বউকে হারিয়ে ফেলার প্রচণ্ড আতঙ্কে ভুগছিস। তুই ঠিকমতো ঘুমাস না, আর সারাদিন তোর মগজে কেবল উনার চিন্তাই ঘুরঘুর করে। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা আর অনিদ্রার কারণে তোর মস্তিষ্ক এই মিথ্যা দৃশ্যগুলো তৈরি করছে। যাকে তুই সবচেয়ে বেশি ভালোবাসিস, তাকেই হারানোর ভয়টা তোর সামনে বারবার ছায়া হয়ে দাঁড়াচ্ছে।"

তুরাগ ইমতিয়াজের কথার কোনো প্রতিবাদ করল না। সে মেঝের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত মলিন গলায় বলল,

"সে ছাড়া আমার আর আছেই বা কে রে? তার যদি কিছু হয়, তবে মনে হয় না আমি বাঁচতে পারব। তার চোখের দিকে তাকালে আমার মনে হয় দুনিয়ার সব শান্তি ওইখানেই আছে। কিন্তু হুট করে যখন দেখি সে নাই, তখন কলিজার ভেতরটা মনে হয় কেউ ছিঁড়ে বের করে নিয়ে যাচ্ছে।"

ইমতিয়াজ প্রেসক্রিপশনটা লিখতে লিখতে একবার চোখ উঠিয়ে তুরাগের দিকে তাকায়। কলমের খোঁচায় ওষুধের নামগুলো দ্রুত কাগজে ফুটিয়ে তুলে তিনি গম্ভীর গলায় বলেন,

"তোকে কয়েকটা কড়া ঘুমের ওষুধ লিখে দিচ্ছি, এইগুলো খেয়ে তুই কিছুদিন শান্তিতে ঘুমা। তোর মস্তিষ্ককে রেস্ট দিতে হবে। নাহলে এই হ্যালুসিনেশন তোকে গিলে খাবে, তুই আবারও আগের মতো পাগল হয়ে যাবি।"

তুরাগ কোনো পাল্টা যুক্তি দেয় না। ইমতিয়াজ ভুল বলছে না, কিন্তু তার ভেতরে যে অস্থিরতা চলছে, তা কোনো ওষুধ দিয়ে থামানো সম্ভব কি না, সে বিষয়ে তার ঘোর সন্দেহ আছে। ইমতিয়াজের চেম্বার থেকে বের হয়ে তুরাগ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। তার শহরে আসার আজ পাঁচদিন হয়ে গেছে। এর মধ্যে একবারও চৈতির সঙ্গে তার কথা হয়নি। গ্রাম থেকে শহরে আসার সময় সেই যে ফোনের নেটওয়ার্ক আর মনের নেটওয়ার্ক বিচ্ছিন্ন হয়েছে, তা আর জোড়া লাগেনি। তুরাগ নিশ্চিত, চৈতি অভিমানে পাহাড় হয়ে আছে। বিশেষ করে আসার সময় বিনা কারণে মেয়েটার ওপর যেভাবে সে চিল্লাইছে আর দুর্ব্যবহার করেছে, তাতে রাগ হওয়াটাই স্বাভাবিক। তুরাগ হাঁটতে হাঁটতে মনে মনে ঠিক করে নেয়, এবার ফেরার সময় সে খালি হাতে যাবে না। নিউমার্কেট হয়ে একবার ঢুঁ মারবে। চৈতির জন্য পছন্দমতো কিছু শাড়ি আর প্রসাধনী কিনে নিয়ে যাবে। মেয়েটা বড্ড সরল, তুরাগের আনা ছোট্ট উপহার আর একটু সোহাগ পেলেই নির্ঘাত তার সব রাগ বরফের মতো গলে যাবে।

তুরাগ রাস্তার সরু গলিটা ধরে আনমনে হাঁটছে। মাথার ওপর তপ্ত দুপুরের সূর্য, রোদের প্রখর তেজ শার্টের কাপড় ভেদ করে শরীরে বিঁধছে তীরের মতো, কিন্তু সেদিকে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। তার সমস্ত মনোযোগ এখন পকেটের মানিব্যাগটার ওপর। গলিটার একপাশে ছায়ায় দাঁড়িয়ে সে মানিব্যাগ থেকে টাকাগুলো বের করে আবারও গুনল। নোটগুলো বড্ড কম, সংখ্যাটা তার প্রয়োজনের তুলনায় বড্ড নগণ্য।দোলাচলে আটকে গেছে তুরাগ। জমির জন্য ভালো কিছু বীজ কেনাটা তার জন্য খুব জরুরি, ওদিকে এখান থেকে নিউমার্কেট হয়ে গ্রামে ফেরার পথটাও অনেকটা দীর্ঘ। সে যদি এখন আয়েশ করে রিকশা বা গাড়িতে যায়, তবে ভাড়াতেই পকেটের একটা বড় অংশ শেষ হয়ে যাবে। আর সেটা হলে চৈতির জন্য ভালো কিছু কেনা তো দূরের কথা, মানসম্মত বীজটুকুও জুটবে না। আবার যদি হাত খুলে চৈতির জন্য কেনাকাটা করে, তবে ফেরার ভাড়ার টাকাটাই আর অবশিষ্ট থাকবে না। তুরাগ কপালের ঘাম মুছে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। একবার ভাবে একটা রিকশা নিয়ে নিবে, শরীরটা আর চলছে না। কিন্তু পরক্ষণেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে আসার সময়কার চৈতির ছলছল চোখ আর অভিমানী মুখটা। মেয়েটার ওপর সে বড় বেশি অন্যায় করে ফেলেছে। কোনো কারণ ছাড়াই তাকে ধমক দিয়ে একা ফেলে এসেছে। একটা শাড়ি বা অন্তত তার প্রিয় কোনো প্রসাধনী না নিয়ে আজ ঘরে ফিরলে সে নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারবে না।নিজের আরাম-আয়েশের কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে তুরাগ। টাকাগুলো মুঠোয় চেপে ধরে সে মনে মনে ঠিক করে হাঁটবে, আজ সে অনেকটা পথ হেঁটে টাকা বাঁচাবে। নিজের পা দুটোর ওপর অমানুষিক ধকল যাক, তাতে ক্ষতি নেই কিন্তু ফেরার পথে চৈতির জন্য এক টুকরো রঙিন হাসি তাকে নিয়ে যেতেই হবে। শার্টের হাতা দিয়ে মুখটা মুছে নিয়ে তুরাগ লম্বা কদমে নিউমার্কেটের দিকে হাঁটা দেয়। পায়ের তলার পিচঢালা রাস্তাটা আগুনের মতো উত্তপ্ত হয়ে আছে। তৃষ্ণায় তুরাগের গলা শুকিয়ে একদম কাঠ হয়ে গেছে, বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করছে। রাস্তার ধারে পানির বোতল সাজানো দোকানগুলো তাকে বারবার প্রলুব্ধ করলেও পকেটে তার হাত যায় না। এক বোতল পানি মানেই তো বিশটা টাকা কমে যাওয়া সেটা হোক না সামান্য, কিন্তু ওই টাকাটুকু বাঁচাতে পারলে চৈতির জন্য হয়তো এক পাতা টিপ কেনা যাবে। এই ভেবে সে নিজের তৃষ্ণাকে গলা টিপে মেরে সামনে এগিয়ে চলে। প্রায় ঘণ্টাখানেক টানা হাঁটার পর তুরাগের শরীর আর সায় দিচ্ছে না। পায়ের পাতা দুটো জ্যান্ত আগুনের উপর পড়ছে। একটু জিরিয়ে নেওয়ার তাগিদে সে রাস্তার ধারের একটা বিশাল বটগাছের ছায়ায় গিয়ে বসে। কিন্তু বসার সাথে সাথেই তার নজর গিয়ে স্থির হয় সামনের একটা ফুচকার দোকানের উপর। একটা ছেলে আর একজন মাঝবয়সী মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন। ছেলেটার বয়স হবে তেইশ কি চব্বিশের কোঠায়। তুরাগ প্রথমে সাধারণ দৃষ্টিতে তাকালেও পরক্ষণেই তার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে যায়। সে চোখ বুজে আবার ভালো করে তাকায় না, তার হ্যালুসিনেশন নয়, এবার সে একদম ঠিক দেখছে। এই মহিলাকে সে মাস খানেক আগে চৈতির সঙ্গে ছবিতে দেখেছিল! যদিও ছবিতে মহিলা অনেক বেশি তরুণী ছিলেন আর এখন চেহারায় বয়সের ছাপ পড়েছে, কিন্তু তুরাগ মানুষের মুখচ্ছবি সহজে ভোলে নয়।মহিলাটি ওই ছেলেটির হাত ধরে বেশ মমতা নিয়ে কথা বলছেন। তুরাগ স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। তার মানে চৈতির মা এখন এই শহরেই আছেন? আর এই ছেলেটা কে যার জন্য এত মমতা? তুরাগ টলমল পায়ে উঠে দাঁড়ায়। তার হৃদপিণ্ড দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছে। কিন্তু পরক্ষণেই সে নিজেকে সামলে নেয়। না, সে যা দেখেছে তা চৈতিকে কখনো বলবে না। বলেই বা কী লাভ? তুরাগ জানে, এই মহিলা চৈতিকে ফেলে চলে গিয়েছিলেন। যে মা নিজের সন্তানকে মাঝপথে একা ফেলে যেতে পারেন, তার উপস্থিতি চৈতির জীবনে এখন কেবল নতুন করে রক্তক্ষরণই ঘটাবে। তুরাগ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উল্টো দিকে হাঁটা দেয়। সে চায় না চৈতির ক্ষতগুলো আবার জেগে উঠুক। চৈতি এখন তার আশ্রয়ে আছে, তার ভালোবাসায় আছে এটাই সত্য। অতীতের বিষাক্ত স্মৃতিগুলো এখনেই পড়ে থাকুক, তুরাগ তার সাথে করে গ্রামে নিয়ে যাবে কেবল ভালোবাসা।আর এই দৃশ্যটা সে তার স্মৃতির অতলে চিরতরে কবর দিয়ে দেবে।

চলবে….

(গল্পটা প্রথমে যাই একটু গুছানো ছিলো কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমি সব মিলিয়ে জগাখিচুড়ি বানিয়ে ফেলছি আস্তে আস্তে।তাই এখন থেকে আস্তে আস্তে রহস্য খুলতে থাকবো আমি চাইনা গল্পটা আর নষ্ট হোক।)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন